অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩৫ (৩)
নুরিয়া ইসলাম
বিয়ে বাড়িতে হুলুস্থুল কাণ্ড লেগেছে। হট্টগোল যাকে বলে। গ্রামের বিয়ে, তাই উত্তেজনা একটু বেশি। এমনিতে এই পাড়ায় বড় একটা কিছু ঘটে না, তবে যখন ঘটে, তখন আর দেখতে হয় না। মানুষজন বিষয়টিকে বিনোদনের সহিত দেখছে। মানুষের জীবনের ট্রাজেডি, অন্য মানুষের কাছে সবসময়ই একটা চমৎকার গল্পের মতো লাগে। এই সত্যটা শেওনায়াজ শেখের মতো গম্ভীর মানুষও জানেন। তিনি গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তার এই গাম্ভীর্যের কারণ, আদিল এভাবে পালিয়ে যাবে, এটা তিনি কল্পনাতেই আনেননি।
শেওনায়াজ শেখ একটা সিগারেট ধরাতে গেলেন, কিন্তু দেশলাইটা খুঁজে পেলেন না। আজকাল তার স্মৃতিশক্তি বড্ড দুর্বল হয়ে পড়েছে। না কি এই দুশ্চিন্তার কারণে এমন হচ্ছে?
তার ভাবনার মাঝে হঠাৎই একটা ঘটনা ঘটল। পুরো বিয়েবাড়ি অন্ধকারে ছেঁয়ে গেল।মন্ডপের চালার নিচে অনেকগুলো হ্যাজাক লাইট জ্বলছিল, সেগুলোও নিভে গেল। সম্ভবত মেইন সুইচটা কেউ নামিয়ে দিয়েছে।অন্ধকারের মধ্যে মানুষজনের শোরগোল আরো বেড়ে গেল। এটা স্বাভাবিক। আলো থাকলে শোরগোলটা থাকে চোখে দেখার মতো, আর অন্ধকার হলে তা পুরোপুরি কানে এসে লাগে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
হঠাৎ করেই আবার আলো জ্বলে উঠলো। বৈদ্যুতিক বাল্বগুলো জিরো পাওয়ারের মতো মিটমিট করে জ্বলে উঠে আবার পুরোটা আলোকিত করল। এইবার সকলের দৃষ্টি স্বাভাবিকভাবেই মন্ডপের দিকে পড়লো।
শেওনায়াজ শেখও তাকালেন। দেখেই তার চোখ কপালে উঠলো। মন্ডপ পুরো ফাঁকা। শুধু দুটো চেয়ার পড়ে আছে। বর তো আগেই ভেগেছিল, সেটা না হয় একরকম সামাল দেওয়া যেত। কিন্তু এ কী! কনেও নেই! ইনায়া উধাও!
পাড়াপ্রতিবেশীগুলো এমন একটা সুযোগ কি আর হাতছাড়া করে? এইরকম রসালো ঘটনা, তাও আবার শেখ বাড়িতে! চারদিক থেকে চাপা উত্তেজনা নিয়ে কানা-ঘোঁষা শুরু হয়ে গেল। মানুষের স্বভাবই এমন, অন্যের বিপদে তারা নিজেদের আনন্দ খুঁজে নেয়।
❝এইগুলান কি বিয়া হইতাছে না কি তামশা হইতাছে!প্রথমে বর ভাগছে, এহন আবার কনে উধাও! এমন বিয়া বাপের জন্মেও দেহি নাই বাপু!❞
এই হুলুস্থুলের মধ্যেই পালোয়ানের মতো দেখতে দুজন লোক হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে শেওনায়াজ শেখের সামনে দাঁড়ালো। শেওনায়াজ শেখ তখনো হিসাব মেলাতে ব্যস্ত, আসলে কী ঘটলো! লোক দুটি নিজেদের স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল,
❝চেয়াম্যান সাব, ওহ্ খ্রিষ্টান পোলাডা আমাগোরে মাইরা ছোট মেমসাবরে কাঁন্দে চড়াইয়া কই জানি লইয়া যাইতাছে! আমরা না করতি গেলে আমাগো সব্বাইরে মাইরা রক্তারক্তি কইরা দিছে!❞
কথাটি শুনামাএ রুখসানা বেগমের মুখটা চকচক করে উঠলো। ইনায়াকে হেনস্তা করার একটা সুযোগও তিনি ছাড়েন না। তিনি শেওনায়াজ শেখকে কিছুটা তিরস্কার করে বলে উঠলেন,
—দেখলেন বাবা, মিললো তো আমার কথা, পালালো তো আপনার প্রিয় নাতনি, আপনার মুখে ঝামা ঘঁষে। কত বার বলেছি,ওই মেয়ে ওই বিধর্মী ছেলেটার সাথে শুয়েছিল। তখন তো আমাকেই হুমকি দিয়ে, আমার মুখ বন্ধ করে রেখেছিলেন।
এখন চারিপাশের মানুষকে বলুন, কীভাবে আপনার সতীসাবিত্রী নাতনি, আপনার মুখে ঝামা ঘঁষে দিয়ে , এক বিধর্মী ছেলের হাত ধরে পালালো।
কথাটি বলতে পেরে এই মুহুর্তে রুখসানার খুশিতে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করলো,
—ঠিক হয়েছে বুড়ো, এইবার বাঁচা নিজের পরিবারের সম্মান। আমাকে শায়েস্তা করতে এসে বুড়ো নিজেই কাঁত হয়ে গেছে।
রুখসানা ধারালো বাক্যবাণ বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পরলো সকলের মাঝে । আদিলের পালানোর খবরের থেকে ইনায়ার বিয়ের মন্ডপ থেকে চলে যাওয়ার কথাটা দ্রুত দমে ছড়িয়ে পরলো। সবাই ছিঃ ছিঃ করতে লাগলো। শেখ পরিবারের মতো রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে কিনা শেষে নিজের ধর্ম জাত,কুল ভুলে একটা খ্রিষ্টান ছেলের সাথে পালালো। এতোদিন তলে তলে শেখ পরিবারের মানুষের সামনেই একটা বিধর্মী ছেলের সাথে ফষ্টিনষ্টি করে বেরিয়েছে এই খবরটুকু শেখ পরিবারের মানুষেরা গুণাক্ষরে টেরও পেলো না।পুরো লায়ারি টাউনের মানুষের সামনে লজ্জায়, অপমানে শেখ নেওয়াজের উঁচু গর্বভরা মুখটা নিচু হয়ে এলো।
দেখতে দেখতে সাত-সাতটা ঘন্টা পার হয়ে গেল। সময় যেন থমকে আছে এই বাড়িতে। বিশাল বৈঠকখানা। ঝকঝকে ফ্লোরে সস্তা দামের চীনামাটির ফুলদানি। কিন্তু এতকিছুতেও মন টেকে না শেওনায়াজ শেখের। তিনি একটা আরামকেদারায় বসে আছেন। চোখে-মুখে রাজ্যের বিরক্তি। কিন্তু সেটা কেউ বুঝতে পারছে না। মানুষটা এমন যে রাগ-অনুরাগ কিছুই তিনি সহজে প্রকাশ করেন না। এই সাত ঘন্টায় একটাও কথা বলেননি তিনি। একটাও না। কেবল সামনের টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। গ্লাসটা খালি। অনেকক্ষণ যাবৎ চুপ থাকার পর তিনি হঠাৎ গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন,
❝❝আজ, এই মুহূর্ত থেকে, ইনায়া আর আদিলের সাথে এই শেখ পরিবারের সমস্ত সম্পর্কের আজ ইতি টানছি আমি। তারা দু’জনই আজ থেকে মৃত। এই পরিবারের কেউ তাদের সাথে কোনো রকম সম্পর্ক রাখবে না। এটা শেওনায়াজ শেখের আদেশ।❞
শেওনায়াজ শেখের হুকুমনামা জারি হওয়ার পরপরই পিছন থেকে কেউ একজন গম্ভীর স্বরে বলে উঠে,
❝আমি মানি না এই হুকুমনামা, দাদাজান। আপনি ফিরিয়ে নিন এই হুকুমনামা।❞
শেওনায়াজ শেখের চোখ দুটো মুহূর্তে টকটকে লাল হয়ে গেল। তিনি চমকে পিছনে তাকালেন। তাঁর চোখজোড়া যা দেখল, সেটাকে ঠিক বিশ্বাস করতে তাঁর বিচক্ষণ মস্তিষ্ক সামান্য সময় নিলো, যেন কোনো জটিল অঙ্কের সমাধান মেলাতে গিয়ে হঠাৎ একটা সহজ কিন্তু অবিশ্বাস্য উত্তর চলে এসেছে।
দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে আছে আদিল। আর তার পাশে, সম্পূর্ণ নতুন বউয়ের সাজে, একজন বিদেশি মেয়ে।গালে তার সামান্য লালের ছোঁয়া, চোখে গভীর সরলতা, কিন্তু এই পরিবেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান। একটি অচেনা ফুল যেন ভুল করে একটি শুকনো জমিতে ফুটে উঠেছে।
শেওনায়াজ শেখের বিচক্ষণ মস্তিষ্ক এতক্ষণ যা বোঝার বুঝে নিয়েছে। আর কোনো হিসেব বাকি নেই। সব পরিষ্কার। একেবারে ঝকঝকে জলের মতো। এই সহজ সত্যটা মেনে নিতেই তাঁর সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল।
আদিল সবে এক পা দরজার ফ্রেমে রেখেছে, ঠিক তখনই শেওনায়াজ শেখ হুংকার দিয়ে উঠলেন। ঘরের মধ্যে আচমকা একটা বাজ পড়ার মতো শব্দ হলো।
❝দাঁড়াও!বেরিয়ে যাও তুমি তোমার নব বধূয়াকে নিয়ে। এই শেখ পরিবারে তোমার মতো উশৃঙ্খল ছেলের কোনো জায়গা হবে না। আমি কোনো খ্রিষ্টান মেয়েকে এই পরিবারের বউ হিসাবে মানবো না। কিছুতেই না।❞
আদিল শেওনায়াজ শেখের কথা শুনে সামান্য নড়ে উঠল। তার রাগটা সাধারণত চাপা থাকে। রাগলে ছেলেটার চোখ ছোট হয়ে আসে, ঠোঁট কাঁপে সামান্য। যেই ছেলে কোনোদিন তার মুখের উপর একটা টু শব্দও করেনি। আজ এই সামান্য মেয়েটার জন্য সে মুখ খুলল, বুক টানটান করে দাঁড়াল।
❝অনেক তো করলেন দাদু। কি করতে পারলেন এতকিছু করে? ভাগ্যের লেখা কি খণ্ডাতে পেরেছেন? তাহলে কীসের এত অহংকার আপনার? জোর করে কি সংসার করানো যায়? তাছাড়া ভালোবাসা তো কোনো অপরাধ নয়।”
শেওনায়াজ শেখ নাতির এমন সাহস দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি আর এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারলেন না। ক্রোধে তাঁর হাত কাঁপছিল। লাঠিটা সশব্দে ছুরে ফেলে দিলেন ফ্লোরের ওপর। শব্দটা গোটা বাড়িতে প্রতিধ্বনিত হলো।তিনি চিৎকার করে উঠলেন, তাঁর গলা ভেঙে আসছিল,
❝ভালোবাসা পাপ নয় তবে বিধর্মীর ছেলে-মেয়েকে ভালোবাসা পাপ! ঘোর পাপ!❞
কথাটি বলেই তিনি বাঁ হাতে নিজের কালো পাঞ্জাবির ভাঁজ ঠিক করলেন। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুললেন। তাঁর চোখ দুটো সামান্য কুঁচকে গেল। তিনি তাঁর লোকেদের দিকে ফিরে আদেশের সুরে বলে উঠলেন,
❝আদিলকে এই মুহূর্তে ঘরে বন্দি কর! খবরদার, সে যেন বের হতে না পারে। আর এই মেয়ের বিচার… কাল সকলের সামনে করা হবে! সবাই দেখুক, শেখ পরিবারের বেয়াদবির শাস্তি কেমন হয়!আর ইনায়াকে যেইখানে পাবি ধরে নিয়ে আসবি না আসতে চাইলে চুলের মুঠি ধরে টেনে আনবি।❞
কথাটি বলে শেওনায়াজ শেখ আর এক মুহুর্তও সেইখানে দাঁড়ায় না। পিছনে আদিল জুলিকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য খুব করে তার দাদুর কাছে আকুতি মিনতি করছিলো। পাষান মন কি আর ভালোবাসার গুরুত্ব বুঝে।
করাচি এয়ারপোর্ট তখন মধ্যরাত পার করে ফেলেছে। শহরটা ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু এখানে ঘুম নেই। চারদিকে আলোর তীব্রতা। এই তীব্র আলো-আঁধারিতে একটি কালো গাড়ি এসে দাঁড়ালো। ধীরেসুস্থে নয়, যেন কোনো জরুরি কাজের তাড়া আছে। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দটা কিছুক্ষণ ধরে বাজতে থাকলো, তারপর হঠাৎ থেমে গেল।
গাড়ি থেকে দ্রুত ভঙ্গিতে বেরিয়ে এল এরিক। তার তীক্ষ্ণ নজরে আশেপাশে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। এরপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘ, শীতল শ্বাস টানলো। পেছনে গাড়ির ভেতরে ইনায়া গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে এই মেয়েটা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, আর সে তার কিছুই জানলো না। এরিক ভাবলো,
❝এই মেয়েটার কি কোনো হুঁশ আছে? নাকি জগৎ-সংসারের কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করে না?❞
সে ইনায়াকে ভালোবাসে। কী আশ্চর্য সরল কথা! অথচ এই সরলতার পেছনে কী ভয়ানক এক ঘূর্ণিপাক লুকিয়ে আছে, তা আর কেউ না জানুক, এরিক জানে। খুব ভালোবাসে কিনা। আর এই ভালোবাসাকে জয় করার জন্যই এরিক আজ সীমা অতিক্রমের খেলায় মেতেছে।
মানুষ কি আর সহজে তার চেনা খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে পারে? পারে না। যারা আসে, তারা হয় পাগল, নয়তো কিছু একটা হয়ে যায়। কেমন ছিলো সে আগে, আর এখন এই মেয়েটা তাকে কি বানিয়ে ছেড়েছে! ভাবলেও হাসি আসে।
এতো এতো ছক, এতো কৌশল—সব ই তো এই একটি মেয়েকে হাসিল করার জন্য। এরিকের মনে হয়, এই মেয়েটার জন্য সে পুরো পৃথিবীটাকে একটা দাবার ছক বানাতে পারত। বানিয়েছেও হয়তো। পৃথিবীর সব মানুষ সেখানে তার ঘুঁটি।
মিস্টার রিচার্ড আর শেওনায়াজ শেখের মতো চতুর দুই লোকের নাকের ডগা দিয়ে ইনায়াকে তুলে আনা চারটি খানি কথা । তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ইনায়াকে তুলে আনা কি এতোই সহজ ছিল এরিকের পক্ষে? কথাটা মোটেও সত্যি নয়। তবে কঠিন কাজটাই এরিক সহজে করে ফেলেছে। ব্যাপারটা অনেকটা এইরকম অসম্ভব বলে কিছু নেই, শুধু একটু বুদ্ধি খরচ করতে হয়।
এরিক আপন মনে হাসলো। বিজয়ীর হাসি। এই হাসিতে কোনো শব্দ নেই, শুধু এক হিমশীতল তৃপ্তি। বাবার সাথে যা বাকি আছে, তা আমেরিকায় গিয়ে হবে। ওটা পাওনা। পাওনা আদায় করতে এরিক অ্যাসফোর্ড কখনো পিছপা হয় না।
এইসব ভাবতে ভাবতে এরিকের মুখে একটা ডেভিল হাসি ফুটে উঠলো । হাসিটা অদ্ভুত। আনন্দও নেই, দুঃখও নেই। শুধু একটা হিসেব মেটানোর তৃপ্তি। সে পকেট থেকে ফোন বের করে জ্যাকের নাম্বারে ডায়াল করলো,
জ্যাক এট অ্যানি কস্ট আমার একটা প্রাইভেট জেটের ব্যবস্থা কর ।আমি আজ’ই আমেরিকায় ব্যাক করতে চাই।❞
জ্যাক ফোনের ওপাশ থেকে আমতা আমতা করে উঠলো। তার কারণ মিস্টার রিচার্ডের তার উপর সন্দেহ হয়েছে। সে পুরো ফোকাস জ্যাকের উপর রেখেছে। জ্যাক এরিককে ইনফোকম করে সমস্তটা বললো,
❝বস্, এই মুহুর্তে আপনার এইখানে আসাটা রিস্কি হয়ে যাবে। আপনি ম্যামকে নিয়ে ব্যাক করুন। স্যারের পুরো ফোকাস এখন আপনার উপর। ❞
এরিক জ্যাকের কথার কোনরকম গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন করলো না বরং সে গম্ভীর কন্ঠে জ্যাককে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
❝আই ডোন্ড ফাকিং কেয়ার! আমার এক ঘন্টার মধ্যে প্রাইভেট জেট চাই। কীভাবে ম্যানেজ করবে
দ্যাটস্ নট মাই বিজনেস। ❞
কথাগুলো বলেই এরিক ফোন কেটে দিলো।এইদিকে জ্যাক এরিকের দায়ছাড়া ভাব দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
মিস্টার শেওনায়াজ শেখ অত্যান্ত রাগি ভঙ্গিতে নিজের চেয়ারে বসে রয়েছেন। আজ তিনি যতটা অপমানিত হয়েছেন এর আগে এতটাও অপমানিত হননি। তার ভাবনার মাঝে ফোনে নোটিফিকেশন বেজে ওঠে। তিনি ফোনটি হাতে নিতেই স্কিনে ভেসে উঠলো প্রাইভেট নাম্বার থেকে একটা মেসেজ,
❝বলেছিলাম না যেটা আমার সেটা সহজে আমি অন্য কারো হতে দিবো না প্রয়োজনে তুলে আনবো তাও তার নামের সাথে আমি হিনা অন্য কারো নাম বরদাস্ত করবো না। ❞
মেসেজটা পড়ে আর বুঝতে বাকি রইল না, কার কাজ এটা। ওই বদমাশ ছেলেটা। শেওনায়াজ শেখের ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটল। রাগ আর হাসির একটা মিশ্রণ, ঠিক যেমন তেঁতুলের আচার খেলে হয়।
ছেলেটা একটা ভয়ংকর জিনিস। ভয়ংকর হওয়া ভালো, ভয়ংকর হওয়া জরুরি। তবে বোকামি করা ঠিক না। এই মেসেজ পাঠানোটা চূড়ান্ত বোকামি।
শেওনায়াজ শেখের রাগ এবার যেন একটা আকার পেল। তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
হাতের মুঠোয় ধরা ফোনটা তিনি সপাটে ছুঁড়ে মারলেন উল্টো দিকের দেওয়ালে। ঝন করে একটা শব্দ হলো। এক মুহূর্তের মধ্যেই ফোনটা দু’টুকরো হয়ে গেল। একটা টুকরো পড়ল তাঁর পায়ের কাছে, অন্য টুকরোটা গিয়ে পড়ল কার্পেটের ওপর।
❝এরিককে আপনি সাহায্য করেছেন তাইনা তানভীর। ❞
নিজের স্ত্রীর মুখে এমন কথা শুনে তানভীরের মুখটা কিছুটা হাঁ হয়ে গেল। এমনটা হওয়ার কথা না। এই বিষয়টা তো এত সহজে কারো জানার কথা নয়। মারিয়া কীভাবে জানল? সে কি সত্যিই জেনেছে, নাকি আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ছে?
তানভীর চুপ করে থাকল। এর উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলাটা ঠিক হবে না। আপাতত চুপ থাকাই ভালো।
তানভীরের মুখের ভাব দেখে মারিয়া আরও একটু হাসল,
❝আমি জানতাম তানভীর। ইনায়ার সাথে এতো বড় অন্যায় আপনি হতে দেবেন না। এতটাও পাষাণ আপনি নন। কিন্তু এরিক তো খ্রিস্টান। তাহলে তাকে সাহায্য করলেন কেন?❞
তানভীর এবার হাসল, তবে সেটা মুচকি হাসি। এই হাসিটা খুব সহজে কেউ বুঝতে পারে না। এর মধ্যে অনেক কিছু লুকিয়ে থাকে তৃপ্তি, দুঃখ এবং সামান্য এক ধরনের বোকামি।
সে তো আগেই জেনে ফেলেছে, নিজের বিশ্বস্ত লোকেদের কাছে যে এরিক কালিমা পড়েছে। নাম বদলে ফেলেছে। এখন সে আর এরিক নয়, সে ‘আব্রাহাম’
তানভীর ভাবল, মারিয়াকে এখন সব বলে দেওয়া যায়। আবার না বললেও ক্ষতি নেই। গোপন কথা গোপন থাকাই ভালো।
”কারণ আছে, মারিয়া, তানভীর বলল, “গোপন কারণ। তবে আসল কারণ হচ্ছে, এরিকের মতো করে কেউ আমার বোনকে ভালোবাসতে পারত না।”
মারিয়ার চোখে সামান্য বিস্ময় ফুটে উঠলো।তানভীর এই কথা বলছে তার বিশ্বাস হচ্ছে না।
তানভীর আবার বলতে শুরু করল,
অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩৫ (২)
“নিজের বোনের সুখের জন্য আজ আমাকে আমার দাদাজানের সাথে, এই শেখ পরিবারের সম্মানের সাথে বেইমানি করতে হলো। জানো তো, সম্মান জিনিসটা বড় অদ্ভুত। কখনো মানুষের হাসির চেয়েও দামি হয়ে যায়।”
মারিয়া এগিয়ে এসে তানভীরের হাতটা ধরল। হাতের স্পর্শে তানভীরের বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।
”আপনি ভুল করেননি, তানভীর,” মারিয়া বলল। “ভালোবাসার চেয়ে বড় সম্মান আর কী আছে?”
তানভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে হলো, এতক্ষণের চাপা একটা কষ্ট যেন হালকা হয়ে গেল। আসলে সে একটা কঠিন কাজ করেছে, যা শেখ পরিবারে কেউ সাহস করত না।
