Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৬

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৬

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৬
ফাহিমা ইসলাম

একটি মাস।
কেবলমাত্র ত্রিশটি দিনের সমষ্টি নয়, বরং অসংখ্য নির্ঘুম রাত্রি, হাজারো অনভ্যস্ত অভ্যাস, অনির্বচনীয় ক্লান্তি, অকুণ্ঠ মমতা আর অদেখা আত্মত্যাগের সংমিশ্রণে রচিত এক দীর্ঘ জীবনযাত্রার নাম। দেখতে দেখতে সিকদার পরিবারের নবাগত দুই কুসুমকলির পৃথিবীতে আগমনের পূর্ণ হলো একটি মাস। এই এক মাসে সময় যেন তার স্বাভাবিক গতি ভুলে গিয়ে নতুন ছন্দে প্রবাহিত হয়েছে। প্রতিটি প্রহর, প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি জাগরণ যেন আবর্তিত হয়েছে বাড়ির চারটি ক্ষুদ্র প্রাণকে কেন্দ্র করেই। বাড়িটা যেনো নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে, বাচ্চাদের হাসি-কান্নার শব্দে সবকিছু ভেসে থাকে।

নিস্তব্ধ কালো রজনীর অন্ধকার কাটিয়ে ভোরের সূত্রপাত শুরু হয়েছে। চারিদিকে নিস্তব্ধতায় ঘেরা, কোথাও কোনো কোলাহলের চিহ্নমাত্র নেই। এমন সময়ই নিস্তব্ধ গৃহমধ্যের শান্ত আবহটাকে বিদীর্ণ করে ভেসে এলো একরত্তি শিশুর তীক্ষ্ণ অথচ অসহায় কান্না। অভ্যাসবশত চোখ খুলে ফেলল রৌদ্রিক দ্রুতই। ঘড়ির কাঁটা এখন ভোরের সূচনালগ্নে। রাতজাগার ক্লান্তি এখনো তার চোখের নিচে গাঢ় ছাপ এঁকে রেখেছে। পুরো রাতটাই প্রায় ছেলেকে কোলে নিয়েই কেটেছে। এক মাস বয়সী ছোট্ট মানুষটার আজকাল দিন-রাতের কোনো হিসেব নেই। একটু আগেই বুক ভরে দুধ খেয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল সে। অথচ সেই ঘুম স্থায়ী হলো না। রৌদ্রিক পাশ ফিরে তাকাল।
তার একদম গা ঘেঁষে নিশ্চিন্ত ঘুমে আচ্ছন্ন তূর্ণা। এলোমেলো কেশরাশি বালিশজুড়ে ছড়িয়ে আছে। অতিরিক্ত ক্লান্তিতে মুখশ্রীটাও কেমন ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। সারারাত একবারও ঠিকমতো চোখ বুজতে পারেনি মেয়েটা। কখনো বাচ্চাদের দু’ধ খাইয়েছে, কখনো কোলে নিয়ে হেঁটেছে, কখনো নিঃশব্দে তার কপালে চুমু এঁকে আবার শুইয়ে দিয়েছে। মেয়েটা শান্ত হলেও ছেলেটা শান্ত হওয়ার নাম নেয়, না ঘন্টাখানিক ও হয়নি ঘুমিয়েছে তারা। ক্রন্দনরত ছেলের মুখশ্রী পানে চাইতেই রৌদ্রিকের দৃষ্টি নরম হয়ে এলো। পাশে থাকা তূর্ণা আর রোদেলার দিকে তাকালো, তারও ঘুম হয়নি এতো কান্নার শব্দে। তবুও ভাই-বোনদের উপর অভিযোগ তোলেনি সে। রৌদ্রিক মেয়ের কপালে চুমু একে দিলো, তার লক্ষী বাচ্চা! বাবা-মায়ের সমস্যা বুঝতেও পারে এতটুকু মেয়েটা তার। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো সে।

তারপর তার বাম হাতটা আলতো করে বাড়িয়ে তূর্ণার কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে পড়া কয়েকগুচ্ছ চুল কানের পেছনে গুঁজে দিল । এতটুকু স্পর্শেও যেন তূর্ণার ঘুম ভেঙে না যায়, সেই সতর্কতায় তার প্রতিটি আঙুল চলল নিঃশব্দে। তারপর আস্তে করে কম্বলটা আরও একটু টেনে স্ত্রী আর মেয়ের কাঁধ পর্যন্ত ঢেকে দিল। বিছানার পাশে ছোট্ট দোলনায় শুয়ে থাকা ছেলে তখনো মুখ লাল করে কেঁদেই চলেছে। দুই মুঠো হাত শক্ত করে বন্ধ, ছোট্ট পাগুলো অস্থির ছটফট করছে। যেন তার সমগ্র পৃথিবীটাই এই মুহূর্তে অস্বস্তিতে ভরে উঠেছে। রৌদ্রিক দুই হাত বাড়িয়ে অত্যন্ত সাবধানে ছেলেকে বুকের কাছে তুলে নিল। মুহূর্তেই কান্নাটা আরও একটু জোরালো হলো বাবার স্নেহময় স্পর্শ পেয়ে।
সে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং ছেলের নরম মাথার পেছনে এক হাত রেখে অন্য হাত দিয়ে ছোট্ট পিঠে ধীর ছন্দে আলতো চাপড় দিতে লাগল। বুকের সঙ্গে এমনভাবে আগলে রাখল, যেন পৃথিবীর সমস্ত অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সে একাই সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়। মৃদু দোল খেতে খেতে ফিসফিস স্বরে বলল*
” কী হয়েছে আমার ছোট্ট রাজপুত্রের? একটু আগেই তো পেট ভরে খেয়েছো। এতো চোখের জলের কারণ কি হুম?”

অবুঝ শিশুটি উত্তর দিল না। তার বদলে ছোট্ট মুখটা বাবার বুকে আরও জোরে গুঁজে দিল। কান্নার শব্দ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে শুরু করল।রৌদ্রিক মৃদু হেসে ছেলের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। নবজাতকের গায়ের মিশে থাকা অপার্থিব দুধেল গন্ধটা বুক ভরে শ্বাসের সঙ্গে টেনে নিল সে। অদ্ভুত এক অনুভূতি ভর করল তার সমগ্র সত্তা জুড়ে। এই ক্ষুদ্র মানুষটাগুলোর জন্যই তো আজ তার প্রতিটি নিঃশ্বাসের অর্থ বদলে গেছে।নিজের কাজ, দায়িত্ব, ব্যক্তিগত ক্লান্তি সবকিছুই যেন এই নরম উষ্ণ শরীরটার ওজনের কাছে অর্থহীন। সে ধীর পায়ে পুরো ঘর জুড়ে হাঁটতে লাগল।
প্রতিটি পদক্ষেপ পরিমিত। প্রতিটি দোল সতর্ক মিশে আছে ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠল বহুদিন ভুলে থাকা এক পুরোনো লোরির সুর। রোদেলাকে এইভাবে শান্ত করাতো সে, একসময় রোদেলাকেও একই ভাবে সারারাত এইভাবে বুকের উপর নিয়ে হেঁটে হেঁটে কান্না থামিয়েছে। অতীতের এই
স্মৃতিমধুর ঘটনাগুলো আবারও পূর্ণবৃত্তি হচ্ছে। রৌদ্রিক চায় না তার কোনো সন্তানই বড়ো হোক। বড় হলেই এইভাবে বুকে জড়িয়ে রাখতে পারবে না কাউকেই।রৌদ্রিক মৃদু সুর তুললো, সুরটা এতোটাও নিখুঁত নয়, কিন্তু পিতৃত্বের নিঃস্বার্থ কোমলতা তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংগীতে পরিণত করল।
“ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি,
মোদের বাড়ি এসো…”

সুরের ফাঁকে ফাঁকে সে ছেলের ক্ষুদ্র আঙুলগুলো নিজের তর্জনীতে জড়িয়ে দিল। অবাক হয়ে দেখল, একরত্তি মানুষটা কী অদ্ভুত শক্ত করে বাবার আঙুল আঁকড়ে ধরেছে। যেন জন্মের পর থেকেই সে বিশ্বাস করে আসছে,এই হাত তাকে কখনো পড়ে যেতে দেবে না। কিছুক্ষণ পর কান্না পুরোপুরি থেমে গেল। ছোট্ট ছেলেটা বাবার বুকের বাঁ পাশে মুখ গুঁজে নিশ্চিন্তে চোখ বুজে ফেলেছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিঃশ্বাস বুকের ভেতর নিয়মিত ওঠানামা করছে। রৌদ্রিক মাথা নিচু করে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল সেই শান্ত মুখটার দিকে। তার দুই বাচ্চাকে ঘুমালে ঠিক রোদেলার মতো দেখতে লাগে, যেনে রোদেলারই প্রতিচ্ছবি ফিরে এসেছে এই নতুন দুই সত্তার মাঝে। রৌদ্রিক আরও কিছুখন ছেলেকে কোলে নিয়ে হাটাহাটি করলো, তারপর আস্তে করে মেয়ের পাশে শুইয়ে দিলো। এখন আর উঠবে না ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে যে। বাড়িতে আকিকার অনুষ্ঠানের কাজ চলছে, তাই সেদিকটাও দেখায় ব্যস্ত সে৷

দিনের সূচনালগ্ন থেকেই উৎসবের আমেজ লেগেছে সারা সিকদার বাড়িতে।নপুরো অট্টালিকাজুড়ে ব্যস্ততার এক অপার্থিব ছন্দে মেতে আছে। সারা বাড়ি সুন্দর করে সেজে উঠেছে, বাগানের মাঝখানে বাঁশ আর শালকাঠের নকশায় নির্মিত বিশাল প্যান্ডেল; তার মাথাজুড়ে সাদা কাপড়ের ঢেউ, যার ফাঁক গলে সকালের রোদ এসে পড়ছে সোনালি রেখায়। চারপাশে কর্মব্যস্ত মানুষের পদচারণা, হাসির রোল, শিশুদের উচ্ছ্বাস আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা মসলার উষ্ণ ঘ্রাণ মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে পারিবারিক আনন্দের এক অবিনশ্বর সিম্ফনি। আজ সিকদার পরিবারের সবচেয়ে আদরের দুই নবজাতক জমজ সন্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে নাম দেওয়া হবে। আকিকার এই মহা-আয়োজন শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এ যেন বংশের নতুন অধ্যায়ের শুভারম্ভ। দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরিচিতজনেরা একে একে এসে ভরিয়ে তুলছে পুরো বাড়ি। প্রবীণদের মুখে তৃপ্তির হাসি, তরুণদের ব্যস্ততা আর শিশুদের উচ্ছ্বাস মিলেমিশে সিকদার বাড়িটাকে আজ যেন জীবন্ত উৎসবের অভিধানে রূপ দিয়েছে।
এই উৎসবমুখর পরিবেশের কোলাহল থেকে খানিকটা দূরে, দ্বিতীয় তলার প্রশস্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে তূর্ণা। গাঢ় পান্না-সবুজ জামদানিতে মোড়ানো তার অবয়বটাকে সকালের কোমল আলো আরও স্বর্গীয় করে তুলেছে। মাতৃত্ব যেন তার ব্যক্তিত্বে এক অনির্বচনীয় প্রশান্তির পরশ এঁকে দিয়েছে। দুই সন্তানের মা হওয়ার পরও তার সৌন্দর্য এক বিন্দুও মলিন হয়নি; বরং গভীর হয়েছে, পরিণত হয়েছে। পেটের ঘাঁ’টা এতো তাজা, হালকা নড়াচড়া করলেও এখনে সেখানটা চিনচিন ব্যথায় ফেঁপে উঠে। রৌদ্রিক কড়া ভাবে এতো ভিরের মধ্যে নিচে যেতে মানা করেছে, তাই এখানটায় দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছে। হঠাৎই পিছন দিক থেকে ক্ষুদ্র দুটো নরম হাত এসে জড়িয়ে ধরল তূর্ণার কোমর।

“মা..!!”
শব্দটা শুনেই তূর্ণার ঠোঁটের কোণে নিঃশব্দ হাসি ফুটে উঠল। পিছনে না তাকিয়েও সে বুঝে গেল, এ তার পৃথিবীর সবচেয়ে আদুরে ডাক। পিছন ফিরে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল রোদেলাকে। গোলাপি ফ্রক পরে, এলোমেলো কোঁকড়ানো চুলে ছোট্ট সাদা ফিতের বাঁধন, হাতে শক্ত করে আঁকড়ে রাখা একটা কাপড়ের পুতুল। বড় বড় হরিণচোখ দুটোতে জমে আছে অভিমান।তূর্ণা হাঁটু গেড়ে মেয়ের সমান হয়ে বসতেই রোদেলা দু’গাল ফুলিয়ে বলল-
“তুমি এখন আমাকে একদড আগের মতো আদর করো না।”
বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল তূর্ণার। মায়ের হৃদয় খুব সহজেই বুঝে ফেলল, রোদেলার ছোট্ট মনটা নিজের অজান্তেই ঈর্ষা আর একাকীত্বে ভুগছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে রোদেলাকে কোলে তুলে নিল। কা’টা পেটের কথা ভুলে, সামনে থাকা চেয়ারটাতে বসে পরলো রোদেলাকে নিয়ে। রোদেলার কপালে দীর্ঘ চুমু এঁকে নরম কণ্ঠে বলল-

“আমার রোদপাখি, পৃথিবীতে যদি কেউ সবচেয়ে বেশি আদর পায়, তবে সে তুমি। মায়ের একটু কষ্ট হয় এখন, পে’ট কা’টা তাই আগের মতো কোলে নিতে পারি না আমার পুতুলকে। তাই বলে আদর করি না বুঝি?”
রোদেলা নিচের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট গলায় বলল-
” পে’ত কেনু ভাল হয় না্ছ
সে মেয়ের গাল দু’হাতে জড়িয়ে কাঁপা হাসি হেসে বলল,
“ একটু সময় দাও আবারও মা তার পুতুলকে কোলে নিবে কেমন?”
রোদেলার নিষ্পাপ মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।
“প্রমিজ?”
তূর্ণা নিজের কনিষ্ঠ আঙুল বাড়িয়ে দিল।
“প্রমিজ।”
ছোট্ট আঙুলটা বড় আঙুলে জড়িয়ে ধরতেই রোদেলা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। সেই হাসি যেন পুরো সকালের সমস্ত আলোকে হার মানিয়ে দিতে বাধ্য। পরক্ষণেই সে দু’হাতে তূর্ণার গলা জড়িয়ে ধরে বলল-

” এত্তো ভালুপাসি মা! বেবিদেরও এত্তো এত্তো ভালুপাসি!”
চোখের কোণে অজান্তেই জল চিকচিক করে উঠল তূর্ণার।
সে মেয়েকে বুকের সঙ্গে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্কের ভিড়ে মা আর সন্তানের এই নির্ভেজাল ভালোবাসার কাছে ভাষাও যেন নতজানু হয়ে যায়। ঠিক সেই সময় নিচতলা থেকে ভেসে এল রোমানা সিকদারের ডাক –
“তূর্ণা! অতিথিরা প্রায় সবাই চলে এসেছে। বাচ্চাদেরও প্রস্তুত করতে হবে। ওদের তৈরি করো জলদি।”
তূর্ণা মৃদু হেসে রোদেলার নাকে আলতো টোকা দিল।
“চলো আজ তোমার ছোট্ট ভাইয়া আর আপুর সবচেয়ে বড় দিন। তাদের নাম রাখতে হবে তো তাই না?”
রোদেলা আনন্দে হাততালি দিয়ে বলে উঠল-
“ আমি নাম ঠিক করবো কিত্তু!”

তূর্ণা হেসে মাথা নাড়ল। তারপর মেয়ের ছোট্ট হাত নিজের উষ্ণ মুঠোয় নিয়ে ধীর পদক্ষেপে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। রোদেলা নাচতে নাচতে তূর্ণার সঙ্গে পা ফেলছে, দোলনায় ঘুমিয়ে আছে দুইজন। সারারাত জেগে জেগে কাঁদবে আর দিনের বেলা এইভাবে ঘুমাবে। সে অবশ্য কমই সামলায়, যা বেগ পোয়াতে হয় সেটা রৌদ্রিকে পোয়াতে হয়৷ মানুষটা ঠিক মতো ঘুমাতেও পারে না এদের জন্য, নিজের কাজ থেকে অনেকটা সময় হলো অবসর নিয়েছে। বাড়ির সবাই থাকলেও রৌদ্রিক নিজের সন্তানদের নিজেই সামলাতে পছন্দ করে। ঘরে এসে রোদেলা আর তূর্ণার মিলে দুইজনের জামা বের করলো, দুই আলমারি ভর্তি তিনজনের জামা দিয়ে ভরা বাচ্চাদের। রোদেলা একটা জামা বারিয়ে দিয়ে বলে-
“ এটা পরাও ভাইকে তুন্দল লাগবে।”
তূর্ণার সেটাই নিলো, রোদেলা আবারও বেছে বেছে বোনের জন্য একটা গোলাপী রঙের নিয়ে দিয়ে বলে-
” এতা তিত্তালের জন্য।”
তূর্ণা আর বাছাবাছি করলো না, রোদেলার বাছাইকৃত জামাগুলো সুন্দর করে দুইজনকে পরিয়ে দিলো। রোদেলার বেবির সঙ্গে কথা বলছে টুকটাক, তার কথার ভান্ডার যেনো শেষ হওয়ার নামই নেয় না।

সারা বাড়ি অনুষ্ঠান উৎসবে মুখর। দূরে কোরআন তিলাওয়াতের সুমধুর ধ্বনি ধীরে ধীরে ভেসে এসে সমস্ত কোলাহলকে প্রশমিত করে দিচ্ছে। বিশাল মঞ্চের মধ্যভাগে মখমলের শুভ্র আসন। তার দু’পাশে রূপোর দোলনা, সাদা মসলিনে মোড়ানো। দোলনার চারপাশে বেলিফুলের মালা দিয়ে সাজানো। এক দোলনায় নিশ্চিন্ত নিদ্রায় নিমগ্ন কন্যাশিশুটি। অন্য দোলনায় চোখ মেলে বিস্ময়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে পুত্রসন্তান। তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই অথচ আজকের এই বিপুল আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু তারাই। তার থেকে কিছুটা দূরে রোদেলা দাঁড়িয়ে। তার শিশুসুলভ চঞ্চলতা তার মধ্যে অটুট, তবে সেই চঞ্চলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক নতুন পরিচয় সে আজ বড় আপু, বিগ সিস্টার। অনুষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী ইমাম সাহেব প্রথমে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত সমাপ্ত করে নবজাতকদের সুস্বাস্থ্য, নেক হায়াত ও ঈমানদার জীবনের জন্য দীর্ঘ দোয়া করলেন। সমগ্র প্রাঙ্গণ নিস্তব্ধ হয়ে রইল। শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতেও সেই মুহূর্তে যেন শুধু “আমীন” ধ্বনিটুকুই আকাশের গায়ে প্রতিধ্বনিত হলো।
এরপর আকিকার মূল পর্ব শুরু হলো। রৌদ্রিক নিজ হাতে পুত্রসন্তানকে কোলে তুলে নিল। মাতৃত্বের অনির্বচনীয় প্রশান্তি নিয়ে তূর্ণা তুলে নিল কন্যাশিশুটিকে। রোদেলা তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক হাত দিয়ে ভাইকে ধরেছে অপর হাত দিয়ে বোনকে। তিনজনকে পাশাপাশি দাঁড়াতেই উপস্থিত সকলের চোখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত তৃপ্তি। ইমাম সাহেব স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন-

“নবজাতকের ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত প্রদান সুন্নত।”
রৌদ্রিক দুই হাতের অগাধ মমতায় ছেলেকে বুকে আগলে নিয়ে ডান কর্ণের কাছে মুখ ঝুঁকাল।
“আল্লাহু আকবার… আল্লাহু আকবার…”
তার গম্ভীর অথচ কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারিত আজানের প্রতিটি শব্দ যেন পিতৃত্বের অঙ্গীকার হয়ে শিশুটির কর্ণগহ্বরে প্রবেশ করল। একইভাবে কন্যাশিশুর কানে ইকামত উচ্চারণ করল তূর্ণা। তার কণ্ঠ কাঁপছে। এতোকিছু প্রথমবার দেখা, সায়রা বেলাও এতো বড় করেই সবকিছু হয়েছিল, তবুও সেখানে ইরা আর শ্রাবণ ছিলো আর আজকে সে আর রৌদ্রিক। তার চোখের কোণে টলমল করছিল অশ্রু। সুখের অশ্রু। রৌদ্রিক হাসি মুখে ছেলের পানে চেয়ে বলে-
“আমাদের পুত্রের নাম রাখা হলো ” তূর্ণ সিকদার রোদ্দুর ।”
মুহূর্তেই চারদিক করতালিতে মুখর হয়ে উঠল।
করতালির রেশ মিলিয়ে যেতেই তূর্ণা নিজের বুকে জড়িয়ে ধরা কন্যাশিশুর কপালে দীর্ঘ চুম্বন এঁকে বলল

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৫

“আর আমাদের কন্যার নাম ” তাসরিন সিকদার রোদেশী”
দুইটি নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন সমগ্র পরিবেশ আরও পবিত্র হয়ে উঠল। দু’টো নামই রোদেলা পছন্দ করে দিয়েছে, রোদেলার অধর ভাজ থেকে হাসি যেনো সড়ছেই না। উপস্থিত প্রত্যেকের মুখে মুগ্ধতার হাসি। বাচ্চাদের আবারও দোলনায় রাখা হলো৷ রোদেলা তাদের কাছ থেকে সড়ছেই না। রোদেলা এবার দুই দোলনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক হাতে ভাইয়ের ক্ষুদ্র আঙুল, অন্য হাতে বোনের নরম হাত মুঠোয় ধরে রইল। তারপর তাদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে-
” তোদেশী, তোদ্দুল!”
সবাই হাসলো, রোদেলা এখনোও র’কে ত বলার অভ্যাস বদলায়নি।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here