Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৪

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৪

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৪
ফাহিমা ইসলাম

রাত্রি যেন আজ এক অনির্বচনীয় গাম্ভীর্যে আচ্ছন্ন হয়ে আছে৷ আকাশের বক্ষ জুড়ে বিস্তৃত নিঃসীম নৈঃশব্দ্য, যেন সময় নিজেই তার গতি স্তব্ধ করে কোনো এক অদৃশ্য প্রহর গুণছে। দূর দিগন্তে ক্ষীণ চাঁদের আলো, অর্ধনিদ্রিত পৃথিবীর কপালে ফেলে রেখেছে শীতল এক রৌদ্রহীন দীপ্তি। যা আলো হয়েও যেন অন্ধকারেরই পরম আত্মীয়।
তার আলোতে ঘরটা মৃদু আলোকচ্ছটায় স্নাত, নতুন জায়গায় হওয়ায় বেশ অস্বস্তিতে পরতে হয়েছে ইরার৷ কেমন কেমন জানি লাগছে, সে তার স্বামীর কক্ষ দাঁড়িয়ে আছে! সেই স্বামী যার সঙ্গে তার জীবন এক আকস্মিক ভাবে সে নিজেই জড়িয়ে পরেছে৷ নামহীন ভাবে তৈরি হয়েছে এক পবিত্র সম্পর্ক। যাকে চিনে না,জানে না আজকে তার কক্ষে তারই অর্ধাঙ্গিনী রূপে দাঁড়িয়ে আছে।

বিবাহ,যা হওয়ার কথা ছিল এক সামাজিক উৎসব, তা আজ তাদের জীবনে রূপ নিয়েছে আকস্মিক এক সিদ্ধান্তের প্রতিচ্ছবির মতো। কোনো আয়োজনের উচ্ছ্বাস নেই, নেই প্রথাগত অনুরাগের স্পর্শ; বরং আছে এক অদ্ভুত টানাপোড়েন,অস্তিত্বের, পরিচয়ের, আর অদৃশ্য এক সম্পর্কের সূক্ষ্ম রেখাচিত্র। ইরা জানালার ধারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। তার অবয়ব চাঁদের আলোয় অর্ধপ্রকাশিত, চোখ দুটি গভীর, অথচ অশান্ত হয়ে আছল; যেন হাজারো প্রশ্নের ভারে নত, কিন্তু উত্তরহীন। আজ সে নিজ ইচ্ছায় শ্রাবণের সঙ্গে এসেছে তবুও মনের অন্তঃস্থলে অচেনা এক শূন্যতা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। জানা নেই তার এই সিদ্ধান্ত কতটুকু সঠিক, নাকি নিজেই নিজেকে ঠেলে দিয়েছে এমন কিছুর উপর যেটা তার জন্য ভয়ানক কিছু বয়ে আনবে।
হুট করেই কারো উপস্থিতি টের পেতেই চট করে পিছন ফিরতেই ;শ্রাবণকে শান্ত ভাবে তার দিকেই তাকিয়ে থাকতে দেখতে পায়। ইরার তাকিয়ে থাকতে পারো না দৃশ্য নত করে ফেললো। শ্রাবণ বেয় চলা এই নিরবতা ভেঙে বলে-
“আপনি ফিরে যেতে চান, তাহলে এখনো সময় আছে।”

ইরা ধীরে মাথা নাড়লো।
“ফেরার পথ আমি নিজেই বন্ধ করেছি।”
কথাগুলো উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা নামলো৷ শ্রাবণ আর কিছু বলল না। শুধু কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে রইল। তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব খুব বেশি নয়, তবুও সেই সামান্য ব্যবধান যেন বহু বছরের অচেনা পথচলার সমান দীর্ঘ।
হঠাৎ এক ঝটকায় জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ল শীতল বাতাস। ইরার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের উপর ছড়িয়ে পড়ল। সে অপ্রস্তুত হয়ে সেগুলো সরাতে গিয়েই থেমে গেল; কারণ তার আগেই শ্রাবণের আঙুল ছুঁয়ে গেল সেই কেশরাশি।
ইরা কয়েক মুহুর্তের জন্য থমকে গেল। সে এমন কিছু আশা করেনি, শ্রাবণ নিজের অবস্থা বুঝতে পেরে দ্রুত হাতটা সরিয়ে নেয়। শ্রাবণ পরিবেশটা স্বাভাবিক দেখানোর জন্য তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না, নির্লিপ্ত রইলো সে যেনো কিছুই হয়নি একটু আগে।
ইরা ধীরে চোখ তুলে তাকালো শ্রাবণের দিকে। তার দৃষ্টিতে ভয় নেই, লজ্জা মিশানো নেত্রজোড়ায়। শ্রাবণও তাকিয়ে রইল নিঃশব্দে, অবিচলভাবে। তার চোখে প্রথমবারের মতো গাম্ভীর্যের আবরণ ভেঙে ফুটে উঠলো এক মৃদু কোমলতা।

“আমি জানি না… এই সম্পর্কের কোনো নাম আছে কি না,” নিম্নস্বরে বলল শ্রাবণ,
“তবে আজ থেকে আপনি একা নন।”
ইরার বুকের ভেতর কিছু যেন কেঁপে উঠল। এতদিনের অচেনা পথচলায় হঠাৎ একটুকরো আশ্রয়ের আভাস অপরিচিত, অথচ আশ্চর্যভাবে স্বস্তিদায়ক। এটা হয়তো বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনের শক্তি, যা দু’টি অপরিচিত সত্তার মাঝে অদৃশ্য এক স্বস্তি এনে দেয়, ভরসা এনে দেয়৷
“ কালকে আপনার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন ইরা৷ বাড়ি সবাই আমাদের বিয়েটা সামাজিক ভাবে করাতে চাচ্ছে, আশা করি এতে দুই পরিবারের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝিটা থাকবে না। ”
“ আপনার কি মনে হয় দুই দুইবার বিয়ে থেকে পালিয়ে আসায় আমাকে আমার পরিবার কিছু বলবে না? প্রথমবার নাহয় কিছু বলেনি, কিন্তু আমি এবার বিয়ের দিন পালিয়েছি৷ বুঝতে পারছেন কতটা অপমানিত হতে হয়েছে আমার বাবা-মা’কে।”
“ বুঝতে পারছি, তাই সবাই বিয়েটা সামাজিক ভাবে করাতে চাচ্ছে৷ এতে যতটুকু আপনার পরিবারের মান-সম্মানে আঘাত হেনেছে, কিছুটা হলেও কমবে।”
“ আচ্ছা সকাল হোক মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করবো৷ বাবা-মা আমার উপর ভীষণ রেগে আছে নিশ্চয়ই।”
কথাটুকু বলতে বলতে ইরা আবেগপ্রবণ হয়ে পরলো। শ্রাবণ ইরার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, বলে-
” চিন্তা করবেন না ইরা৷ সবঠিক হয়ে যাবে, আমি আছি তো!”
শ্রাবণের কথা শুনে ইরা অশ্রুসজল চোখে শ্রাবণের দিকে তাকায়৷ শ্রাবণের কি হলো জানা নেই, না চাইতেও ইরার চোখে আসা অশ্রুবারি গুলো দেখে অন্তস্তলে কেমন জ্বালা-পোড়া সৃষ্টি হলো। শ্রাবণ সেটা উপেক্ষা করতে চাইলো তবে সম্ভব হলো না, শ্রাবণ নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে শান্ত স্বরে, ইরাকে আশ্বস্ত করে বলে-
“ কাঁদবেন না ইরা, আমি আছি তো। সব ঠিক করে দিবো, একটু সময় দিন আমাকে। আপনি শুইয়ে পরুন।

রাতের অন্তিম প্রহরের নিঃশেষিত অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে গিয়ে এক অপার্থিব আলোয় ভিজে উঠছে ধরণী। পূর্ব আকাশে সূর্যের আগমনী আভাস যেন লজ্জাবনত কুমারীর মতো লালিমা ছড়িয়ে দিচ্ছে। নিস্তব্ধতার গহ্বর ভেদ করে ভোরের পাখিদের ক্ষীণ কূজন ধীরে ধীরে জীবনের সুর রচনা করছে। এই সকালের ভেতরেও তূর্ণার পৃথিবী সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নয়,তবুও আর আগের মতো ভাঙাচোরা, অস্থির, বিভ্রান্ত নয় সে। চিকিৎসার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এখন সে এখন ধীরে ধীরে নিজেকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় রত। অনেক উন্নতি এসেছে তার মাঝে, আগে থেকে তার মানসিক অবস্থা অনেকটা ভালো হয়ে এসেছে।
শুক্রবারের সকাল। ঘরের জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া কোমল আলো বইয়ের পাতায় ছড়িয়ে পড়েছে। সেই আলোয় বসে আছে রৌদ্রিক তার সামনে খোলা বই, মুখে একাগ্রতার ছাপ। আর তার ঠিক বিপরীতে বসে তূর্ণা, তবে মনটা যেন বইয়ের অক্ষরে বন্দি নয়, বরং অন্য কোথাও উড়ে বেড়াচ্ছে। তাকে এই ভোর সকালে উঠে পড়তে বসিয়েছে রৌদ্রিক, নামাজ পরা শেষ করার কিছু সময় পর কিছু খাবার খেয়েই তাকে পড়তে বসিয়ে দিয়েছে।
“এই লাইনটা পড়ো।”

শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল রৌদ্রিক।তূর্ণা বইয়ের দিকে তাকাল বটে, কিন্তু ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক হাসি খেলে গেল।
“আপনি এত সিরিয়াস কেন? শুক্রবার বলে একটু ছাড় দেওয়া যায় না বর?”
রৌদ্রিক ভ্রু কুঁচকালো, তবে সেই কঠোরতার আড়ালে এক অদৃশ্য কোমলতা লুকিয়ে রয়েছে। তারপরও এই মুহুর্তে কোনো প্রকার কোমলতা না দেখিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে-
“পড়াশোনার কোনো ছুটি নেই।”
“তাহলে আপনারও নেই?” তূর্ণা কৌতুক ভরা চোখে তাকালো। “আপনি কি কখনো ছোট ছিলেন না? দুষ্টুমি করেননি?”
এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল রৌদ্রিক। প্রশ্নটা যেন অপ্রস্তুত করে দিলো তাকে। তারপর নিজেকে সামলে শান্ত স্বরে বলে-
“বিষয় পরিবর্তন করো না। এই প্যারাগ্রাফটা সম্পূর্ণ মুখস্থ বলবে আমায়।”
তূর্ণা মুখ ফুলিয়ে বইয়ের দিকে তাকালো, কিন্তু পড়ার বদলে পেন্সিল দিয়ে বইয়ের কোণায় অদ্ভুত সব আঁকিবুঁকি করতে লাগল।

“আমি যদি না বলি?”
“তাহলে শাস্তি পাবে।” সংক্ষিপ্ত উত্তর
তূর্ণা হঠাৎ সামনে ঝুঁকে এল, চোখ দুটো কৌতূহলী দীপ্তিতে উজ্জ্বল। রৌদ্রিকের শান্ত,গম্ভীর মুখপানে চেয়ে বলে-
“আপনি সবসময় এত গম্ভীর থাকেন কেন বর? একটু হাসলে কি ক্ষতি?”
রৌদ্রিক এবার সরাসরি তাকালো তার দিকে। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা অদ্ভুত, গভীর।
তারপর খুব সামান্য, প্রায় অদৃশ্য এক হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে। তূর্ণা থমকে গেল। যেন অমূল্য কিছু দেখেছে।
“এই তো! পারেন তো!” সে হেসে উঠলো, শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে।
রৌদ্রিক মাথা নাড়ল, তবে চোখের কোণে সেই মৃদু হাসির ছায়া আবারও মুছে গেলো।
“এখন পড়া শুরু করো।”
“একটা শর্তে। ”তূর্ণা বলল।
“কি?”
“আমায় সমুদ্রে নিয়ে যাবেন বর? সেখানে আমি, আপনি আর আমার পুতুল হাতে হাত ধরে একসঙ্গে হাঁটবো।”
অতি আনন্দের সঙ্গে কথাটুকু বলে রৌদ্রিকের শান্ত মুখপানে চাইলো তূর্ণা। রৌদ্রিক তার দিকেই পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, রৌদ্রিক তার ঠিক সামনে বসা রমণীর দিকে তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে। মেয়েটা সর্বদাই তার কাছে এমন ভাবে বায়না করে রৌদ্রিক সেটা ফেলে দিতে পারে না। তূর্ণার সেই মায়াভরা দৃষ্টিকে উপেক্ষা করার সাধ্য যেনো তার কাছে নেই। এখনো টেবিলের উপর গালে হাত দিয়ে তার দিলে মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

“ আচ্ছা নিয়ে যাবো, হসপিটাল থেকে ছুটি নিয়ে তারপর।”
“ সত্যি..!?”
“ না একদমই মিথ্যে।”
রৌদ্রিকের এমন কথা শুনে তূর্ণা মুখটা হালকা বাকিয়ে বলে-
” ইসস বর আপনি না দিন দিন কেমন দুষ্টু হয়ে যাচ্ছেন।”
“ তা কেমন দুষ্টু হয়েছি আমাকেও একটু বল।”
শান্ত স্বরে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে
“ এইযে মজা করছেন, নিয়ে তো যাবেন আমি জানি। তূর্ণার বর বলে কথা, সে নিয়ে যাবে না তা কি করে হয়।” অধর ভাজের হাসি চওড়া করে বলে
” এত বিশ্বাস! যদি না নিয়ে যাই তখন?”
“ ইসস বললেই হলো নাকি। আমি জানি তো তূর্ণা বর বেস্ট বর। তূর্ণার যা চায় না তাও এনে দেয়, তাহলে এটা কি করে ফেলে দেবে বলুন।”
“ এবার তাড়াতাড়ি পড়া মুখস্থ করে দাও। ”
রৌদ্রিক কিছু বলল না, শুধু বইটা তার দিকে এগিয়ে দিলো। তূর্ণা এবার সত্যিই পড়তে শুরু করল, তবে মাঝেমধ্যে চোরের মতো তাকাচ্ছে তার দিকে।

অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে৷ তূর্ণার ধীরে ধীরে পাঠ করে পড়া মুখস্থ করায় ব্যস্ত৷ রৌদ্রিক নিজেও বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তূর্ণার দিকে খেয়াল রাখছে৷ তূর্ণার একটা জিনিস রৌদ্রিকে ভালো লাগে সেটা হলো, মেয়েটা যা একবার শিখে যায় সেটা আর ভুলে যায় না।রৌদ্রিক লক্ষ্য করছিল, তার দৃষ্টি আর আগের মতো অস্থিরভাবে ছুটে বেড়াচ্ছে না; বরং কোথাও একাগ্রতার ক্ষীণ অথচ দৃঢ় রেখা আঁকা হয়েছে। তবুও, স্বভাবের সহজাত চপলতা কি এত সহজে বিলীন হয়?
“এই যে,” তূর্ণা হঠাৎ বই বন্ধ করে বলল, “আপনি ইচ্ছে করেই কঠিন অংশগুলো আমাকে দেন, তাই না?”
রৌদ্রিক দৃষ্টি না তুলে শান্ত গলায় বলল,
“যা কঠিন, সেটাই প্রয়োজনীয়।”
“তাহলে আপনি নিজেই করেন না কেন?”
ঠোঁট উল্টিয়ে প্রশ্ন করে, যেখানে ছিলো অভিমান মিশ্রিত দুষ্টামি। রৌদ্রিক এবার তাকালো। তার দৃষ্টিতে কোনো বিরক্তি নেই, কেবল এক অদ্ভুত স্থিরতা
“কারণ তোমার শেখাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
তূর্ণা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর আবার বই খুলল, কিন্তু এবার তার আঙুল হালকা করে ছুঁয়ে গেল রৌদ্রিকের হাত। স্পর্শটি এতটাই ক্ষণস্থায়ী যে, সেটিকে ইচ্ছাকৃত বলা যায় না তবুও তার প্রতিক্রিয়া ছিল গভীর। রৌদ্রিক সামান্য থমকালো। তূর্ণা হঠাৎ মাথা তুলে রৌদ্রিকের দিকে তাকালো, তূর্ণা কিছু বুঝতে পেরে হেসে ফেলল,

“ভয় পেয়েছেন বর?”
“না।”
“তাহলে চুপ হয়ে গেলেন কেন?”
“মনোযোগ নষ্ট করছো।”
তূর্ণা মৃদু হেসে মাথা নত করল, তবে তার চোখের কোণে খেলা করছিল এক অদ্ভুত দীপ্তি। যেন বহুদিন পর কোনো অনুভূতি নিঃশব্দে ফিরে এসেছে। বাইরে তখন সকালের আলো আরও প্রখর হয়ে উঠেছে। জানালার ফাঁক গলে আসা রৌদ্রকিরণ দু’জনের মাঝখানে পড়ে এক সোনালি রেখা তৈরি করেছে, যেন অদৃশ্য কোনো সীমানা, আবার একই সঙ্গে এক অদ্ভুত সংযোগসূত্র।
“ বর,” তূর্ণা হঠাৎ ডাকল।
“হুম?”
“আমি যদি একদিন পুরোপুরি ভালো হয়ে যাই… তখনও কি আপনি আমাকে এভাবেই পড়াবেন?”
প্রশ্নটি ছিল সরল, অথচ তার অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল গভীর, বহুস্তরবিশিষ্ট। রৌদ্রিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ধীর স্বরে বলল-

“তুমি ভালো হয়ে গেলে, তোমার আর আমার প্রয়োজন থাকবে না।”
বাক্যটি নিঃশব্দে নেমে এলো, কিন্তু তার অভিঘাত ছিল প্রবল। তূর্ণার মুখের হাসি ম্লান হয়ে গেল। সে কিছু বলল না। কেবল চোখ নামিয়ে বইয়ের পাতায় দৃষ্টি স্থির করল, কিন্তু অক্ষরগুলো যেন আবার ঝাপসা হয়ে উঠেছে। রৌদ্রিক তূর্ণার মাথা করে থাকা মুখশ্রীর পানে চেয়ে রইলো। তারপর রৌদ্রিক নিজেই বইটা সরিয়ে রেখে বলে-
“তবে… যদি তুমি চাও, আমি থাকতেও পারি।”
তূর্ণা ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে বিস্ময়, হাসির রেখা, আর এক ফোঁটা অদ্ভুত স্বস্তি মিলেমিশে আছে।
“তাহলে ঠিক আছে,“আমি ভালো হতে একটু সময় নেবো। যাতে আপনি আমাকে একা ছেড়ে না যান বর।
রৌদ্রিক কিছু বলল না, তবে তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই ক্ষীণ, দুর্লভ হাসির রেখা ফুটে উঠল। অধ্যয়নের সেই নীরব সুষমা ভেঙে গেল এক অতি ক্ষুদ্র অথচ প্রগাঢ় উপস্থিতির স্পর্শে।
দরজার চৌকাঠে পেরিয়ে, আধো পায়ে এইদিকেই এগিয়ে আসচ্ছে। এলোমেলো কেশরাশি কপালের ওপর নেমে এসেছে, নিদ্রাভঙ্গের আবেশ এখনও চোখের কোণে লেপ্টে আছে। ছোট্ট দুই হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে সে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সামনের দিকে। তূর্ণার দৃষ্টি প্রথমে যায়নি। কিন্তু রৌদ্রিকের দৃষ্টি হঠাৎ স্থির হয়ে যেতেই সে ঘুরে তাকালো। আর তাকাতেই তার চোখের গভীরে এক অনির্বচনীয় কোমলতা জেগে উঠলো।
“আমার পুতুল…”

আনন্দের সাথে বলে উঠলো তূর্ণা। তূর্ণাকে পড়াবে দেখে রোদেলাকে জবা সিকদারের কাছে দিয়েছিল, এতক্ষণ সেখানেই ঘুমিয়ে ছিল সে।
রোদেলা ধীরে ধীরে পা ফেলতে ফেলতে এগিয়ে এলো। তূর্ণা আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। বইয়ের পাতা, অক্ষর, সবকিছু যেন মুহূর্তেই গুরুত্বহীন হয়ে গেল। সে উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত প্রসারিত করল-
“ মায়ের কাছে আসো পুতুল…”
রোদেলা আধো আধো পায়ে নিদ্রামগ্ন হয়ে, তূর্ণার কাছে এলো। মুহূর্তেই রোদেলা তূর্ণার বুকে আশ্রয় নিলো। সেই ক্ষুদ্র দেহখানি যেন তূর্ণার শূন্যতার ভেতর নীরব এক পূর্ণতা এনে দিলো। তূর্ণা চোখ বন্ধ করে তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। রৌদ্রিক নির্লিপ্ত দর্শকের মতো বসে রইলো, কিন্তু তার দৃষ্টি আর আগের মতো শীতল নয়। সেখানে অচেনা এক প্রশান্তির ছায়া।
“আপনি আমাকে পড়াচ্ছেন, আর আমি এখানে আদর খাচ্ছি এটা কি ঠিক?”
তূর্ণা মৃদু হাসিতে বলল, রোদেলার গালে আলতো চাপ দিয়ে। রৌদ্রিক বই বন্ধ করল না, তবে পাতার ওপর তার আঙুল রেখে বলে-

“তুমি পড়ছো না, সেটা আগেই প্রমাণিত।”
“আমি পড়ছি,” তূর্ণা প্রতিবাদ করল শিশুসুলভ ভঙ্গিতে, “এই পুতুলটাই আমার বই।”
রোদেলা কিছুই বুঝলো না, কিন্তু তূর্ণার মুখের দিকে তাকিয়ে সে হেসে উঠলো অকারণ, নির্মল এক হাসি।এই হাসির ধ্বনি যেন ঘরের আবহকে পরিবর্তিত করলো। গম্ভীরতা ভেঙে নেমে এলো এক সহজ, স্বচ্ছ উষ্ণতা। কিছু সময় পর রৌদ্রিক ধীরে উঠে দাঁড়ালো। কয়েক পা এগিয়ে এসে থামলো তাদের সামনে। রোদেলা এবার তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো এক নিঃশর্ত আহ্বান। রোদেলা প্রথমে চলে গেলো বাবার কোলে। তূর্ণা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
“ আগে পড়া কর তারপর বাকি সব। ”
রৌদ্রিকের কথা শুনে তূর্ণা মুখ বাঁকাল। রোদেলা রৌদ্রিকের কাঁধে মাথা রেখে শান্ত হয়ে গেল।
তূর্ণা পাশে এসে দাঁড়ালো, তার আঙুল আলতো করে ছুঁয়ে দিলো রোদেলার চুলে। তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ভিন্ন সত্তা, তবুও এই মুহূর্তে তারা যেন এক অদৃশ্য সূত্রে আবদ্ধ। তূর্ণা রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে-

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৩

“দেখেছেন? আমরা তিনজন মিলে একদম ঠিক আছি৷ শুধু পড়াকে কেনো টানেন বর?”
“ পড়া চোর।”
রৌদ্রিকের কথায় তূর্ণা মুখ বাঁকাল আবারও। সে নাকি পড়া চোর, একটু নাহয় দেরি করে পড়াটা করে দিবে৷ তাই বলে পড়াচোর বলবে তাকে।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৫