Home অগ্নিশিখার অন্তরালে অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ২২ (২)

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ২২ (২)

কিয়ারা রুদ্রর অস্থিরতা দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গেল। ও নিজের শাড়িটা একটু টেনে নিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আমি ঠিক আছি, রুদ্র। কিন্তু… উনি কি জানেন আমি এই হসপিটালে আছি?”
রুদ্র একটা তপ্ত নিশ্বাস ফেলে কপালে হাত বুলালো। গালের দাগটা এখনো সামান্য চনচন করছে। ও কিয়ারার দিকে তাকিয়ে বলল, “জানেন মানে? ভাইয়া তো এখানে এসে পুরো তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়ে দিয়েছিল! রিসিপশনের একটা ভুলের কারণে ও ভেবেছিল তুমি আর নেই। ওই ধাক্কাটা সহ্য করতে না পেরে ভাই নিজেও মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাত থেকে স্যালাইনের সুচ-টুচ ছিঁড়ে রক্তারক্তি অবস্থা করে ফেলেছিল। শেষে ডাক্তাররা বাধ্য হয়ে ওনাকে কড়া ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে।”

“মানে? কী বলছ এসব তুমি!”
কিয়ারার চোখ দুটো ভয়ে আর উদ্বেগে মস্ত বড় বড় হয়ে গেল। ও বিছানা থেকে নামার জন্য ছটফট করে উঠল, “আমাকে এক্ষণি ওনার কাছে নিয়ে চলো, রুদ্র”
রুদ্র পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ডিউটি নার্সের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “সিস্টার, আমি কি ওনাকে ওনার হাজব্যান্ডের কেবিনে নিয়ে যেতে পারি?”
নার্সটি কিয়ারার রিপোর্টের ফাইলটা একবার দেখে নিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “হ্যাঁ, নিয়ে যেতে পারেন। ওনার তেমন কোনো সিরিয়াস ইনজুরি নেই। মাথায় সামান্য একটু চোট লেগেছে আর হাতে হালকা ব্যথা পেয়েছেন। হাঁটাচলা করতে কোনো সমস্যা হবে না।”
রুদ্র কিয়ারার হাত ধরে ওকে আস্তে আস্তে ইয়াশের বেডের দিকে নিয়ে গেল। কেবিনের ভেতরে ইয়াশ তখনো ইনজেকশনের ঘোরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ওর ফর্সা মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে আছে, ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। ইয়াশকে এই অবস্থায় দেখে কিয়ারার বুকটা মুচড়ে উঠল। ও ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ইয়াশের বেডের একপাশে বসল।

ওদের ঢুকতে দেখে কেবিনের ভেতরের নার্সটি স্বস্তির একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “ওহ, আপনিই ওনার ওয়াইফ? যাক বাবা, বাঁচা গেল! আপনি প্লিজ ওনার পাশেই বসে থাকুন। ওনার ঘুম ভাঙলে যেন ওনার চোখ প্রথমে আপনাকেই দেখে। নাহলে চোখ খুলেই উনি আবার যে হারে ভাঙচুর শুরু করবেন, তা সামলানো আমাদের পক্ষে অসম্ভব হবে।”
কিয়ারা কোনো কথা না বলে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে ইয়াশের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রুদ্র দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করতে করতে বলল, “কিয়ারা, আমি কি ইনায়া আপুকে একটা কল দিয়ে জানাব সব?”
কিয়ারা ইয়াশের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই আস্তে করে মাথা নাড়ল, “না, এখন জানানোর দরকার নেই। আপু অযথা ভীষণ চিন্তা করবে। এমনিতেই সব ঠিক হয়ে গেছে।”
রুদ্র আর কথা বাড়াল না। ও কিয়ারা আর ইয়াশকে কিছুটা একাকী সময় দেওয়ার জন্য নিঃশব্দে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল।

কেবিনে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। কিয়ারা আলতো করে ওর নরম হাতটা ইয়াশের কপালে আর চুলে বুলিয়ে দিতে লাগল। ইয়াশের চুলের অবিন্যস্ত জটগুলো ঠিক করতে করতে ওর নিজের চোখের কোণ দিয়েও দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। এই মানুষটা ওকে কতটা ভালোবাসে, তা ও আজ আবার নতুন করে উপলব্ধি করল। ইয়াশের গায়ের চেনা সুবাস আর ফ্যানের বাতাসে কিয়ারার নিজেরও শরীরটা ক্লান্তিতে ভেঙে আসছিল। ও আর সামলাতে না পেরে ইয়াশের চওড়া বুকের ওপর আলতো করে মাথাটা রাখল। ইয়াশের বুকের নিয়মিত ওঠানামা আর হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনতে শুনতে একসময় কিয়ারার চোখ দুটো ঘুমে লেগে এল।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ইয়াশের ইনজেকশনের ঘোরটা কাটতে শুরু করল। চেতনা ফিরতেই ওর মস্তিষ্কে আবার সেই মর্গের দৃশ্যটা ভেসে উঠল। ও এক ঝটকায় চোখ মেলে আবার চিৎকার করে উঠতে গেল। কিন্তু ঠিক তখনই ও টের পেল, ওর বুকের ওপর ভারী মতন কী যেন একটা রাখা। ও নিচের দিকে তাকাতেই ওর পুরো শরীর স্তব্ধ হয়ে গেল।
চোখের সামনে কিয়ারা! ওর বাটারফ্লাই আস্ত একটা মানুষ হয়ে ওর বুকের ওপর শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে!
ইয়াশের যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছিল না। ও এক লাফে বিছানা থেকে উঠে বসল এবং কোনো কিছু না ভেবেই এক ঝটকায় কিয়ারাকে নিজের কোল তুলে নিল। ও কিয়ারাকে এমনভাবে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরে রাখল, যেন ও কোনো ছোট্ট বাচ্চা। ইয়াশ উন্মাদের মতো কিয়ারার কপালে, গালে, চোখে অনবরত চুমু খেতে লাগল। ওর চোখ দিয়ে তখনো টপটপ করে জল পড়ছে।

কিয়ারার ঘুমটা মাত্র একটু লেগে এসেছিল। আচমকা এমন একটা হ্যাঁচকা টানে শূন্যে ভেসে ওঠায় ও ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। ও আতঙ্কে চোখ মেলেই অবচেতনভাবে ইয়াশের গলা জড়িয়ে ধরল।
ইয়াশ ওকে কোল থেকে না নামিয়েই ব্যাকুল, ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করতে লাগল, “তুমি ঠিক আছো তো বউ? তুমি কোথায় ব্যথা পেয়েছ বলো আমাকে? আমাকে এভাবে একা ফেলে তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে?”
কিয়ারা ইয়াশের এই পাগলামি দেখে আলতো করে ওর কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। অত্যন্ত শান্ত গলায় সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “আমি একদম ঠিক আছি। আমার কিচ্ছু হয়নি…”
কিন্তু কিয়ারার কথা শেষ হওয়ার আগেই ইয়াশের চোখের চাউনিটা হুট করে বদলে গেল। ভয়ের জায়গাটা নিমেষেই দখল করে নিল এক চরম, হিংস্র ক্ষোভ। ইয়াশের যেন এতক্ষণে পুরোপুরি হুশ ফিরল যে ঠিক কী ঘটেছিল। ও কোনো কিছু না ভেবেই কোল থেকে কিয়ারাকে বেডের ওপর নামিয়ে সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল কিয়ারার নরম গালে। চড়ের শব্দে পুরো কেবিনটা যেন কেঁপে উঠল।

কিয়ারা গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। ইয়াশ দাঁতে দাঁত চেপে, গর্জে উঠে বলল, “তোর এত বড় সাহস কী করে হলো একা একা বাড়ির বাইরে বের হওয়ার? প্রথমত, তুই আমার নিষেধ করা সত্ত্বেও শাড়ি পরে বাইরে বের হয়েছিস! দ্বিতীয়ত, আমার পারমিশন নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করিসনি”

কথাটা শেষ করেই ইয়াশ নিজের শক্ত হাত দিয়ে কিয়ারার গলাটা চেপে ধরল। ওর ভেতরের আতঙ্ক আর রাগ যেন ওকে এক হিংস্র দানবে পরিণত করেছে। কিয়ারা আচমকা এই আক্রমণে পুরোপুরি হকচকিয়ে গেল। গলার ওপর ইয়াশের হাতের চাপ বাড়তেই ওর দম আটকে আসতে লাগল, ফুসফুস বাতাস পাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল। ইয়াশের এই রূপ ও আগেও দেখেছে। ও কোনো প্রতিবাদ করার সুযোগ পেল না, নিজের আত্মরক্ষার চেষ্টাও করল না। ও শুধু ইয়াশের রক্তচক্ষুর দিকে তাকিয়ে আস্তে করে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here