অবেলার প্রণয়ভেলা সারপ্রাইজ পর্ব
ফাহিমা ইসলাম
ঋতুচক্রের অনিবার্য আবর্তনে আরেকটি বসন্ত এসে নীরবে বসতি গড়েছে ধরিত্রীর বুকে। শীতের জীর্ণ, বিবর্ণ আবরণ ঝরিয়ে প্রকৃতি যেন নবজীবনের সবুজ অলংকারে নিজেকে পুনর্জন্ম দিয়েছে। শুঁকনো ডাল ছাপিয়ে সবুজে ভড়িয়ে দিয়েছে। ফুলের দহনরাঙা পাপড়ি আর কোকিলের পঞ্চম স্বরের গোপন আহ্বানে চারদিক যেন ঘোষণা করে উঠে-” বসন্ত এসে গেছে, বসন্ত এসে গেছে!” সূর্যি মামা উঠেছে বহুক্ষণ আগেই। চারিদিক থেকে বসন্তের কোকিল ডেকে উঠছে। টিপ টিপ পায়ে, এলোমেলো ছন্দে একদজোড়া কোমড় পা এগিয়ে চলেছে অতি সাবধানে। যেনো কোনো প্রকার শব্দ না হয়, এগিয়ে যেতে যেতে পা দু’টি একটি জায়গায় এসে থামলো। এতপর অতি সাবধানে চারিদিকের তাকিয়ে নিজেকে আড়াল করে নিলো। তারপর জামার নিচে লুকিয়ে থাকা আইসক্রিমের বক্সটা খুলে সেটার দিকে লোভনীয় দৃষ্টি তাক করলো, যেনো বহুদিন পর কোনো ক্ষুধার বিড়াল ছানা খাবার পেয়েছে। অন্য ছোট্ট হাতে থাকা চামুমটা দিয়ে সেই না আইসক্রিমের মাঝে দিলো, এমনি ঢুকে গেলো। খেতে থাকলো মনের আনন্দে, দুই পা মেলে এক কোণে ফ্লোরে বসে নিশ্চিন্তে খাওয়া মগ্ন সে। মাঝে মাঝে মজায় মাথাটুকু নাড়িয়ে নিজের নিরব আনন্দ প্রকাশ করছে। যেই না পাঁচ নাম্বার চামুচটা মুখে তুলতে নিবে ওমনি একজোড়া হাত এসে সেটা আঁটকিয়ে দিলো। খাওয়া বন্ধ করে রোদেলা চট করে দৃষ্টি উপর করতেই রৌদ্রিকের শান্ত,গম্ভীর মুখখানি দৃশ্যমান হলো। ওমনি ভেজা গলাটা শুঁকিয়ে এলো, দৃষ্টি জোড়া নামিয়ে নিল সে।
রৌদ্রিক রোদেলার হাতে থাকা আইসক্রিম সহ চামুচটাও নিয়ে নিলো নিজের কাছে। সেটা দেখে মুখ ফুলালো রোদেলা, কত কষ্ট করে এই জায়গাটা খুঁজে বের করেছিলো৷ অথচ তার পাপা এখানেও খুঁজে নিলো তাকে। সে তো এই সাজসকাল আইসক্রিম খাওয়ার জন্য উঠেছিলো; অথচ রৌদ্রিক তাকে এই ভাবে ধরে নিলো। রৌদ্রিক গম্ভীর চোখে মেয়ের পানে চেয়ে বলে ওঠে-
“আগামী এক মাস আর কোনো আইসক্রিম খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ তোমার।”
রৌদ্রিকের এমন কথা শোনা মাত্র রোদেলা বিস্মিত হয়ে চাইলো রৌদ্রিকের পানে। তারপর অভিমান ভার করলো তার গোটা মুখশ্রী জুড়ে, নাকটা ফুলে উঠলো অভিমানে। এই বুঝি কেঁদে দিবে সে; নিষ্ঠুর বাবার পানে চেয়ে বলে ওঠে-
“ না,আমি খাব।”
“ ওকে তাহলে চকলেটও একমাসের জন্য বন্ধ।”
রোদেলা এবার কেঁদে দিলো, মেয়ের কান্না দেখেও গললো না রৌদ্রিক। তাই উঠে যেতে নিতেই ছোট্ট,নরম আদুরে দু’টি হাত এসে তাকে আঁকড়ে ধরলো। রৌদ্রিক থামল, এই স্পর্শ কি উপেক্ষা করে চলে যাওয়া যায়? তবুও গাম্ভীর্য বজায় রাখলো মুখাবয়বে। রোদেলা কাঁদতে কাঁদতে বলে-
“ এমন কর কেনো? এত্তুই তো খেয়েতি!”
রৌদ্রিক রোদেলার কথা শুনে ভ্রু যুগল কুঁচকিয়ে ফেললো৷ অতঃপর ভ্রু নাচিয়েই বলে-
“ অসুস্থ হয়ে কে পরেছিলো?”
রোদেলা মুখ ফুলিয়ে বলে-
“ রোদেলা।”
“ কার জন্য এতো অস্থির হয়েছিলাম আমি?”
” রোদেলার!”
“ আইসক্রিম খেলে কার ঠান্ডা লাগে?”
“ রোদেলার!”
“ তারপরও এটা খাওয়া হয় কেনো?”
রোদেলা এবার কেঁদে দিলো আরও জোরে। সেটা দেখে রৌদ্রিক রোদেলাকে কোলে তুলে নিলো। রোদেলা রৌদ্রিকের গ্রীবাদেশ শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, সেখানটায় মুখ লুকিয়ে ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে যাচ্ছে। রৌদ্রিক কিছু বললো না। রোদেলা যখন বিছানা থেকে নেমেছে তখনই সে টের পেয়েছে রোদেলা কি করতে পারে। রোদেলার মন তার কাছে খোলা বইয়ের মতো। তার প্রতিটা সন্তানের,প্রতিটও পদক্ষেপ খুব সুক্ষ ভাবে চেনা। কয়েক দিনে আগেই জ্বর থেকে উঠেছে, আইসক্রিম থাকলেই খেয়ে নিবে পুরোটা৷ তারপর ঠান্ডা,জ্বর বাঁধিয়ে ফেলবে। কয়েকদিন ধরে খেতে দেয়নি, দেখে রোদেলা আও নিজেই এমন চুপিচুপি করে খেতে বসেছিলো। ওমনি ধরাও পরেছে, রোদেলাকে কোলে করেই আবারও কক্ষে ফিরে গেলো। বাকি দুইজন দোলনায় আরামে নিদ্রামগ্ন, তূর্ণারও সজাগ ফিরেছে। রৌদ্রিক এসে রোদেলাকে বিছানায় ছাড়তেই সে বিড়াল ছানার মতো তূর্ণার বুক দখল করে নিলো। তূর্ণা আধখোলা চোখ দু’টো এবার পুরোপুরি খুলে গেলো, রোদেলা নরম দেহ কেঁপে উঠছে। সেটা টের পেতেই তূর্ণার ঘুম একেবারেই ছুটে গেল, সে রোদেলাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে অস্থির কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে-
“ কি হয়েছে সোনা? কাঁদে কেনো?”
রোদেলা কিছু বললো না, উল্টো তূর্ণার বুকের মাঝে আরও গাঢ় ভাবে মিশে গেলো। তূর্ণা এবার রৌদ্রিকের দিকে তাকালো।
“ কি বলেছেন আমার মেয়েকে আবার?”
“ মায়ের মতো চু’রি করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে।”
তূর্ণা রাগ লাগলো, বুঝলো কি হয়েছে। তাই রোদেলাকে চেপে ধরে রাগ দেখি বলে-
“ আপনিও না, খেয়েছে তো কি হয়েছে? আর কয়েকদিন খাবে না। কতখানি বকেছেন ইস!”
“ হ্যাঁ তোমরা মা-মেয়েই সঠিক আর আমি তো বানের জলে ভেসে এসেছি।”
বলেই রৌদ্রিক শুইয়ে পরলো। ছুটির দিন হওয়ায় তেমন কিছুর তাড়া নেই, রাতে বিয়ের দাওয়াচ রয়েছে৷ সেখানে সপরিবার যাবে। রোদেলার কান্না থেমে এসেছে, সে বুক থেকে মাথা তুলে ফোলা ফোলা চোখে একবার রৌদ্রিকের দিকে তাকালো। এতপর আবারও অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। সেটা দেখে তূর্ণা রোদেলার কানে কানে ফিসফিস করে বলে-
“ আরে পুতুল, পাপা চলে যাওয়ার পর খাবো কেমন? বেশি না একটু একটু!”
“ চো’রেদের জন্য বাসায় আর কোনো চকটেল বা অন্যকিছু আসবে না।আমার কথা শুনলেই খেতে পাবে শুধু।”
রোদেলা এটা শোনার পর আবারও কেঁদে দিলো৷ সেটা দেখে তূর্ণা হাত দিয়ে রৌদ্রিকে বাহুতে হালকা করে বা’রি দিলো।
“ চুপ করুন বেশি বলেন কিন্তু৷ বাকি দুইটাকেও খাওয়ানো শুরু করিয়ে দিবো কিন্তু, রোদ্দুরে আগে দিবো। বুঝবেন তখন কত ধানে, কত চাল। ”
“ সমস্যা নেই, কিছু হলে আমার কাছে যাতে না আসা হয়। চার চারটা বাচ্চা পালছি এই বয়সে।”
“ বুড়ি হবেন আপনি, আমায় কোন দিক থেকে বাচ্চা মনে হয় আপনার?”
“কোনদিক থেকে নও?”
তূর্ণার কিছু বলতে নিবে, তার আগেই রোদেলা তূর্ণার মুখ চেপে ধরে। কথা বলতে দিবে না সে। সেটা দেখে রৌদ্রিক চোখ বন্ধ করে বলে ওঠে-
“ কেউ চাইলে আমার বুকে এসে নাক মুছতে পারে।”
রোদেলা বুঝলো কথাটা তাকেই বলেছে৷ কারণ সেই কান্না শেষে রৌদ্রিকের বুকের কাছকার কাপড়ে নাক মুছে। রোদেলাও এবার হালকা হালকা করে এগিয়ে এসে রৌদ্রিকের বুকে দখল করে নিলো। তারপর অন্যদিকে মুখ ফুলিয়ে বলে-
“ আমিও নাক মুছতে এসেতি।”
তূর্ণা হেসে দিলো এদের কান্ড দেখে। এর মধ্যেই রোদ্দুর পা নাড়িয়ে কেঁদে উঠলো, সেটা দেখে তূর্ণা তড়িঘড়ি করে উঠে দোলনা থেকে ছেলেকে কোলে উঠিয়ে নিলো। দুই বছরে দিবে কয়েক মাস পর রোদ্দুর আর রোদেশীর। দেখতে দেখতে সময় গুলো কত দ্রুতই চলে গেলো চোখের পলকে বোঝাই গেলো না। দুঃখের সময় গুলোতে মনে হয় সময় যেনো পার হতেই চায় না। সময়ের কাটা এক জায়গায় আটকে রয়েছে, অথচ সুখের সময় গুলো চোখের পলকেই কেটে যায়। তূর্ণা রোদ্দুরকে শুইয়ে দিয়ে আস্তে করে রোদেশীকেও তুলে নিলো। রোদ্দুর দুধ পান করতে ব্যস্ত হয়ে পরলো, রোদেলা বোনের ছোট হাত গুলো ধরে নাড়াচাড়া করছে। রৌদ্রিক এক হাতে অতি সাবধানে রোদেশীকেও বুকের উপর নিয়ে চোখ বুঝলো। রোদ্দুরও খেতে খেতে শান্ত হয়ে গেছে।
বিকেলের স্বর্ণাভ আলো নরম পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে বাগানের প্রতিটি পত্রপল্লবে। শিশিরস্নাত সবুজ ঘাসের বুক জুড়ে ছড়িয়ে আছে পাঁচ বছরের রোদেলার কিশোরী উচ্ছ্বাস। কখনো সে প্রজাপতির রঙিন পাখনার পিছু ছুটছে, কখনো আবার ফুলের দিকে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে আপনমনে হেসে উঠছে। তার চারপাশে খেলা করছে ভাই-বোনেরাও। সমগ্র উদ্যান যেন তাদের কলরবে প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠেছে। সায়রা একপাশে বসে মাটি ঘাস ছিড়ছে, ইরা দ্বিতীয় বারের মতো সন্তানসম্ভাবনা, তার চার মাস চলছে।
অল্প দূরেই দাঁড়িয়ে আছে রোদ্দুর আর রোদেশী। টলমল পায়ের অনভ্যস্ত পদক্ষেপে দু’জনই প্রাণপণে রোদেলার দিকে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে। একেকটি পদক্ষেপে শরীর দুলে উঠছে, কখনো ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় বসে পড়ছে, আবার দু’হাত মেলে নিজেকে সামলে নিয়ে নতুন উদ্যমে হাঁটা শুরু করছে। তাদের সেই টুকরো টুকরো পদচারণা দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সমস্ত সরলতা যেন এসে আশ্রয় নিয়েছে ওই দুটি ক্ষুদ্র অবয়বে। রোদেশী টলমল পায়ে এগিয়ে যেতে নিলেই পিছন থেকে হঠাৎ করে রোদ্দুর এসে তাকে ফেলে দিয়ে নিজে টলমল পায়ে হাঁটতে শুরু করে। রোদ্দুর কে হাঁটতে দেখে রোদেশীও কম যায় না। সে ভ্রু কুঁচকে কচি কণ্ঠে প্রতিবাদ করল-
” আইইই!আআ য়পো,য়পো!
বলতে বলতে রোদেশীও এগিয়ে এলো রোদ্দুরের পিছনে। রোদ্দুর যেই না রোদেশীর জামা ধরতে নিলো, ওমনি রোদেশী এক ঘা বসিয়ে দিলো। লেগে গেলো তাদের দুইজনের বিশ্বযুদ্ধ। দু’জনের এই শিশুসুলভ মান-অভিমান, আধো-আধো উচ্চারণে উচ্চারিত প্রতিবাদ আর নিষ্পাপ অধিকারবোধে মুহূর্তটি হয়ে উঠল অপার স্নিগ্ধতায় মোড়ানো। রোদেলা খেলা থামিয়ে তাদের দিকে তাকাতেই মুখে ফুটে উঠল এক চিলতে মায়াভরা হাসি। বড় বোনসুলভ গাম্ভীর্য আনার ব্যর্থ চেষ্টা করে কোমরে দু’হাত রেখে বলল,
“এই যে! কেও ঝগড়া করবে না। তোমরা দু’জনই আমার। আবার ঝগড়া করলে কিন্তু আমি কারও সঙেই খেলব না।”
কথাটা শুনেই রোদ্দুর আর রোদেশী দু’জনেই থমকে গেল। একে অপরের মুখের দিকে কিছুক্ষণ নিষ্পাপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর আবার টলতে টলতে পাশাপাশি রোদেলার দিকে এগোতে লাগল। রোদ্দুর আবারও রোদেশীকে থামাতে নিলেই রোদেলা আবারও বলে ওঠে –
“পচাদের রোদেলা নিবে না। মালামালি করলে কাওকে
আদল করবো করবে না। একা একা খেলবে সায়রার সাথে।”
রোদ্দুর এতোটাও না বুঝতে পারলেও, যতটুকু বুঝেছে রোদেলা রাগ করবে তার সঙ্গে। তাই সে আর কিছু করলো না, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পায়ে এগিয়ে যেতে থাকলো রোদেলার দিকে।
রোদেলা নিচু হয়ে বসে দু’হাত প্রসারিত করতেই দুটি ক্ষুদ্র প্রাণ একসঙ্গে তার বুকে এসে জড়িয়ে ধরল। সে স্নেহমাখা ভঙ্গিতে দু’জনের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বলল+-
“এই তো আমার লক্ষি ভাই-বোন। এভাবেই একসঙ্গে থাকবে, বুঝেছ? আপুর কাছে আসতে হলে কখনো ঝগড়া করা যায় না।”
রোদ্দুর আধো হাসিতে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। রোদেশীও মিষ্টি হেসে ভাইয়ের ছোট্ট হাতটা নিজের হাতে ধরে ফেলল। মুহূর্তের আগের ক্ষণস্থায়ী অভিমান নিমেষেই বিলীন হয়ে গেল; বাগানের স্নিগ্ধ বাতাসে আবারও ভেসে উঠল তিন ভাই-বোনের নির্মল হাসির কলতান। তিন জা বসে এতোক্ষণ এইসবেই দেখছিলেন৷ সায়রাও এগিয়ে এলো, রোদেলাকে তাকেও তার ছোট বুকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলো। পুরোপুরি পারলো না, তবে তাও চারজনেই হাসচ্ছে। সেটা দেখে বাকিদের মনটা ভরে গেলো।
“ মাশাল্লাহ আল্লাহ এইভাবে আমাদের পরিবারটাকে আগলে রাখুক।”
জবা সিকদার মুচকি হেসে বললেন-
“ আমাদের দেখে ওরাও ওটাই শিখবে৷ আলহামদুলিল্লাহ! সব বাচ্চাগুলো মিলেমিশে থাকুক। ”
রাত্রির নিবিড় আবরণ এখন ধীরে ধীরে সমগ্র আকাশকে আপন কৃষ্ণাভ আঁচলে ঢেকে ফেলেছে। বিয়েবাড়ির চারদিকে টাঙানো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোকমালার দীপ্তি যেন নক্ষত্ররাজির ভূপাতিত প্রতিরূপ হয়ে চারপাশকে এক অনির্বচনীয় মোহময়তায় ভাসিয়ে রেখেছে। শঙ্খধ্বনি, হাস্যরোল, উলুধ্বনি আর দূর থেকে ভেসে আসা সানাইয়ের সুর সব মিলিয়ে এক অপার্থিব আবহের জন্ম দিয়েছে।
বাড়ির প্রবীণ সদস্যরা বেশ আগেই বাচ্চাদের নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। রোদেলা, রোদেশী,রোদ্দুর, সায়রা বড়দের সঙ্গে বাড়িতে গেছে। যাওয়ার আগে রোদেলা বারবার বলেছিল-
“পাপা, তুমি আসবে না?”
রৌদ্রিক মৃদু হেসে তার কপালে চুম্বন এঁকে দিয়েছিল।
“আসব রোদ। তোমার মাকে নিয়ে আসব।”
কিন্তু বাস্তবে সে ইচ্ছে করেই যায়নি। বহুদিন পর শুধুমাত্র তূর্ণাকে নিয়ে কিছুটা নিরালায় সময় কাটানোর দুর্লভ সুযোগ সে হারাতে চায়নি। অনেকদিন পর বাহিরে বের হয়েছে, ব্যবসায়ের কাজে টুকটাক হাত লাগিয়েছে। তাই অবসর সময় পাওয়া খুব কমই হয়। এদিকে তূর্ণা যেন আজ রজনীর সমস্ত সৌন্দর্যকে নিজের অবয়বে ধারণ করেছে। গাঢ় নীলাভ শাড়ির আঁচলে সূক্ষ্ম রূপালি জরি রাতের তারামালার মতো ঝিকমিক করছে। কপালের ক্ষুদ্র টিপটি যেন পূর্ণিমার কণামাত্র আলো। খোঁপায় গুঁজে রাখা সাদা ফুলের গন্ধ বাতাসে নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ছে। চোখের কাজল তার দৃষ্টিকে করেছে আরও নিবিড়, আরও সম্মোহনী; রৌদ্রিকও কম নয়। গাঢ় রঙের পাঞ্জাবির সঙ্গে পরিমিত সৌন্দর্যে নিজেকে ধারণ করে থাকা রৌদ্রিকের ব্যক্তিত্ব ছিল এক অন্যরকম স্থৈর্যের প্রতিমূর্তি। সুগঠিত দেহাবয়ব, সুঠাম কাঁধ, পরিপাটি চুল আর গভীর দৃষ্টি তাকে জনসমুদ্রের মাঝেও স্বতন্ত্র করে তুলেছে।
বিয়েবাড়িতে উপস্থিত অনেক তরুণীর দৃষ্টি অজান্তেই বারবার রৌদ্রিকের দিকে ছুটে যাচ্ছিল। কেউ আড়চোখে দেখছিলো, কেউ নিজেদের মধ্যে চাপা স্বরে কিছু বলেই হেসে উঠছিলো। কেউ আবার মোবাইল হাতে ছবি তুলতে তুলতে সুযোগ বুঝে তার দিকেই তাকিয়ে থাকছে।
তূর্ণা সবই লক্ষ্য করেছে। তার ভেতরে অভিমানের এক সূক্ষ্ম রেখা নিঃশব্দে জন্ম নিয়েছে। যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে, রৌদ্রিকে দেখে সে ঠোঁট ফুলিয়ে সে ধীরস্বরে বলল-
“বেশ তো,আজ তো দেখি সবাই আপনাকেই দেখছে।”
রৌদ্রিক ভ্রু তুলল।
“তাই নাকি?”
“হুম। খুব আনন্দ হচ্ছে নিশ্চয়ই?”
রৌদ্রিক হাসল না। শুধু তাকিয়ে রইল। তূর্ণা মুখ ফিরিয়ে নিল। অভিমানের অভিনয় করলেও তার কণ্ঠে ক্লান্তির রেশ স্পষ্ট ছিল। বিয়েবাড়ির ফটকের দিকে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার পদক্ষেপ আরও ধীর হয়ে এল। প্রতিটি পা ফেলতেই মুখে ক্ষীণ যন্ত্রণার ছায়া ফুটে উঠছে। কিন্তু সে কিছু বলল না। আজ অনেক শখ করে উঁচু হিল জুতো পরেছিল।
সাজের সঙ্গে মানাবে ভেবেছিল। এখন সেই হিলই তার প্রতিটি পদক্ষেপকে কষ্টের অনুচ্ছেদে পরিণত করেছে।
রৌদ্রিক কয়েক মুহূর্ত নীরবে লক্ষ্য করল। তারপর কোমল অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল-
“পা ব্যথা করছে?”
তূর্ণা চমকে উঠল।
“না তো।”
“মিথ্যে বলছ।”
“আমি ঠিক আছি।”
রৌদ্রিক এবার আর কোনো উত্তর দিল না। বিয়েবাড়ির কোলাহল পেছনে ফেলে তারা নির্জন রাস্তায় পা রাখতেই সে তূর্ণার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তূর্ণা বিস্ময়ে বলল-
“এই! কী করছেন?”
কোনো উত্তর না দিয়ে রৌদ্রিক আলতো হাতে তার পায়ের হিল খুলে দিল। জুতোর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা পায়ের গোড়ালিতে লালচে ঘর্ষণের দাগ স্পষ্ট। রৌদ্রিকের ভ্রু কুঁচকে গেল। গাড়িতে রাখা ছোট্ট ফার্স্ট-এইড বক্স থেকে একটি ওয়ান-টাইম ব্যান্ডেজ বের করে সে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিল। তূর্ণা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
“বলোনি কেন?”
খুব ধীরস্বরে প্রশ্ন করল রৌদ্রিক।
তূর্ণা মৃদু হাসল।
“ভাবলাম,আপনার এত ব্যস্ততার মধ্যে এসব বলে বিরক্ত করব না।”
রৌদ্রিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তোমার কষ্টের খবর জানাটা যদি বিরক্তি হয়, তাহলে আমার কোনো মূল্যই থাকল না।”
কথাটা শুনে তূর্ণার চোখ অনিচ্ছায় সজল হয়ে উঠল।
পরের মুহূর্তেই কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই রৌদ্রিক তাকে দুই হাতে তুলে নিল। তূর্ণা বিস্ময়ে আঁতকে উঠল।
“এই! নামান! কেউ দেখে ফেলবে!”
“দেখুক।”
“আপনি!”
“আজ আর এক পা-ও হাঁটতে দেব না।”
তূর্ণা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলল তার বুকের কাছে।
চারপাশে নির্জন পথ। দূরের আলোগুলো ক্রমশ ক্ষুদ্র হয়ে যাচ্ছে। রাত যেন আরও গভীর হচ্ছে। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি, হাঁটতে বেশ মন্দ লাগছে না৷ তূর্ণা রৌদ্রিকের কাঁধে মাথা দিয়ে রেখেছে। ঠিক তখনই আকাশের বুক চিরে নেমে এল ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। প্রথম কয়েকটি বিন্দু এসে পড়ল রৌদ্রিকের কাঁধে। তারপর ধীরে ধীরে বৃষ্টির সূক্ষ্ম জলরেখা দু’জনকেই ভিজিয়ে দিতে শুরু করল। তূর্ণার খোঁপা আলগা হয়ে কয়েকটি চুল বাতাসে ভেসে এসে গাল ছুঁয়ে রইল। শাড়ির আঁচল ভিজে আরও গাঢ় হয়ে উঠল। বৃষ্টিধোয়া রাতের স্নিগ্ধতায় তার মুখশ্রী যেন নতুন করে প্রস্ফুটিত হলো। রৌদ্রিক হাঁটছে ধীর পদক্ষেপে। বুকের কাছে পরম যত্নে আগলে রেখেছে তূর্ণাকে। তূর্ণা মুখ তুলে তাকাল।
বৃষ্টিবিন্দু রৌদ্রিকের কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। সে মৃদুস্বরে বলল-
“এভাবে কতক্ষণ নিয়ে হাঁটবেন?”
রৌদ্রিক তার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
“যতক্ষণ না তোমার সব ক্লান্তি আমার কাঁধে এসে বিশ্রাম নেয়।”
তূর্ণার অধরে অমলিন হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে নিজের কপাল রৌদ্রিকের কপালে ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল-
“জানেন,পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়টা কোনো ঘর নয়।”
রৌদ্রিক তাকাল। তূর্ণা চোখ বুজে তার বুকে আরও একটু সেঁধিয়ে গিয়ে বলল-
“আপনার এই দুই বাহুর বেষ্টনীই আমার সমস্ত পৃথিবী।”
অবেলার প্রণয়ভেলা শেষ পর্ব
বৃষ্টি এখনও ঝরে চলেছে অবিরাম, নিঃশব্দ, স্নিগ্ধ। রাত্রির দীর্ঘ পথ যেন তাদের জন্যই আপন গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে। চারদিকে নিস্তব্ধতার গভীর আবরণ, আর সেই নৈঃশব্দ্যের অন্তরালে ধুকধুক করে বেঁচে আছে দুটি হৃদয়ের অব্যক্ত অনুরাগ। মনে হচ্ছিল, এই ক্ষণিক পথচলাই যেন অনন্ত জীবনের এক অমর উপাখ্যান; যেখানে ভাষার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, আর ভালোবাসা নিঃশব্দেই তার সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতাটি লিখে ফেলে। প্রতিটা মুহুর্তই যেনো প্রেমময় কোনো কবিতা। যেটা স্বয়ং আল্লাহ খুব যত্ন নিয়ে লিখেছেন।
