মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৮ (২)
jannatul firdaus mithila
প্যালেসের সুবিশাল লিভিং রুমে অবতরণের জন্য দুপাশে বিস্তৃত রাজকীয় যুগল সিঁড়ি! একই উৎস থেকে জন্ম নিয়ে তারা কি সুন্দর করে সুশোভিত বক্ররেখায় নেমে এসেছে নিচে! মাঝখানে রেখেছে একখানা প্রশস্ত অঙ্গন। পালিশ করা মার্বেলের তকতকে মেঝেতে ঝাড়বাতির সোনালী আলোর পরশ পরতেই তারা কেমন চকচক করছে! একজোড়া তুলতুলে কোমল পদ, ভীত হরিণীর ন্যায় রয়েসয়ে নেমে আসছে ডানদিকের রাজকীয় সিঁড়ি বেয়ে। কোমল পদের মালকিনের গায়ে জড়িয়ে আছে, রেশম কাপড়ের তৈরি একখানা সফেদ রঙা লং ফ্রক। সদ্য গোসল সেরে আসার দরুন সিল্কি চুলগুলো তার এখনো ভেজা! দু’হাতের উষ্ণ বাহুডোরে আলগোছে চেপে রেখেছে আদুরে পৌষ্য খরগোশ ছানাকে। পশমি প্রাণীটা কেমন আবেশে দেহ গুটিয়ে বসে আছে দেখো! মাঝেমধ্যে নাক ঘষছে সপ্তদশীর তুলতুলে বক্ষভাজে।
শান্ত হরিণীর চলন্ত পদযুগল মাত্রই পরশ ঠেকাল শেষ সিঁড়ির গায়ে, ওমনি তার কর্ণকুহরে অদূর থেকে ভেসে এলো বেশক’জনের চাপা কান্নার শব্দ! কেউ কেউ তুলছে গুঞ্জনধ্বনি! সহসা থমকে দাঁড়ায় মাহি। গোছায় কপালের চামড়া! গৌরবর্ণা সুশ্রী মুখমণ্ডলে খানিক সন্দিগ্ধতা লেপ্টে কৌতুহলী হলো বেশ।সর্বদা এক অদ্ভুত নিরবতায় মুদে থাকা প্যালেসে আজ হঠাৎ ওমন দিনে-দুপুরে কাঁদছে কারা? সপ্তদশীর কৌতুহলী মন, বাড়ন্ত আগ্রহে তৎক্ষনাৎ পায়ের তাল বাড়াল সে। এগোলো প্রশস্ত অঙ্গন সংলগ্ন ডাইনিং স্পেসের দিকে। মানবীর পাদু’টো যত এগোচ্ছে, ততই যেন উদ্বিগ্নতা বাড়ছে তার। হরিণা চোখদুটোয় দৃশ্যমান হচ্ছে — অদূরের ডাইনিংয়ের দুয়ার পানে দাঁড়িয়ে থাকা বেশকিছু নারী মেইডদের। প্রত্যেকে একে-অপরের সনে ফিসফিসিয়ে কি যেন বলছে। সপ্তদশীর কৌতুহল বাড়ল বৈকি! সঙ্গে বাড়ল পায়ের গতি। আদুরে কিউটিকে কোলে নিয়েই সে কেমন গটগটিয়ে এসে দাঁড়াল ডাইনিং এ। সপ্তদশীর উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই সহসা দুয়ার ছেড়ে সরে দাঁড়ালেন নারী মেইডস। দু-কদম পিছিয়ে গিয়ে আলগোছে একহাত পেটে ঠেকিয়ে কুর্নিশ জানালেন মেয়েটাকে। আড়দৃষ্টে তা বেশ অবলোকন করল মাহি। কুঞ্চিত ললাটে, মুখমণ্ডলে সন্দিগ্ধতার ছাপ ফুটিয়ে গমগমে গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কে কাঁদছে ওমন করে?”
তৎক্ষনাৎ জড়সড়ভাব ধরলেন মেইডরা। নতমুখে একে-অপরের সনে নিরবে চোখাচোখি করলেন এক-আধবার। সপ্তদশী কেমন অবোধের ন্যায় তাকিয়ে রইল সেদিকে। বোধগম্যহীনতায় ফের আওড়াল,
“ কথা বলছেন না যে?”
সহসা মৃদু কম্পনে কেঁপে ওঠে মেইডরা। রুশদী’র সিগনোরার সাথে কথা বলবার মুরোদ আছে তাদের? ভুলভাল কথা বলে ফেললে না আবার গর্দান যায় তাদের! এহেন চিন্তার ঘোরে আঁটকে আছে প্রত্যেকে। মধ্য থেকে একজন বড্ড সাহসী কায়দায় নতমুখে এগিয়ে এলো চুপচাপ। পরক্ষণেই মিনমিনে স্বরে শুধালো,
“ আপনার কি কিছু লাগবে সিগনোরা?”
কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের সঠিক উত্তর না পেয়ে তৎক্ষনাৎ মুখাবয়বে অসন্তোষের ছাপ ফুটলো মাহি’র। তুলতুলে চোয়ালখানা রূপ নিলো শক্ত। গলায় অসামান্য বিরক্তি ঢেলে, মেয়েটা পরপরই শুধালো,
“ কি জিজ্ঞেস করলাম, আর কি উত্তর দিচ্ছেন আপনারা? বললাম কে কাঁদছে ওমনভাবে?”
“ মুনলাইট!”
আচানক বাক্যবাণ থেমে গেল মাহি’র! তীক্ষ্ণ দৃষ্টে ঘাড় বাকিয়ে তাকাল ডাইনিং হলের রাজকীয় দুয়ার পানে। দেখল — মিলা কেমন সন্দিহান চোখে তার পানে তাকিয়ে আছে। তরুণীর ফর্সা মুখটা আচমকাই ভাব ধরেছে র*ক্তশূণ্য। তার দু’হাতে ঠায় পেয়েছে একখানা সিলভার ট্রে! মাহি ভ্রু গোটায়। তক্ষুনি চটপট পায়ে এগিয়ে আসে মিলার সম্মুখে। এসেই কেমন সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন ছুড়েঁ বলে,
“ ফাইনালি তোমার দেখা পেলাম। আচ্ছা, ভেতরে ওভাবে কাঁদছে কে? আর তুমি….”
বাক্যটুকু সম্পূর্ণ করার পূর্বেই ভারী হলো সপ্তদশীর জিভের ডগা! চোখদুটো হলো বিস্ফোরিত। দৃষ্টি গিয়ে থমকাল — মিলার কাছ থেকে ঠিক দু’হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা ড: হায়ার পানে। পারস্য সুন্দরীর মুখটা আজ বড্ড ফ্যাকাশে। তার হাতদুটোয় ক্লিনিক্যাল গ্লাবস, সেথায় লেপ্টে আছে মানব লোহু! ভড়কায় মাহি। হতবিহ্বলতায় তড়াক এগিয়ে আসে দু-কদম। ডঃ হায়া’র মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, অস্থিরতায় আবারও জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ আপনার হাতে র*ক্ত কেনো মিস?”
হায়া বাকশূন্য! কেবল ঘাড় বাকিয়ে তাকাল বা-দিকে। বিচলিত সপ্তদশী তড়িঘড়ি করে অনুসরণ করল পারস্য সুন্দরী’র সেই বাঁকানো দৃষ্টি। পরমুহূর্তেই সে কেমন আকাশ ভেঙে পড়ল যেন! অদূরের মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে একজন নারী মেইড। যার কোমর হতে শুরু করে দু’পা অব্দি তাজা লহুতে সিক্ত! রমণী ব্যথায় গোঙাচ্ছে। তার মাথার দুপাশে বসে আছেন তারই সহচরী। এহেন দৃশ্য পরোখ হতেই আঁতকে উঠল মাহি। অস্থিরতায় কদম ছুটিয়ে চলে এলো আহত মেইডের কাছে। পাদু’টোর শক্ত হাঁটু দু’খানা তড়িঘড়ি করে ঠেকাল মার্বেলের তকতকে মেঝের গায়ে। অতঃপর কন্ঠে একরাশ অধৈর্য্য ভাবভঙ্গি ঢেলে, মানবী বলে ওঠে,
“ কি হয়েছে আপনার? কে মে’রেছে আপনাকে?”
আহত রমণীর কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুট গোঙানি বৈকি আরকিছুই বেরুচ্ছে না। সঙ্গে বসে থাকা সহচরী দু’জন একইভাবে নিশ্চুপ! এদিকে অস্থিরতা বাড়ছে মাহি’র। কন্ঠে ফের ব্যগ্রতা নামাবে তার আগেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মিলার গম্ভীর অথচ কাপত্রয়ী কন্ঠ!
“ ওকে কেউ মা*রেনি মুনলাইট। ও নিজেই নিজের ম-রণ ডেকে এনেছে! সবকিছু জানাশোনার পরও ও নিজে থেকে নিষিদ্ধ কর্মে লিপ্ত হয়েছে।”
তরুণীর নির্লিপ্ত বাক্যবাণে হতবুদ্ধির ন্যায় ভাব ধরল মাহি। মুখাবয়বে এক আকাশসম হতবাকতা লেপ্টে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সে। অবোধ কন্ঠে অধর নাড়িয়ে যেই না কিছু আওড়াবে তার পূর্বেই স্থান ত্যাগ করল মিলা। চলে গেল আড়ালে! বোকা মানবী কেমন উৎসুক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল সে পথে। এরইমধ্যে হায়া এগিয়ে এলো মেয়েটার সন্নিকটে। কদম থামিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকা মাহি’র পানে আলতো করে হাত বাড়িয়ে শান্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ উঠে এসো প্রিটি!”
মাহি আলগোছে ঘাড় তুলে চাইলো। হতভম্বের ন্যায় কিয়তক্ষণ নেত্র ঠেকিয়ে রেখে, পরক্ষণেই আলতো করে আঁকড়ে ধরল হায়া’র বাড়ন্ত হাত। এরূপ কান্ডে মুচকি হাসে হায়া! মেয়েটাকে এক হেঁচকা টানে তুলে এনে দাঁড় করালো নিজের পাশে। অতঃপর বড়ো শান্ত অথচ নিরেট কন্ঠে শুধালো,
“ ও প্রেগন্যান্ট! বোকামি করে উল্টোপাল্টা ঔষধ খেয়ে এ*বোর্শন করাতে চাচ্ছিলো! বাট এলাস, দ্যাট ডিডনট ওয়ার্ক।”
তক্ষুনি অদৃশ্য বজ্রপাত ঘটল সপ্তদশীর মাথার ওপর। বিস্ফোরিত নেত্রদ্বয় একযোগে ছুঁয়ে গেল কোমল ললাটের চামড়া। বিস্ময়ে দুরত্ব বেড়েছে গোলাপি অধরযুগলের। মেয়েটা কেমন হতভম্বের ন্যায় অস্ফুটে আওড়াল,
“ উনি প্রেগন্যান্ট? উনার হাসবেন্ড কে?”
রহস্যময় বাঁকা হাসল পারস্য সুন্দরী। শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়াল বোকা মানবীর পানে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেশ টেনে শুধালো,
“ শি ইজ নট ম্যারিড ডিয়ার!”
“ তাহলে উনি… প্রেগন্যান্ট হলেন যে? কে করেছে উনার সাথে এসব?”
সপ্তদশীর আহত কন্ঠ! উত্তরের অপেক্ষায় সেজেছে হরিণী চোখদুটো। হায়া বেশ নিপুণতায় পরোখ করল তা। পরমুহূর্তেই একখানা হাত উচিঁয়ে এনে আলতো করে আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম কাঁধ। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বড্ড ফিসফিসিয়ে আওড়াল,
“ এ প্যালেসে বন্দীদের ছোঁয়ার কিংবা তাদেরকে মে’রে ফেলার একমাত্র অধিকার মনস্টারের! তিনি বাদে এমন কাজ করবার সাহস নেই কারোর।”
মুহুর্তেই বিভ্রমের অতল সমুদ্রে ডুব দিলো মাহি। মস্তিষ্ক বনে গেল ফাঁকা! মনস্টার? তারমানে মেইডের সাথে এমন ঘৃণিত কাজটা মনস্টারই করেছে? এর মানে সে সত্যিই একজন চরিত্রহীন পুরুষ? ভাবনার জালে আটকা পড়ল মাহি। সর্বাঙ্গে তার অদ্ভুতভাবে নামল একপ্রকার নাম না জানা অসারতা। পাদু’টো কেমন টলমল করছে! হতভম্বতায় পেছাচ্ছে শুধু। মনের কোণে কেবল উত্থাপিত হচ্ছে একটি কথাই — হি ইজ আ ব্লা’ডি ক্যারেক্টারলেস বিস্ট!
হোটেল সান-মেরিকো!
আলিশান হোটেলটি বাইরে থেকে যতটা জাঁকজমকপূর্ণ, ভেতর থেকে যেন ততটাই রাজকীয়। ১৫ তলার সুউচ্চ ভবন, যার প্রতিটি সুইটে রয়েছে আভিজাত্যের পরশ! আলিশান হোটেলটির বেশ পরিচিত মুখ ডঃ দামিয়ান। মধ্যবয়স্ক পেটমোটা লোকটা আবার রাতের সময়টা একটুখানি আয়েশে কাটাতে পছন্দ করেন! আজ-ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল এক হানিমুন সুইট! যার নিরব বেডরুমের প্রতিটি দেয়ালে গুঁজছে একজোড়া কপোত-কপোতীর মৃদু শীৎকার ধ্বনি! কক্ষে শোভীত একমাত্র মখমলি বিছানার কোলে আদিম খেলায় মত্ত দুটো তরতাজা প্রাণ। একে-অপরের অপারগ ঘনিষ্ঠতায় আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েছে তারা! নিজেদের ওমন নৈসর্গিক মুহুর্তে তলিয়ে থাকতেই আচানক সুইটের সদর দরজায় কর্কশ শব্দে বেল বেজে উঠল কেমন! একবার, দু’বার পরপর কয়েকবার! মধ্যবয়স্ক দামিয়ানের সেসবে হুঁশ নেই তেমন। সে-তো মত্ত নিজ নিষিদ্ধ কাজে। একইযোগে মাতিয়ে রেখেছে নিজের চাইতে অর্ধেক বয়সী স্লা*ট সুন্দরীকে। ওদিকে দরজায় বেল তখনো বেজে চলেছে। রমণী এক-আধবার অস্ফুটে গুঙিয়ে পরক্ষণেই থেমে থেমে বলে,
“ আহ মা’ই ড্যাডি! স্টপ। গো এন্ড চেক, হু ইজ এট দ্য ডোর।”
অস্থির দামিয়ান! নিজ অস্থিরতার সম্পূর্ণ ভার রমণীর গায়ে ভর করিয়ে, কপাল গোছালো বিরক্তিতে। অস্ফুটে দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ আই ডোন্ট কেয়ার, হু দ্য ফা’ক ইজ এট দ্য ডোর। দরজার গায়ে ডু নট ডিস্টার্ব বোর্ড লাগানোর পরও কোন বা’স্টার্ডের এতো উত্তেজনা বেড়েছে তা দেখার সময় নেই আমার। সো লেট ইট বি, জাস্ট ফোকাস অন মি। গিমমি সাম প্লেজার হানি!”
গৌরবর্ণা সুশ্রী রমণী আবেদনময়ী কায়দায় ফের হাসল। দু’হাতে আলতো করে জড়িয়ে ধরল দামিয়ানের গলা। স্বদ্যোগে নিজ পাতলা ফিনফিনে অধরযুগল দিয়ে মধ্যবয়স্কের তামাকে পোড়া ঠোঁটদুটো আঁকড়ে ধরতেই আচানক এক বিকট শব্দ ভেসে এলো লিভিং এরিয়া থেকে। মুহুর্তেই আঁতকে ওঠে দু কপোত-কপোতী! বেভুলার ন্যায় নিজেদের চলমান কর্মে সামান্য রুখ টেনে, বেডরুমের দরজার পানে তাকিয়ে রইল তীক্ষ্ণ দৃষ্টে। বেডরুমের দুয়ার বন্ধ! তবে লিভিং এরিয়া থেকে কয়েক জোড়া ব্যস্ত কদমের ধুপধাপ শব্দ ভেসে আসছে বেশ। রমণী ভীত হলো এমুহূর্তে। ভীতসন্ত্রস্ত ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে,
“ কে এসেছে?”
দামিয়ান নিজেও হতভম্ব! ঘাড় বাকিয়ে তাকিয়ে আছে অনড় দৃষ্টে। রয়েসয়ে আলগোছে নেমে এসেছে রমণীর গা হতে। ঠিক তখনি আরেক বিকট শব্দে আচানক ভেঙে পড়ে গেল বেডরুমের দরজাটা। পরমুহূর্তেই বেশকিছু সশস্ত্র গার্ডস কেমন একযোগে ছুটে এলো বেডরুমে। এহেন অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় দামিয়ান এবং স্লা*ট রমণী। তড়িঘড়ি করে তক্ষুনি নিজেদের ন*গ্ন গা ঢাকা দিলো মোটা ব্ল্যাঙ্কেটের আড়ালে। ওদিকে সশস্ত্র গার্ডেরা ভেতরে ঢুকেই সবার আগে নিজেদের রাইফেলের সরু ধাতবপ্রকৃত নলখানা একত্রে তাক করেছে দামিয়ানের পানে। এহেন কান্ডে যারপরনাই তৎক্ষনাৎ গলার কাছে নিশ্বাস আঁটকে গেল মধ্যবয়স্কের। ভয়ে হলো কাবু! কাঁপা কাঁপা কন্ঠে কোনমতে জিজ্ঞেস করল —
“ ক-কে তোমরা?”
কথাটা শেষ হবার ঠিক পরক্ষণে বেডরুমের সদ্য ভাঙা সম্মুখ দুয়ার দিয়ে প্রবেশ ঘটল এক গম্ভীর পুরুষের। পরনে তার সফেদ স্যুট-ব্যুট! কানে কালো রঙা ইয়ারপিস, চোখে দৃষ্টি আড়ালকৃত রোদচশমা। যুবক কেমন গম্ভীর মুখে বাঁকা হেসে তক্ষুনি পায়ে রুখ টেনে শুধালো,
“ হ্যালো বাস্টা’র্ড! হাউ আর ইউ্য?”
ভয়ে কম্পিত দামিয়ান। শুকনো ঢোক গিলছে বারংবার। সম্মুখের গম্ভীর মানুষটা যে বড্ড চেনা তার। শেষবার দেখেছিলো জ্ঞান হারানোর নাটক করবার সময়। আজ ঠিক এতগুলো দিন পর আবারও কেনো দেখা হলো তার সঙ্গে, তা নিয়ে বড্ড সন্দিহান দামিয়ান। পরপরই কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়াল,
“ আ-আপনি?”
তৎক্ষনাৎ গম্ভীরমুখো এডউন ঠোঁট পিষে হাসল। এক ঝটকায় চোখ হতে চশমাটা খুলে এনে ক্রুর দৃষ্টে তাকাল দামিয়ানের পানে। মুখে কপট ভাব জমিয়ে আওড়াল,
“ বাহ! স্মৃতিশক্তি দেখি ভালো তোমার! এখনো মনে রেখেছো আমায়? ভালোই তো!”
থতমত খেয়ে বসল দামিয়ান। ভয়ডরে ভুলেই বসল তখনকার কথা। সে তক্ষুনি প্রসঙ্গ উল্টালো। মুখাবয়বে একপ্রকার নাটকীয় ভাবভঙ্গি ফুটিয়ে এদিক-ওদিক চেয়ে আওড়াল,
“ আপনারা কারা?”
কুটিল হাসল এডউইন। দৃষ্টি সরু করে নিয়ে আচমকা ভয়ানক শান্ত কন্ঠে শুধালো,
“ তুমি অভিনয়ে খুউব কাঁচা বাস্টা’র্ড। যাক সেসব কথা — ইউ্য নো সামথিং? সামওয়ান স্পেশাল হেজ কাম টু মিট ইউ্য!”
বোধগম্যহীনের তাকিয়ে আছে দামিয়ান। পরপরই হতভম্ব কন্ঠে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করল ,
“ কে?”
“ মে আই কাম ইন?”
কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই তটস্থ হলেন সকলে। তড়িঘড়ি করে মাথা ঝোঁকালেন যে যার মতো। সম্মুখ পথ হতে তক্ষুনি মাথা নুইয়ে সরে দাঁড়ায় এডউইন। উম্মুক্ত করে পেছনের দৃশ্য! দামিয়ানের উৎসুক চোখদুটো আচানক নিক্ষিপ্ত হলো সেদিকে। অদূরের দরজার দু’ধারে বলিষ্ঠ দু’টো হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজোড়া দাম্ভিক কদমের মালিক! গায়ে জড়ানো কালো রঙা ওভারকোট। মুখ ঢাকা কালোরঙা মুখ ফুল মাস্কে, মাথায় ফেডোরা টুপি! মাস্কের ওপর দিয়েই ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে রাখা জ্বলন্ত সিগার। পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষ কেমন ঘাড় কাত করে তাকিয়ে আছে তার পানে। তৎক্ষনাৎ শুকনো ফাঁকা ঢোক গিললো দামিয়ান। তড়িঘড়ি করে নিজেকে গুটিয়ে নিতে তৎপর সে। এরইমধ্যে দাম্ভিক কদমজোড়ার মালিক এগোলেন সম্মুখে। একহাতে আলগোছে ঠোঁটের কোণ হতে সিগারটা নামিয়ে এনে পরক্ষণেই ভারী অথচ ভয়ানক শান্ত কন্ঠে শুধালেন,
“ ড্যাডি’জ হোম মা’ই বয়! ওন্ট ইউ্য ওয়েলকাম মি?”
অন্তরাত্মা শুকিয়ে কাঠ হলো দামিয়ানের! চোখদুটো হলো নিষ্পলক। ঠোঁটের আগা বাকশূন্য হয়েছে বহু আগে। আপাতত রুশদী কিংয়ের ভয়ে কাঁপছে সে। কাঁপছে তার হৃৎপিণ্ড! সম্মুখের দাম্ভিক পুরুষ বোধহয় মাস্কের আড়ালেই ঠোঁট পিষে হাসলেন। হাতে থাকা সিগারটা ফের ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে নিয়ে, বাহাতটা আলগোছে বাড়িয়ে দিলেন পাশে। ঠিক তখনি পাশ থেকে হাওয়ার বেগে ছুটে এলেন এক রক্ষী। সসম্মানে মাফিয়া মনস্টারের তুলে দিলেন হাতে থাকা স্নাইপারটা। তা দেখে আঁতকে উঠে স্লা*ট রমণী! তক্ষুনি ভয়ে হাউমাউ করে চেঁচিয়ে ওঠে বেচারি। এপর্যায়ে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য সে, যার দরুন কখন যে গা থেকে ব্ল্যাঙ্কেটটা খসে পড়ল সেদিকে বিন্দুমাত্র হুঁশ নেই তার! মাফিয়া বিস্টের তীক্ষ্ণ চোখদুটো তক্ষুনি কুঁচকে গেল কেমন। দৃঢ় চোয়ালখানা শক্ত করে ফুটিয়ে, মানব ঘাড় বাকিয়ে তাকালেন অন্যত্র। পরক্ষণেই দাতেঁর সনে দাঁতের রুষ্ট চাপায় কটমট শব্দ তুলে, বিকট হুংকারে গর্জন তুলে বলে ওঠে,
“ গার্ডস! নষ্টা বি’চটাকে এক্ষুনি সরা আমার দু-চোখের সামনে থেকে!”
তৎক্ষনাৎ হুকুম তামিলে মত্ত হলেন গোটাকতক গার্ডস। চিলের ন্যায় ছো মে’রে স্লা*ট রমণীকে তুলে নিয়ে গেলেন কাঁধে করে। দামিয়ান তখনো সুযোগসন্ধানে মত্ত! কাঁপা কাঁপা বদনে বিছানা থেকে নামতে গেলেই আচমকা তার দিকে তাক হলো — মনস্তারের স্নাইপারের আগা। তক্ষুনি স্থবির হলেন দামিয়ান! নিশ্বাস আঁটকে চেয়ে রইলেন সম্মুখে। মনস্টার গম্ভীর! শক্ত চোয়ালে কটমট কন্ঠে তড়াক হুকুম ছুঁড়লেন,
“ ওকে ধর!”
আজ্ঞা পেতে সময় লাগলেও, কর্মে মত্ত হতে সময় লাগেনি রুশদী গার্ডদের। ক’জন তক্ষুনি এগিয়ে এসে দু’দিক দিয়ে চেপে ধরলেন দামিয়ানের হাতদুটো। আর-ও দু’জন গিয়ে বিছানার সনে ছড়িয়ে ধরলেন বেচারার পাদু’টো। এরূপ কান্ডে মোচড়ে ওঠে দামিয়ান! চিৎকারের শব্দ বাড়িয়ে অনুনয় জুড়ে বলে,
“ দয়া করুন! দয়া করুন মনস্টার! আমার ভুল হয়েছে।”
কথাটা বোধহয় কানে তুললেন না মাফিয়া বিস্ট! উল্টো গম্ভীর মুখে এগিয়ে এসে এক ঝটকায় মধ্যবয়স্কের গায়ের ওপর থেকে সরিয়ে দিলেন শেষ সম্বলটুকু! মুহুর্তেই লজ্জায় কুঁচকে যায় দামিয়ানের ন*গ্ন বদন। মোচড়ে ওঠে সর্বাঙ্গ! মনস্টার কেমন বিরক্ত মুখে আপাদমস্তক পরোখ করলেন বেয়াদবটাকে। পরক্ষণেই স্নাইপারের ধাতব শীতল নলটা দামিয়ানের স্পর্শকাতর অঙ্গ বরাবর ঠেকিয়ে, তাচ্ছিল্যের সুরে বলে ওঠেন,
“ নটি বয়! এটুকু নিয়েই এতো তেজ তোর শরীরে?”
লজ্জায় লাল হয়ে গেল দামিয়ান! পরমুহূর্তেই সে লজ্জা কেটে গেল স্পর্শকাতর অঙ্গহানীর আশঙ্কায়। মধ্যবয়স্ক কেমন মোচড়াতে মোচড়াতে ফের অনুনয় জুড়ে বলে ওঠে,
“ ছেড়ে দিন মনস্তার! কথা দিচ্ছি, আর কোনদিন করব না।”
বাঁকা হাসে রূঢ় মানব। নিজ শক্তপোক্ত হাতের রুক্ষ তর্জনীটা ধীরে ধীরে প্রবেশ করালো স্নাইপারের চাবির রিংয়ে। অতঃপর ঘাড় কাত করে শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে শুধালো,
“ হেপি জার্নি বাস্টা’র্ড!”
কথাটা বলতে বলতেই ট্রিগারে আঙুল চাপল মনস্টার! একবার, দুবার, পরপর বেশ ক’বার! মুহুর্তেই ঝাঁঝিয়ে উঠল দামিয়ানের সর্বাঙ্গ। সম্পূর্ণ কক্ষে ছেয়ে গেল বেচারার আত্মচিৎকার। অসহ্য ব্যথায় ছটফটাতে ছটফটাতে লোকটা একটা সময় নিস্তেজ হলো! তবুও থামাথামির নাম নেই মনস্তারের। স্নাইপারের সবগুলো অগ্নিসীসা এখনো বর্ষিয়ে যাচ্ছে নিষ্প্রাণ দামিয়ানের সর্বাঙ্গে। দাঁত খিঁচে বিড়বিড়িয়ে আওড়াচ্ছে,
“ দিস ইজ ইউ্যর গিফট! নাউ গো টু হেল।”
কাঁদছে মাহি! দু’হাঁটু ভাঁজ করে ঠেকিয়ে রেখেছে বুকের সনে। পেল্লব মুখখানায় তার ধরা দিয়েছে লালাভ আবরণ। সরু নাকের ডগাটা কেমন টুকটুক করছে লালিমায়। বাচ্চা কিউটি চুকচুক করছে! বারবার উঠতে চাইছে সপ্তদশীর উষ্ণ বাহুডোরে। তবে সপ্তদশী’র সেদিকে মন নেই। সে কাঁদছে! হুটহাট কোনো কারণ ছাড়াই কাঁদছে। অধীক কান্নার ফলে মেয়েটা কেমন হেঁচকি তুলছে এবার। অভিমানে দু’হাতের উল্টোপিঠে সিক্ত চোখদুটো আলতো করে মুছে নিয়েছে মাহি, ঘাড় বাকিয়ে তাকিয়েছে কিউটির পানে। মনের কোণে এক আকাশসম বিষাদ লেপ্টে, রমণী কেমন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়ায়,
“ আমি..আমি কেনো কথাটা মানতে পারছিনা কিউটি? কেনো মানতে পারছিনা বিস্ট একটা চরিত্রহীন? আমিতো আগে থেকেই শুনেছি, জেনেছি সে একজন চরিত্রহীন! আমার সাথেও তো কত বাজে বাজে কথা বলে। কিন্তু এখন? এখন কেনো তার চরিত্র নিয়ে এসব কথা মানতে পারছিনা? সে এতো খারাপ কেনো কিউটি? এত্তো খারাপ কি করে হয় একটা মানুষ?”
বোকা কিউটি কেবল হা করে তাকিয়ে রইল মেয়েটার পানে। বোধহয় সঠিক ভাষা না জানায় ঠিকঠাক মতো বাক্য আওড়াতে পারছেনা সে। মাহি নাক টানলো ফের। হৃদয়ের অন্তস্থলের হুটহাট বাড়ন্ত যন্ত্রনায় মুখ হা করে নিশ্বাস ফেলতে লাগল ক্রমাগত।
দু’হাতভর্তি তাজা লহু! গায়ে চিরচেনা মাফিয়া পোশাকআশাক। রূঢ় মানব কেমন ধুপধাপ পায়ে এগোচ্ছে চেরি ব্লসম গার্ডেনের দিকে। পেছনে তার অগণিত দেহরক্ষী! গুনে গুনে কয়েক কদম সম্মুখে এগোতেই আচমকা থমকে দাঁড়াল মাফিয়া বিস্ট। আশ্চর্য! হুট করে হৃদয়টা ওমন ছলকে উঠল কেনো তার? অবচেতন মনটা ওমন তৃষ্ণার্ত পথিকের ন্যায় একটুখানি দর্শন খুঁজছে কেনো বোকা মেয়েটার? মুগ্ধ স্তম্ভিত! আলগোছে ঘাড় উঁচিয়ে গোলাকার টুপির আড়াল দিয়ে তাকাল প্যালেসের দোতলার হাট-খোলা জানালার পানে। ঐ যে! বোকা মানবীর মাখনের ন্যায় হাতদুটো দৃশ্যমান হচ্ছে। এহেন তীব্র তুষারপাতে জানালার দ্বারে বসে কি করছে মেয়েটা? ওর ঠান্ডা লাগার ভয় নেই? এরূপ চিন্তায় মুহুর্তেই কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়ল রূঢ় মানবের। চোয়ালের পেশী হলো টানটান। তক্ষুনি কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই উল্টোপথে পা ঘোরালেন মাফিয়া মনস্টার। সবেগে দাম্ভিক কদম ছোটালেন প্যালেসের দিকে। এদিকে তার ওমন কান্ডে হতভম্ব সবাই। তড়িঘড়ি করে মন্সটারের পিছু নিতে চাইলেই মনস্তার তর্জনী উঁচিয়ে বাঁধ সাধলেন সকলকে। মুহুর্তেই থেমে গেলেন সবাই। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন ওমন তীব্র তুষারপাতে।
ধুপধাপ পায়ের শব্দে মুখরিত নিরব প্রশস্ত করিডরখানা। মনস্টারের উপস্থিতি টের পেতেই তটস্থ হলেন কক্ষরক্ষী। তড়িঘড়ি করে ঝোঁকালেন নিজেদের মস্তক। মুগ্ধ মহাশয় তোয়াক্কাহীন, শক্ত চোয়ালে কেমন ব্যগ্র গতিতে হেঁটে এসে প্রবেশ করল মাহি’র কক্ষে। মুখাবয়বে সে-কি রাগ তার! চোখদুটোয় জমেছে আগুন। মেয়েটাকে ইচ্ছেমতো কয়েক গাল হুমকি-ধমকি না দিলে আপাতত মাথা ঠান্ডা হবে না তার। সে চিন্তায় রূঢ় মানব কক্ষে প্রবেশ করেই ঝাঁঝিয়ে উঠেন কেমন,
“ হেই বান্দীর মেয়ে! জানালার কাছে কি তোর? ঠান্ডা লাগে…..”
থামল মুগ্ধ! তার ক্ষিপ্ত দৃষ্টিযুগল আচানক থমকাল সপ্তদশীর ছলছলে চোখদুটোর পানে। ওমনি নিজের সকল রাগ ভুলে গেলেন রূঢ় মানব। হয়ে উঠলেন অস্থির! তক্ষুনি ছুটে এসে আচমকা হাঁটু গেঁড়ে বসল মেয়েটার সম্মুখে। অস্থিরতায় নিজের চিরচেনা খোলস ছেড়ে দিয়ে, দু’হাতের শক্তপোক্ত রুক্ষ তালুর আঁজলায় আলতো করে ঠেকিয়ে ধরল মাহি’র নরম তুলতুলে মুখটা। অতঃপর কন্ঠে একরাশ বিচলিত ভাব ঢেলে শুধালো,
“ কি হয়েছে তোর সিগনােরা? এ্যাই মেয়ে! কাঁদছিস কেনো তুই? আমি তো এখন মা’রি না তোকে। এ্যাই সিগনোরা! কথা বল, কাঁদিস না। দেখ আমায়, আমি কিছু বলেছি তোকে? আরে তাকা না আমার দিকে। কান্না থামা! আমার কেমন কেমন যেন লাগছে।”
তড়াক শক্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকাল মাহি। সম্মুখে সুদর্শনের সুশ্রী মুখখানা দেখেও আজ গললো না সে। উল্টো চোখেমুখে তার আচমকা লেপ্টে গেল এক আকাশসম ঘৃণা। সে তক্ষুনি নিজ গাল হতে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিলো রূঢ় মানবের হাত। তার ওমন কান্ডে হতভম্ব মুগ্ধ! কপাল কুঁচকে তাকাতেই মেয়েটা কেমন কর্কশ কন্ঠে ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে ,
“ দূরে সরুন জা*নো*য়ার লোক! খবরদার আপনার ঐ অপবিত্র হাত দিয়ে আমাকে ছোঁবেন না। এক্ষুণি আপনার এই মুখ থেকে টেনে খুলে ফেলুন এহেন কপটতার মুখোশ!”
হতভম্বতার শীর্ষে পৌঁছাল মুগ্ধ! তৎক্ষনাৎ চোয়াল কটমট করে ফুটিয়ে গমগমে গলায় আওড়াল,
“ মুখ সামলে কথা বল বান্দীর মেয়ে!”
মাহি আজ শুনতে নারাজ! তক্ষুনি বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মানবী। রণচণ্ডী ভাব ধারণ করে, এক আকাশসম দুঃসাহস নিয়ে আচানক টেনে ধরে রূঢ় মানবের কোটের কলার। মানবীর এহেন দুঃসাহসিক আস্পর্ধায় মুহুর্তেই রং পাল্টে গেল নির্দয় মানবের সুশ্রী মুখমণ্ডলের। সেথায় এবার ভর করল এক অদৃশ্য আগুন! চোখদুটো তক্ষুনি লাল বর্ণ ভাব ধরল মুগ্ধের। অথচ মাহি আজ মোটেও ভয় পেলো না সেসবে! উল্টো বসে থাকা রূঢ় মানবের কলার টেনে টেনে শুধালো,
“ কেনো? আমি কেনো মুখ সামলে কথা বলব? আপনি যখন-তখন, যার-তার সাথে নিজের হিং স্র তা দেখাতে পারবেন, নিজের চরিত্রহীনতার পরিচয় দিবেন। আর আমি বললেই দোষ?”
সহসা হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ হলো মাফিয়া বিস্টের। ঘাড়ের সবক’টা রগ ফুলে উঠল ধপ করে। দৃঢ় চোয়ালখানার সে-কি কটমট ভাব! তবুও নিজের উপচে পড়া রাগগুলো নিয়ন্ত্রণের শেষ চেষ্টায় নির্দয় মানব দাঁতে দাঁত চেপে, কিড়মিড় কন্ঠে আওড়ালেন,
“ হাত সরা বান্দীর মেয়ে! নাহলে এ হাত আর হাতের জায়গায় থাকবে না।”
অন্য সময় হলে হয়তো যুবকের এহেন ভয়ানক কিড়মিড় কন্ঠে ভয়ে ছুটে পালাতো মাহি। তবে আজ ব্যাপার ভিন্ন! মেয়েটা কেমন পরক্ষণেই অগ্নিমূর্তি ভাব নিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ কেনো? কি করবেন? মা’রবেন আমায়? হাত ভেঙে দিবেন আমার? না-কি ঐ মেয়েটার মতো আমাকেও ভোগ করবেন?”
তড়াক অগ্নিদৃষ্টে তাকাল মুগ্ধ! দাঁতে দাঁত চেপে হুংকার ছুঁড়ে বলল,
“ হোয়াট দা ফা’ক আর ইউ্য ট্রায়িং টু সে?”
ঠোঁটের কোণে ব্যথাতুর ছাপ ফুটলো মাহি’র। পরপরই দাগী কন্ঠে আওড়াল,
“ নাথিং মাচ বিস্ট! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, যেই পুরুষের প্রতি রাতে নতুন নতুন শয্যাশায়ী প্রয়োজন পড়ে, তার কাছে মেয়ে হিসেবে থোড়াই রেহাই পাব আমি! ঠিক যেমনটা রেহাই পায়নি — বেচারি মেইডটা। শি হেজ বিকাম প্রেগন্যান্ট, অথচ তার এখনো বিয়েই হয়নি। তাহলে কে করল তার এতোবড় সর্বনাশ? আপনিই তো করেছেন তাই না? একজন দুশ্চরিত্রের কাছে….”
কথাটা শেষ হবার পূর্বেই সপ্তদশীর সুদীর্ঘ কোমল কন্ঠনালী বরাবর আচানক আক্রমণ বসল রূঢ় মানবের হিং স্র থাবার! মুহুর্তেই বাকরুদ্ধ মাহি! কন্ঠনালীর ব্যথায় কুঁচকে যাচ্ছে মুখ। বোধহয় এক্ষুণি ভেঙে গুড়িয়ে যাবে ভেতরেই। সপ্তদশী তৎক্ষনাৎ দু’হাতে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াসে মত্ত হলো। ঠিক তখনি তার কর্ণকুহরে পৌঁছাল রূঢ় মানবের বজ্রকঠিন হুংকার!
“ কু**বাচ্চা! কি বললি তুই? আমি দুশ্চরিত্র? জানোয়ারের বাচ্চা! কোন সাহসে আমাকে এ কথা বলিস তুই? তুই কে বান্দীর মেয়ে? কে তুই?”
সপ্তদশীর পেল্লব মুখখানা লাল হচ্ছে ক্রমশ! নিশ্বাস আঁটকে যাচ্ছে তার। অথচ রূঢ় মানব সমান তালে হাতের জোর বাড়াচ্ছে। তার মাথাভর্তি অদৃশ্য আগুন! কানে এখনো বাজছে — মেয়েটার দেয়া সকল অপবাদ। যুবক ফের এক হুংকার ছুঁড়ে তক্ষুনি নিজ শক্তপোক্ত হাতের জোরে শূন্যে উঁচিয়ে তুলল মানবীকে। মুখাবয়বে আগুন লেপ্টে হিং স্র আহত বাঘের ন্যায় গর্জন তুলে আওড়াল,
“ কোন সাহসেআমার সঙ্গে গলা উঁচিয়ে কথা বলিস তুই জানোয়ারের বাচ্চা? দু’দিন ভালোভাবে কথা বলেছি বলে ভুলে গিয়েছিস আমি কে? তোর সাথে আমাকে ভালো হতে দিবি না তুই কু***বাচ্চা?”
যুবক থামছে না! মাত্রাতিরিক্ত রাগে থরথর করে কাঁপছে তার মুখাবয়ব। ওদিকে মাহি প্রায় জ্ঞান হারালো বলে। ছটফটানি বাড়ল কয়েকগুণ। নির্দয় মানবের উপচে পড়া রাগের মাঝেও বুকের খাচাঁয় বন্দীরত হৃদয়টা বোধহয় লাফিয়ে উঠল পরমুহূর্তেই। সে আর পারলোনা মেয়েটাকে উঁচিয়ে রাখতে। তক্ষুনি হাতটা নামিয়ে ফেলল রূঢ় মানব। ছাড়া পেতেই হাঁপাচ্ছে মাহি! পাগলের ন্যায় নিশ্বাস টানছে মেয়েটা। মুগ্ধ অস্থির! উদ্ভ্রান্তের ন্যায় নিজের ঘাড়ে একের পর এক জোরালো চপেটাঘাত বসিয়ে যাচ্ছে রূঢ় মানব। কানদুটোয় কেনো যে বেজে চলেছে মেয়েটার কথাগুলো! সে-তো ভুলতে চাইছে! তবে পারছেনা কেনো? মুগ্ধ তড়াক অগ্নিদৃষ্টে তাকাল মেয়েটার পানে। বাজপাখির ন্যায় এগিয়ে এসে আচমকা ছো মে’রে সপ্তদশীর গ্রীবাদেশ আঁকড়ে হিসহিসিয়ে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কে বলেছে তোকে এসব?”
কাঁদছে মাহও! ভেঙেছে কন্ঠ! তবুও ভাঙা ভাঙা কন্ঠে আওড়াল,
“ মে-মেইড!”
চোয়াল শক্ত হলো মনস্টারের। তৎক্ষনাৎ শক্ত হাতে মাহি’র বাহু আঁকড়ে, মেয়েটাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল কক্ষের বাইরে। করিডর দিয়ে হাঁটার সময় বজ্র কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে বলে,
“ গার্ডস! সবাইকে একত্র কর!”
হুকুম তামিল হলো যথার্থ। মনস্টারের একটা হুংকারে তক্ষুনি নিজেদের কাজকর্ম ভুলে, সবাই কেমন একযোগে একত্র হলেন গ্রাউন্ড ফ্লোরে। মুগ্ধ চরম ক্ষোভে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। কাপত্রয়ী সপ্তদশী যুবকের ওমন জোরালো পায়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে বারকয়েক। তা নজরে পরতেই রূঢ় মানব ছেড়ে দিলো মেয়েটার হাত। নিজে নিজেই ধুপধাপ পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল গ্রাউন্ড ফ্লোরে।
কলাম বদ্ধ আকারে দাঁড়িয়ে আছেন বাড়ির সকল মেইড। নতমস্তকে তটস্থ সকলে! মনস্টার ছুটে এসেই উম্মাদের ন্যায় শুরু করলেন প্রহার। হাতে একখানা চাবুক তার! যার প্রতিটি জোরালো আঘাতে পিষ্ট হচ্ছে মেইডদের নরম গায়ের ত্বক। যে আঘাতের জোরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে সকলে। রূঢ় মানব থামছে না। চালাচ্ছে জোরালো হাতে চাবুক। আজ বহুদিন পর নিজের সেই চিরচেনা উম্মাদনা দেখাচ্ছে সে। হিং স্র কন্ঠে গর্জন তুলে আওড়াচ্ছে,
“ কোন কু**** বাচ্চা প্রেগন্যান্ট হয়েছিস সামনে আয়! এক্ষুনি সামনে আয়, নয়তো সবক’টাকে একসাথে জ্যান্ত কবর দিব আমি!”
তক্ষুনি আফ্রিকান মেইড কাঁপা কাঁপা বদনে হাত উঁচাল। তীব্র আঘাতে মুষড়ে গিয়েছে রমণী। বাঁধ ভাঙা কান্না জুড়ে বলে ওঠে,
“ আমি! আমি মনস্তার!”
একমুহুর্ত থামল মুগ্ধ! ত্বরিত বেগে ছুটে এলো রমণীর দিকে। নির্দয় হাতে আচানক মেয়েটার চুলের গোছা খামচে ধরে, কটমট করতে করতে আওড়াল,
“ ইউ্য বি’চ! কার সাথে করেছিস এসব? আমার প্যালেসে কার সঙ্গে করেছিস এসব?”
রমণী কাঁপছে! উত্তর দিতে দেরি হচ্ছে বিধায় মনস্টারের শক্ত হাতের তীব্র প্রহার ফের চলল তার মুখমন্ডলে। বেচারি আর সইতে না পেরে তক্ষুনি বলে ওঠে,
“ ইট’স হাইম্যান! ইউ্যর শেফ মনস্তার।”
মুহুর্তেই বাজ পড়ল সপ্তদশীর মাথায়। দুলে উঠল তার ক্ষুদ্রকায় বদন। রূঢ় মানবের রাগের তোড়ে থরথর মুখশ্রী ধীরে ধীরে তাক হলো মাহি’র পানে। তার অগ্নিদৃষ্টিতে চোখ পরতেই কন্ঠ শুকিয়ে কাঠ হলো মাহি’র। মেয়েটা কেমন ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে কদম পেছাতে লাগল। এদিকে মুগ্ধের এবার হুঁশ নেই। এক ঝটকায় আফ্রিকান রমণীকে ছেড়ে দিয়ে হুংকার ছুঁড়ে এডউইনকে ডেকে বলল,
“ এডউইন! আমার তলোয়ার দে!”
আঁতকে উঠে এডউইন! কাঁপা কাঁপা হাতে তক্ষুনি তামিল করল মনস্তারের আদেশ। হাতে নিজের ধারালো তলোয়ার নিয়ে পরক্ষণেই যুবক ছুট লাগাল সিঁড়ির পানে। তা দেখে ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে মাহি। ছুটন্ত হরিণীর ন্যায় দ্রুত বেগে ছুটে যায় সিঁড়ি দিয়ে। চিৎকার দিয়ে বলতে থাকে,
“ আল্লাহ গো! লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তুম-মিনাজ জোয়ালিমিন! আল্লাহ বাঁচাও!”
সপ্তদশী ছুটছে! পেছনে ছুটছে রূঢ় মানব। চেঁচিয়ে ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলছে,
“ দাঁড়া জানোয়ারের বাচ্চা! আজকে তোরে পিস পিস করব আমি।”
ভয়ে তটস্থ মাহি! জলদি ছুটে এসে ঢুকে গেল কক্ষে। অতঃপর কোনরূপ উপায়ন্তর না পেয়ে তড়িঘড়ি করে গা লুকলো ওয়াশরুমে। এদিকে মুহুর্ত ব্যয়েই কক্ষে প্রবেশ করল মুগ্ধ। হাতে ধারালো তলোয়ার নিয়ে এগোলো ওয়াশরুমের দরজার কাছে। শক্ত হাতে দরজার গায়ে চপেটাঘাত চালিয়ে হুংকার ছুঁড়ে আওড়াল ,
“ এ্যাই বান্দীর মেয়ে দরজা খোল! আ’ই সেইড জাস্ট ওপেন দ্য ফা’কিং ডোর গ্লুপায়া।”
সুদর্শনের এহেন হুংকারে যেন কাঁপছে প্যালেসের প্রতিটি দেয়াল! সেই সঙ্গে কম্পন বাড়ছে সপ্তদশীর ক্ষুদ্রকায় বদনে। বলিষ্ঠ লোকটা বোধহয় এক্ষুণি দুয়ার ভাঙলো বলে। বেচারি কোনমতে দোর আঁটকে সরে গেল দু-কদম। ভয়ার্ত কন্ঠে থেমে থেমে আওড়াল,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৮
“ আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষমা করে দিন বিস্ট! আর কোনদিন এ কাজ করব না!”
“ ওহ জাস্ট শাট আপ এন্ড ওপেন দ্য ডোর জা*নোয়ারের*বা*চ্চা! আজকে তোর একদিন আর আমার একদিন! তারাতাড়ি দরজা খোল, আজকে তোকে জাস্ট কোপা*ব আমি!”
