অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৩
রিদিতা চৌধুরী
সৌহার্দ্যের চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি যেন ধারালো কোনো অস্ত্রের মতো রিদির দিকে তাক করা। ঘরের থমথমে নীরবতা এতই গাঢ় যে, নিঃশ্বাসের শব্দও যেন কানে বাজছে। রিদির বুকের কাছে পরম মমতায় লেপ্টে থাকা ছোট্ট বিড়ালছানাটি সৌহার্দ্যের সেই অগ্নিশর্মা দৃষ্টির ঝাপটা সহ্য করতে না পেরে ভীত স্বরে মিউমিউ করে উঠছে, আর নিরাপত্তার খোঁজে রিদির বুকের উষ্ণতায় আরও বেশি করে সেঁধিয়ে যাচ্ছে।
ঘরের এক কোণে বসে পুরো দৃশ্যটা উপভোগ করছিল ফারিস। তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই বাঁকা, রহস্যময় হাসি সৌহার্দ্যের রক্তচাপ যেন এক নিমেষে তিনগুণ বাড়িয়ে দিল। রিদির ওপর থেকে নজর সরিয়ে সৌহার্দ্যের জ্বলন্ত দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ফারিসের ওপর। নিজের রাগ সামলাতে না পেরে সৌহার্দ্য ক্ষিপ্ত হয়ে ফারিসের দিকে তেড়ে গেল, ফারিস এক মুহূর্ত দেরি না করে বিদ্যুৎগতিতে দৌড়ে গিয়ে শাহেদা চৌধুরীর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
শাহেদা চৌধুরীর আড়ালে দাঁড়িয়ে, কপট বিরক্তিতে মুখ ভেংচে ফারিস বলল, “তুই অকৃতজ্ঞের মতো এমন করছিস কেন? আমি তো তোর উপকারই করলাম! নিজের তো আর বাচ্চা পয়দা করতে পারবি না, তাই ফুফিকে দাদি বানানোর জন্য একদম রেডিমেড বাচ্চা এনে দিলাম!”
কথাটা বলেই সে শাহেদা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমিভরা হাসিতে জিজ্ঞেস করল, “বলো ফুফু, একদম ঠিক কথা বলছি না?”
শাহেদা চৌধুরী ছেলের উত্তপ্ত চেহারার দিকে একবার তাকালেন। সৌহার্দ্যের চোখেমুখে এখন আগ্নেয়গিরির লাভা খেলা করছে, তা বুঝতে তাঁর বাকি রইল না। তবুও পরিস্থিতি হালকা করার বদলে, সুযোগ বুঝে খোঁচা দিতে ছাড়লেন না তিনি। আড়চোখে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে কিছুটা উদাসীন ভঙ্গি করে বললেন, “কপালে যখন দাদি হওয়ার ভাগ্যই নেই, তখন বিড়ালের বাচ্চার কাছ থেকেই নাহয় দাদি ডাকটা শুনলাম! এইটুকু সান্ত্বনাতেই মনটা জুড়িয়ে নিই।”
মায়ের মুখে এমন কথা শুনে সৌহার্দ্যের বিরক্তি যেন এক নিমেষেই চরমে পৌঁছাল। ফারিসের দিকে একবার অগ্নিশর্মা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে উঠল, “ইডিয়ট!”
এরপর আর কোনো দিকে না তাকিয়েই সে গটগট করে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। কিন্তু দু-তিন কদম যেতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে রিদির দিকে ঘুরল। গম্ভীর, অথচ গমগমে স্বরে নির্দেশ দেওয়ার মতো করে বলল, “রুমে এসো, সুইটহার্ট। তোমার শাশুড়িকে দাদি বানানোর ব্যবস্থা করতে হবে।”
কথাটা বলেই সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে দ্রুত পায়ে ওপরে উঠে গেল। তার এই অকপট মন্তব্যে ঘরের আবহাওয়া যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল।
ছেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সারহান চৌধুরী বিরক্তিতে মুখ ঝামটে উঠলেন, নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বললেন, “একেবারে নির্লজ্জ বেয়াদব!”
শাহেদা চৌধুরীও ততক্ষণে বেশ অপ্রস্তুত। ছেলের মুখে লাগামহীন এই কথা শুনে লজ্জায় ওনার কান-গলা লাল হয়ে উঠেছে। সৌহার্দ্য যে কতটা বেপরোয়া আর মুখে যা আসে তাই বলে দিতে পারে, তা তো ওনার অজানা নয়!
রিদির লজ্জা লাগলেও এখন ব্যাপারটা অনেকটা গা-সওয়া হয়ে গেছে। এই মানুষটাকে বলে যে কিছু হবে না, সেটা সে ভালো করেই জানে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিদি মিকিকে আলতো করে মেঝেতে নামিয়ে রাখল, তারপর ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
সেখানে পৃথা আগে থেকেই দুপুরের খাবারের আয়োজন গোছাচ্ছিল। রিদিকে দেখেই সে দুষ্টুমিভরা হাসিতে একটা খোঁচা দিয়ে বলল, “এখানে কী চাই তোর? যা, আমাকে খালা বানানোর প্রসেসিং শুরু কর গিয়ে! স্যার ওয়েট করছে, বেবি!”
রিদি বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে বলল, “আজাইরা বকিস না তো! দে, আমি খাবারগুলো টেবিলে গুছিয়ে দিই। এমনিতেই অনেক লেট হয়ে গেছে, সবাই বসে আছে।”
অহেতুক তর্কে না জড়িয়ে আমেনা খালার সহযোগিতায় রিদি দ্রুত খাবারগুলো টেবিলে সাজিয়ে ফেলল। সব গুছিয়ে সে ওপরে পা বাড়াল, রুমের উদ্দেশ্যে—সৌহার্দ্যকে ডেকে আনতে।
রিদি রুমে ঢুকে দেখল পুরো ঘর ফাঁকা। বিছানার ওপর পাঞ্জাবিটা অগোছালোভাবে পড়ে আছে। বাথরুম থেকে পানির ঝনঝন শব্দ ভেসে আসছে। রিদি কিছুটা বিভ্রান্ত হলো; এই লোকটা তো নামাজে যাওয়ার আগেই গোসল সেরে গিয়েছিল, আবার এখন গোসলের কী দরকার? নিচে সবাই খাবারের টেবিলে অপেক্ষায়, আর তিনি এখানে সময় নষ্ট করছেন! রিদি বিরক্তি নিয়ে পাঞ্জাবিটা গুছিয়ে বেলকনিতে মেলে দিল, তারপর বাথরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
দরজায় হালকা টোকা দিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, “আপনি না সকালে গোসল করে গেলেন? এখন আবার কিসের গোসল করছেন? সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে, তাড়াতাড়ি বের হন তো!”
রিদির কণ্ঠস্বর কানে যেতেই সৌহার্দ্যের ভেতরে জমে থাকা রাগটা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। রিদিকে ডাকার পরও না আসায় নিজের মাথা ঠান্ডা করতে সে এতক্ষণ হিমশীতল পানিতে ভিজেছিল। রাগের মাথায় তোয়ালেটা কোনোমতে কোমরে জড়িয়ে সে সটাসট বাথরুমের দরজা খুলে দিল। জ্বলন্ত চোখে রিদির দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে বলল, “প্রয়োজনের গোসল করতে পারছি না বলে সারাদিন অপ্রয়োজনীয় গোসল করছি! তোমাকে রুমে আসতে বলিনি? আমার কোনো কথা শুনবে না বলে ঠিক করেছো তুমি? অবাধ্যতা আমার পছন্দ না জেনেও অবাধ্য হও কেন?”
রিদি সৌহার্দ্যের এমন অহেতুক রাগ দেখে একটু বিরক্ত হলো। দুপুরবেলা সবার খাওয়ার সময়ও রুমে এসে বসে থাকবে, ব্যাপারটাই ভালো দেখায় না! রিদি রাগে বিরক্ত হয়ে বলল, “বুড়ো মানুষের মতো সারাদিন এত খিটখিট করেন কেন? আপনার এই সব স্বভাব যাবে না কখনো, পেঁচা লোক?”
সৌহার্দ্যের রাগ সামলাতে না পেরে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “স্টুপিড, আউট!”
রিদি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। রাগ আর একরাশ বিরক্তি তার সমস্ত বিচারবুদ্ধি ছাপিয়ে গেছে। কোনো কিছু চিন্তা না করেই সে রাগের মাথায় সজোরে সৌহার্দ্যের কোমরে জড়ানো টাওয়ালটা ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। মুহূর্তের মধ্যেই টাওয়ালটা খুলে নিচে পড়ে গেল। এমন অদ্ভুত ও অভাবনীয় কাণ্ডে সৌহার্দ্য পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল, তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দই বের হলো না।
রিদি নিজের কাণ্ডে নিজেই কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে আসলে কী করে ফেলল! লজ্জায় আর বিস্ময়ে তার মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। কাঁচুমাচু হয়ে অপরাধীর মতো কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই তার দৃষ্টি নিচের দিকে পড়ল। পরক্ষণেই ‘আহ্’ করে বিকট চিৎকার দিয়ে উঠল রিদি। ছিঃ! লজ্জায় রিদির কান-গাল আগুনের মতো গরম হয়ে উঠল, সে চোখ সরাতে গিয়েও যেন ঘোর কাটছে না।
বউয়ের ওই ফাটা বাঁশের মতো আর্তচিৎকারে সৌহার্দ্যের ঘোর ভাঙল। সে দ্রুত নিচে পড়ে থাকা টাওয়ালটা কোনোমতে কোমরে পেঁচিয়ে নিল। রিদির মুখটা এক হাতে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলল, “বেয়াদব মহিলা, ইজ্জত খেয়ে দিয়ে এখন আহাম্মকের মতো চেঁচাচ্ছ কেন? বাড়ির সবাইকে এক করার জন্য?”
সৌহার্দ্যের কথা শেষ হতে না হতেই ঘরের দরজা ঠেলে হুরমুড় করে ভেতরে ঢুকল ফারিস আর শাহেদা চৌধুরী। তারা ভেবেছিল হয়তো বড় কোনো বিপত্তি ঘটেছে! কিন্তু সামনের দৃশ্য দেখে ফারিস খুক খুক করে কেশে উঠল। শাহেদা চৌধুরী ছেলে আর ছেলের বউকে এত কাছাকাছি এবং এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় দেখে লজ্জায় মুখ ঢেকে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন।
কিন্তু ফারিস নড়ছে না! সে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, যেন বিনা পয়সায় সিনেমা দেখছে। সৌহার্দ্য সেদিকে তাকিয়ে বিরক্তিতে গর্জে উঠল, “হাবার মতো তাকিয়ে আছিস কেন? বের হ, ইডিয়ট?”
ফারিস বাঁকা হেসে যেতে যেতে বলল, “যাচ্ছি যাচ্ছি, কিন্তু খোলামেলা সিনেমাটা সুন্দর ছিল। টাওয়ালটা ভালো করে পরে নে, না হয় ইজ্জত যেটা আছে সেটাও চলে যাবে…”
সৌহার্দ্যের জ্বলন্ত দৃষ্টি দেখে ফারিস আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না, হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রিদি তখনও ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেনি। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে সেই অপ্রীতিকর, অথচ অদ্ভুত এক দৃশ্য। সৌহার্দ্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়েই বুঝে গেল, তার স্ত্রী অপ্রত্যাশিত কিছু দেখে রীতিমতো শকড। সে নিজের নিচের ঠোঁটটা চেপে কিছু একটা ভাবল, তারপর হঠাৎ করেই রিদিকে হ্যাঁচকা টানে বাথরুমের ভেতরে ঢুকিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
রিদি হকচকিত হয়ে সৌহার্দ্যের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল। এমনিতেই যেটা দেখার কথা নয় সেটা দেখে সে লজ্জায় লাল হয়ে আছে, তার ওপর সৌহার্দ্যের এই আকস্মিক কাণ্ড যেন সে কিছুতেই সামলে উঠতে পারছে না। কিন্তু রিদির ছটফটানিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে সৌহার্দ্য তার কোমরটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। এক হাতে শাওয়ারটা খুলে দিতেই ঝরনার মতো পানি ঝরতে শুরু করল তাদের দুজনের ওপর।
পানির ধারায় ভেজা রিদির মুখের দিকে সৌহার্দ্য তাকিয়ে রইল এক ঘোরলাগা দৃষ্টিতে। মেয়েটা চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে আছে, আর তার ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপছে। সাদা পোশাকটা পানিতে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে গিয়ে রিদির লাবণ্যময় ভাঁজগুলোকে অস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে; সেদিকে চোখ পড়তেই সৌহার্দ্যের শরীরের সমস্ত বাঁধ যেন ভেঙে গেল। রিদির ওপর নিজের কামুক দৃষ্টি বুলিয়ে, নেশাক্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে সে বলল, “হট লাগছে বেবি, বাট লালটা একদম মানাচ্ছে না। ওটা আর পরার দরকার নেই, ওকে?”
লজ্জায় রিদির যেন মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। এই মানুষটা তার ভাবনার চেয়েও অনেক বেশি নির্লজ্জ! মেয়েটা কাঁপতে থাকা ঠোঁটে মিনমিনিয়ে কোনো রকম বলল, “দেরি হয়ে যাচ্ছে ডাক্তার সাহেব, সবাই অপেক্ষা করছে!”
সৌহার্দ্যের মন এখন রিদির কথায় নেই। তার চোখে-মুখে ঘোর; মুহূর্তেই রিদির আরও কাছে ঝুঁকে বুকের ওপরের নরম ত্বকে একটা শক্ত কামড় বসিয়ে দিল—যেন নিজের ভেতরকার সমস্ত উন্মাদনা সে এক নিমেষেই উজাড় করে দিতে চায়। ব্যথায় কেঁপে উঠে রিদি অস্ফুট আর্তনাদ করে সৌহার্দ্যের চুলে আঙুল চালিয়ে মুঠো করে ধরল।
সাথে সাথে হুস ফিরল সৌহার্দ্যের। তৎক্ষণাৎ চোখ বন্ধ করে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিদির কাছ থেকে নিজেকে সামান্য সরিয়ে নিল। ঝরনাটা বন্ধ করে দিয়ে রিদির দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বলল, “ফ্রেশ হয়ে নাও, ঠান্ডা লেগে যাবে। আমি তোমার ড্রেস দিয়ে যাচ্ছি।” বলেই সে এক মুহূর্ত দেরি করল না। একটা শুকনো তোয়ালে জড়িয়ে দ্রুত বাথরুম থেকে বেরিয়ে গেল।
সৌহার্দ্য চলে যেতেই রিদি নিজের ভেজা শরীরের দিকে তাকিয়ে লজ্জা আর আবেশে কুঁকড়ে গেল। দুই হাতে নিজের মুখটা ঢেকে নিল সে। রিদি মনে মনে ঠিক করে নিল, আর মাত্র এক সপ্তাহ পরেই সৌহার্দ্যের জন্মদিন। সেদিন সৌহার্দ্যকে বড় একটা সারপ্রাইজ দেবে; সে চায় তাদের একান্ত মুহূর্তগুলো স্বপ্নের মতো করে সাজিয়ে তুলতে!
বিকেল প্রায় পাঁচটা। মার্কেট থেকে কেনাকাটা সেরে সুমি সবে বাইরের রাস্তায় পা রেখেছে, এমন সময় হঠাৎ সামনে এসে পথ আগলে দাঁড়াল কেউ। মাথা তুলে তাকাতেই সুমির বিরক্তির সীমা রইল না—সামনে দাঁড়িয়ে নীল চোখের শাহাবীর। সেদিনের সেই ঘটনার পর থেকে এই লোকটা যেন তার ছায়ার মতো পিছু নিয়েছে। জোগাড় করে ফেলেছে তার ফোন নম্বরও; দিনে তিনবেলা ফোন করে এমনভাবে ধমকায়, যেন সুমি তার ঘরের বউ! শাহাবীরের এই অস্বাভাবিক অধিকারবোধের মাঝেও সুমির মনে অগোচরেই কিছু অনুভূতির জন্ম নিচ্ছে, কিন্তু বাবার ঠিক করে রাখা বিয়ে আর পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে সে নিজেকে পাথর করে রেখেছে। বাবা-মায়ের অবাধ্য হওয়া তার ধাতে নেই।
সুমিকে এমন উদাসীন দেখে শাহাবীর গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ল, “আমাকে এড়িয়ে চলছ কেন, মেয়ে? কোন দিক থেকে আমাকে তোমার রাস্তার কোনো ছেঁচড়া ছেলে মনে হচ্ছে যে এই ধরনের আচরণ করছো? কেন আমাকে তোমার পিছনে পাগলের মতো ঘোরাচ্ছ? আমাকে জোর করতে বাধ্য করো না, মেয়ে—তাহলে ফল তোমার জন্য মোটেও ভালো হবে না!”
সুমি বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “দেখুন, কতবার বলব আমার বিয়ে ঠিক করা? শুধু শুধু নিজের সময় নষ্ট করবেন না। আমি কি আপনাকে আমার পিছে ঘুরতে বলেছি? দয়া করে রাস্তা ছাড়ুন, আমাকে যেতে দিন!”
’বিয়ে ঠিক করা’—কথাটা কানে যেতেই শাহাবীরের রাগ সপ্তম আসমানে উঠে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “তোমাকে কতবার বলছি, এই গান আমার কানের কাছে আর বাজাবে না…”
শাহাবীরের কথা শেষ হওয়ার আগেই এক গম্ভীর পুরুষকণ্ঠের ভারী আওয়াজ ভেসে এল, “কিরে বিস্ফোরণ এক্সপ্রেস, তুই দেখছি আজকাল রাস্তাঘাটে মেয়েদের ডিস্টার্ব করিস? ঘটনা কী? আমি বাবা একজন দায়িত্বশীল এমপি হয়ে আমার এলাকায় এসব বখাটেপনা একদম মেনে নেব না!”
শাহাবীর এমনিতে রাগে ফুটছিল, তার ওপর ফারিসের এই আগমন যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। তিরতিরে মেজাজে দাঁতে দাঁত চেপে সে চিবিয়ে বলল, “তোর কি হাত ধুয়ে আমার পেছনে লাগা ছাড়া কোনো কাজ নাই? যা, আমার চোখের সামনে থেকে!”
ফারিস শাহাবীরের কথায় বিন্দুমাত্র কান দিল না। সুমির দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “এত সুন্দর ফুটফুটে একটা মেয়ে তোর সাথে একদম মানায় না! আর এমনিতে গ্যাংস্টার মানুষের প্রেম মানায় না। কোনোদিন কার গুলিতে টপকে যাস ঠিক নেই!”
সুমি এতক্ষণ দুজনের ঝগড়া শুনছিল। সে ফারিসকে চেনে, এই শহরের এমপি হিসেবে তার ভালোই নামডাক আছে। ফারিসের মুখে ‘গ্যাংস্টার’ শব্দটা শুনে সুমি বিস্ফোরিত চোখে শাহাবীরের দিকে তাকাল। মেয়েটা ভয়ে কেঁপে উঠল; এই লোকটা এত খারাপ—সে তো কল্পনাই করেনি! অথচ এই কয়দিন সে এই লোকটার কথা ভেবেই স্বপ্নের জাল বুনছিল, অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল তার প্রতি। সুমি আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না, এক প্রকার দৌড়ে পালানোর মতোই সেখান থেকে চলে গেল।
সুমি এভাবে চলে যেতেই শাহাবীরের ঘোর কাটল। সে রাগে-বিরক্তিতে ফারিসের দিকে আগুন ঝরানো চোখে তাকিয়ে বলল, “তোর সমস্যা কী বলবি? কী করছিস এটা তুই? মেয়েটাকে ভয় পাইয়ে দিলি? আমার পিছু না লাগলে তোর কি খাওয়া হজম হয় না?”
ফারিস শাহাবীরের কথায় দুই পয়সার গুরুত্ব না দিয়ে চোখে সানগ্লাসটা পরতে পরতে বলল, “সত্যিই ধরেছিস দোস্ত, একদমই হয় না! যতদিন না আমার বউয়ের মুখ থেকে ‘ভালোবাসি’ শুনছি, ততদিন তুই সিঙ্গেল মরবি!” বলেই সে শিস বাজাতে বাজাতে হেলেদুলে নিজের গাড়ির দিকে চলে গেল।
শাহাবীর জ্বলন্ত চোখে ফারিসের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “বেয়াদবের বেয়াদব! এমনিতেই মেয়েটা পাত্তা দিচ্ছে না, তার ওপর এই আগুনটা কেন জ্বালিয়ে দিয়ে গেলি!”
নিজের রাগ আর বিরক্তিটুকু কোনোমতে চেপে শাহাবীরও নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
রাত তখন প্রায় এগারোটা। রুমের আবছা আলোয় সৌহার্দ্য সোফায় বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনে মগ্ন। তার চোখের মণি স্ক্রিনের নীল আলোয় স্থির, যেন বাইরের জগতের সাথে তার কোনো সংযোগ নেই। ঠিক তার পাশেই রিদি—বই হাতে বসে থাকলেও পড়ার দিকে তার মনোযোগ তলানিতে। বইয়ের অক্ষরের চেয়েও তার চোখের দৃষ্টির সবটুকু দখল করে নিয়েছে পাশে বসে থাকা মানুষটি। রিদির মনে হচ্ছে, এই লোকটার পৃথিবীর অর্ধেকটা জুড়ে কেবল ওই ল্যাপটপ।
রিদির অস্থিরতা বাড়ছিল। বইটা সশব্দে পাশে ছুড়ে ফেলে সে এক ঝটকায় সৌহার্দ্যের ল্যাপটপটা সরিয়ে দিল। হঠাৎ কাজে বিঘ্ন ঘটায় সৌহার্দ্য বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে রিদির দিকে তাকাল। কিন্তু রিদি তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে সরাসরি সৌহার্দ্যের কোলে উঠে বসে দুই হাত দিয়ে সৌহার্দ্যের গলা জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে মুখ লুকাল। সৌহার্দ্য একটু অবাকই হলো; কারণ তার স্টুপিড বউ সহজে এভাবে ধরা দেওয়ার মানুষ নয়। নিশ্চিত কোনো মতলব আছে—এটা বুঝতে পেরে সৌহার্দ্য এক হাতে রিদিকে জড়িয়ে ধরে অন্য হাত রিদির গালের ওপর রাখল। চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “প্রবলেম হচ্ছে? কিছু বলবে?”
রিদি সৌহার্দ্যের বুকের সাথে আরেকটু সেঁটে গিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “ঘুম পাচ্ছে, পড়তে ইচ্ছে করছে না। সেই কখন থেকে বসিয়ে রেখেছেন, আমার কোমর ব্যথা করছে।”
সৌহার্দ্যের বুঝতে বাকি রইল না—এই সোহাগের আড়ালে মূলত পড়াশোনা থেকে রেহাই পাওয়ার এক নিখুঁত ফন্দি। সে আর কোনো তর্ক করল না। ঘুমাতে চাইলে ঘুমাক, এই ভেবে সৌহার্দ্য সোফায় আরাম করে হেলান দিয়ে বসল যাতে রিদির সুবিধা হয়। এরপর নিজের এক হাত রিদির টি-শার্ট গলিয়ে কোমরে রেখে আলতো করে মালিশ করে দিতে লাগল।
রিদি একটু কেঁপে উঠতেই সৌহার্দ্য ফিসফিস করে বলল, “অযথা কাঁপাকাঁপি করলে এক্ষুনি যা করতে যাচ্ছি না, তা করে ফেলব।”
তবে রিদির এসবের দিকে আর হুশ নেই। সৌহার্দ্যের বুকে মাথা রাখতেই সে ঘুমিয়ে পড়েছে, ঘুমের মধ্যেই শরীরটা মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। রিদি যে ঘুমিয়ে গেছে তা নিশ্চিত হয়ে সৌহার্দ্য ল্যাপটপটা আবার নিজের সামনে টেনে নিল এবং কাজের দিকে মনোযোগ দিল।
রাত প্রায় দেড়টার কাছাকাছি। রিদি এখনো সৌহার্দ্যের বুকের কাছে খরগোশের বাচ্চার মতো লেপ্টে ঘুমিয়ে আছে। সৌহার্দ্যের কাজ শেষ হতেই সে রিদির দিকে তাকাল। মেয়েটার মুখের ওপর এক অদ্ভুত মায়া—যেন কোনো শান্ত পুতুল। সৌহার্দ্যের মতো একজন কঠিন পুরুষের সবটুকু অহংকার আর কঠোরতা এই শ্যাম বর্ণের মায়ার কাছে আজ হার মেনেছে।
সৌহার্দ্য একটু ঝুঁকে রিদির ফুলকো গালে গভীর এক চুমু খেল। তারপর ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমার এই কঠিন পৃথিবীটা যে তোমার চোখের অতলে এসে থমকে যাবে, তা আগে ভাবিনি। তুমি আমার সবচেয়ে সুন্দর ধ্বংস, হার্ট। তোমার ভালোবাসার কাছেই আমার সবটুকু আত্মসমর্পণ।”
ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎ করেই সৌহার্দ্যের ফোনটা কেঁপে উঠল। তীক্ষ্ণ সেই শব্দে ওর ভাবনার জগতে এক মুহূর্তের ছন্দপতন ঘটল। ভ্রু কুঁচকে, বিরক্তিতে দলা পাকানো দৃষ্টি নিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল সে। নামটা ভেসে উঠতেই চোয়াল শক্ত হয়ে এল তার।
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪২
ফোনটা কানে ঠেকিয়ে ওপাশ থেকে আসা কথাগুলো মন দিয়ে শুনল সৌহার্দ্য। তার কণ্ঠস্বর তখন শীতল, কিন্তু তাতে চাপা আগ্নেয়গির মতো এক অস্থির উত্তেজনা—গম্ভীর স্বরে বলল, “আই’ম অন মাই ওয়ে। ইউ ফলো দেম অ্যান্ড সেন্ড মি দ্য অ্যাড্রেস।”
