অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৮
ফাহিমা ইসলাম
রজনী আজ যেন কৃষ্ণবর্ণ মখমলের বিস্তীর্ণ চাদর মেলে আকাশময় আধিপত্য বিস্তার করেছে। দূরবর্তী নক্ষত্ররাজি ক্ষুদ্র হীরকখণ্ডের ন্যায় জ্বলজ্বল করছে সেই অন্ধকারের বুকে। রৌদ্রিক তার বন্ধুর বোনের বিবাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছে তূর্ণা এবং রোদেলাকে নিয়ে। উৎসবমুখর আলোকসজ্জার মধ্যেও তূর্ণাকে দেখেই যেন দৃষ্টি থমকে যেতে বাধ্য! গোলাপি বর্ণের মসৃণ শাড়িটা তার দেহাবয়ব জড়িয়ে এমনভাবে নেমে এসেছে, যেন কোনো স্বর্গীয় শিল্পী নিজ হাতে সন্ধ্যাতারার আভা বুনে তাকে অলংকৃত করেছে। শাড়ির রূপালি জরির কারুকাজ আলো পড়লেই ক্ষুদ্র নক্ষত্রের মতো ঝিলমিল করে উঠছে। কপালে ক্ষুদ্র গোলাপি টিপ, চোখের পাতায় হালকা আভা, আর ঠোঁটে অনুচ্চারিত এক শিশুসুলভ হাসি,সব মিলিয়ে তাকে অপার্থিব লাগছে। তার মুখশ্রীতে এমন এক মায়াময় কোমলতা বিদ্যমান, যা ভাষায় বর্ণনা করা দুরূহ। যেন ভোরের প্রথম শিশিরবিন্দু, অথবা দীর্ঘ খরার পর প্রথম বৃষ্টির স্নিগ্ধতা। রোদেলা চুপটি করে বাবার কোলে থেকে চারিদিকে উচ্ছ্বাস ভড়া নয়নে চেয়ে আছে। রোদেলাও একই রঙের ফ্রক-স্টাইলের পোশাকে সজ্জিত। ছোট্ট চুলে গোলাপি ফিতায় বাঁধা। তাকে দেখে মনে হচ্ছে গোলাপি তুলোর তৈরি কোনো ক্ষুদ্র পরী ভুল করে মানবলোকে চলে এসেছে।
বিয়ের মঞ্চের দিকে যেতে যেতে রোদেলা হঠাৎ রৌদ্রিকের কোল থেকে নেমে পরলো। এক হাত এবং তূর্ণার আরেক হাত শক্ত করে ধরে ফেললো।
“ তুলমা আমাল দুউ পাতে থাকো। আনি মাতখানে থাকবু।”
“ অনেক গরম রোদ, ওইদিকে যেতে হেঁটো।”
“ না, আনি তো লাতকুমালি। তাই মাতখানে থাতবু।”
তূর্ণা সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লো।
“ হ্যাঁ। ও রাজকুমারী।”
রৌদ্রিক দু’জনের দিকে তাকিয়ে অসহায় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। অথচ তার ঠোঁটের কোণে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠলো। তাই আর না করলো না, রোদেলা পা নাচিয়ে নাচিয়ে বাবা-মায়ের মাঝখানে হাঁটছে হাসিমুখে। রৌদ্রিক তাদের নিয়ে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো। এই প্রথম তূর্ণাকে নিয়ে বাহিরে এত জনবহুল পরিবেশে এসেছে, এটা তূর্ণার জন্য ভালো। সব পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। তূর্ণার নজর হুট করে দূরে একটা বাচ্চা মেয়ের দিকে গেলো, যেকিনা রোদেলার দিকে তাকিয়ে মুখের অঙ্গভঙ্গি দ্বারা রোদেলাকে ক্ষেপানোর চেষ্টা করছে। রোদেলার মেয়েটাকে দেখেও না দেখার ভান করছে, তবুও বার বার মেয়েটা রোদেলাকে ভেঙিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ তূর্ণা বসা থেকে উঠে পরে রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ আপনি একটু বসুন আমি আসচ্ছি।”
কথা শেষ হওয়া মাত্রই রৌদ্রিকের উত্তরের অপেক্ষা না করে, রোদেলার হাত নিজের মুঠোবন্দি করে নিয়ে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যায়। রোদেলা আর তূর্ণাকে এগিয়ে আসতে দেখে৷ মেয়েটা ভয় পেয়ে যায়। তূর্ণা একদম মেয়েটার মুঝ বরাবর যেয়ে দাঁড়ায়, তূর্ণা হাসি মুখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ সমস্যা কি হুম? এমন করছো কেনো বাবু?”
তূর্ণার কথায় মেয়েটা আর একবার রোদেলার দিকে তাকালো, আর একবার তূর্ণার দিকে। মেয়েটাকে কিছু বলতে না দেখে তূর্ণা আবারও বলে-
“ এমনটা আর করবে না। মানুষ পঁচা বলবে।”
“ আমি করবো, তাতে তোমার কি হুম?”
মেয়েটার কথা শুনে হাসলো, তারপর আস্তে করে মেয়েটার নাকে টিপ দিয়ে বলে-
“ কার সাথে করবে করিও বাবু, কিন্তু আমার মেয়ের সঙ্গে এমন করলে খবর করে ছাড়বো। দেখেছো আমার পুতুলকে, তুমি বিরক্ত করার পরও তোমাকে কিছু করেনি। তাই আমার মেয়ের সাথে এইসব করা থেকে দূরে থাকো বাবু। এমনটদ না করলে আদর করতাম, কিন্তু এখন আর করবো না।”
বলেই রোদেলার হাত ধরে আবারও রৌদ্রিকের কাছে ফিরে আসে। রৌদ্রিক চুপচাপ দূর থেকে দুইজনের কান্ড দেখছিলো। রোদেলা তো বিজয়ের হাসি দিয়ে এগিয়ে আসচ্ছে।
“ মা-মেয়ে কি করে এলে?”
“ কিছু না, বাড়িতে কখন যাবাে আমরা?”
“ কেনো কিছু হয়েছে? ভালো লাগছে না।”
“ না এমনি চলুন, থাকবো না আর।”
রৌদ্রিক আর ঘাটল না। রোদেলাকে কোলে তুলে সবার থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। এরমাঝে রোদেলা আর তূর্ণা ফিসফিসে কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পরেছে, বেশ অনেকটা পথ যেতে হবে। রৌদ্রিক এসির পাওয়ারটা কমিয়ে দিলো। আস্তে-ধীরে ড্রাইভ করছে, যাতে সমস্যা না হয়।
আস্তে করে রোদেলাকে মাঝখানে শুইয়ে দিয়ে আবারও বাহিরে চলে যায় রৌদ্রিক। আসতে আসতে প্রায় রাত এগারোটা বাজে গেছে। গাড়ির কাছে আবারও ফিরে এসে তূর্ণাকে জাগাতে চাইলো, তবে ইচ্ছে করলো না। তাই হাত বাড়িয়ে এলোমেলো হাতে পাঁজ কোল তুলো নিলো। তূর্ণার সারা মুখশ্রীতে অবাধ্য ভাবে ছড়িয়ে থাকা ছোট্ট কেশরাশিগুলো সারা মুখশ্রী দখল করে নিয়েছে, গভীর নিদ্রায় মগ্ন। এখন সবাই সবার কক্ষে, তাই নিশ্চিন্তে এইভাবে নিয়ে। তার প্রথম সাক্ষাৎ এর কথা মনে পরে গেলো, নিষ্পাপ,ভয়ার্ত দৃষ্টিতে মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে ছিলো। জীবনের বাকিটা পথ একসঙ্গে চলবে কিনা সেটাও জানা ছিলনা, কথাও ছিল দূর্গম পথের সঙ্গী হবে। অথচ আজকে মেয়েটা তার জীবনের বড় একটা অংশ হয়ে উঠেছে। না চাইতেও নিজের তালাবদ্ধ হৃদয়কোণে জায়গা করে নিয়েছে মেয়েটা। রৌদ্রিক তূর্ণা নিদ্রা মগ্ন মুখশ্রী পানে চেয়ে, শান্ত স্বরে বিরবিরে বলে-
“ কথা ছিল শুধুই দুর্গম পথের সঙ্গী হবো। ভালোবাসা থাকবে নাকি না সেই পথে সেটার নিশ্চয়তা ছিলনা। অথচ দেখো নিজের কথা নিজেই রক্ষা করতে পারলাম না।”
কক্ষে নিয়ে গিয়ে রোদেলা আর তূর্ণাকে পাশাপাশি শুইয়ে দিয়ে। রৌদ্রিক একে একে তূর্ণার গা থেকে সাজসজ্জার জিনিস খুলে দিয়ে, রোদেলার গায়ের ভাড়ি জামা পাল্টে দিয়ে, পাতলা জামা পরিয়ে দেয়। রোদেলা তূর্ণার গায়ের গন্ধ পেয়ে বিড়াল ছানার মত ছিটিয়ে যায় তূর্ণা বক্ষপটে। রৌদ্রিক নিজেও ফ্রেশ হয়ে লাইট অফ করে, দু’টো মানুষকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে নিজেও নিদ্রায় মগ্ন হয়ে যায়।
“ আপনি কেনো করছেন আমার সাথে এইসব?”
“ কিসব করেছি?”
গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করে রূপা, রূপা রাগ বাড়লো। এত কিছু করে বলছে কি করেছি?
“ কি করেছেন জানেন না? বউ যেহেতু মানেন না তাহলে এই সম্পর্ক এমন ঝুলিয়ে রেখেছেন কেনো?”
“ মাই উইস।”
“ আপনার ইচ্ছে মানে! আমাকে কি কোনো পণ্য পেয়েছেন, যে কিনে এনে ঘরের এককোণে ফেলে রেখে দিবেন। আর আমি থাকবো!”
“ আপনাকে তো আমি ঘরের এক কোণে থাকতে বলিনি। যেখানে ইচ্ছে সেখানে থাকুন।”
গম্ভীর স্বরে কথাটুকু বলে আবারও চুপ হয়ে যায় তূর্য। রূপা রাগ তরতর করে বেড়ে গেলো তূর্যের এমন ঘাড়ত্যাড়ামি কথা শুনে।
অবেলার প্রণয়ভেলা ঈদ স্পেশাল
“ আমি থাকবো না আপনার সঙ্গে। যে সম্পর্কের কোনো গতি নেই, সেখানে থাকার কোনো মানে নেই।”
“ আপনি থাকতে বাধ্য মিসেস তূর্য। বিকজ ইউ’র মাইন এন্ড আমার নিলামে একবার কিছু লিখা হয়ে গেলে, সেটার মুক্তি আমি চাওয়া ব্যতীত সম্ভব নয়।”
