Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৯ (২)

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৯ (২)

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৯ (২)
ফাহিমা ইসলাম

রজনী আজ অস্বাভাবিক নীরব। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মেঘরাজি চাঁদের আলোকে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করতে পারেনি ঠিকই, তবে তাকে করেছে বিষণ্ন, ফ্যাকাশে। চারদিক জুড়ে এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে নৈঃশব্দ্য ঝুলে আছে,সিকদার বাড়ির অধিকাংশ কক্ষের আলোকরশ্মি ইতোমধ্যে নিভে গেছে। দীর্ঘ ব্যস্ততার পর সবাই এখন নিদ্রার আশ্রয়ে গিয়েছে। কেবলমাত্র একটি কক্ষে ক্ষীণ হলুদাভ আলো এখনো জেগে আছে। রোদেলা ঘুমিয়ে রয়েছে। ছোট্ট শরীরটা তূর্ণার আঁচল জড়িয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে বিছানার মাঝখানে। এতক্ষণ বাকিদের সঙ্গে নিচেই ছিল, শ্রাবণের বাসর ঘরে ঢোকার আগে সবাই মিলে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়েছে। সেটাই সবাই মিলে ভাগাভাগি করে নিয়েছে, এর আগে কোনোদিন এমন আনন্দঘন মুহুর্তের অংশ হয়নি তূর্ণা। তাই সবকিছু তার নিকট নতুন, বেশ উপভোগ করেছে সে, হলুদের দিন মন খারাপ থাকায় সেদিন রুম থেকে বের হয়নি ঠিকই। তবে রাতের দিকে রিনি এসে জোর করে তাকে নিয়ে গিছেছিল।

সবার সঙ্গে থাকতে থাকতে মন খারাপের রেশটা অনেকখানিকটা কেটে দিয়েছিল তার। তূর্ণার আস্তে করে রোদেলা পাশ থেকে উঠে বারান্দায় চলে যায়।
বারান্দায় এসে সে দোলনাচেয়ারটিতে গুটিসুটি মেরে বসে পরলো। বাহিরের নির্মল হাওয়া এসে সবকিছু কেমন প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিচ্ছে। হাঁটুর উপর থুতনি রেখে বসে পরলো, এলোমেলো চুলগুলো মুখের অর্ধেক ঢেকে রেখেছে। তার চোখদুটো অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে আছে দূরের অন্ধকারে। কিছু সময় অতিবাহিত হতেই রৌদ্রিক ধীর পায়ে এসে দাঁড়ালো তার পাশে। রৌদ্রিক কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে ধীরে বসে পড়লো তার পাশে। মৃদু বাতাসে তূর্ণার চুল উড়ে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তার বাহু। অথচ মেয়েটা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। এমনি সময় হলে মেয়েটা হাজারখানিকটা কথা বলতে শুরু করে দিতো।

“ ঠান্ডা লাগবে।”
কোনো উত্তর এলো না,তূর্ণা আগের মতোই নিশ্চুপ রইলো। রৌদ্রিক দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তার দৃষ্টি এবার স্থির হলো তূর্ণার অবসন্ন মুখাবয়বের উপর। হঠাৎ এই মেয়েটা অভিমান করায় রৌদ্রিকের একদমই ভালো লাগছে না। মেয়েটা তার উপর অভিমান করতেও জানে, এটা ভেবে এক দফা হালকা হাসলো।
“ কথা বলবে না?”
রৌদ্রিক আবার বললো-
“ তূর্ণা… আমার দিকে তাকাও।”
তূর্ণা তাকালো না, বরং মুখটা আরও ঘুরিয়ে নিলো অন্যদিকে। রৌদ্রিকের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক অসহায় হাসি ফুটলো। আশ্চর্য, এই মেয়েটা না বুঝেই কিভাবে তাকে দুর্বল করে দেয়।
“ রাগ করেছো?”

নিশ্চুপ রইলো তূর্ণা, সহসাই মাথা নামিয়ে রাখলো একই ভঙিতে। কৃষ্ণবর্ণ গগণে ওঠা মস্ত বড় হালকা রক্তিম জ্যোৎস্নার আলো আঁচড়ে পরছে ধরণীর বুকে। সেই আলো এসে আঁচড়ে পরছে তূর্ণার মুখশ্রীর উপর। বাহিরে চলা মৃদু দমকা হওয়ায়, হালকা বের হওয়া কেশরাশি গুলো কেমন দোল খেয়ে যাচ্ছে। রৌদ্রিক নৈঃশব্দে হাসলো, তারপর আকাশপানে চেয়ে শান্ত স্বরে বলে-
“ অভিমান করেছো? করো। তোমার অভিমানও তো আমারই প্রাপ্য। কারণ তোমার হৃদয়ে এতটা জায়গা না পেলে তুমি এভাবে অভিমান জমাতে না।”
তূর্ণার এইবারও এত এত কথার মানে বুঝলো না ঠিকই।তবে যতুটুকু বুঝেছে তাতেও কিছু বললো না।
“ চল তোমার অভিমান ভাঙাই আমার অভিমানী!”

বলেই কোনো সময় ব্যয় না করে আচমকাই পাঁজ কোল তুলে নিলো রৌদ্রিক। হঠাৎ এমনটা হওয়ায় তূর্ণা বেশ হকচকিয়ে গেলো! আতঙ্কে তার নেত্র পল্লব খিঁচিয়ে বন্ধ করে নিয়ে রৌদ্রিকের গ্রীবাদেশ শক্ত করে দুই হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে। রৌদ্রিক হালকা হেসে একহাতে তূর্ণাকে নিয়ে কক্ষের বাহিরে পা বাড়িয়েছে। এমন ভাবো তূর্ণাকে এক হাত দ্বারা কোলে নিয়ে হাঁটছে যেনো সামান্য তুলোর তৈরি পুতুল নিয়ে আছে। তূর্ণা হঠাৎ লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো, অভিমানী মেঘের স্তুপ সরে গিয়ে লজ্জায় রাঙা মেঘেরা দলবদ্ধ হলো। বাক্য উচ্চারণ ছাড়াই নিজেকে ছোটাতে চাইলো; তবে সে ব্যর্থ হলো রৌদ্রিকের শক্তির কাছে। দু’তালা পেরিয়ে সুবিশাল ছাদে এনে একপাশের দোলনায় এনে বসিয়ে দিলো তূর্ণাকে। রাত গভীর হওয়ায় সকলেই কান্ত থাকায় সারা বাড়ি ঘুমিয়ে পরেছে। জাগ্রত এই দুই মানব-মানবী, একজন অভিমানী কন্যা অপরজন অভিমান ভাঙানোর কাজে নিয়োজিত।
হঠাৎই তূর্ণাকে অবাক করে দিয়ে রৌদ্রিক যেটা করলো সেটা দেখে তূর্ণার চোখ দু’টো আপনাআপনি বড় হয়ে এলো। স্তব্ধ নেত্রজোড়া এখনো বড় বড় হয়ে আছে, সত্যিই কি এমনটা ঘটছে তার সামনে?
তার বিস্ফারিত দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে রৌদ্রিকের উপর।

কারণ,রৌদ্রিক হঠাৎ করেই দোলনার সম্মুখভাগে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে। রৌদ্রিক সিকদার যার ব্যক্তিত্বে অহংকার নয়, বরং জন্মগত কর্তৃত্বের এক অদৃশ্য গাম্ভীর্য মিশে রয়েছে; যে মানুষটা কারো সামনে মাথা নত করে না। সেই মানুষটা আজ নত হয়েছে শুধুমাত্র একটি অভিমানী মেয়ের সামনে। তূর্ণার নিশ্বাস থমকে গিয়েছে মনে হলো। তার মানসিক জগৎ এত জটিল অনুভূতির ব্যাখ্যা দিতে অভ্যস্ত নয়। তাই সে শুধু অপলক তাকিয়ে রইলো। ধীরে হাত দু’টো দ্বারা কানের লতি চেপে ধরে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে শান্ত অবদার স্বরে বলে-
“ ওহে অভিমানী কন্যা, রাগ কি আপনার কমবে না? দেখুন কানে ধরেছি, ছেলেমানুষী ভাবতে পারেন। বউয়ের অভিমান ভাঙানোর জন্য এতটুকু ছেলেমানুষী,করা তো যায়। বাচ্চা বউ বলে কথা! যদি অনুমতি দেন আপনার পা’টা স্পর্শ করতে পারি?”

বইতে থাকা মৃদু দমকা হওয়ায় তূর্ণার কেশরাশি গুলো আরও এলোমেলো করে দিলো। তূর্ণা নিষ্পলক চেয়ে আছে রৌদ্রিকের দিকে। অভিমান ভুলে সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে। তূর্ণাকে কিছু বলতে না দেখে, রৌদ্রিক আর কিছু বললো না। রৌদ্রিক ধীরে নিজের পকেট থেকে ক্ষুদ্র একটি বস্তু বের করলো। এক জোড়া নূপুর,অত্যন্ত সূক্ষ্ম সোনালী কারুকাজে গঠিত। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘণ্টিগুলো রাতের বাতাসে মৃদু কেঁপে উঠে ক্ষীণ রিনরিনে শব্দ তুলছে। যেন চন্দ্রালোকে কেউ গোপনে সুর ছড়িয়ে দিয়েছে।
তূর্ণা হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রইলো।
“ এ… এটা?”
তার কণ্ঠে বিস্ময়ের কম্পন স্পষ্ট। রৌদ্রিক মাথা সামান্য কাত করলো। রৌদ্রিক মুখ তুলে তাকালো তার দিকে। চাঁদের রক্তিমাভ আলো এসে পড়েছে তার সুগভীর চোখজোড়ায়। সেখানে আজ কোনো কঠোরতা নেই। আছে শুধুই প্রশান্ত কোমলতা। ঠোঁটের কোণে আবছা হাসির রেখা।

“ সেদিন মার্কেটে এটা দেখার পর থেকে তোমার চোখ দু’টো অদ্ভুতভাবে জ্বলজ্বল করছিল।”
তূর্ণার মনে পড়লো। হ্যাঁ, কয়েকদিন আগে সবার সাথে শপিং এ যাওয়ার পর, যখন জুয়েলারি জিনিসপত্র কিনছিলো সবাই। তখন সে দোকানের কাঁচের ওপাশে রাখা নূপুরজোড়ার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু পরমুহূর্তেই ভুলে গিয়েছিল বিষয়টা। কিন্তু রৌদ্রিক? সে কিভাবে জানলো? জানলেও সে মনে রেখেছে? এতটুকু ক্ষুদ্র বিষয়ও?তূর্ণার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন কেঁপে উঠলো। রৌদ্রিক অত্যন্ত ধীর ভঙ্গিতে বললো-
“ আমার অভিমানী মেয়েটার মন খারাপ ছিল। তাই ভাবলাম,শব্দ দিয়ে অভিমান ভাঙানো যাক।”
“ এ. এটা আমার?”
“ হুম। অভিমানী মানুষদের তো মানাতে হয়।”
তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই রৌদ্রিক ধীরে ধীরে তূর্ণার এক পা নিজের হাতে তুলে নিলো। মুহূর্তেই তূর্ণার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠলো।
“ আ-আপনি কি করছেন!”
লজ্জা, বিস্ময়, সংকোচ, সব মিলেমিশে তার কণ্ঠ প্রায় জড়িয়ে এসেছে। রৌদ্রিক শান্ত! অদ্ভুত রকম শান্ত যেন এই মুহূর্তটুকুর জন্যই সে এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল।

“ নড়বে না।”
অত্যন্ত নিম্নস্বরে উচ্চারিত সেই বাক্যে অদ্ভুত এক মাদকতা ছিল। আদেশও নয়, অনুরোধও নয় বরং এক গভীর যত্নের স্পর্শ মিশে ছিলো। তূর্ণার হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত হয়ে উঠলো। সে জীবনে বহুবার অবহেলা, ভয়, বিশৃঙ্খলা অনুভব করেছে; কিন্তু কেউ তাকে এতটা ধৈর্য নিয়ে, এতটা মনোযোগ দিয়ে আগলে রেখেছে এ অভিজ্ঞতা তার নিকট সম্পূর্ণ অচেনা। রৌদ্রিক অত্যন্ত সতর্কতায় নূপুরটি পরিয়ে দিলো তার পায়ে। ক্ষুদ্র ঘণ্টিগুলো সাথে সাথেই মৃদু শব্দ তুলে কেঁপে উঠলো।
ঝনৎ!
শব্দটা যেন সরাসরি গিয়ে আঘাত করলো তূর্ণার হৃদয়ের গভীরতম স্থানে। সে নির্বাক ভাবে তাকিয়ে থাকলো। এর আগের বারও একই ভাবে সকালে উঠে নিজের পায়ে নূপুর পেয়েছিল, তখন শুধু সেই নূপুর জোড়া পেয়ে আনন্দিত হয়েছিল। জানতো না কে পরিয়েছে। তবে আজকে সচক্ষে রৌদ্রিকে এত যত্ন নিয়ে পায়ে পরিয়ে দিতে দেখে অবাক হচ্ছে সে।
রৌদ্রিক দ্বিতীয় নূপুরটিও পরিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো তার পায়ের দিকে। তারপর অত্যন্ত ধীরস্বরে বললো-

“ জানো, ছোটবেলায় মা বলতো,যে মেয়ের পায়ে নূপুর মানিয়ে যায়, সে নাকি ঘরের ভেতরও বসন্ত নিয়ে আসে।”
তূর্ণার চোখদুটো ধীরে ভিজে উঠলো হঠাৎ। কারণ এই প্রথম কেউ তাকে কোনো বোঝা, অসুস্থ মানুষ কিংবা সমস্যার উৎস হিসেবে নয় ;বরং একজন সুন্দর, মূল্যবান নারী হিসেবে দেখছে। তূর্ণা নির্বাক, তার মনে হচ্ছে অন্তস্তলে ভেতরে অদ্ভুত কিছু হচ্ছে। এমন অনুভূতি সে আগে কখনো উপলব্ধি করেনি। রৌদ্রিক তাকে জড়িয়ে ধরেনি, চুম্বনও করেনি, তবুও এই মুহূর্তটা কেন যেন তার সমগ্র অস্তিত্বকে কাঁপিয়ে তুলছে। কারণ একজন মানুষ যখন নিজের অহংকার নামিয়ে কারো সামনে নতজানু হয়, তখন সেই দৃশ্য হাজারো স্পর্শের চেয়েও গভীর হয়ে ওঠে।তূর্ণা নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। নূপুরের ক্ষুদ্র ঘণ্টাগুলো বাতাসে হালকা দুলছে।রৌদ্রিক হঠাৎ বললো-
“ এখন একটু হাঁটো তো।”
“ কেনো?”
“ শুনবো।”
“ কি?”
“ তোমার অভিমান ভাঙার শব্দ।”

কথাটা শুনে তূর্ণার গালদুটো মুহূর্তেই লালাভ হয়ে উঠলো। রৌদ্রিকের চোখে তখন সেই বিরল কোমলতা যা সে পৃথিবীর আর কাউকে দেখায় না। তূর্ণা ধীরে দোলনা থেকে নেমে দাঁড়ালো। পা নড়তেই নূপুরের ক্ষুদ্র ঝংকার ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে।
ঝনৎ…!!
মুহূর্তেই রৌদ্রিক মৃদু হেসে উঠলো।
“ এই তো। এখন আর তোমাকে অভিমানী লাগছে না।”
তূর্ণা এবার সত্যিই আর নিজের লজ্জা সামলাতে পারলো না। দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে ফেললো অন্যদিকে। অথচ ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ফুটে উঠেছে ক্ষীণ এক হাসি।
আর সেই হাসিটুকু দেখেই রৌদ্রিক বুঝলো,তার অভিমানী কন্যার মেঘ অবশেষে একটু একটু করে সরতে শুরু করেছে।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৯

“ চলুন মহারাণী, আর সকালে নাহয় বাকি অভিমান ভাঙিয়েন। অনেক রাত হয়েছে।
বলা শেষ হতেই সেই আগের ঝড়-হওয়ার গতিতে তূর্ণাকে তুলে নিলো নিজের বাহুদ্বয়ে। লম্বা পা বাড়িয়ে হেঁটে চললো কক্ষের দিকে, লজ্জায় তূর্ণা আড়ষ্ট হয়ে নিজেকে লুকিয়ে নিলো রৌদ্রিকের বাহুদ্বয়ে। সেটা দেখে রৌদ্রিক হেসে ফেললো, টোল পরা হাসির দেখা মিললো তার অধরভাজে। প্রতিটা কদমের সঙ্গে তূর্ণার পায়ে থাকা নূপুর গুলো বেজে উঠছে হালকা স্বরে।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩০