অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৩
ফাহিমা ইসলাম
নিশীথের নিগূঢ় নৈঃশব্দ্য ভেদ করে আজ রজনী যেন এক উন্মত্ত উল্লাসে আত্মবিসর্জন দিয়েছে। আকাশের গাঢ় কৃষ্ণাভ ক্যানভাস জুড়ে আজকে আর চাঁদের দেখা মিললো না। বইতে থাকা বাতাসে ধরণী আজ শুচিশুভ্র, বাতাসের তাণ্ডবী হুংকারে কেঁপে উঠছে নিঃসঙ্গ বৃক্ষরাজি, ছিন্নভিন্ন হয়ে উড়ছে শুকনো পাতা। রাতে হয়তো ভুবন কাঁপিয়ে বৃষ্টি নামবে। গৃহপ্রাচীরের বাইরে ঝড়ের উন্মত্ততা যেমন অসংযত, তেমনি ভেতরে রুমল জমে উঠেছে আরও গভীর এক নিস্তব্ধ অন্ধকার।রুমের কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে তূর্ণা,একটি ভাঙা মন,
একটি আতঙ্কিত সত্তা,একটি অবহেলিত অস্তিত্ব। তূর্ণার এলোমেলো চুলগুলো মুখমণ্ডল ঢেকে রেখেছে, অশ্রুসিক্ত গাল বেয়ে শুকনো রেখার দাগ স্পষ্ট। দু’হাত জড়িয়ে রেখেছে হাঁটুর চারপাশে, যেন নিজেকেই আঁকড়ে ধরে আছে। ভয় পাচ্ছে, যদি হাত ছেড়ে দেয়, তবে সেও হারিয়ে যাবে এই নির্মম পৃথিবীর ভিড়ে। রোদেলা জবা সিকদারের কাছে, বাচ্চাটা জ্বর হয়েছে বিকেল থেকে। তূর্ণার ওষ্ঠাগত কাঁপছে তিরতির করে,
অস্পষ্ট, ছিন্নভিন্ন কিছু শব্দ বেরিয়ে আসছে বারবার-
“সবাই চলে যানে,,সবাই যাবে কেউ থাকবে না… আমি একা,আমি একা।”
বলতে বলতে তূর্ণার হঠাৎ হেসে উঠলো,একটি অস্বাভাবিক, বেদনাভারাক্রান্ত হাসি আবার মুহূর্তেই সেই হাসি ভেঙে যাচ্ছে করুণ কান্নায়।
“আমি ভালো না,আমি,, আমি পাগল!!” ‘নিজের মাথায় নিজেই আলতো চাপড় দিতে থাকে।
“তাই না? তাই না? তাইলে সবাই চলে যায় কেনো?”
এমনটা তার সঙ্গে হওয়াটা নতুন নয়। যেদিন তার ভিতরকার কষ্টগুলো অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন এমন আচরণ শুরু করে দেয়। এমনটা করার জন্য সেলিমা খাতুনের কাছ থেকে মার খাওয়া লাগতো, কিন্তু এখানে মার দেওয়ার মত কেউ নেই। রুমা সিকদার হাতে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে, বিষয়টা তিনি জবা সিকদারকেও জানিয়েছেন। মিথিলার এমন কাজে তিনিও অবাক হয়েছে, রৌদ্রিক মেনে নেওয়ার পর জবা সিকদার আর তূর্ণাকে কোনো প্রকার হাত তোলেননি। রাশেদুল সিকদারও কড়া ভাবে বাড়ির বউয়ের গায়ে হাত তোলা থেকে নিষেধ করে দিয়েছে। যত যাইহোক তূর্ণা এখন এই বাড়িই বউ, রৌদ্রিকের চোখে এইসব পরলে চুপ করে থাকবে না সে। দেখা গেলো রেগে-মেগে কি করে বসবে আল্লাহ জানে। দুপুরেট পর তূর্ণা আর বাহিরে বের হয়নি, রুমা সিকদার রুমে এনে রেখে গেছেন এখানেই আছে। রোদেলাও নেই সঙ্গে তাই তূর্ণার যে নিজের মধ্যে থাকা দলা পাকানো কষ্টটাকে সড়িয়ে তার সঙ্গে কথা বলবে। রুমা সিকদার এসে খাইয়ে দিয়ে গেছেম রাতে জোর করে। এই নিয়ে রুমা সিকদারের হাতে দুইবার খেলো তূর্ণা।
তূর্ণা এই জিনিসটা একদমই হাত ছাড়া করেনি। জীবনে প্রথমবার কেউ এত স্নেহ জড়িয়ে নিজ হাতে তুলে খাইয়ে দিয়েছে তাকে। সবসময় রূপাকে আর সোহেলকেই সেলিমা খাতুন আর লুকমান হোসেনকে খাইয়ে দিতে দেখে দূর থেকে। তাই যখন প্রথমবার রুমা সিকদার তূর্ণাকে খাইয়ে দিয়েছি তূর্ণা হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল, আলাদা এক তৃপ্তি পেয়েছি তার তৃষ্ণার্ত হৃদয়! আর আজকেও খাওয়ার হাতটা কে’টে গিয়েছে, তাই রুমা সিকদার নিজেই তুলে খাইয়ে দিয়েছে। মিথিলার কথাগুলো এখনো তূর্ণার কর্ণকুহরের রিনরিন শব্দ করে বেজে চলেছে, বার বার মনে হচ্ছে তার সামনে মিথিলা রক্তচক্ষু করে তাকিয়ে বলছে-
“ তুমি পাগল, সবাই তোমাকে ফেলে চলে যাবে। পাগলকে কেউ ভালোবাসে না, পাগল পাগলই থাকে। এরা কোনোদিন ঠিক হয় না!”
তূর্ণার দুই কান চেপে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে ওঠে-
“ তুমি খুব পঁচা,খুব পঁচা! আমি, আমি ঠিক হব। আমি ঠিক হব। ”
বলতে বলতে চুপ হয়ে যায় তবে ফোঁপানি বন্ধ হয় না।
ঠিক সেই সময়েই দরজাটা খট করে খুলে যায়, প্রবেশ করলো রৌদ্রিক। কোলে তার ঘুমন্ত রোদেলা। দীর্ঘ কর্মব্যস্ততার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফিরেই জবা সিকদারের কাছে চলে গেছিলো। রোদেলার জ্বর আসচ্ছে শুনেই তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করেছে। রৌদ্রিকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কুঁচকিয়ে এলো মুহুর্তেই। রুমটা কেমন নিস্তব্ধতায় ঘেরা হয়ে আছে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মুহূর্তেই টের পেলো অস্বাভাবিকতার গাঢ় ছায়া। চারপাশের নিস্তব্ধতা, সেই সঙ্গে ভেসে আসা অসংলগ্ন শব্দ। রৌদ্রিক দেরি না করে রুমের সব লাইট আন করতেই রুমের এক কোণে তূর্ণাকে হাঁটুর ভাজে মুখ লুকিয়ে থাকতে দেখতে পায়। মুহুর্তেই কুঁচকে যাওয়া ভ্রুটা আরও কুঁচকিয়ে আসলো। ধীর পায়ে বিছানায় এগিয়ে দিয়ে রোদেলাকে আস্তে করে শুইয়ে দিল, তূর্ণা এতক্ষণ মুখ তুলে তাকানো। নেত্রজোড়া অসম্ভব রকমে লাল হয়ে আছে, সঙ্গে ফুলে উঠেছে। রৌদ্রিক বুঝলো না এই অবস্থার কারণ, দ্রুত পায়ে সে এগিয়ে এলো তূর্ণার নিকট দিকে।
“তূর্ণা…”
গভীর কিন্তু অতি কোমল স্বরে ডেকে উঠলো সে।তূর্ণা চমকে উঠলো। আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে যেন অচেনা কাউকে দেখছে। রৌদ্রিককে দেখে অস্বাভাবিক ভাবে বলে ওঠে-
“না… না… তুমি আসো না, তুমি চলে যাবে। সবাই যাবে।”
সে মাথা নাড়িয়ে পেছনে সরে যেতে চাইল।
রৌদ্রিক বুঝলো না কি হয়েছে, তারপরও তূর্ণাকে শান্ত করার জন্য জিজ্ঞেস করে-
“আমি কোথাও যাচ্ছি না, তূর্ণা। তুমি ভয় পেও না।”
তূর্ণা বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে-
“সত্যি? তুমি যাবে না…?”
রৌদ্রিক তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে, চোখের সমতলে এনে নিজের দৃষ্টি স্থির করে শান্ত গলায় বলে-
“হ্যাঁ, আমি যাব না। আমি আছি, তূর্ণা। তোমার পাশে আছি।”
এই ‘পাশে আছি’ শব্দদুটি যেন তূর্ণার ভেতরের ভাঙা প্রাচীরে একটুখানি আশ্রয়ের আলো ফেলে।
তূর্ণা রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টিয়ে কেঁদে দেয়। কান্না করতে করতে বলে-
“ পঁচা আপু বলেছে আপনিও নাকি আমাকে ফেলে চলে যাবেন। আমি আমাকে সবার মত দূরে ঠেলে দিবেন, আর..আর আমি কোনোদিন ঠিক হব না। ডাক্তার মিথ্যে কেনো বলেছে বর?”
তূর্ণার কথায় রৌদ্রিক কৌতূহলী জিজ্ঞেস করে-
“ কাঁদছো কেনো? কেউ কিছু বলেছে? আর হাতে ব্যথা পেয়েছো কিভাবে?’
তূর্ণা ফোলা ফোলা চোখ তাক করে বলে-
“ আপনি আমায় মিথ্যে কেনো বলেছেন, আমি তো পাগল আর পাগলরা ঠিক হয় না কোনোদিন। আপনি শুধু শুধু আমাকে বলেছেন আমি ঠিক হব।”
রৌদ্রিক এবার কণ্ঠে হালকা কঠোরতার এনে জিজ্ঞেস করে-
“ কে এইসব বলেছে তোমায়? বার্তি একটা কথাও না তূর্ণা জাস্ট টেল মি, কে বলেছে এইসব তোমাকে?”
তূর্ণা কাঁদতে কাঁদতে আবারও বলে-
“ আপনি বলেছেন আমি ঠিক হয়ে যাবো, কিন্তু সবাই
বলে আমি কোনোদিন ঠিক হবো না। সবার মত
আপনিও আমাকে ফেলে দূরে চলে যাবেন। আমি
পাগল বলেই আপনি আমায় মেনে নেননি। আমি সব
জানি!”
রৌদ্রিক নিজের রাগটাকে দমিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে-
“ তুমি অসুস্থ এটা সত্যি। কিন্তু তার থেকেও বড় সত্যি
হলো, তুমি এখনো বেঁচে আছো। আর যতদিন তুমি
বেঁচে আছো, ততদিন আমি তোমার পাশে থাকবো।
আর মানুষ তোমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে বলে তুমি
একা নও। কারণ আমি এখনো তোমার পাশে দাঁড়িয়ে
আছি, আর রৌদ্রিক সিকদার চলে যাওয়ার মত মানুষ
নয়। মানুষ তোমাকে ফেলে গেছে বলে তুমি মূল্যহীন
নও।বরং তারা বুঝতে পারেনি তোমার মূল্য আসলে
কি।”
তূর্ণার ছলছল চোখে রৌদ্রিকের দিকে তাকালো। ঢোক নিলো, রৌদ্রিক ব্যান্ডেজ করা হাতের দিকে তাকিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করে-
“ ব্যাথা পেয়েছো কিভাবে, আর কে তোমাকে পাগল বলেছে?”
“ পঁচা আপু গ্লাস ফেলে দিয়েছিল, এইখানে খুব জোরে চড়ও মেরেছে। নিচে পরে গিয়ে হাতে ব্যথা পেয়েছি।”
“ পঁচা আপু? এটা কে?”
“ অনেক সুন্দর করে, মিথি নাম ওনার।”
রৌদ্রিক বুঝতে পারলো কার কথা বলছে। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার, নেত্রদ্বয় বন্ধ করে বড় নিশ্বাস টেনে শান্ত করলো নিজেকে। চোয়াল শক্ত রেখেই তূর্ণার হাতের দিকে তাকিয়ে বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে
আলতো, সুরক্ষিত এক স্পর্শ করে জিজ্ঞেস করে-
“ব্যথা করছে?”
নিম্নস্বরে জিজ্ঞেস করে সে। তূর্ণা একটু ভেবে মাথা নাড়ে
”একটু, কিন্তু এইখানে বেশি ব্যথা করছে। রোজ করে জানো বর!” বুকে হাত রেখে বলে
রৌদ্রিকের চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিষাদের ছায়া খেলে যায়। মেয়েটাকে সে যত ভালো ভাবে রাখার চেষ্টা করছে, কোনো না কোনো ভাবে তার আপন মানুষগুলোর কাছ থেকেই আঘাতগুলো পাচ্ছে মেয়েটা। রৌদ্রিক তূর্ণাকে আশ্বাস দিয়ে বলে+
“ সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি আমার রোদের দিকে একটু খেয়াল রাখ আমি আসচ্ছি।”
তূর্ণার এতক্ষণে নজর গেলো বিছানায় ঘুমন্ত রোদেলার দিকে। তূর্ণা সেইদিকে ফোলা ফোলা চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ পুতুল কি ঘুমিয়ে পরেছে? জানো ও আজকে আমার সাথে ছিল না, তাই আরও খারাপ লাগছিল আমার।”
“ ও অসুস্থ তাই তোমার সঙ্গে ছিল না।”
অসুস্থ হওয়ার কথা শুনতেই তূর্ণা উঠে দৌড়ে ঘুমন্ত রোদেলার কাছে ছুটে। আটকে আসা অশ্রুবিন্দু গুলো আবারও ঝড়তে শুরু করেছে, তূর্ণা রোদেলার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ঝপড়াতে থাকে-
“ পুতুলের কি হয়েছে বর? ও কেনো অসুস্থ হয়েছে? ওকে সুস্থ করে দাও বর। নাহলে আমার মত আমার পুতুলকেও সবাই দূরে সরিয়ে দিবে। তুমি পুতুলকে সুস্থ করে দাও বর, আমার পুতুল কে সুস্থ করে দাও!”
“ রিলাক্স তূর্ণা, ও ঠিক হয়ে যাবে চিন্তা কর না। ওর জ্বর হয়েছে, কালকের মধ্যে কমে যাবে। তুমি এখানে ওর কাছে থাক আমি আসচ্ছি।”
বলেই রৌদ্রিক ঘর থেকে বের হয়ে যায়। এইদিকে তূর্ণা কাঁদতে কাঁদতে ছোট্ট রোদেলার ললাটে সাবধানে স্নেহময় স্পর্শ এঁকে দিতে থাকে। গা একদম গরম হয়ে আছে, তূর্ণা কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে-
“ তুমি ঠিক হয়ে যাও পুতুল সোনা। আল্লাহ আমার পুতুলকে ভালো করে দাও। নাহলে সবাই আমার পুতুলকেও কষ্ট দিবে! তুমি ওকে ভালো করে দাও!”
বলেই রোদেলার ছোট্টো মাথাটা নিচের কোলের উপর টেনে নিয়ে আদর করে দিতে থাকে আর আল্লাহ কাছে বার বার রোদেলার সুস্থতা কামনা করতে থাকে।
মিথিলা, ইমা, আর মাইশা এক রুমেই থাকছে এখানে আসার পর। পরশু তারা চলে যাবে এখান থেকে, মাইশা ঘুমিয়ে পরেছে, ইমা আর মিথিলাই জাগ্রত। মিথিলা বারান্দায় বাহিরে বয়ে চলা ঝড়-হাওয়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছে একদৃষ্টিতে। মেঘাছন্ন, কৃষ্ণবর্ণ নীলিমার পানে চেয়ে আছে। হুট করেই পরিচিত কারো কণ্ঠস্বর পেতেই নিজের জগৎ থেকে ছিটকে বের হয়ে আসে সে। রৌদ্রিকের কণ্ঠস্বর? হ্যাঁ এটা তো রৌদ্রিকেরই স্বর। মিথিলা আর দেরি না করে ছুটে রুমে আসতেই, গাম্ভীর্যের ঠাসা রৌদ্রিকের কঠোর মুখশ্রীটা দেখতে পায়। চোয়াল শক্ত করে, শক্ত চোখে তাকিয়ে রয়েছে, মিথিলা উপস্থিত হতেই রৌদ্রিক ঘরে প্রবেশ করে। মিথিলার মনে অজানা এক ভয় দানা পেকে উঠলো, রৌদ্রিক কিসের জন্য এসেছে? দুপুরের ঘটনা কি রৌদ্রিকের কান অব্দি পৌঁছে গেছে? ভাবতেই মিথিলা শুঁকনো ঢোক গিলে নিলো, রৌদ্রিক মিথিলার দিকে পূর্ণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চোয়াল শক্ত করে বলে ওঠে-
“ তূর্ণা গায়ে হাত তুলেছো কোন সাহসে?”
মিথিলা খিঁচিয়ে চোখজোড়া বন্ধ করে নেয়। বুকটা ধুকপুক করছে প্রচন্ড জোরে! কি বলবে সে এবার? তার তখন কি যে হয়েছিল নিজেও জানে না। নিজের মধ্যে জমে থাকা সমস্ত রাগ তখন ঢেলে দিয়েছিল তূর্ণার উপর। মিথিলাকে জবাব না দিতে দেখে রৌদ্রিক এবার ধমকের স্বরে জিজ্ঞেস করে ওঠে-
“ অ্যানসার মি ডাম ইট! সাহস কি করে হয়ে আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে,আমারই ওয়াইফের গায়ে হাত তোলার সাহস পাও কোথা থেকে?”
“ রৌদ্র ভ..ভাই..আ..আমি..”
মিথিলা তার বাক্যটুকি শেষ করতে পারলো না, তার আগেই আবারও রৌদ্রিক একই টোনে বলে ওঠে-
“ বল এই সাহস কে দিয়েছে তোমায়? তুমি তো শিক্ষিত তাহলে মানসিক অসুস্থতাকে ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত কর কিভাবে? সবচেয়ে বড় কথা ওর গায়ে হাত তোলার সাহস হয় কি করে তোমার? আমি এই রাইট কাউকেই দেইনি যে যে-সে এসে আমার ওয়াইফের গায়ে হাত তুলে যাবে। ”
“ রৌদ্র ভাই..আসলে…আ..আমার তখন মাথা গরম ছিল। তার মধ্যে… ও পানিতে চিনির জায়গা লবণ দিয়ে এনেছিল। তাই..রাগটাকে ধরে রাখতে পারিনি।”
রৌদ্রিক এবার হুংকার দিয়ে বলে ওঠে-
“ মাথা গরম হলে বলে ওকে মারবে? ওকে কি তুমি পেয়েছো? যে মন চাইলো আর মেরে দিলে! সি ইজ মাই ওয়াইফ, এন্ড তাকে সেই সম্মান দেওয়া তোমার কর্তব্য। যদি সম্মান না করতে পারো দ্যান এখানে আসার প্রয়োজন নেই তোমার। এন্ড বাড়িতে এত কাজের লোক থাকার পরও আমার ওয়াইফে দিয়ে ওইসব করানোর মানে কি? ওকে কি তোমার সার্জেন্ট মনে হয়? জানো না ওর মানসিক অবস্থার কথা, তাহলে কোন আক্কেলে ওকে দিয়ে তুমি কাজ করাও?”
মিথিলা মাথা নিচু করে নিলো, অশ্রু এসে হানা দিয়েছে তার নেত্রকোণে। রৌদ্রিকের দিকে তাকালে হয়তো এই আটকে থাকা অশ্রু গুলো টুপটাপ ঝড়ে পরবে। মিথিলা ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্নাকে আটকানোর চেষ্টা করলো। রৌদ্রিক দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বলে-
“ লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি, আমার কোনো জিনিসে হাত দেওয়ার আগে ভাববে কার জিনিসের দিকে হাত বাড়িয়েছো। আমার জিনিসে আমি বিন্দুমাত্র অন্যকারো স্পর্শ সহ্য করবো না। সেখানে সে আমার অর্ধাঙ্গিনী, নেক্সট টাইম এমন কিছু করার দুঃসাহসও করার আগে ভাববে তোমার হাত হাতের জায়গায় থালবে কিনা।”
কথাটুকু শেষ করে কোনো দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করলো না রৌদ্রিক। সেভাবে এসেছিল সেই ভাবে আবারও চলে গেলো, এইদিকে রৌদ্রিকের সমস্ত কথা মিথিলার কানে এখনো বাজচ্ছে। রৌদ্রিক বের হয়ে যেতেই মিথিলা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সশব্দে। ইমা এতক্ষণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। রৌদ্রিক যেতেই যে মিথিলার কাছে ছুটে গেলো, মিথিলা কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে-
“ রৌদ্রিক ওই মেয়েটার জন্য এতগুলো কথা বলে গেলো আমাকে। ইমা রৌদ্রিক, রৌদ্রিক!”
“ শান্ত হ মিথিলা, শান্ত হন। তুই মেয়েটাকে মারতে গেলি কেনো? না মারলে এত কিছু হত না।”
মিথিলা কোনো জবাব দিল না। কাঁদতে থাকলো শুধু।
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১২
কেটেছে সময়, কেটেছে দিন। খাড়া স্রোতের মত বয়ে গেছে সময়। দেখতে দেখতে কেটে গেছে পাঁচটা দিন, শ্রাবণ এখনো বের হতে পারেনি সেই বৃষ্টিস্নাত দিনের কথা মাথা থেকে বের হতে পারেনি। বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা নীল শাড়ি পরিহিত মেয়েটাকে বের করতে পারেনি মাথা থেকে, ফোনে থাকা ভিডিওটা একশো বারেরও বেশি দেখা হয়ে গেছে তার। ভিডিওটা যতবার দেখেছে তার মধ্যে স্নিগ্ধতা ছেয়ে গেছে ততোবার।
টিএসসি চত্বরে এসেছে, শ্রাবণকে নিজের মধ্যে ঢুবে থাকতে দেখে হুট করে থেকে রাকিব কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে-
“ কিরে মামা কোন সকিনার স্বপ্নে বিভোর তুমি?”
