অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩৪
শ্রাবণী ইয়াসমিন
ভোরের কুয়াশা জমে আছে ঢাকা শহরের ঘনগভীর গলিতে। সূর্য ধীরে ধীরে আকাশের কিনারা ছাড়তে চাইছে, আর বাতাস কাঁপাচ্ছে দৃষ্টিশূন্য শীতের আঙিনায়। শিশিরের ছোট ছোট বিন্দু গাছপালার পাতা থেকে ঝরে মাটিতে লুকোচুরি খেলে। চারপাশে সবকিছু নিঃশব্দ, যেন এই মুহূর্তটাই কেবল তার নিজের, অচেনা ও স্বপ্নময়।
কুয়াশা ভেদ করে বিএমডব্লিউ গাড়িটা তীব্র গতিতে ছুটছে। হাওয়ার মধ্যে শীতের ঝাপটা মিশেছে, বাতাস ঠেসে দিচ্ছে চেহারায়। আনায়া চলে আসার পর দীর্ঘ ছয় বছর পর জেভিয়ার বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছে।
গাড়ির পাশের সিটে ভিক্টর বসে সিগারেট ফুঁকছে, মাঝে মাঝে আবার সেইটা জেভিয়ার এর বাড়িয়ে দিচ্ছে। জেভিয়ার একবার টান দিলেই ধোঁয়া তার মুখের কাছ দিয়ে মিশে যাচ্ছে।
এই ছয় বছর ধরে আনায়ার অনুপস্থিতিতে তারা দুজনই একসাথে, আবার এক অদ্ভুত বন্ধুত্বের সমীকরণে বাঁধা পড়েছে।
আনায়া সেদিন জেভিয়ারকে ক্ষমা করেছিল ঠিকই, কিন্তু তার অন্তরের গভীর থেকে পারেনি ভুলে যেতে সেই ভয়ঙ্কর অন্যায়গুলো। ভালোবাসা আর ঘৃণার মাঝখানে দুলতে থাকা তার হৃদয় শুনতে পেতো সেই বাচ্চাগুলোর আর্তনাদ, তাদের কান্না, তাদের নিরীহ চোখের ভয়ের ছায়া। মাঝে মাঝে মনে হতো যদি তার নিজের সন্তানদের সাথেও এমন কিছু ঘটে? সেই চিন্তাতে মাথায় আনলেই বুকটা কেঁপে ওঠতো।
তাই সেদিন আনায়া এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
জেভিয়ার যেন তার গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানের মুখ না দেখে। তার শাস্তি হবে বেঁচে থেকেও বিচ্ছিন্ন থাকা তাদের থেকে। নিজের সন্তানদের অস্তিত্ব জেনেও ছুঁতে না পারা, জানতে না পারা তাদের কণ্ঠস্বর, তাদের প্রথম হাঁটা, প্রথম হাসির গল্প।
ওদের জন্মের পর পাঁচ বছর জেভিয়ার আনায়া কিংবা বাচ্চাদের কোনো খোঁজ রাখতে পারবেনা। কোনো যোগাযোগ নয়, কোনো বার্তা নয় একবারের জন্যও না। এটাই হবে তার পাপের শাস্তি।
জেভিয়ার তখন সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। সে জানত, আনায়া তার হৃদয়ের সব ভালোবাসা দিয়ে এই যন্ত্রণা বেছে নিয়েছে। আর জেভিয়ার, নিজের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে, সেটাই মাথা পেতে গ্রহণ করেছিল।
সেই দিন থেকেই সে পরিবর্তন করে। জেভিয়ার আর কোনো অনৈতিক কাজে জড়ায়নি, না কোনো র*ক্ত, না কোনো সহিংসতা সবকিছু থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। কিন্তু এক জিনিসে সে হেরে গিয়েছিল তা হলো ‘সিগারেট’।
আনায়ার অনুপস্থিতিতে তার ভেতরের যন্ত্রণা নিভানোর একমাত্র উপায় হয়ে উঠেছিল এই নেশা। এমনও দিন গেছে যখন সে টানা ২৪ ঘণ্টায় পনেরো প্যাকেট সিগারেট শেষ করেছে।
ধোঁয়ার ভেতর ডুবে সে ভুলে থাকতে চাইত নিজের অপরাধ, নিজের একাকিত্ব, আর সেই মেয়েটার অনুপস্থিতি, যাকে সে ভালোবেসেছিল জীবনের থেকেও বেশি।
আজ এত বছরের অপেক্ষার অবসান হলো।
দীর্ঘ ছয় বছরের নিরব প্রতীক্ষার পর জেভিয়ারের বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক কাঁপুনি কাজ করছে। তার সময়জ্ঞান ভুল না হয়ে থাকলে আজ পাঁচ বছর পূর্ণ হলো তার সন্তানের।
বাইরে এখনো সূর্য মামার দেখা মেলেনি, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা ছয়টা পেরিয়ে গেছে। ভোরের কুয়াশা এখনো শহরের গায়ে লেপ্টে আছে, ঠান্ডা বাতাস গাড়ির জানালা ভেদ করে কাঁচের ভেতর ঢুকে গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে।
রাজকীয় ভঙ্গিতে ছুটে চলা বিএমডাব্লিউটি এসে থামল এক পুরনো বাড়ির সামনে–আনায়ার মামাবাড়ি।
সে আসার আগে সব খবর নিয়ে রেখেছিল। জানতে পেরেছে, আনায়া এখন বাংলাদেশে, তার নানু আপার কাছে।
গাড়ি থামতেই ভিক্টর জানালার কাচ নামিয়ে শেষ এক টান দিল সিগারেটে, তারপর নিঃশব্দে ছাই ফেলে দিল বাইরে। জেভিয়ার কিছু না বলে দরজাটা খুলে নেমে গেল।
তার ধূসর চোখদুটোতে তখন এক তৃষ্ণা, যেন বছর সাতেকের অন্ধকারে হারানো আলো খুঁজছে।
বাড়ির মূল প্রবেশদ্বারের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় সে। দরজাটা আধখোলা, ভেতর থেকে আলো ফুঁড়ে বাইরে আসছে। ঠিক তখনই দরজার দিক থেকে কেউ বেরোতে যাচ্ছিল—আনায়ার মামা, রবিন সাহেব।
দু’জনের চোখাচোখি হতেই সময়টা হঠাৎ থমকে যায়।
রবিন সাহেব থতমত খেয়ে যান, ঠোঁট শুকিয়ে আসে। এই ভয়ংকর ধূসর চোখের মানুষটিকে তিনি ভুলতে পারেননি।
এক মুহূর্ত পর জেভিয়ার দৃষ্টি সরিয়ে নেয়, ধীরে ধীরে দরজার ভেতর ঢুকে যায়। রবিন সাহেব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, বুকের ভেতর ধকধক শব্দ আরও জোরে বাজতে থাকে।
চোখ নামিয়ে নেন নিচের দিকে, আর ঠোঁটের কোণে এক দীর্ঘ, অপরাধবোধে ভারী নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে।
জেভিয়ার ধীরে ধীরে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। প্রতিটি ধাপে যেন তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছিল। দীর্ঘ সাত বছরের অপেক্ষার শেষে আজ, সে পৌঁছে গেছে সেই দরজার সামনে যে দরজার ওপাশে লুকিয়ে আছে তার সব অপরাধ, ভালোবাসা আর অনুতাপের মিশ্র মুখ।
দরজাটা আলতো করে ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই এক ঘুটঘুটে অন্ধকার তাকে ঘিরে ফেলল। প্রথমে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অন্ধকারটা তার চোখে সয়ে যায়।
চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পোশাক, খেলনা, ছোট ছোট জামাকাপড় যেন রুমটা একসাথে দুই প্রজন্মের নিঃশ্বাসে ভরা। দেয়ালের পাশে রাখা এক ছোট টেবিলে কিছু অর্ধেক খাওয়া খাবার, আর বাতাসে ভাসছে শিশুর দুধের গন্ধ।
জেভিয়ারের চোখ তখন সেই দৃশ্যটার দিকে আটকে গেল একই ঘরে দুটি বেড। তার কপালে ভাঁজ পড়ে গেল মুহূর্তেই। একটা বেডে ছোট্ট কাঁথা মুড়ি দিয়ে কেউ ঘুমাচ্ছে কে, তা বোঝা গেল না।
তার নিঃশ্বাসের হালকা শব্দ ছাড়া রুমে আর কোনো নড়াচড়া নেই।
জেভিয়ার ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সামনের খাটের দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারল না কে শুয়ে আছে সেখানে। তারপর পায়ে শব্দ না করে সরতে সরতে এগিয়ে গেল পাশের বেডের দিকে আর সেখানে পৌঁছাতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় মেরে উঠল।
ম্লান আলো জানালার ফাঁক দিয়ে এসে পড়েছে আনায়ার মুখে। মনে হলো, সাত বছরের ব্যবধানে মেয়েটা এক নতুন রূপ নিয়েছে। চেহারার শিশুসুলভ মাধুর্যটা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এসেছে পরিণত এক নারীর শান্ত সৌন্দর্য।
গালগুলো সামান্য ফুলে আছে, চোখের নিচে হালকা ছায়া, আর ঠোঁটদুটো নরমভাবে ফুলে আছে ঘুমের ভেতর। তার মুখে যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি যেন পৃথিবীর সব যন্ত্রণা পেরিয়েও এই নারী অবশেষে নিজের ছোট্ট জগতে শান্তি খুঁজে পেয়েছে।
জেভিয়ার নিজের ফোনের ব্রাইটনেস কমিয়ে আনায়ার মুখের কাছে ধরল। আলোটা তার গাল বেয়ে ঠোঁটে এসে থামল এক মুহূর্তের জন্য জেভিয়ার কেমন ঘোরে চলে গেলো।
তার মনে হলো, পৃথিবীর সব পাপ, সব অনুশোচনা এই এক জোড়া ঠোঁটের ছোঁয়ায় মুছে যেত যদি সে পারত। কিন্তু সে পারল না।
জেভিয়ারের দৃষ্টি হঠাৎ থেমে গেল আনায়ার বুকের ঠিক পাশে। একটা ছোট্ট, গোল কিছু নরমভাবে গুটিয়ে শুয়ে আছে তার সঙ্গে লেপ্টে। আনায়ার এক হাত সেই ছোট্ট জিনিসটাকে ঘিরে রেখেছে নিঃশ্বাসের তালে তালে তার বুক ওঠানামা করছে।
দৃশ্যটা এমন কোমল, এমন শান্ত—যেন পৃথিবীর সমস্ত তৃষ্ণার পর এটাই একমাত্র উত্তর।
জেভিয়ারের বুকজুড়ে অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এলো। তার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেশ দেখা মিলল। যত অপরাধ, যত অস্থিরতা সব মিলিয়ে যেন এই মুহূর্তেই গলে যাচ্ছে।
তবু, এতটা কাছে পেয়েও অদ্ভুত এক আকুলতা তাকে ছাড়ল না। এত বছর পর, এত কষ্টের পর এই মেয়েটাকে এত সামনে পেয়েও যদি বুকের ভেতর পিষে না ধরে, তাহলে কি করে হয়?
সে আস্তে ফোনটা নিভিয়ে দিল। তারপর ভিক্টর কে ছোট করে একটা মেসেজ পাথলো। এরপরি জেভিয়ার ধীরে দরজাটা বন্ধ করল। নিজের গায়ের ভারী লেদারের জ্যাকেট খুলে পাশের টেবিলে রাখল, তারপর পাতলা সোয়েটারটাও খুলে রাখল নিঃশব্দে।
তারপর সম্পূর্ণ উদাম শরীরে কম্বলের ভেতরে ঢুকে গেল। শীতল, খড়খড়ে হাত দুটো আলতো করে বাড়িয়ে আনায়াকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল।
আনায়ার গা থেকে ভেসে এলো চেনা গন্ধ যে গন্ধে একসময় তার পৃথিবী জুড়ে থাকত।
শীতের ঠান্ডায় জেভিয়ারের আঙুল কেঁপে উঠছিল।
তার স্পর্শে আনায়া সামান্য নড়ল, ভ্রু কুঁচকে ফেলল ঘুমন্ত অবস্থায়। মুখের কোণ দিয়ে নিঃশব্দে বিরবির করে বলল,
“আভিয়ান… তোমার হাত এত ঠান্ডা কেন? আবার একা বাইরে গিয়েছিলে আজও?”
আনায়ার ঘুমুঘুমু কন্ঠ যেন জেভিয়ার কে মাতাল করে ফেলল। সে আনায়ার ঘাড়ে মুখ গুজে ফিসফিস করে বলল,
“তোমার এই ছোট্ট দেহ টা পিষে ফেলতে আমি চলে এসেছি লাভবার্ড।”
রাশিয়ার Serbsky Psychiatric Institute, মস্কো।
একটা ঘর, দেয়ালের একপাশে চোখে পড়ার মতো কিছুই নেই, কারণ পুরোটা ভরে আছে একটাই শব্দে, My oxygen Ash, my oxygen Ash, my oxygen Ash…
শুকনো দেয়ালের গায়ে আঁচড়ে আঁচড়ে লেখা।
কোনো জায়গা ফাঁকা নাই, সব ভরা সেই একই শব্দে।
ঘরের এক কোণায় বসে আছে এক ছেলে।
উষ্কখুষ্ক চুল, শুকনো চেহারা, গায়ের পোষাক ময়লা আর ছেড়া। হাতে একটা ছোট পাথর, সেইটা দিয়ে ফ্লোরে টুকটুক শব্দ করছে বারবার।
তার শরীর জুড়ে ক্ষত, বুকে গভীর কাটা দাগে লেখা— Love you Ash.
এছাড়াও বিভিন্ন অংশে ক্ষত করে খোদাই করা A অক্ষর।
চোখ দুটো ফাঁকা, যেন অনেকদিন কোনো আলো দেখেনি। ঠোঁট শুকনো, নিঃশব্দে কিছু বিড়বিড় করছে।
কে বলবে এই ছেলেটাই সেই অ্যালেক্স?
ছয় ফুট উচ্চতার শক্তপোক্ত শরীর, একসময় যার চেহারায় ছিলো গাম্ভীর্য । এখন সে কেবল এক নামের মধ্যে বন্দি–Ash.
কিছুক্ষণ পর একজন নার্স আসে, হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে। অ্যালেক্সের থেকে বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে, শব্দ করে টেবিলের ওপর প্লেট রাখে।
“এই পাগল, এই নে তোর খাবার রাখা আছে খেয়ে নিস। আমি পরে এসে প্লেট নিয়ে যাবো।”
তার কণ্ঠে যতটা রুক্ষতা, তার চেয়েও বেশি ভয়।
দ্রুত পা বাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
অ্যালেক্স একটাও শব্দ করে না। হাসপাতালে শুধু সে নয়, বেশিরভাগ নার্সই ভয় পায় অ্যালেক্সকে।
ভয় পাবারও যথার্থ কারণ আছে। তাদের প্রত্যেকেই জানে, অ্যালেক্স কী করেছে,
পুরো রাশিয়ায় সেই হত্যাকান্ডের কথা আলোচিত।
একজন মানুষ হয়ে কীভাবে অন্য মানুষকে এমন নির্মমভাবে কুড়াল দিয়ে কু/পাতে পারে?
এই প্রশ্নটা মাথা ঘুরিয়ে যায় সবার।
শুধু কি কু/পানো অবধি ছিলো? না কু/পানোর পর মুরগীর চা/মড়া যেইভাবে হাত দিয়ে টেনে ছি/ড়ে ফেলা হয় তেমন ভাবেই সেই মানুষগুলোর চা//মড়া হাত দিয়ে টেনে টেনে ছি/ড়েছিলো। হাতের নখ দিয়ে চা/মড়া ভেদ করে বেড়িয়ে আসা মাংস খামচে খামচে ছোট ছোট টুকরো করে খুবলেছে।
এরপর আবার কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে বুকের খাচা ভেঙে সেইখান থেকে হৃদপিণ্ড টা হাতে এনে শক্তি দিয়ে চাপ দিয়ে চটকেছে। এইগুলো কি চারটে খানি কথা? আবার সেই র/ক্ত দিয়ে নিজের মুখও ধুয়েছে। কোনো স্বাভাবিক সুস্থ মানুষ কি এইগুলো পারবে? অসম্ভব।
এইটাতো গেলো একজনের কথা আরেকজন কেও এমন ভয়ানক ভাবেই খুন করেছে এই ছেলে। সেই জনের জিভ টেনে ছিড়ে এনে কপালের সাথে পেরেক দিয়ে আটকে রেখেছে। হাতে পায়ের নখ উপড়ে সেই আঙুলে পেড়েক গেড়ে আঙুলের অপর পাশ দিয়ে বের করেছে।
পেট ফাড়া আর তার ভেতরের পেচানো নাড়িভুড়ি সব টেনে টেনে ছিড়েছে যেন সে দড়ি টেনে ছিড়ছে। চোখের মণিতে ছুড়ি গেড়ে রাখা এবং দু পায়ের মাঝ বরাবর পুরুষাঙ্গ বরাবর কুপানো হয়েছে।
এমন ভয়ানক সব লাশ তো অনেক রিপোর্টাররা সেইখানেই বমি করে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো। অথচ এই ছেলে কত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তাদের র/ক্ত দিয়ে নিজের পা ধুচ্ছিলো।
এরপর তাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় তবে সেইখানে বিভিন্ন জিনিস দিয়ে নিজেকে ক্ষত করত বলে বাধ্য হয়ে এইখানে চিকিৎসার জন্য ওকে রাখা হয়েছে। তবে ওর রুমে কেউ আশে না ভয়ে।
আনায়া অবাক চেহারায় জেভিয়ার এর দিকে তাকিয়ে আছে। সকাল সকাল, এমনভাবে জেভিয়ারকে তার সামনে দেখবে এইটা তার কল্পনাতেও ছিলো না।
চোখে পানি জমছে, বুক ভেতর কেমন অচেনা উত্তেজনা কাজ করছে।
জেভিয়ার ধীরে তার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল তার মুখখানা। এত বছর পর, সেই পরিচিত ঘ্রাণ যা একসময় তার পৃথিবী জুড়ে ছিলো এত নেশাজনকভাবে পৌঁছালো আনায়ার কাছে, যে সে নিজের নিঃশব্দ স্পন্দনে সেই মুহূর্তে হারিয়ে গেল। নির্জীব প্রানীর মতো সে পড়ে রইল জেভিয়ার বুকের মাঝে।
কতক্ষণ কেটে গেল, ঠিক বোঝা গেলো না।
হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এলো একটি চিকন, অস্পষ্ট কণ্ঠ,
“মাম্মাম…”
জেভিয়ার চোখ ধীরে খুলল। তার দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে এক ছোট্ট, গুলোমূলু ছায়ার মতো বাচ্চা। আলোর অভাবে পুরো চেহারা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, তবে চোখ দুটো নিঃসন্দেহে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
জেভিয়ার কিছুটা হকচকিয়ে, তবে কেমন যেন অচেনা উষ্ণতায় সেই ছোট্ট মুখটা দেখল।
আনায়া তার বুকেই গুটিসুটি মেরে আবার ঘুমিয়ে গেল পরম উষ্ণতায়। জেভিয়ার চাইল বাচ্চাটার দিকে হাত বাড়াতে, কিন্তু কেমন যেন হাত কাঁপছে, সাহস থাকলেও আর ঠিকভাবে বাড়াতে পারছে না।
বছরের ফাঁকফোকর, যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে হাতটা যেন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।
শেষ পর্যন্ত সাহস জোগাতে গিয়ে হাত বাড়ালেই মেয়েটা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
“মাম্মাম!”
আনায়া লাফ দিয়ে উঠে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিল। বাচ্চাটি যেন তার কোলে নিঃশ্বাসে মিলিয়ে গেল।
কিন্তু মেয়েটার চিৎকারে বিছানার পাশে আরেকটি বাচ্চা উঠে বসল, চোখ ছলছল করে জেগে উঠল।
জেভিয়ার চোখ বড় হয়ে গেল, চমকে বলল,
“তোমার… টুইন হয়েছে?”
আনায়া ধীরে ধীরে দুপাশে মাথা নাড়ল, আর চোখের কোণে সামান্য হাসি খেলল।
জেভিয়ার ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে ওই বাচ্চা… কার?”
ঠিক সেই মুহূর্তে রুমের আলো জ্বলে উঠল।
জেভিয়ার পিছে ঘুরে তাকাল, একটা বাচ্চা ছেলে, ঘুমোমুখো চোখে লাইট জ্বালিয়ে, তার দিকে তাকিয়ে আছে। শরীরটা এখনও অর্ধেক ঘুমে, কিন্তু চোখের দৃষ্টি পুরোপুরি ঠিক তার দিকে।
আনায়া বুঝতে পারল, তার এক চিৎকারে সবাই জেগে উঠেছে। জেভিয়ার হতবাক হয়ে বলল,
“এটা আবার কে? তুমি কি এলাকা থেকে মানুষের বাচ্চা এনে নে, লালন পালন করার কাজ শুরু করেছো নাকি?”
আনায়া হালকা ফিক করে হেসে বলল,
অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩৩
“জ্বি না, স্যার। এইগুলো সব আপনারই বাচ্চা। আমার কোনো সিঙ্গেল বেবি হয়নি… কোনো টুইন বেবি হয়নি…
আমার ট্রি-প্লেটস বেবি হয়েছে।”
জেভিয়ার চোখ তখন একেবারে বড় হয়ে গেল। মাথার ভেতরে সমস্ত ভাবনা ঘুরছে, হৃদয় কেমন যেন বাঁধহীন স্পন্দনে ছুটছে।
