অবেলার প্রণয়ভেলা শেষ পর্ব
ফাহিমা ইসলাম
ঋতুচক্রের অনিবার্য আবর্তনে আরেকটি ফাগুন এসে নীরবে বসতি গড়েছে ধরিত্রীর বুকে। শীতের জীর্ণ, বিবর্ণ আবরণ ঝরিয়ে প্রকৃতি যেন নবজীবনের সবুজ অলংকারে নিজেকে পুনর্জন্ম দিয়েছে। কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম উল্লাস, শিমুলের দহনরাঙা পাপড়ি আর কোকিলের পঞ্চম স্বরের গোপন আহ্বানে চারদিক যেন ঘোষণা করে উঠে-“সময়ের সমস্ত ক্ষত একদিন না একদিন বসন্তেরই হাতে নিরাময় লাভ করে।” কালস্রোত থেমে থাকে না। সে আপন গতিতে মানুষকে ভাঙে, গড়ে, শূন্য করে আবার পূর্ণও করে। সেই অনিবার্য সময়ের সোপান বেয়ে তূর্ণা আর রৌদ্রিকের জীবনও ধীরে ধীরে এমন এক প্রশান্ত অধ্যায়ে উপনীত হচ্ছে, যার জন্য হয়তো একসময় তূর্ণা কল্পনাও করেনি। যে দিনগুলো একসময় তূর্ণার কাছে ছিল অন্তহীন অন্ধকার, আজ সেই দিনগুলোর স্মৃতিও যেনো ঝাপসা কুয়াশার আড়ালে বিলীন হয়ে গেছে।
একদা যে মেয়েটা মানসিক ভারসাম্যহীনতার কলঙ্কিত অভিধায় সমাজ সহ নিজে পরিবারের নিকট নির্মম অবহেলা, বিদ্রূপ আর ঘৃণার বোঝা বয়ে বেড়াত, যে হৃদয় ভালোবাসার পরিবর্তে বারবার প্রত্যাখ্যানের বিষপাত্র পান করেছিল। আজ সেই তূর্ণাই যেনো ভাগ্যের পুনর্লিখিত উপাখ্যান। নিয়তির নির্মম কলম একদিন তার জীবনের প্রতিটি পৃষ্ঠায় দুঃখের কালিমা মেখে দিয়েছিল বটে, কিন্তু আল্লাহ বোধহয় শেষ অধ্যায়টি লিখতে বসে একটু থমকে গিয়েছিলেন। তাই তো রৌদ্রিকের মতো একজন মানুষকে তিনি পাঠিয়েছিলেন তূর্ণার জীবনে। যে তূর্ণাকপ তূর্ণার মতো করেই গ্রহণ করবে; তার ক্রটিগুলোকে সরিয়ে তূর্ণার আসল সত্ত্বকে আপন করবে।
রৌদ্রিক কখনো তূর্ণার অপূর্ণতাকে তার পরিচয় হতে দেয়নি। সমাজ যেখানে তূর্ণার ভাঙা সত্তাকে আঙুল তুলে দেখিয়েছে, সেখানে রৌদ্রিক সেই ভাঙা অংশগুলো দু’হাতে জোড়া লাগিয়েছে একটু একটু করে। সে কখনো করুণা করেনি তূর্ণাকে, বরং সম্মান দিয়েছে; কখনো দূরে সরিয়ে দেয়নি, বরং বুকের আরও গভীরে স্থান করে দিয়েছে তূর্ণার জন্য। তূর্ণার প্রতিটি অস্থির প্রহরে পাশে সে ছিল অবিচল প্রহরীর মতো, প্রতিটি অকারণ ভয়কে নিজের প্রশস্ত বুকে আশ্রয় দিয়ে নিঃশেষ করেছে। তার কাছে তূর্ণা কোনো দায় ছিল না, কোনো বোঝাও ছিল না; সে ছিল তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় আশ্রয়, সবচেয়ে নির্মল,পবিত্র সত্ত্বা।
সংসারটা রৌদ্রিক একা হাতে শুরু করলেও আজ সেই সংসার পূর্ণতার অপার্থিব আভায় আলোকিত। বিশাল বাড়ির প্রতিটি ইট-পাথরে জমে আছে তাদের হাসির প্রতিধ্বনি, প্রতিটি জানালায় ভেসে বেড়ায় সন্তানের কোলাহল, প্রতিটি ভোর শুরু হয় ছোট ছোট পায়ের টুপটাপ শব্দে, আর প্রতিটি রাত শেষ হয় এক ছাদের নিচে পরম নিশ্চিন্ততার নিঃশ্বাসে। তূর্ণা কখনো কখনো নীরবে বসে চারপাশে তাকিয়ে থাকে। মনে হয় এ কি সত্যিই তার জীবন? নাকি বহু বছরের কান্নার শেষে পাওয়া কোনো দীর্ঘ স্বপ্ন? না সে আর আগের মতো স্বপ্ন দেখে না, কারণ তার জীবনটা স্বপ্নের থেকেও বহুগুণ রঙিন। যেখানে মরিচীকার কোনো চিহ্ন নেই, নেই কোনো আক্ষেপ। রৌদ্রিক যেন কেবল একজন স্বামী নয়, বরং এক সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রাপ্ত অবিনাশী নিরাপত্তার অপর নাম। মানুষটির ভালোবাসা কখনো তূর্ণার অপূর্ণতাকে বিচার করেনি, বরং যত্ন নিয়ে আগলে নিয়েছে। কখনো তার অতীতের ক্ষত নিয়ে বিদ্রূপ করেনি, কখনো মানসিক ভঙ্গুরতাকে অবজ্ঞার কারণ বানায়নি। বরং প্রতিটি দুঃসহ রাতের শেষে তার হাতে হাত রেখে নিঃশব্দে বুঝিয়ে দিয়েছে “তুমি একা নও তূর্ণা, কোনোদিনও থাকবে না।”
রোদেলাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় হয়ে উঠছে। চার বছরের ছোট্ট মেয়েটা এখন নিয়মিত স্কুলে যায়। বাবার হাত ধরে, ক্ষুদ্র দুটি কাঁধে রঙিন ব্যাগ ঝুলিয়ে, দুই পাশে সুন্দর করে বাঁধা চুলে ফিতে পরে, সে যখন টুপটাপ পায়ে দরজার দিকে এগোয়, তখন মনে হয় যেনো বসন্তেরই কোনো ছোট্ট পরী পৃথিবীর বুকে হাঁটতে শিখেছে। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে নিশ্বাস ফেলারও ফুরসত না নিয়ে এক নিঃশ্বাসে বলে যায়। তার গল্পের ঝুড়ি বরাবরই বাড়ির জন্য তৈরি থাকে। তাই বাড়ি ফেরা মাত্রই পাখির মতো কিচিরমিচির করে,আজ ম্যাডাম কী শিখিয়েছেন, কোন বন্ধুর সঙ্গে খেলেছে, কে তার পাশে বসেছে, কে নিজের টিফিন ভাগ করে খাইয়েছে। তার নিষ্পাপ কথার ঝর্ণাধারায় তূর্ণার ক্লান্ত বিকেলগুলো মুহূর্তেই রঙিন হয়ে ওঠে। তার আর তার পুতুলের গল্প যেনো শেষ হওয়ার নয়, প্রতিদিন নতুন করে এই মানুষগুলের জন্য বাঁচে।
অন্যদিকে রোদ্দুর আর রোদেশীও এক বছরে পা দিয়েছে, তারাও ধীরে ধীরে নিজেদের ক্ষুদ্র জগৎটাকে আবিষ্কার করতে শিখেছে। টলমল দুটি পা ফেলে হাঁটার চেষ্টায় কখনো মেঝেতে বসে পড়ে, আবার অট্টহাসিতে নিজেই নিজের ব্যর্থতাকে ভুলে যায়। কখনো দু’জনে হামাগুড়ি দিয়ে প্রতিযোগিতায় নামে কে আগে বাবার কাছে পৌঁছাবে। রৌদ্রিক তখন দু’হাত প্রসারিত করে বসে থাকে, আর দুটি ছোট্ট প্রাণ প্রাণপণে বাবার বুকে পৌঁছানোর জন্য হাসতে হাসতে এগিয়ে আসে। শেষমেশ একজন পৌঁছালেই আরেকজন ঠোঁট ফুলিয়ে প্রতিবাদ জানায়, সেই দৃশ্য দেখে তূর্ণার হাসি যেন বসন্তের বাতাসের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। রোদেশীর অভ্যাস হয়েছে বাবার আঙুল শক্ত করে ধরে ঘুমিয়ে পড়া, আর রোদ্দুর সুযোগ পেলেই মায়ের ওড়না মুখে পুরে গম্ভীর মুখে দাঁত বসানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। তাদের অস্পষ্ট আধো আধো উচ্চারণে উচ্চারিত “মাম্মা”, “আপ” শব্দদুটি যেন তূর্ণা আর রৌদ্রিকের জীবনের সমস্ত ক্লান্তি এক নিমিষেই ধুয়ে নিয়ে যায়। তবে এখনো রৌদ্রিকে পাপা বলে ডাকেনি, এই আফসোস অবশ্য রৌদ্রিকের রয়েছে। তবুও সে অপেক্ষায় আছে কবে এই দুইজনের মুখ থেকে ‘পাপা’ শব্দটা শুনবে। আর সবচেয়ে অপার্থিব দৃশ্যটি সৃষ্টি হয় সন্ধ্যার পর। রোদেলা নিজের ছোট্ট দায়িত্ববোধ নিয়ে দুই ভাইবোনের কাছে এসে বসে। কখনো গল্পের বই খুলে অক্ষর না জেনেই ছবির দিকে তাকিয়ে গল্প বানিয়ে শোনায়, কখনো ছোট্ট খেলনা এগিয়ে দিয়ে বলে, “এটা তোমাদের। জগরা করা যাবে না কিন্তু!” রোদ্দুর হাততালি দেয়, রোদেশী খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে, আর মুহূর্তের মধ্যেই তিন ভাইবোনের হাসির রোল পুরো ঘরটাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। রোদেলা এই সময়টা স্কুল টিচারের মতো করে ওদের বই নিয়ে গল্প বানিয়ে বানিয়ে বলে। আর সেইগুলে দু’টো কিছু না বুঝলেও বোনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে, তারপর এমন একখামা ভান করবে যেনো তারা সব বুঝে।
কখনো কখনো তিনজনকে নিয়ে রৌদ্রিক বাগানে সাবানের বুদবুদ উড়িয়ে দেয়। অসংখ্য রঙিন বুদবুদ বাতাসে ভেসে উঠতেই রোদেলা সেগুলো ধরতে ছোটে, রোদ্দুর দু’হাত তুলে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে, আর রোদেশী বাবার কোলেই বসে খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে আকাশের দিকে হাত বাড়ায়।
তূর্ণা তখন নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। একসময় সে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ বলতে কেবল অন্ধকারই কল্পনা করত, আজ তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার সমগ্র পৃথিবী একজন আদর্শ স্বামী, তিনটি সুন্দর সন্তান, আর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ একটা সংসার। নিয়তি বহুবার তাকে ভেঙেছে, কিন্তু শেষপর্যন্ত ভালোবাসাই তাকে নতুন করে নির্মাণ করেছে।
তূর্ণা রোদেলাকে স্কুল থেকে আনতে গেছে। আপাতত রোদ্দুর আর রোদেশী রুমা সিকদারের সঙ্গে রয়েছে, দু’জনই খেলায় মগ্ন তাদের মতো। রোদেশী খানিকক্ষণ আগেই ঘুম থেকে উঠেছে তাই তার আর ঘুমানোর তাড়া নেই। কিছুখন পর সেখানে রৌদ্রিক ফোন করলো, বেশ কয়েকটা পর পর সার্জারি থাকায় একদম ভোর রাতে বের হয়েছে। আজকে রোদেলাও স্কুলে দিয়ে আসতে পারেনি, তূর্ণাই দিয়ে এসেছে। সামনে থাকা আইপ্যাডে একবার ফোন দিতেই রুমা সিকদার ফোনটা তুললেন। রুমা সিকদার হাসি মুখে জিজ্ঞেস করে-
“ খেয়েছিস কিছু হসপিটালে? নাকি না খেয়েই আছিস?”
রৌদ্রিক হালকা হেসে শান্ত স্বরে বলে-
“ এই তো খেলাম, ওরা কোথায়?”
রুমা সিকদার ফোনটা রোদ্দুর আর রোদেশীর সামনে রাখলেন। রোদেশী নিজের মতো বসে খেলছে, রোদ্দুর খেলছে কম ছোড়াছুড়ি করছে বেশি। রৌদ্রিক আবারও জিজ্ঞেস করে-
“ তূর্ণা আর রোদ এখনো আসেনি?”
“ না, বললো আজকে একটু দেরি হবে। ওদের মা-মেয়ের কি জানি কাজ আছে।”
রৌদ্রিক আর কিছু বললো না, রৌদ্রিক স্ক্রিনে তাকিয়ে রোদ্দুর আর রোদেশীকে ডেকে ওঠে-
“ এই দুষ্টু দুটো এইদিকে তাকাও।”
রোদেশী বাবার কণ্ঠ পাওয়া মাত্রই সেদিকে তাকালো। মুহুর্তেই তার মুখে হাসির ভরাট হলো, হাসলে একদম রৌদ্রিকের মতো টোল পরে দুই পাশেই। তার জন্য বাচ্চাটাকে হাসলে অসম্ভব রকমের সুন্দর লাগে, সামনের উপর-নিচে দাত গজিয়েছে যার কারণে আরও সুন্দর লাগে হাসলে। রোদ্দুরও একই রকম খালি তার বাবার মতো টোল পরে না। রোদেশীর চুলগুলো অনেকটা কোঁকড়ালো যার কারণে ঝাঁকড়া চুলগুলো আরও সুন্দর লাগে গোলগাল আদুরে মুখশ্রীতে। রোদ্দুর হয়েছে একদম রোদেলা আর তূর্ণার মতো চঞ্চল প্রকৃতির, রোদেলাও এতোদ দুষ্টু ছিল না যতটা রোদ্দুর৷ হাতের কাছে যা পাবে সেটা ফেলে দিবে, সেই সঙ্গে সুযোগ পেলেই রোদেশীর চুলে টান দিবে দিয়েই এমন একখানা নিষ্পাপ মাখা হাসি দিবে যেনো সে কিছুই করেনি। তার মতো নিষ্পাপ বাচ্চা আর আছে কেউ? এমন হয়েছে রোদেশীর গায়ে নখ বসিয়ে দিয়েছে, এরপর শুরু হয়ে যায় রোদেশীর কান্না। সেটা দেখে রোদ্দুর হেসে ওঠে, বোনকে কাঁদিয়ে সে ভারি মজা পেয়েছে যেনো। রোদেশ হামাগুড়ি দিয়ে ফোনের স্ক্রিনের কাছে এসে বসলো তারপর হাত বাড়িয়ে ফোনের ওইপাশে থাকা রৌদ্রিকে ধরার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। সেটা দেখে রুমা সিকদার হেসে বলেন-
“ বাবা এখানে নেই দিদুভাই, বাবাকে ডাক দিয়ে আসতে বল যে তাড়াতাড়ি আসো পাপা।”
দাদির কথা অনুযায়ী রোদেশী হাত নাড়ি নাড়িয়ে বলে ওঠে-
“ আ..আত..আত..আই!”
রৌদ্রিক হাসলো খানিকটা।
“ আসবো তো মা, কাজ শেষ করেই একদম আমার বাচ্চাগুলোর কাছে চলে আসবো। ওই দুষ্টুটা কি এখনো শোনেনি?”
রৌদ্রিকের কথা শুনে রুমা সিকদার রোদ্দুরকে রোদেশীর পাশে বসালো, তার হাতে আপাতত একখান গাড়ি রয়েছে একদম মিনি সাইজের সেটার সঙ্গেই তার যুদ্ধ চলছে। রৌদ্রিক ছেলের পানে চেয়ে বলে-
“ এইদিকে তাকাও তো তূর্ণ।”
রৌদ্রিকের কণ্ঠস্বর পেয়ে এবার তাকালো সে, রৌদ্রিকে দেখা মাত্রই রোদ্দুরের দাফর উঠে গেলো। সে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে রৌদ্রিক ধরার চেষ্টা করলো, তবে লাভ হলো না বিশেষ। এই সময়টাতে বাহিরে থাকলে রৌদ্রিক তিনজনের সঙ্গেই কথা বলে ফোনে। এইসময়ে তূর্ণা রোদেলাও নিয়ে আসে। রোদেশী তার হাতে থাকা পুতুলটা মুখে ঢুকিয়েছে, সেটা নিয়েই ব্যস্ত। এইদিকে রোদ্দুর তার হাতে থাকা খেলনাটা ফেলে সামনে থাকা আইপ্যাডের উপর পরেছে। সেখানটা ধরার চেষ্টা করছে। তার আকাড়ের চেয়ে বড় হওয়ায় কিছুই করতে পারছে না, তারপরও সেটার দিকে তাকিয়ে শব্দ করছে।
“ আইইই..আহ..বা.বা.বাব…আইই!”
রৌদ্রিকও দেখলো, রুমা সিকদার রোদেলাকেও সামনে বসিয়ে দিলো। এতে করে দুইজনই ব্যস্ত হয়ে পরলো ফোনের উপর। দুইজন খেলতে খেলতে হঠাৎ করেই রোদেশী রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে-
” আই..পা..পা..পাপা!”
রৌদ্রিকের মনে হলো সে ভুল শুনলো, কিন্তু না কিছুখন আগে রোদেশী পাপা শব্দটা উচ্চারণ করলো। রোদেশীর দেখাদেখি তাকে ঢেলে রোদ্দুর এগিয়ে এসে সে জোরে বলে ওঠে-
“ প…প..পাপা..পা..পাপা..আইত!”
রৌদ্রিক কিছুখনের জন্য থমকালো হয়তো। রুমা সিকদার হাসলেন, টুকটাক এখন সবাইকে ডাকা শিখেছে তারা, রৌদ্রিকেই খালি ডাকেনি। আর আজকে ডেকে ফেললো। রৌদ্রিক আবাক হয়েই তাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে –
“এই দুষ্টু দু’টো আবার বল পাপা। পাপাকে আর একবার
ডাক দাও!”
কিন্তু তারা শুনলোই না রোদ্দুর আবারও রোদেশীর চুল ধরে টান দিয়ে হেসে দিলো। আর রোদেশী ঠোঁট উল্টালো, শুরু হয়ে গেলো একজনের কান্না অপরজনের হাসি। রুমা সিকদার দ্রুত রোদেশীকে কোলে নিয়ে থামাতে থামতে বলে-
“ ইসস! রোদ্দুর এইভাবে বোনকে কেউ মা’রে?”
কিন্তু তারা শুনলোই না রোদ্দুর আবারও রোদেশীর চুল ধরে টান দিয়ে হেসে দিলো। আর রোদেশী ঠোঁট উল্টালো, শুরু হয়ে গেলো একজনের কান্না অপরজনের হাসি। রুমা সিকদার দ্রুত রোদেশীকে কোলে নিয়ে থামাতে থামতে বলে-
“ ইসস! রোদ্দুর এইভাবে বোনকে কেউ মা’রে?”
বিদ্যালয়ের পাঙ্গনে বাচ্চারা দলবদ্ধ হয়ে খেলায় মেতে আছে। সারা মাঠ জুড়ে বাচ্চাদের কলকলধ্বনিতে মুখরিত। রোদেলাও সবার সঙ্গে খেলছিলো কিছুখন আগেই, কিন্তু এখন সে একা দূরে বসে আছে। কারণ তার হাতে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা নেই, সেটা দিয়ে বাকিরা খেলছে। রোদেলার সব বন্ধুদের হাতে একই রঙের ছোট্ট খেলনাটি দেখে রোদেলার নয়নযুগলে জন্ম নিয়ে এক অবুঝ আকাঙ্ক্ষা। শিশুমন বড়ই অদ্ভুত যে বস্তুটির মূল্য পৃথিবীর কাছে সামান্য, তার কাছেই সেটিই হয়ে ওঠে সমগ্র পৃথিবীর সমান। গতরাতেই তূর্ণার বুকে মুখ গুঁজে সে শতবার বলেছিল-
“মা, কাল কিত্ত এটা আনবে। সবাল আছে, আমারও লাগবে।”
তূর্ণা জানতো না কি আনার কথা বলছে। তবুও সে রোদেলার কপালে চুম্বন এঁকে মৃদুস্বরে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলো-
“আচ্ছা, ইনশাআল্লাহ আনবো আমার পুতুলের জন্য।”
আজ সেই প্রতিশ্রুতির ভার নিয়েই তূর্ণা যখন রোদেলাকে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেওয়ার পর শ্রেণিকক্ষে ঢোকার আগে রোদেলা আবারও তর্জনী তুলে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলো-
“ভুলে যেও না কিত্ত!”
ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসি এঁকে তূর্ণা মাথা নেড়েছিলো। এখন তূর্ণা তার সেই খেলবা আনতে গেছে, রোদেলার কাছে এর থেকেও দামি আর ভালো খেলনা রয়েছে। কিন্তু আপাতত তার কাছে এটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মনে হচ্ছে। নাহলে সবাই একা একা তাকে না নিয়ে খেলছে, কারণ তার এটা নেই তাই তারা তাকে নিবে না খেলায়। ছুটির পর আসার পর তূর্ণা তার ক্লাস টিচারের কাছে রেখে বাহিরে এসেছে খেলনাটা নিতে। বাহিরে ড্রাইভারও রয়েছে। বাহিরে অনেল রোদ তাই রোদেলাকে নেয়নি নিজের সাথে। সময় যেন আজ ইচ্ছে করেই তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
তূর্ণা বাহিরে একা একা কোনোদিন যায়নি, তাই একটু ভয় ভয় লাগছে। চারদিকে গাড়ি চলাচল করছে, আশেপাশের স্কুল ছুটি হওয়ায় জায়গাটাও বেশ ভিড় হয়ে গেছে। তূর্ণা
রাস্তা পার হওয়ার মুহূর্তে আচমকা এক বেপরোয়া মোটরসাইকেল পাশ ঘেঁষে চলে যায়। তূর্ণা ভারসাম্য হারিয়ে রুক্ষ পিচঢালা সড়কে ছিটকে পড়ে সে। হঠাৎ আচমকা এমনটা হওয়ায় নিচে পরে কনুইয়ের চামড়া ছিঁড়ে রক্ত গড়িয়ে পড়লো মুহুর্তেই। হাঁটুর উপরিভাগ ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, কবজিতেও লেগেছে তাই সেখানটায় অসহ্য যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ে। পথচারীরা ছুটে এসে তাকে উঠায়
” হসপাতালে যান।”
বাইক চালক সেখান থেকে দ্রুত বেগে চলে গেছে। তাই কেউ কিছু বলতেও পারেনি, তূর্ণা উঠে কোনো রকমে হাঁটা শুরু করেছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে খানিকটা, তবুও থামলো না।তূর্ণা একবার ঘড়ির দিকে তাকালো । হাঁটতে হাঁটতেই তার মনে পড়ে যায় রোদেলার উজ্জ্বল দুটি চোখ, নিষ্পাপ প্রত্যাশা, আর গতরাতের সেই শতবার বলা অনুরোধ। প্রথমবারের মতো কিছু একটা চেয়ে রোদেলার তার কাছে, সেটাও যদি সে দিতে না পারে কেমন মা সে? রোদেলা তার কাছে কোনোকিছুর বায়না ধরে না এইসব বিষয়ে। প্রথমবারের মতো চেয়েছে এখন যদি না দিতে পারে নিজেরই খারাপ লাগবে। তাছাড়া সেও দেখেছে, বাচ্চাগুলো সেই খেলনা দিয়ে খেলার সময় রোদেলাকে খেলায় নেয় না। তখন রোদেলার সারা মুখশ্রীতে কাল বৈশাখী ঝর নামে। অথচ রোদেলার এর থেকেও শতগুণ দামি আর ভালো খেলনা রয়েছে। তূর্ণা ব্যথায় কাঁপতে থাকা দেহ নিয়েই সে দোকানের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস! সেখানে যাওয়া মাত্রই দোকানদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানায়,
“আপা, একটু আগেই শেষ হয়ে গেছে। পরশুদিন মাল আসলে পাবেন।”
কথাটুকু শোনার পর তূর্ণার বুকের ভেতরটা যেন নিঃশব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তূর্ণা সেখান থেকে বের হয়ে আশেপাশে আরও দোকানে ঘুরলো কিন্তু লাভ হলো না৷ কোথাও নেই, এই দোকানেই খালি ছিলো। তূর্ণা হতাশ হলো।
শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়ে শূন্যহস্তে বিদ্যালয়ের পথেই ফিরতে হলো তাকে। এখন সবাই বাড়িতে চলে যাচ্ছে। গেটের পাশে দাঁড়িয়ে রোদেলা উৎকণ্ঠিত নয়নে মায়ের পথ চেয়ে আছে। তূর্ণাকে একা ফিরতে দেখেই তার দৃষ্টি প্রথমেই ছুটে যায় মায়ের হাতে। কিছুই নেই।পরক্ষণেই ছোট্ট মুখখানি অভিমানে মেঘাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে।
“তুমি আনোনি?”
তূর্ণা ক্লান্ত হাসি টেনে বলে-
“সোনা, অনেক খুঁজেছি। কোথাও পাইনি। কাল সকালে পাপাকে..!”
কথা শেষ করার সুযোগও দিল না রোদেলা।
চোখের কোণে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়ার আগেই সে মুখ ফিরিয়ে নিল।
“না! তুমি খুঁজোনি। তুমি ইচ্চে করেই আনোনি। সবাইয়ের আছে, শুতু আমার নেই।”
শিশুমনের অভিযোগ যুক্তির কাছে মাথা নত করে না; সেখানে অনুভূতিই একমাত্র সত্য।
তূর্ণা ধীরে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। আহত হাঁটুতে নতুন করে ব্যথার ঢেউ উঠলেও মুখে তার কোনো ছাপ ফুটে উঠতে দিল না। রোদেলার ছোট্ট দুটি হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে ফিসফিস করে বলল-
“বিশ্বাস কর পুতুল, মা সত্যিই অনেক খুঁজেছে।”
রোদেলা এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নেয়।
“মিত্তে! তুমি আমাকে ভালবাতো না। ভালবাতলে এনে দিতে।”
বাক্যগুলো ক্ষুদ্র হলেও প্রতিটি শব্দ যেন সূক্ষ্ম কাচের টুকরোর মতো এসে বিদ্ধ হতে লাগল তূর্ণার অন্তরজুড়ে। এই প্রথম হয়তো রোদেলা তাকে এমন কথা বললো, তাই না চাইতেও কান্না পেলো তূর্ণাও। কিন্তু নিজেকে সামলাল, তারপর
সে আবারও রোদেলার এলোমেলো চুলগুলো কানের পাশে গুঁজে দিয়ে কাঁপা স্বরে বলল,
“রাগ করেনা সোনা, কাল আবার নিয়ে দিবো কেমন। যত দোকান লাগে ঘুরবো। না পাওয়া পর্যন্ত ফিরবো না।”
রোদেলা মুখ ঘুরিয়েই রইল।মায়ের দিকে তাকাল না।ছোট্ট বুকটা অভিমানে ফুলে আছে। বাচ্চামন অন্যদের এমন অবহেলা দেখে জেদ ধরেছে৷ তাই শত কথাও তার কাছে মিথ্যা লাগছে। তূর্ণা কনুই বেয়ে এখনও রক্তের সরু রেখা নেমে আসছে, হাঁটুর ক্ষত জ্বালায় সমগ্র শরীর অবশ হয়ে আসছে, কবজির যন্ত্রণায় আঙুল নাড়ানোও দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। অথচ সে নিজের ব্যথার দিকে একবারও দৃষ্টি দিলো।
তার সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে একটিমাত্র মুখে তার অভিমানী পুতুলের মুখে। তূর্ণা কোনো রকমে উঠে, রোদেলাকে কোলে তুলে নিলো। রোদেলা উঠতে চাইলো না, অভিমানে তার গাল বেয়ে অশ্রু ঝড়চ্ছে। তূর্ণা রোদেলাকে নিয়েই গাড়িতে বসতেই গাড়ি ছুটে চললো বাড়ির দিকে। যাওয়ার সময় পুরোটা রোদেলা অন্যদিকে মুখ করে রেখেছে৷ যেখানে রোদেলা পুরো রাস্তা গল্প করতে করতে যায়। তূর্ণা মানানোর চেষ্টা করলেও লাভ হয়নি,তূর্ণা তারপরও রোদেলার জুতাগুলো পা থেকে খুলে দিয়েছে, পানির পটটা এগিয়ে দিলোও সেটা খেলো না রোদেলা।
বাড়ি ফেরার পর রোদেলা সোজা দাদির কাছে চলে গিয়েছে, তূর্ণা হাজারবার ডাকলেও শোনেনি। রোদেলা যেনো আজ এক অচেনা বাচ্চায় পরিণত হয়েছে৷ যাকে তূর্ণা একবার ডাকলেই তার নিকট ছুটে আসতো সেকিনা আজকে তার শতবার ডাকার পরও রোদেলা শোনেনি। জবা সিকদার জিজ্ঞেস করার পরও কিছু বলেনি খালি মুখ ফুলিয়ে বসে ছিলো। তূর্ণা নিজের ঘরে বসে আছে, কা’টা জায়গাগুলোতে এখনো কিছুই লাগায়নি। সেই অবস্থায় বসে আছে, রোদ্দুর আর রোদেশী এখন ঘুম দিয়েছে খেয়ে। কিছুখন পর সেখানে জবা সিকদার উপস্থিত হলেন, তূর্ণাকে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন-
“ কি হয়েছে মা-মেয়ের?”
শ্বাশুড়ির স্বর পেতেই তূর্ণা তার দিকে তাকালো। কেঁদে ফেলবে বলে সে, তার নেত্রকোণে অশ্রু এসে জেমেছে। টোকা দিলেই ঝরে পরবে হয়তো!
“ ও একটা খেলনা চেয়েছিল সেটা পাইনি, তাই রাগ করেছে। কথা বলছেন, আমি নাকি ওকে ভালোবাসি না!”
জবা সিকদার দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
“ এতটুকুতেই কান্না! ও এখন বাচ্চা তাই এইসব বলবেই৷ তাই বলে ওর কথা ধরে তুমিও বসে থাকবে? ও বললো আর তোমার ভালোবাসা কমে গেলো?”
জবা সিকদারের কথায় তূর্ণা মাথা নাড়িয়ে না জানালো।
“ সেটা না, আমি তো আমার পুতুলকে ভালোবাসি, অনেক বাসি।”
“ তাহলে কাঁদছো কেন? ওর মনটা খারাপ হয়েছে সেটা না পেয়ে৷ এমনি ঠিক হয়ে যাবে। ঘুম থেকে উঠলেই ঠিক হয়ে যাবে। হাতে কি হয়েছে?”
কথা বলতে বলতে তার নজর তূর্ণার হাতে গিয়েছে, র’ক্ত শুঁকিয়ে আছে। তূর্ণা নিজের হাতের দিকে তাকালো, হাতের ব্যথাও ফিঁকে লাগছে তার এখন। জবা সিকদার সেভলন আর তুলা এনে কা’টা জায়গাগুলো পরিষ্কার করে সেখানে মেডিসিন দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলো।
“ এইসব কথা ভাবা বন্ধ কর, ওর মন ঠিক হলে এমনি ঠিক হয়ে যাবে। এতটুকুতেই মন খারাপ করলে, বাকি দুইটাও আছে। তাই শক্ত কর নিজেকে৷ এইসব ছোটখাটো বিষয়ে মন খারাপ করে বসে থাকলে সংসার চলে না।”
ব্যস্ত হাতে রোদেলার পছন্দের ফালুদা তৈরি করছে তূর্ণা। এমনি এটা জবা সিকদার নাহয় অন্যরা বানায়, আজকে সে প্রথমবারের মতো বানাচ্ছে। কোলে তার রোদেশী, ঘুম থেকে ওঠার পর অন্যকারো কোলে যেতে চায় না তাই তাকে নিয়েই কাজ করছে। রোদ্দুর সায়রার সঙ্গে খেলছে, বানানো প্রায় শেষ। তূর্ণা কিছুটা দই রোদেশীর মুখের সামনে ধরে। মেয়েটা দই মুখে দেওয়া মাত্রই পুরোটা খেয়ে নিলো, বেশ মজা লেগেছে তার কাছে৷ আবারও খাওয়ার জন্য মুখটা খুললো৷ তূর্ণা আবারও কিছুটা দিলো। রোদেশী খেতে খেতে আনন্দের সঙ্গে মাথা দুলিয়ে ওঠে।
” ম..ম..তা!”
তূর্ণা আর একটু খাইয়ে আর দিলো না, এতো বেশি খাওয়ানোটা ঠিক না। ফালুদার বাটি দিয়ে তূর্ণা জবা সিকদারের ঘরে চলে গেলো। সেখানে রোদেলা বসে বসে কি জানি করছে, তূর্ণা এগিয়ে গিয়ে রোদেলার সামনে বাটিটা রাখলো। তারপর রোদেলার উদ্দেশ্যে বলে-
“ তূর্ণা আজ নিজ হাতে ফালুদা বানিয়েছে, কারো পছন্দ হলে খেতে পারে।”
তূর্ণার কথা শুনে রোদেলা আঁড়চোখে তাকাল সেদিকে। তূর্ণাকে দেখেই আবারও সে মুখ ফুলালো, খেতে ইচ্ছে করছে তার। তূর্ণার গায়ের সঙ্গে গা ঘেঁষে থাকতেও ইচ্ছে করছে। কিন্তু তারও মনটা খারাপ হয়ে আছে, বলতেও পারছে না সে আর রাগ করে নেই। রোদেলা আবারও খাওয়ার জন্য বাটির দিকে যেতে নিলেই তূর্ণা মেয়েকে আটকালো।
“ আর না, খাওয়া যাবে না আর৷”
রোদেলা আবারও তাকালো আঁড়চোখে। গাল ফোলালো, সেটা দেখে তূর্ণা আবারও বলে-
“ খেতে চাইলে খেতে পারে, তূর্ণা কারো মতো রাগ করবো না!”
রোদেলা এবার গাল ফোলালো আরও, দুপুরে করা কাজ গুলো মনে পরতেই তারও খারাপ লাগলো৷ সে কি পঁচা বাচ্চাদের মতো করেছে, তার পাপা জানলেও রাগ করবে যে রোদেলা পঁচা বাচ্চাদের মতো আচরণ করেছে। সে তো বুদ্ধিমতি মেয়ে। তাই সে কান্না করে দিলো, সে যে সারাদিন তূর্ণা কাছ ছাড়া থেকে ভালো থেকেছে তেমন নয়৷ তারও মনটা বার বার বলছিলো তূর্ণার গায়ের সঙ্গে গা ঘেঁষে শুইয়ে থাকতে। তূর্ণা যেভাবে তাকে বুকে নিয়ে আদর করে দেয়, সেই আদর খেতে ইচ্ছে করছিলো৷ কিন্তু তখন অভিমানে যায়নি৷ এখন নিজেই নিজের ওমন পঁচা আচরণে কারণে কষ্ট পাচ্ছে। রোদেলাকে কাঁদতে দেখে তূর্ণা এবার রোদেলাকে বিছানায় বসিয়ে রোদেলাকে কোলে টেনে নিলো। তারপর তার কপালে চুমু দিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে বলে-
” মা কালকে যে করেই হোক ওটা এনে দিবো৷ কাঁদছো কেনো?”
রোদেলা কিছুই বললো না, সে কেঁদে গেল৷ সেটা দেখে রোদেলা তূর্ণাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে-
“আমার নারি ছেড়া সন্তান না হলেও তুমি আমার প্রথম
সন্তান রোদ। কারণ মাতৃত্বের যে অব্যক্ত, অপার্থিব অনুভূতি
তার প্রথম স্পর্শ আমি পেয়েছি তোমার হাত ধরেই।
তোমাকে কি করে ভুলে থাকি পুতুল? মায়ের পছন্দের পুতুল
তার রোদ। রোদকে ছাড়া মা একদম একা। রোদের মতো
কে বুঝে মা’কে? এখনো রাগ মায়ের উপর?”
রোদেলা এবার কেঁদে ফেলবে শব্দ করে, তূর্ণার বুকের সঙ্গে শক্ত করে মিশে গেলো। তূর্ণা রোদেলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, এইদিকে রোদেশী বড় বোনকে কাঁদতে দেখে সেও কেঁদে উঠলো না বুঝেই। সেটা দেখে রোদেলা মাথা তুলে তাকালো বোনের দিকে, তূর্ণা অন্যহাতে রোদেশীকে বুকে টেনে নিলো।
” আপনার আবার কিসের কান্না শুনি? দু’জনই কাঁদো তারপর তোমাদের পাপা এসে আমাকে ধরবে।”
রোদেশী রোদেলার অশ্রুসজল মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে কাঁদছে। রোদেলা এবার তার কান্না থামালো, তারপর হাত বাড়িয়ে রোদেশীর চোখে পানি মুছে দিতে দিতে বলে-
” কাঁতে না, দেখো আমি কাঁতি না।”
তূর্ণা এবার মন খারাপ করে বলে-
“ তার বিগ সিস্টারের মন খারাপ করে আছে দেখে তারও মন খারাপ। সে কি তার মায়ের উপর এখনো রেগে আছে?”
রোদেলা এবার ফট করে বলে ওঠে-
“ না রোদেলা আর রেগে নেই।”
তূর্ণা হাসলো তারপর সামনে থাকা বাটি নিয়ে রোদেলার সামনে ফালুদা তুলে দিয়ে বলে-
“ তাহলে এবার খাও দেখি। আর কাঁদতে হবে না।”
রোদেলা খেয়ে নিলো, রোদেশী রোদেলাকে খেতে দেখে সেও হাত বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলো। সেটা দেখে তূর্ণা হালকা একটু তরল দই আর আইসক্রিম দিলো। আর দিলো না কারণ আইসক্রিম অনেকটা ঠান্ডা, রোদেলা খেতে পারলেও রোদেশী খেতে পারবে না। রোদেলা খেতে খেতে হাসি মুখে বলে ওঠে-
” অন্নেক মতা হয়েছে মা।”
তূর্ণা হাসলো, যাক রাগ পরেছে তার৷ রোদেলা এবার মাথা নিচু করে বলে-
” সরি মা, রোদেলা আর ওমন করবে না! রোদেলা পতা মেয়ে হবেনা!”
” কে বলেছে আমার মেয়ে পঁচা? মা কিছু মনে করেনি,এইসব বাদ দাও। আমার কিছু মনে নেই।”
রোদেলা খুশি হয়ে গেলো, তূর্ণা রোদেলাকে খাওয়াচ্ছে৷ মাঝে মাঝে একটু একটু রোদেশীর মুখেও দিচ্ছে।
রাত্রি এখন আপন নৈঃশব্দ্যের রাজ্য বিস্তার করেছে সমগ্র ধরাধামে। আকাশজোড়া কৃষ্ণাভ মখমলের বুকে অসংখ্য নক্ষত্র যেন বিধাতার হাতে ছিটিয়ে দেওয়া রৌপ্যমুদ্রা।
গৃহের প্রতিটি প্রকোষ্ঠ এখন নিদ্রাদেবীর করুণায় আচ্ছন্ন। রোদেলা, রোদ্দুর, রোদেশী তিনটি কোমল প্রাণই এখন স্বপ্নপুরীর অলিগলিতে হারিয়ে গেছে। তূর্ণা আর রোদেলার অভিমান বহু আগেই গলে জল হয়েছে; মায়ের বুকে মাথা রেখে রোদেলা কেঁদে ক্ষমাও চেয়েছে। তূর্ণা তার কপালে দীর্ঘ চুম্বন এঁকে সমস্ত অভিমান জ্যোৎস্নার মতো গলিয়ে দিয়েছে।
সবাই এখন গভীর নিদ্রামগ্ন, রৌদ্রিক আজকে বেশ কান্ত ছিলো। মানুষটা মুখে নিজের অসুবিধার কথা না বললেও তূর্ণা বোঝে, কক্ষে একখান নীল ড্রিম লাইট জ্বলছে। তূর্ণা চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেও তার চোখে ঘুম নেই, ডান হাঁটুর ক্ষতস্থান দপদপ করে জ্বলছে, কব্জির ভেতরটা যেন অদৃশ্য কেউ ধীরে ধীরে মোচড় দিয়ে যাচ্ছে। একেকবার পাশ ফিরতেই বুকের ভেতর থেকে চাপা নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসছে, অথচ ঠোঁটের ফাঁক গলে একটি গোঙানির শব্দও বেরোতে দিচ্ছে না সে। পাকা রোডে আঘাতের ব্যথা বড্ড পীড়াদায়ক!
আজকের সমস্ত ঘটনা সে রৌদ্রিকের কাছ থেকে গোপন রেখেছে। রৌদ্রিক যদি জানতে পারে, তবে নিজের চেয়ে তাকে নিয়েই বেশি ব্যথিত হবে। তাছাড়া এমন সামান্য বিষয়ও যদি রৌদ্রিক বলে তার চিন্তা বারানোর মানে হয় না৷
এইদিকে রৌদ্রিক তূর্ণার দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে।
হঠাৎ করেই বিছানার একপাশ দুলে উঠল। পরমুহূর্তেই কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই রৌদ্রিক দু’হাতে তূর্ণাকে তুলে নিল নিজের বক্ষে। আচমকা এমন ঘটনায় তূর্ণা ভয়ে কেঁপে উঠল।
“এই! কী করছেন? নামান… সবাই ঘুমিয়ে আছে তো।”
রৌদ্রিক কোনো উত্তর দিল না। তার বাহুবন্ধন আরও দৃঢ় হয়ে উঠল।
“কি করছেন? প্লিজ! যদি কেউ দেখে?”
গভীর, স্থির স্বরে সে শুধু বলল-
” দেখলে দেখুক, আমার বউকে আমি কোলে নিয়েছি ব্যাস!”
তূর্ণার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক আলোড়নে কেঁপে উঠল।
রৌদ্রিক ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে এগিয়ে গেল।
চারদিকে রূপালি জ্যোৎস্না ছড়িয়ে আছে। ছাদের এক কোণে কাঠের দোলনাটা হাওয়ার মৃদু স্পর্শে আপনমনে দুলছে। সেখানে সযত্নে তূর্ণাকে সেই দোলনায় বসিয়ে দিল রৌদ্রিক। নিজেও পাশে বসতেই দোলনাটি ধীরে ধীরে দুলে উঠল।রৌদ্রিক ধীরে তূর্ণার আহত কব্জিটা নিজের দুই হাতের মাঝে তুলে নিল। আঙুলের ডগা দিয়ে ক্ষতস্থানের চারপাশে এতটাই কোমল স্পর্শ বুলিয়ে দিল, যেন ভাঙা কাঁচের ওপর শিশির ছুঁয়ে যাচ্ছে। তারপর ফিসফিসিয়ে বলল-
“এত ব্যথা সহ্য করলে অথচ আমাকে একটা বারও বললে না?”
তূর্ণা মৃদু হাসল।
“সব ব্যথা কি বলে দিতে হয়?”
রৌদ্রিক চোখ তুলে তাকাল। তারপর শান্ত স্বরে বলে-
“না। কিন্তু তোমার ব্যথাগুলো আমার অধিকার। তুমি লুকিয়ে রাখলে আমি নিজেকেই অপরাধী মনে করি।”
তূর্ণার চোখের কোণে অশ্রু চিকচিক করে উঠল।সে ধীরে মাথাটা রৌদ্রিকের কাঁধে রেখে বলল-
” এতটুকু আবার বলা লাগে নাকি?”
রৌদ্রিক মৃদু হেসে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
” এতটুকু না একচিমটি কিছু হলেও আমাকে বলা লাগবে।
রূপালি আলোয় ভিজে থাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে তূর্ণা ফিসফিসিয়ে বলল-
” আপনি একটু বেশি চিন্তা করেন রোদে পাপা।”
” চিন্তার কারণ আছে বলেই চিন্তা করি। আমাকে কিছু বলোনি কেনো?”
” কি বলবো?”
” এই যে রোদেলা খেলনা লাগবে, আর মা মেয়ের যে মান-অভিমান হয়েছিলো।”
তূর্ণা হালকা হেসে বলে-
” আমাদের মা-মেয়ের কথা আপনাকে বলবো কেনো? এখন মা-মেয়ের রাগারাগি হয়েছে সেটা মিটেও গেছে তাহলে আবার আপনাকে বলবো কেনো?”
” সেটা বুঝলাম, আঘাত পেয়েছো সেটা বলোনি কেনো? আর আমাকে ফোন দিয়ে বলতে পারতে রোদের এটা লাগবে, আমি এনে দিতাম।”
” উফ বাবা! আমার মেয়ে আমার কাছে চেয়েছে আপনাকে বলতে যাবো কেনো?”
” তাই নাকি?”
” হুম?”
তূর্ণা এবার আকাশ পানে চেয়ে বলে-
“জানেন, আজ যখন রোদেলা বলেছিল আমি নাকি তাকে ভালোবাসি না… তখন মনে হয়েচ্ছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শাস্তিটা বুঝি পেয়ে গেছি।”
রৌদ্রিক তার আঙুলগুলো নিজের আঙুলের ফাঁকে আটকে দিল।
“এমনি বলেছে ও, মন খারাপ করে থেকো না। বাচ্চার এমনই বলে বাবা-মাকে অভিমান হলে ”
তূর্ণার বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত ক্লান্তি যেন এক নিমিষে গলে গেল। দোলনাটা ধীরে ধীরে দুলতে লাগল।
জ্যোৎস্না নেমে আসচ্ছে তাদের কাঁধে।বাতাস এসে তূর্ণার এলোমেলো কেশরাশি উড়িয়ে দিল। রৌদ্রিক আলতো করে সেগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে তার কর্ণকুহরে কাছে এসে মৃদুস্বরে বলল-
” হ্যাপি বার্থডে মাই ডিয়ার বেটার-হাফ!”
তূর্ণা অবাক হয়ে মাথা তুলে রৌদ্রিকের পানে তাকালো৷ আজকে তার জন্মদিন? সত্যি? তার জানা নেই আজ তার জন্মদিন। তূর্ণা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো৷ সেটা দেখে রৌদ্রিক তূর্ণা ওষ্ঠপুটে ছোট ছোট কয়েকটা চুমু একে দিলো। তারপর আবার বলে-
” বড় হয়ে যাচ্ছো পিচ্চি থেকে।”
তূর্ণার অবাক হয়ে প্রশ্ন করে।
” আ.আপনি কি করে জানলেন আজ আমার জন্মদিন?”
” না জানার কি কথা? আমার ওয়াইফের জন্মদিন, আর আমি জানবো না।”
তূর্ণা আবেগপ্রবণ হয়ে পরলো, রৌদ্রিকের বুকে মাথা এলিয়ে দিয়ে বলে-
” আপনি না এলে আমার কি হবো বর?”
রৌদ্রিক তূর্ণাকে নিজের সৃষ্টি গাঢ় ভাবে মিশিয়ে নিয়ে বলে-
” এরজন্যই আমার আগমন তোমার জীবনে।”
বলতে বলতে রৌদ্রিক তার পকেট থেকে একটা লকেট বের করলো। সেটা তূর্ণার গলায় পরিয়ে দিলো, দেখেই বোঝা যাচ্ছে জিনিটা দামি।
” এটা কি?”
” পেন্ডেন্ট, খুলে দেখো।”
রৌদ্রিকের কথা মতো তূর্ণা পেন্ডেন্টা খুলতেই পাঁচজোড়া হাস্যজ্বল মুখশ্রী চোখে পরলো। ভিতরের ছবিতে তাদের সবাইকে একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে, কিছুদিন আগেই ছবিটা তুলেছিলো তারা বাগানে সপরিবারে।
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৮ (২)
” আপনাকে আমার জীবনে আসার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ আমার পুতুলের বাবা৷ ভালোবাসি আপনাকে খুব!”
বলেই রৌদ্রিকের বক্ষপটে মুখ গুঁজে দিলো, রৌদ্রিক আগলে নিলো অর্ধাঙ্গিনীকে সযত্নে৷ মাথায় ঠোঁট এলিয়ে নরম স্বরে বলে-
” তোমাকেও ধন্যবাদ আমার জীবনের ” অবেলার প্রণয়ভেলা” হয়ে আসার জন্য।”
সমাপ্ত
