Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৬

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৬

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৬
ফাহিমা ইসলাম

নবদিবসের সূচনা আজ যেন স্বর্গীয় কোনো চিত্রকরের নিখুঁত তুলির আঁচড়ে রচিত হয়েছে। আকাশজুড়ে ভেসে থাকা দুধসাদা মেঘরাজি সূর্যের কোমল কিরণকে এমনভাবে আবৃত করে রেখেছে, যেন প্রকৃতি নিজেই আলোকে সংযত হতে বলেছে। সিকদার বাড়ি আজ আলোকমালায় সজ্জিত। বিশাল প্রাসাদসদৃশ অট্টালিকার প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি বারান্দা উৎসবের রঙে রঞ্জিত। গৃহময় ছড়িয়ে রয়েছে আতরের সুগন্ধ, ফুলের পাপড়ি আর মানুষের ব্যস্ত পদচারণা। শ্রাবণ আর ইরার বিয়ের আয়োজন ঘিরে সবার মাঝেই ব্যস্ততা। অল্প সময়ে বিয়ের আয়োজন হওয়ায় সবকিছু তাড়াহুড়ো করে করা হচ্ছে, বাড়িতে মেহমান দিয়ে ভড়ে উঠছে। রাত গড়িয়ে সকাল হলে এর সংখ্যা আরও বাড়বে। সারা বাড়ি কোলাহলে মগ্ন,

কিন্তু সেই কোলাহলের ভেতরেও বাড়ির দক্ষিণ পাশের প্রশস্ত বারান্দাটিতে যেন অন্য এক শান্ত জগতের অবস্থান। সেখানে মেঝেতে বসে আছে তূর্ণা।
তার পরনে হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি, তার পরনে হালকা আকাশি রঙের শাড়ি, উন্মুক্ত কেশরাশি বাতাসে এলোমেলো হয়ে উড়ছে। তূর্ণার কোলে আঁধশোয়া হয়ে আছে ছোট্ট রোদেলা। রোদেলা নিজের ছোট্ট আঙুল দিয়ে তূর্ণার গাল টিপে টিপে হাসছে। শিশুসুলভ সেই নিষ্পাপ হাসি যেন সমস্ত বিষণ্নতাকে মুহূর্তেই গলিয়ে দিতে সক্ষম।
“ মা তুনি অনেত তুন্দল। তুমায় অনেত তুন্দল লাগতে।”
অস্পষ্ট জড়ানো কণ্ঠে বলেই আবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো রোদেলা। তূর্ণার অধরপ্রান্তে ধীর, মায়াময় হাসি ফুটে উঠলো। সে রোদেলার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বললো-
“ আমার পুতুল পাখিটা এত দুষ্টু কেনো হুম? তুমি তো আমার চেয়েও বেশি সুন্দর।”
রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে গলা জড়িয়ে ধরলো তাকে।

“ না মা বেতি তুন্দল।”
বাক্যটা সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়, তবুও তূর্ণার বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে এলো। দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা গভীর মুগ্ধতা নিয়ে দেখছিল রুমা সিকদার আর রোমানা সিকদার। রোমানা ধীর কণ্ঠে বললেন-
“ মেয়েটা অনেক বদলে গেছে আপা। আগে চোখে মুখে যে ভয়টা ছিল, এখন আর ততটা নেই।”
রুমা সিকদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হাসলেন।
“ মানুষকে যদি ঠিকভাবে আগলে রাখা যায়, তাহলে ভাঙা মনও একদিন জোড়া লাগে। আমাদের রৌদ্র থাকলে তো আর কথাই নেই।”
ঠিক তখনই করিডোর পেরিয়ে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এলেন জবা সিকদার। হাতে তার কিছু জিনিসপত্র, তার ব্যক্তিত্বে এখনো সেই চিরচেনা কঠোরতার আবরণ বিদ্যমান। চোখেমুখে গাম্ভীর্য, চলনে ব্যক্তিত্বের তীক্ষ্ণ ছাপ। তূর্ণা তাকে এখনো ভীষণ সমীহ করে চলে। এক অদ্ভুত ভয় কাজ করে তার মাঝে জবা সিকদারকে দেখলে। হয়তো প্রথমদিকের সাক্ষাৎ তার মস্তিষ্কে এখনো সেই আতঙ্ক বহাল। জবা সিকদার সামনে আসতেই তূর্ণা দ্রুত উঠে দাঁড়াতে গিয়ে শাড়ির আঁচলে জড়িয়ে হোঁচট খেতে নিলো। সঙ্গে সঙ্গে রোদেলা আঁতকে উঠে ছোট্ট কণ্ঠে বলে উঠলো-

“ মা… বেতা পায়!”
জবা সিকদারের কপাল কুঁচকে গেলো।
“ সাবধানে হাঁটতে পারো না? সবসময় অস্থিরতা নিয়ে থাকো কেনো?”
কথাগুলো শাসনের মতো শোনালেও কণ্ঠের অন্তর্গত উদ্বেগটা এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। তূর্ণা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। ঠিক যেন কোনো অপরাধ করে ফেলা শিশু।জবা সিকদার কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। অতঃপর ধীর ভঙ্গিতে হাতে থাকা ছোট্ট বাক্সটা এগিয়ে দিলেন।
“ এটা তোমার জন্য এনেছি। এত অতিথির মাঝে যেন এলোমেলো হয়ে না থাকো।”
তূর্ণা বিস্মিত চোখে বাক্সটার দিকে তাকালো। ভেতরে অত্যন্ত সুন্দর মুক্তার কাজ করা একটি চুড়ির সেট। তার চোখদুটো মুহূর্তেই বিস্ফারিত হয়ে উঠলো।

“ আ…আমার জন্য?”
জবা সিকদার মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, যেন অতিরিক্ত কোমলতা প্রকাশ করতে তিনি নিজেই অস্বস্তি বোধ করছেন।
“ বেশি ভাবার কিছু নেই। বাড়ির বউকে ভালো দেখানোও বাড়ির সম্মানের অংশ। সুন্দর মত থাকবে এই ক’দিন কারো কথায় কান দিবে না, কেউ কিছু বললে আমাশ এসে জানাবে।
তূর্ণার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠলো। এতদিনের ভয়, সংকোচ, দূরত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই ক্ষুদ্র গ্রহণযোগ্যতাটুকুই যেন তার কাছে বিশাল কোনো প্রাপ্তি।রোদেলা তখন বাক্সটার ভেতর উঁকি দিয়ে খুশিতে হাততালি দিচ্ছে।
“ চকচকে! আমিও নিবো!”
সবাই হেসে উঠলো। তূর্ণা রোদেলাকে কোলে তুলে নিয়ে নরম গলায় বললো—
“ না পুতুল, এটায় চকলেট নেই তো। রুমে বর এতগুলো চকলেট রেখেছে।
রোদেলা ঠোঁট ফুলিয়ে বললো-
“ আনি চকচকে খাবু, পাপাকে বুলুনা কিত্তু। আমি না তুন্না মায়ের পুতুল। ”

রৌদ্রিক রোদেলাকে নিয়ম করে হাবিজাবি জিনিস খেতে দেয়। ছোট ফ্রিজ ভর্তি খাবার থাকলেও সেটা নিয়ম করে খেতে দেয় সে। তাই রৌদ্রিক না থাকলে এমন করে বায়না করে তূর্ণার কাছে। রোদেলার কথা শুনে তূর্ণার ইশারায় চুপ করতে বললো, কারণ সে আর রোদেলা লুকিয়ে লুকিয়ে খায়। রৌদ্রিক জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় সে আর রিনি খেয়েছে। তাই রৌদ্রিক তখন আর কিছু বলে না। তূর্ণার রোদেলার কানের কাছে মুখটা এগিয়ে ফিসফিস করে বলে-
“ আরে পুতুল, এখানে বলছো কেনো। সবাই জেনে যাবে তো। পরে খাবো তো।”
জবা সিকদারের কঠোর মুখেও অতি ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠলো। রুমা সিকদার জবা সিকদারের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ আরে আপা মন খুলে হাসো না একটু। মেয়েটা শুধু শুধু এখনো তোমায় ভয় পায়।”
“ পাক, তোদের তো পায় না। আর সবাই আদরে আদরে রাখলে শাসন করবে কে। থাকলাম নাহয় পঁচা শ্বাশুড়ি হয়ে।”
জবা সিকদারের কথা শুনে তূর্ণার কাচুমাচু করে জবা সিকদারের দিকে তাকালেন।

“ শ্বাশুড়ি মা আমি আর পঁচা ডাকবো না। তুমি কষ্ট পেওনা, তূর্ণা খুব সরি ওইভাবে ডাকার জন্য।”
“ হুম তাই কর। এই কয়েকদিন বাড়ির বড় বউ হয়ে থাকবে, জা আসছে তোমার।”
“ জা কি? শ্রাবণ ভাইয়ের বউ তো ইরা আপু।”
“ আগে আপু ছিল, এখন জা। জা মানে তোমার বরের ভাইয়ের বউকে জা বলে। তুমি ওর জা আর ও তোমার ছোট জা সম্পর্কে। জা না বোনের মত লাগে সে তোমার।”
“ আমাল ঝা কই দিদু?”
হাত নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে রোদেলা। রোদেলার কথা শুনে হেসে দেয় সবাই, রুমা সিকদার রোদেলার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ বড় হয়ে নে বুড়ি, তারপর তোমারও জা হবে৷”
“ আনি বল হব কবে ছুতু দিদু?”
“ এই তো বড় হচ্ছো।”
আরও নানান কথা বলছে সবাই মিলে। কথা শেষে জবা সিকদার তূর্ণাকে তাড়া দিয়ে বলে-
“ যাও গোসল ছেড়ে আসো, বিকেলের দিকে শপিং এ যাবো। মেয়েদের শপিং বাকি, ইরাও তো অনেককিছু কেনা বাকি আছে।”

তূর্ণা বাধ্য মেয়ের মতো উঠে গেলো রোদেলাকে রুমের দিকে। তূর্ণার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রুমা সিকদার বলেন-
“ যাই বলনা কেনো আপা, তূর্ণা যদি আর পাঁচটা মানুষের মত স্বাভাবিক ভাবে জন্ম নিতো। মেয়েটা আস্ত হিরের টুকরো হতো। ইসস প্রীয়তির আগে যদি এই মেয়েটাকে পেতাম তাহলে ভালোই হতো, রোদকে কি সুন্দর আগলে রাখে। আমরা যা ভেবেছিলাম তার থেকেও বেশি ভালো মেয়েটা।”
“ হুম, ভাগ্য দেখো যে জন্ম দিয়েছে তার মায়া হয়নি। অথচ যে জন্ম দেয়নি তার মায়াই বেশি। এরজন্যই হয়তো বলে রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বড় সম্পর্ক আত্মার।”
রুমা আর রোমানা সিকদারের কথায় চুপ থাকলে জবা সিকদার। তারা যা বলেছে সেটা ভুল কিছু নয়, রৌদ্রিকের বিয়েটা যেমন রৌদ্রিকের জন্য দিয়েছি। তেমনিও রোদেলার জন্য একটা মাও তারা চেয়েছিল, কিন্তু রৌদ্রিক তূর্ণাকে তার বাচ্চার জন্য বেছে নেয়নি। বরং রৌদ্রিক তূর্ণাকে বেছেছে তূর্ণার জন্য, মেয়েটাকে নতুন জীবন দেওয়ার জন্য। তারপরও তূর্ণার সঙ্গে জুড়ে গেছে রোদেলা। তূর্ণাও সুন্দর এখন,পুরোপুরি না হলেও আল্লাহ যতোটুকু সুস্থ করেছে তাতে সবাই খুশি।

ধরণী জুড়ে রাত্রির আগমন ঘটেছে বহু আগেই। সারা বাড়ি আলোকসজ্জায় সেজে উঠেছে, রাত হওয়ায় চারদিকটা যেনে আরও ঝলমল করে উঠছে। হালকা বিটে গান বেজে চলছে, মেয়েরা কেনাকাটা করতে করতে প্রায় নয়’টা বেজে গেছে। কিছুখন আগেই বাড়ি ফিরেছে, বাড়ি ভর্তি মেহমান দিয়ে ভরা। কালকে আরও আত্মীয়-স্বজনের আগমন ঘটবে। বাহিরে থেকে আসায় সকলেই কান্ত, রোদেলাও গিয়েছিল কিন্তু সে ঘুমিয়ে পরেছিল একটা সময়। তাই সেই অবস্থায়ই শপিং করে এসেছে, বিয়ের শপিং এত অল্প সময়ে করা যায় না। যতটুকু সম্ভব হয়েছে করে নিয়েছে। বাদবাকি যা রয়েঢ়ে সেগুলো আজ-কালকের মধ্যে করা হয়ে যাবে। বাড়ির বাকি পুরুষেরা বিয়ের অন্যদিকগুলো তকদারী করছে, রৌদ্রিকও কয়েকদিনের জন্য ছুটি নিয়েছে। ছুটি নিয়েছে বললে ভুল হবে তাকে নেওয়ানো হয়েছে। ছেলেটা সবসময় কাজ নিয়েই পরে থাকে।

তূর্ণার বারান্দায় দিয়ে হেঁটে হেঁটে রোদেলাকে খুঁজছে। দুপুরের পর থেকে কেউ রোদেলাকে দিচ্ছেই না তার কাছে, সবাই কেমন রোদেলাকে নিয়ে থাকছে। তূর্ণার না চাইতেও কিছু করতে পারছিল না, হাঁটতে হাঁটতে তূর্ণার দৃষ্টি আচমকাই নিচের বাগানের এক কোণে গিয়ে স্থির হলো। রোদেলা বসে আছে ছোট্ট টুলের উপর। গোলাপি ফ্রক পরা শিশুটাকে আজ যেন তুলোর পুতুলের মতো লাগছে। আর তার পেছনে দাঁড়িয়ে বাড়ির এক আত্মীয়া অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তার চুল বেঁধে দিচ্ছে। মুহূর্তেই তূর্ণার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেলো। চোখেমুখে এক অদ্ভুত অসন্তোষের ছাপ ফুটে উঠলো। এমনিই সবাই আজকে রোদেলাকে তার থেকে দূরে রেখেছে, তারউপর দৃশ্য দেখে না চাইতেও ঈষা লাগলো তার। শিশুসুলভ অধিকারবোধে তার অন্তর হঠাৎ করেই কেমন টনটন করে উঠলো। যেন কেউ তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাতে অনুমতি ছাড়া হাত দিয়েছে। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর আচমকাই দ্রুত পায়ে নিচে নেমে এলো সে।
বাগানের একপাশে এসে দাঁড়াতেই সেই মেয়েটা, তূর্ণার চেনে না কে এ মেয়েটা। তূর্ণার হঠাৎ আগমনে মেয়েএা খানিকটা বিস্মিত হয়ে তাকালেন তূর্ণার দিকে। কিন্তু তূর্ণা কোনো কথা বললো না। নীরবে রোদেলার ছোট্ট হাত ধরে নিজের দিকে টেনে নিলো। রোদেলা বিস্মিত হয়ে বড় বড় চোখে তাকালো তার দিকে।

“ মা?”
শিশুসুলভ জড়ানো কণ্ঠস্বরটা শুনে তূর্ণার ভেতরের সমস্ত অস্থিরতা কেমন যেন নরম হয়ে এলো। তবুও মুখে গম্ভীর ভাব বজায় রেখে নিচু স্বরে বললো-
“ মা’কে ভুলে গেছো তুমি?”
তার কণ্ঠে রাগের চেয়ে অধিক ছিল অভিমান। মেয়েটা হয়তো কিছু বুঝলো, তাই সে মৃদু হেসে সরে যেতেই তূর্ণা রোদেলাকে কোলে তুলে নিলো। রোদেলা খিলখিল করে হেসে নিজের ছোট্ট হাতদুটো তূর্ণার গলায় জড়িয়ে ধরলো।
“ মা, উঁচু… উঁচু…”
তূর্ণা কপাল ঠেকালো রোদেলার নরম গালে। রোদেলার গায়ের মিষ্টি পাউডারের গন্ধটা যেন তার অস্থির মনকে মুহূর্তেই প্রশান্ত করে দিলো। মেয়েটা চলে যেতেই, তূর্ণা পাশের বেঞ্চটায় বসে রোদেলাকে নিজের সামনে দাঁড় করালো সে। অতঃপর অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে ছোট্ট ছোট্ট চুলগুলো আঁচড়াতে শুরু করলো। তার আঙুলের স্পর্শে ছিল অপার মমতা। যেন সে চুল বাঁধছে না, বরং নিজের সমস্ত ভালোবাসা নিঃশব্দে গেঁথে দিচ্ছে প্রতিটি কেশগুচ্ছে। চুল বাঁধতে বাঁধতে অভিমানী গম্ভীর স্বরে বলে-

“ মা ছাড়া আর কারো কাছে চুল বাঁধবে না পুতুল।তোমার সব কিছু শুধু আমি করবো। আমি তোমার মা হই, তাই আমার পুতুলের সব আমার।”
রোদেলা অস্থির হয়ে নড়াচড়া করে উঠলো।
“ আআহ… লাগতাছে…”
তূর্ণা সঙ্গে সঙ্গে কোমল হয়ে গেলো।
“ আচ্ছা আচ্ছা, আর টানবো না। আমার পুতুল কাঁদবে না।”
শিশুটি ঠোঁট ফুলিয়ে বললো-
“ তুনি কই তিলা না? আনাল তুল ধলে ওই মেয়ে, আমাল তুল তুনি ধলবা, আনু কেউ না।”
তূর্ণার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। এই ছোট্ট অধিকারবোধ, এই নির্ভরতা সবকিছু কেমন না চাইতেও তূর্ণার ভালো লাগে। সে এখনো বুঝেই রোদেলা তার মেয়ে নয়, তার রক্ত। সে শুধু এতটুকুই বোঝে রোদেলার তার পুতুল। আর সে সেই পুতুলের মা, সৎ-আপন এইসবের মানে জানা নেই তার।
চুল বাঁধা শেষ করে তূর্ণা আলতো করে রোদেলার কপালে চুমু খেলো।

“ হয়ে গেছে। এখন আমার পুতুলকে রাজকন্যার মতো লাগছে।”
রোদেলা হাসতে হাসতে দুই হাত দিয়ে নিজের চুল ছুঁয়ে বললো-
“ আমি পিচ্ছেচ্ছি?”
তূর্ণা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বললো-
“ না, তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পুতুল।”
বলেই রোদেলাকে কোলে তুলে বাড়ির ভিতরে চলে যায়। রুমে দিয়ে একদম দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে, আর কাউকে দিবে রোদেলাকে এখন।

সময় বারার সঙ্গে সঙ্গে রাত্রিরও যেনো বেড়ে চলেছে পাল্লা দিয়ে। ঘড়ির কাটায় এখন রাত একটার বেশি বাজে। ছাদে হলুদের অনুষ্ঠান করা হবে দেখে ছাদটা সাজাচ্ছিল লোকেরা। সেটাই দেখছিল রৌদ্রিক, বিয়ের বাড়ির কাজ এই প্রথম করছে সে। ইচ্ছে করেই তাকে এইসবে বাজিয়ে দিয়েছে যাতে হসপিটালে সে যেতে না পারে। বাকিটুকু কালকে করলেই হয়ে যাবে, কাঁচা ফুল দিয়ে গায়ে হদুলের দিন সাজিয়ে দিলেই হয়ে যাবে। রৌদ্রিক ফিরতি পথেই যাচ্ছিল, তখনই সেখানে শ্রাবণ উপস্থিত হয়।
“ কেমন চলছে দিন-কাল? তোমার তো দেখাই পাওয়া যায় না।”
শ্রাবণের কথা শুনে রৌদ্রিক হালকা স্বরে বলে-

“ জানিস কেমন যায়, তেমনিই যাচ্ছে। তোরটা বল।”
“ আমার আরকি, দেখছোই তো সব।”
রৌদ্রিক শ্রাবণের তিন বছরের বড়। কর্মজীবনে বস্ত হওয়ায় আগের মত ভাইদের মাঝে তেমন কথা সাক্ষাৎ হয়না। রৌদ্রিক আর শ্রাবণের সম্পর্ক বন্ধুর মত, শ্রাবণ আকাশ পানে চেয়ে বলে-
“ তূর্ণা ভাবিকে ভালোবাসো? নাকি আগের মতই নিজের অনুভূতিকে লুকিয়ে রেখেছো?”
রৌদ্রিক কিছুখন নীরব থাকলো। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে-
“ মুখে ভালোবাসি বললেই কি ভালোবাসা হয়? এছাড়া কি ভালোবাসা হয় না?”
“ উম, সেটা নয়। তুমি মানুষটা ওমন চাপা, নিজের ভালো লাগা, খারাপ লাগা কোনোটাই প্রকায় কর না। দেখ এরজন্য প্রীয়তি ভাবিও নির্দয়ের মত চলে গেলো।”

“ যে পাখি থাকার সে হাজার বারণেও থেকে যায়। প্রীয়তি থাকতে চায়নি সেটা ওর একান্তই নিজের মতামত। কাউকে নিজের সঙ্গে রাখার জন্য আমরা জোর করার কেউ নই।”
“ তূর্ণা ভাবিও যদি যেতে চায় ওকে যেতে দিবে?”
কিছুখন থমকালো রৌদ্রিক, উত্তর হয়তো নিজের মধ্যে খুঁজলো কিন্তু পেলো না মন মত। শ্রাবণ হালকা হাসলো, শ্রাবণ হেসে রৌদ্রিকের মুখপানে চেয়ে বলে-
“ জানো কি, প্রীয়তি তোমার স্ত্রী হলেও তোমার সেই ভালোবাসা হতে পারেনি, যা হওয়ার কথা ছিল। আমি জানি যেটাকে একবার তোমার মনে জায়গা করে নেয়, সেই জিনিস কিংবা মানুষকে তুমি নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলো না। বরং শক্ত করে আঁকড়ে ধরো, কিন্তু প্রীয়তির ক্ষেতে সেটা তুমি করনি। কারণটা তোমারও অজানা নয়। একই ভাবে যদি বলি তূর্ণার কথা, তুমি ওকে ছাড়তে পারবে না। ও চাইলেও না, সময় নিচ্ছো নাও কিন্তু দেরি কর না কিন্তু।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৫

“ বড্ড কথা শিখেছিস দেখছি। ইরাকে ভালোবাসি তাই না? কতদিন হয়?”
রৌদ্রিকের কথা এবার শ্রাবণ চুপ হয়ে গেলো। কিছুখন ভেবে উত্তর দিলো।
“ ভালোবাসি কিনা জানি না, বাট কিছু একটা আছে।”
“ কিছু একটা না ভালোবাসাই আছে। বিয়ে করে সংসার পাত আর চাচ্চু বানা জলদি।”
“ উমম, চাচ্চু তো আমার হওয়ার কথা সেকেন্ড টাইম।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৭