Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৭

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৭

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৭
নুরিয়া ইসলাম

সময় গড়িয়েছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ পহেলা আগস্ট।ধূসর স্মৃতির পথ ধরে অতীতের ছায়া এখনো জীবন্ত হয়ে রয়েছে ইনায়ার মনে,হয়তো কোনো এক অলিখিত গল্পের পাতায় আটকে রয়েছে সে।বিকট শব্দে যান্ত্রিক অ্যালার্ম ঘড়িটার আওয়াজ হতেই ইনায়া ধর-ফরিয়ে বিছানা থেকে উঠে বসে। ঘড়িটার টিকটিক শব্দ জানিয়ে দিচ্ছে ফজরের সময় হয়ে গেছে।সারারাত কান্না করার ফলে রাতের শেষ ভাগে ক্লান্ত হয়ে মেয়েটা ঘুমিয়েছিলো। ইনায়া আর একফোঁটাও দেরি না করে, নিজের মনের ভিতর বয়ে চলা অস্থিরতা কমাতে নামাজে মনোনিবেশ করলো। নামাজ শেষ করে ইনায়া জায়নামাজেই বসে রইল। ঠোঁটের কোণে এখনো মোনাজাতের কিছু শব্দ নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে। আল্লাহর কাছে আরেকবার প্রার্থনা করলো,

— “যা কিছু আমার জন্য ভালো, তা আমার নসিবে লিখে দিন… আর এরিককে সুস্থ করে দিন।”
বাইরের আকাশ সূর্যের আলোয় ধীরে ধীরে ধূসর থেকে হালকা নীল হয়ে উঠছে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস ভেতরে ঢুকে ইনায়ার গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে।তবুও বুকের ভেতর জমে থাকা ভার যেন কিছুতেই কমছে না।
এমন সময় দরজার বাইরে খুব আস্তে কারো কণ্ঠ শোনা গেল,
—”ননদীনি… উঠেছো?”
ইনায়া চমকে উঠে দরজার দিকে তাকালো। এ কণ্ঠ তো তার ভাবির! সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়াল। তার ভাবি মারিয়া ফিসফিসিয়ে বলল,
—”আজ তোমার জন্য একটা ভালো খবর আছে,ননদীনি।”
ইনায়া মারিয়ার কথা শুনার জন্য অধীর আগ্রহে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, হৃদপিণ্ড যেন মুহূর্তে জোরে ধড়ফড় শুরু করল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—”কী খবর, ভাবি? এরিক…?”
মারিয়া একটা দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে বলল,
“আমি কাল রাতে আদিলকে পাঠিয়েছিলাম হাসপাতালে। সে বলেছে, এরিকের অবস্থা… কিছুটা ভালো। কিন্তু এখনো আইসিইউ-তে আছে। ডাক্তাররা বলেছে, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা খুব ক্রিটিক্যাল।”
মারিয়ার মুখ থেকে এরিকের বেঁচে থাকার খবরটা শুনে ইনায়ার চোখ ভিজে উঠল,সে কতই না অস্থির হয়ে ছিল, এরিকের খবর পাওয়ার জন্য, সে খুশি হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বললো,
“আলহামদুলিল্লাহ… অন্তত উনি বেঁচে আছেন।”

ইনায়ার হাস্যজ্বল মুখটা দেখে,মারিয়া একটু থেমে ধীরে ধীরে বলে উঠলো ,
“শোনো, ননদীনি… আজ সন্ধ্যায় যদি সুযোগ পাই, আমি তোমাকে হাসপাতালে এরিককে এক ঝলক দেখাতে নিয়ে যাবো। তবে তুমি প্রতিশ্রুতি দাও, কোনো ঝামেলা করবে না।”
ইনায়া কাঁপা গলায় বলল,
“প্রতিশ্রুতি দিলাম, ভাবি। শুধু দূর থেকে একবার দেখতে চাই…”
“চারিদিকে অন্ধকার মিলিয়ে যেতে যেতে, ইনায়া শুধু ভাবছিল—সন্ধ্যা কি সত্যিই তাকে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত উপহার দেবে?”

Vertex Dynamics কোম্পানি, দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিট,
বাইরের কাঁচের দেয়াল বেয়ে রোদের আলো ঢুকে পড়েছে মিস্টার রিচার্ড অ্যাসফোর্ডের বিশাল কেবিনে। ডেস্কের ওপর সাজানো দামি ক্রিস্টালের পেপারওয়েট, চামড়ার ফাইল কভার আর একপাশে রাখা কফির কাপ—সবকিছুতেই ছড়ানো আছে ক্ষমতা আর ঔদ্বত্যের ছাপ।
রিচার্ডের চোখ তখন জানালার বাইরে শহরের আকাশচুম্বী টাওয়ারগুলোর দিকে, যেন নতুন কোনো খেলা খেলতে যাচ্ছেন তিনি। হঠাৎ দরজায় তিনবার কড়া নাড়ার শব্দ ভেসে আসে।
—”কাম ইন!” অত্যান্ত গম্ভীর কণ্ঠে অনুমতি দেন তিনি।
দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে মিস্টার তানভীর।মিস্টার রিচার্ডের এই অসময়ে তাকে ডাকার কোন কারণ সে খুঁজে পাই না। সে আর বেশি কিছু না ভেবে মিস্টার রিচার্ডকে জিজ্ঞেসা করলো,

—”স্যার, আপনি ডাকছিলেন?”
রিচার্ড ধীরগতিতে চেয়ার থেকে সামান্য এগিয়ে এসে হাতে থাকা কাগজটা বাড়িয়ে দেন।
—”হ্যাঁ, এটা তোমার জন্য।”
তানভীর কাগজটা হাতে নিয়ে চোখ বুলাতেই ভ্রু কুঁচকে যায়।
—”রেজিগনেশন…?”
রিচার্ড চেয়ারে হেলান দিয়ে হাসলেন, কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতার চেয়ে বিষাক্ততা বেশি ছিল।
—”ঠিক তাই। আজ থেকেই তোমার চাকরি শেষ। শুধু এখানে নয়… এই শহরের কোনো কোম্পানিত যাতে তোমাকে জব না দেয়, সেটা আমি খেয়াল রাখবো।”
তানভীর ঠাণ্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

—”আমার অপরাধ?”
মিস্টার তানভীরের প্রশ্ন শুনে মিস্টার রিচার্ড একটু বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বললেন,
— “কারণ তুমি ওই মেয়েটার ভাই।”
মিস্টার তানভীর দৃঢ় গলায় প্রশ্ন করলেন,
— “কোন মেয়েটা?”
মিস্টার রিচার্ড তানভীরের এমন খাপছাড়া ভাব দেখে বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন,
— “ইনায়া শেখ।তোমার একমাএ বোন যার জন্য আমার ছেলে প্রায় মরতে বসেছে।”
মিস্টার রিচার্ডের কথা শুনে এই মুহুর্তে তানভীরের রাগ লাগলেও সে বহু কষ্টে নিজেকে শান্ত করে ধীরে বললেন,
— “আপনার ছেলে নিজে এসেছে আমার বোনের জীবনে। আমার বোন কাউকে ডাকেনি।
মিস্টার তানভীরের কথা শুনে মিস্টার রিচার্ড হাসলেন, কিন্তু সেই হাসিতে নেই কোন আন্তরিকতা আছে শুধু একরাশ বিষাক্ততা।তিনি মিস্টার তানভীরকে উদ্দেশ্য করে খুবই সূক্ষ্ম অপমানের সহিত বললেন,

— “তোমাদের মতো পরিবার… টাকার গন্ধ পেলে পেছন ছাড়ে না।বোনকে তো ভালো ট্রেনিং দিয়েছো,কেমন করে,বড়লোক ছেলেদের ফাঁসাতে হয়। এখন স্বপ্ন দেখছো, অ্যাসফোর্ড নাম তোমাদের পদবির সাথে লাগানোর?”
নিজের বোন সম্পর্কে এই রকম কুরুচিপূর্ণ কথা শুনে তানভীরের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, রাগে সে হাতের আঙুল মুষ্টিবদ্ধ করে নিল।হুংকার ছেড়ে মিস্টার রিচার্ডের উদ্দেশ্য বলে উঠলো,
” টাকা আপনার চোখ অন্ধ করে দিয়েছে।তাইতো নিজের বিবেক হারিয়ে বসেছেন। আমার বোনের সম্মানকে নোংরা ভাষায় বর্ণনা করবেন না। তাহলে,কিন্তু আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।তাছাড়া,আমার বোনের সম্মান নিয়ে কথা বলার আগে, নিজের ছেলের চরিত্রটা দেখুন স্যার।”

তানভীরের মতো সামান্য এক কর্মচারী মিস্টার রিচার্ডের মুখে মুখে জবাব দেওয়ায়, তিনি রেগে গিয়ে টেবিলে হাত চাপড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তীব্র এক হুংকার ছেড়ে মিস্টার তানভীরকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,
“শুনে রাখো, তানভীর শেখ… যদি বোনকে জীবিত দেখতে চাও, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই দেশ ছেড়ে চলে যাও। তোমার বোন এইখানে থাকলে আমি তাকে বাঁচতে দিব না,মাইন্ড ইট!”
তানভীর এক ভ্রু উঁচিয়ে বললেন,
—”এটা হুমকি, নাকি যুদ্ধ ঘোষণা?”
মিস্টার তানভীরের কথায় রিচার্ডের ঠোঁটে একফোঁটা শীতল হাসি ফুটল।
—”দুটোই। আর মনে রেখো, আমি যখন যুদ্ধ ঘোষণা করি, তখন প্রতিপক্ষের দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ থাকে না।”
ঘর ভরে ওঠে নিঃশব্দ চাপা উত্তেজনায়। তানভীর ধীরে ধীরে রেজিগনেশন পেপারটা টেবিলে রাখলেন, চোখে চোখ রেখে বললেন,

—”আমার বোনের জীবনে হাত দেওয়ার আগে ভেবে নেবেন, মিস্টার অ্যাসফোর্ড।”
তারপর পেছন না ফিরেই কেবিন থেকে বেরিয়ে যান তানভীর। বাইরে রিসেপশনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন কর্মচারী কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকায়।তাদের বোঝার জন্য খুব বেশি শব্দের দরকার হয় না, আজ Vertex Dynamics-এর ভেতরে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে।

আজ সারাদিনটা ইনায়ার কাছে শত বছরের মতো লাগছিল। জানালার বাইরে সূর্যের আলো ফিকে হয়ে সন্ধ্যার রঙে ঢেকে যাচ্ছে। মিস্টার তানভীর এখনো অফিস থেকে ফেরেনি, তাই পুরো বাড়িটা কেমন যেন নেতিয়ে রয়েছে। মারিয়া চুপিচুপি ইনায়ার ঘরে ঢুকল, কাঁধে একটা শাল নিয়ে। সে ইনায়ার দরজায় শব্দ করতেই ইনায়া ভিতর থেকে দরজাটা খুলে দেয়, মারিয়া ইনায়াকে দেখা মাএ তাড়া দিয়ে বললেন,
“চলো, ননদীনি। এখনই বেরোতে হবে। তোমার ভাইয়া ফিরলে আর যাওয়া হবে না।”
ইনায়ার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল, তবুও সে কোনো প্রশ্ন না করেই মাথা নেড়ে দাঁড়িয়ে গেল। শালটা কাঁধে জড়িয়ে, চুপচাপ ভাবির পেছনে পেছনে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল।

গেটের বাইরে ভাবির ছোট্ট গাড়িটা দাঁড়িয়ে। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে, শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে রাতের নীরবতায় মিশে যাচ্ছে। গাড়িতে উঠে ইনায়া নিঃশব্দে বসে রইল, জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
প্রতিটা মোড় পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে তার বুকের ভেতরের ধুকপুকানি আরও বেড়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, হৃদপিণ্ডটা যেন বাইরে বেরিয়ে আসবে। মারিয়া কিছু না বলেই গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল, হয়তো সেও বুঝতে পারছিল ইনায়ার ভেতরের ঝড়টা।
শেষমেশ, হাসপাতালের সামনে এসে গাড়ি থামল। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রবেশপথে কালো স্যুট আর কানে ওয়্যারলেস লাগানো কয়েকজন গার্ড দাঁড়িয়ে। তাদের চোখে-মুখে সতর্কতা, যেন কোনো অনাহূত অতিথি ঢুকতে না পারে।
মারিয়া গাড়ি পার্কিং-এ রেখে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে আস্তে বলল,
“দেখো, ননদীনি… আমাদের মাত্র কয়েক মিনিট সময় আছে। গার্ডরা চিনে ফেললে বিপদ হবে। তুমি মাথা নিচু করে চলো।”

ইনায়া শাল দিয়ে মাথা ঢেকে নিল। দু’জন হাসপাতালের অন্য পাশের একটি সাইড এন্ট্রান্স দিয়ে ঢুকে পড়ল। করিডরের মোড়ে এক নার্সকে চেনার ভান করে কথা বলে তারা গার্ডদের চোখ এড়িয়ে ধীরে ধীরে আইসিইউ-র করিডরে পৌঁছাল। ইনায়ার হৃদপিণ্ড দ্রুত লাফাচ্ছে। সে জানে, সে এরিকের কাছে যেতে পারবে না, কিন্তু দূর থেকে তাকে একঝলক দেখার আকাঙ্ক্ষা তার মনকে অস্থির করে তুলেছে। মারিয়া তাকে আইসিইউ-র কাচের জানালার কাছে নিয়ে যায়।ইনায়া কাচের ওপাশে তাকায়। এরিক শুয়ে আছে, তার শরীরে নানা মেশিনের তার জড়ানো। তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখ বন্ধ।এরিককে এই অবস্থায় দেখে ইনায়ার শ্বাস আটকে গেল। সে কাঁচের কাছে এগিয়ে এসে ঠোঁট চেপে ধরল, চোখ ভিজে উঠল। কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল,

“কেন, এরিক…? কেন আমার জন্য এত পাগলামি করলেন?
আপনি জানেন না, আমাদের মাঝে এক বিশাল দেয়াল আছে— ধর্মের দেয়াল, যা আমি কোনোদিন ডিঙাতে পারব না।
তবুও কেন বারবার নিজের জীবন আমার জন্য ঝুঁকিতে ফেলেন?”
সে আরেকটু কাছে গিয়ে হাত কাঁচে রাখল, যেন দূর থেকে হলেও স্পর্শ করতে পারে।
“আপনি কি বুঝতে পারেন না… আপনার এই পাগলামি আমাকে আরও ভেঙে দিচ্ছে?
আমার কাছে আপনার জীবন, আপনার নিরাপত্তা— সবকিছুর চেয়ে বড়।
আমি যদি আপনার ভাগ্যে না-ই থাকি, তবুও চাই আপনি বেঁচে থাকুন, সুস্থ থাকুন।
আমার জন্য এমন বোকামি করবেন না, প্লিজ… আপনি জানেন, আমার কতো কষ্ট হচ্ছে, আপনাকে এভাবে দেখতে।”
তার চোখের পানি কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। দূরে মেশিনের বিপ… বিপ… বিপ… শব্দ প্রতিটা মুহূর্তে তার বুক ভেদ করে যাচ্ছে।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৬

মারিয়া ধীরে ইনায়ার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“চলো, ননদীনি… গার্ডরা হয়তো ফিরে আসছে।”
ইনায়া শেষবারের মতো এরিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“শুধু এইটুকু কথা মনে রাখবেন, এরিক —
“আমি না থাকলেও, আল্লাহ যেন আপনাকে এমন সুখ দেন, যা আমার বদলে আপনার ভালোবাসার আকাশে চিরজ্বলন্ত তারা হয়ে ঝলমল করবে।”
আর… প্লিজ, নিজের যত্ন নেবেন।”

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৭ (২)