Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৩

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৩

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৩
ফাহিমা ইসলাম

সকালটা আজ অদ্ভুত রকমের স্তব্ধ। জানালার কাঁচ ভেদ করে ঢুকে পড়া সূর্যালোকও যেন নিজের দীপ্তি বিসর্জন দিয়ে বিষণ্নতার শোকবস্ত্র পরিধান করেছে। বাড়ির প্রতিটি কোণে এক ধরনের নৈঃশব্দ্যের আবরণ ঘেরা। যেন শব্দ উচ্চারণ করাও আজ নিষিদ্ধ কোনো পাপ। অথচ বাইরে পৃথিবী তার স্বাভাবিক গতিতেই ছুটে চলেছে; থমকে আছে কেবল একটি হৃদয়, যে হৃদয় বছরের পর বছর ধরে অপূর্ণতার ভার বইতে বইতে ক্লান্ত। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা তূর্ণা বারান্দার দোলনাচেয়ারটিতে নিশ্চুপ বসে আছে। স্ফীত উদরের ওপর দু’হাত জড়িয়ে রেখেছে সে। মাতৃত্বের পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও আজ তার চোখে কোনো দীপ্তি নেই; আছে কেবল অদৃশ্য শূন্যতার অসীম বিস্তার।আজকের এই অবসন্নতা শরীরের নয়, বরং বহু বছরের অনাথ অনুভূতির পুনর্জাগরণ।

কিছু কিছু দিন মানুষের জীবনে এমন আসে, যেদিন কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই অতীত কবর ভেঙে ফিরে আসে। বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা স্মৃতিগুলো মৃত থাকে না; তারা হঠাৎ করেই জীবন্ত হয়ে বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ শুরু করে। আজ তূর্ণারও ঠিক তেমনই একটি সকাল। অবচেতন মনে বারবার ভেসে উঠছে একটি মুখ, একজন মানুষ, যাকে সে জন্মদাতা ছাড়া আর কোনো পরিচয়ে কখনো চিনতে পারেনি।
বাবা কী মাধুর্য মিশ্রিত অদ্ভুত শব্দ! মাত্র দুটি অক্ষর। অথচ এই দুটি অক্ষরের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটি সন্তানের সমগ্র নিরাপত্তা, আশ্রয় আর অস্তিত্বের ভিত্তি।
সেই আশ্রয়টাই কোনোদিন পায়নি তূর্ণা। সেই আশ্রয়ের নীড় তৈরি করেনি বাবা নামক মানুষটি তার জন্য ল, অথচ তারই জন্য মন পুড়ছে তার। কেনো পুড়ছে জানা নেই, একরাশ বিষণ্ণতা তাকে গ্রাস করে নিয়েছে।
ছোটবেলায় যখন রূপাকে বাবার কাঁধে চড়ে মেলায় যেতে দেখত, সে দূরে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে থাকত। যখন রূপা পড়ে গিয়ে বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদত, তখন তূর্ণা নিজের রক্তাক্ত হাঁটুর দিকে নির্লিপ্ত ভাবে তাকিয়ে থাকতো। যখন রূপা আর সোহেলের মাথায় স্নেহমাখা হাত বুলিয়ে দেওয়া হতো, তখন তার ভাগ্যে জুটত কেবল অবহেলা, ধমক আর অপমানের ধারালো শব্দ।

আর মায়ের মুখ? সেটা তো স্মৃতিতেও নেই। মায়ের কণ্ঠ কেমন ছিল, হাসি কেমন ছিল, কোলে নিলে কেমন গন্ধ আসতো কিছুই জানে না তূর্ণা। কেবল কল্পনা করতে পারে। তার দাদি বলতো সে নাকি অবিকল তার মায়ের মতো হয়েছে,অথচ সে কোনোদিন সেই মুখশ্রীখানা দেখতে পারেনি। এই পৃথিবীতে এমনও একজন নারী ছিলেন, যার রক্ত তার শরীরে প্রবাহিত হচ্ছে।কিন্তু সেই মানুষটিকে সে কোনোদিন ‘মা’ বলে ডাকতে পারেনি।
অজান্তেই দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তারপর আরও কয়েক ফোঁটা গড়ালো একধারে। অতঃপর সমস্ত সংযম ভেঙে নীরব কান্নায় কেঁপে উঠল তার শরীর!
তূর্ণার আটকালো না নিজেকে, কেঁদে গেলো অনেকটা সময়। হঠাৎই কারো উপস্থিতি টের পেতেই কান্না থেমে গেলো। মাথা উঁচু করে তাকাতেই রোদেলাকে নিজের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখতে পেলো। তূর্ণা নিজেকে আপ্রাণ চেষ্টা করলো থামানোর অথচ পারলো না; রোদেলা এগিয়ে এলো তূর্ণার গা ঘেঁষে। ছোট করতল এগিয়ে দিলো তূর্ণার দুই গালে।

“ কাতু কেনো? বেবি ব্যতা দেয় বেতি? বকে দিবো?”
বলতে বলতে তূর্ণার গালে লেপ্টে থাকা অশ্রুবিন্দু মুছে দিলো। তূর্ণার দুঃখের মাঝেও হালকা হাসলো, তার এক টুকরো সুখের নীড় এই জীবন্ত পুতুলটা। রোদেলাকে একহাতে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। আঁকড়ে ধরে চোখ বন্ধ করে নীরবে সময়টুকু কাটালো। রোদেলা কি বুঝলো জানা নেই, লক্ষীটির মতো নৈঃশব্দে তূর্ণার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো। যেনো সে বোঝাতে চাচ্ছে সে আছে তূর্ণার সঙ্গে, তূর্ণার দেহাবশেষটা ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠলো কান্নার তারণে। অশ্রু বিসর্জন দিলো রোদেলাকে নিয়েই। কিছু সময় পর কান্না থামালো তূর্ণা, অতঃপর মাথা তুলে রোদেলার পানে চেয়ে আপন মনে বলে ওঠে-
“ আমার না হয়েও আমার এত আপন কেনো তুই রোদ? তুই আমার সাত কপাল করে পাওয়া অমূল্য রতন! তোকে না পেলে এই জীবন আমার অপূর্ণই রয়ে যেতো!”
রোদেলা বুঝলো না এত কঠিন শব্দের মানে,তাই নিজের মতো করে তূর্ণার অশ্রুবিন্দু মুছে দিয়ে আদুরে স্বরে বলে-

“ আমি আতি তো, কাতে না! বেবিকে বকে দিত্তি দালাও।”
বলেই রোদেলা নিজেকে ছাড়িয়ে তূর্ণার স্ফীত উদরের উপর হাত রেখে রাগী স্বরে বলে-
“ পতা বেবি, মা’কে কেউ কত্তো দেয়? দেখতো না মা কাতে হু! একদম মাইল দিবো, মা’কে কত্তো দিলে আদল করবো না একতম হুম। একতম গুত বেবি হয়ে থাকো।”
রোদেলা কথা শুনে কান্নার মাঝেও হেসে ফেললো তূর্ণা। রোদেলাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু একে দিয়ে বলে-
“ আমার পুতুল! মায়ের পুতুল!”
দূর থেকে রৌদ্রিক সবটা দেখছিলো, রোদেলা তার তূর্ণার সুন্দর এই মুহুর্তে সে আর সামনে আাগায়নি। তূর্ণার কান্নার কারণটাও বুঝতে সক্ষম সে; তবে সে স্ত্রীর এই ইচ্ছেকে পূর্ণ করবে না। যাদের কাছে তার স্ত্রীর মূল্য নেই, সেখানে এতো মায়া দেখি লাভ কি? শুধুই কষ্টই পেয়ে যাবে আবারও। দীর্ঘকালীন কষ্টের চেয়ে, সামরিক কষ্ট বেশি শ্রেয়! এটা র’ক্তক্ষরণ করলেও দীর্ঘস্থায়ী হয়না, বরং সময়ের প্রেক্ষিতে সেড়ে যায়।

রাত্রি যত গভীরতার দিকে অগ্রসর হয়, পৃথিবী ততই মানুষের মুখোশহীন নিঃসঙ্গতার সাক্ষ্য বহন করতে শুরু করে। দিবালোকের কোলাহল, ব্যস্ততা, কৃত্রিম হাস্যোজ্জ্বলতা সবকিছুই যেন কৃষ্ণবর্ণ অন্ধকারের অন্তরালে নির্বাসিত হয়ে যায়। সিকদার বাড়ির বিশাল প্রাসাদোপম অট্টালিকার প্রতিটি করিডোর নীরবতার কৃষ্ণচাদরে আবৃত। দূরে কোথাও ঘড়ির কাঁটার নিয়মিত শব্দ ছাড়া আর কোনো প্রাণের অস্তিত্ব যেন অনুভূত হচ্ছে না। শুধু দ্বিতীয় তলার দক্ষিণমুখী কক্ষটিতে এখনো জেগে আছে দুটি হৃদস্পন্দন।

রৌদ্রিক সোফায় বসে আছে। ল্যাপটপে কিছু একটা করছে, কাজ করতে করতে হঠাৎ রৌদ্রিকের দৃষ্টি গেলো বিছানায় শোয়া তূর্ণার দিকে। মেয়েটা চোখ বন্ধ রাখলেও নাকের পাটি ফুলে উঠছে। তূর্ণা ঘুমিয়ে নেই সেটা বহুক্ষণ আগেই বুঝেছে, রৌদ্রিক বহুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইল। এতপর উঠে গেলো বিছানার দিকে, হঠাৎই কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই তূর্ণাকে তুলে নিলো বাহুদ্বয়ে। হঠাৎ এমনটা হওয়ায় হকচকিয়ে গেলো তূর্ণা, দ্রুত চোখ মেলে তাকাতেই রৌদ্রিকে দেখতে পেলো। রৌদ্রিক তূর্ণাকে নিয়ে বারান্দায় চলে গেলো, এতপর দোলানাটিতে বসিয়ে দিলো নিজেও পাশে বসে পরলো। তারপর তূর্ণাকে নিজের বুকের সঙ্গে আলতো করে ঠেস দিয়ে রাখল রৌদ্রিক। কিছুক্ষণ দুজনেই নীরব রইলো তারপর রৌদ্রিক নিজের থুতনি রাখল তূর্ণার মাথায়।
নিম্নস্বরে বলল

“জানো, মানুষ কখন অপূর্ণ হয়?”
তূর্ণা নীরবে মাথা নাড়ল।
“যখন সে নিজের মূল্য অন্যের আচরণ দিয়ে মাপে।”
সে তূর্ণার আঙুলগুলো নিজের মুঠোয় আবদ্ধ করল।
“তোমাকে কেউ ভালোবাসেনি বলে তুমি ভালোবাসার অযোগ্য হয়ে যাওনি। বরং তারা ভালোবাসতে শেখেনি এটাই তাদের অক্ষমতা। তোমার নয়!”
কোনো সাড়া এল না।

“ আমাদের জীবনটা খুবই নগন্য, এখানে সুখ-দুঃখ,হতাশা সব মিলিয়ে আমরা বাঁচি। কিছু কাল দুঃখের সঙ্গে বাঁচি,আবার কিছুকাল সুখের সঙ্গে। সুখ-দুঃখ জীবনের একটা বড়ো অংশ, খরস্রোতার মতো বয়ে চলে আমাদের জীবনে। অতীতকে নিজের মধ্যে তালাবদ্ধ করে রাখা মানে নিজেকে প্রতিনিয়তই শেষ করা। যে অতীত আমাদের দুঃখ ছাড়া সুখ দেয়নি, তাকে মনে রাখা নিতান্তই বোকামি। জানো কারা কষ্ট পায়? যারা বোকা তারাই কষ্ট পায়, কারণ বুদ্ধিমানরা কখনো অতীত মনে রেখে জীবন পার করে না। তারা জানে অতীত তাদের কিছুই দিবে না মরিচীকা ছাড়া, তাহলে অতীত ধরে লাভ কি? যেখানে নেই কোনো স্মৃতিকাতর কোনো মুহুর্ত, নেই কোনো হাসির কারণ তাহলে কেনো মনে রেখেছো অতীতকে? অতীতে তুমি ছিলে একজন ভারসাম্যহীন মেয়ে তবে এখন তুমি এখন কারো স্ত্রী,কারো সন্তানের জননী সবচেয়ে বড় কথা তুমি এখন সুস্থ একজন মানুষ, তোমার বাঁচার হাজারটা কারণ রয়েছে। যে চাইলেই মাথা উঁচু করে সমাজে বাস করতে পারবে। কেউ আঙ্গুল তুললে তার আঙ্গুল মুচড়ে দিতে পারবে, কারণ তুমি এখন একা নও, তোমাকে আগলে রাখার মানুষ রয়েছে। আগে তুমি আর এখনকার তুমি’র বিশাল তফাত রয়েছে। মানব হৃদয়ে মাঝে মাঝে ঝর নামে, সেই ঝর বর্ষের সঙ্গে ধুয়ে ফেলে নতুন হৃদয়গাঁথা তৈরি করে নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। কার জন্য কাঁদছো? বাবার জন্য? জন্মদাতা হওয়া খুব সহজ। কিন্তু বাবা হওয়া সেটা ভাগ্যের বিষয়। তোমার জীবনে সেই মানুষটা ছিল না, এটা সত্যি। কিন্তু তাই বলে তুমি ভালোবাসাহীন নও। আল্লাহ হয়তো একজন বাবার স্নেহ কেড়ে নিয়ে তার বদলে আমাকে, আমাদের রোদেলাকে আর তোমার গর্ভে বেড়ে ওঠা ছোট্ট প্রাণটাগুলোকে পাঠিয়েছেন।”

তূর্ণার সমস্ত প্রতিরোধ মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল। নিঃশব্দে মুখ গুঁজে দিল রৌদ্রিকের প্রস্তর বুকে। বহুদিনের জমানো হাজারো অশ্রুবারি ঝড়ছে, সকল অভিমান গিয়ে ঠেকছে একটি নিরাপদ আশ্রয়ে। রৌদ্রিক কিছু বলল না। শুধু এক হাত দিয়ে তূর্ণার চুলে বিলি কাটতে লাগল, আর অন্য হাতটি আলতো করে তার পিঠে রেখে ছন্দহীন হৃদস্পন্দনকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল।
কিছু সময় পর তূর্ণা অশ্রুসিক্ত চোখে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে ভাঙা স্বরে জিজ্ঞেস করে-
“আমায়ও ভালোবাসা যায়?”
” সবটুকু দিয়ে বাসা যায়।”
” আমি পাগল!”
“তবুও আমার।”
” আমাদের একসঙ্গে মানায় না।”
“ তবুও আমার হয়ে থাকতে হবে।”
“ যদি আবার আমি অন্ধকারে হারিয়ে যাই?”
“ আমি আছি অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দিশায় ফিরে আনার জন্য।”
“ আমি পুরোটাই অপূর্ণতা।”
“ অপূর্ণতাই পূর্ণতার সূচনা লগ্ন।”

তূর্ণা হাঁপিয়ে উঠলো, পারলো না সামনে থাকা মানুষটাকে পরাজিত করতে। ফুঁপিয়ে উঠলো সহাসয়, অপর প্রান্তে থাকা মানবটি আবারও তাকে আবদ্ধ করে নিলো নিজের বাহুদ্বয়ে। আগলে নিলো তার কম্পতি দেহাবশেষটা, ক্ষণে ক্ষণে মৃদু হওয়া দুলতে থাকা লতার মতো তাকেও আগলে নিলো মানবটা। যত দিন যাচ্ছে মানুষটার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা বেড়ে চলেছে। একটা মানুষ এতটা নিখুঁত হয় কি করে? তার সকল অপূর্ণতা পেরিয়ে তাকে পূর্ণার লগ্নে পৌঁছে দিয়েছে। আজ মনে হচ্ছে তার মানসিক ভারসাম্যহীনতা কোনো অশুভ অভিশাপ নয়; বরং তার জীবনের শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ।
“ আরও কাঁদতে হবে?”
তূর্ণা কোনো উত্তর করলো না, নিঃশব্দে ফোঁপাতে লাগলো। রৌদ্রিক সাবধানতার সঙ্গে তূর্ণা ভারি শরীরখানা নিজের কোলে বসিয়ে নিলো। তূর্ণার মাথা এখনো রৌদ্রিকে বক্ষপটে এলিয়ে দেওয়া; ওঠার তাড়া নেই, না আছে কান্না থামানোর তারা। রৌদ্রিক করতল তূর্ণার ছড়িয়ে থাকা কেশরাশি গুলো নুইয়ে দিচ্ছে। নিস্তব্ধ রজনীর বুক চীরে ওঠা বাঁকা চন্দ্রলোকে সোনালী রশ্মিতে মুখরিত গোটা ধরণী। তার চতুর্দিকে ঘের নক্ষত্রমন্ডলীরা, তাদের নীরব নীর্তে সাজিয়ে তুলেছে চন্দ্রলোক’কে। অনেকটা সময় নিস্তব্ধতার সাক্ষী হলো, বাহুদ্বয়ে থাকা অর্ধাঙ্গিনীর উপর বিন্দুমাত্র বিরক্তি এলো না।

“ আপনি একটু বেশিই ভালো।”
নাক টানতে টানতে কথাটুকু বলে ওঠে তূর্ণা। মাথা এখনো রৌদ্রিকের বুকপকেটের উপর, ওঠার তাড়া নেই তার। রৌদ্রিক একগাল হাসলো, অতঃপর অত্যন্ত শান্ত স্বরে বলে-
“ খারাপ হতে বলছো?”
“ না, আমার হয়ে থাকুন!”
” তাহলে এখন কি অন্যকারো হয়ে আছি?”
” সেটা বলেছি নাকি।”
“ তাহলে কি বলেছো?
“ আমার রোদের পাপা হয়ে থাকুন।”
“ হয়েছে আর কাঁদতে হবে না, পরে কষ্ট হবে আরও। কি ছিঁচকাঁদুনে বউ পেয়েছি!”
“ আমার ইচ্ছে আমি আমার বরের সামনে কাঁদবো আপনার কি?”
“ আমারই তো সব এখন। এখন চল ঘুমাবে, আমার বাচ্চাগুলোকে অনেক কাঁদিয়েছো সারাদিন।”
“ তাহলে আপনার পেটেই রাখুন ওদের।”
“ সম্ভব হলে রেখে দিতাম, আপাতত সম্ভব নয় তাই তোমার কাছেই রাখলাম এই কয়েকটা মাস।”
তূর্ণার মুখ বাঁকিয়ে বলে-

“ হ্যাঁ এই কয়েক মাসে বুঝেও পেরেছি কি জ্বালা! একবার আসুক সব ক’টাকে পিটাবো।”
“ ভুলেও আমার বাচ্চাদের গায়ে ফুলের টোকা পরলে, এই রুম থেকে বেরিয় রিনির ঘরে চলে যাবে।”
“ কেনো যাবো? এটা আমার ঘর, বউ আগে না বাচ্চা আগে?”
“ আপাতত দু’টোই আগে।”
“ বাটপারি করেন দেখি। সব নৌকায় পা দিয়ে চলছেন সমান তালে।”
“ না চলে উপায় আছে? আমার ঘরে আবার চারটা নৌকা।”
“মজা নিচ্ছেন?”
“ না বাবা এত বড়ো স্পর্ধা কি আমার আছে?”

আজকের সকালটা অন্য সকালের মতো নয়। সকলেই কাজে ব্যস্ত হয়ে আছেন, সকাল গড়িয়ে মধ্যপ্রহরের দিকে এগোলেও সিকদার বাড়ির ব্যস্ততার অন্ত ছিল না। বৃহৎ দোতলা বাড়িটার প্রতিটি কোণে ছুটে বেড়াচ্ছে মানুষ। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে ঘি, কেওড়া আর গরম মসলার গাঢ় সুগন্ধে মো মো করছে। বিশাল ডাইনিং স্পেসে একের পর এক রূপোর ট্রে সাজিয়ে রাখছেন জবা সিকদার। তাঁর কপালে উদ্বেগের রেখা স্পষ্ট হলেও চোখেমুখে মাতৃত্বের এক অদ্ভুত কোমল দীপ্তি। পাশেই রুমা সিকদার ব্যস্ত হাতে ফল কাটছেন। মাঝেমধ্যে বিরক্ত কণ্ঠে কাজের মেয়েদের নির্দেশ দিচ্ছেন। রোমান সিকদার শেষবারের মতো ড্রয়িংরুমের পর্দার ভাঁজ ঠিক করে নিয়ে ধীরস্বরে বললেন;
“ রান্না প্রায় শেষ, ওরা কখন আসবে? রিনি কিছু বললো?”
” ওই জানে ভালো, ওর মাথায় কি ঘোরে আল্লাহ মালুম।”
হালকা বিরক্তি নিয়ে কথাটা বললেন জবা সিকদার। রাশেদুল সিকদার, রশিদ সিকদার এবং রহিম সিকদার তিন ভাই ড্রয়িংরুমে বসে সম্ভাব্য কথোপকথনের বিষয় নিয়ে করছেন। তবে যাদের নিয়ে আলোচনা তাদের চেনেই না তারা।

অন্যদিকে,
দোতলার দক্ষিণমুখী ঘরটায় জানালার পাশে নিশ্চুপ বসে আছে রিনি। আহ তার পরনে গাঢ় নীল জমিনে রুপালি জরির কাজ করা শাড়ি। কোমর ছুঁয়ে নামা ঘন কৃষ্ণ কেশগুলো আলতো করে গুঁজে দেওয়া হয়েছে একপাশে। কপালের মাঝখানে ক্ষুদ্র লাল টিপ, চোখে সূক্ষ্ম কাজলরেখা, অধর কোণে হাসির রেখা ফুটে আছে। ইরা সেটা দেখে সন্দেহ মেশা কণ্ঠে বলে-
“ ননদি অনেক ফাস্ট হয়ে গেছো, প্রেমও করেছো আবারও বিয়েও ঠিক করে ফেলছো বাহ! তা ছেলেটাকে এটা তো আমায় বলো।”

“ উঁহু! বলা যাবে না এখন, বললেই তো সব ভেস্তে যাবে। আসুক তারপর তো দেখতেই পাবে।”
” সেটাই দেখছি, অপেক্ষা করতে হবে। কখন আসবে ওরা?”
” বাড়ির কাছাকাছি এসে গেছে মিনিট দশেকের মধ্যে এসে যাবে হয়তো।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫২

আজকে রিনিকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে, তাই এতো আয়োজন। অথচ বাড়ির কেউই জানে না ছেলে কে? তার পরিবার কে? ছেলে কি করে? কিছুই বলেনি। বাড়ির একমাত্র মেয়ে হওয়ায় আদরটাও সবচেয়ে বেশি। হঠাৎ করেই সে জানিয়েছে তার কাউকে পছন্দ আর তাকেই বিয়ে করবে। রিনির পছন্দ বা বিয়ে নিশো আপত্তি নেই। অনার্সে পড়াশোনা করছে, তারা চেয়েছিলো অনার্সটা শেষ হলে বিয়ের কথা তুলবে। কিন্তু রিনি যখন নিজ থেকে বিয়ের কথা বলেছে তারা না করেনি, তবে তাদের কাউকে জানায়নি পাত্রপক্ষ কে? বার বার জিজ্ঞেস করার পরও বলেনি। কিন্তু মেয়ের জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মেনে নিয়েছে। আর আজকে ছেলে পক্ষ আসচ্ছে।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here