অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৪
ফাহিমা ইসলাম
নিশীথের কালো আবরণ সরিয়ে, প্রভাত আজ ধীরে ধীরে উন্মোচন করেছে তার স্বর্ণাভ অধিকার। নির্মল আকাশের বুকে মৃদু রৌদ্রের কোমল স্পর্শ ছড়িয়ে পড়তেই প্রকৃতি জেগে উঠেছে নতুন এক সজীবতার আহ্বানে। দূর আকাশে অলস ভেসে বেড়ানো মেঘপুঞ্জগুলো যেন নীরব দর্শক, প্রভাতের এই পবিত্র জাগরণকে নিরবে অবলোকন করছে। পাখিদের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে অনাবিল সুরের মৃদু ঝংকার, যা নিস্তব্ধ সকালের বুক চিরে ছড়িয়ে দিচ্ছে এক অদৃশ্য সঙ্গীত। বারান্দা পেরিয়ে আসা মৃদু আলো এসে চোখে লাগতেই ধীরে ধীরে নড়েচড়ে উঠলো তূর্ণা। অলস চোখদুটো আধখোলা রেখেই সে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে রইল, যেন ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি কোনো অচেনা জগতে আটকে আছে সে। এখানে সে আরামটা তার সঙ্গী হয়েছে বেশি, আগের মত কেউ দেরি করে ওঠার জন্য মা*রে না। বরং তার সুবিধা মত সবকিছু হয় এখানে, এই বাড়িটা তূর্ণার নিকট একটা স্বপ্নপুরী।
হঠাৎই তার দৃষ্টি আটকে গেল নিজের হাতের দিকে।
শুভ্র কব্জিতে জড়ানো সূক্ষ্ম নকশার চুড়িগুলো সূর্যের আলোয় মৃদু ঝিকমিক করে উঠলো। তূর্ণার সম্পূর্ণ চোখ মেলে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। শিশুসুলভ বিস্ময়ে ভরে উঠল তার চোখ।
“এগুলো কি?” ‘ ফিসফিস করে বলে উঠল সে।
ধীরে ধীরে হাত নেড়ে চুড়িগুলোর শব্দ শুনল, যেন নতুন কোনো খেলনা পেয়েছে। তারপর হঠাৎই পা দুটো নড়াতেই টুংটাং শব্দে বেজে উঠল নূপুর। তূর্ণা এক ঝটকায় উঠে বসে পায়ের দিকে তাকাল। সোনালি নূপুর জোড়া তার পায়ের পাতায় জড়িয়ে আছে, সূক্ষ্ম নকশায় বাঁধা। তূর্ণার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তূর্ণা ভয়ে ভয়ে আবারও পা নাড়াতেই নূপুরের ক্ষুদ্র ঘুঙুর গুলো নড়াচড়া করতেই টুংটাং শব্দে ভরে উঠছলো, সঙ্গে নিস্তব্ধ ঘরটা ভড়িয়ে তুললো। তূর্ণা হতভম্ব! তার নিষ্পাপ, শিশুসুলভ চোখদুটো বড় হয়ে গেল। কৌতূহল, ভয় আর একরাশ অবুঝ আনন্দ, সবকিছু মিলেমিশে এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো তার মুখশ্রীতে।
“এগুলো বাজে কেনো? কি সুন্দর!”
সে আঙুল দিয়ে আলতো করে চুড়িগুলো নাড়াতে লাগলো। শব্দ পেয়ে হালকা হেসে উঠলো আবার পরক্ষণেই থেমে গেল। সে বুঝতে পারছে না, খুশি হবে না ভয় পাবে।ঠিক তখনই এতোক্ষণ দরজার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা রৌদ্রিক এগিয়ে এলো। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে তূর্ণা কর্মকাণ্ড নৈঃশব্দে দেখছিল। তার গভীর, সংযত চোখে আজ এক অদ্ভুত কোমলতায় ছেয়ে আছে। তূর্ণার কাছে এসে নিচু, ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে-
“পছন্দ হয়নি?”
তূর্ণা চমকে তাকালো তার দিকে। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে হঠাৎই মুখে ফুটে উঠলো এক নির্মল, শিশুসুলভ হাসি। হাসিমাখা মুখে বলে-
“ হুম খুব… কিন্তু এই গুলো কার?”
সে আবারও নিজের হাতের দিকে তাকালো, যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। রৌদ্রিক ধীরে তার সামনে বসে পড়লো।
“তোমার।”
এই ছোট্ট স্বীকারোক্তিতেই যেন তূর্ণার ভেতরের সমস্ত দ্বিধা ভেঙে গেল। চোখ-মুখে তার আনন্দের রেখা ফুটে উঠেছে। সে হঠাৎই হাত দুটো এগিয়ে দিল রৌদ্রিকের দিকে, তারপর বাক-বাকুম হয়ে বলে-
“দেখো বর! শব্দ করে!”
চুড়িগুলো নাড়াতে নাড়াতে এমন উচ্ছ্বাসে বললো, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামী খেলনাটা সে পেয়েছে।রৌদ্রিকের ঠোঁটের কোণে অচেতনভাবেই ফুটে উঠলো এক টুকরো হাসি এক বিরল। তূর্ণা নাড়িয়ে নাড়িয়ে পা গুলো দেখছে, সূর্যের আলোয় তূর্ণার ফর্সা পায়ে জ্বলজ্বল করছে নূপুর জোড়া। তূর্ণার সেদিকেই মন বেশি, বার বার পা নাড়িয়ে শব্দ করছে আর হেসে উঠছে। রৌদ্রিক শান্ত চোখে দেখলো পুরোটা, তূর্ণা খুব অল্পতেই খুশি হয়ে যায়। ঠিক তখনই ছোট্ট পায়ের টুপটাপ শব্দে ঘর ভরে উঠলো। আরও একজোড়া নূপুরের ঘুঙুর বেজে চলছে, তূর্ণা অবাক হয়ে তাকালো সেদিকে। রোদেলা টলমল পায়ে এগিয়ে আসচ্ছে এইদিকেই।
“পা..পাপা…!”
রোদেলা দৌড়ে এসে রৌদ্রিকের হাঁটুর পাশে থামলো।তার গোলগাল মুখে কৌতূহলের ছাপ। তূর্ণার পায়ের নূপুরের শব্দ শুনে সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। অবাক হয়েই বলে ওঠে-
“টুনটুন…!”
বলেই বিছানার পাশে উঠতে চেষ্টা করল ছোট্ট রোদেলা।
“মা… মা…”
আধো আধো স্বরে তূর্ণাকে ডেকে ওঠে রোদেলা। তূর্ণার দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে নরম হয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি রোদেলাকে কোলে তুলে নিল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা বুকে আগলে নিলো। রোদেলা তূর্ণার কোলে বসতেই সে তার হাত এগিয়ে দিয়ে, তার ছোট্ট ছোট্ট হাতজোড়া দেখি বলে-
“ টুনটুন বাতে, বাতে মা!”
রোদেলাটা দেখে তূর্ণা নিজের হাতের দিকে তাকালো। দু’জনের হাতেই একই রকম চুড়ি। তবে তূর্ণার সংখ্যাটা বেশি, পায়ের নূপুরটাও একই রকম দেখতে। সেটা দেখে তূর্ণা খুশিতে গদগদা হয়ে বলে-
“ আরে পুতুল তোমার আর আমার তো দেখতে সেম সেম। ইয়ে আমরা সেম সেম পরেছি।”
তূর্ণার কথা শুনে ছোট্ট রোদেলা খিলখিল করে হেসে উঠলো। তারপর রোদেলা তূর্ণার হাতে থাকা চুড়িগুলো ধরে টান দিল, তারপর নূপুরের শব্দে মুগ্ধ হয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল।
“মা টিং টিং!”
উচ্ছ্বাসে বলে উঠল সে। তূর্ণা নিজেও হেসে ফেলল, শিশুর মতোই, এই হাসিতে কোনো জটিলতা নেই, নেই কোনো ভয়। রৌদ্রিক নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার সামনে একটা অদ্ভুত, অসম্পূর্ণ অথচ পূর্ণ এক পৃথিবী। রৌদ্রিক দু’জনের দিকে তাকিয়ে বলে বলে-
“ হয়েছে এখন দু’জন উঠে পর অনেক হয়েছে। আর তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো, আমি বিকেলে নিতে আসবো।”
তূর্ণা রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী জিজ্ঞেস করে-
“ কোথায় যাবো আমরা বর?”
“ ডক্টরের কাছে।”
” গেলে আমি ঠিক হয়ে যাবো তো?”
“ হ্যাঁ যাবে, তবে ডক্টরের সব কথা শুনতে হবে ঠিক মত।”
ওদের কথার মাঝখানে রোদেলাও হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলে-
“ আনি যবু, আনি যবু।”
রৌদ্রিক আর মেয়েকে কিছু বললো না। কোলে তুলে নিলো আর তূর্ণাকে ফ্রেশ হতে বললো। রৌদ্রিক রোদেলাকে নিয়ে পাখিদের খাবার দিতে গেলো।
প্রভাতকালীন সময় পেরিয়ে উত্তাপ প্রহরের আগমন ঘটেছে। চারিদিকে ভাপসা গরমে ফেঁপে উঠেছে সবকিছু। গাছের পাতা অব্দি নড়ছে না ঠিক মতো। সেলিমা খাতুন ঘরের কাজ করছিলেন। তূর্ণার যাওয়ার পর সারা বাড়ি একাই তাকে পরিষ্কার করতে হয়। যার জন্য কাজের চাপ বেড়েছে, সারাদিন খাটুনি করতেই চলে যায়। আগে শুধু রান্নার দিকটা সামলাতেন তিনি, বাকিটা তূর্ণাকে দিয়ে করিয়ে নিতেন। কিন্তু এখন তূর্ণারও নেই যে করে নিবেন তিনি। তূর্ণাকে নিয়ম করে মেপে মেপে খাবার দিতে তিনি। ভালো তরকারি রান্না হলেও সেটা খাওয়ার ভাগ্য তূর্ণার ছিল না। মাংস রান্না করলে এক পিস দিতেন, মাঝে মাঝে সেটাও দিতেন না।
সকাল থেকে একা হাতে খেটে যাচ্ছেন সেলিমা খাতুন। যার জন্য মেজাজ তার তুঙ্গে উঠে আছে; একেই এই মানুষ ম*রা গরম তার উপর একা হাতে কাজ করছেন। লুকমান হোসেন বাহিরে থেকে কিছুখন আগেই ফিরেছেন, খাবার খেয়ে কিছু সময় পর আবারও বেরিয়ে যাবেন। সেলিমা খাতুন ভাত বাড়ছিলেন সেই সময় দরজায় কড়া নড়ায় বিরক্ত হয়ে যান তিনি। কয়েক বার দরজায় কড়া নাড়া শেষ, শেষমেশ না পেরে রেগেমেগে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন তিনি৷ দরজা খুলেই এই অসময়ে এমনটা করার জন্য সামনের মানুষটাকে কিছু বলতে নিবেই, কিন্তু সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখে তার কথা আটকে গেছে। বিস্মিত নয়নে সে সামনে দাঁড়ানো রূপাকে দেখছে। শুঁকনো, মলিন চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে৷ সেলিমা খাতুনকে দেখা মাত্রই চট করে আঁকড়ে ধরলো শক্ত করে। জড়িয়ে ধরেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো রূপা। এতক্ষণ ধরে আটকে থাকা অশ্রুবিন্দু গুলো মুক্তার ন্যায় ঝরঝর করে ঝরছে। হয়তো আপন কারো আলিঙ্গনের প্রয়োজন ছিল নিজের মধ্যে থাকা চাপা কষ্টগুলোকে বের করার জন্য।
সেলিমা খাতুন প্রায় একমাস পর রূপাকে দেখছেন। তাই তিনি এখনো বিস্ময়ের মধ্যেই আটকে রয়েছেন, রূপার কথায় তার হুস ফেরে। তড়িঘড়ি করে রূপাকে আগলে নিয়ে বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন-
“ রূপা..এই রূপা কি হয়েছে তোর? এতদিন পর মনে পরলো আমাদের?”
রূপা সেলিমা খাতুনকে জড়িয়ে রেখেই বাচ্চাদের মত কান্না করতে করতে বলতে থাকে-
“ মা.. সৈকত আমাকে বিয়ে করেনি। ও আমাকে ঠকিয়েছে মা, ও আমাকে ঠকিয়েছে!”
মেয়ের কথায় সেলিমা খাতুন কিছুই বুঝলেন না। এতদিন পর ফিরে আসলো, তাও এমন অবস্থায়৷ সেলিমা খাতুন রূপার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করেন-
“ কি হয়েছে মা? সৈকত কি সেই ছেলে যার সঙ্গে তুই পালিয়েছি?”
রূপা মাথা তুলে কাঁদতে কাঁদতে হ্যাঁ জানায়। সেলিমা খাতুন রাগ করবেন নাকি খুশি হবেন বুঝলেন না। তিনি রূপাকে নিয়ে ভিতরে চলে এলেন, এসেই লুকমান হোসেনকে ডাকতে শুরু করলেন-
“ ওগো এদিকে আসুন, দেখুন কে এসেছে। তাড়াতাড়ি আসুন এইদিক!”
রুমের মধ্যে থাকা লুকমান হোসেন সেলিমা খাতুনের কষ্টস্বর শুনে বেরিয়ে এলেন। দুপুরের এই গরম সহ্য না করতে পেরে গোসলে গিয়েছিলেন তিনি। বাহিরে আসতেই ক্রন্দনরত রূপাকে দেখতে পেয়ে তিনিও অবাক হলেন। কিছু সময় পর সেটা কেটে গিয়ে মুখশ্রীতে কাঠিন্য ভাব ফুটে উঠলো, রূপা সেটা দেখে দৌড়ে লুকমান হোসেনের নিকট যেতে চাইলে। লুকমান হোসেন গম্ভীর, রাগী স্বরে বলে ওঠেন-
“ ওকে এই বাড়িতে কেনো আসতে দিয়েছো? সমাজে চুনকালি মাখিয়ে যে একবার চলে গেছে সে আবার কেনো এসেছে?”
রূপা লুকমান হোসেনের রাগ হওয়ার বিষয়টা বুঝতে পারছে। সে যা করেছে সেটা একদমই ঠিক হয়নি, একটা ভুল মানুষের হাত ধরে সে পালিয়েছে। অথচ এতগুলো বছর যারা তাকে ভালোবেসে আগলে রাখলো তাদের কথাই চিন্তা না করে সে পালিয়ে গেলো। রূপা কাঁদতে কাঁদতে লুকমান হোসেনের দিকে তাকিয়ে মিনতি স্বরে বলে-
“ ও বাবা এমনটা বল না। তোমরা ছাড়া আর কে আছে আমার, তোমরাও যদি আমার সাথে এমন কর তাহলে কোথায় যাবো আমি!”
“ কোথায় যাবে সেটা তোমার ব্যাপার। আমার বাড়ি থেকে তো নিজ ইচ্ছেই পালিয়েছিলে তাহলে এখন এখানে কেনো?”
রূপা লুকমান হোসেনের কাছে এসে কাঁদতে কাঁদতে আবারও বলে-
“ এমনটা বলছো কেনো বাবা? আমি বুঝতে পারিনি সৈকত আমাকে এইভাবে মাঝরাস্তায় ছেড়ে দিবে।”
“ তো কেমনটা বলবো?আমরা কি তোমার খারাপ চেয়েছিলাম? যে তুমি পালিয়ে গেলে, আমাকে একবারও জানিয়েছো যে তুমি অন্যকাউকে ভালোবাসো? কিছু করনি, আমাকে বললে কি আমি শুনতাম না? ছেলে যদি তোমার যোগ্য হত, ওর সঙ্গে সুখী থাকলে আমি নিজেই দিয়ে দিতাম বিয়ে।” ‘গম্ভীর স্বরে কথাটুকু শেষ করলেন তিনি’
রূপা কান্না ছাড়া আর কোনো গতি পেলো না। সে যা করেছে সেটা একদমই ভুল হয়েছে সেটা সে জানতো ;কিন্তু যার সঙ্গে যে সমাজে নিজের গায়ে কলঙ্ক মাখালো সেই কিনা মাঝপথে এসে তার হাতটা ছেড়ে দিল! রূপা কাঁদতে কাঁদতে লুকমান হোসেনের পায়ের সামনে বসে, পা আঁকড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে-
“ ও বাবা আমাকে আর একটা সুযোগ দাও। আমি আর তোমার অবাধ্য হব না, আমি সত্যি বুঝতে পারিনি এতবড় ভুল হয়ে যাবে। আমাকে একটা সুযোগ দাও, নাহলে আজকেই আমি ম*রে যাবো।”
সেলিমা খাতুন এতক্ষণে নীরব ছিলেন। মেয়ের এমন করুন অবস্থা দেখে তার মাতৃমন কেঁদে উঠলো। তিনি লুকমান হোসেনের দিকে তাকিয়ে হতাশ কন্ঠে বলে-
“ ওগো মেয়েটাকে একটা সুযোগ দাও। একটা ভুল নাহয় অজান্তে করেছে, সেটা তো বুঝতে পেরেছে। কতদিন পর মেয়েটা ফিরলো। তুমি ওকে সুযোগ দাও একটা।”
লুকমান হোসেন কিছু বললে না। রূপা তার বড্ড আদরের, তার তিন সন্তানের মধ্যে তিনি রূপাকে বেশি ভালোবাসেন, স্নেহও করেন। ছেলের প্রতিও তার আলাদা টান আছে, তবে তূর্ণা লুকমান হোসেন জানেন না সেই ব্যাপারে। সে তূর্ণাকেও দেখেও দেখে না, যেখানে তূর্ণাই সবচেয়ে প্রিয় সন্তান হওয়ার কথা ছিল। তূর্ণার ওমন হালের জন্য নিজেকেও দায়ী মনে করেন তিনি, জুঁইয়ের ওমন অবস্থার জন্য সে দায়ী ছিল। তূর্ণা সবসময় লুকমান হোসনের নিকট নীরব হৃদয়ভারের মত বিরাজ করে সবর্দা। লুকমান হোসেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর স্বরে বলেন-
“ ঘরে যাও।”
কথাটুকু আদেশের স্বরে বলে ভিতরে চলে গেলেন। রূপার কান্নার মাঝেও হেসে উঠলো, সে জানতো লুকমান হোসেন তাকে ফিরিয়ে দিবে না। রূপা উঠে বসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজলো।
“ সাজিদ কোথায়?”
রূপার ছোটভাইকে বাড়িতে সবাই সাজিদ বলেই ডাকে।
“ খেলতে গেছে, এতদিন কোথায় ছিলি?”
রূপা নাক টেনে বলে-
“ কাছেই ছিলাম, যা করেছি তার জন্য খুব সরি মা। আর করবো না এমন কিছু!”
“ এখন বলে লাভ আছে, কত বড় বাড়িটা হাত ছাড়া করলি। আমরা কি তোর খারাপ চেয়েছি বল? আজকে ওইখানে থাকলে তুই রাজরাণী হয়ে থাকতি, অথচ ওই পাগলটা সেই জায়গায় এখন।”
মায়ের কথা কিছুই বুঝলো না রূপা। পাগল বলতে তূর্ণাকে বুঝিয়েছে সেটা তো বুঝতে পারছে, কিন্তু তার জায়গায় তূর্ণা কেনো?
“ মানে? কি বলছো, আমায় জায়গায় ও মানে?”
সেলিমা খাতুন হাক ছেড়ে হতাশ হয়ে বললেন-
“ মানে তোর আজকে যেখানে থাকার কথা ছিল আজকে সেখানে তূর্ণা রয়েছে। মানে সিকদার বাড়ির বউ ও এখন।”
সেলিমা খাতুনের কথা শুনে যেনো অবাকের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেলো রূপা। তূর্ণার বিয়ে হয়ে গেছে তাও তারই হবু বরের সঙ্গে! সবকিছু মানতো তবে তূর্ণার মত মেয়েকে মেনেও নিয়েছে সবাই? এটা তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না।
“ কি বলছো, ওর মত পাগলকে কেউ বিয়ে করবে কিভাবে? আর ওর বিয়েই হলো কি করে?”
“ তুই তো পালিয়ে গেলি, তখন তোর বাবা সম্মান রক্ষা করার জন্য তোর জায়গায় ওকে বসিয়ে দিয়েছে। আলাদা আলাদা কাবিন হয়েছে দেখে কেউ ধরতে পারেনি।”
“ কিহহ! যাও সব মানলাম সবকিছু জানার পরও তারা তূর্ণাকে মেনে নিয়েছে?”
“ হ্যাঁ, ওর বর নাকি ওকে মেনে নিয়েছে তাই আর কেউ কিছু বলতে পারেনি। ওই বাড়ির কেউ তো ওকে মানবেই না, ওর শ্বাশুড়িও ওকে দেখতে পারে না। শুধু রৌদ্রিক রাজি হয়েছে বলে এখনো ওই বাড়িতে আছে।”
রূপা অবাক না হয়ে পারলো না, তূর্ণা মত মেয়ের ভাগ্য হঠাৎ তার খেল দেখিয়ে দিলো। রূপা অবাক হলো বেশি তার বাবা-মার কাজ দেখে। তার জায়গায় তূর্ণাকে বসানোর দরকার কি ছিল?
“ তোমরাও কোন আক্কেলে আমার জায়গায় ওকে বসালে? ও যদি ঠিক থাকতো তাও মানা যেত কিন্তু ওমন একটা মেয়েকে বসিয়ে দিলে।”
সেলিমা খাতুন মেয়ের কথায় বেজায় হলেন। তিনি এবার হালকা কড়া গলায় বলে-
“ সেটা তোর এখন নিয়ে মনে হচ্ছে যে ঠিক হয়নি যা হয়েছে। কত ভড়ি গয়না পরেছিল জানিস বউভাতের দিন ও, এখন তো আরও হয়তো পেয়েছে। কত বড় বাড়ির বউ এখন একটা পাগলে। নিজের কপাল নিজে পুরিয়ে এখন আফসোস করে লাভ কি?”
রূপা আর কিছু বললো না, কিছু বলার মত নেই তার। সে তো নিজের দোষেই সব হারিয়েছে। তাই বলে সে এটা মানতে পারছে না যে তার জায়গায় তূর্ণা রয়েছে; সেই সব তো তার হওয়ার কথা ছিল। তূর্ণার মত বোধহীন মানুষের সঙ্গে কেউ সংসার করবে কিভাবে?
ক্যাফের একসাইডে বসে আছে ইরা। সামনেই ইয়া বড় বই খোলা, এখানে এসেছে প্রায় তিরিশ মিনিটেরও বেশি। যার জন্য অপেক্ষা করছে তারই আশার নাম নেই, তূর্ণা বিরক্ত হয়ে বই বন্ধ করল। এরমধ্যেই তার অর্ডার দেওয়া কপি এসে পৌঁছালো, ওয়েটার টেবিলে কফি রেখে চলে গেছে। ইরা বিরক্ত হয়ে ফোন বের করে কাউকে ফোন দিল, কিছু সময় পর ক্যাফেতে একজন ফোন কাটতে কাটতে প্রবেশ করলো। ইরা সেদিকে রাগি চোখে তাকালো, রূপা তাড়াতাড়ি করে কাছে এসে বসলো।
“ সরি রে, রাস্তায় আটকা পরেছিলাম তাই দেরি হল।”
ইরা নাকের পাঠা ফুলিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে-
“ জানি তোর কিসের জন্য দেরি হয়েছে। আর একটু হলে চলে যাইতাম।”
“ আরে রাগ করিস কেন বেবি, ক্লাস করছিস তো?”
ইরা কফিতে চুমু দিতে দিতে বলে-
“ না করি নাই এখনো, সৈকতের খবর পেলাম শা*লা নাকি বিয়ে করছে কালকে।”
সৈকতের কথা উঠতেই রূপার মনটা খারাপ হয়ে যায়। ইরা সেটা দেখে মুখ ভেংচি কেটে বলে-
“ মুখের নঁকশা ঠিক ছেমড়ি। আগেই না করছিলাম তোরে বার বার, কিন্তু না তোর তো বাড়াবাড়ি না করলে পেটের ভাত হজম নয় না। এবার বোঝ ঢেলা।”
“ আমি কি জানতাম ও শেষ অব্দি এমনটা করবে। কিন্তু ওকে আমি সত্যি ভালোবাসতাম!”
“ রাখ তোর ভালোবাসা, এখন ভাব ওরে শিক্ষা দিবি কিভাবে সেটা ভাব। আমি জানতাম ও এমন কিছুই করবে, তুই যে পালাবি সেটা বুঝতে পারিনি।”
রূপা হতাশ হয়ে বলে-
“ ও বলেছি পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করবে, কিন্তু পরে বলে ওর বাপ-মা নাকি রাজি হবে না।”
“ আরও কর প্রেম, শা*লারে দেখতেই বাটপার বাটপার লাগতো। যেটার সঙ্গে বিয়ে তোর ঠিক হয়েছি সেটা কত বড় সার্জান জানিস, বদল কোথাকার। হ্যাঁ আগে একটা বিয়ে হয়েছে তবে বেডার বয়স ও বোঝা যায় না। দেখতেও সেই, আর সেই একটা মানুষ হাত ছাড়া করলি তুই।”
রূপা যেনো আরও হতাশ হলো, নিজের করা বোকামিগুলো হারে হারে টের পাচ্ছে এখন নিয়ে। এখন টের পেয়ে লাভ নেই, যা হওয়ার হয়ে গেছে। চাইলেও কিছু করার সম্ভব নয়। ইরার মাথায় কিছু আসতেই বলে ওঠে-
” এই শোন, তুই এখন ওই ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখ। হয়তো কথা এগোতেও পারে।”
রূপা হতাশ হয়ে বলে-
“ সম্ভব নয়, ওনার বিয়ে হয়ে গেছে ওইদিনই।”
“ কিহহ! কিন্তু কিভাবে? তুই না পালিয়েছিলি তাহলে কার সাথে?”
“ আমার বাড়ির পাগলের সাথে। আমি পালানোর পর বাবা ওকে বসিয়ে দিয়েছিল, আর ওনি ওই পাগল তূর্ণাকেই মেনে নিয়েছে।”
“ উফ রূপা ও তো তোর বোন তাই না, মা এক না হোক বাবা তো এক। মেয়েটাকে এইভাবে বলিস কেনো তুই? যাক শুনে ভালো লাগলো লোকটা তূর্ণাকে অবহেলা করেনি।”
“ তুই খুশি হচ্ছিস এটা নিয়ে?”
“ তো হব না, তূর্ণারও তো একটা সুন্দর জীবন পাওয়ার অধিকার আছে। তুই তো ওই ছেলেকে প্রত্যাখ্যান করে চলে গিয়েছি, তাহলে এখনে ওর দোষ কোথায়?”
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১৩ (২)
রূপা কিছু বললো না কারণ দোষটা তারই যে যদি এত বড় বোকামি না করতো তাহলে আজকে তূর্ণার জায়গায় সে থাকতো। ইরা আর রূপা কলেজ থেকেই বন্ধু, একই ভার্সিটিতে দু’জন। ইরার দাদু অসুস্থ থাকায় রূপার বিয়েতে সে থাকতে পারেনি, তবে রূপার সবকিছুই তার জানা।
