অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২১
রিদিতা চৌধুরী
সৌহার্দ্যের গলার আওয়াজ শুনে ফারিস পিছু ফিরল। সৌহার্দ্যের চোখেমুখে এক অদ্ভুত শীতলতা—যেন জমাট বাঁধা বরফ, যা যেকোনো মুহূর্তে আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হতে পারে। ফারিস আড়চোখে একবার তাকে খুঁটিয়ে দেখল। সে বুঝতে পেরেছে সৌহার্দ্য এখনো প্রচণ্ড রেগে আছে। ফারিস ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে কিছুটা ব্যঙ্গাত্মক সুরেই বলল,
“ওহ্! চৌধুরী সাহেব দেখছি অবশেষে তাঁর রানিহীনা রাজত্বে ফিরে এসেছেন!”
সৌহার্দ্য কোনো উত্তর দিল না। সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ক্লান্তিতে এলিয়ে পড়েছে সে। সারাদিনের ধকলের পর শরীরে যেন আর একবিন্দু শক্তি নেই। রিভার দিকে তাকিয়ে নিস্তেজ স্বরে বলল, “রিভা, ভাইয়ার জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে আয় তো।”
রিভা রান্নাঘরের দিকে চলে যেতেই ফারিস সুযোগ বুঝে খোঁচা দিয়ে বসল, “কি কপাল ভাই তোর! নিজের বাড়ি, নিজের সব… অথচ এখন আমার বউয়ের হাতের পানি খেয়ে তৃষ্ণা মেটাতে হচ্ছে? ইস, যদি তোর বউটা পাশে থাকত, এই গ্লাস পানির বদলে হয়তো এক গ্লাস শরবত এগিয়ে দিত! খুব মিস করছিস, তাই না?”
সৌহার্দ্যের রাগের পারদ যেন আবারও চড়তে শুরু করল। বিরক্তিতে চোখ কুঁচকে ফারিসের দিকে তাকিয়ে বলল, “আই অ্যাম টায়ার্ড, ফারিস। প্লিজ, ডোন্ট ডিস্টার্ব মি।” এই বলেই সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চোখ বন্ধ করে নিল।
ঠিক তখনই শাহেদা চৌধুরী নাস্তার প্লেট হাতে ঘরে ঢুকলেন। ফারিসের দিকে নাস্তা এগিয়ে দিয়ে তার পিঠে হাত বুলিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “বাড়ির সবাই কেমন আছে রে ফারিস? তোর বাবা, চাচারা সবাই সুস্থ আছে তো?”
ফুফুর চোখের দিকে তাকিয়ে ফারিসের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মায়া ফুটে উঠল। শান্ত কণ্ঠে সে বলল, “সবাই ভালো আছে ফুফিমনি। ফাহান ভাইয়ের বিয়ের তারিখটা মনে হয় আগামী মাসেই ঠিক হবে। তোমাদের কিন্তু অবশ্যই যেতে হবে, নাহলে তোমার এই জেদি ভাতিজা তো সোজা বলেই দিয়েছে—তোমরা না গেলে সে বিয়েই করবে না!”
শাহেদা চৌধুরী মলিন হাসলেন। পরক্ষণেই অভিমানী সুরে বললেন, “তোর বাবা-চাচা নিজে এসে আমাকে দাওয়াত না দিলে আমি যাবো না।”
সৌহার্দ্য চোখ বন্ধ করেই সব শুনছে, কিন্তু তার মুখে কোনো সাড়া নেই। ফারিস ফুফুকে সান্তনা দিয়ে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি চললাম ভাই, পরে দেখা হবে।”
সে দরজার দিকে পা বাড়াতেই সৌহার্দ্য নীরবতা ভেঙে শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলে উঠল, “আজকের রাতটা থেকে যা।”
ফারিস হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে একটা বাঁকা হাসি দিল। ঝুঁকে সৌহার্দ্যের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “উঁহু, থাকা যাবে না! তোর সাথে একা থাকলে কখন যে কী করিস তার ঠিক নেই। বউয়ের অভাবে মানুষ এখন যা তা হয়ে যায়! ভদ্রলোকের বেশ ধরে বসে থাকলেই হয় না রে, তুই আসলে কী জিনিস সেটা আমি ভালো করেই জানি!”বলেই দোঁড়ে চলে যেতে নিলে সৌহার্দ্য নাক মুখ কুঁচকে একটা কুশন ছুঁড়ে মারলো, বিরবির করে বলল, ইডিয়েট!
সেদিনের পর ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে একটা মাস ঝরে গেল। এই এক মাসে সম্পর্কের মানচিত্রটাই যেন বদলে গেছে। সাহানের কাছ থেকে সৌহার্দ্যের সেই পাগলামির কথাগুলো শোনার পর থেকে রিদির মনের ভেতরটা বিষে নীল হয়ে গেছে। তার কাছে সৌহার্দ্যের এই হাহাকার, এই আর্তনাদ—সবই যেন সুনিপুণ এক নাটক!
রিদি নিজের মনেই ভাবে, “যে মানুষটা সামনে থাকলে অবহেলার দগদগে ক্ষতে আমাকে জর্জরিত করে, সে আবার কিসের জন্য কেঁদে মরে? এটাই কি ভালোবাসা? না, এটা কেবলই এক ধরনের অদ্ভুত পাগলামি।”
এই এক মাস রিদি যেন সৌহার্দ্যের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেছে। এড়িয়ে চলা তো অনেক দূরের কথা, সে সৌহার্দ্যের দিকে চোখ তুলেও তাকায় না। ক্লাসে সৌহার্দ্য কতবার যে তাকে খোঁচার সুরে কিছু বলার চেষ্টা করেছে, তার ইয়ত্তা নেই—কিন্তু রিদি যেন এক কঠিন দেয়ালে নিজেকে বন্দি করে নিয়েছে। কোনো শব্দ খরচ করে না সে। পড়ার প্রয়োজনে যখনই সৌহার্দ্য কিছু জিজ্ঞেস করে, রিদি মাথা নিচু করে খুব সংক্ষেপে, যান্ত্রিক স্বরে উত্তর দিয়ে দেয়। তার এই নিস্পৃহতা সৌহার্দ্যকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে মারছে।
সৌহার্দ্য মরিয়া, কিন্তু রিদির এই নীরবতা তার সব অস্ত্র ভোঁতা করে দিচ্ছে। বার বার কথা বলতে চেয়ে সৌহার্দ্য ব্যার্থ হয়ছে!
ক্লাস শেষ হওয়ার পর করিডোরের নির্জনতায় রিদির হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে গেল অপ্রত্যাশিত ঘটনাটা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজোড়া বলিষ্ঠ, শক্তপোক্ত হাত তাকে জাপটে ধরে হ্যাঁচকা টানে নিয়ে গেল পাশের অন্ধকারাচ্ছন্ন ফাঁকা ক্লাসরুমটিতে। মুহূর্তের মধ্যে রিদির পিঠ দেয়ালে আছড়ে পড়ল। অজানা আশঙ্কায় তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। দমবন্ধ করা অন্ধকারে রিদির মনে হলো, আজ নিশ্চয়ই কোনো সর্বনাশ হতে যাচ্ছে। মুখটা শক্ত করে চেপে ধরায় আর্তনাদটুকুও গলার কাছে আটকে যাচ্ছে।
রিদির কাঁপুনির তীব্রতা টের পেয়ে সৌহার্দ্য একটু এগিয়ে এলো। রিদির কানের কাছে উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে সে ফিসফিস করে বলল, “ডোন্ট প্যানিক জান,!
সৌহার্দ্যের কণ্ঠে সেই পরিচিত পৌরুষের ভারী সুর। হাতটা সরিয়ে নিতেই রিদি একটু আশ্বস্ত হলো, কিন্তু পরক্ষণেই সৌহার্দ্যের মুখে ‘জান’ সম্বোধন শুনে তার বুকের ভেতরটা দুলে উঠল। অন্ধকারে সৌহার্দ্যের মুখটা অস্পষ্ট, শুধু তার ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এই মানুষটা তাকে ‘জান’ বলে ডাকছে? বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল রিদির। তার ভাবনার ঘোর কাটার আগেই সৌহার্দ্য রিদির কোমর জড়িয়ে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিল। রিদির মুখের কাছে মুখ নিয়ে শীতল, বিষাদমাখা কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বলল, ” ইগনোর করছো কেন?কষ্ট দিয়ে কি শান্তি পাও, হুম?”
সৌহার্দ্যের আজকের কণ্ঠে কোনো আগ্নেয়গিরির মতো রাগ নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত গভীরতা, যা রিদির স্নায়ুগুলোকে আরও উসকে দিচ্ছে। রিদি নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে তেঁতে উঠল, “ছাড়ুন আমায়, অসভ্য লোক! আমি কেন আপনাকে কষ্ট দিতে যাবো? এমনিতে কিছুদিন পর আমাদের ডিভো…”
পুরো কথাটা মুখ দিয়ে বের হতে পারল না। তার আগেই সৌহার্দ্য ক্ষিপ্ত হয়ে রিদির ঘাড়ের নরম চামড়ায় নিজের দাঁত বসিয়ে দিল। যন্ত্রণায় রিদি আর্তনাদ করে উঠতে চাইলে সৌহার্দ্য সেই কামড়ের জায়গায় আলতো করে চুমু খেয়ে শীতল গলায় বলল, “উহু, হার্ট এমন বাজে শব্দ করো না। তাহলে আমার অন্য কিছু করতে ইচ্ছে হবে, আর এখানে সেটা সম্ভব না। বাড়ি চলো… দেন হবে!”
কথাটা বলেই সে রিদির দিকে মুখ এগিয়ে নিতেই রিদি ঝাড়া দিয়ে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করল। দূরে সরে গিয়ে রাগে ফেটে পড়ে চিৎকার করে উঠল, “খবরদার! একদম আমাকে ছুবেন না। কোনো অধিকার নেই আপনার। কী পেয়েছেন আমাকে? যখন যা খুশি করবেন আর আমি মেনে নেবো? একদম না! আমি আপনার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখবো না। আর হঠাৎ হঠাৎ এসব নেকামী করতে আসবেন না!”
সৌহার্দ্য রিদির এই জেদটুকু যেন পাত্তাই দিল না। সে শিকারি বাঘের মতো রিদির আরও কাছে এগিয়ে এলো। নিজের নাক দিয়ে রিদির নাকের ডগায় আলতো করে ঘষটে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “বোচা নাক! এই পুঁচকে শরীরের মধ্যে এত রাগ জমিয়ে রাখো কীভাবে, বলো তো?”
সৌহার্দ্য যেই না আরও একটু এগিয়ে আসতে গেল, রিদি যেন আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠে চিৎকার করে বলল, “অসভ্য লোক! আর এক পা আগালে কিন্তু আমি চেঁচিয়ে লোক জড়ো করবো! ছাড়ুন, যেতে দিন আমাকে!”
সৌহার্দ্য যেন কোনো কিছুতেই দমবার পাত্র নয়। ঘোর লাগানো কণ্ঠে সে বলল, “ওকে…” বলেই এগিয়ে আসতে নিলো। ঠিক সেই মুহূর্তে রিদি সত্যি সত্যি চিৎকার করে উঠল। সৌহার্দ্য এমনটা আশা করেনি। রিদির এই দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তে সে চমকে গিয়ে দ্রুত হাত বাড়িয়ে রিদির মুখ চেপে ধরল। সে ভাবতেও পারেনি তার বলদ বউ নিজের ইজ্জতের তোয়াক্কা না করে এমন বোকামি করবে। এই বদ্ধ ক্লাসরুমে কেও তাদের এমন অবস্থায় দেখে ফেলা মানেই রিদির জন্য বিপদ—সৌহার্দ্য সেটা বুঝতে পারলেও তার এই অবাধ্য বউটি যে তাকে জব্দ করার জন্য এত এমন করবে, তা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।
রিদির চিৎকার থামানোর চেষ্টায় সৌহার্দ্যের মুখ চেপে ধরায় কোনো লাভ হলো না। ক্লাসরুমের বাইরে করিডোরে ততক্ষণে ছাত্রছাত্রীদের পায়ের আওয়াজ আর অস্পষ্ট সোরগোল শোনা যাচ্ছে। সৌহার্দ্য রাগে-বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত করে রিদির দিকে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বলল, “এটা কী করলে, স্টুপিড?
রিদি ভয়ে কুঁকড়ে গেল। রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সে যে কত বড় বোকামি করেছে, সেটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। নিজের অসহায়ত্ব আর লজ্জা চেপে ধরে সে কাঁপা গলায় বলল, “আমার… আমার কি দোষ? আপনিই তো এমন করছিলেন যে…” লজ্জায় তার বাকি কথা আর মুখ দিয়ে বের হলো না।
সৌহার্দ্যের চোখেমুখে আগুনের হল্কা। সে রিদির দিকে তাকিয়ে তিক্ত স্বরে বলল, “ঠিক আছে, আজ দুজনকেই একসাথে কট খাবো! আই হ্যাভ নো প্রবলেম। আমার এসবের অভিজ্ঞতা তুমি আগেই করিয়ে রেখেছ!”
বলেই সে যখন রাগে দরজা খুলতে হাত বাড়াল, রিদি আতঙ্কিত হয়ে তার হাত চেপে ধরল। ভয়ে আমতা আমতা করে মিনতি করে বলল, “প্লিজ… এমনটা করবেন না। আমি আর জীবনে আপনাকে কোনোভাবে কট খাওয়াবো না, সত্যি বলছি! এবারের মতো আমাকে বাঁচিয়ে দিন, প্লিজ!”
দরজায় এখন ছাত্রছাত্রীদের ধুমধাম ধাক্কা আর শোরগোল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সৌহার্দ্য এক মুহূর্ত ভাবল, তারপর দ্রুত পকেট থেকে ফোন বের করল। রিদিকে রুমের এক কোণায় আড়ালে দাঁড় করিয়ে দিয়ে, নিজের চেহারায় সেই পরিচিত গম্ভীর মুখোশটা পরে দরজাটা খুলল সে।
বাইরে থাকা ছাত্রছাত্রীদের ভিড় তাকে এ অবস্থায় দেখে থমকে গেল। এক ছেলে তো ভয়ে থতমত খেয়ে বলেই ফেলল, “স্যার… আপনি?”
সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে তার সেই চিরচেনা কর্কশ আর গম্ভীর কণ্ঠে গর্জে উঠল, “কী চাই এখানে?”
ছেলেটা ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল, “স্যার, ভেতর থেকে একটা মেয়ের চিৎকারের শব্দ পেলাম তো, তাই…” ছেলেটা ক্লাসরুমের ভেতরে উঁকি মারার চেষ্টা করতেই সৌহার্দ্য তার মাথায় আলতো করে একটা ধাক্কা দিয়ে বিরক্ত মুখে ফোনের স্ক্রিনটা ঘুরিয়ে ধরল। ফোনের পর্দায় একটা মুভির ক্লিপ চলছে। সৌহার্দ্য ঝাঝালো গলায় বলল, “আমি মুভি দেখছিলাম। এনি প্রবলেম?”
সৌহার্দ্যের মুখে এই অজুহাত কারো খুব একটা হজম হলো না। এই রাগী আর গম্ভীর স্যার অন্ধকার ক্লাসরুমে দরজা বন্ধ করে একা একা মুভি দেখছেন—এটা কল্পনা করাও তাদের জন্য দুঃসাধ্য। কিন্তু স্যারের রাগী চেহারা দেখে কারো আর পাল্টা প্রশ্ন করার সাহস হলো না।
ঠিক সেই ভিড়ের মধ্যেই ছিল সায়েম। সে রিদিকে খুঁজতে খুঁজতে এদিকেই এসেছিল। এতক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে সে সব লক্ষ্য করছিল। সায়েমের মনে গভীর সন্দেহ দানা বেঁধেছে; তার কেন জানি দৃঢ় বিশ্বাস, রিদি ভেতরেই আছে। সায়েমের খুব ইচ্ছে করছিল সৌহার্দ্যকে একবার কট খাইয়ে এতদিন জ্বালানোর প্রতিশোধ নিতে, কিন্তু উপায় নেই! এই খাটাশকে ফাঁসাতে গেলে যে রিদিও ফেঁসে যাবে। সায়েম মনের দুঃখে দাঁত চিপে বলল, ‘খাটাসটা কে আজ কট দিতে পারলে শান্তি পেতাম!
ঠিক তখনই সৌহার্দ্যের নজর পড়ল সায়েমের ওপর। চোখের ইশারায় সে সায়েমকে কিছু একটা শাসিয়ে দিল। সায়েম সব বুঝে করেও না বোঝার ভান করে দাঁড়িয়ে রইল, মুখে একটা নিরীহ গোবেচারা হাসি ফুটিয়ে মনে মনে গালি দিল, খাটাশ, এখন বোঝ কেমন লাগে!’
এদিকে সুজন করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় ভিড় দেখে এগিয়ে এল। সামনে থমথমে মুখে সৌহার্দ্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে পরিস্থিতিটা আঁচ করতে পারল। সৌহার্দ্য তাকেও চোখের ইশারায় কিছু একটা ইঙ্গিত করতেই, সুজন দক্ষ হাতে ভিড় সামলে ছাত্রছাত্রীদের সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল।
সবাই চলে যাওয়ার পর করিডোর আবার নিস্তব্ধ হয়ে এল। সৌহার্দ্যের গম্ভীর ছায়াটা রিদির ওপর এসে পড়ল। রিদি তখনও দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তার বুকের ধড়ফড়ানি তখনও থামেনি। সৌহার্দ্য ধীর পায়ে রিদির দিকে এগিয়ে এলো। তারপর নিজের এক হাত দিয়ে দেওয়াল আটকে রিদিকে পুরো নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে রিদির মুখের কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল, “কী ম্যাডাম, আর চেঁচাবেন?”
এতক্ষণ ভয়ের চোটে রিদি গুটিয়ে ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে বুঝতেই তার ভেতরের চাপা রাগ আর জেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সৌহার্দ্য তখন বিজয়ের হাসিতে বিভোর, ঠিক সেই সুযোগটাই নিল রিদি। সৌহার্দ্য কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিদি ঝটকা মেরে সৌহার্দ্যের হাতে জোরে একটা কামড় বসিয়ে দিল!
যন্ত্রণায় চোখ-মুখ কুঁচকে সৌহার্দ্য দ্রুত হাতটা সরিয়ে নিতে,সেই এক সেকেন্ডের সুযোগেই রিদি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে করিডোর দিয়ে দিল দৌড়। সৌহার্দ্য সামলে ওঠার আগেই রিদি যেন হাওয়া হয়ে গেল!
শূন্য করিডোরের দিকে তাকিয়ে সৌহার্দ্য রাগে-বিরক্তিতে হাতটা ডলতে ডলতে বিরবির করে বলে উঠল, “জংগি বিড়াল!”
শিকদার বাড়িতে রিভার আসার আজ এক সপ্তাহ পূর্ণ হলো। রিদির কথা মনে পড়ছে—এই অছিলায় ভাইকে অনেক কান্নাকাটি করে সে শিকদার বাড়িতে আস্তানা গেড়েছে। কিন্তু রিভার আসার আসল উদ্দেশ্য রিদি নয়, শাহাবীর। সেদিন শপিংমলে শাহাবীরের সেই ব্যক্তিত্ব আর অ্যাটিটিউড দেখে রিভা একেবারে ঘায়েল। এরপর কত খুঁজেছে, কিন্তু শাহাবীরের নাগাল পায়নি। যখন হতাশ হয়ে প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিল, ঠিক তখনই একদিন রিদির সঙ্গে দেখা করতে কলেজে গিয়ে শাহাবীরকে দেখে তার চোখ চড়কগাছ! রিদির মুখেই জানল, শাহাবীর সম্পর্কে তার ফুফাতো ভাই। এরপর তো আর পায় কে! অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, রিভা সৌহার্দ্যকে কোনোমতে রাজি করিয়ে তবেই সে শিকদার বাড়িতে পা রেখেছে।
কলেজ থেকে ফিরে রিদি বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছে। আর গত এক ঘণ্টা ধরে রিভা তার পাশে বসে শাহাবীরের বিরুদ্ধে নালিশের ঝুলি খুলে বসেছে। রিদি চুপচাপ শুনছে, কোনো উত্তর করছে না। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে রিভা এবার রাগে-দুঃখে রিদিকে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল, “ভাবি! কোনো কথা বলছো না কেন? তোমার ভাই সব সময় আমাকে কেন এভাবে এড়িয়ে চলে, বল তো? আমি কি খুব ছোট? এই তো কিছুদিন পরেই আঠারো বছর হয়ে যাবে। বলো তো, আমার কি প্রেম করার বয়স হয়নি?”
রিদি যেন পাথরের মতো জমে গেল। রিভার এই নির্লজ্জ প্রশ্ন শুনে রিদির মাথার ভেতরটা রি রি করে উঠল। মনে মনে ভাবল, ‘যেমন ভাই, তেমন বোন! ছিঃ, আমাদের ভাই বোন দুটোর কপাল এই বেহায়া দুটোর সাথেই কেন জুড়তে হলো!’
তবুও নিজের বিরক্তি লুকিয়ে মুখে একটা কৃত্রিম হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে রিদি শান্ত গলায় বলল, “হুম, এখন কী করব বলো? ভাইয়া তো একটু বেশি গম্ভীর! তুমি মন খারাপ করো না, আমার লক্ষ্মী বোন।”
বলেই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে রিদি ঝটপট বাথরুমের দিকে পা বাড়াল। না হলে এই মেয়ের বকবকানি আর প্রশ্নের বাণে আজ তার মাথাটাই বিগড়ে যাবে!
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর শহরের এক অভিজাত ক্লাবের নির্জন কোণে বসে আছে সৌহার্দ্য, সাথে সুজন আর ফারিস। সৌহার্দ্যর আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেটের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। একটার পর একটা সিগারেট শেষ করে চলেছে সে। এখনকার এই মত্ত, বিপর্যস্ত সৌহার্দ্যকে দেখে কেউ বিশ্বাসই করবে না যে সে একজন নামকরা কার্ডিওলজিস্ট। তার এই এক অদ্ভুত বদভ্যাস—যখনই প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকে, সিগারেটের আস্ত প্যাকেটটাই যেন তার ফুসফুসে ছাই হয়ে মিশে যায়। অথচ স্বাভাবিক দিনে তিন-চারটের বেশি সে ছোঁয় না।
ফারিস আর সুজন বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে আছে। ফারিস একসময় আর নিজেকে সামলাতে না পেরে ফেটে পড়ল, “না মানা বউকে নিয়ে ফাঁকা ক্লাসরুমে কট খেয়ে আসিস, আবার মুখে বলিস ‘বউ মানি না’, আর টেনশনে ধোঁয়ায় আকাশ অন্ধকার করছিস! তুই আসলে চাসটা কী, বল তো?”
সুজন বাঁকা হেসে মশকরা করল, “আমার তো মনে হয় ফারিস, তোর কথাই সত্যি। শালা, ওর সমস্যা আছে! কোনো বড় ডাক্তার দেখিয়ে নেওয়া দরকার!”
সৌহার্দ্যর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। বিরক্তি আর রাগে কপালে ভাঁজ ফেলে সে উঠে দাঁড়াল। ফারিসের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলল, “আপাতত তোদের দুটাকে পিটিয়ে সোজা করতে ইচ্ছে করছে। খাওয়ার ইচ্ছে না থাকলে মুখটা দয়া করে বন্ধ রাখ।” বলেই সে ওদের ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে গেল।
ক্লাবের আবছা আলোয় সে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি হাসিখুশি মেয়ের ছবি। সেই ছবির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সে। তারপর আপনমনেই বিড়বিড় করে উঠল, “ভালোবাসা শব্দটা হয়তো তোমাকে বোঝানোর জন্য যথেষ্ট নয়; তুমি সৌহার্দ্য চৌধুরীর সেই আসক্তি, যে আসক্তি জন্ম পেরিয়েও থেকে যায়, মাই হার্ট।”
রিভা হেলতে-দুলতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল, ঠিক তখনই পা হড়কে সে নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে এক জোড়া শক্ত হাত তার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে সামলে নিল। রিভা তাকিয়ে দেখল, শাহাবীর তাকে ধরে রেখেছে।
রিভাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ভ্রু কুঁচকে ধমক দিয়ে শাহাবীর বলল, “সমস্যা কী তোমার? এমন ছাড়া গরুর মতো করো কেন সারাদিন? একটু স্থির হয়ে থাকা যায় না?”
রিভা পলকহীন দৃষ্টিতে শাহাবীরের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে, কিন্তু মুখে দুষ্টুমির হাসি। নিজের ওড়নার কোনাটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে লজ্জা পাওয়ার নিখুঁত ভান করে রিভা বলল, “ইস! এভাবে না দৌড়ালে কি আপনার বুকে গিয়ে পড়তাম? কানা লোক! একটা নাদুস-নুদুস সুন্দরী মেয়ে আপনার পিছু পিছু ঘুরছে, সেটা চোখে পড়ে না, বেয়াই সাহেব?”
শাহাবীর রাগে আর বিরুক্তিতে ফুঁসে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে সে ফিসফিসিয়ে বলল, “থাপ্পড় দিয়ে গাল লাল করে দেব, বেয়াদব! ঠিক বয়সে বিয়ে করলে আমার তোমার মতো একটা মেয়ে থাকত, ইডিয়েট! নাক টিপলে দুধ বের হবে, আর এসেছে প্রেম করতে!”
শাহাবীরের এত কড়া কথাতেও রিভার বিন্দুমাত্র রাগ হলো না, বরং সে যেন তাতে উৎসাহ পেল। সে একটু এগিয়ে গিয়ে শাহাবীরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সুর টেনে গেয়ে উঠল, “এই যে বেয়াইসাব, ভাব নিয়েন না! এত সুন্দরী একটা বেয়াইনকে দেখেও দেখেন না?”
শাহাবীর আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। রাগে-বিরক্তিতে গজগজ করতে করতে হনহন করে চলে যেতে যেতে পেছন থেকে গর্জে উঠল, “নির্লজ্জ, বেহায়া, বাল পাকনা মেয়ে কোথাকার!”
রাত প্রায় দুটো। শিকদার বাড়ির সামনে পার্ক করা গাড়ির সিটে শরীর এলিয়ে বসে আছে সৌহার্দ্য। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে সে তার অবাধ্য বউটাকে অনবরত কল দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু রিদি ফোন ধরছে না। সৌহার্দ্য গাড়ি থেকে নামতে যাবে তখনই তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ‘প্যারোট’ নামটা।
সৌহার্দ্য ঠোঁট কামড়ে একটু হাসল। ফোনটা কানে লাগাতেই ওপাশ থেকে রিদির ঘুমজড়ানো, বিরক্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “অসভ্য ডাক্তার, এত রাতে বিরক্ত করছেন কেন?
সৌহার্দ্যর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। রাগী গলায় ঝেড়ে বলল, “স্টুপিড, নিচে আসো! আমি ওয়েট করছি। কাম ডাউন ইন ফাইভ মিনিটস!”
রিদি যেন আগুনের ওপর ঘি ঢালল। সে আরো তিনগুণ রাগে গর্জে উঠল, “অসভ্য লোক! আপনি ওখানে দাঁড়াতে দাঁড়াতে শহীদ হয়ে যান, আমি যাব না!” বলেই ‘ঠাস’ করে ফোনটা কেটে দিয়ে আবার ঘুমে তলিয়ে গেল।
ফোনটা কেটে যেতেই সৌহার্দ্য বিড়বিড় করে উঠল, “এই জন্যই নিজের দুর্বলতা কাউকে প্রকাশ করতে নেই। দেড় ব্যাটারিটা যেই বুঝল আমি দুর্বল, অমনি নাকানিচুবানি খাওয়ানো শুরু করে দিল!”
বলেই গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি গেটের দিকে এগিয়ে গেল। দারোয়ানের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। দারোয়ান প্রথমে নিতে চায়নি, কিন্তু রিদির এই অদ্ভুত ‘জামাইবাবুর’ পাগলামি সে আগেই দেখেছে; এই জেদি ছেলেকে আটকানোর ক্ষমতা কার আছে?
রিভা এসে দরজা খুলে দিতেই সৌহার্দ্য কোনো ভণিতা না করে রিদির রুমটা জেনে নিল। ঝড়ের গতিতে সোজা গিয়ে ঢুকে পড়ল রিদির ঘরে। রুমের ভেতর ডিম লাইটের নীলচে আলোয় রিদির মুখটা অপূর্ব দেখাচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো এক ঘুমন্ত পরী। সৌহার্দ্য থমকে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর এক পা এক পা করে বিছানার কাছে এগিয়ে গিয়ে পাশে বসল।
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২০
রিদির মুখের ওপর ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো আলতো হাতে আলগোছে সরিয়ে দিয়ে, ঝুঁকে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “মানি না তোমাকে আমার বউ, তবুও তোমার প্রতিটি অস্থির নিঃশ্বাস, প্রতিটি ছটফটানি এই সৌহার্দ্য চৌধুরীর নামেই হবে। এই ছোট্ট ‘সত্তা’ একদিন এমনভাবে আমার বুকের স্পন্দনের সঙ্গে মিশে যাবে, যে তোমাকে আমার থেকে আলাদা করা অসম্ভব হয়ে যাবে।”
বলেই সৌহার্দ্য কোনো দিকে না তাকিয়ে রিদিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। এরপর যেভাবে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই বেরিয়ে গেল…..
