অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৬
YASH
বিকেলের নরম আলোয় চারপাশটা বেশ শান্ত লাগছিল। প্রতিদিনের মতো আজকে পার্কে খুব একটা ভিড় নেই বললেই চলে।
হালকা মিষ্টি হাওয়া বইছে। পার্কে পা রাখতেই কেয়ারা খিলখিল করে হেসে উঠল। তার কোমর ছাড়ানো লম্বা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। দেখলেই মনে হয়, সদ্য কেনা একটা জীবন্ত পুতুল হেঁটে চলে বেড়োচ্ছে।
কেয়ারা একছুটে চলে গেল বড় লোহার দোলনাটার কাছে। ইনায়াও বোনের পেছন পেছন এগিয়ে গেল। সে নিজেই আগে দোলনায় উঠে বসল, তারপর কেয়ারাকে কোলে তুলে নিজের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে নিল। ড্রাইভার আর শিউলি মিলে দোলনাটা আলতো করে দুলিয়ে দিতে লাগলেন। দোলনাটা যতবার ওপর-নিচ হচ্ছে, কেয়ারা ততবার খিলখিল করে হেসে উঠছে। কুচকুচে কালো বড় বড় চোখ দুটোতে যেন আকাশের সব আনন্দ এসে ভর করেছে।
আর একটু দূরে একটা মেহগনি গাছের নিচে হাত পকেটে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াশ। ওর নজর কেবল একটি জায়গাতেই স্থির দোলনায় হাসতে থাকা কেয়ারার ওপর। ইয়াশ ছোট থেকেই বড্ড আলাদা। সমবয়সী ছেলেদের মতো দোলনা, চকোলেট বা খেলাধুলার প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তার আগ্রহের পৃথিবীটা কেবল দুটো জিনিসে সীমাবদ্ধ এক তার পড়াশোনা, আর দুই এই ছোট্ট কেয়ারা। তাছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো কিছুতেই তার কোনো ইন্টারেস্ট নেই বললেই চলে।
ঠিক এমন সময় হঠাৎ করেই একটা কাণ্ড ঘটল। কেয়ারার বয়সীই ছোট্ট একটা মেয়ে আচমকা দৌড়ে এসে ইয়াশের ঠিক সামনে দাঁড়াল। ইয়াশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটি তার ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে ইয়াশের প্যান্টটা খপ করে টেনে ধরে আধো-আধো গলায় চিৎকার করে উঠল,
“ইয়াত বাইয়া! ইয়াত বাইয়া!”
হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত স্পর্শে ইয়াশ বেশ চমকে গেল। ইয়াশ আচমকা ভয় পেয়ে দুই ধাপ পিছিয়ে গেল। ঠিক তখনই পিছু পিছু হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন মেয়েটির মা। পুচকে মেয়েটি তখন নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে ইয়াশকে দেখিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বলল, “ওই দেকু আম্মু, ইয়াত বাইয়া এচেচে!”
ভদ্রমহিলা ইয়াশের দিকে তাকিয়ে বেশ নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছো বাবু? তোমার বাবা কেমন আছে?”
ইয়াশ প্রথমে বেশ থতমত খেয়ে গিয়েছিল। বাচ্চাদের এমন হুটহাট জড়িয়ে ধরা তার একদম পছন্দ নয়। তবে নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে সে স্বাভাবিক গলায় জবাব দিল, “আছি ভালো। পাপাও ভালো আছে। আপনি কেমন আছেন?”
“আছি বাবা ভালোই।”
ভদ্রমহিলা হেসে ইয়াশের প্যান্ট ধরে থাকা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই দেখো তোমার তুষ্টি! তোমাকে দূর থেকে দেখেই ও চিনতে পেরেছে। তারপর তো আর কথাই শোনে না, জেদ ধরেছে তোমার কাছে আসবেই।”
ইয়াশের গম্ভীর মুখে খুব হালকা একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে নিচে তাকিয়ে ছোট তুষ্টির দিকে চোখ রেখে বলল, “কেমন আছো টেস?”
নামটা শুনেই তুষ্টির অভিমান হলো। সে দুই গাল বেলুনের মতো ফুলিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল, “টেশ না, তুষ্টি! আর তোমাল সাতে কুতা নাই, তুমি পচা!”
এতক্ষণ দোলনা খাওয়ার আনন্দে মেতে থাকায় কেয়ারা আর ইনায়া এইদিকের ঘটনাটা খেয়াল করেনি। কিন্তু হঠাৎ ইয়াশের সামনে অন্য একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কেয়ারার কালো চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও দোলনায় বসলো না। তড়িঘড়ি করে দোলনা থেকে নিচে নামতে গেল সে। পেছন থেকে ইনায়া আতঙ্কিত গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “বুনু! আস্তে নামো, পড়ে যাবে তো!”
কিন্তু কেয়ারার তখন ওসব শোনার সময় নেই। সে তার ছোট্ট পা দুটো ফেলে প্রায় দৌড়ে আসলো ইয়াশের দিকে। এসেই সে সোজা ইয়াশের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে দুহাত বাড়িয়ে দিল, যেন এখনই তাকে কোলে উঠতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ইয়াশকে জড়িয়ে ধরে সে যেন ইয়াশের পুরো শরীরের ভেতর ঢুকে যেতে চাইল!
ইয়াশ বেশ অবাক হলো। এই মুরগির বাচ্চার শরীরে এত জোর কোত্থেকে আসে? আর কেনই বা সে এভাবে জাপটে ধরল? ইয়াশ নিচু হয়ে কেয়ারাকে কোলে তুলে নিল। তার নরম তুলতুলে গাল দুটো ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে বাটারফ্লাই? ভয় পেয়েছ তুমি?”
কেয়ারা কোনো উত্তর দিল না। সে তার ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে ইয়াশের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুক ঘেঁষে রইল। তার চোখ দুটো চড়কগাছে, স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তুষ্টির দিকে। এক ফোঁটাও ইয়াশকে ছাড়তে রাজি নয় সে।
তাই দেখে পিচ্চি তুষ্টিও দমে যাওয়ার পাত্রি নয়। সে কোমর বেঁধে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল,
“ইয়াত বাইয়া, কে এই মেয়েতা?”
ইনায়া ততক্ষণে হেঁটে ওদের কাছে চলে এসেছে। ভদ্রমহিলাকে দেখে সে বেশ বিনয়ের সাথে একটু ঝুঁকে সালাম দিল, “আসসালামু আলাইকুম ম্যাম, কেমন আছেন?
ভদ্রমহিলা হাসিমুখে উত্তর দিলেন, “ওয়ালাইকুম আসসালাম। এইতো মা, ভালো আছি। এটা তোমার ছোট বোন বুঝি?”
ইনায়া কেয়ারার দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বলল, “হ্যাঁ ম্যাম।”
তারপর সে কেয়ারার দিকে ঘুরে নরম গলায় বোঝাল, “বুনু, ইনি আমার স্কুলের ম্যাম। তোমার ইয়াশ ভাইয়ারও ম্যাম হন। ম্যামকে সালাম দাও।”
কেয়ারা তখনও ইয়াশের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোরের মতো তাকিয়ে ছিল। ইনায়ার কথা শুনে সে ইয়াশের কাঁধে মুখ গুঁজেই আধো-আধো গলায় আওড়াল,
“তালাম ওয়াইতুম।”
ভদ্রমহিলা ওর এমন তোতলা সালাম দেখে হেসেই খুন বললেন, “ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছে আমার এই ছোট্ট মা-টা?”
মায়ের এমন আদর দেখে পাশে থাকা পুচকে তুষ্টির মুখটা রাগে লাল হয়ে গেল। সে নিজের মায়ের শাড়ি টেনে ধরে তীব্র আপত্তির গলায় বলল, “মা! তুমি কেনু কুতা বলচো ওর সাতে?”
ভদ্রমহিলা তুষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, “এভাবে বলতে নেই তুষ্টি। ও তোমার ফ্রেন্ড হয়।”
“নো ফ্রেন!”
তুষ্টির সটান জবাব। সে কেয়ারার দিকে আঙুল উঁচিয়ে প্রায় কেঁদেই দিল, “ও আমার ইয়াত বাইয়ার তোলে কেনু উটপে?”
ভদ্রমহিলা এবার পরিস্থিতি সামাল দিতে একটু হেসে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আরে, ওইটা তো তোমার ইয়াশ ভাইয়ার নিজের বোন হয়। তুমি যেমন বোন, ও-ও তেমন ছোট বোন। যাও, তুমিও ইয়াশ ভাইয়ার কোলে উঠো।”
ব্যাস! এই একটা কথাই যেন বারুদ ছুড়ে দিল। মায়ের পারমিশন পেয়েই তুষ্টি একছুটে গিয়ে ইয়াশের অন্য পা-টা জড়িয়ে ধরে কোলে ওঠার জন্য আকুল হয়ে উঠল। আর তা দেখেই খেল খতম, পয়সা হজম!
কেয়ারা আর এক সেকেন্ডও সময় নিল না। নিজের ইয়াশ ভাইয়ার ওপর অন্য একটা মেয়ের এমন ভাগ বসানো সে সহ্য করতেই পারল না। সে মুখ হাঁ করে এক গগনবিদারী চিৎকার ছেড়ে ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে উঠল। তার সেই কান্নার আওয়াজ আর গলার জোর দেখে মনে হলো যেন মস্ত বড় কোনো অঘটন ঘটে গেছে! চার বছরের বাচ্চার বুক ফাটানো চিৎকার শুনে পার্কের দু-চারজন মানুষও চমকে তাকাল। কেয়ারার এই ভয়ংকর কান্না দেখে ইয়াশ তো বটেই, ইনায়া, শিউলি আন্টি আর ড্রাইভার আঙ্কেলও রীতিমতো ভয় পেয়ে গেল।
এদিকে কেয়ারার এমন কান্না দেখে ভয় পেয়ে পুচকে তুষ্টিও তাল মেলালো। সে-ও হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। পুরো পার্ক তখন দুই বাচ্চার কান্নার জুগনিবন্ধে কান পাতা দায়! ভদ্রমহিলা আর পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে তড়িঘড়ি করে তুষ্টিকে কোলে তুলে নিলেন। ইয়াশের দিকে তাকিয়ে একটা অপরাধী মার্কা হাসি দিয়ে বললেন, “আমি তাহলে আসি বাবা।”
এই বলেই উনি তুষ্টিকে নিয়ে প্রায় দৌড়ে পার্ক থেকে বিদায় হলেন।
তুষ্টি চলে গেলেও কেয়ারার কান্না থামার কোনো লক্ষণ নেই। সে তখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেদেই চলেছে। ইনায়া কেয়ারার কাছে এগিয়ে এলো। সে দুহাত বাড়িয়ে বলল, “বুনু, আসো আমার কোলে আসো।”
কিন্তু ইনায়া হাত বাড়াতেই কেয়ারা যেন আরও খেপে গেল। সে ইয়াশের জামা খামচে ধরে ইয়াশের বুকের সাথে আরও শক্ত করে লেপ্টে গেল। ইয়াশও আর দাঁড়িয়ে থাকল না, সে ইনায়ার কাছ থেকে দুই কদম পিছিয়ে সরে এলো। কেয়ারার এই কান্না ইয়াশের সহ্য হচ্ছিল না। সে কেয়ারার কানের কাছে নিজের মুখটা নামিয়ে ভীষণ নরম, আদুরে গলায় ডাকল, “কাঁদে না, তোতাপাখি!”
কেয়ারা তখনো চোখ-মুখ বন্ধ করে হেঁচকি তুলছে। ড্রাইভার আঙ্কেল আর শিউলি আন্টিও ততক্ষণে একদম কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। শিউলি আন্টি কপালে হাত দিয়ে বললেন, “ওমা! ছোটমণি কান্না জুড়ল ক্যা রে বাবা!”
ইয়াশ কেয়ারার ভেজা গালটা আলতো করে মুছে দিয়ে গম্ভীর কিন্তু মায়াবী গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে বাটারফ্লাই? আমাকে বলো?”
কেয়ারা ইয়াশের বুকে নাক ঘষতে ঘষতে, ভীষণ কষ্ট নিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, “তুট্টি তে তোলে নিয়েতো তেনো? অ্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা…”
বলতে বলতেই তার কান্নার বেগ আবার বাড়ল।
ইয়াশ এবার আলতো করে কেয়ারার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “ওকে কোলে নেই নি তো। আমি শুধু আমার বাটারফ্লাইকেই কোলে নিবো, আর কাউকে না। কেঁদো না মুরগির বাচ্চা
কথাটা শুনে কেয়ারার কান্নাটা এক ঝটকায় থমকে গেল। সে চোখের জল টলমল করা বড় বড় কালো চোখ দুটো মেলে ইয়াশের দিকে তাকাল। একটা বড় করে ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল, “তত্যি?”
ইয়াশের পাথরের মতো গম্ভীর মুখে একটা স্বস্তির আভা ফুটে উঠল। সে কেয়ারার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে বলল, “সত্যি।”
এতক্ষণ পর পরিবেশটা একটু শান্ত হতেই ইনায়া এবার কেয়ারাকে একটু ধমকের সুরে বলে উঠল, “যদি কোলেও নিত, তাতে এত কান্না করার কী আছে শুনি? ও কি ইয়াশ ভাইয়াকে গিলে খেত?”
ইনায়ার এই কড়া কথা শুনে কেয়ারার ঠোঁট দুটো আবার উল্টে গেল। সে নতুন করে কাঁদার প্রস্তুতি নিতেই ইয়াশের মাথাটা গরম হয়ে গেল। সে নিজের চোয়াল শক্ত করে, বেশ রাগী চোখে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, “ওকে কাঁদাচ্ছো কেন তুমি?”
১২ বছরের ইয়াশের ওই চোখের চাউনি আর ভারী গলার ধমক খেয়ে তেরো বছরের ইনায়া মুহূর্তে দমে গেল। সে মুখটা চট করে নামিয়ে একদম চুপ মেরে গেল।
পরিবেশটা আবার থমথমে হতে দেখে শিউলি আন্টি এবার কোমর বেঁধে মাঝখানে দাঁড়ালেন। উনি ইয়াশ আর কেয়ারার দিকে তাকিয়ে চিবুক নেড়ে
বললেন, “হইছে বাপ, অনেক কান্না-কাটি হইছে। এহন বাড়িত চলো সবাই। সাহেব ফিরলে পরে আমাগো ধইরা একদম ছেসবো!”
অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৫
শিউলি আন্টির ওই ‘ছেসবো’ শব্দটা আর বলার ধরণটা এতই অদ্ভুত ছিল যে, কাঁদো কাঁদো মুখে থাকা কেয়ারা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে চোখের জল মাখানো মুখ নিয়েই খিলখিল করে হেসে উঠল। তার সেই হাসিতে দুই গালে আবার মিষ্টি টোল দুটো ভেসে উঠল।
