অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৫
Maha Aarat
একাধারে কয়েকদিন মেডিসিন নিতে খামখেয়ালি করাতে গতদিন মাইমুনা হঠাৎ ই অসুস্থ হয়ে পড়েন।হঠাৎ প্রেসার বেড়ে যাওয়া সাথে বমিটিং এর বিষয় আরহামকে অবগত করা হলেও ব্রিদেনে সমস্যার জন্য সারারাত ছটফট করার কথা বলা হয়নি।এসব শুনলে আরহাম নিশ্চিত রাতেই বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তেন।সকাল এগারোটার মধ্যেই বাড়িতে পৌঁছেছেন তাঁরা।লাঞ্চে আরহাম নিজেই মাইমুনাকে খাইয়ে দিচ্ছিলেন রুমে।মেডিসিন খাওয়ানোর পর গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘মাইমুনা,আপনাকে আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারি।এসব পাগলামি কেন করেছেন?আমি সেখানে ছিলাম কিন্তু আপনার কথা সব সময় মনে হয়েছে।আচ্ছা বেশ,আপনাকে রেখে আর কখনো কোথাও যাবো না।কিন্তু অভিমান লুকিয়ে নিজের ক্ষতি করবেন না।নিজেকে কষ্ট দিবেন না। ‘
মাইমুনা অনুতপ্ত ভঙ্গিতে আরহামের হাত জড়িয়ে ধরে বলল,’শাহ।আমি জানি,এসব আমার পাগলামি।আপনি আমার জন্য দোয়া করুন প্লিজ।আমার ইমান যেনো দূর্বল না হয়ে যায়।’
‘যেখানে সারা (আ.) ঈর্ষান্বিত হয়েছেন সেখানে আপনি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।কিন্তু দূনিয়া তো ক্ষণিকের।আমাদের জীবন টা তো আল্লাহর কাছ থেকে ধার নেয়া কিছু সময় মাএ।আমরা তো এখনো পরিক্ষা দিচ্ছি।পরিক্ষা নেওয়া শেষ হলে আল্লাহ যেদিন ইচ্ছা আমাদের তুলে নিবেন।এই ক্ষনিকের সময়টুকু একটু আল্লাহর সন্তুষ্টি আর তাওয়াক্কুল নিয়ে চলতে পারি না?তাহলে এই দূর্বলতা কেন?আপনার ক্ষোভ বা হিংসার কারনে আপনি আপনার উত্তম প্রতিদান হারিয়ে ফেলবেন হানি।বি প্যাশেন্ট।আমি তো আপনারই।আপনার হয়েই থাকবো।এখানে হারানোর ভয় কোথায়?
‘আল্লাহ তৌফিক দিন আমাকে।আফওয়ান।আর এমন করবো না।’
আরহাম চুপচাপ বেরিয়ে গেলে মাইমুনার গ্লানি আরও বেড়ে যায়।এতো তাড়াতাড়ি সে শাহ’এর চোখে ধরা পড়ে গেলো।এত দূর্বল ইমান নিয়ে তো সে এতো বড় সিদ্ধান্তে সহমত দেয়নি।
দুপুরের লাঞ্চের পর আরহাম বেরিয়ে গেছেন।তখন একদম একা লাগলো হাফসার।একটু আগ পর্যন্তও লোকটা পাশে ছিলেন।এ কয়দিনে আরহামের সাথে সহজ হয়েছে সে।এখন আর কথা বলতে আগের মতো সাইনেস ফিল হয় না।আম্মু নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন।হাফসার একা বোর লাগছিলো বলে আইরার রুমে উঁকি দিলো।আইরা ঘরে নেই কিন্তু ওয়াশরুম থেকে পানির আওয়াজ আসছে।হাফসা ভেতরে ডুকতেই তাঁর গলার আওয়াজ শোনা গেলো।তাঁর চিরাচরিত চিন্টুকে নিয়ে কবিতা আওড়াচ্ছে সে।মিনিট দশেক পর বের হয়ে হাফসাকে দেখে চমৎকার হেসে জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাইয়া চলে গেছেন তাই এতক্ষণে আসলেন ভাবিপু?আমাকে একটুও মিস করেন না?’
হাফসার উত্তর দেওয়ার অপেক্ষা না করে সে অন্য প্রসঙ্গে গিয়ে চরম এক্সাইটমেন্ট নিয়ে বলল, ‘গতকালকে একটা দারুণ স্বপ্ন দেখেছি জানেন?আমার চিন্টুকে আমি খুঁজে পেয়ে গেছি।কিন্তু সত্যি তো পাইনি।কিন্তু আমার মনে পড়ছে খুব।তাই খুব শীঘ্রই বাসায় একজন জুনিয়র চিন্টু আনবো।’
হাফসা তাঁর কথার আগামাথা কিছু না বুঝে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো, জুনিয়র চিন্টু কে।আইরা বোকা হাসি হেসে বলে, ‘বিকেলেই মিট হবে।আপনিও তো যাবেন আমার সাথে।’
হাফসা এতোক্ষণে বুঝতে পারলো তাঁর কথাবার্তা।এজন্য লোকটা যাবার সময় বলেছিলেন,বিকেলে আইরাকে নিয়ে বের হবেন।
আইরা কথা বলতে বলতে নিজের কাজ গুছিয়ে নিয়ে বলল, ‘আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, আমাকে নিয়ে ভাইয়া বের হতে এতো সহজে রাজি হয়ে যাবেন?নাহ,রাজি তো হোননি।বরং আমাকে এত্তগুলা কথা শুনিয়ে দিচ্ছিলেন তখন আব্বুকে কনফারেন্সে রেখে আমি চুপচাপ শুনে গেলাম।ব্যাস,আব্বুর একটা ধমক শুনে ভাইয়া রাজি হয়ে গেলেন।আমাকেও সরি বললেন।’
হাফসা মুচকি হেসে তাঁর কুটিল বুদ্ধির প্রশংসা করছিলো তখন সে আচমকা সিরিয়াস হয়ে বলে, ‘ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ওই আপুটার কথা?ভাইয়া কিছু জানেন?’
হাফসা হতাশভঙ্গিতে না বোধক উত্তর দিতেই আইরা অন্যমনষ্ক হয়ে পড়লো।
‘স্পেশাল ক্যাট হোমস’ টা তাঁরা ঘুরে দেখছিলো আর আরহাম তাদেরকে দেখছিলেন।আইরাকে যতই শাসন করেন না কেন সবশেষে আব্বুর একটু প্রশ্রয়ে সে ভাইকে ভয় পাওয়া তো দূর,উল্টো সরি বলায়।আজকে বাসায় আসামাত্রই যখন নতুন একটা জুনিয়র বাচ্চা বিড়াল এর আবদার করছিলো তখন আরহাম তাকে কিছু কড়া কথা শুনিয়েছিলেন তাঁর শাস্তিস্বরুপ সরিও বলতে হয়েছে।তাঁরযেকোনো বাহানা আর কারো কাছে একসেপ্ট হোউক আর না হোউক একেবারে হাই কোর্টে একসেপ্ট হয়ে যায়।আব্বুর যেনো একটাই সন্তান।আরহাম কেউ না।মাঝে মাঝে জেদ হয় আরহামের।এমনকি আজকে যখন হুট করে উমায়েরকে তাঁর সাথে আনার বায়না করেছিলো তখন আরহাম সাফ সাফ মানা করে দিয়েছিলেন।কিন্তু তবুও সে আনলোই কারন আব্বুর একমাত্র আদূরে কন্যা তাই তাঁর আবদারও শুনতে বাধ্য।
এটা একটা ফেমাস ক্যাটস হোম।এজন্য বিড়ালপ্রেমী মানুষদের আনাগোনা এখানে বেশী।তাঁর চেয়েও বেশী ভিনদেশী সব কাস্টমারের।তাদের বেশভূষায় চোখ পড়লেই গুনাহে হাবুডুবু খেতে হবে এজন্য আরহাম বাইরে অপেক্ষা করছিলেন তাদের জন্য।
আইরা একে একে ছোট্ট সাইজের বিড়ালগুলো কোলে নিচ্ছিলো, চুমু খাচ্ছিলো হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো আর বারবার বলছিলো,সবগুলো নিলে কি ভাইয়া বকবেন?এগুলো সবগুলো নিতে দিলে সামনের একবছর আমি আর কোনো আবদার করতাম না।
ডানপাশের সব গুলো দেখে তাঁরা দূজনে আরো ভেতরে যেতে আপুটা সামনে পড়তেই আইরা চমকে তাকায়।মাএ কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁর মাথায় অনেকগুলো সিগন্যাল এসে যায় কিন্তু ততক্ষণে সে প্রশ্নের সম্মুখীন হলো, ‘আপনি ডক্টর মাহেরের উডবি না?”
হাফসা তড়িৎ চমকে তাকালো আইরার দিকে।সামনের আপুটা কি তার ভাইয়ার কথা বলছেন।আইরা প্রশ্নের উত্তরটা নিয়ে না যতটুক ভাবছে তার চেয়ে বেশী ভাবছে,আর দূ একটা কথা বললেই ভাবি’পু নিশ্চিত হয়ে যাবেন যে এটাই সেদিনের মেয়ে।তারপর বায়োডাটা নিয়ে পারলে আজকেই লোকটার বিয়ে দিয়ে দিবেন।
আইরা থতমত খেয়ে উত্তর দেয়, ”আ আপনি কে?’
এশা তৎপর উত্তর দিলো, ‘ওই যে সেদিন ডক্টর মাহেরের চেম্বারে দেখেছিলাম।আপনার ভাই বোধহয় সাথে ছিলেন।’
আইরা আড়চোখে ভাবি’পুর দিকে তাকালো।উনার নিঁখুত দৃষ্টি সামনের আপুর দিকে।ভাবি’পু কি টের পেয়ে গেলেন।
হাফসা ইশারায় সামনের ডিভান ইশারা করে মেয়েটার উদ্দেশ্যে বললো, আমরা বসে কথা বলি।
হাফসা এতক্ষণে নীরব দর্শক হয়ে বসেছিলো।সামনের মেয়েটার লাগাতার প্রশ্নে সে অন্তত এটা শিওর হয়ে গেছে, ভাইয়াকে ইনিই পছন্দ করেন।অথচ তিনি ভুল জেনে বসে আছেন।যেমন বারবার আইরাকে প্রশ্ন করছেন, ‘আপনার সাথে উনার সত্যি আক্বদ হয়ে গেছে?’
আইরা হাসফাস করছিলো এখান থেকে উঠে যাওয়ার জন্য।ফোনের কী বোর্ডে হাফসা উত্তর দিলো, ‘হয়নি।’
এশা সেটা দেখে খুশিতে আত্নহারা হয়ে যাবার অবস্থা। তৎক্ষণাৎ হাফসার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বলল, ‘আপনি উমায়ের?আপনাকে চিনি আমি।আমি ডক্টর মাহেরকে.…
হাফসা আরও কিছু বলতে চাচ্ছিলো এমন সময় আরহাম উপস্থিত হোন।তিনি এসেই আইরার দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকান।সেই দৃষ্টিতে অজান্তেই হাফসাও ভয়ে আটসাট হয়ে রইলো।আইরা মিইয়ে যায় ভাইয়ের কড়া দৃষ্টিতে।ঘড়িতে চোখ যেতে দেখলো এখানে আসার বিয়াল্লিশ মিনিট পার হয়ে গেছে।অথচ দুজনের কোনো খেয়ালই ছিলো না যে আরহাম বাইরে অপেক্ষা করছেন।
আরহামের দৃষ্টি ঘুরে আসে আশেপাশে।আশেপাশে মেয়েদের থেকে পুরুষ বা ছেলেদের সংখ্যাও কম নয়।তাও দূজন নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে।হাফসার দিকে তাকাতে দেখলেন মেয়েটা ভয়ে চুপ হয়ে আছে।তাঁর হাত আলতো স্পর্শে ধরতে বুঝতে পারলেন উমায়ের কাঁপছেন।তাদের নিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে আরহাম ভাবছিলেন, তিনি তো রেগে কিছু বলেনও নি।তাও এত ভয় উনার?
তাদের পছন্দের ছোট্ট বিড়ালটা পে করে আলাদা কেইজে করে আনলেন আরহাম।গাড়িতে বসে কঠিনস্বরে আইরার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আর কখনো তোমার কোনো আবদার থাকলে আব্বুকে নিয়ে আসবে।ফোন সাইলেন্ট থাকলেও আমার জায়গায় আব্বু কিছু বলবেন না বা তোমাকে উমায়েরকেও সাথে নিয়ে আসতে হবে না।’
নতুন বাসার পাশের গার্ডেনে অনেকগুলো কিউট কিউট বিড়াল আছে।একাকীত্ব দূর করতে ইদানীং এগুলোর সাথে মাঝে মাঝে সময় কাটানো হয় এশার।আজকে তাদের জন্য ক্যাট ফুড নিতেই এখানে আসা।কিন্তু এসে এমন একটা চমকপ্রদ কিছু শুনবে সেটা তাঁর কল্পনায়ও ছিলো না।
এবার লোকটার সাথে তাঁর হিসেবনিকেশ বুঝে নিতে হবে।
আসরের নামাজ আদায় করতে নিচে আসছিলেন মাহের।নিচের ফ্লোরে নামাজের জন্য আলাদা জায়গা আছে।নামাজ শেষে নিজের কেবিনে যাওয়ার আগে রিসিপশনে যেতে হয়েছে কোনো প্রয়োজনে।যাওয়ামাএ সেখানে এশাকে দেখে খানিক চমকালেন তিনি।তাঁর সাথে তো কথার এন্ডিং অনেক আগেই হয়ে গেছে তাহলে এখন তাঁর আসার কারন উনার মাথায় আসছে না।
মাহেরকে দেখে ছুটে আসলো এশা।এসেই রাগ নিয়ে চট করে বললো, ‘আপনার পিএ খুব খারাপ।আমাকে ঢুকতেই দিলো না।’
মাহের চুপচাপ রিসেপশনিস্ট এর দিকে একপলক তাকিয়ে দেখলেন, যার চোখে অনেক কৌতূহল এশাকে নিয়ে।মেয়েটার এই আচরণই যথেষ্ট ছিলো মাহেরকে নিয়ে হেড অফিসে দ্বিতীয়বারের মতো প্রশ্ন উঠার জন্য।
তাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়েই মাহের কড়াসুরে বললেন, ‘আবার কেন আসা আপনার?আপনার জন্য আমাকে এর আগেও জবাবদিহি করতে হয়েছে।আজকে আবারও করতে হবে সেটা বুঝা হয়ে গেছে।আপনার এখানে লাস্ট আসা আজ।আর কখনো আসবেন তো আমাকে কঠিনরূপে দেখবেন।’
এশা এসব কিছু পাত্তা না দিয়ে বলল, ‘আপনি আগে বলুন মিথ্যে কেন বললেন আমাকে।আপনার বন্ধুর বোনের সাথে তো আপনার আক্বদ হয়নি।’
‘কে বলেছে?”
‘আপনার বোন বলেছেন।’
‘তাকে কোথায় পেলেন আপনি?’
‘ক্যাটফুড নিতে গিয়ছিলাম সেখানে দেখা হয়েছে।’
মাহেরকে নিরুত্তর দেখে সে আবার জানতে চাইলো, ‘আক্বদ হয়নি তাই না?’
‘হয়ে যাবে।একটু মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে তাই সময় নিচ্ছি?’
‘মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং মিনস?’
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৪
‘সেটা আমার আর তার পার্সোনাল ম্যাটার।পছন্দের মানুষের সাথে এমন হতেই পারে।এজন্য ভেবেছি,একসাথে বিয়ে করেই মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং সলভ করবো।আশা করি আর কিছু জানার নেই।’
বলেই মাহের এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না।মাহের চলে যেতেই অমি এসে বলল, ‘মিস মশা সরি এশা এবার আপনি যেতে পারেন।’
