Home অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৪

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৪

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৪
শ্রাবণী ইয়াসমিন

ঘরটা যেন এক নিঃশ্বাসে জমে থাকা অন্ধকারের চিলেকোঠা। দেয়ালের পাথরে হালকা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, কেবল মাথার অনেক ওপরে একটা সরু ফাঁক দিয়ে ঢুকছে ক্ষীণ আলো। বাতাস নেই, শব্দ নেই, জানার উপায় নেই দিন যাচ্ছে না রাত।
মেঝেতে পাথরের ওপর গুটিশুটি মেরে বসে আছে শেইলি। তার হাতে দড়ির দাগ, চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। চোখের কোণে লেগে আছে শুকনো কান্নার রেখা। সেই যে কয়েক ঘণ্টা আগেও দুঃস্বপ্ন বলে ভেবেছিল… এখন সেটা তার বাস্তব। একদম ছুঁয়ে ফেলা, ঠাণ্ডা বাস্তব।
কতবার চিৎকার করেছে, কেঁদেছে, দরজা পেটাতে গিয়ে হাত কে*টে র*ক্ত ফেলেছে। তবুও কেউ আসেনি। এখানে আসবে না কেউ।

শেইলির গলা ফাটলেও, এই ঘর তার কণ্ঠস্বরকে শুষে নেয়। তাকে এমন এক জায়গায় রাখা হয়েছে, যেখানে পৃথিবীর শব্দ ঢোকে না, আর তার কান্নাও বেরোয় না।
আস্তে আস্তে বোঝা যাচ্ছে, এখান থেকে মুক্তি নেই।
শেইলি দুর্বল কান্নারত কণ্ঠে নিজেকেই নিজে বলতে থাকে-
“- কেন…? আমি-ই কেন? এত কষ্ট শুধু আমাকেই কেন দেওয়া হচ্ছে?
আর ঠিক তখনই বাতাসের ভেতর ভেসে আসে সেই ভয়ানক কণ্ঠস্বর।
“- তুমি কিছুই করোনি তোমাকে শুধু আমি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছি। কারণ তোমাকে কষ্ট দিলে তোমার মা বাবা কষ্ট পাচ্ছে আর তারা কষ্ট পাচ্ছে দেখে আমি তৃপ্তি পাচ্ছি।
এই কথা বলেই ভিক্টর এর মুখে ফুটে ওঠে এক ভয়ংকর হাসি যে হাসি দেখলে যে কেউ শিউরে উঠবে।

রাত তখন অনেকটা গভীর। বাকিদের ঘুমিয়ে পড়ার শব্দ যেন আরও বেশি নিস্তব্ধতা নিয়ে আসে আনায়ার চারপাশে।
ঘরটা নিঃশব্দ, নিস্তরঙ্গ। কিন্তু আনায়ার ঘুম আসছে না কিছুতেই। কেন যেন বুকের ভেতর একটা অজানা অস্বস্তি, একধরনের অচেনা অস্থিরতা কাজ করছে আজ সারাদিন ধরেই।
চুপচাপ বিছানা ছেড়ে উঠে বারান্দায় আসে সে। আকাশটা মেঘে ঢাকা, বাতাসে হালকা শীতের আমেজ।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে অন্ধকারের দিকে, ঠিক যেন কোনো অদৃশ্য কিছু খুঁজছে।হঠাৎই তার দৃষ্টি আটকে যায়।
তার নিজের ঘরের নিচে—অন্ধকারের গাঢ়তলে একটা ছায়া সরে যেতে দেখল সে,মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ঝলক, কিন্তু এতটাই স্পষ্ট ছিল যে ভুল দেখার কোনও সুযোগ ছিল না।
আনায়ার কাঁপুনি ধরে যায়। কান যেন তালা লেগে গিয়েছিল মুহূর্তে। শরীর অবশ হয়ে আসছিল, অথচ চোখ খুলে ছিল পুরোপুরি।

সে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। পিছনের তালাটাও ভালো করে আটকে দেয়, তারপর হেঁটে আসে বিছানায়।
চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ে , কিন্তু তার মন জানান দিচ্ছে সে একা নেই। ঘরের প্রতিটি কোণ থেকে যেন কেউ তাকে গিলছে চোখ দিয়ে। এমন অনুভূতি আগেও হয়েছে তার
বাড়ি থেকে বের হলেই মনে হত কেউ অনুসরণ করছে।
অস্বস্তিতে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় আনায়া।
লাইটের সুইচে হাত বাড়ায় ঠিক তখনই পাশের টেবিলের উপর রাখা একটা ফুলদানি আচমকা তার কনুইয়ের আঘাতে পড়ে গিয়ে ভেঙে যায়।
আনায়া চমকে যায়।
ঘরের বাতি জ্বালিয়ে তাড়াতাড়ি নিচু হয়ে ফুলদানির টুকরো তুলতে গিয়ে হঠাৎই চোখে পড়ে একটা অদ্ভুত জিনিস।
একটা ছোট গোল ক্যাপসুলের মতো বস্তু।৷ সে হাতে তুলে নেয়। চোখ বড় হয়ে যায় তার।

“সিসিটিভি ক্যামেরা!”
তাকে অবাক করে দেওয়া নয়, আতঙ্কিত করে ফেলার মতো ক্যামেরা ঘরের ভেতরে গোপনে লাগানো হয়েছে!
“কে করেছে এটা?কখন?কেন?
শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসে। সে কাঁপতে কাঁপতে পুরো ঘরটাকে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করে। জানালার পর্দা, বুকশেলফ, টেবিলের নিচ, দরজার ফাঁক সব খুঁটিয়ে খোঁজে।
অথচ কোথাও কিছু পায় না।
তবুও বুকের ভেতর থেকে একটা কণ্ঠস্বর বলে ওঠে
“একমাত্র একটা ক্যামেরা তো হবে না…
হঠাৎ তার চোখ চলে যায় ড্রেসিং টেবিলের দিকে। ভেতরে যেন একটা আশঙ্কা জমে উঠছে। সে ঘরের লাইট বন্ধ করে ধীরে ধীরে পা বাড়ায় । আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। আয়নার কোনা দিয়ে আঙুল চালিয়ে যায়।
আর ঠিক তখনই—
একটা রিফ্লেকশন, একটা অতিক্ষুদ্র গর্ত এক চিলতে লাল আলো।
আরও একটা ক্যামেরা!

আনায়া চিৎকার করে উঠতে চায়, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না। দুই হাতে আয়নাটা ঠেলে ফেলে দেয় সে। কাচ ভেঙে পড়ে যায় টুকরো টুকরো হয়ে।
ভাঙা আয়নার টুকরোতে পড়ে থাকা সেই ক্যামেরাটা দেখে বুক ধ্বক করে উঠল।তাকে দেখা হচ্ছে। দিনরাত, ঘুমের ভেতরেও, হয়তো বা তার গোপন কিছুও।
তার নিরাপত্তা, গোপনতা, আর নিজস্বতার দেয়াল ভেঙে গিয়েছে চুপিসারে।
সে দম বন্ধ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। চারপাশ ঘিরে এক অদৃশ্য শ্বাস যেন হাড়ে হাড়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে।
আনায়া তখনও জানে না এই নজরদারি কেবল তার শরীরের ওপর নয়। তার জীবন, তার অতীত, তার ভবিষ্যৎ সবকিছুর ওপর।
হঠাৎ দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এলো হালকা কড়া নাড়ার শব্দ।
আনায়ার পায়ের নিচে জমিন যেন সরে গেল। শরীরের সব র*ক্ত যেন মাথায় উঠে গেল এক মুহূর্তে। কেউ আছে এই রাতের গভীরে, তার ঘরের দরজার সামনে ভেবেই যেন তার আ*ত্মা বেরিয়ে যাচ্ছে। সে চেচাতেও পারছে না, এই নির্জন জায়গায় সে চেচালেও কেউ শুনবে না।
হঠাৎ দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসে এক কণ্ঠস্বর —

“অ্যানা…? শুনছো? তুমি ঠিক আছো?
পরিচিত সেই কণ্ঠস্বর।
আনায়া যেন মুহূর্তেই হালকা হয়ে যায়। বুকের ওপর চাপা এক পাথর নেমে যায় কিছুটা। সে তাড়াতাড়ি এগিয়ে দরজাটা খুলে দেয়।
সামনে দাঁড়িয়ে জেভিয়ার, মুখে উ*দ্বে*গের ছাপ। হাতে একটা ছোট টর্চ, পরনে ট্র্যাকস্যুট। চোখে গভীর নজর।
“তুমি ঠিক আছো তো?” — জেভিয়ার নরম গলায় বলে।
আনায়া চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে কোনো জবাব দেয় না।
“আমি আমার পোষা কুকুরটা খুঁজতে বেরিয়েছিলাম বাইরে। হঠাৎ তোমার ঘর থেকে কিছু ভাঙার শব্দ শুনলাম। খুব তীব্র লাগলো, তাই ভাবলাম… কোনো বিপদ হলো নাকি।
আনায়া কিছু বলতে পারে না। ঠোঁট কাঁপছে, গলার ভেতর যেন কিছু আটকে আছে। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
জেভিয়ার আর অপেক্ষা করে না। ভেতরে ঢুকে চারপাশে চোখ বুলায়। তার দৃষ্টি আটকে যায় ভাঙা আয়নায়, ছড়িয়ে থাকা কাঁচের টুকরো আর সেই ছোট্ট ক্যামেরার উপর।
চোখের কোণ কুঁচকে যায় ওর। সে ধীরে ধীরে আনায়ার দিকে এগিয়ে আসে। কাঁধে একটা সান্ত্বনার হাত রেখে বলে

“কী হয়েছে বলো তো? এগুলো… সব কিভাবে হলো?
আনায়া আর ধরে রাখতে পারে না। গলা দিয়ে এক গাঢ় কান্নার আওয়াজ বেরিয়ে আসে সে ভেঙে পড়ে জেভিয়ারের সামনে বাচ্চাদের মতন করে কেঁদে উঠে।
“জেভিয়ার… আমি অনেকদিন ধরে টের পাচ্ছিলাম… কেউ… কেউ আমাকে দেখছে, যেন ছায়ার মত পেছনে পেছনে নজর রাখছে। আমার ঘরে… আমার ঘরে লুকিয়ে ক্যামেরা লাগানো! আমার গোপন কিছুই আর গোপন নেই! আমি… আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছি!”
জেভিয়ার কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল আনায়ার কান্নাভেজা মুখের দিকে। চোখে কোনো ভয় নেই, না আতঙ্ক একটা অদ্ভুত স্থিরতা। যেন এসব কিছুই তাকে নাড়া দিচ্ছে না।
“তুমি আজকের মতো ঘুমিয়ে পড়ো, ঠান্ডা স্বরে বলে উঠল সে, “কাল দেখা যাবে এইসব। আজ অনেক রাত হয়েছে।
একটু থেমে চোখ ঘোরাল চারপাশে, তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের বাড়ির কেয়ারটেকার কোথায়? সে থাকে না?
আনায়া মাথা নিচু করে ধীরে বলল, “সে কিছুদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি গিয়েছে… এক আত্মীয় অসুস্থ।
জেভিয়ার মাথা নাড়ল।

“ঠিক আছে। এখন ঘুমিয়ে পড়ো। যদি আবার কিছু হয়, আমাকে ডেকো। অনেক রাত হয়েছে… আমি যাচ্ছি।
এই বলে পেছন ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়াতেই আনায়া তড়াক করে উঠে এসে ওর হাতটা ধরে ফেলল। চোখে টলটলে জল, ঠোঁট থরথর করছে ভয় আর কাঁপুনিতে।
“যেয়ো না… আমার একা… ভয় করছে, জেভিয়ার…
জেভিয়ার থেমে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল ওর দিকে। তারপর কিছুক্ষণ আনায়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
নিঃশব্দ সেই চোখে যেন এক অদ্ভুত গভীরতা।

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩

“আমার এখানে থাকা সম্ভব নয়, ধীরে ধীরে বলল সে, “তুমি চাইলে আমার বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারো… যদি তোমার সমস্যা না হয়।
আনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। চোখ নামিয়ে ভাবল কয়েক মুহূর্ত। তারপর মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেল।
জেভিয়ারের ঠোঁটে যেন এক ক্ষীণ রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল যেন সে এইটাই চাইতো।
সে এক পা সামনে এগিয়ে এল, আনায়ার খুব কাছে। কণ্ঠটা তখন একেবারে নিচু, কিন্তু তীক্ষ্ণ শোনায় কানের খুব কাছে-
“আমার কাছে কিন্তু তুমি নিজে থেকেই যেতে চাচ্ছো, ফেরার কিন্তু আর কোন পথ পাবে না পরে আমার থেকে……

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৫