Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৪

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৪

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৪
ফাহিমা ইসলাম

বেলা ঠিক এগারোটা বেজে সতেরো মিনিট। মিঠা রোদে চারিদিকে ঝিলমিল করছে, হঠাৎ করেই বাইরে থেকে গাড়ির শব্দ ভেসে এলো। দারোয়ান দ্রুত গেট খুলে দিতেই কালো রঙের গাড়িটা ধীরগতিতে প্রবেশ করল সিকদার বাড়ির বিশাল প্রাঙ্গণে। রাশেদুল সিকদার,রশিদ সিকদার আর রহিম সিকদার বাহিরে এসে দাড়িয়েছেন মেহমানদারির জন্য। গাড়ি থেকে
প্রথমে নেমে এলেন মধ্যবয়সী এক মার্জিত ভদ্রমহিলা।
গাঢ় পান্না রঙের মসলিন শাড়ি, চোখেমুখে সংযত ব্যক্তিত্ব। আনিকা হোসেন, হঠাৎ পাত্রপক্ষের গাড়ি থেকে কুটুমকে বের হতে দেখে তিন ভাইয়ের মাঝেই বিস্ময় বিদ্যমান,তারপর গাড়ি থেকে নামলেন গম্ভীর ব্যক্তিত্বের এক ভদ্রলোক। পরিপাটি ধূসর পাঞ্জাবি, শুভ্র দাড়ি আর স্থির দৃষ্টি। সাদাত হোসেন বেয়ানদের দেখেই একগাল হাসলেন। রিনি কি এদের কথাই বলছিলো? পাত্রপক্ষ কি তবে তাদেরই পরিচিত কেউ ছিলো? তাদের ঠিক পেছনেই নামল লম্বা সুঠাম গড়নের এক যুবক। অফ-হোয়াইট পাঞ্জাবির ওপর গাঢ় নীল ওয়েস্টকোট, হাতে দামী ঘড়ি, মুখে অপ্রয়োজনীয় কোনো অভিব্যক্তি নেই। এই যুবকই ইকরাম হোসেন।

“ কেমন আছেন আপনারা?”
রাশেদুল সিকদার বিস্ময় ছাপিয়ে হেসে উত্তর দিলেন।
“ আলহামদুলিল্লাহ! আপনারা কেমন আছেন?”
“ আলহামদুলিল্লাহ আমারও ভালো, আরও ভালো হয়ে যাবো ছেলের বউকে ঘরে তোলার ব্যবস্থা করে।”
“ ভিতরে চলুন।”
কথা বলতে বলতে ভিতরে গেলো সবাই। ভিতরেই সবাই অপেক্ষা করছে,জবা সিকদার শাড়ির আঁচল ঠিক করলেন। রুমা সিকদার মুখে স্বাগত হাসি ঝুলছে তার অধর কোণে। তবে পাত্রপক্ষের জায়গায় পরিচত মুখশ্রী দেখে তারা অবাক হলেন। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না, তবে তিন জা একে-অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করলো। নিজেদের মধ্যে থাকা চাপা দিলো তাদের বিস্ময়, এগিয়ে এলো অতিথি আপ্যায়নে। শ্রাবণ এখনো অবাক হয়ে নিজের শশুড় বাড়ির মানুষের দিকে তাকিয়ে আছে। রৌদ্রিক পাশে দাঁড়ালো, সে শ্রাবণের অবস্থা দেখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে-

” ভালো ভাবে তাকা। এমন ভাবে তাকালে কি ভাববে!”
শ্রাবণ অবাক হয়েই বলে ওঠে-
“ রিনি তলে তলে আমারই বউয়ের ভাইয়ের সঙ্গে প্রেম করলো আর আমি বুঝলাম না।”
“ সাধেই কি তোকে গাধা বলি নাকি বল।”
শ্রাবণ অবাক হয়ে রৌদ্রিকের মুখপানে চেয়ে জিজ্ঞেস করে-
” তারমানে তুমি সব জানতে? মানা করোনি কেনো?”
“ মানা করবো কেনো? ছেলে ভালো হলে মানা করার কোনো কারণ আছে?”
ইকরাম ছেলে হিসেবে বেশ দারুন বর্তমানে দেশের অন্যতম শীর্ষ বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে রিজিওনাল ক্লাউড সলিউশনস আর্কিটেক্ট হিসেবে কর্মরত। কোটি টাকার প্রকল্প পরিচালনা করা, আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কৌশলগত প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিদেশি শাখাগুলোর প্রযুক্তি অবকাঠামো তদারকি এসবই তার নিত্যদিনের দায়িত্ব। অল্প বয়সেই অসাধারণ মেধা ও কর্মদক্ষতায় প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আস্থাভাজন হয়ে উঠেছে সে। ব্যক্তিগত ভাবেও বেশ ভদ্রলোক। রৌদ্রিক বিষয়টা জানে কয়েক মাস হলো, ইকরামকে ছেলে হিসেবে তার কাছেও বেশ ভালো লাগে। রিনি নিজেও জানে না সে যে তার আর ইকরামের বিষয়টা জানে। সিঁড়ির ওপর থেকে নিচে নামতে থাকা একটি পরিচিত অবয়ব আচমকা স্থির হয়ে গেল। ইরা, তার কোলে সায়রা আর অন্যহাত দিয়ে তূর্ণাকে নিয়ে নিচে নামছে। তার চোখ প্রথমে গিয়ে থামল নিচে বসে থাকা আনিকা হোসেনের মুখে। তারপর সাদাত হোসেন। আর শেষে ইকরাম। পরবর্তী মুহূর্তেই ইরার ঠোঁট কেঁপে উঠল।

“মা…?”
তূর্ণাও অবাক হয়েছে পাত্রপক্ষ হিসেবে ইরার পরিবারকে দেখে। ইরার হিসাব মিলানোর চেষ্টা করলো কিভাবে কি? তার ভাইয়ের মতো নিরামিষ মানুষটাও নাকি প্রেম করেছে! এটাও তাকে বিশ্বাস করতে হচ্ছে! ইকরাম স্বভাবগতই চুপচাপ,রাগী স্বভাবের। ইরা নিজ বাড়ি থাকাকালী জীবনে দেখেনি তার ভাইকে প্রেম করতে, মেয়ে ফ্রেন্ডও নেই তার ভাইয়ের তেমন। আর তার ভাইয়ের বাচ্চামো তো একবারেই পছন্দ নয়, রিনি তো সবসময় বাচ্চামিতে মেতে থাকে। ইরার এবার মাথা ঘুরলো, হিসাব মিলছেই না। রিনি আর ইকরাম, মানে আলাদা মেরুর মানুষ কিভাবে প্রেম করলো? তাদেরই নাকের ডগায় অথচ তারা জানতেই পারলো না। তূর্ণার ইরার দিকটা বুঝতে পেরে হালকা হেসে বলে-
“ আরে ইরাপু চিন্তা করিও না। আমাদের রিনি কেমন তো জানোই, ওকে আবার না পছন্দ করে থাকা যায় নাকি? বাদ দাও নিচে চলো তো।”
ইরার বিস্ময় কাটিয়ে তূর্ণাকে নিয়ে নিচে নামলো। তূর্ণার শরীরে জড়ানো ঢোলাঢুলা একখান বড় বড় জামা, মেক্সির মতো। শরীরের গঠনের থেকে পেটটা বেশিই বড় তার, পা ফেলতে কষ্ট হচ্ছে বেশ। তবুও সে একা ঘরে বসে থাকবে কেনো? রিনির বিয়ে ঠিক হচ্ছে আর সে থাকবে না?

রিনিকে ইকরামে পাশে বসানো হলো, রিনি লজ্জায় মাথা তুলতে পারছে না। এমনি তার লজ্জা কম তবে আজকে এতো লজ্জা লাগার কারণ বুঝতে পারলো না। বিগত একবছরের মাঝে কোনোদিন ইকরামের এতোটা কাছাকাছি বসা হয়নি, আর না হয়েছে হাত ধরা। বলতো গেলে তাদের পুরো একটা বছরের প্রেমে কোনোদিন ইকরাম তাকে স্পর্শ করেনি, আর না তারা কাছাকাছি বসেছে। তাই আজকের অনুভূতিটা অন্যরকম। বাড়ির সবাই ইকরামকে পাত্র হিসেবে দেখে নিশ্চিন্ত হয়েছে। তাদের আপত্তি নেই, তাছাড়া ইরার পরিবারটা বেশ ভালো একটা পরিবার। মেয়েকে সেখানে দিয়ে তারাও নিশ্চিত থাকতে পারবে না। সবার অনুমতিতে রিনি আর ইকরামের আংটি পরানো হলো।
ইকরামের স্পর্শে কেঁপে উঠল রিনির সর্বঙ্গ। চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেলো ইকরাম তার দিকে চেয়ে আছে। তবে আজকের দৃষ্টিতে অন্যকিছু মিশে রয়েছে। এই মানুষটাকে নিজের করে পেতে কতটা কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে সেটা শুধু রিনিই জানে।
ইকরাম মানুষ হিসেবে রাগী হলেও তাকে এখন অব্দি রাগ দেখায়নি। রাগলেও লোকটা তার উপর কোনোদিন ক্ষোভ প্রকাশ করেনি। সবার অনুমতিতে রিনি আর ইকরাম ছাদে এসে একপাশে দাঁড়িয়েছে। রিনি লজ্জাশ মাথা উঁচু করতে পারছে না, তাই নিচু করে রেখেছে। ইকরাম সাবলীল ভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎই ইকরামে শান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো-

“ আজ এতো শান্ত? তিড়িংবিড়িং করছো না দেখি।”
রিনি চোখ তুলে তাকালো এবার৷ এতোক্ষণের লজ্জার আবরণ থেকে নিজেকে বের করে, আগের ফ্রমে ফিরে এসে বলে-
“ প্রথমবার পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে তাই একটু লজ্জা পাচ্ছি। বউ হবো কয়েকদিন পর তাই লজ্জা পাওয়ার অভ্যাস করছি।”
ইকরাম কিছু বললো না, রিনির স্বভাব সম্পর্কে এক বছর খুব ভালো করে জেনে গেছে। ইকরাম শান্ত স্বরেই বলে-
“ লজ্জাটা ধরে রেখো, বিয়ের আগে হারাম ছিলে বলে স্পর্শ করিনি। তবে হালাল হওয়ার পর প্রতিনিয়ত আমার স্পর্শকে সামলাতে হবে।”
রিনি হয়তো লজ্জা লাগলো, গাল দু’টো কেমন গরম হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রকাশ করতে চাইলো না, লজ্জাটুকু গিলে বলে-

“ আচ্ছা সামলাবো। জামাই সামলানোর জন্যই তো বিয়ে করছি।”
ইরা আর ইকরামের বিয়ের তারিখ ঠিক করা হলো তিন মাস পর। রোহানও দেশের বাহিরে তারউপর সামনে তূর্ণার ডেলিভারিত সবমিলিয়ে তিন মাস পরই সবকিছু ঠিক করা হলো।
দুপুরটা যেন আকাশের কপালে গলিত সোনার দীর্ঘ তিলক এঁকে বসে আছে। সকালবেলার বৃষ্টিধোয়া কোমলতা অনেক আগেই সূর্যের প্রখর অধিকারবোধের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। নিস্তব্ধতা চারিপাশ, সবাই বিশ্রামে ব্যস্ত। এই নিরিবিলি দুপুরে বাথরুমের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল টুকটাক হাসির শব্দ। ছোট্ট রোদেলা বাথটবে দাঁড়িয়ে দু’হাত দিয়ে বারবার পানির ফোঁটা ছিটিয়ে দিচ্ছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রৌদ্রিকের গায়ে। রৌদ্রিক মুখ গম্ভীর করে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা করলেও, মেয়ের দুষ্টুমির কাছে প্রতিবারই হার মেনে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠছে।
“ পাপা আজকে সারাদিন গোসল করবো।”
রোদেলার গম্ভীর ঘোষণা শুনে রৌদ্রিক ভ্রু উঁচু করল।
“ একদমই না।”
“ একবার একদতই।”

বলেই মেয়েটা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। সেই হাসিটা এতটাই নির্মল, যেন পাহাড়ি ঝরনার প্রথম কলকল ধ্বনি। রৌদ্রিক কুসুম গরম পানি ধীরে ধীরে মেয়ের মাথার ওপর ঢেলে দিল। কালো, নরম কেশগুচ্ছগুলো মুহূর্তেই জলে সিক্ত হয়ে কপাল বেয়ে নেমে এলো। খুব যত্ন করে শ্যাম্পু হাতে নিয়ে আঙুলের ডগায় গোল গোল বৃত্ত এঁকে আলতো করে মাথার ত্বকে মালিশ করতে লাগল সে।
“চোখ বন্ধ করো, রোদ। না হলে ফেনা ঢুকে যাবে।”
রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে দু’চোখ শক্ত করে বন্ধ করলেও, একচোখ আধখোলা রেখে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করল।
রৌদ্রিক তা দেখে মুচকি হেসে বলল,
“আচ্ছা! পাপা কি এতই বোকা নাকি?”
ধরা পড়ে যেতেই রোদেলা আবার হাসল। তারপর বাধ্য মেয়ের মতো দু’চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ছোট্ট ঠোঁট গোল করে বসে রইল। শ্যাম্পুর সাদা ফেনাগুলো ধীরে ধীরে মেয়েটার মাথাজুড়ে জমে উঠল। দূর থেকে মনে হচ্ছিল, তুলোর নরম মুকুট পরে বসে আছে ছোট্ট কোনো পরীকন্যা। কিছুখন পর আবারও রোদেলা চোখ মেলে তাকালো, তার দৃষ্টি এবার আড়মোড়া ভেঙে ওঠা তূর্ণার উপর পরলো। এই সময়টাতে তূর্ণা ঘুমায়, রোদেলা তূর্ণাকে নড়তে দেখে হাসি মুখে বলে ওঠে-

” মা আমি একানে দেখু।”
“ চোখ বন্ধ রোদ, শ্যাম্পু চোখে যাবে।”
“উপফ পাপা, তুনি কালি ভয় পাও।”
“ আমার ভয় পাওয়ার জিনিস হলে ভয় পাবো না? মা’কে পরে দেখিও আগে চোখ বন্ধ কর।”
“ এত্তো ভয় পাও?”
“ ভয় তাদেরই থাকে, যাদের হারানোর কিছু থাকে। তুমি আমার জীবনে কোনো অর্জন নও, তুমি আমার প্রার্থনা, সেটা পূর্ণ হওয়ার পরও রোজ নিয়ম করে আগলে রাখতে চাই।”
রোদেলা রৌদ্রিকের কথার মানে বুঝলো না, কিন্তু রৌদ্রিকের সিরিয়াস মুখশ্রী দেখে আর দুষ্টুমি করলো না। ভদ্র বাচ্চার মতো চোখ বন্ধ করে নিলো।
রৌদ্রিক খুব ধীরে ধীরে ফেনাগুলো ধুয়ে দিতে দিতে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর কোথাও এক নিঃশব্দ উপলব্ধি জন্ম নিল,জীবনের সবচেয়ে বিশুদ্ধ সুখগুলো কখনো প্রচণ্ড শব্দ করে আসে না; তারা আসে এমনই ক্ষুদ্র, সাধারণ, সংসারঘেরা মুহূর্তের ছদ্মবেশে। ছোট্ট দুটি হাত যখন গলা জড়িয়ে ধরে, কিংবা বিশ্বাসভরা চোখ বন্ধ করে কোনো শিশু নিজের সমস্ত নিরাপত্তা একজন মানুষের হাতে সমর্পণ করে সেই অনুভূতির কাছে পৃথিবীর সমস্ত প্রাপ্তিই তুচ্ছ হয়ে যায়।
ফেনা ধুয়ে শেষ করতেই রোদেলা চোখ মেলে তাকাল। তারপর আচমকাই দুই হাত ভরে পানি তুলে রৌদ্রিকের মুখে ছুড়ে মেরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল-

“ মজা তাই না?”
রৌদ্রিক কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভিনয় করে বলল-
” পাপাকে ভিজিয়ে দিলে?”
রোদেলা বিজয়ীর হাসি হাসল। সেই হাসির দীপ্তি জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া দুপুরের সূর্যালোককেও যেন এক নিমেষে হার মানিয়ে দিলো। রৌদ্রিক মেয়েকে সুন্দর মতো টাওয়ালে পেঁচিয়ে রুমে এনে, হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুলগুলো সুন্দর মতো শুঁকিয়ে দিলো। তারপর বেবি লোশন লাগিয়ে দিয়ে, চুলগুলো সুন্দর মতো বেঁধে দিলো। একে একে রোদেলাকে সম্পূর্ণ রেডি করালো, রোদেলা মনের আনন্দে তার মতো করে গুনগুন করছে। এর মাঝেই তূর্ণার ঘুম ছুটে গেছে। রোদেলা তূর্ণা কে উঠতে দেখে তার পাশে গিয়ে পর পর কপালে কয়েকটা চুমু দিয়ে, প্রাণভরা হাসি দিয়ে বলে-
“ বেবিদের ঘুম শেষ?”
রোদেলা কোনো রকমে রোদেলাকে টেনে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে বলে-
“ হুম শেষ, গোসল দিয়েছে পুতুলটা?”
“ হুম, করেছি তো দেখো।”

বলেই নিজেকে মেলে ধরলো। রৌদ্রিক নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলো। তূর্ণা কোনো রকমে আধশোয়া অবস্থায় বসলো। রোদেলার সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত সে, কিছু সময় পর বিছানার কিনারায় আধশোয়া অবস্থায় বসে থাকা তূর্ণার সমগ্র দেহটা আচমকাই তীব্র যন্ত্রণার অভিঘাতে কেঁপে উঠল। প্রথমে সে ভেবেছিল, হয়তো সাময়িক টান। মাঝে মাঝেই এমনটা হয় তাই সেরকম পাত্তা দিলোনা। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই শরীরটা তার ভীষণ ভঙ্গুর; ডাক্তার বারবার সতর্ক করেছিলে যেহেতু তার গর্ভে দুটি শিশু, তাই প্রতিটি দিনই সাবধানে পার করতে হবে। তবুও নির্ধারিত প্রসবের সময় আসতে তখনও বাকি প্রায় দশ দিন। কিন্তু পরের মুহূর্তেই নিম্ন উদরে এমন এক তীব্র সংকোচন নেমে এলো, যেন অদৃশ্য কোনো নিষ্ঠুর করালগ্রাস তার অস্তিত্বকে ভেতর থেকে মুচড়ে ধরে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে চাইছে। তূর্ণার আঙুলগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরল। শ্বাস আটকে এল। চোখের মণি বিস্ফারিত হয়ে উঠল আতঙ্কে।
“ রোদ!

নামটুকুও সম্পূর্ণ উচ্চারণ করতে পারল না সে। পরবর্তী সংকোচনের অভিঘাতে আর্তনাদ ছিটকে বেরিয়ে এলো তার কণ্ঠনালী ভেদ করে। সেই আর্তচিৎকারে যেন ঘরের চার দেয়াল পর্যন্ত কেঁপে উঠল। রৌদ্রিক দ্রুত এগিয়ে এলো বিছানার কাছে। তূর্ণা কুঁকড়ে আছে। কপালের প্রতিটি শিরা টানটান। সারা শরীর ঘামে সিক্ত। ঠোঁট কাঁপছে, নিঃশ্বাস ভেঙে ভেঙে বেরোচ্ছে।
রৌদ্রিকের বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই শূন্য হয়ে গেল।
“তূর্ণা… কী হয়েছে? কোথায় ব্যথা হচ্ছে?”
তূর্ণা কাঁপতে কাঁপতে উদরের ওপর হাত চেপে ধরল।
“খুব… খুব ব্যথা হচ্ছে… আমি… আমি পারছি না…”
আরেকটি তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ আছড়ে পড়তেই তার শরীর ধনুকের মতো বাঁকিয়ে উঠল। অসহায় কণ্ঠে ছিটকে বেরোল হৃদয়বিদারক আর্তনাদ। রোদেলা কিছুই বুঝছে না, ব্যথায় তূর্ণার বিত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া মুখশ্রী পানে ভয়াতুর চোখে তাকিয়ে রয়েছে।

“আ…আহ…!”
রৌদ্রিকের সমস্ত স্নায়ু যেন এক নিমিষে বিশৃঙ্খলার অতল গহ্বরে পতিত হলো। রৌদ্রিক বুঝতে পারলো নির্ধারিত সময়ের আগে প্রসববেদনা! আর তূর্ণার শারীরিক অবস্থাও তো বহুদিন ধরেই আশঙ্কাজনক।
“ মা, ছোট মা এদিকে একটু আসো প্লিজ!”
রৌদ্রিকের চিৎকারে ছুটে এলে তারা, তূর্ণাকে ব্যথায় কাতরাতে দেখে বুঝলেন কি হয়েছে। জবা সিকদার এগিয়ে এসে তূর্ণার মাথা হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু লাভ হচ্ছে না। মেয়েটা ব্যথায় কাতরাচ্ছে, রোদেলা ভয়ে তাকিয়ে আছে। সে বোঊয় কেঁদে ফেলবে তূর্ণার এমন অবস্থা দেখে। রুমা সিকদারের দিকে তাকিয়ে রোদেলা কান্না মিশ্রিত স্বরে বলে-
“ বেবিরা মা’কে কত্তো দিচ্ছে কেনু? ওদের না কর না দিদু! মা কত্তো পায়!”
“ কিছু হয়নি দিদুভাই, বেবিদের আসার সময় হয়েছে তাই মা একটু কষ্ট পাচ্ছে। মা একদম ঠিক হয়ে যাবে, তুমি সায়রার কাছে যাও একটু হুম?”
“ না মায়ের কাছে থাকবো!”
“ এখন থাকা যাবে না সোনা, পরে মায়ের সঙ্গে থেকো কেমন?”

বলেই রুমা সিকদার রোদেলাকে বুঝিয়ে বাহিরে নিয়ে গেলেন। রৌদ্রিক তূর্ণাকে কোলে নিয়ে নিচে সিঁড়ি বেয়ে নামছে, তার একটু অসাবধানতার জন্য বড় ক্ষতি হতে সময় লাগবে না। তূর্ণা ব্যথায় কাতরাতচ্ছে! তার মুখের দিকে তাকা যাচ্ছে না। ড্রাইভা গাড়ি বের করেছে, রৌদ্রিক দ্রুত তূর্ণাকে নিয়ে গাড়িয়ে বসে। পাশে জবা সিকদারও এসেছেন। গাড়ু ছুটে চলেছে, এদিকে তূর্ণার যন্ত্রণা ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছিল। সে রৌদ্রিকের কবজি এমন শক্ত করে চেপে ধরেছিল যে নখের দাগ রক্তিম হয়ে ফুটে উঠল। ভাঙা নিঃশ্বাসে সে শুধু ফিসফিস করে বলল-
“আমাকে… ছেড়ে যাবেন না…”
রৌদ্রিক এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। পরক্ষণেই তূর্ণার কপালে কাঁপতে থাকা ঠোঁট ছুঁইয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল*
“ এই তো আছি, কোথাও যাবো না। কখনো যাবো না, একটু সহ্য করো! হুম? সব ঠিক হয়ে যাবে, আমি আছি তো।”

তূর্ণা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। সারা শরীর অবশ হয়ে আসচ্ছে, সারা শরীরে তীব্র যন্ত্রণা ছড়িয়ে পরছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি তার শেষ সময়, চোখে সবকিছু কেমন অন্ধকার ঠেকছে। মা হওয়া এতোটা কঠিন? এরজন্যই হয়তো মায়ের পায়ের নিচে বেহেশত, একটা সন্তান জন্ম দিতে কতটা তীব্র মৃ’ত্যু যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় সেটা একমাত্র একটা মেয়েই জানে।
“ আ..আমি বোধহয় ম..ম’রে যাবো বর!”
“ কিছু হবে না পাগল!”
“ আ…আমাকে বাঁচান বর! আ…আমি বাঁচতে চ..চাই!”
রৌদ্রিক তূর্ণার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে অত্যন্ত নরম স্বরে বলে-
“ বাঁচবো তো, অনেক বছর বাঁচবো। অনেকটা পথচলা বাকি তোমার, কেবল তো শুরু তোমার পথচলা। ”
“ আ..আমার কষ্ট হচ্ছে খ..খুব!”
“ একটু সহ্য করো তূর্ণা! আছি তো এই দেখো।”
বলেই শক্ত করে তূর্ণার হাতটা চেপে ধরলো। তূর্ণার মনটা শান্ত হলো না, মনে হচ্ছে সে ম’রে যাচ্ছে একটু একটু করে। শরীরের নিচের অংশটুকুতে কেউ যেনো পিটাচ্ছে! তূর্ণা কাতরাতে কাতরাতে বলে ওঠে-
“আ… আমি যদি আর কখনো ফিরে না আসি?”
“কিছু প্রতীক্ষা প্রত্যাবর্তনের জন্য নয়, অস্তিত্বের জন্য বেঁচে থাকে। তাই তোমার না-ফেরা আমার প্রতীক্ষাকে মুছে দিতে পারবে না।”
তূর্ণা আর কিছু বলতে পারলো না চোখ জোড়া বুঝে আসচ্ছে। রৌদ্রিক সেটা দেখে তূর্ণাকে জাগানোর চেষ্টা করলো।
“ এই মেয়ে চোখ খোল, দেখো চোখ খোলো। বন্ধ করছো কেনো? তূর্ণা চোখ মেলে আমার দিকে তাকাও।”
“ তাড়াতাড়ি চলো।”
জবা সিকদার তাড়া দিলেন, ছেলের মনের অবস্থা তিনি মা হয়ে উপলব্ধি করতে পারছেন। উপরে উপরে মনে হচ্ছে কিছুই হয়নি, কিন্তু তিনি খুব ভালো করে জানেন তার ছেলের মনের মধ্যে কি ঝড় চলছে। ঘেমে একাকার হয়ে গেছে এই এসির মধ্যেও, নেত্রজোড়া লাল হয়ে এসেছে। নিজেকে সামলানোর বৃদ্ধ চেষ্টা চালাচ্ছে।

করিডোরজুড়ে ছড়িয়ে আছে তীব্র জীবাণুনাশকের গন্ধ, সাদা দেয়ালের উপর ঝুলে থাকা নির্বিকার ঘড়ির কাঁটাগুলো যেন প্রতিটি সেকেন্ডে মানুষের ধৈর্যকে কুরে কুরে খাচ্ছে। অপারেশন থিয়েটারের লাল সতর্কবাতিটা অবিরাম জ্বলছে। তার্ণা অপারেশন থিয়েটারে রয়েছে, নরমাল ডেলিভারি সম্ভব নয়। তূর্ণার শরীরিক দূর্বলতা রয়েছে, শেষ মুহূর্তে রক্তচাপ ভয়াবহভাবে নেমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে উঠেছে। চিকিৎসকদের কণ্ঠেও এখন আর স্বস্তির নিশ্চয়তা নেই; আছে কেবল প্রাণপণ চেষ্টা। রৌদ্রিক বারবার একই জায়গা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আবার ফিরে আসছে। আবার দাঁড়িয়ে পড়ছে। তার ভিতরকার উদ্বিগ্ন বেড়েই চলেছে, যে মানুষটাকে সবাই শীতল আগ্নেয়গিরি বলেই চিনে, যতো যাই হোক রৌদ্রিকের ভিতরকার অবস্থা বোঝা সবসময় বড্ড দায়। সেখানে আজ সেই মানুষটার চোখের মণিতে উন্মাদের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে এক আদিম ভীতি। হাতে ধরা তূর্ণার ওড়নার ছোট্ট ভাঁজটুকু সে এত জোরে চেপে রেখেছে যে আঙুলের গিঁটগুলো রক্তশূন্য সাদা হয়ে উঠেছে। হঠাৎ করেই এক নার্স দ্রুত পায়ে ওটির ভেতরে ঢুকে যেতেই রৌদ্রিক প্রায় ছুটে গেল।

“সিস্টার ও কেমন আছে?”
কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো সময় কারও নেই। দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল। ধাতব দরজার সেই ক্ষীণ শব্দটুকু যেন রৌদ্রিকের বুকের ভেতর একটা সম্পূর্ণ পৃথিবী ধসে পড়ার শব্দ হয়ে প্রতিধ্বনিত হলো। সে কাঁপা হাতে মাথার চুল মুঠো করে ধরল। গভীর শ্বাস নিতে চাইল কিন্তু পারল না। মনে হচ্ছে বুকের খাঁচার ভেতর কেউ সমস্ত বাতাস শুষে নিয়েছে। জবা সিকদার দুই হাত তুলে অবিরাম দোয়া করে যাচ্ছেন। ঠোঁট কাঁপছে, চোখদুটো অশ্রুতে এতটাই ঝাপসা যে সামনে থাকা দৃশ্যও স্পষ্ট দেখতে পারছেন না। রৌদ্রিকের বাবা বহুবার ছেলেটার কাঁধে হাত রাখতে গিয়েও থেমে যাচ্ছেন। কি বলবে জানা নেই, কারণ এই সময়টা একজন বাবার জন্য কেমন হয় তিনি বাবা হয়ে জানেন।

অনেকটা সময় পার হয়েছে, তবুও রৌদ্রিকের নিকট মনে হচ্ছে সময় চলছে না আজ। সময় যেনো এক জায়গায় আঁটকে রয়েছে। কিছুক্ষণ পর সেখানে শ্রাবণে কোলে করে রোদেলাও উপস্থিত হলো। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে চোখ-মুখ ফুলিয়ে লাল করে ফেলেছে। রৌদ্রিকে দেখা মাত্রই তার কান্নার তারনা বেড়ে গেলো, হাত পাতলো বাবার কোলে যাওয়ার জন্য। রৌদ্রিক মেয়েকে বুকে টেনে দিলো, রোদেলা ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে-
“ বেবিরা খুব পতা, মা’কে কত্তো দিছে। আমি বেবিদের চাই না! ওরা পতা!”
রৌদ্রিকের নিজের কথা ভুলে মেয়ের কান্না থামানোর জন্য বলে-
“ কিছু হবে না মায়ের, মা ঠিক হয়ে যাবে। বেবিরা তো ছোট, আর ওরা তোমার কাছে আসবে বলেই মা’কে একটু কষ্ট দিচ্ছে। নাহলে ওরা আসবে কিভাবে রোদের কাছে?”
“ সত্তি তো? ওরা মা’কে বেশি কত্তো দিচ্ছে না তো?”
” হুম সত্যি! এবার কান্না থামাও দেখি। এভাবে কাঁদলে মা’কে কে সামলাবে? তোমাকে কাঁদতে দেখলে তোমার ছিঁচকাঁদুনে মাও তো কান্না জুড়ে দিবে।”
রোদেলা নাক ফুলালো, সে নাকচ করে জানালো।
“ আমি ব্রেব গাল, কাতি না তো। তোদ কই কাঁতে?”
বলেই নিজ হাতেই চোখের পানি মুছলো। বড়ো করে হাসি দিলো একটা, রৌদ্রিকের বুক থেকে আর একটা ভাড় নামলো।

“ শ্রাবণ চাচ্চুর সঙ্গে থাকো হুম? একদম দুষ্টুমি করবে না রোদ ঠিক আছে?”
“ আচ্ছা করবু না, বেবি কখন আতবে?”
“ আসবে সোনা, একটু ওয়েট করো।”
” আমি আগে কুলে নিবো কিত্তু!”
“ আচ্ছা নিও।”
রৌদ্রিক রোদেলাকে শ্রাবণের কাছে নিয়ে গেলো। রৌদ্রিক রোদেলাকে নিয়ে বাহিরে গেলো হসপিটালের। এইখানে৷ না থাকাই ভালো।

সময় পেরিয়ে ঘন্টাখানিক হয়ে গেছে। সবাই অপেক্ষা করছে কিছু খবর শোনার, তবে ভেতর থেকে কোনো খবর এলো না এখন অব্দি। রৌদ্রিকের চিন্তা বেড়েছে, তার দিকে তাকানো চাচ্ছে না। কয়েক ঘন্টায় তার দশা পরিবর্তন এসেছে, সমগ্র মুখশ্রীতে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট!
হঠাৎ করেই অপারেশন থিয়েটারের ভারী দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। একজন নার্স আর চিকিৎসক বেরিয়ে এলেন। নার্সের দুই বাহুতে জড়ানো দু’টি ক্ষুদ্র জীবন একটি কন্যাশিশু, অন্যটি পুত্র।পুত্রশিশুটির ক্ষুদ্র বক্ষ উঠানামা করছে নিয়মিত ছন্দে। কান্নাটাও বেশ জোরালো। অথচ কন্যাশিশুটির দেহখানি যেন তুলোর মতো নিশ্চল। চোখদুটো সম্পূর্ণ মুদিত, ঠোঁটের আভা নীলচে, শ্বাসপ্রশ্বাসটুকুও এতটাই ক্ষীণ যে, না দেখলে বোঝাই যায় না সে এখনও জীবনের সঙ্গে সূক্ষ্ম এক সুতোয় আবদ্ধ। রৌদ্রিক সহ সবাই দ্রুত এগিয়ে এলেন। রৌদ্রিকের নিশ্বাস যেনো আঁটকে এসেছে। ডাক্তার এগিয়ে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে-

“অভিনন্দন। আপনার একটি ছেলে, একটি মেয়ে হয়েছে। তবে… কন্যাশিশুটির শারীরিক প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত নয়। যমজ সন্তানের ক্ষেত্রে অনেক সময় একটি শিশু তুলনামূলক দুর্বল হয়ে জন্মায়। ওর শ্বাস-প্রতিক্রিয়া ও শরীরের অভিযোজন এখনো স্থিতিশীল নয়। আমরা ওকে এনআইসিইউতে (NICU) নিয়ে যাচ্ছি। সেখানে বিশেষ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত ইনকিউবেটর, অক্সিজেন সাপোর্ট এবং সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা হবে। আপাতত ওকে আপনাদের কাছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”
ডাক্তারের কথায় রৌদ্রিকের বুকে এমনভাবে আঘাত হানল, যেন অদৃশ্য কোনো কুঠার তার পাঁজরের অস্থিমজ্জা পর্যন্ত চিরে ফেলেছে। তার দৃষ্টি গিয়ে থামল মেয়েটার মুখে।এতো ছোট্ট এত নিস্তেজ এত অসহায় মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণশক্তি যেন ওর শরীর থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য নির্বাসনে গেছে। কন্যাশিশুটির ক্ষুদ্র আঙুলখানা একবারও নড়ল না।একবারও কাঁদছেও না। একবারও চোখ খুলে দেখল না তার বাবাকে। রৌদ্রিকের বুকের ভেতরটা আচমকা হিমবাহে রূপ নিল। একজন নার্স দ্রুত কন্যাশিশুটিকে নিয়ে করিডোরের শেষপ্রান্তে অদৃশ্য হয়ে গেল ইনকিউবেটরের দিকে। রৌদ্রিক আটকে থাকা দমটা কোনো রকমে ফেলে কম্পতি স্বরে জিজ্ঞেস করে-

“ আমার স্ত্রী কেমন আছে?”
শব্দটা তার ঠোঁট ছেড়ে বেরোলেও গলায় এসে ভেঙে গেল।
“আপনার স্ত্রীর অবস্থা এখনো সংকটমুক্ত নয়। অস্ত্রোপচারের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে,
আর আগেও হয়েছে। তাঁর শরীর আগে থেকেই অত্যন্ত দুর্বল ছিল। আমরা রক্ত সঞ্চালন শুরু করেছি, তবে পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কক্ষে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এখন দেখা করা যাবে না।”
সবটুকু শোনার পর রৌদ্রিক দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সদ্য জন্মানো নিজের অংশটার দিকে তাকালো, কোলে নেওয়ার সাহস হচ্ছে না। জবা সিকদার পাশ থেকে বললেন-
“ কোলে নে ওকে।”
রৌদ্রিক মায়ের দিকে তাকালো। সাহস হলো না, মনে হচ্ছে নিলেই বুঝি তার ছোট্ট অংশটা ব্যথা পাবে। রাশেদুল সিকদার শ্রাবণকে ফোন দিয়ে ভিতরে আসতে বলেছেন। রোদেলা ছটপট করছে তার কোল থেকে নামার জন্য। বেবির কাছে আসতেই সে নিজেকে ছাড়িয়ে অতি উল্লাসে বলে ওঠে-

“ বেবি নিবো,বেবি নিবো!”
রৌদ্রিক মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। রোদেলা সদ্য জন্মানো নিজের ভাইয়ের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো। রোদেলা অবাক হয়েই বলে ওঠে-
“ ও এত্তো ছোটো? ওর কি ব্যথা লাগছে? ও এত লাল কেনো? ও গাল না বয়?”
নার্সটা হেসে বলে-
“ তোমার ভাই,ও ছোট যে তাই এমন, আর কিছুখন আগেই ওর জন্ম তাই এমন লাগছে। কোলে নিবে না ওকে?”
“ নিবু তো, তোদ তো বেবিকে সবাল আগে নিবে। আমায় দাও ওকে।”
রৌদ্রিক রোদেলাকে একটা সিটের উপর বসিয়ে দিলো। জবা সিকদার পাশেই বসে, নার্সটা সদ্য জন্মানো ছোট্ট অংশটাকে রোদেলার কোলে দিলো। রোদেলা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সদ্য জন্মানো নবজাতকের দিকে। সে তার ছোট হাত দ্বারা বেবির নাকটা স্পর্শ করে বলে-
“ এইযে বেবি দেখো, আমি তুমাল বিগ তিত্তাল! তুমি তো অনেক সুন্দল দেখতে। একদম বেবি ডলের মতো।”
বলেই মাথা নিচু করে চুমু খেলো সদ্য জন্মানো নবজাতকের ললাটে। রোদেলার হাত কাঁপছে এই বুঝি ব্যথা পেলো বেবিটা!

“ দিদু ও চোক খুলে না কেনু?”
” ও এখনো ছোট তাই খুলছে না, একটু সময় দাও খুলবে।”
“ আমার আর একটা বেবি কই?”
” আছে তো।”
” কই? কই? আমায় দাও!”
” না দিদুভাই ও অসুস্থ। ওকে পরে নিও কেমন?”
” ও অত্তু কেনু? কি হয়েছে ওর?”
“ এমনি কিছু হয়নি ঠিক হয়ে যাবে।”
নার্সটা এগিয়ে এসে বলে-

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৩

“ ওকে এখন আমার কাছে দিন, ওকেও একটু এনআইসিইউতে রাখতে হবে।”
বলেই আস্তে করে রোদেলার কোল থেকে বাচ্চাটা তুলে নিলো। রোদেলা রেগে গেলো রাগ নিয়ে বলে-
“ এই এই আমার বেবিকে কেনু নিয়েতো? ও আমার ভাইকে দাও! দাও!”
রৌদ্রিক এগিয়ে এসে বলে-
“ রোদ এখন না, পরে আবার নিও। এখন ও যাক হ্যাঁ,বাড়িতে গেলে তোমার কাছেই থাকবে।”
“ সত্যিই তো?”
“ হুম একদম সত্যি!”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here