অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৭ (২)
ফাহিমা ইসলাম
বলদেছে দিন,পাল্টেছে সময় কেটে যাচ্ছে সময়গুলো খরস্রোতার মতো। রিনির বিয়ের দিন ঘনিয়ে আচ্ছে, বাড়িতে বারছে ব্যস্ততা। সুবিশাল বাগান জুড়ে বড় পেন্ডে সাজানোর কাজ শুরু হয়েছে। বিদায়ের ঘন্টার সময় ঘনিয়ে আসচ্ছে। মেয়ে হলে জন্মালে তাকে পরের ঘরে একদিন না একদিন যেতেই হয়। পৃথিবীতে মেয়েদের নিজস্ব বাড়ি বলতে কিছু হয়, যেটা হয় সেটা কেবলই কবর। কবর ছাড়া কোনো ঘরই মেয়েদের আপন নয়। আর না কোনোদিন হয়েছে, রাজার মেয়ে হলেও তাকে নিজ পিতৃগৃহ ছেড়ে অন্য রাজ্যে যেতে হয়। তারপর সেই চিরচেনা পিতৃগহও হয়ে যায় মেহমানদারী বাড়ির৷ যেখানে ছোট থেকে প্রাণ খুলে হেসে-খেলে বেরানো হয়েছে সেখানটা হয়ে যায় বড্ড অচেনা। আপন হয়েও কত পর হয়ে যায়।
আজ প্রায় দুই বছর পর রোহান দেশে ফিরছে। এটাই শেষ, বাড়ির ছেলেকে বাড়িতেই রেখে দিবে। নিজের ভাইয়ের বিয়েতেও উপস্থিত থাকতে পারেনি। দুই ভাইয়ের বিয়েতেই সে হতভাগার মতো উপস্থিত থাকেনি। তাই একমাত্র বোনের বিয়ে কিছুতেই মিস দিবে এবার৷ সারা বাড়িতে এ নিয়েও যেনোও নতুন উৎসব লেগেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির ছেলেদের সঙ্গে রোহান এয়ারপোর্ট থেকে বাড়িতে এসেছে। কতদিন পর বাড়ির ছেলে বাড়িতে ফেরায় সকলের মাঝেই খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। রোহান একসাথে সায়রা, রোদ্দুর,রোদেশী তিনজনকেই কোলে নিয়ে রেখেছে। সায়রা আর রোদ্দুর সহজেই সকলের সঙ্গে মিশে যেতে পারে তাই তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই রোহানের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠলো; যেনো তারা কতদিনের পরিচিত তারা৷ রোদেশী চোখ-মুখ কুঁচকিয়ে রেখেছে। কেঁদে দিবে দিবে বলে ভাব! মেয়েটা একদম বাবার কার্বন কপি হয়েছে। হাসেও কম আবার জ্বালাও কম, আবার মিশবেও না সহজেই। এত্তোটুকুনি বয়সেই তার এতো মিল, বড় হলে কতখানি মিলে যাবে আল্লাহ মালুম! রোদেলাকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রোহান বলে-
“ রোদপাখি চাচ্চুর কাছে আসচ্ছে না কেনো? রোদের জন্য কত কি এনেছি চাচ্চু দেখতে হবে না?”
রোদেলা অভিমানে অন্যদিকে মুখ ঘোরালো৷ তারপর সেদিকে তাকিয়ে থেকেই অভিমান মিশ্রিত স্বরে বলে-
“ না দেখবে না, সায়রা, রোদ্দুর,রোদেশীকেই দেখাউ!”
রোদেলার নাক ফুলানো দেখে হেসে ফেললো সবাই। আসার পর থেকে সায়রা, রোদ্দুর আর রোদেশীকেই নিয়ে আছে রোহান। রোদেলা ঘুমাচ্ছিল, কিছুখন আগেই জাগ্রত হয়ে সে নিচে এসেছে। রোহান বাচ্চাদের সোফার উপর বসিয়ে উঠে রোদেলার নিকট এগিয়ে এলো৷ কোনো বাক্য বিনিময় না করেই রোদেলাকে কোলে তুলে নিলো। রোদেলা নামতে চাইলো, সেটা দেখে রোহান কানে কানে ফিসফিসয়ে বলে-
“ আরে ওদের তো ড্যাম দেখিয়ে নিয়েছি, নাহলে রাগ করবে তো। চাচ্চু তো রোদেলার জন্যই বসে ছিলাম, কিন্তু তুমি এলে পরে। এখন বল এটা কি আমার দোষ?”
রোদেলা কিছু বললো না মুখ ফুলিয়ে রইলো। সেটা দেখে রোহান আবার কানে কানে বলে-
” রোদেলার সব পছন্দের চকলেট এনেছি, সেগুলো কি সে খাবে? নাকি আমি সায়রাকে দিয়ে দিবো? ভেবেছিলাম রোদেলা আর আমি একা একাই খাবো, রোদের পাপাও জানবে না। এখন দেখছি কিছু হবে না।”
রোহানের কথা শুনে রোদেলা ছোট ছোট চোখ করে রোহানের দিকে তাকালো। রোহান ঠোঁট উল্টালো, যেনো সে কি নিষ্পাপ ভদ্রলোক। রোদেলা ছোট ছোট চোখ করে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রৌদ্রিকের পানে একপলক চেয়ে বলে-
“ রোদেলা খাবে সব।”
রোহান হাসলো, রৌদ্রিক সবকিছু হিসাব করে দেয়৷ এটা অবশ্য ঠিকই, বাচ্চাদের সবকিছুই খাওয়ানো উচিত তবে সেটা একটা নিয়মের মধ্যে। তাহলে সবকিছুই সমপরিমাণে খাওয়া শিখবে৷ রোদেলা সবজি থেকে শুরু করে সবকিছুই খায়। রৌদ্রিক ছোট থেকেই সবকিছু একটু একটু করে খাইয়ে অভস্ত্য করেেছে। সায়রাকেও ইরা রৌদ্রিকের কথা মতো খাওয়ায়, মাঝে মাঝে রৌদ্রিক সায়রা আর রোদেলাকে একসঙ্গে খাইয়ে দেয় সময় পেলেই৷ সায়রাও রৌদ্রিকের বেশ ভক্ত বড় বাবা বলতেই তার মুখে হাসির ঝলকানির শেষ হয় না। কম-বেশি সবাইকে ডাকা শিখছে সায়রা, আঁধো আঁধো বুলিতে সবাইকে একটু একটু ডাকে সে।
রুমা সিকদার তাড়া দিয়ে বলে-
“ যা তুই ফ্রেশ হয়ে আয়, সকালের নাস্তা এখনো কেউ করিনি তুই আসবি বলে।”
রোহান কথা মতো সবার সঙ্গে কথা বলে উপরে নিচে ঘরে চলে গেলো। খাওয়ার পর সবার জন্য যা যা এনেছে সেই লাগেজ গুলো খুলবে।
রজনীর বক্ষ জুড়ে আজ যেন নক্ষত্রেরা অলংকার হয়ে জ্বলজ্বল করছে। কৃষ্ণাভ আকাশের কপালে আধখানা চাঁদ রূপালি তিলক এঁকে নীরব প্রহরীর মতো ঝুলে আছে। সমগ্র প্রকৃতি এক অপার্থিব প্রশান্তির চাদরে নিজেকে জড়িয়ে নিলেও সিকদার বাড়ির আঙিনা যেন সেই প্রশান্তির বিপরীত এক জীবন্ত উৎসবের নাম। চারদিকে আলোকমালার দীপ্তি, গাঁদা, রজনীগন্ধা আর বেলিফুলের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠেছে বাতাস, ঢোলকের তাল, মেয়েদের সম্মিলিত কলকলধ্বনি আর খিলখিল হাসির স্রোত মিলেমিশে সৃষ্টি করছে এক অনিন্দ্য উৎসব-সিম্ফনি। আজ রিনির মেহেন্দি নাইট। সারা বাড়ি জুড়ে আনন্দের ঢেউ বইছে। বাড়ির তিন কর্ত্রীরা সমগ্র আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে কখনো রান্নাঘরে, কখনো অতিথিদের আপ্যায়নে, কখনো আবার মেয়েদের হাসি-ঠাট্টার মাঝখানে ছুটে বেড়াচ্ছেন। জবা সিকদার নিজের স্বভাবসিদ্ধ গাম্ভীর্যের আড়ালে আনন্দ লুকোতে ব্যর্থ হচ্ছেন। মুখে বারবার শাসনের সুর তুললেও চোখের কোণে জমে থাকা তৃপ্তির আভা স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে আজ তাঁরও মন কিশোরী হয়ে উঠেছে। রোমানা সিকদার আর রুমা সিকদার’রাও যেনো কিশোরী হয়ে উঠেছে। সবার সঙ্গে তারাও হাত রাঙাতে ব্যস্ত।
রিনিকে আজকে অসম্ভব রকমের সৌন্দর্য ঘিরে ধরেছে, গায়ে জড়ানো ভাড়ি কারুকাজের গাঢ় সবুজ লেহেঙ্গা৷ চুলগুলো আধখোলা অবস্থায় ক্রাল করা সঙ্গে পিছনে গোলাপ আর বেলিফুল দিয়ে সাজানো৷ অল্প সাজেও তাকে অপরূপ সুন্দর লাগছে। দুই পাশে দুইজন তার হাতে মেহেদী দিয়ে তাদের কারুকার্যে ব্যস্ত। হুট করেই কোথা থেকে রোহান এসে রিনির মাথা চাট্টি মে’রে বলে-
“ ইসস রে ইরা ভাবির ভাইটার মাথা খাওয়ার জন্য এতো আনন্দে হাসচ্ছিস? তোর মতো ডাইনিকে কিভাবে পছন্দ হলো ইকরামের?”
রিনির চোখ গরম করে পিছনে তাকালো তারপর নিজের হাতে দিকে দেখল মেহেদীর কোনো ক্ষতি হয়েছে কিনা।তারপর দাঁত কটমট করে তাকিয়ে বলে-
“ দূর হ শয়তান, মেঝ মা এই শয়তানকে যেতে বলো৷ আমার চুলগুলো খারাপ করছে।”
“ এই চুপ কর ছাগলের ছাও, এতো ম্যা ম্যা করিস কেন?”
রোমানা সিকদার পিছন থেকে ছেলেকে শাসনের স্বরে শাসিয়ে ওঠে-
“ রোহান মেয়েটাকে জ্বালাচ্ছি কেন? সর তো সর, আজ আর লাগিস না মেয়েটার পিছে।”
মায়ের কথায় রোহান গজগজ করতে করতে উত্তর করে।
“ আজ লাগবো না কখন লাগবো, আপদ বিদায় হয়েই যাবে একটু লাগলে কিছু হবে না।”
“ দেখেছো তোমরা, ও আমায় আপদ বলছে। এরজন্যই তোর কপালে কোনো মেয়ে জোটেনি আজও বুঝলি।”
“ এতো বড় অপমান! চুপ কর ডাইনি, জানিস কত মেয়ে লাইন দিয়ে থাকে আমার জন্য?”
” হ্যাঁ জানি তো, রাস্তার হিজরা গুলো তোকে দেখলে কেমন লালা ঝড়ায়।”
রিনির কথায় আশেপাশে থাকা সবাই মুখ টিপে হাসলো। তূর্ণা আর ইরা অন্যদিকে মেয়েদের সাথে বসে গল্পে মেতে আছে। ইরা আর তার পরণে একই রকম শাড়ি দুইজন মিলিয়েই পরেছে। তূর্ণার কোলে রোদ্দুর, একটু পর পর কাঁদছে তাই সবার মাঝে নিয়ে আছে এতেই মশাই শান্ত হয়ে পিটপিট করে সবাইকে দেখছে নিষ্পাপ দৃষ্টিতে। কিন্তু
এই উৎসবমুখর কোলাহলের ঠিক বিপরীতে বসার ঘরের এক কোণে রোদেলাকে কোলে বসিয়ে তাকে খাইয়ে চলেছে রৌদ্রিক। রোদেলা কখনো মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, কখনো আবার চামচটা নিজের হাতে ধরতে চাইছে। রৌদ্রিক একবারও বিরক্ত হচ্ছে না। প্রতিটি লোকমা গল্পের ছলে, হাসির ছলে, কখনো আঙুল দিয়ে ছোট্ট নাক ছুঁয়ে, কখনো গালে আলতো টোকা মেরে মেয়ের মুখে তুলে দিচ্ছে। লোকমা নিতেই রোদেলা দু’হাত বাড়িয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে। রৌদ্রিকের কঠিন মুখাবয়ব মুহূর্তেই নরম হয়ে আসে। সে মৃদু হেসে মেয়ের কপালে দীর্ঘ একটি চুম্বন এঁকে দেয়।
“ আর খাবো না পাপা!”
” আর একটু আছে রোদ শেষ করো।”
” এট্টুও জাতগা নেই পাপা!”
“ সারাদিন খাওনি এইসব বাহানা দিয়ে, এতটুকুই তো খাবার। শেষ করো জলদি, নাও খা করো দেখি।”
ইচ্ছে না থাকা শর্তেও রোদেলা মুখ খুললো রৌদ্রিক যত্ন নিয়ে মেয়ের মুখে লোকমা তুলে দিলো। নাক-মুখ কুঁচকে খাওয়া শেষ করলো রোদেলা। বাড়িতে বাচ্চাদের ভীড়ে খাওয়া-নেওয়া ভুলে খেলায় ব্যস্ত। তূর্ণাও খাওয়াতে পারেনি, রৌদ্রিক অনুষ্ঠানে কাজে ব্যস্ত ছিলো তাই সেটার সুযোগ নিয়ে রোদেলাও আর খাওয়ার আগ্রহ দেখায়নি। সন্ধ্যায় হালকা খাবার খাইয়েছে তূর্ণা এরপর আর খাওয়ার হদিস নেই তার। সব ব্যস্ততা ছেড়ে প্লেটে খাবার নিয়ে খাওয়াতে বসিয়েছে। খাওয়া শেষ হতেই রৌদ্রিক গ্লাসটা এগিয়ে ধরলো, রোদেলা পানি শেষ করেই অন্যদিকে দৌড় দিতে নিবে তার আগেই রৌদ্রিক গম্ভীর স্বরে বলে-
“ এখন না পাঁচ মিনিট রেস্ট করো, তারপর যাওয়ার অনুমতি পাবে। খেয়ে উঠে দৌড়াতে হয় না।”
” উপফফ! পাপা৷ কিচু হবে না তো।”
“ অনেক কিছু হবে, এখানে চুপচাপ বসো।”
এদিকে রোদেশী যেন ঠিক সেই সময়েই নিজের উপস্থিতি জানান দিলো। ক্ষুদ্র ঠোঁট কুঁচকে অল্পস্বরে কেঁদে উঠতেই রৌদ্রিক অনায়াস ভঙ্গিতে রোদেলাকে পাশের সোফায় বসিয়ে দ্রুত হাতটা পানি দিয়ে পরিষ্কার করে নিলো। তারপর
ছোট্ট রোদেশীকে কোলে তুলে নেয়। অভ্যস্ত হাতে রোদেশীর মাথা আগলে ধরে সে ধীরে ধীরে পিঠে তাল মিলিয়ে চাপড়াতে থাকে। অল্পক্ষণ আগেও কান্নায় কুঁকড়ে থাকা রোদেশী বাবার বুকের উষ্ণতা ছুঁতেই আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত হয়ে আসে। আধবোজা চোখে বাবার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার নিশ্চিন্ত ঘুমে তলিয়ে যায়।
রোদেলা সুযোগে আছে কখন ভাগবে, রোদেশীর দিকে খেয়াল দিয়েছে বলে রোদেলা চুপিচুপি পালাতে নিলেই রৌদ্রিক দক্ষ হাতে অন্যপাশে আটকে দিলো রোদেলাকে।
” পাপার কথা শুনছো না কেনো?”
“ এত্তু যাই না পাপা! ওরা সব খেলা শেষ করলো তো!”
“ আবার খেলবে লাগলে, এখন বসো এখানে।”
রোদেলা মুখ ফুলিয়ে বসলো। দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে তূর্ণার অধরপ্রান্তে অজান্তেই এক স্নিগ্ধ হাসি ফুটে ওঠলো।রোদেশীকে বুকে আগলে রেখেই রৌদ্রিক অন্য হাতে রোদেলার এলোমেলো চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দেয়। ঘামে গজগজ হয়ে গেছে তবুও তার খেলা চাই। রৌদ্রিক রোদেলার ফুলা মুখশ্রীতে চুমু দিলো, পরপর বেশ কয়েকটা। রোদেলার মুখ ফোলাটা কমলো খানিকটা। তারপর চোখ তুলে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে নীরব ইশারায় জিজ্ঞেস করে-
‘তুমি কিছু খেয়েছ?’
তূর্ণা মাথা নেড়ে না-সূচক উত্তর দিতেই রৌদ্রিকের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ে। কয়েক মুহূর্ত পরই সে রোদেশীকে জবা সিকদারের কোলে তুলে দিয়ে নিজ হাতে একটি প্লেটে খাবার সাজিয়ে নিয়ে আসে। তূর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বলে-
“সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার আগে নিজের শরীরটার প্রতিও একটু দায়িত্বশীল হও, তূর্ণা। তোমার না খাওয়া মানে ওদেরও না খাওয়া।”
কথাগুলোতে কোনো অভিযোগ নেই আর না আছে কোনো রাগ; আছে কেবল নিখাদ দায়িত্ব, অদৃশ্য মমতা আর এমন এক ভালোবাসা, যা উচ্চারণের চেয়ে যত্নের মধ্যেই নিজের পূর্ণতা খুঁজে নেয়। রৌদ্রিকের কাজ দেখে বরাবরই সবাই মুগ্ধ হয়, রৌদ্রিক পুরুষটাই এমন যে যেখানেই যাবে মুগ্ধতা ছড়াবে। জবা সিকদার নিঃশব্দে হাসলেন ছেলের এমন কাজ দেখে। সন্তানের সুখ দেখতেও ভালো লাগে, তার ছেলের জীবনটা আবার সুখী হয়ে ফিরেছে এতেই মা হয়ে তিনি বড্ড খুশী আর কিছু চাই তার৷ বাড়ির সব সন্তানই এমন সুখে ডুবে থাকুক তিনি চান।
রজনীর দ্বিতীয় প্রহর ধীরে ধীরে সিকদার বাড়ির উৎসবমুখর প্রাঙ্গণকে আপন নীরবতার আঁচলে ঢেকে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও যে আঙিনা হাস্যরোল, ঢোলকের ছন্দ আর কোলাহলের বহুস্বরিক অনুরণনে মুখরিত ছিল, এখন সেখানে কেবল ঝুলে থাকা আলোকমালাগুলো ক্ষীণ আলোয় নিঃশব্দে দুলছে। বাতাসে এখনও ভেসে বেড়াচ্ছে গাঢ় মেহেন্দির সোঁদা গন্ধ, তার সঙ্গে মিশে আছে রজনীগন্ধার মাদকতাময় সুবাস। উৎসবের উচ্ছ্বাস ধীরে ধীরে ক্লান্তির কাছে আত্মসমর্পণ করছে। অতিথিরা কেউ বিদায় নিয়েছে, কেউ বা নিদ্রার রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে। বিশাল বাড়িটা যেন দীর্ঘ এক আনন্দোৎসবের পর অবশেষে গভীর প্রশ্বাস ফেলছে। বড় বিছানার একপাশে পাশাপাশি ঘুমিয়ে আছে রোদেলা আর রোদ্দুর। রোদেলার ছোট্ট মুঠোয় এখনও আঁকড়ে ধরা রয়েছে তার প্রিয় কাপড়ের পুতুল। অন্যদিকে রোদ্দুর ঘুমের ঘোরেই বাবার বালিশের এক কোণা শক্ত করে চেপে রেখেছে। নিষ্পাপ দুই মুখশ্রীর দিকে একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রৌদ্রিক ধীরে ধীরে তাদের গায়ের চাদরটা টেনে ঠিক করে দেয়। কপালে আলতো স্পর্শ রেখে নিশ্চুপে উঠে আসে সে। তূর্ণা এখনে ঘরে ফেরেনি ইরা আর রিনির সঙ্গে আছে, বাচ্চাদের খাইয়ে আবারও সেদিকে ছুটেছে৷ রৌদ্রিকও আর আটকায়নি, যাক আনন্দের সময় আনন্দ করুক। ঘরের দুই সদস্য ঘুমালেও ঘরের সবচেয়ে ছোট্ট বাসিন্দার আজ যেন নিদ্রার সঙ্গে কোনো সন্ধিই হয়নি।
সারা সন্ধ্যা অনুষ্ঠানজুড়ে আরাম করে ঘুমিয়ে কাটানোর ফলস্বরূপ এখন রোদেশীর দুটি গোলগাল চোখে নিদ্রার লেশমাত্র নেই। নরম বিছানার ওপর শুয়ে সে দুই পা আকাশের দিকে তুলে একমনে নাড়াচ্ছে। কখনো ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি দুই হাতে শক্ত করে ধরে মুখে পুরে নিচ্ছে, কখনো আবার নিজেরই ছোট্ট আঙুলগুলো বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে দেখে যেন নতুন কোনো মহাবিশ্ব আবিষ্কার করছে।
মুখভর্তি লালায় ভেজা হাসি নিয়ে সে আধো স্বরে বকবক করছে-
“আঁ… উঁ… আ-আ… গু… বুঁ… ইই…”
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেই অসংলগ্ন ধ্বনিগুলো যেন ভাষাহীন আনন্দের নির্মলতম অনুবাদ। রৌদ্রিক কিছুক্ষণ নীরবে মেয়েটাকে দেখতেই থাকলো। অজান্তেই তার কঠোর মুখাবয়বের প্রতিটি রেখা কোমল হয়ে আসে। অদৃশ্য এক প্রশান্তি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে তার সমগ্র সত্তায়। পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল সমীকরণও হয়তো এত সহজে সমাধান করা যায় না, যত সহজে এই ক্ষুদ্র মানুষটা তার সমস্ত ক্লান্তি বিলীন করে দিতে পারে। সে ধীর রোদেশীর পাশে এসে বসে। রোদেশী বাবার উপস্থিতি টের পেয়েই আরও জোরে দু’পা নাড়াতে শুরু করে। গোল গোল চোখদুটি বিস্ময়ের দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ছোট্ট দুই হাত বাতাসে ছুঁড়ে দিয়ে সে আবারও আওয়াজ তুলছে*
“আআ… উউ… গুঁ… দ্দা… আহ্…”
যেন নিজের ভাষাতেই বাবাকে হাজারো গল্প শোনানোর প্রয়াস। রৌদ্রিক মৃদু হেসে তর্জনীটা এগিয়ে দেয়।
মুহূর্তের মধ্যেই রোদেশীর ক্ষুদ্র মুঠো সেই আঙুল শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। এতটুকু প্রাণের সেই দৃঢ় স্পর্শে রৌদ্রিকের বুকের ভেতর কোথাও এক অপার্থিব কম্পন জেগে ওঠল।
সে আলতো করে মেয়েটার নরম পায়ের পাতায় আঙুল ছোঁয়াতেই রোদেশী খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। হাসির দমকে আবারও মুখ থেকে বেরিয়ে আসে অস্ফুট ধ্বনি-
“হুঁ… আআ… গুঁউ…”
দুই পা আরও দ্রুত নাড়াতে নাড়াতে সে বাবার আঙুল মুখের দিকে টেনে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। রৌদ্রিক ইচ্ছে করেই আঙুলটা একটু দূরে সরিয়ে নেয়। রোদেশী ভ্রু কুঁচকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলো। তারপর আবার অকারণেই হেসে ওঠলো। রৌদ্রিক ঝুঁকে এসে মেয়ের গোলাপি গালে আলতো করে নাক ছুঁইয়ে দেয়।
রোদেশী মুহূর্তেই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। ক্ষুদ্র হাতদুটো বাবার দাড়িভরা থুতনিতে এলোমেলোভাবে বুলিয়ে দিলো। রোদেশী এবার তার চুলের মুঠি ধরে টান দিলো,তারপর আবার বিস্ময়ে বাবার মুখখানা স্পর্শ করে দিলো। রৌদ্রিক একবারও বাঁধা দিলো না। বরং গভীর মুগ্ধতায় সেই ক্ষুদ্র আঙুলগুলোর প্রতিটি স্পর্শ নিজের ভেতরে সযত্নে সঞ্চয় করে রাখে। রোদেশী এবার নিজের পা’টা নিয়ে খাওয়াড চেষ্টা করছে, সেটা দেখে রৌদ্রিক মেয়েকে কোলে তুলে শুইয়ে দিলো ঠিক করে৷ তারপর পা দোলাতে শুরু করলো, এতে যেনো রোদেশী আরও আনন্দ পেল। সেটা দেখে রৌদ্রিক মেয়ের নাকের সঙ্গে হালকা ভাবে ঝুঁকে ঘঁষে বলে-
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৭
“ ছোট আম্মাজানের এতো খুশি? কি হয়েছে আমার এই
মায়ের? বড় হয়ে যাচ্ছো এতো তাড়াতাড়ি? ধীরে ধীরে
বড়ো হও পাপাকে অনেকটা সময় এইভাবে কাটাতেও
দিবে না?”
রোদেশী কি বুঝলো কে জানে, সে হেসে ফোকলা হেসে উঠলো শব্দ করে। ছোট ছোট হাত দিয়ে রৌদ্রিকের সমস্ত মুখশ্রী ছুঁয়ে দিলো আলতো করে।
