শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৯
সুমাইয়া ইসলাম নূর
মালদ্বীপ এর সময় রাত ঠিক ১১টা।
(বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা।)
মালদ্বীপের আকাশজুড়ে তখন নেমে এসেছে শান্ত, মায়াবী এক রাত। চারপাশে শুধু নীল সমুদ্রের অসীম বিস্তৃতি। দূরে দূরে ঢেউগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে, আর সেই মৃদু শব্দ যেন রাতের নীরবতাকে আরও মোহময় করে তুলেছে। সমুদ্রের বুক ছুঁয়ে বয়ে আসা শীতল বাতাসে লবণাক্ত এক মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে।রেদোয়ান আর পিয়াসা উঠেছে মালদ্বীপের বিশ্ববিখ্যাত Soneva Jani Maldives-এর রাজকীয় Overwater Villa-য়।
পৃথিবীর সবচেয়ে বিলাসবহুল রিসোর্টগুলোর একটি। কাঁচের দেয়ালঘেরা বিশাল ভিলা, ব্যক্তিগত ইনফিনিটি সুইমিং পুল, সাগরের বুকের ওপর কাঠের তৈরি প্রশস্ত ডেক, আর চারদিকে শুধু নীল জলরাশি—মনে হচ্ছে যেন পুরো সমুদ্রটাই তাদের ব্যক্তিগত ঠিকানা।ভিলার মাস্টার বেডরুমের সঙ্গে লাগোয়া বিশাল ব্যালকনির একপাশে রয়েছে সমুদ্রের ওপর ঝুলে থাকা নেট হ্যামক—যেখানে শুয়ে থাকলে মনে হয়, আকাশ আর সমুদ্রের মাঝখানে ভেসে আছো। অন্য পাশে রয়েছে কাঁচের কিনারা ছুঁয়ে থাকা ইনফিনিটি পুল, যার নীল জল যেন গিয়ে মিশেছে ভারত মহাসাগরের গভীর নীলের সঙ্গে।
আর সেই ব্যালকনির ঠিক সামনেই…
সমুদ্রের ওপর তৈরি ব্যক্তিগত কাঠের ডেকটাকে স্বপ্নের মতো সাজিয়ে তুলছে রেদোয়ান।
ডেকের চারপাশে একের পর এক সুগন্ধি সাদা মোমবাতি জ্বালিয়ে গোলাকার নকশা তৈরি করছে সে। গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দিচ্ছে কাঠের পথজুড়ে। মাঝখানে সাদা পর্দায় ঘেরা ছোট্ট একটি ক্যানোপি, তার নিচে দু’জনের জন্য সাজানো ডিনার টেবিল। টেবিলের চারপাশে নরম আলোয় জ্বলছে অসংখ্য ক্যান্ডেল। সমুদ্রের বাতাসে শিখাগুলো হালকা দুলছে, কিন্তু নিভে যাচ্ছে না। পুরো পরিবেশটা যেন কোনো রূপকথার দৃশ্যর মতো লাগছে
এক হাতে শেষ মোমবাতিটা ঠিক করতে করতেই অন্য কানে লাগানো ব্লুটুথ ইয়ারফোনে ইউভির সঙ্গে কথা বলছে রেদোয়ান।অন্যদিকে…
পিয়াসা তখন ও কিছুই জানে না।সে ভিলার ভেতরেই রয়েছে। বিশাল কাঁচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও কলে কথা বলছে বাড়ির সবার সাথে কিছু সময় পর কথা বলা শেষ করে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। তার ধারণাও নেই, মাত্র কয়েক কদম দূরেই তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সারপ্রাইজটি অপেক্ষা করছে
অন্যদিকে…
ইউভির কঠোর ভাবে নির্দেশ দিয়েছে বাড়ির সবাই কে রেদোয়ানের আগে যেন কেউই পিয়াসাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা না জানায়।তাই রাত বারোটা বাজলেও চৌধুরী ভিলার ড্রয়িংরুমে পরিবারের প্রত্যেক সদস্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। কারও চোখে ঘুম নেই। সবার মুখেই চাপা উত্তেজনা।
ইনায়া আরাম করে রাতিব চৌধুরীর কোলের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। আয়াত আর আতিকা ইউভির কলে বসে আছে কখন যে পিয়াসা কে উইশ করবে সেই অপেক্ষাই প্রহর গুনছে কিছুক্ষণ আগেই ভিডিও কলে পিয়াসার সঙ্গে বাড়ির সবার কথা শেষ হয়েছে।
কল কেটে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ড পরই পিয়াসার ফোনে টুং করে একটি মেসেজ ভেসে উঠল।
ফোন অন করে দেখতে পেল ইনায়ার মেসেজ
“বেবি, তোর জন্য সাদা একটা প্যাকেটে কিছু ড্রেস দিয়ে দিয়েছি। একবার খুলে দেখ তো। আজই ওগুলোর একটা পরে আমার ভাইয়াকে একটু চমকে দিস না প্লিজ, সোনা পাখি!”
মেসেজটা পড়েই পিয়াসার ঠোঁটে মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠল।সে সঙ্গে সঙ্গেই রিপ্লাই করল—
“কী ড্রেস? আগে বল তো!”ওপাশ থেকে মুহূর্তেই উত্তর এলো—আগে খুলে দেখ! আজই কিন্তু পরবি। আমার ভাইয়াকে একটু সারপ্রাইজ দে, ওকে?”
পিয়াসা মুচকি হেসে লিখলওকে… দেখি তাহলে।”
মেসেজটা পাঠিয়েই সে নিজের লাগেজের কাছে গিয়ে সাদা রঙের প্যাকেটটা বের করল।
কিন্তু…প্যাকেট খুলতেই বিস্ময়ে থমকে গেল সে।
— “ইয়া আল্লাহ…!”
এটা সে ইনায়ার কাছ থেকে একেবারেই আশা করেনি!প্যাকেটের ভেতরে থাকা পোশাকগুলো দেখে লজ্জায় তার দুই গাল মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল।কয়েক মাস আগে ইনায়া, পিয়াসা আর তুবা মজা করেই অনলাইন থেকে এই ছোট ছোট নাইটড্রেসগুলো অর্ডার করেছিল। পরে তুবা বলেছিল আমি এই গুলো নিয়ে কী করবো তোরা রাখ যদি কোন দিন এই অভাগার বিয়ে হয় তো বিয়ের পর এগুলো নিয়ে যাবো। সময়ের সঙ্গে সবাই বিষয়টা ভুলেই গিয়েছিল।কিন্তু সেই দুষ্টু ইনায়া যে এতদিন ধরে পোশাকগুলো নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিল, আর আজ এমন সময়ে সেগুলো পিয়াসার লাগেজে গুঁজে দেবে—এটা ভাবতেই পিয়াসার হাসি পেয়ে গেল।
প্যাকেটের ভেতরের পোশাকগুলোর দিকে তাকিয়ে সে মাথা নেড়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,
— “পরবো কী পরবো না পরবো না না পরেই ফেলি যা আছে কাপালে
অন্যদিকে…
মালদ্বীপের সময় তখন রাত ১১টা ৫৫ মিনিট।
রেদোয়ান তার সমস্ত প্রস্তুতি শেষ করেছে। সমুদ্রের বুকের ওপর সাজানো স্বপ্নের সেই মুহূর্ত এখন শুধু অপেক্ষা করছে তার প্রিয় মানুষটার জন্য।
ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি নিয়ে সে ধীরে ধীরে ভিলার রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল।
কিন্তু…
আজ যে সে-ই জীবনের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ পেতে যাচ্ছে, সেটা হয়তো কল্পনাও করেনি।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে পিয়াসা।
তার পরনে হাঁটু পর্যন্ত নেমে আসা সাদা রঙের একটি ছোট্ট নাইটড্রেস। কোমর ছাপিয়ে নেমে আসা ঘন কালো চুলগুলো দুই হাতে সামনে টেনে এনে নিজেকে আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে সে। লাজুক মুখে বারবার আয়নায় নিজেকে দেখছে, আবার সংকোচে চোখ নামিয়ে ফেলছে।
কিন্তু সে বুঝতেই পারে নি…তার এই অনিন্দ্যসুন্দর রূপ দেখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবকের গলাটা যেন হঠাৎ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য রেদোয়ান যেন নিজের দৃষ্টিই সরিয়ে নিতে ভুলে গেল।
কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে পিয়াসার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল সে।পরম মমতায় আলতো করে তার কোমর জড়িয়ে ধরতেই পিয়াসা হঠাৎ কেঁপে উঠল।রেদোয়ান মুখটা তার কানের কাছে নিয়ে দুষ্টু হেসে খুব নিচু স্বরে বলল,
— “আমাকে মেরে ফেলার প্ল্যান করেছিস নাকি, পিহু?”পিয়াসা যেন মুহূর্তেই জমে গেল।লজ্জায়, সংকোচে সে নড়তেও পারছে না।কাঁপা কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলল,”আমি… আমি কেন তোমাকে মারতে যাব? আমি তো… আমি তো তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি…”পিয়াসার কথাটা শেষ হতেই—
দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির কাঁটা ঠিক বারোটায় এসে মিলল।নতুন দিনের সূচনা।রেদোয়ান মৃদু হেসে আরও একটু ঝুঁকে পিয়াসার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
— “হ্যাপি বার্থডে, পিহু…” “বিশ্বাস করো, বেবি… তোমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য কত কিছু ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু এখন তোমাকে এই রূপে দেখার পর… মাথায় কিছুই কাজ করছে না।এই মাহতিব রেদোয়ান চৌধুরীকে পাগল করে দেওয়ার জন্য এই লুকে না এলেও পারতে।”
কথাটা বলেই এক মুহূর্তও দেরি করল না রেদোয়ান।
আলতো করে পিয়াসাকে কোলে তুলে নিল।
হঠাৎই কোলে উঠে পড়ায় পিয়াসা চমকে গিয়ে শক্ত করে রেদোয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল।রেদোয়ান মুচকি হেসে ধীর পায়ে তাকে নিয়ে চলে এল সমুদ্রের ধারে সেই স্বপ্নের মতো সাজানো জায়গাটায়।চারদিকে শত শত জ্বলন্ত মোমবাতি, সাদা গোলাপের পাপড়ি, নরম আলো আর সামনে অসীম সমুদ্র।আলতো করে পিয়াসাকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে রেদোয়ান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “উফফ… কী গরম!”
বলেই শার্টের কলারটা একটু ঢিলা করল।
পরক্ষণেই শার্টটা খুলে পাশে ফুলে সাজানো চেয়ারের ওপর ছুড়ে রাখল।মোমবাতির আলো আর সমুদ্রের শীতল বাতাসে তার নিয়মিত শরীরচর্চায় গড়া সুঠাম শরীরের প্রতিটি রেখা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।পিয়াসা অবাক হয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।মনে হচ্ছিল, চোখের পলক ফেলতেও যেন ভুলে গেছে সে।রেদোয়ান মুচকি হেসে ধীরে ধীরে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
খুব যত্ন করে পিয়াসার কোমর ছাপিয়ে নেমে আসা লম্বা চুলগুলো গলার ওপর থেকে সরিয়ে দিল।
তারপর কানের কাছে মুখ এনে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
— “তোর জীবনের সেরা জন্মদিনটা এটাই হতে চলেছে, নীলাঞ্জনা…”টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট কেকটার পাশে রাখা ছুরিটা হাতে নিয়ে পিয়াসার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল সে।দু’জনে একসঙ্গে কেক কাটতেই ঘড়ির কাঁটা নতুন দিনের প্রথম মুহূর্তটাকে ছুঁয়ে গেল।রেদোয়ান আবারও তার কানের কাছে ঝুঁকে নরম কণ্ঠে বলল,
— “হ্যাপি বার্থডে, পিহু… মেনি, মেনি হ্যাপি রিটার্নস অব দ্য ডে, আমার পিহু।”পিয়াসা মুগ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল,
— “থ্যাঙ্ক ইউ… বর।
অন্যদিকে…
ঠিক সেই সময় চৌধুরী ভিলায় যেন ছোটখাটো হুলুস্থুল অবস্থা।
ইনায়া, রিমঝিম চৌধুরী, , ইউভি ওই দিকে তুবা সহ বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে পিয়াসাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবে বলে।
রাত এক টা পেরোতেই সবাই প্রায় একসাথেই দু’জনের নম্বরে কল দিতে শুরু করল।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো রেদোয়ান আর পিয়াসার দু’জনের একজনও ফোন ধরছে না!
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে আবারও কল দিয়ে বলল,
— “এই দুইজন কি ফোনটা সমুদ্রে ফেলে দিছে নাকি?”রিমঝিম ঠোঁট চেপে হাসি আটকাতে আটকাতে বলল,আমার তো মনে হয় ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছে। এখন ফোন ধরার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে।”সাবিহা চৌধুরী হেসে বললো “আরে আর কল দিস না! একটু পর দেখবি নিজেরাই কল দিয়ে বলবে সরি, ফোনটা খুঁজে পাইনি! একদিকে একের পর এক কল যাচ্ছে…
অন্যদিকে ফোন শুধু বেজেই যাচ্ছে।কিন্তু রেদোয়ান আর পিয়াসার দু’জনের একজনও ফোন ধরার নাম নেই!শেষমেশ সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।রাতিব চৌধুরী মুচকি হেসে বললেন,থাক চলো সব ঘুমোতে যাই সকালে না হয় উইশ করবো
রেদোয়ান ধীরে ধীরে পিয়াসার কপালে একটি দীর্ঘ, স্নেহভরা চুমু এঁকে দিল। তারপর নেমে এলো তার চোখের পাতায়, গালে, আর খুব আলতো করে গলার কাছে। প্রতিটি স্পর্শে ছিল ভালোবাসার কোমল আশ্বাস, অধিকার নয়—শুধু আপন করে পাওয়ার অনুভূতি।পিয়াসা লাজুক হাসিতে চোখ বুজে ফেলল। তার দু’হাত নিঃশব্দে জড়িয়ে ধরল রেদোয়ানের কাঁধ। চারপাশে সমুদ্রের ঢেউয়ের মৃদু শব্দ, মোমবাতির কাঁপা আলো আলোই মালদ্বীপের রাত টা যেন তাদের ভালোবাসার নীরব সাক্ষী হতে শুরু করলো রেদোয়ানের আঙুলের কোমল ছোঁয়া ধীরে ধীরে আরও গভীর অনুভূতির জন্ম দিতে লাগল।বেপরোয়া বেসামাল ছোয়া গুলো ধিরে ধিরে গভীর হতে লাগলো। পিয়াসা নিঃশ্বাস ফেলে আরও একটু কাছে সরে এল নিজের মানুষটার। দু’জনের চোখে তখন ভাষার চেয়ে অনুভূতিই বেশি কথা বলছিল।
এত বড় দুঃসাহস কেন দেখাতে গেলি পিহু। পিয়াসা কোন উত্তর দিলো না হয়তো তার কাছে এর উত্তর আদেও জানা নায়।
সেই রাতের বাকি সময়টা তারা কাটিয়ে দিল একে অপরের ভালোবাসা, বিশ্বাস আর অফুরন্ত সান্নিধ্যে—যে মুহূর্তগুলো শুধু তাদের দু’জনের, হৃদয়ের একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল।
মালদ্বীপের সময় ভোর ৩টা।
চারপাশে তখনও রাতের নীরবতা বিরাজ করছে । দূরে সমুদ্রের ঢেউ একের পর এক এসে তীরে আছড়ে পড়ছে। ঠিক তখনই রেদোয়ানের ফোনে একটি মেসেজ ভেসে উঠল।
— “Sir, everything is ready.”
মেসেজটা পড়েই ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল তার।পুরো পরিকল্পনাটাই ছিল রেদোয়ানের। নিজের নীলাঞ্জনাকে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটি সকাল উপহার দিতে চায় সে। মালদ্বীপের মনোমুগ্ধকর সূর্যোদয় দেখাতে হলে খুব ভোরেই বের হতে হবে।সারারাত এক সেকেন্ডের জন্যও চোখ বন্ধ করেনি রেদোয়ান। বুকের মাঝে নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে জড়িয়ে ধরেই পুরো রাতটা কাটিয়ে দিয়েছে।আলতো করে পিয়াসার কপালে একটি চুমু এঁকে নরম স্বরে বলল,
— “পিহু… উঠতে হবে। তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে।”পিয়াসা তখন সবে মাত্র ঘুমিয়েছে। আধোঘুমে কাঁপা কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল,
— “আমি ঘুমাব…”রেদোয়ান হেসে ফেলল।
এক মুহূর্তও দেরি না করে আলতো করে পিয়াসাকে কোলে তুলে নিল।ঘুমজড়ানো পিয়াসা অভ্যাসবশত দু’হাত দিয়ে রেদোয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল।
রেদোয়ান তাকে নিয়েই ইনফিনিটি পুলের পানিতে নেমে গেল।ঠান্ডা পানির স্পর্শ পেতেই পিয়াসা চোখ মেলে বিরক্ত গলায় বলল, “তুমি আমাকে একটুও শান্তি দেবে না? খুব ঘুম পাচ্ছে আমার! সারারাত একটু ও ঘুমোতে দাও নি রেদোয়ান যেন কোন কথাই শুনতে পেল না বরং তাকে আলতো করে নিজের কাছে টেনে এনে মৃদু হেসে বলল,
— “তোর জন্য একটা সুন্দর সকাল অপেক্ষা করছে, পিহু। আশা করি… আমার এই সারপ্রাইজটা তোর খারাপ লাগবে না।”পিয়াসা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— “আমার পুরো শরীরে পানি লাগার পর থেকে কেমন জ্বালা করছে । আমি রুমে যাচ্ছি। আপনি গোসল করুন, আমার ভালো লাগছে না।”
কথা শেষ করেই সে রুমের ভেতরে চলে গেল।
বেশ কিছুক্ষণ পর রেদোয়ানও ফ্রেশ হয়ে রুমে ফিরল।
পরনে ঝকঝকে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো ঠিক করতে করতেই হঠাৎ তার দৃষ্টি চলে গেল রুমের এক কোণে।
সবে গোসল করে পিয়াসা সাদা নরম বাথরোব জড়িয়ে সোফার এক পাশে চুপচাপ বসে আছে। ভেজা কোমরছোঁয়া চুলগুলো বুকের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে। ঘুমে আধবোজা চোখে এখনও অলসতার ছাপ স্পষ্ট।রেদোয়ান কয়েক মুহূর্ত শুধু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। যেন ভোরের আলো ফোটার আগেই তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা সে দেখে ফেলেছে।
রেদোয়ান দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলো মনে মনে নিজেকে গালি দিল না রেদোয়ান আর নয় মেয়েটা তোর পাগলামি অনেক সহ্য করেছে আর না । এর পর সে আলমারির ওপর রাখা সাদা রঙের একটি প্রিমিয়াম গিফট বক্স হাতে তুলে নিল।
মুচকি হেসে সেটি পিয়াসার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— “আজ আমার বউ কে আমি নিজের হাতে সাজাব। কোনো আপত্তি শুনব না। এমনিতেই তোকে বড্ড ক্লান্ত লাগছে পিয়াসা কৌতূহলী চোখে বক্সটা খুলতেই মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
ভেতরে ছিল হালকা আইভরি রঙের ঝলমলে একটি শাড়ি। সূক্ষ্ম স্টোনওয়ার্কে মোড়ানো কাপড়টা আলো পড়তেই মৃদু ঝিকমিক করে উঠল। সঙ্গে মিলিয়ে একটি স্লিভলেস ব্লাউজ, আর সাদা হাই হিল।
পিয়াসা অবাক হয়ে ফিসফিস করে বলল,এসব… সব আমার জন্য?”রেদোয়ান হেসে মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ। আজকের সূর্যোদয়টা আমার নীলাঞ্জনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রূপে দেখেই শুরু করতে চাই।”
পিয়াসা লাজুক চোখে তাকিয়ে রইল। কোনো আপত্তি করল না। শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল তার সামনে।রেদোয়ান প্রথমে আলতো করে তার কাঁধে শাড়ির আঁচলটা রাখল। ধীরে ধীরে একেকটি ভাঁজ নিখুঁত করে গুছিয়ে দিল। তারপর কোমরের চারপাশে শাড়িটা যত্ন করে জড়িয়ে সুন্দর করে কুচি গুলো ভাজ করতে লাগলো কুচি গুলো এক সাথে করে একটা পিন লাগিয়ে দিলো এর পর বাকি অংশ আলতো করে কমোর মাঝে গুজে দিয়ে পিন দিয়ে সুন্দর করে ছেট করে দিল শাড়ি পরাতে পরাতে হঠাৎই তার চোখ থেমে গেল পিয়াসার ত্বকে ফুটে থাকা নিজেরই রেখে যাওয়া কয়েকটি ভালোবাসার চিহ্নে।এক মুহূর্তের জন্য তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
গভীর নিশ্বাস ফেলে খুব আস্তে বলল,
“সরি, বউ…”পিয়াসা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।— “কেন?”রেদোয়ান মুচকি হেসে আলতো করে তার কপালে চুমু রেখে বলল,
— “একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলাম বলে।”
পিয়াসার ঠোঁটেও লাজুক এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল।রেদোয়ান খুব যত্ন করে তার লম্বা চুলগুলো পেছনে সরিয়ে দিল। তারপর নিজের ।
আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে শাড়ির আঁচলটা নিখুঁত করে কাঁধে গুছিয়ে দিল।কোমর ছুঁয়ে নেমে আসা ঘন কালো চুলগুলো একপাশে এনে আঙুলের ডগায় আলতো করে ছড়িয়ে দিল।
তারপর এক পা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইল।
মুগ্ধ কণ্ঠে বললো মা শা আল্লাহ . তোকে যতবার দেখি, ততবারই মনে হয় আল্লাহ যেন খুব যত্ন করে তোকে সৃষ্টি করেছেন।”পিয়াসা কাঁদো কাঁদো মুখে বলল,”এত কিছু কেন করছ আমার জন্য?”
রেদোয়ান মৃদু হেসে তার দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল, “কবুল বলার মুহূর্ত থেকেই তুই আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান আমানত। তোর হাসিটা সারাজীবন এভাবেই আগলে রাখতে চাই।”
পিয়াসা লাজুক হেসে মাথা নিচু করল।
কিছুক্ষণ পর…রেদোয়ান আলতো করে পিয়াসার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে বললো
“এবার চল, আমার নীলাঞ্জনা… তোর জন্য যে সবচেয়ে সুন্দর সারপ্রাইজটা অপেক্ষা করছে।”
এরপর রেদোয়ান পিয়াসার হাত শক্ত করে ধরে তাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল সমুদ্রতীরের উদ্দেশ্য
দিগন্তজোড়া সমুদ্রের বুক তখন ধীরে ধীরে ভোরের রঙে রাঙিয়ে উঠছে।
সাদা পর্দায় ঘেরা কাঠের ক্যানোপি, চারপাশে শত শত মোমবাতির আলো, লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি বিশাল হৃদয়চিহ্ন, কাঁচের লণ্ঠনের নরম আলো আর ঢেউয়ের মিষ্টি শব্দ—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রস্তাবনার মঞ্চ
দূরে তখন সূর্যের প্রথম সোনালি আলো ধীরে ধীরে সমুদ্রের বুকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে পরিবেশটা যেন নিখুঁত এক স্বপ্নের মতো লাগছে পিয়াসার কাছে
সমুদ্রের নোনা বাতাসে পিয়াসার আইভরি রঙের শাড়ির আঁচল উড়ে যাচ্ছে। কোমর ছাপিয়ে নেমে আসা ঘন কালো চুলগুলোও বাতাসের ছোঁয়ায় এলোমেলো হয়ে বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছে। ভোরের প্রথম সোনালি আলোয় তাকে দেখে রেদোয়ান কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে পিয়াসার সামনে দাঁড়াল।মুচকি হেসে পকেট থেকে একটি ছোট্ট ভেলভেট বক্স বের করল।
বক্সটি খুলতেই ভেতরে দেখা গেল সাদা হীরের ছোট্ট একটি হৃদয়-আকৃতির লকেট।
রেদোয়ান খুব যত্ন করে লকেটটি হাতে তুলে নিয়ে পিয়াসার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। আলতো করে তার লম্বা চুলগুলো এক পাশে সরিয়ে দিয়ে নিজের হাতে লকেটটি গলায় পরিয়ে দিল।
লকেটটি গলায় পড়তেই পিয়াসা মুগ্ধ চোখে সেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
রেদোয়ান মৃদু স্বরে বলল,
শেহেজাদার আদর পর্ব ৬৮
— “পৃথিবীর সবচেয়ে দামি হীরেও তোর হাসির কাছে ফিকে, পিহু। তবু এই ছোট্ট উপহারটা দিলাম, যেন প্রতিদিন আয়নায় নিজেকে দেখার সময় আমার ভালোবাসাটাও তোর চোখে পড়ে।”
পিয়াসার চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল। সে ধীরে ধীরে রেদোয়ানের দিকে ফিরে মিষ্টি হেসে বলল,
— “তাহলে এটা কোনো গয়না নয়… এটা তো আপনার হৃদস্পন্দন। আমি কথা দিচ্ছি, এই লকেটটার মতোই আপনার ভালোবাসাটাও সারাজীবন আমার হৃদয়ের সবচেয়ে কাছে আগলে রাখব।”
