প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৩
সাইয়্যারা খান
সময়টা তখন গিয়ে ঠেকেছে রাত তিনটার কাটায়। পৌষ ঠাই বসা রাস্তার এক বেঞ্চে। তুহিন ওর পায়ের কাছাকাছি বসেছে হাঁটু ভেঙে। ইহান বসা পাশে। ইরা গিয়েছে মেঝ মামার কাছে, তায়েফা ওখানে একা। তৌসিফের ঘুম ভাঙে নি এখনও। ঘুমের ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে ওকে। মিস্টার কিবরিয়া হসপিটালে গিয়ে ডক্টরদের সাথে কথা বলেছেন। প্যানিক অ্যাটাক থেকেই জ্ঞান হারিয়েছে তৌসিফ। শরীর দূর্বল হয়েছে হঠাৎ, প্রেশার ফল করেছে অনেক। সব মিলিয়ে দিন দুই লাগবে সুস্থ হতে। এনজাইটির ঔষধ চলবে এটা নিয়েও বলে গিয়েছেন। তৌসিফের মেডিক্যাল রেকর্ড সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেও তায়েফা বা মিস্টার কিবরিয়া কেউ উত্তর দিতে পারেন নি। তুহিনও পারে নি। তারা তৌসিফ থেকে দূরে ছিলো। তৌসিফের জন্য জীবনে বড় ধাক্কাই ছিলো তার মায়ের প্রস্থান। তুহিন ছোট বলে তৌসিফ বা তুরাগ সামলাতো কিন্তু তৌসিফ যেতো কার কাছে? কে ছিলো তার? একটা নারী ছিলো অবশ্য। পিয়াসী ছিলো।
যার সাথে তৌসিফ জীবনের লম্বা সময় পাড় করেছিলো। মৌখিক ভাবে বিয়ে ঠিক ছিলো। তৌসিফ তখন রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে দাবিয়ে বেড়ানো এক সদস্য। সম্রাটের রেখে যাওয়া ঝাঁঝ কিছুটা তো বাকি রয়েই গিয়েছিলো, সেই সাথে যোগ দিয়েছিলো তৌসিফের নিজস্ব কায়দায়ায় করা রাজনীতি যার ফলাফলস্বরূপ যখন দল বদলে গেলে তখন চরম মাত্রায় বিপাকে পড়লো সকলে। চেয়ারম্যান বাড়ী পরিণত হলো শাসন ঘাটে। একদম নিস্তব্ধ, নিরিবিলি। তৌসিফ, তুহিন, তুরাগ তিন ভাই পলাতক তখন। বাড়ীটা পুরুষহীনা থাকলে নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠবে আরো তাই তো চাচাতো দুই ভাইকে এই বাড়ীতেই রেখে গিয়েছিলো। সোলায়মানের ছেলেরা তখন নব যৌবনের অধীকারী। পিয়াসীর সাথে তুষারের সম্পর্ক ভালোই ছিলো। পলক যেহেতু এই বাড়ীতেই থাকতো তাই বোনের সাথে পিয়াসীও এখানেই থাকতো তবে সে থাকতো তৌসিফের ফ্ল্যাটে। তৌসিফ সেবার পলাতক ছিলো টানা ছয়মাস কারণ দেশের অবস্থা বৈরী ছিলো। বিরোধী দলের প্রধান প্রধান কিছু মাথার নাম লিস্টে ছিলো যাদের সরাসরি ক্রস ফায়ারের দেওয়া হয়েছিলো।
তিন ভাইয়ের মধ্যে তৌসিফ এবং তুহিনের নাম চলে এসেছিলো তাতে। কেরানীগঞ্জ দাবিয়ে বেড়ানো দুই ভাই এই খবর জেনেছিলো জিঞ্জিরা মডেল থানা থেকে। বেশিরভাগ পুলিশের সাথেই সম্পর্ক খুব ভালো ছিলো। আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারবে না অবৈধ ভাবে তারা কিছু করেছে। সেই ছয় মাসের ব্যবধানে তৌসিফ হারিয়ে ফেলে তার বাবাকে যে কিনা বারংবার তাদের অনুরোধ করেছিলো এই ধ্বংসের পথ থেকে ফিরে আসতে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তৌসিফ আর তুহিন এমন পর্যায়ে ছিলো যে ফিরে আসা ছিলো অসম্ভব! দুই ছেলের চিন্তায় চিন্তায় প্রথমবার স্ট্রোক করেন শাজাহান তালুকদার। তিশা তখন পা’গলের মতো দুই ভাইকে ফোন করেছিলো। নিকট আত্মীয়দের সাহায্যে বাবাকে হাসপাতালে নিয়েছিলো। তাদের বাড়ী ছিলো পুলিশ দিয়ে ঘেরাও করা। সকল খবরাখবর সরাসরি চলে যেতো তাদের নিকট। বোনের কান্না কানে তুলতে পারে নি তিন ভাই। মিরপুরে থাকা তুরাগও আসতে পারে নি। অতঃপর এক মাসের ব্যবধানে তাদের কাছে খবর আসে তৌসিফ নিখোঁজ। এটা ছিলো নিছক ছড়ানো এক গুজব যার দরুন দ্বিতীয়বার স্ট্রোক করে ফেলেন শাজাহান তালুকদার। এই যাত্রায় অবস্থা খুব বেগতিক দেখা যায়। ছেলের শোকে তিনি হসপিটালের বিছানায় তৃতীয়বার স্ট্রোক করেন যদিও তখন জেনেছিলেন তার অধিক প্রিয় ছেলেটি বেঁচে আছেন। নিথর দেহে ওখানেই পড়ে ছিলেন শাজাহান তালুকদার। তিশার কান্নায় চারপাশ ভারী হয়ে ওঠে। সবাই থাকলেও ছিলো না তিন ভাই। তাহিয়া বরাবরই নিরব ছিলো। হাসপাতালের করিডোর চিৎকার করে তিশা বারবার বলছিলো,
“মেঝ ভাই দায়ী। আব্বার মৃত্যুর জন্য তোরা সবকটা দায়ী। আমার আব্বাকে মেরে ফেলেছিস তোরা।”
শুধু মাত্র দাফনের সময় হাজির হয় তুরাগ। তৌসিফ আর তুহিন আসতে পারে নি। পুলিশের উপস্থিতিতেই দাফন সম্পূর্ণ হয়েছিলো। বাড়ীর অবস্থা তখন খুবই নাজুক। সেই নাজুক অবস্থায় আরেকটা ধাক্কা ছিলো তুষারের সাথে পিয়াসীর পালিয়ে যাওয়া। তৌসিফ খবরটা জেনেছিলো পরে। দু’জন একাকী সময় কাটাতে প্রায়। পিয়াসী নিজেও তখন তৌসিফের থেকে দূরত্ব মেনে নিতে পারে নি। তুষারের সাথে গড়ে উঠেছিলো তার ভিন্ন এক প্রেমের সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক তৌসিফ কোনদিনই টিকে থাকতে দিবে না সেটা জানতো দুজনেই তাই তো পালিয়ে যাওয়াটাই শ্রেষ্ঠ মনে হয়েছিলো। একা একা এই কাজ করাটাও অসম্ভব ছিলো। পিয়াসী তখন কথা বাড়ায় নিজ বোনের সাথে। পলক শোনা মাত্রই না করেছিলো কিন্তু বোনের কথা না করতে পারে নি শেষ পর্যন্ত তাই তো তৌসিফের আলমারি থেকে নগদ অর্থ সহ ভরী ভরী স্বর্ণ নিজ হাতে সরিয়ে পাঠিয়েছিলো পিয়াসীর কাছে।
তুরাগ জানা মাত্রই দু’জনকে খোঁজার অনেক চেষ্টা করেছিলো কিন্তু ফলাফল শূন্য। ও জানতো তৌসিফ পিয়াসীকে হাতে পেলে আঘাত করতে দুবার ভাববে না কিন্তু শেষে কি হয়েছিলো সেটা তালুকদার বাড়ীর একদম ভেতরের সদস্যরা বাদে কেউ জানে না এখনও।
তুহিন খুব আশা নিয়ে তাকালো পৌষের দিকে। পৌষ ওর দিকে তাকাতেই তুহিন বললো,
“মেঝ ভাইয়ার দোষ নেই পৌষ। ভাই তো শুধু ভালোবেসেছিলো। আমার ভাই কোন খারাপ কাজ করে নি। মেঝ ভাইয়ার সাথে তুমি কথা বলো।”
“আমাকে আগে জানানো উচিত ছিলো না?”
“পিয়াসী এতটাও গুরুত্বপূর্ণ কেউ না পৌষ৷ তোমাকে বিয়ে করার বহু আগেই পিয়াসী ভেগে গিয়েছিলো। কি বলবে মেঝ ভাইয়া? প্রেম ভালোবাসা হয়েছিলো। ব্যাস, ওখানেই শেষ। এটা তো এতটাও গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।”
“গুরুত্বপূর্ণ না হলে পিয়াসী তখন আপনার ভাইয়ের কাঁধে মাথা রাখতো?”
“বিজনেস ডিল হওয়ার কথা ছিলো।”
“প্রেম করছিলো।”
“আহা, পৌষ। শুনো, তুষার আর পিয়াসীর যেই ডায়মন্ডের বিজনেসে সেটায় মেঝ ভাইয়া আর আমারও পার্সেন্টেজ আছে।”
“এত কিছুর পর একসাথে ব্যাবসা?”
“মাঝে একটু কাহিনি আছে। তুমি ভাইয়ার সাথে কথা বলো।”
“কথা বলতে ইচ্ছুক নই।”
তুহিন পৌষের আঁচলটা ডান হাতে পেঁচিয়ে নিতেই পৌষ বললো,
“এয়ারপোর্টে গিয়ে কিন্তু এখন আমি খুব ঝামেলা করব।”
“আমি যেতে দিব না পৌষ৷ আর কি জানতে চাও?”
“জানতে চাইতে হবে কেন? আগে জানালো না কেন আপনার ভাই? আমার স্বামী প্রেমিকা নিয়ে বসে ছিলো। কেন থাকবে? ব্যাবসা করতে হবে কেন?”
তুহিন ক্ষুদ্র শ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে নিলো। বললো,
“উঠে এসো। ভাইয়ার থেকে শুনবে।”
পৌষ বসে রইলো। ইহান তাকিয়ে আছে অসহায় ভাবে। চোখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হলো। তুহিন ধীরে হাতটা নিচে বাড়ালো। পৌষের পা ধরতেই পৌষ ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিলো। উঠে দাঁড়িয়ে রাগী কণ্ঠে বলে উঠলো,
“ফাইজলামি হচ্ছে! আমার জামাই, আমি বুঝি না? সে আমাকে ভালোবাসে আমি জানি না? আমি পা’গল? আমাকে কেন পা ধরে বুঝাতে হবে? আমার চোখ থেকে শুধু তাদের একত্রে দেখার দৃশ্য মুছছে না।”
তুহিন উঠে দাঁড়াতেই পৌষ হাঁটা ধরলো। তুহিন, ইহান দৌড়ালো পেছনে। চেঁচিয়ে উঠলো তুহিন,
“কোথায় যাবে এয়ারপোর্টে নাকি স্বামীর বুক?”
“জাহান্নামে।”
ধীর পায়ে কেবিনে ঢুকে পৌষ। চোখেমুখে তেমন পরিবর্তন নেই। বেডে এভাবে দ্বিতীয়বার পড়ে থাকতে দেখলো সে তৌসিফকে। কারণ দুইবারই পৌষ। এগিয়ে গিয়ে নিকটতম হতেই বন্ধ চোখের তৌসিফকে দেখলো ও। পা দুটো টেনে নিয়ে এলো কাছাকাছি। হাত বাড়িয়ে দিলো ঘুমন্ত তৌসিফের দিকে। প্রশস্ত কপালে হাত বুলিয়ে ঝুঁকে কপালে চুমু খেলো, পরপর দুই গালে, থুতনিতে এবং শেষটায় দীর্ঘ এক চুমু খেলো ঠোঁটে। বুক জুড়ে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বললো,
“আমি জানি এই বুকে আমি থাকি।”
একটু থেমে পুণরায় বললো,
“শাস্তিটা তোলা রইলো। আরেকবার নারী ঘটিত ব্যাপার জানলে ছেড়ে যেতে দুবার ভাবব না আমি।”
পৌষ বাথরুমে চলে গেলো। মুখ হাত ধুতে হবে একটু। ঠান্ডায় শরীর অবশ লাগছে তার।
“আমি মরে যেতে রাজি পৌষরাত কিন্তু তোমাকে ছাড়তে না।”
তৌসিফ যেন একা একাই বিরবির করলো। তার পরিশ্রান্ত চোখ দুটো কেবিনের এদিক ওদিক ঘুরলো কিছুক্ষণ। ভীষণ তৃষ্ণা নিয়ে সে খুঁজতে লাগলো পৌষকে। সে জানে তার পৌষরাতটা রাগী, বেয়াদব, ছন্নছাড়া, ভীষণ উদাসীন তবে তৌসিফের ক্ষেত্রে সে এসকল গুনের পাশাপাশি ভীষণ যত্নশীল। তৌসিফকে শেষবার এভাবে তার মা যত্ন করতো। এতগুলো বছর মা ছাড়া থেকে এখন সে যত্ন পায় স্ত্রী থেকে। তার পৌষরাত থেকে। তুহিনটাকি আর শুধু শুধু পা’গল হয়েছে পৌষের জন্য?
তবে তৌসিফ পৌষকে পেলো না। ভীষণ অসহায় ভাবে কণ্ঠে আকুলতা নিয়ে ডাকলো সে,
“প..পৌষরাত?”
দমকা হাওয়ার উড়ে গেলো ডাকখানা৷ কি আদুরে ভাবে তাকিয়ে রইলো তৌসিফ। তার চোখ দুটো জ্বলছে ভীষণ ভাবে। তৌসফের বুক তখন ধরফর করছে। ওর মনে হচ্ছে পৌষ এখানে। হ্যাঁ, অবশ্যই এখানে। ওর ভাবনার মাঝেই বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো পৌষ। তৌসিফ তখন বুদ হয়ে তাকিয়ে রইলো। ওর দৃষ্টিতে আটকে পৌষ। পৌষ এক দুই পা করে এগিয়ে এলো। বসলো তৌসিফের পাশে। ডান হাত বাড়িয়ে তৌসিফের চাপ দাঁড়ি যুক্ত চোয়ালটা চেপে ধরলো ততক্ষণাৎ। হিসহিসিয়ে বলে ওঠে,
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮২ (২)
“শুধু মাত্র এইবারের জন্য ছাড়। নাটক দেখে চোখ দুটো জ্বলছে। মুখ দিয়ে পিয়ুর নাম হলে পরের বার খু ন করে জেলে যাব তবে কাকে খু ন করব সেটা বলতে পারছি না।”
তৌসিফকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই পৌষ দু’জনের ওষ্ঠাধর একত্রে মিলিত করলো। মত্ত হলো দু’জন প্রেমসুধা পানে। সুধায় কাতর তৌসিফ ডুবে গেলো। কোমর চেপে পৌষকে একেবারে বুকে তুলে ফেললো। অস্থির হয়ে গেলো দু’জন। প্রেমে মত্ত রইলো কিছুক্ষণ।
