Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ৪৫

উন্মাদনা পর্ব ৪৫

উন্মাদনা পর্ব ৪৫
কায়নাত খান কবিতা

“ নিজের বা’ল, নিজেই ছিড়তাছে জাতির ব্রো..!”
অভীর কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছাতেই তার সাঙ্গোপাঙ্গদের মুখের রঙ মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যে মুখগুলো দুষ্টুমির হাসিতে উজ্জ্বল ছিল, সেগুলো এখন অকারণ অস্বস্তিতে বিবর্ণ। কারও কপালে চিকচিক করছে ঘামের বিন্দু, কেউ আবার শুকনো গলায় বারবার ঢোক গিলে পরিস্থিতি সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
কাঠফাটা রোদের দুপুরে বিয়ে সেরে নতুন বউকে ঘরে তুলেই আবার সোজা গ্যারাজে চলে আসা, ঘটনাটা যেন তাদের কারও বোধগম্য হচ্ছিল না। তারা অভীকে বহুদিন ধরে চেনে, কিন্তু আজকের অভীকে যেন সেই চেনা মানুষটির সঙ্গে কোনোভাবেই মেলাতে পারছিল না। তার আচরণে এমন এক অদ্ভুত স্বাভাবিকতা, যা-ই তাদের অস্বস্তিকে আরও গভীর করে তুলছিল।
নেমে আসা ভারী নীরবতাটা আর সহ্য করতে না পেরে কবি ঠোঁটের কোণে কৃত্রিম হাসি টেনে মৃদু স্বরে বলে উঠল,

“আজি বাসরের দিনে, কেন আপনে এখানে?”
কাটা ঘায়ে যেন আরও একমুঠো নুন ছিটিয়ে দেয় কবির কথাটা। অভীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মুন্ডুর কোমরে এক পা ঠেকিয়ে তাকে হালকা ধাক্কা দেয়। ঠোঁটের কোণে কটাক্ষের হাসি টেনে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ আপনাদের পু*কিতে বাঁশ ভরতে! তাও আক্কালা!”
অভীর তেড়াতেড়া কথার পর আর কারও মুখে শব্দ রইল না। সবাই চুপচাপ বসে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগে।ঠিক তখনই হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা নিয়ে ভেতরে ঢুকে ছোটু। এই কাঠফাটা গরমে চা খাওয়ার মতো দুঃসাহস বোধহয় অভীরই ছিলো।কাপটা টেবিলে রেখে ছোটু বলল,
“চাঁদ ভাই, দাদা সাহেব যেতে বলেছে।”
অভী নির্বিকার ভঙ্গিতে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
“এই রোদে বাইর হইলে কালা হইয়া যামু। আগে সানস্ক্রিন
মাইখা লই, তারপর যামু।”
কথা শেষ করেই টেবিলের ড্রয়ার খুলে সানস্ক্রিন বের করল সে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি হাতে নিয়ে মুখ, গলা আর বাহুতে যত্ন করে মাখতে শুরু করল।দৃশ্যটা দেখে ঘাতক সুমন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“আচ্ছা ভাই, আপনে রূপ লইয়া এত চিন্তা করেন ক্যান?”
অভী মুচকি হেসে আয়নায় নিজের মুখটা একবার দেখে বলল,
“জীবন যতদিন, যৌবন ধরে রাখবো ততদিন। ফলো মি!”
সানস্ক্রিন মাখা শেষ করে অভী উঠে দাঁড়ায়। মুহূর্তের মধ্যেই সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।কেন ডাকা হয়েছে, তা অভীর অজানা নয়। হঠাৎ করে তার বিয়ে, আর তারও আগে রেসে দুর্দান্ত জয়।এরপরই দাদা সাহেব তাকে সেই বহু আলোচিত গোপন আস্তানায় নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আজ মনে হচ্ছে, সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের সময় এসে গেছে।অভীর বাড়ি থেকে আস্তানার দূরত্ব খুব বেশি নয়। বাড়ির ছাদে দাঁড়ালেই চারপাশটা স্পষ্ট দেখা যায়। অনেকের ধারণা, মৃত ছেলের স্মৃতিকে চোখের আড়াল না করতেই কৃষ্ণ দাস ইচ্ছে করেই অভীর বাড়িটি আস্তানার এতটা কাছে নির্মাণ করেছিলেন।

অভীর বাড়িটি কৃষ্ণ দাস নির্মাণ করেছিলেন,এ কথা বলা ঠিক হবে না। বাড়িটি বহু পুরোনো।পুরান ঢাকার অধিকাংশ বাড়ির মতোই সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে বয়স তার সৌন্দর্যকে ম্লান করতে পারেনি। নিরিবিলি পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা দোতলা বাড়িটির স্থাপত্যে এখনো এক ধরনের পুরোনো দিনের অভিজাত্য লেগে আছে। শুধু দেয়ালের ক্ষয়ে যাওয়া রং আর মরিচাধরা লোহার গ্রিলগুলো সময়ের নির্মমতার সাক্ষ্য বহন করে।
আস্তানার ভেতরে তখন ভারী নীরবতা।
আক্কাস কমিশনের কথা শুনে কৃষ্ণ দাস ধীরে ধীরে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে মাটিতে ফেললেন। তারপর গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“যা করছি, ভেবেচিন্তেই করছি, নেতা। এই সিন্ডিকেটরে আমার চাঁদ বাবা অনেক কিছু দিছে। আমি তারে বিশ্বাস করি। চাঁদ আইসার পর থেইকা যত টাকার মুখ দেখছো, তত টাকা শুধু উসমান সাহেবের আমলেই আসছিল।”

আক্কাস কমিশন ঠোঁট বাঁকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“দেখেন, যা ভালো বুঝেন। তবে উসমান সাহেবের মতো টাকা আনতে আনতে, শেষে নিজেই আবার উসমান সাহেবের মতো হইয়া না যায়!”
কৃষ্ণ দাস হালকা হেসে মাথা নাড়লেন।
“হুহ! হাসাইলা, নেতা। চাঁদ আমার লাইগা গুলি খাইছিল। যে পোলা নিজের জীবন দিয়া আমারে বাঁচাইতে পারে, তারে অবিশ্বাস করার কোনো উপায় নাই।”
আক্কাস কমিশন এবার গলা নিচু করে বলল,
“বিশ্বাস তো আপনাকেও উসমান সাহেব করতেন…। শেষ পর্যন্ত আজ সিন্ডিকেটের দশা খুব একটা ভালো নয়।?”

কৃষ্ণ দাসের চোখমুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে উঠল।
“আমরা কেউ এই সিন্ডিকেটের জন্য জান দিতে রাজি নাই।। আমরা আছি ”
কথাটা শেষ করার আগেই বাইরে গাড়ির শব্দ ভেসে এল। মুহূর্তের মধ্যেই নিজের সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে আস্তানায় প্রবেশ করল অভী।তাকে দেখেই কৃষ্ণ দাসের গম্ভীর মুখে আবার স্নেহের হাসি ফুটে উঠল। দুই হাত প্রসারিত করে ডাকলেন,
“আয়, চাঁদ বাবা!”
অভীও বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে এগিয়ে গিয়ে কৃষ্ণ দাসের পাশে বসে পড়ল। মুহূর্তেই ঘরের ভারী পরিবেশে এক অদ্ভুত পরিবর্তন নেমে এল।
“ বাজান! শুনলাম মাইয়া তুলে আনছো!”
“ জ্বী দাদা সাহেব!”
“ তই, বিয়া সাদি?”
“ করছি! “
“ আমাগো তো বললা না বাজান!”
অভী কোনো উত্তর দিল না। নিঃশব্দে বসে রইল, যেন সমস্ত কথাই সে নীরবতার আড়ালে গুছিয়ে রেখেছে।
দাদাসাহেব মৃদু হেসে উঠলেন। তাঁর সেই হাসিতে ছিল প্রশ্রয়, স্নেহ আর একরাশ তৃপ্তি। ছেলে মানুষ বড়ো হয়েছে, বিয়ের বয়স হয়েছে, বিয়েও করেছে। এতে আর আপত্তি বা কোনো কিন্তু থাকার কী-ই বা কী আছে!
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি অভীর কাছে এগিয়ে এলেন। স্নেহভরা হাতে অভীর হাতটি ধরে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইলেন। তারপর পকেট থেকে একটি কাপড় বের করে অত্যন্ত যত্নে তার চোখ বেঁধে দিলেন।

“ এটা..!”
“ ভরসা করো তো আমারে?”
“ করি দাদা সাহেব!”
“ তাইলে চুপচাপ চলো! আইজকা তোমারে বিশেষ কিছু দেখামু!”
অভীর চোখে কাপড় বেঁধে তাকে নিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে বসল কৃষ্ণ দাস। সঙ্গে ছিলেন এমপি সাহেব এবং দাদাসাহেবের খাস চামচা।কানকাটা রমজান। পরক্ষণেই ইঞ্জিনের গর্জনে নিস্তব্ধতা ভেঙে গাড়িটি ছুটে চলল অজানা এক গন্তব্যের দিকে।
অভীর চোখ তখনও বাঁধা। বাইরের পৃথিবী তার কাছে অদৃশ্য, কিন্তু শ্রবণশক্তি যেন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। চারপাশের শব্দগুলোকে সে নীরবে বিশ্লেষণ করতে লাগল। হঠাৎই কানে ভেসে এলো কিছু একটার মৃদু ঝংকার। শব্দটা যেন কোনো অচেনা দরজার ওপাশ থেকে তাকে আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু সেই পথের শেষ কোথায়।তা অভীর জানা নেই।

অন্যদিকে, ঠিক সেই সময় রেহমান ছুটে বেড়াচ্ছে আরেক অদৃশ্য গোলকধাঁধার ভেতর। একের পর এক বার্তা এসে জমা হচ্ছে তার ফোনে। কোথাও শিশু নিখোঁজ, কোথাও রহস্যময় কিছু মানুষের দেশে প্রবেশ, আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।একের পর এক পুলিশ কর্মকর্তার নির্মম হত্যা।ঘটনাগুলো কি নিছকই বিচ্ছিন্ন? নাকি অদৃশ্য কোনো সুতোয় বাঁধা এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র?
রেহমানের কাছে উত্তর নেই। আছে শুধু অসংখ্য প্রশ্ন আর এমন এক শত্রুর উপস্থিতির আভাস, যে প্রতিটি পদক্ষেপেই যেন সবার চেয়ে কয়েক কদম এগিয়ে।
ক্যাবিনজুড়ে তখন থমথমে নীরবতা। ডেস্ক ল্যাম্পের ম্লান আলোয় মাথা নিচু করে নোটবুকে একের পর এক তথ্য লিখে চলেছে রেহমান। কপালের ভাঁজ স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে, কোনো জটিল সমীকরণের শেষ সূত্রটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে সে।ঠিক সেই সময় কোনো রকম অনুমতির তোয়াক্কা না করেই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল রোমিও।
রেহমান বিরক্ত হলো, তবে মুখে তার কোনো ছাপ ফুটল না। এমন বেয়াড়া আচরণে সে এখন অনেকটাই অভ্যস্ত। তাই নতুন করে প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রয়োজনও মনে করল না। নির্বিকার ভঙ্গিতে আবারও নোটবুকের পাতায় মনোযোগ ফিরিয়ে দিল।কিন্তু রোমিও কি আর এত সহজে হাল ছাড়ার মানুষ? বারবার উপেক্ষিত হয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে গুনগুন করে গেয়ে উঠল,

“আয়না মন ভাঙ্গা আয়না! দেয় না রেহমান স্যার পাত্তা দেয় না! সই না এই কষ্ট যে, সই না!”
“ বিরক্ত করো না রোমিও!”
“ স্যার, আপনি শুধু বিরক্ত করা দেখলেন। আমি যে গান গাইলাম। সেটা দেখলেন না!”
“ তোমার গানের গলা বেশ বেসুরে।তাই ধ্যান দেইনি।”
“ এভাবেই ডাইরেক্ট অপমান না করলে ও পারতেন স্যার!”
রেহমান তবু কিছু বলল না। নীরব হাতে নোটবুকে একের পর এক তথ্য লিখে চলল সে কয়েকটি তারিখ, কিছু সংখ্যা, আর কিছু অর্ধেক বোঝা কোডের মতো চিহ্ন। যেন কোনো অদৃশ্য ধাঁধার টুকরোগুলো সে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছে।রোমিও কপাল কুঁচকে সেই লেখা দেখতে লাগল। চোখে স্পষ্ট কৌতূহল, কিন্তু মাথায় যেন কিছুই ঢুকছে না।
অবশেষে ধৈর্য হারিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, “এগুলো কী আপনার গার্লফ্রেন্ডদের জন্মসাল?”
রেহমান ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল। দৃষ্টিটা এতটাই কড়া ছিল যে, মুহূর্তেই রোমিওর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে সাথে সাথেই মুখে কুলুপ আঁটল।

“সরি স্যার! আপনি তো জন্মের সিঙ্গেল,” রোমিও তড়িঘড়ি বলে ফেলে।
তারপর একটু গলা নামিয়ে আবার যোগ করল,“নিজে তো বিয়ে করেন না, আমাদেরও করতে দেন না!”
রেহমান এবারও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। শুধু কলমটা আরও শক্ত করে ধরে লিখে যেতে যেতে বলল,
“তা এতোই যখন শখ, নিজে বিয়ে করো না কেন? কে আটকাচ্ছে?”
শুকনো ঢোক গিলে রোমিও এবার ঠাণ্ডা গলায় বলল,“যেটা ধীরে বলি, সেটা শুনে । যেটা জোরে বলি, সেটাও শুনেন না। কাহিনি কী কিছুই বুঝি নাহ!”
রেহমান মুখ বাঁকিয়ে বলে “ব্রেন থাকলে তো বুঝতে পারতে!”
রেহমান এবং রোমিও নিজেদের কথায় ব্যস্ত ছিল। ঠিক তখনই দরজার ওপারে হুট করে এক লেডি অফিসার প্রবেশ করে।সে জানায়, দৌতলিয়া রেড লাইট এরিয়া থেকে একজন মেয়ে এসেছে। পোশাক দেখে তাকে নাচনেওয়ালী বাইজি বলেই প্রথমে মনে হয়।কিন্তু চোখে একটা অস্বস্তিকর গল্প লুকিয়ে আছে। রেহমান তাকে ভিতরে আসতে বলে।
কিছুক্ষণ পর ঘোমটা টেনে ধীরে ধীরে ভিতরে আসে বিলকিস রানি। সাথে একটি কিশোরী মেয়ে শেফালি। ঘরের ভেতর হঠাৎ করেই নীরবতা ভারী হয়ে যায়।বিলকিস সোজা চেয়ারে বসে পড়ে। কোনো ভূমিকা না করেই কথা শুরু করে।

‘ জ্বি বলুন!’
রেহমান কপাল কুঁচকে তাকায়। পরিবেশটা সে বুঝে নিতে চেষ্টা করে।
বিলকিস ভনিতা না করে বলে,
‘ পোশাক দেইখা তো বুইঝা গেছেন আমি রেড লাইট এরিয়ার মাইয়া। ওহহ সুরি সুরি নাচনু ওয়ালি।’
‘ ম্যাডাম কাজ কী?’
‘ এখানে আর কী কাজ হইবো ধান্দা তো করতে পারুম না!’
রোমিও পাশ থেকে হেসে ফেলে। সেই হাসি হালকা, কিন্তু মুহূর্তেই ঘরের ভারসাম্য নড়ে যায়। বিলকিস এক চোখ টিপ দিয়ে হালকা হাসে। রেহমান কড়া চোখে রোমিওর দিকে তাকায়। রোমিও সঙ্গে সঙ্গে চুপ।রেহমান বলে,
‘ দেখুন ম্যাডাম কী বলবেন সরাসরি বলুন!’
বিলকিস তখন শেফালির হাত টেনে সামনে দাঁড় করায়।
‘ এইডা হইলো শেফালি। বয়স ১৬! লম্বা ৪ ফুট ৬!’
রেহমান থেমে যায়। চোখে প্রশ্ন।
‘ ম্যাডাম বলতে কী চাচ্ছেন?’
বিলকিস একদম সোজা গলায় বলে,
‘ ওরে ওর বাসায় দিয়া আইহেন!’
‘ মানে?
শেফালীর দিকে তাকিয়ে বিলকিস বলে,

‘ বপপেনের লগে ভাইগা আইছিলো। বড়ো দালালের হাতে পড়ে। তার থেকে রাজিয়া বিবির কোটায়। ওখান থাইক্কা ভাগাইয়া নিয়া আইছি। বয়স কম। মাইয়া মানুষ ভুল করছে। বাড়ি দিয়া আইয়েন।”
ঘরটা কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে যায়।বিলকিসের কথা শেষ হতেই রেহমানের চোখ ধীরে ধীরে বদলে যায়। কঠোরতার জায়গায় আসে এক ধরনের নীরব ভার।সে সাথে সাথে লেডি অফিসারকে ডেকে বিস্তারিত তথ্য নেওয়ার নির্দেশ দেয়। শেফালির সম্পূর্ণ ডিটেইলস রেকর্ড করা হয়, তার কথা আলাদা করে শোনা হয়, বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।কিন্তু প্রতিটি প্রশ্নের ভেতরেও যেন একটা উদ্দেশ্য থাকে মেয়েটাকে ফিরিয়ে দেওয়া, হারিয়ে যেতে না দেওয়া।
রোমিও আর কিছু বলে না। সে এবার হাসেও না। শুধু তাকিয়ে থাকে। সেই এলাকার কোনো মেয়ে আরেকটি মেয়েকে সাহায্য করছে কীভাবে?
‘ কাম শ্যাষ?’
রেহমান মাথা নাড়ে! বিলকিস রানি শরীরে আড়মোড়া দিয়ে উঠে বলে,
‘ ওককে। কাম শ্যাষ! খোদা হাফেজ!”
পানের বাটা থেকে পান বের করে মুখে ঢুকিয়ে বাইরে যেতে থাকে বিলকিস। রেহমান বেশ অবাক করা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সেই অন্ধকার এলাকায় কোনো মেয়ে এতো সাহসী রয়েছে! রেহমান পিছন থেকে বিলকিসকে ডাকে,

“ ম্যাডাম একটু শুনবেন?”
“ কিতা?”
“ আপনাদের ধান্দায় তো এভাবে লোক ফিরিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ নেই। তাহলে?”
বিলকিস সোজা এসে আবার ও চেয়ারে বসে পড়ে। তারপর রোমিওর দিকে তাকিয়ে বলে, “ এ পিচ্চি বস না রে!”
রোমিও একটু কপাল কুঁচকে বসে পড়ে।একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুলিশ অফিসারকে সে পিচ্চি বললো, বিলকিস রেহমানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ তখন আমার বয়স ১৫-১৬ হইবো। মায়ের লগে মামা বাড়ি থাকতাম। কতই না সুন্দর দিন ছিলো। অবাক অনেক ছিলো। কিন্তু কষ্টে ছিলাম না। একদিন মামা কইলো শহরে কাম দিবো। মেলা টাকা পামু। আম্মার চিকিৎসা করাতে পারমু। আমি ও রাজি হয়ে গেলাম। চইলা আইলাম মামার লগে। যেদিন আইলাম সেদিন রাইতে তিন জন ব্যাটা ছাওয়াল…..!”

বিলকিসের কণ্ঠটা হঠাৎই থেমে যায়। যেন কোনো অদৃশ্য হাত তার শব্দগুলোকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছে।ঘরের বাতাস এক মুহূর্তে ভারী হয়ে ওঠে।তার চোখের দৃষ্টি স্থির, কিন্তু সেই স্থিরতার ভেতরেই ভাঙতে শুরু করে আরেকটা সময়। বর্তমানের আলো নিভে গিয়ে সেখানে জেগে ওঠে অতীত।সে যেন আর এই ঘরে নেই।সে আবার সেই মেয়েটা।যে মামার হাত ধরে শহরে এসেছিল, চোখে যার ছিল অগাধ বিশ্বাস। শহর তখন তার কাছে ভয় নয়, সম্ভাবনার নাম। ইট-পাথরের এই জঙ্গলেও সে দেখেছিল নিজের ভবিষ্যতের একটা রাস্তা।মায়ের অসুস্থ মুখটা ভেসে ওঠে তার মনে।
সেই মুখ, যেখানে কষ্ট ছিল, কিন্তু আশা ছিল আরও বেশি।‘মায়ের চিকিৎসা করবো’ এই একটা বাক্য তখন তার ভেতরে স্বপ্ন ছিল না, ছিল এক ধরনের পবিত্র প্রতিজ্ঞা।তারপর নিজের ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো,একটু নিরাপদ জীবন।কিছু টাকা জমা।স্কুলের বেঞ্চে আবার ফিরে যাওয়া।আর তিন বেলা খাবারের নিশ্চয়তা।যেটা অন্যদের কাছে স্বাভাবিক, কিন্তু তার কাছে ছিল একেকটা অর্জনের মতো।নতুন জামার কথা ভাবলেই সে লাজুকভাবে হাসত। মনে হতো, জীবন বুঝি এবার একটু কোমল হবে, একটু মানুষের মতো হবে।কিন্তু শহর তাকে সেই কোমলতা দেয়নি।ধীরে ধীরে স্বপ্নের ভেতরেই ঢুকে পড়ে এক অচেনা অন্ধকার।

“আমি তখন ঘুমন্ত ছিলাম। মামা ঘরে কারে যেন ঢুকাইলো। তারপর শুরু হইলো…!”
দীর্ঘ পথের যাত্রা করে ছোট্ট বিলকিস তখন ক্লান্ত। রাতে ভাত খেয়ে ঘরে ঘুমিয়ে পরে। ছোটো ফ্লাট বাসায় প্রথম বার বিলকিস ঘুমালো। এতোদিন তো ভাঙ্গা টিনের ঘরে থাকতো মায়ের সাথে। আজ সে ইটের ঘরে। মনে মনে চিন্তা করে মা-কে ও সাথে নিয়ে আসবে। চিন্তা করতে করতে বিলকিস যখন গভীর ঘুমে, তখন মামা নামক নরপিশাচ তার ঘরে ঢুকিয়ে দেয় মাঝ বয়সী তিনজনকে। তারা বিলকিসের বয়স দেখে না। দেখে শুধু শরী*র টা। বিলকিস কেঁদেছিলো, হাতে পায়ে ধরে ছিলো, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। সারা রাত ধরে চলে নির্মম অত্যাচার। এক পর্যায়ে বিলকিসের গোপন অঙ্গের কিছুটা জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।এরপর শুরু হয় আরেক যাত্রা।হাসপাতালের সাদা দেয়াল, নিঃশব্দ রাত, আর দীর্ঘ চিকিৎসার দিনগুলো। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সে যেন জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলো পুরোটা না হারিয়ে, পুরোটা না ফিরে।
সুস্থ হয়ে ওঠার পর যখন মনে হয়েছিল এবার বুঝি আবার শুরু করা যাবে, তখনই আসে আরেক প্রতারণা।যেটা সবচেয়ে পরিচিত মানুষের মুখে লুকানো ছিল।মামার কথা ছিল আশ্রয়ের মতো, কিন্তু সেটাই হয়ে দাঁড়ায় শেষ ভরসা ভাঙার মুহূর্ত।

‘গ্রামে নিয়ে যাওয়া’ এই কথাটা তখন তার কাছে মুক্তির প্রতিশ্রুতি ছিল। সে আবার বিশ্বাস করেছিল। কারণ তার কাছে তখনো পৃথিবীকে সন্দেহ করার মতো ভাষা তৈরি হয়নি।কিন্তু সেই বিশ্বাসই তার জীবনের শেষ সরল ভুল হয়ে দাঁড়ায়।এরপর ধীরে ধীরে সে পড়ে যায় এমন এক বাস্তবতায়, যেখান থেকে আর ফেরার রাস্তা থাকে না।না মানচিত্রে, না মানুষের ব্যবস্থায়।রেড লাইট এরিয়া তার কাছে শুরুতে কোনো জায়গা ছিল না, ছিল যেন এক অদৃশ্য গ্রন্থির মতো, যেখানে গিয়ে জীবন নিজেই নিজের পরিচয় হারায়।আর সেই জায়গা থেকে বের হওয়ার পথটা অজানা।
“ আর কিছু জানতে চান অফিসার?”

বিলকিসের কথা শেষ হতে হতে ঘরের ভেতরটা হঠাৎই ভারী হয়ে যায়।যেন বাতাসটাও শ্বাস নিতে ভুলে গেছে। রেহমান বসে থাকে স্থির হয়ে, কিন্তু তার ভেতরের স্থিরতা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করে। ছেলে মানুষ সহজে কাঁদে না।এই কথাটা সে বহুবার শিখেছে, বহুবার মানিয়েছে, কিন্তু আজ সেই শেখা যেন আর শরীর মানছে না। চোখের কোণে অজান্তেই জল এসে জমে, আর সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নেয়, যেন নিজের দুর্বলতাকেও ধরা পড়তে দিতে চায় না।
বিলকিস তখন আর কিছু বলে না। সে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, মাথার ঘোমটা টেনে নেয় এমনভাবে, যেন সে আবার নিজের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে, বাইরের পৃথিবী থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। তার পায়ের শব্দটা খুব মৃদু, কিন্তু ঘরের দেয়ালে সেটা অদ্ভুতভাবে বাজে। দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে তার শরীরটা যেন আরেকটা সময়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে যায়।যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই অভিজ্ঞতার ভারে ভারী।

উন্মাদনা পর্ব ৪৪

সে বেরিয়ে যায়। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেলে ঘরের ভেতর হঠাৎ শূন্যতা নামে, কিন্তু সেটা খালি শূন্যতা নয় একটা ভারি উপস্থিতির অনুপস্থিতি। রেহমান চুপচাপ বসে থাকে, সামনে তাকিয়ে থাকলেও আসলে সে কিছুই দেখছে না।তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে বিলকিসের সেই কণ্ঠ, সেই স্বীকারোক্তির ভাঙা টুকরোগুলো, আর একটা অস্বস্তিকর সত্য মানুষ জন্মে না এই অন্ধকারে, তাকে ধীরে ধীরে সেখানে ঠেলে দেওয়া হয়।বাইরে তখন শহর তার স্বাভাবিক নিয়মে চলতে থাকে গাড়ির শব্দ, মানুষের হাঁটা, জীবনের নির্লিপ্ত গতি। কিন্তু ভেতরের ঘরে রেহমান বুঝতে পারে, কিছু গল্প শেষ হয় না তারা শুধু মানুষের ভেতরে থেকে যায়, নীরব হয়ে, দীর্ঘ সময় ধরে।

উন্মাদনা পর্ব ৪৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here