Home অগ্নিশিখার অন্তরালে অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৩

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৩

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৩
YASH

রাতের নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে বিশাল মির্জা বাড়িকে। তবে বাড়ির ভেতরের চিরচেনা কোলাহলটুকু এখনো থামেনি। কেয়ারা গোটা বাড়ি জুড়ে ছোট ছোট পায়ে অনবরত দৌড়ে বেড়াচ্ছে, এটা ওর প্রতিদিনের একটা অবধারিত নিয়ম। রাতের খাবার শেষ হতেই তার যেন বাড়তি শক্তির জোগান মেলে।
সারা বাড়ি চুষে বেড়ানোর পর কেয়ারা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল ইয়াশের ঘরের দিকে। দরজার কোণ দিয়ে মাথাটা বের করে ভেতরের দিকে উঁকি দিল।

ঘরের ভেতরের পরিবেশটা একদম শান্ত। ইয়াশ অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়ার টেবিলে বসে বইয়ের পাতায় চোখ বুলাচ্ছে। কেয়ারা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। নিঃশব্দে ঘরের ভেতর ঢুকে ইয়াশের একদম গা ঘেঁষে দাঁড়াল। এরপর কোনো পারমিশন ছাড়াই টুক করে ইয়াশের কোলের ওপর উঠে জাঁকিয়ে বসল।
অন্য কেউ এমন আচমকা বিরক্ত করলে হয়তো এই মুহূর্তে ইয়াশের রাগি রূপ দেখতে হতো, কিন্তু কোলের মানুষটা কেয়ারা হওয়ায় ইয়াশের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে বইটা একপাশে সরিয়ে রেখে কেয়ারাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে নিজের কোলে টেনে নিল। ওর তুলতুলে গালে নিজের নাকটা আলতো করে ঘষে দিয়ে আদুরে গলায় প্রশ্ন করল,

“কী চাই এখানে শুনি? রাতের খাবার খেয়েছিস তুই?”
কেয়ারা মাথা নেড়ে নিজের বড় বড় চোখ দুটো পিটপিট করে তাকাল। আধো-আধো গলায় উত্তর দিল,
“থেচি। তুমি থাও নি তেনো?”
ইয়াশ কেয়ারার এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে গুছিয়ে দিতে দিতে বললো, “আমি পড়া শেষ করেই খেতে যাবো। তুই ঘুমাবি না? দেখেছিস কতটা রাত হয়েছে?”
কেয়ারা একটু মন খারাপের ভান করে দুই হাত নেড়ে বললো, “পাপা তলে আসলেই গুমিয়ে পলবো।”
আসলে ব্যবসার কাজে আবির মির্জার প্রায়ই বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায়, আর কেয়ারা প্রায় বাবার জন্য এভাবে জেগে থাকে। অনেক সময় ইনায়া ওকে ঘুম পারিয়ে দেয় ইনায়া মেয়েটা অনেক লক্ষী এবং বুঝদার, বোনকে সব সময় সামলে রাখে,
ইয়াশের বুক চিরে হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। সে হুট করেই কেয়ারার দিকে তাকিয়ে বলে বসলো,
“আজকে আমার কাছে ঘুমাবি, বাটারফ্লাই?”

কথাটা শুনে কেয়ারার ছোট্ট মুখটা কেমন যেন কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল। সে বেশ দোটানায় পড়ে মিনমিন করে বললো, “ইনু আপু বয় পাবে একা একা গুমাতে। তোমাল তাচে অন্য দিন গুমাবো, তেমন?”
ইনায়ার প্রতি কেয়ারার এই ভালোবাসা দেখে ইয়াশ আর জোর করলো না।
সে কেয়ারার কপালে একটা আলতো চুমু খেয়ে বললো, “আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে।”
তবে পরক্ষণেই ইয়াশের চোখের চাউনি আর গলার আওয়াজ বদলে গেল। গম্ভীর গলায় কেয়ারার চোখের দিকে তাকিয়ে সে বললো, “আর একটা কথা শোনো,”
কেয়ারা ইয়াশের মুখের দিকে তাকিয়ে কৌতূহল নিয়ে বললো, “বলো।”
ইয়াশ কেয়ারার দুই কাঁধ আলতো করে চেপে ধরে বেশ শক্ত গলায় মনে করিয়ে দিল, “তোর বাপ আর আমি ছাড়া তুই আর কারো কোলে উঠবি না। কোনোদিন না। মনে থাকবে কথাটা?”
বিকেলে স্কুলের ওই ঘটনার পর থেকে ইয়াশের ভেতরের জেদটা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সে কিছুতেই কেয়ারার ওপর অন্য কারও অধিকার সহ্য করতে পারছে না।
কেয়ারা ইয়াশের এই গম্ভীর রূপ দেখে একটুও ভয় পেল না, বরং চট করে মাথা নাড়িয়ে বললো, “মনে তাকবে।”
ইয়াশের বুকে মাথা ঠেকিয়ে শান্ত হয়ে থাকার পর কেয়ারা হঠাৎ কী যেন ভেবে ওর শার্টের কলারটা খামচে ধরলো। বড় বড় চোখ দুটো ইয়াশের মুখের ওপর স্থির করে নিষ্পাপ গলায় আবার প্রশ্ন করলো, “আমি কি ইনু আপ্পির তোলে আর বাপির তোলেও উটতে পালবো না?”

কেয়ারার এমন সরল আর দ্বিধাগ্রস্ত প্রশ্ন শুনে ইয়াশের গম্ভীর মুখে আবার একটা গভীর ও স্নিগ্ধ মুচকি হাসি ফুটে উঠলো। সে কেয়ারার নাকটা আলতো করে টেনে দিয়ে নরম গলায় বললো, “নাহ্, বাপির কোলে আর ইনু আপুর কোলে তো অবশ্যই উঠবি। শুধু ওদের আর আমার কোলে উঠবি, আর কোনো বাইরের মানুষের কোলে না, ওকেই?”
কেয়ারা যেন এক মস্ত বড় আশার আলো খুঁজে পেলো। সে খিলখিল করে হেসে মাথা নাড়িয়ে বললো, “ওতে! মনে তাকবে।”
ইয়াশ এবার কেয়ারার দিকে একটু চোখ সরু করে তাকালো। ওকে একটু পরীক্ষা করার জন্য দুষ্টুমি ভরা গলায় জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা, আর যদি আমার কথা না শুনে অন্য কারও কোলে উঠিস, তখন কী করবো?”
কেয়ারা এক মুহূর্ত ভাবলো না। মুখটা একটু কুঁচকে স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল, “তেয়ারাকে মারবে!”
কথাটা শোনা মাত্রই ইয়াশের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। সে পুরো চুপ হয়ে গেল। কেয়ারার এইটুকু ছোট্ট শরীরে হাত তোলার কথা সে অবচেতনেও ভাবতে পারে না। সে কেয়ারাকে দুই বাহুতে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর গালে একটা গাঢ় চুমু খেলো। মনে মনে এক অদ্ভুত তীব্রতায় নিজেকেই বললো “উঁহু, বাটারফ্লাই! তোকে মারবো কীভাবে?”

ভেতরের আবেগটা লুকাতে ইয়াশ হুট করেই কেয়ারার চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে একটু অন্য প্রসঙ্গে গেল। বেশ কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা বাটারফ্লাই, তুই বড় হয়ে কাকে বিয়ে করবি?”
৪ বছরের কেয়ারা এই শব্দের গভীরতা বা মানে কিছুই বোঝে না, শুধু চটপট উত্তর দিতে জানে। সে ইয়াশের গলা জড়িয়ে ধরে এক সেকেন্ডের মাঝে বলে দিল, “তোমাকে!”
১২ বছরের ইয়াশ এই প্রথম একটু থমকে গেল। তারপর নিজের ভেতরের এক অদ্ভুত ভালোলাগা থেকে মৃদু হেসে বললো, “পরে যদি পাল্টি খাস?”
কেয়ারা চোখ দুটো গোল গোল করে অবাক হয়ে তাকালো। ইয়াশের মুখের কথাটি অনুকরণ করার চেষ্টা করে বললো, “পাল্তি তি?”
ইয়াশ ওর কপালে আবার ঠোঁট ছুঁইয়ে হালকা হেসে বললো, “কিছু না। এখন যা, অনেক রাত হয়েছে, এবার ঘুমা।”
কেয়ারা আবার খিলখিল করে হেসে বললো “তেয়ারা বড় হয়ে তোমাকে বিইয়ে তরবে ভাইয়া”
কথাটা শুনে ইয়াশের অনেক ভালো লাগলো ও কেয়ারার হাত নিয়ে চুমু খেতে লাগলো, আর কেয়ারা খিলখিল করে হাসতে লাগলো।

ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরের দরজায় একটা ছায়া পড়লো। কেয়ারার বোন ইনায়া হন্তদন্ত হয়ে ঘরের ভেতর ঢুকলো। ঘরে ঢুকেই ইয়াশের কোলে কেয়ারাকে দেখে ইনায়ার বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠলো। তার চেহারাটা নিমেষেই কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। দুপুরের মারামারির ঘটনার পর থেকে সে ইয়াশের এই রাগকে বেশ ভয় পাচ্ছে। ইয়াশ আবার রেগেমেগে কেয়ারাকে মেরে বসেনি তো?
ইনায়া আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে ইয়াশের কোল থেকে কেয়ারাকে এক টানে নিজের কোলে তুলে নিলো। ইয়াশের দিকে না তাকিয়ে কিছুটা আড়ষ্ট গলায় কেয়ারাকে বললো, “তুই এইখানে কেন এসেছিস কেয়ারা? ঘুমাতে হবে না তোকে? চল, রুমে চল।”
ইয়াশ ইনায়ার এই ভয় আর অস্থিরতাটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারলো। সে নিজের সিটে একটু হেলান দিয়ে বসে শান্ত গলায় বললো, “ইনায়া আপু, ওকে এখন নিয়ে যেও না। রেখে যাও, আমি পড়া শেষ করে একটু পরে গিয়ে তোমাদের রুমে দিয়ে আসবো।”
ইনায়া এবার ইয়াশের চোখের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বললো, “না রে ইয়াশ, আসলে পাপা বাড়ি ফিরেছে। ঘরে ঢুকেই কেয়ারাকে খুঁজছে।”

‘পাপা এসেছে’ এইটা শোনা মাত্রই কেয়ারা ইনায়ার কোলে বসেই আনন্দে দুই হাত-পা ছুড়ে লাফাতে শুরু করলো। সারাদিনের সব ক্লান্তি ভুলে তার চোখে-মুখে রাজ্যের খুশি খেলা করে গেল। সে চট করে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়াতে নাড়াতে আধো-আঁধো গলায় বললো, “তেয়ারা এখন যাচ্চে। আবার তালকে আসবে তেমন ভাইয়া?”
ইয়াশ পড়ার টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে গিয়ে কেয়ারার কোমরের নিচে নামা সিল্কি চুলে আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর আলতো হেসে বললো, “আচ্ছা, টাটা।”

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ২

ইনায়া কেয়ারাকে শক্ত করে ধরে আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আর ইয়াশ দরজার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলো এই বাচ্চার মধ্যে কি এমন আছে? দুনিয়ায় সব কিছু অসহ্য লাগলেও এই বাচ্চাকে এতো ভালো লাগে, ইয়াশ নিজের মেডিসিন পেয়ে গেছে ও বুঝতে পেরেছে ওর আসল মেডিসিন কে।

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৪