অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৯
Maha Aarat
সকালে যখন ঘুম ভাঙ্গলো মাইমুনার নিজেকে বেশ ভারী ভারী মনে হলো।চোখ খুলতেই দেখলো এক ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছে।আরহামের হাত সরিয়ে তড়িৎ গতিতে উঠে বসলো সে।একবার নিজের হাতে চিমটি দিয়ে আরহামের গালে হাত রাখলো।সত্যি আরহাম তো!
ভাইব্রেশনের শব্দ হচ্ছে।শব্দ খুঁজতে দেখলো আরহামের পকেটে থাকা ফোনটা কেঁপে কেঁপে উঠছে।আরহাম একটু নড়েচড়ে উঠতেই মাইমুনা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কখন এসেছেন শাহ?’
কন্ঠ শুনে কিছুসময় নিয়ে ঘুম ঝেড়ে ফেললেন।শেষরাতে এসে পৌঁছেছেন বিধায় চোখে তখনো ঘুম।উঠেই এলার্ম অফ করে মাইমুনার দিকে ঘুরে সালাম বিনিময় শেষে বললেন, ‘ভাবছিলাম এসে কান্না থামাবো।কিন্তু আপনি তো কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছেন ততক্ষণে।’
মাইমুনা উৎকন্ঠা নিয়ে বলল, ‘কেন আসতে গেলেন এতরাতে?যদি কোনো দূর্ঘটনা হতো?’
‘আমার তো ঘুম আসতো না হানি।’
‘তবে আমার মনের সিগন্যাল সত্যি হয়ে গেলো!’
‘হুমম।’
মাইমুনা মিনমিনে স্বরে বলল, ‘আপনার এমন বদলে যাওয়া আমি মানতে পারছি না এটা সত্যি।তাই কেঁদেছি।’
‘বাসায় আসুন।সুদে-আসলে ভালোবেসে সব পুষিয়ে দিবো।’
‘একটা আবদার পূরণ করলেই হবে শুধু।’
‘কি?’
‘রাতের শহর দেখতে চাই আপনাকে নিয়ে।’
‘ওহহ হানি।অন্য কিছু হোক।’
মাইমুনা নিরুত্তর থাকলেন।কিন্তু আরহাম তাঁর মন:ক্ষুন্ন হওয়া বুঝে গেলেন।ওয়াশরুমে অযু করার উদ্দেশ্যে এগোতে এগোতে বললেন, ‘গাল ফুলালে পুতুল বউ লাগে আপনাকে!’
আরহামের এমন সম্বোধনে হেসে ফেললো মাইমুনা।অভিমান ঝেড়ে আরহামের পাশে এসে বলল, ‘শাহ আর মাএ দূই দিন বাকি!’
মাহের রুমে আসতে নারাজ।আন্টি জোর করে তাকে গেস্টরুমে এনে ট্রে তে নাস্তা সাজিয়ে আনলেন।ভালো মন্দ কুশলাদি শেষে তিনি বেরিয়ে গেলে মাহের ক্লান্ত দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকায়।
‘কেমন আছো এখানে?’
হাফসা মাথা নাড়িয়ে বোঝায় বেশ ভালো।হাফসা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো মাহের সেটা আন্দাজ করতে পেরে বললেন, ‘খুব শীঘ্রই শিফট হবো।সামনের উইকেই।’
আরও টুকটাক কথা হচ্ছিলো তাদের মধ্যে।আচমকা ওয়াশরুম থেকে আসা গুনগুন আওয়াজ টা হঠাৎ বেড়ে গেল।
❝খোকন হাসে ফোকলা দাঁতে
চাঁদ হাসে তার সাথে সাথে,
কাজল বিলে শাপলা হাসে হাসে পাঁতিহাস
খলসে মাছের হাসি দেখে হাসে সবুজ ঘাস….❞
হাফসা আর মাহেরের দৃষ্টি ওয়াশরুমের দিকে।আবার আওয়াজ থেমে গেলো।মাহের স্বাভাবিক হলেন।এদিকে
হাফসা কিছুটা ইতস্ততবোধ করছিলো।একথা সে মুখে বলতে পারবে না।তাই গত দূদিন থেকে কাগজে লিখে ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলো সে।সে জানে না তাঁর ভাইয়ের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তবুও সে বলবেই।একটা ভাঁজ করা কাগজ এগিয়ে দিতেই মাহের ভ্রু কুঁচকান।কাগজের লিখা দেখে হাফসার দিকে নিঁখুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ।অতপর গম্ভীর সুরে বললেন, ‘এসব আমি চিন্তাও করছি না হাফসা।আগে তোমার লাইফ সেটেল হোক।’
হাফসার চোখে অনুনয়।যেনো ভাইকে সে খুব করে বলতে চাইছে,বিয়েটা করে নিতে।মাহের নরম দৃষ্টিতে কিছু বকার আগেই হঠাৎ ওপাশ থেকে আবারও ভেসে আসতে থাকলো,
❝জিলিপি সে তেড়ে এসে, কামড় দিতে চায়;
কচুরি আর রসগোল্লা ছেলে ধরে খায়,
পায়ে ছাতি দিয়ে লোকে হাতে হেঁটে চলে
ডাঙ্গায় ভাসে নৌকা-জাহাজ, গাড়ি ছোটে জলে❞
উচ্চশব্দে বাথরুমে আবোলতাবোল গাইছে আইরা।মাহেরের মুখাবয়বে অবাকতার রেশ।শাওয়ার নিতে গিয়েও গাওয়া লাগে?
হাফসা অপ্রস্তুত হলো এমন পরিস্থিতিতে।গত দূদিনে সে এমন পরিস্থিতির সাথে মানানসই হয়ে গেছে।শাওয়ার নিতে গিয়ে পানির কল ছেড়ে আবোলতাবোল কবিতা গাওয়া নাকি তাঁর ছোটবেলার অভ্যেস।
হাফসা দরজায় নক করে আলতো করে।আইরা ভেতর থেকে চেঁচিয়ে বলে, ‘সরি আপু।আমি জানি আপনি মানা করতে চাইছেন কিন্তু আমি গাইতে না পারলে শাওয়ার নেওয়া হবে না।’
হাফসা থমথমে মুখে ফিরে এলো।মাহেরও অন্য প্রসঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।হাফসাকে বললেন তাঁর প্রেসক্রিপশনের ফাইলটা দিতে।এটা উনার প্রয়োজন।হাফসা সেটা খুঁজতে গেলো রুমে।আইরার কন্ঠে এবার অন্য কিছু,
❝বরটা চলে গেল, মনটা ভেঙে গেল
Prestige যা ছিল puncture হয়ে গেল,
Rail line-এ গলা দেবো তখন আমি ভেবেছিলাম,
তারপর হঠাৎ করেই, life-এ আমার চিন্টু এলো
ও চিন্টু সোনা দুটো হাম্পি দেনা
আমি আইরা বলছি আর খৈনি খাব না,
চাঁদনী রাতে আমি চিন্টুর সাথে
যাব dinner date-এ poach-মামলেট খেতে।
আমি গয়া গিয়ে মাথায় চুল লাগিয়ে,
আগের বরের নামে এসেছি মামলা দিয়ে
সামনের ভাদ্র মাসে ছাঁদনা তলায় বসে,
English-এ মন্ত্র পড়ে চিন্টুকে করবো বিয়ে।
ও চিন্টু সোনা
আমি বস্তির বেগম, তুই আমার বাদশা
কোনো মধুর রাতে আমি চিন্টুর সাথে
বসে বাদাম খাব আমার টালির ছাদে…
মাহের ঠোঁটে ঠোঁট কামড়ে হাসছেন।সে যদি একমুহূর্তের জন্যও ভাবতো তাঁর কন্ঠের বুলি কতো দূরের মানুষ শুনছে।কে বা হাসি আটকে রাখতে পারবে?
হাফসা ফাইল নিয়ে এসেছে।সেটা কাবার্ডে রেখে মাহেরের হাতে চা এগিয়ে দিলো।আইরার কন্ঠ আবার শোনা যাচ্ছে।মাহের অদ্ভুত দৃষ্টিতে হাফসার দিকে তাকালেন।মিনিটের ভেতর সে অনেকগুলো কবিতা আওড়ে ফেলেছে।সেগুলোর কোনো লাইনের সাথে কোনো কিছুর মিল নেই।হাফসা অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়।এই বোকা মেয়ের মুখ বন্ধ করার কোনো উপায় তাঁর জানা নেই।
চা শেষ করে মাহের প্রেসক্রিপশনে নজর দিলেন।হাত এগিয়ে আনতেই প্রেসক্রিপশনের নিচ দিয়ে কিছু উড়ে ফ্লোরে পড়লো।মাহের সেটা তুলে রাখার উদ্দেশ্যে ধরতেই ভাঁজ হালকা হয়ে এলো।কৌতূহলবশত সেটাতে নজর বুলাতেই তিনি চমকালেন।নন-ফিকশন বইয়ের লম্বা লিস্ট।সাথে পড়েছে ছোট্ট ইনহেলার।সেটা তুলতে চোখ যায় বক্সের নিচে।ধূলোর মাঝে রুমালের ওপর যত্নে রাখা কোনো বই।বড় বড় অক্ষরে লিখা ড্রাকুলা।মাহের সেদিকে আর চোখ বাড়ালেন না।তবে এটা বুঝতে বাকি নেই সেদিন মেয়েটা এই লিস্টই ভুল করে দিতে ভুলে গিয়েছিলো।
মাহেরের চা শেষ হয়েছে।তিনি উঠে বেরোনোর প্রস্ততি নিতে নিতে হাফসার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলেন।অমনি গুনগুন করা কন্ঠে সে আবার চেঁচিয়ে উঠে,
চিন্টু, নাকে নাক ঘষে দে না
চিন্টু, তুই আমার পুঁচকি সোনা
চিন্টু, তোকে নিয়ে দীঘা যাব
চিন্টু, বেলি ফুলে খাট সাজাব
চিন্টু…
মাহের এবার চরম আশ্চর্যান্বিত হলেন।কোনো স্বাভাবিক মানুষ এমন করতে পারে?মাহেরের মনের কথা হয়তো বুঝে ফেললো হাফসা।সে ইশারা করে বুঝালো চিন্টু হচ্ছে আইরার পোষা বিড়াল।তাকে নিয়েই এত তামাশা তাঁর।মাহের আড়ালে মুচকি হেসে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
আরহামের সাথেই হেঁটে হেঁটে রোডে এসেছেন মাহের।মেইন রোড থেকে তাদের বাসা বেশ কাছেই।অমি গাড়ি নিয়ে এসেছে।পৌঁছতে এখনও এক ঘন্টা লেগে যাবে।বিদায় নিয়ে মাহের গাড়িতে উঠলেন।এক ঘন্টা দস্তুরমতো ফোনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরে নেওয়া যাবে।এসি ছেড়ে সিটে হেলান দিতেই অমি স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে ফ্রন্ট মিররে পেছনের সিটে উঁকি দিলো একবার।অথচ কিছুক্ষণের মধ্যে মাহের ঘুমে ঝিমোচ্ছে দেখে অমির ভেতরে থেকে আতঙ্কের শ্বাস উদগীরণ হলো।
আওয়াজ দিয়ে কয়েকবার হর্ন দিয়েই পিছনের সিটে তাকালো অমি।এশা ঠোঁট গোল করে লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিটভেঙ্গে বেরোতে গেলেই মাহের চোখ খুলেন।চোখটা লেগে আসছিলো গাড়িতে বসতেই।এত লম্বা সময় ঘুমিয়েছেন তিনি?এশাকে পেছন সিট থেকে বেরোতে দেখে মাহের চমকে লাফ দিয়ে উঠেন।
‘হুয়াট দ্যা হেল আর ইউ?আপনি?আপনি এখানে?গাড়িতে কীভাবে?’
এশা শুধু মুচকি হাসলো।মাহের অমিকে খুঁজতে লাগলেন কিন্তু সে আশেপাশে নেই।কড়া দৃষ্টিতে চারিদিকে চোখ বুলাতেই নজরে আসলো সে।দূরে দাঁড়িয়ে আছে নিচুমুখ হয়ে।মাহের এ জায়গাটা চিনতে পারলেন না।এলেমেলো মস্তিষ্কে বিশখানেক প্রশ্ন।যেগুলোর উত্তর একমাত্র অমি’ই দিতে পারবে।
এশা গাড়ি থেকে নেমে বলল, ‘তাড়াতাড়ি নামুন।’
মাহের এখনো অন্যরেশে।কী কী হয়ে যাচ্ছে সেগুলো বুঝতে বেগ পেতে হচ্ছে উনার।মাহের এশার দিকে ফিরেও তাকালেন না।নেমে অমির দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগেই কেউ একজন এগিয়ে আসলো।ভদ্রলোক মাহেরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে এশার দিকে তাকালেন।এশা হেসে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘মিস্টার মাহের।আমার বাবা।’
মাহের বরাবরই হতবাক।তবে সালাম দিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবার পূর্বেই ভদ্রলোক তাড়া দিয়ে বললেন, ‘ভেতরে এসে বসো।’
এশা মাহেরকে ভেতরে যাওয়ার তাগদা দিতে দিতে নিচুস্বরে বলল, ‘এতো বড়ো দূ:সাহসের জন্য যা শাস্তি দিবেন সব মেনে নিবো।আমার থেকে সবদিকে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছেন।এই প্ল্যান ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না।’
মাহের ক্রুর হাসলেন।এতক্ষণে পরিস্থিতি বুঝা হয়ে গেছে উনার।পাএকে পাএীর বাবার সাথে মিট করতে হবে এখন।
এশার মা মিসেস মাইশা এসেই কুশলাদি বিনিময় করে গেলেন।আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে, মাহের আসবে এটা সবাই জানতো।মাহের এতকিছুর আড়ালে তখনো অমির সাথে চোখের কঠিন যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছেন।এশা অরেন্জ হাতে তুলে দিতেই মাহের ভদ্রতাসুলভ হেসে বললেন, ‘আমি আঙ্কেলের সাথে একটু একা কথা বলতে চাই,প্লিজ।’
এশা খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, ‘সিওর।’
মাহেরকে নিয়ে নিয়াজ সাহেব ভেতর ঘরে চলে গেলে এশা বসে বসে নখ খামটাতে থাকলো।কখন তাদের আলাপ শেষ হবে।আর সে সম্ভাবনাসূচক একটা সিদ্ধান্ত শুনতে পারবে?
বিকেলের নাস্তা শেষে হাফসা নিজেই পাশে বসালো আইরাকে।আইরা বাক-বাকুম করে করে নিজের আনলিমিটেড গল্প চলতি রাখলো।হাফসা তাকে থামিয়ে ইশারায় বুঝালো আজকে শাওয়ারের সময় তাঁর জিনিয়াস কন্ঠ টা একজন শুনেছে।আইরা সহাস্যে হেসে বলল, ‘আম্মু?তিনি তো ছোটবেলা থেকে অভ্যস্ত।বিনু আর কাজল আপু?তাঁরাও অভ্যস্ত।আর ভাইয়া?ভাইয়া শুনলে আমার ছোট্ট একটা ইন্টারভিউ দিতে হবে।সেখানে গম্ভীরসুরে মুখস্তের মতো বলবেন, ‘আইরা।ইউ আর এডাল্ট নাউ।এগুলো তোমাকে মানায় না।বড় হচ্ছো বুঝতে পারছো না?শুধু হাতেপায়ে বড় হচ্ছো, ব্রেইনটাকে একটু খাটাও এখন।’
আমি এসবেও অভ্যস্ত।’
হাফসা মুচকি হেসে বলল তারা কেউ না।’
আইরাকে এবার চিন্তিত দেখালো।জিজ্ঞেস করতেই হাফসা মাহের ভাইয়ের কথা বলতেই আইরা যেনো আকাশ থেকে পড়লো।চরম এক্সাইটমেনৃট নিয়ে কখন শুনলেন,কীভাবে শুনলেন,বেশী জোরে শোনা গেছে, সবকিছু শুনেছেন,প্রশ্ন করতে করতে মুখে ফেনা তুলে দেওয়ার জোগাড়।
হাফসা হ্যাঁ বোধক উত্তর দিতেই আইরা নিষ্প্রাণ হয়ে গেলো।মলিনসুরে জিজ্ঞেস করলো, ‘নিশ্চয়ই পাগল।বলেছেন?সাইকো মেন্টাল বলেছেন?তাই না?’
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৮
হাফসা তাকে নিশ্চিন্ত করলো এটা বলে যে,মাহের কিছুই বলেননি।কেবল মুচকি হেসেছেন।উত্তর শুনে আইরা কেন জানি লজ্জ্বায় লাল নীল হতে হতে রুম ছাড়লো।হাফসা তখনও হাসছে।আর মনে মনে আওড়াচ্ছে,
‘চিন্টু, নাকে নাক ঘষে দে না
চিন্টু, তুই আমার পুঁচকি সোনা!
দারুন তোহ!
