Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩৫ (২)

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩৫ (২)

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩৫ (২)
নুরিয়া ইসলাম

সময়ের পাতায় দেখতে দেখতে কাঙ্খিত মুহূর্তটা চলে এসেছে। আজ ইনায়ার বিয়ে। বিশাল এক আয়োজন চলছে শেখ বাড়িতে। বসার ঘরে ব্যান্ড পার্টি প্রস্তুত। সানাই বাজবে যে কোনো সময়। এলাহি ভোজের গন্ধে ম-ম করছে চারপাশ।
​ইনায়া বসেই আছে ড্রেসিং টেবিলের সামনে। পুরো শরীর জুড়ে বিয়ের সাজ। মূল্যবান বেনারসি, সোনার গয়না গায়ে জড়ানো। মাথায় লম্বা একটা ওড়না টেনে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইনায়ার চোখ আয়নার দিকে নেই। সে শূন্য দৃষ্টিতে সামনের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। দেয়ালে একটা পুরোনো ক্যালেন্ডার ঝুলছে। ক্যালেন্ডারের তারিখটা তার কাছে অর্থহীন।

​সে একমনে নিজের পেটে হাত রাখে। খুব সন্তর্পণে। সামান্য একটা নতুন প্রাণের অস্তিত্ব সে নিজের মধ্যে অনুভব করে। এটা এরিকের সন্তান। ইনায়ার বুকটা হু হু করে উঠল।
​এরিক। নামটা মনে আসতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কী অদ্ভুত সুন্দর সময় ছিল তাদের। বসন্তকালের মতো। এখন শরৎকাল। পাতা ঝরার দিন।
​ইনায়া নিজের মনকেই প্রশ্ন করে উঠল। বিড়বিড় করে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

​—অন্তরে একজনকে রেখে সে কিভাবে আরেকজনের নামে কবুল করবে? আর এই সন্তানের ই বা কি হবে? এই বদনাম দিয়ে শুরু হওয়া জীবন কি তাকে শান্তি দেবে?
​প্রশ্নটা ইনায়ার একান্ত নিজস্ব। কেউ শোনার কথা না। তবু মারিয়া শুনল। সে ইনায়ার মাথা থেকে পড়ে যাওয়া ওড়নাটা ঠিক করে দিল। ওড়নাটা হালকা গোলাপী রঙের। ইনায়ার ফর্সা মুখে ভালো মানিয়েছে।
​মারিয়া শান্ত স্বরে বলল,
​—আরেকবার ভেবে দেখ ননদীনি! এখনো সময় আছে। একটা ভুল সারা জীবনের কান্না হয়ে থাকতে পারে।
​মারিয়ার কথা শুনে ইনায়া ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো। সে তাকাল মারিয়ার দিকে। মারিয়ার চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠেছে। সামান্য ভয়ও আছে।
​ইনায়া আবার আয়নার দিকে তাকাল। নিজেকে দেখতে পেল। যেন একটা পুতুল। পুতুলদের কোনো কষ্ট হয় না। তাদের কোনো ইচ্ছা-অনিচ্ছা নেই।

​—আসলে তাকদির জিনিসটাই ভয়ানক, ভাবি! ইনায়া নিচু গলায় বলল।
​—তাকদিরে না থাকলে হাজার চেষ্টা করলেও সেই জিনিসটা পাওয়া যায় না। কয়জনে নিজের ভাগ্যকে বদলাতে পেরেছে, ভাবি! আমি ভাগ্যকে মেনে নিতে বাধ্য।
​কথাগুলো বলতে গিয়ে ইনায়ার চোখ থেকে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। চোখের কাজল লেপ্টে যাচ্ছে। ইনায়া দ্রুত চোখ মুছে নিল। তার ঠোঁটে এক টুকরো তিক্ত হাসি দেখা গেল। হয়তো এইখানে সবকিছু শেষ বা এইখান থেকে সবকিছু আবার শুরু হবে।
​ইনায়াকে চুপ করতে দেখে মারিয়া তার হাতটা ধরল। খুব নরম করে স্পর্শ করলো। মারিয়া ইনায়াকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেল না। সামান্য ইতস্তত করে বলল,

​—চুপ করে গেলে যে! তোমার মুখে তো সবসময় হাসি লেগে থাকতো, ইনা!
​মারিয়া ইনায়ার মাথায় হাত রাখল। চুলের বিনুনির দিকে তাকিয়ে বলল,
​—“চুলগুলো সুন্দর করে বেঁধেছি। দেখতে অপূর্ব লাগছে তোমায়।”
​মিথ্যা কথা বলল মারিয়া। জানে, ইনায়ার ভালো লাগছে না।
​ইনায়া মারিয়ার দিকে তাকাল। চোখ দুটো লাল হয়ে রয়েছে। সারারাত নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবেছে হয়তো মেয়েটা।

​—ভাষা হারিয়ে ফেলেছি! ইনায়া অতি সন্তর্পণে বলল। কথাটি বলতে গিয়ে তার গলার স্বর কেঁপে কেঁপে উঠছিলো।
​—বলার কি কিছু আছে? ভাগ্যকে স্বীকার করে নেওয়াটাই সবার জন্য ভালো।
​মারিয়া গভীর দৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানে ইনায়ার এই ‘স্বীকার করে নেওয়া’ আসলে এক ধরণের আত্মসমর্পণ। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ যেমন করে।
​মারিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ইনায়াকে কোনো উপদেশ দিতে সাহস পেল না। এই ধরনের পরিস্থিতিতে উপদেশ দেওয়ার মতো বোকা সে না। সে আস্তে করে বলল,
​—এরিকের সঙ্গে একবার কথা বলবে? শেষবারের মতো?
​ইনায়া দ্রুত মাথা নাড়ল।
​—না। তাকে বলা যাবে না। তুমি তো জানো ভাবি সে কতটা বেপরোয়া আর উন্মাদ পুরুষ। আমি চাই না, তার উন্মাদনায় সবকিছু ধ্বংস হোক। এই সন্তানকে নিয়ে আমি একা লড়ব।
​কথাটি বলে ইনায়া মৃদু হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না।

মণ্ডপের মাঝখানে ইনায়া বসে আছে। জাঁকজমকপূর্ণ বেনারসী আর ভারী গহনায় আবৃত তার শরীর। কিন্তু তার ভেতরের সত্তাটি কেবলই একটি সুতোর উপর দুলছে। এতক্ষণ তার মনটা ছিল এক অনিশ্চিত, চাপা ব্যথায় ভারাক্রান্ত। সে অপেক্ষা করছে। তার সমস্ত মনোযোগ মণ্ডপের বাইরের দিকের গেটে।
—তার মনে হচ্ছে, রূপকথার নায়কের মতো এরিক হয়তো সব প্রহরার চোখ ফাঁকি দিয়ে এসে তাকে এই ভীড়ের মাঝখান থেকে ‘ছিনিয়ে’ নেবে যেমনটা সিনেমার নায়কেরা করে থাকে। তার সমস্ত সত্তা সেই দুঃসাহসী প্রত্যাশায় চঞ্চল হয়ে উঠছে। পরমুহূর্তেই কঠোর বাস্তবতার রুক্ষ কাঁটা তাকে বিদ্ধ করে। সে উপলব্ধি করে, শেওনায়াজ শেখের নিশ্ছিদ্র প্রহরার এই দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর ভেদ করে তার প্রিয়তমের আগমন অসম্ভব।
তার মুখটা এক পলকে ফ্যাকাশে হয়ে যায়, ঠোঁট দুটো শক্ত করে সে নিজেকে সামলে নেয়।
​চারিদিকে উৎসবের আমেজ। ফুরফুরে বাতাস বইছে। বরযাত্রীর অপেক্ষায় সবাই উৎসুক। হলরুম জুড়ে আত্মীয়-স্বজনদের কলরব। বিলাসবহুল সাজসজ্জা যেন নিজেদের আভিজাত্য জাহির করছে। মিস্টার শেওনায়াজ শেখ কোণের দিকে একটি সুসজ্জিত চেয়ারে বসে আছেন। তার মুখে কাঠিন্য ফুটে উঠেছে , কিন্তু ভেতরের অস্থিরতা ঢাকতে তিনি বারবার হাতের ঘড়িটির দিকে তাকাচ্ছেন।

​কাজীর তাড়া পেয়ে বাহাদুরকে পাঠানো হয়েছিল আদিলকে ডাকতে। কাজীর আদেশ পাওয়া মাত্রই সে ছুটেছিল, কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে গেল বাহাদুরের ফেরার নাম নেই। শেওনায়াজ শেখ ঘড়ি দেখে বিরক্ত হলেন। ঠিক তখনই, বিয়ে বাড়ির মাঝখান থেকে বাহাদুর ছুটে এল। তার জামা এলোমেলো, চোখে-মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক। সে হাঁপাতে হাঁপাতে দম ফুরিয়ে যাওয়া গলায় চিৎকার করে উঠল,
—​”বড়সাহেব! ও বড়সাহেব! সর্বনাশ হয়েছে। আদিল বাবাজান… আ-আদিল বাবাজান আটোতে চড়ে কোথায় একটা চলে গেল, বড়সাহেব!”

​কথাটা যেন পুরো বিয়ে বাড়িতে বোমার মতো ফাটল।
​রুখসানা বেগম, যিনি শেখ বাড়ির বউ হলেও সর্বদা নিজেকে বাড়ির ‘সর্বেসর্বা’ ভাবে, তার ধারালো চোখ-কান সবসময়ই এমন অঘটন ধরার জন্য প্রস্তুত থাকে। তিনি মুহূর্তেই চেয়ার ছেড়ে বিদ্যুতের বেগে এগিয়ে এলেন। তার মুখমণ্ডল ক্রোধে কুঁচকে গেল। তিনি বাহাদুরকে একেবারে জাপটে ধরে ধমকে উঠলেন,
—​”কী বলছিস? সাহস কত তোর! স্পষ্ট করে বল! বর পালিয়েছে মানে? তোর মাথা ঠিক আছে তো?”
​বাহাদুর ভয়ে কাঁপছে। সে থুতু গিলে মিনমিন করে বলল,
— “হ্যাঁ, মালকিন। সত্যি বলছি। আমার চোখের সামনে দিয়ে… আদিল বাবাজান চলে গেল। বলল, ‘আমার দ্বারা এত বড় অন্যায় কাজ হবে না’।”
​কথাটি এক কান দু’ কান হতে হতে পুরো বিয়ে বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল। গুঞ্জন শুরু হলো চারিপাশে । ফিসফাস মুহূর্তেই চাপা কলরবে পরিণত হলো।

​পাশের পাড়ার মজিদের মা, যিনি সবসময় খুঁতখুঁতে স্বভাবের জন্য পরিচিত, তিনি হাত নাড়িয়ে বললেন,
—”বলিহারি যাই! বর পালিয়েছে! এখন এই মেয়েটার কি হবে? একি কম অপমান!”
​পেছন থেকে আর একজন মাথা ঝাঁকিয়ে টিপ্পনী কাটল,
—”আরে মশাই, চেয়ারম্যান সাহেব তো মনে করেন তিনি এলাকার মোড়ল। পুরো এলাকার মানুষকে তো শাসন করতে করতে নিজের পরিবারের দিকে নজর দিতে ভুলে গেছেন। ঘরের খবর রাখেন না,কিন্তু তিনি পরের খবর ঠিক রাখেন!”

রুখসানা বেগম, ঠিক এই মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। এটি ছিল তার বহুদিনের চাপা ক্ষোভ প্রকাশের সেরা সুযোগ। তিনি সটান হয়ে ইনায়ার দিকে আঙ্গুল তুলে দাঁড়িয়ে গেলেন। তার চোখে-মুখে এক বিজয়ের ক্রূর হাসি ফুটে উঠেলো। পুরনো সব কিছুর হিসেব আজ সে ইনায়ার থেকে নিবে।রুখসানা বেগমের মূলত ইনায়ার প্রতি এতো ঘৃণা তার মা হাফসা বেগমের জন্য। বিয়ের পর থেকেই ছোট বউ হয়েও সব দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছে। সে এই বাড়ির বড় বউ হওয়ার সত্বেও প্রতিনিয়ত শাশুড়ীর মুখ থেকে তিক্ত কথা শুনতে হয়েছে। তার শাশুড়ী হাফসা বলতে পাগল আজ সে সুযোগ পেয়েছে তার মেয়ের থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার, আজ সে পিছে হেটবে না। তাইতো, তিনি গলা চড়িয়ে , যাতে সবার কানে যায়,এমনভাবে কথাটি বললেন।

—​”এটা তো হওয়ারই ছিল! হতেই তো হবে। কেই বা অন্যের পাপের ফসলকে নিজের নাম দেবে?
​রুখসানা বেগমের কথা শুনে পুরো বিয়ে বাড়িতে হৈচৈ পড়ে গেল। সবার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে আসলে এখানে কি হচ্ছে আর বর-ই বা পালালো কেন? নানান রকম মানুষের মুখে নানান ধরনের মন্তব্য শুনে শেওনায়াজ শেখের মাথা নিচু হয়ে গেল। তিনি নিজের ইগোকে ধরে রাখতে পারলেন না। ক্রোধে তার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠল। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে গর্জে উঠলেন,
—​”বিয়ে হবে! এই মুহূর্তেই এইখানে হবে এবং আদিলের সাথেই হবে! একটা নচ্ছার ছেলের জন্য আমার মান-সম্মান ডুববে না!”
​কথাটি বলেই শেওনায়াজ শেখ তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ও বিশ্বস্ত লোকদের আদেশ দিলেন,

— “তোরা যা। এখনই যা। আদিলকে ধরে আনবি। টেনে-হিঁচড়ে হোক বা মারধর করে—তাকে আমার সামনে হাজির করবি। এক্ষুনি!”
​তার ইশারা পেতেই পাঁচ-ছয়টা গাড়ি নিয়ে সবাই বেরিয়ে গেল।
​মুহূর্তেই পুরো বিয়ে বাড়ির মধ্যে আবারো গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। এবার গুঞ্জনের কেন্দ্রবিন্দু কেবল আদিলের পলায়ন নয়, ইনায়া। পাড়ার মহিলারা ইনায়াকে নিয়ে সরাসরি বাজে কথা বলা শুরু করে দিলেন। তাদের কণ্ঠস্বর চড়তে শুরু করল।
​রহিমা বেগম, যার ছেলে প্রায়ই ইনায়ার দিকে তাকিয়ে থাকত, তিনি দাঁত কিড়মিড় করে বললেন,
— “এই মেয়েটার সাথে নাকি ওই খ্রিষ্টান ছেলেটার সম্পর্ক ছিল। দেখেছিস! আদিলটা সেই কারণেই পালিয়েছে।
​আরেকজন মহিলা, যিনি শেওনায়াজ শেখের বাড়িতে প্রায়ই কাজের অজুহাতে ঘোরাফেরা করেন, তিনি মুখ টিপে ধরে বললেন,

—”আমার উনি এই বাড়িতে কাজ করে, কত কথা শুনেছি! এই মেয়ের সাথে নাকি ওই খ্রিষ্টান ছেলেটা রাত কাটিয়েছে? ছিঃ! এই জন্যই তো বলছি, ধর্ম-কর্ম সব রসাতলে গেছে।”
​তাদের কথোপকথনের মধ্যে পাড়ার সবচেয়ে রক্ষণশীল মহিলা বলে উঠলেন,

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩৫

—”ছিঃ, ছিঃ! আজকালকার মেয়েদের মধ্যে সামান্যতম লজ্জাবোধ নেই। নিজের ধর্মের মধ্যে হলেও একটা কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত কিনা বিধর্মী ছেলে! ছিঃ! ধর্ম বলেও তো একটা কথা আছে নাকি! এই মেয়ে সমাজকে গোল্লায় দেবে।”
​তাদের চাপা কণ্ঠস্বর এবং অঙ্গভঙ্গিগুলো ইনায়ার দিকেই ইঙ্গিত করছে। ইনায়া পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। সে এখন আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৩৫ (৩)