Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৪

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৪

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৪
Maha Aarat

ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শব্দ, আর শীতল বাতাস।জানালার পর্দা দূলছে থেমে থেমে।জানালার কাছাকাছি এসে দাঁড়াতেই কনকনে ঠান্ডায় হাত গুটিসুটি মেরে দাঁড়ালো হাফসা।নাহ,খুব বেশি দাঁড়ানো যাচ্ছে না।এরকম বৃষ্টিময় পরিবেশটা একটা আরামের ঘুমের জন্য একেবারে পার্ফেক্ট।এমনিতেই গতরাতে তাঁর ঘুম হয়নি লোকটার পাগলামিতে।কালকের ভ্যাপসা গরমের আবহাওয়া এক বৃষ্টিই যেনো বিদেয় জানালো।শীতের শীতল বাতাসের মতো হিম বাতাস গায়ের লোমকূপ অবধি কাঁপিয়ে তুলছে।
লাঞ্চের পর তিনি ভাইয়ের সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন।এখনো ওখানেই।হাফসা বাতি বন্ধ করে পর্দা ফেলে দেয় জানালায়।কাঁথা গায়ে নিজেকে আপাদমস্তক ঢেকেঢুকে ঘুম দেয়।মাএ কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।

‘বাবার লাইফে মা’য়ের আসাটা ব্যতিক্রমী ছিলো।আমার নানাভাই একদম হুটহাট একজন ভিনদেশীর সাথে মায়ের বিয়ে ঠিক করে ফেলেন।মা রাজি ছিলেন না।এদিকে নানাভাই ও উনার সিদ্ধান্তে অটল।অবশেষে,কাকতালীয় ভাবে একেবারে অন্তিম মুহুর্তে বাবার প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলেন নানাভাই।ভিনদেশীর সাথে বিয়ে ভেঙ্গে যায়।
কিন্তু বাবা যখন মাকে এ বাড়িতে নিয়ে এসছিলেন আয়না শেখ মানে বাবার মা তিনি খুশি ছিলেন না।বাবার কোন ফুপাতো বোনের সাথে উনার মৌখিক বিয়ের কথাবার্তা ঠিক করে রেখেছিলেন আয়না শেখ।এদিকে বাবা হুট করে বিয়ে করায় সব ক্রোধ গিয়ে পড়লো মায়ের ওপর।বাবা যখন বাহিরে চলে যেতেন,মা ঘরে একা থাকতেন।ওই আয়না শেখ,ওই মহিলাই আমার মাকে জ্বালাতন করতেন।মানসিক টর্চার করতে করতে মায়ের ব্রেইনে ধরে গিয়েছিলো।এদিকে এ বিয়েতে নানাভাই তেমন খুশি ছিলেন না তাই মাও মামাবাড়ি যেতেন না।বাবা যে বছর দূবাই যাবেন,সে বছর আমার জন্ম।আমি দূ’মাসের থাকতেই বাবা চলে গেলেন।কথা ছিলো খুব তাড়াতাড়ি ফিরার।কিন্তু আয়না শেখ বাবাকে সবসময় বাঁধা দিতেন।বুঝাতেন,মা খুব ভালো আছেন।তাঁর যত্নে এুটি হচ্ছে না বাবা যেনো নিজের কাজে মনোযোগী হোন।এদিকে দিনের পর দিন মানসিক টর্চার,আর অসুস্থতা মাকে আরো দূর্বল করে দিলো।আমি যখন পৃথিবীতে আসলাম তখনও বাবা আসেননি।আমার ছ’মাস হওয়ার পর এসেছিলেন।এর মাঝে মায়ের সাথে সব রকমের অত্যাচার করতেন আয়না শেখ।মা কখনো তাকে নিয়ে বাবার কাছে অভিযোগ করেননি।
মাহের দীর্ঘশ্বাস ফেলে খানিক চুপ থাকলেন।আরহাম তাকিয়ে দেখলেন, তাঁর কপালের শিরাগুলো ফুলে টগবগ করছে।দাঁতে দাঁত কামড়ে থাকা বুঝিয়ে দিচ্ছে তাঁর দাদূর প্রতি তাঁর একজন্মের রাগ।
‘পরে যখন বাবা আবার প্রবাস গেলেন,ফিরে এলেন দীর্ঘ সময় পর।মা অসুস্থ হয়ে গেলেন ততদিনে।উনি খুব কম কথা বলতেন।কেউ হাজার কিছু বললেও প্রত্যুত্তর করতেন না।ওই মহিলার দেওয়া যন্ত্রণাগুলো মাকে পাথর বানিয়ে দিয়েছিলো।

শেষবার ফিরে এসে বাবা আর প্রবাস গেলেন না।মায়ের পাশে থেকে যত্ন নিতেন।কিন্তু ততদিনে মায়ের সমস্যা বেড়ে গিয়েছিলো।আস্তে আস্তে শর্ট টাইম মেমোরি লস এর পেশেন্ট হয়ে গেলেন তিনি।আমি তখন কিশোর বয়সী।মাকে দেখতাম দীর্ঘ সময় চুপচাপ বসে থাকতেন।সংসারে অমনোযোগী হয়ে যেতেই আয়না শেষ সবসময় বাবার কানে মায়ের নালিশ ঢালতেন।কিন্তু বাবা এসব কানে নিতেন না।যতক্ষণ বাসায় থাকতেন মায়ের কেয়ার করতেন।সেই সময়ে হাফসা আসার খবর।সবাই কত খুশি,কিন্তু মা যেনো সবসময় দূ:শ্চিন্তায় থাকতেন।এভাবেই চলছিলো।আর হাফসার জন্মের পর থেকে মা পুরোপুরি একজন ডিমেনশিয়া’র পেশেন্ট হয়ে গেলেন।বাবাকে প্রায় সময় লুকিয়ে কাঁদতে দেখতাম যখন মা বাবাকেও চিনতে পারতেন না।মায়ের একদম অসুস্থতা দেখত দেখতে হাফসার সাত বছর হয়েছে।হাফসা বুঝতে পারতো না মা যে অসুস্থ।ও সারাদিন মায়ের আশেপাশেই ঘুরঘুর করতো।বাট হুট করে মায়ের মৃত্যু হলো স্টোকে।এরপর থেকে মা’ ডাক হারালাম।অসুস্থ থাকলেও তো মা তো মা’-ই ছিলেন।আমার আফসোস হয় আরহাম,আমি আমার মায়ের সাথে সুন্দর সময় কাটাতে পারিনি।ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি উনার নীরবতা।আমার ছেলেবেলায় আমি সব আনন্দ পেয়েছি মায়ের ভালোবাসা ছাড়া!’
বলতে বলতে মাহেরের কন্ঠস্বর দূর্বল হয়ে এলো।চোখে আঙ্গুল চেপে অশ্রু আড়াল করে নিলেন।আরহাম তাঁর কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘মন খারাপ করো না মাহের।দোয়া করো ফিরদাউসে একসাথে দেখা হবে ইন শা আল্লাহ।’

মাহের বলতে শুরু করলেন হাফসার কথা।
‘বোনটা মাকে ছোট থেকেই অসুস্থ দেখেছে।আর মায়ের মৃত্যুর পর থেকে তো একদম একা একা বড় হয়েছে।আর কয়েক বছর আগেই সেই বীভৎসতা, আরো নিষ্ঠুরতম পরিণতি দিয়ে গেলো।’
মাহের উঠতে উঠতে কথার সমাপ্তি টেনে বললেন, ‘রেস্ট করো।সন্ধ্যার পর কথা হবে।’আরহাম বুঝতে পারছেন মাহের ঠিক নেই।সে তাঁর কষ্ট লুকাতে চাইছে এ মুহুর্তে।আরহামের খুব অসহায় লাগলো নিজেকে।এমন কোনো স্বান্তনা যদি দিতে পারতেন,যাতে মাহেরের কষ্টটা একটু হলেও হালকা হবে!

হাফসার ঘুম যতক্ষণে ভাঙ্গলো বুঝলো তাঁর একদম পাশেই আরহাম।উনার হাতে তার হাত জড়িয়ে আঙ্গুলের আঁকিতে হয়তো তাসবিহ গুনছেন।হাফসাকে নড়তেচড়তে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঘুম ভেঙেছে?’
হাফসা আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো।লাইট জ্বালিয়ে তাকালো জানালায়।বৃষ্টির বেগ বেড়েছে,আশপাশ যেনো অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে।এইরকম পরিবেশ তাঁর ভীষণ ভালো লাগে।
আরহাম তাকিয়ে আছেন তার দিকে।সদ্য ঘুম ছেড়ে উঠা মসৃণ মুখশ্রীতে তাঁর সৌন্দর্য যেনো চিকচিক করছে।খাড়া নাকে জ্বলজ্বল করছে সোনালি ফুল।হিজাবের নিচ থেকে বেরোনো বেবি হেয়ারগুলো যেনো উনার সৌন্দর্যে নজর দিতে বাধ্য করছে।উনার এতো সুন্দর বউটা শুধু শুধু দূরে থাকে।

‘কোথায় যাচ্ছেন?”
হাফসা ইশারায় বুঝালো,খালার কাছে।
‘পরে যাবেন।আসুন বারান্দায় বসি।’
চাদর গায়ে জড়িয়ে আরহামের পিছুপিছু সেও গিয়ে বসলো।এখানে এসে আরহাম নিজেই শুধু কথা বলছেন।তাঁর প্রতিক্রিয়া শূন্য।বাইরে দৃষ্টি রেখে সে চুপচাপ শুনে যাচ্ছে আরহামের আলাপন।আচমকা কিছু মনে হতেই সে জড়তা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলো,ভাইয়াকে একটা মেয়ে পছন্দ করেন।আরহাম সে সম্পর্কে কিছু জানেন কি না।আরহাম জানেন না বলতেই তাঁর মুখে আঁধার নেমে এলো।মেয়েটার পরিচয় কোনোভাবেই পাওয়া যাচ্ছে না।মেয়েটা ভালো হলে,সে ভাইয়াকে কনভিন্স করিয়েই ছাড়বে।

সন্ধ্যার পরপরই লোড শেডিং হয়।গ্রামে এটা বিস্ময়কর কিছু না।বারান্দায় বসে মাহেরের সাথে জরুরী আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন আরহাম।কারেন্ট যেতেই হাফসা মোম জ্বালিয়ে আনে।আরহামের নিজের হাতেও ডকুমেন্টসের পেপার।মাহের ব্যস্ত উনার কাজে।মোমবাতির উজ্জ্বল আলোতে আরহাম চোখ তুলে তাকিয়েই যেনো চমৎকৃত হলেন।হিজাবে বেষ্টিত তাঁর রূপ থেকে যেনো মুক্তো ঝরছিলো।তাঁর সুক্ষ্ম আঁখিদ্বয় ব্যস্ত বাতাসের ঝাপটা থেকে মোমবাতির আলোকে বাঁচানোর চেষ্টায়।আরহাম মোম টা হাতে নিতে নিতে বললেন, ‘মাশাআল্লাহ আপনার সৌন্দর্যে আমারও নজর না লাগুক।’

হাফসা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না।মাহেরের মুচকি হাসি দেখতেই আরহাম লজ্জ্বায় মুখ ঢেকে ফেললেন।উনি এতো বিমোহিত কীভাবে হলেন,যে মাহের সামনে বসা এটা ভুলে গেলেন!
মাহেরের হাসি থামছে না।নীরবতায় তাঁর হাসির শব্দ হালকা শোনা যাচ্ছে।আরহাম একপ্রকার অসহিষ্ণু হয়ে বললেন, ‘আশ্চর্য!উনি আমার ওয়াইফ আমি বলতেই পারি এত হাসির কি?’
মাহের ঠোঁট কামড়ে আস্তে আস্তে হাসিটুকু গিলে ফেললেন।বাইরে শক্ত খোলসে আবৃত নিরামিষ আরহাম যে প্রিয়তমার সামনে এতো রোমান্টিক বুলিও ছুড়তে পারে এটা মাহেরের চিন্তাভাবনায়ও ছিলো না।
ঘরে এসে হাফসা মুখে হাত চেপে বসে রইলো।লোকটা এতো এতো বোকামি করলেন কেন।ভাইয়ার সামনে এখন কীভাবে যাবে সে।কথাটা আলাদা বলা যেতো না!
মোমের আলো বাইরের টেবিলে পড়ছে।এছাড়া ঘর থেকে আসা এক টুকরো আলো ছাড়া সবটাই অন্ধকার।বেকাপ লাইটগুলো ড্যামেজ হওয়ার সময় পেলো না।আচমকা এক টুকরো আলোর উৎস ষষ্ঠইন্দ্রীয়তে জানান দিতেই আরহাম তড়িৎ সামনে তাকালেন।একটা পুরুষ অবয়ব দেখে চট করে উঠে বসলেন।মাহেরও তাকে অনুসরণ করে জিজ্ঞেস করলো, ‘কোথায় যাচ্ছিস?’

‘দাদূর কাছে।খাবারটা দিতে এসছিলাম।’
দাদূ সামনের রুমের জায়নামাজেই বসা।মাহেরও আর কোনো প্রত্যুত্তর করলেন না তবে আরহাম উঠে এসে বললেন, ‘আমাকে দিন।আমি দিয়ে আসছি।’
কোমল কন্ঠ অথচ আরহামের কঠিন দৃষ্টির তীর রিযালকে যেনো ঝলসে দিচ্ছিলো।সে অসম্মতি দিয়েও ভেতরে যেতে চাচ্ছিলো আরহাম তাঁর কলারটা গুছিয়ে দিয়ে শক্তস্বরে বললেন, ‘এটুক হেঁটে আমিও দিয়ে আসতে পারবো।আপনি কেন কষ্ট করবেন?’
‘আমার দাদূর কাছে গেলে আপনার কি সমস্যা?’
‘আমার মানুষের দিকে আপনার দৃষ্টি ভালো নয়।এ ঘরেই তিনি আছেন।এটাই আমার সমস্যা।’
বলে তাঁর হাত থেকে থালাটা নিয়ে আরহাম নিজেই ভেতর ঘরে রেখে এলেন।রিযাল রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আরহামের দিকে ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে বেরিয়ে যেতেই মাহের বললেন, ‘একদম উচিত শিক্ষা হয়েছে।সেল্ফ রেসপেক্ট বলে একটুও যদি কিছু থাকতোও তবে এত অপমানের পরও আমাদের বাড়ির সীমানায় ও পা রাখতো না।’

রাতের খাবারের সময় আরহামকে ডাকতে ঘরে আসতে দেখলো তিনি বেলকনির সোফায় বসে আছেন চুপচাপ।হাফসা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিলো।বারবার কারো নাম্বার ডায়াল করছেন কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ ফোন তুলছে না।খানিক পর কল উঠতেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘মাইমুনা কি ঘুমিয়ে গিয়েছেন?আমার ফোন কেন তুলছেন না?’
ওপাশ থেকে কি আওয়াজ আসলো হাফসা আন্দাজ করতে পারলো না তবে উনার চোখেমুখে দূ:শ্চিন্তা দেখা গেলো।অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীভাবে?কখন?এখন ঠিক আছেন?’
ওপাশের উত্তর শুনে আরহাম ফোন রেখে দিতেই হাফসাকে দেখলেন।হাফসা উনার দুশ্চিন্তার কারন জানতে চাইলে উনি সেটা আড়াল করে মুচকি হেসে বললেন, ‘তেমন কিছু না।”
খাবারের সময়ও তিনি একদম চুপচাপ ছিলেন।ঘুমোনোর আগে হাফসা ঘরে আসতেই বললেন, ‘কাল তো চলে যাচ্ছি।সকাল সকাল বেরোব।’
হাফসা আশ্চর্য হয়ে তাকালো।আরহাম সেটা লক্ষ্য না করে অযু করতে চলে গেলেন।হাফসা বুঝলো না হঠাৎ উনার এমন সিদ্ধান্তের কারন।

ছোটবেলা থেকেই সে নিজেকে জেনে এসেছে একজন সাহসী মেয়ে হিসেবে।তবুও একা বাসায় তাঁর থাকতে ভয় হচ্ছে।ঠিক কীসের ভয়,সে বুঝতে পারছে না।পাশের ফ্ল্যাটেই ফ্যামিলি নিয়ে থাকছেন এক দম্পতি।নিচের ফ্লোরেও জয়েন ফ্যামিলি তবুও তাঁর মনে হচ্ছে, সে একদম একা।যেনো কোনো জনমানবহীন জঙ্গল।পরিবাররে কথাও মনেও পড়ছে এশার।তাঁরা কি তাকে খুঁজছে?খুঁজলেও বুঝবে না কারন সে সিম চেইন্জ করে নিয়েছে।অর্ধেক রাতটা সে পার করে দিয়েছে পায়চারি করতে করতে।বাকি রাতটা কীভাবে কাটবে তাঁর।নিজের বলতে শুধু ফোনটাই তাঁর কাছে আছে।ল্যাপটপটা সাথে আনলে হয়তো অফিশিয়াল কাজের বাহানায় নিজেকে ব্যস্ত রাখা যেতো বাট তাড়াহুড়ো করে সে কেবল নিজের জান’টা আর ফোনটা নিয়েই বেরিয়েছিলো।এ মুহুর্তে তাঁর মনে হচ্ছে, এখন পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্তে নেওয়া প্রত্যেকটা পদক্ষেপ তাঁর ভুল ছিলো।
ভাবতে ভাবতে তাঁর মনে হচ্ছিলো রায়ানের কথা।লোকটাকে যতটুকু নেগেটিভ ভেবেছিলো সে বাস্তবে ঠিক ততটাই অমায়িক।রায়ানের কথা ভাবতে ভাবতে এশা তাঁর লাস্ট কনভারসেশনে নজর বুলালো।যেখানে জমা আছে,লোকটার এক জীবনের গল্পের একপিঠ।সেদিন রায়ানের প্রিয় মানুষের গল্পটা অর্ধেক বলেছিলেন।কোনো কারণে বাকিটা শোনানোর সুযোগ হয়নি বলে টেক্সট করে দিয়েছিলেন।এশা আর পড়েনি।ইচ্ছে হয়নি বা সুযোগ হয়নি।এখন সেটায় নজর বুলালো,

❝যে মেয়েটা আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতো না সে-ই আমাকে চরম ধোঁকা দিলো।একদিন ক্যাম্পাসে দেখা করছিলাম আমরা।সেখানে একজন তাকে প্রপোজ করছিলো।বিষয়টা আমরা খুব ফানি হিসেবে নিয়েছিলাম কারন যেখানে আমরা দূজনই কমিটমেন্টে আছি আর দূজন দূজনকে অসম্ভব ভালোবাসি সেখানে এসব বিষয়ে আমলে নেওয়ার না।আমি ওকে বিলিভ করতাম হান্ড্রেড পার্সেন্ট।কিন্তু ও আমার কাছে আস্তে আস্তে গোপন করে গেলো সব।জানেন,আমি তখন বছরশেষে প্রমোশনের অপেক্ষায় ছিলাম।আর ওর পছন্দের ওই ছেলেটা নতুন জবে জয়েন করেছে।জানিনা,কি পেয়েছে তাঁর মধ্যে যে…।তবে আমি কখনোই ওর হাত পর্যন্ত স্পর্শ করিনি।ছেলে হিসেবে লাজুক টাইপের আমি।কিন্তু ওর দিনেদিনে স্টোরি দেখে বুঝতে পারলাম ছেলেটার সাথে তাঁর সম্পর্কের উন্নতি হচ্ছে।ডিপি’টাই ছিলো দূজনের হাতের।অথচ ও মোটামুটি ধার্মিক পরিবারের মেয়ে।

ওদের কি সুন্দর সম্পর্ক অথচ আমার সারারাত যন্ত্রণাময়।দিন দিন আরো দূর্বল হয়ে যাচ্ছিলাম।আমার আপন বলতে কেউ নেই।না কোনো ফ্রেন্ডসার্কেল,না কোনো ভাইবোন।একা আমিটা সামলাতে বেশ হিমশিম খাচ্ছিলাম তখন এক জুমআ’র দিনে একজন নাইস পার্সনের সাথে দেখা হয়ে যায়।কি অদ্ভুত সুন্দর ছিলেন মানুষটা।এতো দারুণ ছিলো উনার ব্যবহার।উনার কথার মাঝে এমন কিছু ছিলো যা আমার হৃদয় স্পর্শ করতো।তখন থেকে চেষ্টা করলাম আমি আর কখনো হারামে জড়াবো না।ওই আগন্তুকের সাথে সবসময় দেখা হওয়ার সুযোগ নেই,তবে আমি এখনও অপেক্ষা করি।
মোটামুটি গুছিয়ে নিলাম নিজেকে।ওর কোনো কন্টাক্ট রাখলাম না।কোনোকিছুই না।কোনো গিফট ও না।এমনকি আমি কোনোদিন গিয়ে জিজ্ঞেসও করিনি আমার সাথে এমন করার কারন।দিনশেষে আমি খুশি কারন তাঁর দেওয়া কষ্টটাই যথেষ্ঠ ছিলো আমার রবকে খুঁজে পাওয়ার জন্য।আর বাবাও জোর করেছিলেন বিয়ের জন্য।আপনার সাধারণ চলাফেরা আমার ভালো লাগলো।পর্দা মানার চেষ্টা করেন সেটাও এপ্রিসিয়েট করি।তাই আপনাকে নিয়ে আমার কোনো আপত্তি ছিলো না।আমিও চাইছিলাম ভালো থাকতে।বাট এটা বুঝতে দেরি হলো যে চাইলেই ভালো থাকা যায় না!❞
মেসেজটা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়লো এশা।তাঁর মধ্যে তখন আর না ছিলো কোনো ভয়,না অশান্তি।সে শুধু ভাবছিলো একটা কথা, ‘তাঁর দেওয়া কষ্টটাই যথেষ্ঠ ছিলো আমার রবকে খুঁজে পাওয়ার জন্য।’

সকাল সকাল আরহামের চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত শুনে মাহেরও চমকালেন।আরহাম মাহেরের অনুরোধ ফেলে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকলে মাহের বললেন, ‘হাফসা কিছুদিন থেকে যাক।’
‘এখন বাসায় যাই।পরে এসে থাকবেন।’
‘বেশ!’
যতটুকু খুশি নিয়ে এসেছিলো ঠিক ততটুকু মন খারাপ নিয়ে ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিলো সে।বাবার বাড়ি দূইটা দিন থাকার আবদার করা কি বেশীই চাওয়া?তিনিই তো বলেছিলেন,যখন ইচ্ছে যতদিন ইচ্ছে থাকতে।তাহলে এখন বদলে গেলেন?’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৩

অনেকক্ষণ থেকে হাফসার মন খারাপ নোটিশ করছিলেন আরহাম।উঠে এসে বললেন, ‘উমায়ের।এখানে আমি আপনাকে রেখে গিয়ে শান্তি পাবো না।মাহের সবসময় তো আপনার পাশে থাকবে না।’
হাফসা প্রত্যুত্তর করলোই না।বেশ তো,চলে যাবে সে।
আরহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমার টেনশন হবে।রিযাল ছেলেটা আপনার পাশাপাশিই থাকছে।যদি না আপনার কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করে।আপনি তো এখন আমার আমানত তাই না?মন খারাপ করে থাকবেন না।প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যাসন্ড।’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৫