Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৫

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৫

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৫
রিদিতা চৌধুরী

লন্ডনের মাটিতে পা রাখার পর থেকেই সময়টা যেন থমকে গেছে। হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে সরাসরি অ্যাম্বুলেন্সে করে সৌহার্দ্যকে নেওয়া হলো সেন্ট থমাস হসপিটালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ)। লন্ডনে থাকার সময় এই হাসপাতালেই সে ডাক্তার হিসেবে যুক্ত ছিল! সেই সুবাদেই এখানকার পরিচিত চিকিৎসকরা তাকে দিচ্ছে স্পেশাল কেয়ার।
বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে; ব্রিটিশ আবহাওয়ার সেই চিরচেনা বিষণ্নতা পুরো পরিবেশটাকে যেন আরও বেশি ভারী করে তুলেছে।

হাসপাতালের ভিজিটিং রুমের কাঁচের দেওয়ালের বাইরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন সারহান চৌধুরী। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মানুষটার চোখ দুটো লাল, মুখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে রায়েদা শেখ তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। শাহেদা চৌধুরীর অবস্থা আরও শোচনীয়—ছেলের চিন্তায় কান্নায় চোখ দুটো অন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, তবুও তিনি এক মুহূর্তের জন্য সিসিইউর ওই বন্ধ দরজাটার দিক থেকে দৃষ্টি সরাচ্ছেন না। সুজন , আর আরবান বাকি ডাক্তারদের সাথে সৌহার্দ্যর কাছে আছে, শাহাবীর ফারিস মূহর্ত্যের জন্য চোখ সরাচ্ছে না, সিসিইউর বন্ধ দরজা থেকে,!
বাংলাদেশ সময় তখন প্রায় ৭টা বাজে। রিদির পৃথিবীটা যেন ওই একটা বিন্দুতে এসে আটকে গেছে। সৌহার্দ্যের ছবিটা বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে সে ডুকরে কেঁদে চলেছে—যে কান্নার কোনো শব্দ নেই, আছে শুধু বুকভাঙা এক হাহাকার।

তার পাশে থমথমে মুখে বসে আছে সুমি, সায়েম আর পৃথা। সকালেই পৃথার মুখে দুঃসংবাদটা শুনে ওরা আর ঘরে স্থির থাকতে পারেনি, ছুটে এসেছে। কিন্তু কী অদ্ভুত এক জেদ মেয়েটার! সকাল থেকে পৃথা আর রিমা চৌধুরী শত চেষ্টা করেও তার মুখে এক ফোঁটা পানি তুলে দিতে পারেননি। রিদির একটাই কথা—আগে সে তার সৌহার্দ্যকে নিজের চোখে দেখবে, তবেই সে জল স্পর্শ করবে!
ওদিক থেকে রায়েদা শেখ লন্ডনে পৌঁছানোর পরপরই রিদির নাম্বারে কল দিয়েছিলেন। কত আকুতি করে মেয়েটাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু রিদির কান পর্যন্ত যেন সে কথা পৌঁছাচ্ছে না। তার একটাই কথা—কাউকে সে বিশ্বাস করে না, আগে নিজের চোখে দেখবে, তবেই তার বিশ্বাস হবে! কারো কোনো সান্ত্বনাতেই তার উত্তাল মন মানছে না।

সুমি আর থাকতে না পেরে রিদিকে নিজের বুকে টেনে নেয়, ভাঙা গলায় বলল, “এমন করিস না তো জানু! দেখিস, আমাদের স্যার ঠিক ঠিক সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন।”
সায়েমও গলাটা ভারী হয়ে আসা সত্ত্বেও একটু হাসির আভা আনার চেষ্টা করে। সুমির কথার রেশ ধরে বলে, “ঠিক বলেছিস সুমি। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখ বোন, স্যার তো ঠিকই ফিরে আসবেন। তখন তোকে এমন মলিন দেখলে স্যারের কি খুব ভালো লাগবে বল? এসেই তো তখন আমাকে ধরে বকবেন—বলবেন, ‘এই চারচোখা, আমার বউটাকে একটু সামলে রাখতে পারলি না?'”
রিদিকে একটু স্বাভাবিক করার জন্যই সায়েমের এই ছোট্ট প্রয়াস। কিন্তু রিদি যেন এক অন্য ভুবনে হারিয়ে গেছে। কারো কোনো কথারই কোনো প্রতিউত্তর সে দিল না, একদম পাথরের মতো বোবা হয়ে বসে রইল। শুধু চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে, সৌহার্দ্যের স্মৃতিমাখা ছবিটা আরও একটু জোরে বুকের গভীরে চেপে ধরে আছে!

লন্ডন সময়ের তখন প্রায় রাত দুটো। পিনপতন নীরবতা ভেঙে সিসিইউর দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। তাঁর ক্লান্ত মুখাবয়বে ক্লান্তি থাকলেও চোখে এক পশলা স্বস্তি। সারহান চৌধুরী থমকে যাওয়া পায়ে, এক বুক অজানা আতঙ্ক নিয়ে ছুটে গেলেন তাঁর কাছে।
ডাক্তার সারহান চৌধুরীর কাঁধে একটা মৃদু সান্ত্বনার হাত রেখে হালকা হেসে বললেন,”হি’জ আউট অব ডেঞ্জার নাউ, বাট ইট মাইট টেক আনটিল টুমরো মর্নিং অর ইভেন দ্য আফটারনুন ফর হিম টু ফুলি রিগেইন কনশাসনেস।””কথাটি শেষ করেই তিনি করিডোর ধরে হেঁটে গেলেন।
ডাক্তারের মুখ থেকে ওই কথাগুলো বের হওয়ার সাথে সাথেই যেন সবার বুকের ওপর থেকে হিমালয় সমান একটা পাথর নেমে গেল। স্তব্ধ হয়ে থাকা দমটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে অবশেষে বেরিয়ে এল সবার বুক চিরে।
বিন্দুমাত্র দেরি না করে রায়েদা চৌধুরী ফোনটা হাতে তুলে নিলেন। রিং বাজার এক সেকেন্ডের মাথাতেই ওপাশ থেকে ফোনটা রিসিভ হলো, যেন সারাক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই বসে ছিল মেয়েটা। রায়েদা শেখ কিছু একটা বলতে যাওয়ার আগেই রিদি উন্মাদের মতো কেঁপে ওঠা কণ্ঠে বলে উঠল, “খালামনি, প্লিজ মিথ্যে বলো না… সে কেমন আছে এখন?”

রিদির গলার সেই ভাঙা, রুদ্ধ কণ্ঠস্বর শুনে রায়েদা চৌধুরীর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি নিজেকে শক্ত করে একটু নরম গলায় বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ, একদম বিপদমুক্ত এখন। ডাক্তার একটু আগেই বলে গেল, সকালে জ্ঞান ফিরবে।”
রিদির যেন বিশ্বাসই হতে চাইল না। কান্নায় ভেঙে পড়া রুদ্ধ কণ্ঠে সে প্রায় ভিক্ষার মতো চাইল, “আমাকে একটু দেখাবে, খালামনি? প্লিজ… একবারের জন্য হলেও একটু দেখতে দাও!”
রায়েদা শেখ অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন ফারিসের দিকে। ফারিস তাৎক্ষণিকভাবে বুঝে ফেলল রিদির মনের আকুতি। ঠিক তখনই সিসিইউর ভেতর থেকে ক্লান্ত পায়ে বেরিয়ে এলেন সুজন। রায়েদা শেখ এক মুহূর্তও দেরি না করে ভিডিও কলটা অন করে সুজনের হাতে মোবাইলটা গুঁজে দিলেন।
স্ক্রিনে রিদির বিধ্বস্ত মুখটা ভেসে উঠতেই সুজন দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে একটা মায়াভরা ধমক দেওয়ার চেষ্টা করল, “কী অবস্থা করে রেখেছিস নিজের? একদম কান্না করবি না তো! আর চার-পাঁচটা ঘণ্টা মাত্র… তারপর তোকে সেই ‘স্টুপিড’ বলে ধমকাবে।”

বলতে বলতে সুজন এগিয়ে গেল সৌহার্দ্যের শয্যার পাশে। ফোনের ক্যামেরাটা ঘুরিয়ে ধরল নিস্তেজ হয়ে শুয়ে থাকা মানুষটার দিকে।
মেশিনের মৃদু বিপ বিপ শব্দের মাঝে অক্সিজেন মাস্কে ঢাকা সৌহার্দ্যের সেই নিথর চেহারাটা স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই রিদির বুকটা কেঁপে উঠল। মনে হলো, এই দূরত্ব ভেঙে এখনই মোবাইল স্ক্রিন ভেদ করে বেরিয়ে যায় সে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার ওই জেদি, রাগী মানুষটাকে। পলকহীন চোখে রিদি তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্যের বিবর্ণ মুখের দিকে। ঠোঁট কামড়ে হাড়ভাঙা কান্নার স্রোতটাকে বুকের ভেতরেই চেপে রাখার অমানুষিক এক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। চোখের জলগুলো আর মানতে চাইছে না বাঁধন, গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে।
রিদির এই বেহাল দশা দেখে সুজনের বুকটাও হু হু করে উঠল। সে একটু কড়া গলায় সামলে নিয়ে বলল, “এখন ফোন রাখছি। কান্নাকাটি একদম না! যা গিয়ে কিছু মুখে দিবি। সৌহার্দ্যের জ্ঞান ফেরার সাথেই তোকে কল দিব আমি, কথা দিলাম।”

রিদি ভিজে যাওয়া চোখে, থরথরে ঠোঁটে শুধু দুপাশে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
সুজন ফোনটা কেটে দিয়ে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
রিদি ফোনটা আস্তে করে বিছানায় রেখে সৌহার্দ্যের ছবিটা বুক চেপে ধরল। কাঁপা ঠোঁটে ছবিটাতে একটা ছোট চুমু এঁকে সে চোখ বুজল। পুরোটা রাত এক ফোঁটাও চোখ পলক ফেলেনি সে; চাতক পাখির মতো শুধু ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল—কখন একটা খবর আসবে! সৌহার্দ্যকে দেখার পর থেকে মনটা যেন আরও বেশি ব্যাকুল হয়ে উঠেছে, বারবার তার ওই নিস্তেজ, মলিন মুখখানা রিদির চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
ঠিক এই মুহূর্তে পৃথা আচ্ছন্ন চোখে তাকাল রিদির দিকে, গলাটা কাঁপিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিছু… কোনো খবর পেলি?”

রিদি কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ রেখেই মৃদু মাথা নাড়ল—যেন এইটুকু নড়াচড়াতেই তার বুক ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। পৃথার বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাতেই সে শিউরে উঠল; বেলা প্রায় সাতটা! কাল থেকে এক ফোঁটা জল ভাতও পেটে যায়নি রিদির। শরীরটা তো এবার ভেঙে পড়বে! ওকে অন্তত জোর করে হলেও কিছু মুখে দেওয়াতে হবে—এই ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পৃথা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সুমি এগিয়ে এসে রিদির কাঁধে হাত রাখল, আর তার পাশেই থমথমে মুখে বসল। সুমি উদ্বিগ্ন গলায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “রিদি, স্যারের কী অবস্থা রে?”

রিদি ক্লান্ত ও ভারী চোখে সুমির দিকে তাকাল। বুকের ভেতর জমে থাকা সমুদ্রে বাঁধ ভেঙে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল। গলায় জমা কান্নার রেশ আর দীর্ঘশ্বাসে ভেঙে আসা ভাঙা কণ্ঠে সে কোনোমতে উচ্চারণ করল, “ডাক্তাররা বলেছেন… উনি এখন আশঙ্কামুক্ত, কিন্তু… কিন্তু এখনও ওনার জ্ঞান ফেরেনি রে…”
সুমি আলতো হাতে চিরুনি দিয়ে রিদির জট পাকানো চুলগুলো আঁচড়াতে আঁচড়াতে নরম গলায় বলল, “এত টেনশন করিস না তো রিদি, দেখিস স্যার একদম সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন!”
রিদি কোনো টু শব্দ করল না, পাথরের মূর্তির মতো চুপচাপ বসে রইল। এর মাঝেই পৃথা এক প্লেট খাবার হাতে ঘরে এসে হাজির হলো। রিদি বারবার মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু সুমি এবার একটু বকাঝকা করেই জোর করে অল্প কিছু খাবার তার মুখে তুলে দিল।

সেখান থেকে একটু ঘেঁষে বসে রিভা মায়াভরা চোখে বলল, “তুমি এভাবে নিজেকে শেষ করে দিয়ো না তো ভাবি! তোমার এই রুগ্ণ মুখটা এভাবে একদম ভালো লাগছে না।”
সবার এই ছায়াঘেরা উদ্বেগের মাঝেই ঘরে প্রবেশ করলেন রিমা চৌধুরী। সোজা রিদির কাছে এসে ওর মাথার চুলে স্নেহের হাত বুলিয়ে আলতো করে জিজ্ঞেস করলেন, “খেয়েছিস কিছু,?”
রিদি শুকনো মুখে কেবল মৃদু মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল। রিমা চৌধুরী এবার মেয়েটির মলিন, শীর্ণ মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে পৃথার দিকে ফিরলেন, “ওর খেয়াল রেখো। আর তুমি নিজে কিছু খেয়েছ?”
পৃথা একটু আড়ষ্ট হয়ে মিনমিন করে জবাব দিল, “খাবো তো মা, এখনই…”
পৃথার এমন ঢিলেঢালা উত্তর শুনে রিমা চৌধুরী কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে বলে উঠলেন, “খাবে কি হ্যাঁ, খেয়ে নাও! এখন নিজের অনিয়ম করলে তো বাচ্চাটার ক্ষতি হবে!”
কথাগুলো শেষ করেই তিনি স্নেহের এক পরম আদুরে স্পর্শ রিদির মাথায় বুলিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

রিমা চৌধুরীর চলে যাওয়ার শূন্য দরজার দিকে তাকিয়ে পৃথার চোখদুটো হঠাৎই চিকচিক করে উঠল। আসলে, পৃথা যে গর্ভবতী—এই খবরটা জানার পর থেকেই রিমা চৌধুরীর ভেতরের কঠোর রূপটা যেন অনেকটাই বদলে গেছে। এখন তিনি পৃথার সাথে আগের চেয়ে অনেক বেশি নরম ব্যবহার করেন, তার খবরাখবর রাখেন এবং যথেষ্ট যত্নও নেন।
লন্ডনের ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল প্রায় দশটা। সৌহার্দ্যের কেবিনটার চারপাশটায় থমথমে একটা নীরবতা, যার মাঝে শুধু ভেসে আসছে চাপা কান্নার আওয়াজ। শাহেদা চৌধুরী ছেলের শক্ত হাতটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে ধরে বসে আছেন মাথার কাছে। সৌহার্দ্যের জ্ঞান ফিরেছে কিছুক্ষণ আগেই; আইসিইউ থেকে তাকে কেবিনে দেওয়া হয়েছে। তবে শরীরে ক্লান্তি আর ব্যথার তীব্রতা থাকায় ডাক্তার ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে তাকে আবার ঘুম পাড়িয়ে রেখেছেন। লন্ডন পৌঁছানোর পর থেকেই শাহেদা চৌধুরীর চোখের পানি এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি, একটানা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছেন তিনি।

তারা উঠেছিলেন রায়েদা শেখের বাসায়। লন্ডনে থাকাকালীন সৌহার্দ্যের নিজের একটি অ্যাপার্টমেন্ট থাকা সত্ত্বেও রায়েদা শেখ তাকে কখনো সেখানে একা থাকতে দেননি, নিজের কাছেই আগলে রাখতেন। আজ বিপদের দিনেও সেই ভালোবাসার ছায়া আরও চওড়া হয়ে ঢেকে রেখেছে তাদের।
ফারিস আলতো হাতে ফুপি শাহেদা চৌধুরীর পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনার সুরে বলল, “কেন এমন করছ ফুপি? তোমার এই বেজাল প্রোডাক্ট একদম সুস্থ! দেখবে, কিছুক্ষণ পর চোখ মেলে এমন বাঘের মতো হুংকার দিয়ে উঠবে যে আমাদের কান ঝালাপালা হয়ে যাবে!”
এতক্ষণ বিষণ্ণ মনে ছেলের মুখের দিকে মায়ার চোখে তাকিয়ে ছিলেন সারহান চৌধুরী। ফারিসের এই চটপটে কথা কানে যেতেই অজান্তে তাঁর ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। এই ছেলেগুলো যে তাঁর ছেলেকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, আজ এই দুঃসময় না এলে হয়তো তা এভাবে অনুভব করতে পারতেন না।
সারহান চৌধুরী ফারিসের দিকে তাকিয়ে মায়াবী গলায় বললেন, “তোমরা তো কেউ এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাওনি। এখন রিভানের সাথে বাসায় যাও, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নাও। আমরা তো আছি ওর পাশে।”
তক্ষুনি শাহাবীর বাধা দিয়ে বলে উঠল, “না আঙ্কেল, কোনো সমস্যা নেই। ও পুরোপুরি সুস্থ হোক, আমরা এখানেই একটু জিরিয়ে নেব।”

রায়েদা শেখ উদ্বিগ্ন মুখে তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা কী করে হয় বাবা? এখানে তো কোনো এক্সট্রা বেড নেই। এই ছোট একটা সোফায় তোমরা চারজন কীভাবে রাত কাটাবে?”
সুজন মৃদু হেসে রায়েদা শেখকে আশ্বস্ত করে বলল, “আন্টি, তা নিয়ে ভাববেন না; আমরা ফ্লোরেই ম্যানেজ করে নেব। কিন্তু ওকে একা রেখে চলে গেলে আমাদের নিজের চোখেই তো ঘুম আসবে না!”
ছেলেগুলোর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথাগুলো কান ছোঁয়া মাত্র সারহান চৌধুরীর চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল। জীবনের এই বাঁকে এসে বুঝতে পেরেছেন, সৌহার্দ্যের অর্জন করা এমন খাঁটি বন্ধুরা আল্লাহর এক বিরাট আশীর্বাদ, যা খুব সহজে পাওয়া যায় না।

দুপুর তখন প্রায় তিনটে। রিদি আনমনা হয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে, বুকের ভেতরটা কেমন যেন শূন্য শূন্য ঠেকছে। একটু আগেই শাহাবীরের ফোন পেয়ে সে জানতে পেরেছে সৌহার্দ্যের জ্ঞান ফিরেছে; ডাক্তার আপাতত ঘুমের ইনজেকশন দেওয়ায় সে ঘুমাচ্ছে, আর ভয়ের বা টেনশনের কোনো কারণ নেই।
খবরটা শুনে মাথার ওপর থেকে একটা বড় পাথরের বোঝা নেমে গেলেও রিদির মন শান্ত হলো না। সে দূর আকাশের পানে তাকিয়ে বিষণ্ণ গলায় বিড়বিড় করে বলে উঠল, “আপনি তো জানেন না, ডাক্তার সাহেব, সেই চৌদ্দ বছর বয়স থেকে আমি আপনাকে ভালোবেসেছি। যখন বুঝতে শিখেছি ভালোবাসার মানে কী, ঠিক তখন থেকেই! স্কুলের ভরা ক্লাসে আপনাকে প্রথম দেখার সেই মুহূর্তে আমার অবাধ্য হৃদয়টা থমকে গিয়েছিল। অথচ এত ছাত্রছাত্রীর ভিড়ে আপনি আমার দিকে একবার ফিরেও তাকাননি। সেই থেকে ভালোবেসে পাঁচটি বছর নীরবে অপেক্ষার প্রহর গুনেছি—আপনার একটুখানি ভালোবাসা পাওয়ার আশায়। আপনি বুঝতেই পারেননি আমার এই নীরব আকুলতা। আর ঠিক এখন, যখন আপনি একটু একটু করে আমায় ভালোবাসতে শুরু করেছেন, ঠিক তখনই নিয়তি বুঝি আপনাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইছে!”

কথাগুলো শেষ করেই মেয়েটা দুচোখ বুঁজে ফেলল। আর অমনি তার চোখের পাতায় জমাট বাঁধা দীর্ঘশ্বাস ভেদ করে ভেসে উঠল ফেলে আসা দিনের সেই পুরোনো সব সোনালী স্মৃতি।
রিদি তখন ক্লাস নাইনে ওঠা এক সদ্য কিশোরী। একদিন হঠাৎ ক্লাসের ফাঁকে বিশেষ এক ক্যাম্পেইন নিয়ে হাজির হলো একদল মেডিকেল শিক্ষার্থী এবং সদ্য ইন্টার্নশিপ শেষ করা কিছু তরুণ ডাক্তার। সেই টিমের সাথেই এসেছিলেন সদ্য এমবিবিএস পাস করা তরুণ ডাক্তার সৌহার্দ্য চৌধুরী। তাঁকে প্রথম দেখামাত্র কিশোরী রিদির অবাধ্য বুকটা থমকে গিয়েছিল। সৌহার্দ্য যতক্ষণ ক্লাসে ছিলেন, রিদি পলকহীন চোখে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিল তাঁর পানে। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত দেখাটা স্থায়ী হয়েছিল মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য! টিমের বাকিরা ক্লাসে থাকলেও সৌহার্দ্য ঠিক পাঁচ মিনিট পর কেমন যেন তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল।
ক্লাস শেষের পর এক ক্লাসমেটের কাছ থেকে রিদি জানতে পেরেছিল তাঁর নাম—সৌহার্দ্য চৌধুরী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সারহান চৌধুরীর একমাত্র ছেলে। ক্লাসমেট আরও বলেছিল, এই ডাক্তার নাকি মেয়েদের দিকে ভুলেও তাকায় না, তাঁর ভেতরে অহংকার আর অ্যাটিটিউডের শেষ নেই! অবশ্য এ কথাগুলো ক্লাসমেট শুনেছিল তার বড় বোনের মুখে, যে ছিল সৌহার্দ্যের ক্লাসমেট এবং তাদের বাড়িও ছিল সৌহার্দ্যদের ঠিক পাশেই।

তবে আশপাশের এই নেতিবাচক কথার ভিড়ে রিদির মনোযোগ কেড়েছিল কেবল একটি নাম—’সারহান চৌধুরী’। এই নামটা শোনার পর সৌহার্দ্যকে চিনতে রিদির আর বিন্দুমাত্র ভুল হয়নি। কারণ, সারহান চৌধুরী যে বাবার খুব ভালো বন্ধু, তাঁরা তো প্রায়ই আসেন তাদের বাড়িতে! সেদিনের সেই ক্ষণিকের পর সৌহার্দ্যকে আরও একবার দেখার জন্য রিদির অবুঝ মন তীব্র এক আকুলতা নিয়ে পুড়ত, কিন্তু ভাগ্যে তা আর জুটেনি। এমনকি ওই পাঁচ মিনিটের দেখায় সৌহার্দ্যের মুখটাও সে পুরোপুরি মনে গেঁথে রাখতে পারেনি।
এরপর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাতটা নেমে এল—বাবা-মা একসঙ্গে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। শোকের সাগরে ডুবে থাকা সেই অন্ধকার রাতে হঠাৎ করেই বিয়ে হয়ে গেল সৌহার্দ্যের সাথে। সদ্য বাবা-মা হারানো শোকে পাথর হয়ে যাওয়া রিদি তখন এক নিথর যান্ত্রিক রোবট! চারপাশে কী ঘটছে বা কেন ঘটছে, তা অনুভব করার বা বোঝার মতো কোনো শক্তিই তার অবশিষ্ট ছিল না। আর যখন সে একটু একটু করে বাস্তবতা বুঝতে শিখল, ততক্ষণে সৌহার্দ্য যেন তার নাগালের অনেক দূরে চলে গেছে।

এরপর মেডিকেল কলেজের ক্লাসরুমে সৌহার্দ্যের সাথে আবার তার প্রথম দেখা হলো। কিন্তু দীর্ঘ এত বছর ধরে না দেখা, ধুলো জমে ঝাপসা হয়ে যাওয়া সেই চেনা মুখটাকে সেদিন আর রিদি চিনতে পারেনি!
মাঝখান থেকে কেটে গেল দুটো দিন। এই ৪৮ ঘণ্টা কড়া ওষুধ আর ঘুমের ইনজেকশনের ঘোরে কেটে যাওয়ার পর আজ কিছুটা সুস্থবোধ করছে সৌহার্দ্য। লন্ডনের ঘড়িতে তখন সবেমাত্র সকাল ন’টা।
সৌহার্দ্যের মাথার কাছে আলতো হাতে হাত রেখে বসে আছেন রায়েদা শেখ। ফ্লোরে কার্পেটের ওপর গালে হাত দিয়ে অপলক তাকিয়ে আছে সুজন। একটু দূরেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ফারিস আর আরবান। আর সোফায় চিৎ হয়ে শুয়ে উদাসীনভাবে মোবাইল স্ক্রল করছেন শাহাবীর।
রায়েদা শেখ পরম যত্নে সৌহার্দ্যের চুলে হাত বুলিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন লাগছে এখন, বাবা?”

সৌহার্দ্য চোখ দুটো বুজেই রইল। তার গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল ঘরজুড়ে, “ভালো না… তোমার ওই স্টুপিড বোনঝিটাকে একটু ডেকে দাও তো। ওটাকে একটু বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরতে পারলে হয়তো কিছুটা ভালো লাগত।”
কথাটা কানে যেতেই রায়েদা শেখের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। সামান্য ধমকের সুরে তিনি বলে উঠলেন, “আস্ত একটা বেয়াদব তুমি! জীবনেও ভালো হবেনা!”
সৌহার্দ্যের কন্ঠস্বর শুনতে যেন জাদুকরী কিছু ঘটে গেল! মুহূর্তেই ঝটকা মেরে চোখ মেলে তাকাল ফারিস আর আরবান। আর মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে শাহাবীর এক পলক সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিভরে বিড়বিড় করে উঠলেন, “উফ! আস্ত একটা বউপাগল!”
শাহবীরের ফিসফিসানি কানে যেতেই এক মুহূর্ত দেরি করল না সৌহার্দ্য। চোখ পাকিয়ে তেতে উঠে সে বলে উঠল, “বউ পাগল হব না তো কি পাশের বাসার আন্টির জন্য পাগল হব?”
সুজন সুযোগ পেয়ে এক হাত বাড়িয়ে খোঁচা মারল, “হলেও হতে পারিস! আমি তো দেখেছি তুই কেমন যেন বয়স্ক মহিলাদের পিছে চুকচুক করিস। ওই যে আমাদের সিনিয়র শাহানা ম্যামের চেম্বারে তো অর্ধেক সময় কাটিয়ে দিস, সে—”
বাক্য শেষ করার সুযোগ দিল না সৌহার্দ্য। বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে সে ধমকে উঠল, “জাস্ট শাট আপ, সুজন! উনি আমার মায়ের বয়সী!”

ফারিস এবার ঠাট্টার সুরে যোগ করল, “ওর আর দোষ কী ভাই? মানুষ বলে পাশের বাসার ভাবির কথা, আর তুই বললি পাশের বাসার আন্টির কথা!”
সৌহার্দ্য আরও বেশি বিরক্ত হয়ে শাহবীরের দিকে ফিরে কড়া গলায় বলল, “হা করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোর বোনকে ডাক, চুমু খাব—ক্রেভিং হচ্ছে!”
কথাটা শোনামাত্র রায়েদা শেখ গলায় কফ জমিয়ে সজোরে কেশে উঠলেন। আর শাহবীর বিরক্তিতে লাল হয়ে তেতে উঠে বলল, “আস্ত একটা বেয়াদব!”
ফারিস মুখভঙ্গি করে উড়ন্ত চুমু দিতে দিতে বলল, “আপাতত বউ মনে করে চুমুটা তোর বউয়ের ভাইকে খেতে পারিস! তোর বউ তো দেশে, আর এটা লন্ডন!”
‘লন্ডন’ শব্দটা কানে যেতেই সৌহার্দ্য একঝটকায় রুমের চারপাশটায় ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিল। ঘুম ভাঙার পর খেয়াল না করলেও এবার রুমটার দিকে তাকাতেই তার চিনতে এক মুহূর্তও ভুল হলো না। কারণ, এই হাসপাতালের এই কেবিনগুলোতেই তো সে একসময় চরম ব্যস্ততায় রোগী দেখে কাটিয়েছে!
চরম তেতে উঠে সে বলে উঠল, “আমাকে লন্ডনে এনে আমার বউটাকে বাংলাদেশে একা ফেলে রেখে এসেছিস কেন, ইডিয়টগুলো?”

শাহবীর বিরক্তি চেপে রেখে জবাব দিল, “তোর বউয়ের পাসপোর্ট-ভিসা কি রেডি করে রেখেছি নাকি যে পকেটে করে নিয়ে আসব? এখন আবার তেজ দেখাচ্ছিস?”
শাহবীরের কথা শুনে সৌহার্দ্য এক মুহূর্তের জন্য যেন একটু দমে গেল। সে তো করতে চেয়েছিলই! কিছুদিন আগেই বাবার কাছ থেকে রিদির পাসপোর্ট করার সব কাগজপত্র সে জোগাড় করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঝামেলার কারণে আর হয়ে ওঠেনি।
সৌহার্দ্যের এই ভাবনার মাঝেই কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন সারহান চৌধুরী আর শাহেদা চৌধুরী।

তাদের দেখে ভ্রু কুঁচকে বিরক্তিকর সুরে সৌহার্দ্য বলে উঠল, “আশ্চর্য! তোমরা সবাই দল বেঁধে এভাবে চলে এসেছ কেন? মনে হচ্ছে বিয়ে খেতে এসেছ! আমার বউটাকে ওদিকে একা ফেলে রেখে সবাই এখানে চলে এলে, এখন ওকে কে দেখে রাখবে?”
ছেলের এমন নির্লজ্জ কথা শুনে সারহান চৌধুরী নাক-মুখ কুঁচকে বলে উঠলেন, “একটু সুস্থ হতে না হতেই তোমার এই নির্লজ্জামি আবার শুরু হয়ে গেল, আস্ত একটা বেয়াদব ছেলে!”
কিন্তু শাহেদা চৌধুরী তো অন্য ধাতুতে গড়া! ছেলের এই অবস্থা দেখে তিনি ছুটে এসে সোজা বুকে জড়িয়ে ধরে উল্টো তেতে উঠলেন স্বামীর উদ্দেশ্যে, “আপনি একদম মুখ বন্ধ রাখবেন! আমার বাবুর সাথে একটা টু-শব্দও করবে না, একদম ধমকে কথা বলবেন না বলে দিলাম!”
চারপাশের এত কথার ছিটেফোঁটাও গায়ে মাখল না সৌহার্দ্য। সে সোজা ফারিসের দিকে তাকিয়ে আদেশ দিল, “আমার ফোনটা দে, বউটার সাথে একটু কথা বলব।”
ফারিস নিজের পকেট থেকে ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “তোর ফোন তো গাড়িতে ছিল, আনা হয়নি। এখন রায়ানের কাছে আছে, আপাতত এটা নে।”

বিরক্ত মুখে ফারিসের ফোনটা ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে কারো দিকে আর একবারের জন্যও তাকাল না সৌহার্দ্য। উল্টো হুকুম দিল, “তোরা সব এখন বের হ তো! আমার প্রাইভেসি লাগবে!”
ছেলের কাণ্ড দেখে শাহেদা চৌধুরী হালকা হেসে তার চুলে একটু হাত বুলিয়ে দিলেন, এরপর রায়েদা শেখকে সাথে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। সারহান চৌধুরী বিড়বিড় করতে করতে বললেন, “আস্ত বেয়াদব!”—বলেও তিনিও বেরিয়ে গেলেন একে একে। আরবান, ফারিস আর শাহবীরও চলে গেল।
কিন্তু কেবিনের মাঝখানে সুজন তখনো হা করে সৌহার্দ্যের মুখের দিকে তাকিয়ে একাসনে বসে আছে!
তার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে সৌহার্দ্য তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “যাচ্ছিস না কেন তুই, ইডিয়ট?”
সুজন একটু থমথম খেয়ে আমতা আমতা করে বলল, “না মানে… তোকে তো জীবনেও কোনো দিন রোমান্টিক কথা বলতে শুনিনি! ভাবলাম একটু রিয়েল লাইফ রোমান্স দেখি আর কী!”
সৌহার্দ্য এইবার চোখ রাঙিয়ে এমন এক মারাত্মক দৃষ্টি দিল যে সুজন ভয়ে শিউরে উঠল। তৎক্ষণাৎ জিভ কেটে সুজন বলে উঠল, “যাচ্ছি, যাচ্ছি ভাই! ওভাবে তাকাস না বাবা, বুক কেঁপে ওঠে!” বলতে বলতে সেও একদৌড়ে রুম থেকে চম্পট দিল।

সবাই একে একে কেবিন ছেড়ে চলে যাওয়ার পর সৌহার্দ্য বিছানার সিটটাতে একটু হেলান দিয়ে বসল। এরপর ফোনের ক্যামেরাটা অন করে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে রিদির নাম্বারে কল করল। রিং হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওপাশে ফোনটা রিসিভ হলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠল রিদির মায়ায় জড়ানো, ভীষণ উদ্বিগ্ন একটা মুখ—যে মুখটার দিকে সে দীর্ঘক্ষণ ধরে শুধু তাকিয়ে থাকতে পারে।
সৌহার্দ্য পলকহীন দৃষ্টিতে চেয়ে রইল সেদিকে। রিদির অবস্থাও ঠিক একই রকম—থমকে যাওয়া, অশ্রুসিক্ত চোখে সে তাকিয়ে আছে সৌহার্দ্যের দিকে। মেয়েটার বুকটা তখন ধুপধুপ করে কাঁপছে, হৃদপিণ্ডটা যেন এক্ষুণি বুকের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসবে! রিদির মনে হচ্ছিল, জীবনের কতগুলো দীর্ঘ যুগ পেরিয়ে আজ সে তার সৌহার্দ্যকে দেখছে! আর ঠিক তখনই বুকফাটা কান্নায় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল মেয়েটা।
বউয়ের সেই কন্দনরত কণ্ঠস্বর কানে আসতেই সৌহার্দ্যের ঘোর কেটে গেল। বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল তার। তবুও কপট বিরক্তিতে মুখটা শক্ত করে সে বলে উঠল, “স্টুপিড মহিলা, কাঁদছ কেন এভাবে? কান্নাটা বন্ধ করো!”

কিন্তু রিদি কোথায় শুনবে সে কথা! সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কাঁপাকাঁপা গলায় আকুল হয়ে জানতে চাইল, “সত্যি… সত্যি ঠিক আছেন তো আপনি?”
বউয়ের এমন সুগভীর ব্যাকুলতা আর ভালোবাসা দেখে সৌহার্দ্যের সব রাগ নিমেষে উবে গেল। সে ঠোঁট কামড়ে হালকা হাসল, চোখের কোণে জমে থাকা সব আকুলতা লুকিয়ে নরম কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, “আই অ্যাম ফাইন, জান! ডোন্ট ক্রাই, প্লিজ। তোমার এই চোখের পানি আমার এক মুহূর্তের জন্যও সহ্য হয় না, প্লিজ স্টপ দিস!”
সৌহার্দ্যের মুখে এমন ভালোবাসার কথা শুনে রিদি আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। সব লজ্জা-সংকোচ একপাশে সরিয়ে সে মোবাইল স্ক্রিনের খুব কাছে ঝুঁকে টুপটাপ চুমু এঁকে দিল সৌহার্দ্যের ঠিকানায়। বউয়ের এমন নিঃস্বার্থ, পাগল করা ভালোবাসা গভীরভাবে অনুভব করল সৌহার্দ্য। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল তার। পরমুহূর্তেই রিদির দিকে তাকিয়ে এক নেশালো, আর্দ্র কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বলে উঠল, “এভাবে স্ক্রিনের ওপাশ থেকে ঠিক ফিল করতে পারছি না, জান! সামনাসামনি চাই তোমায়, একদম কাছে…” বলেই চোখের ইশারায় এক দুষ্টু ইঙ্গিত দিয়ে সে বলতে গেল, “জান, আই…”
কথাটা ঠিকমতো শেষও হতে পারল না, হঠাৎ সৌহার্দ্যের নজর গেল দরজার দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে সুজন!

বিরক্তিতে তেতে ওঠা গলায় সৌহার্দ্য ধমক দিয়ে উঠল, “ইডিয়ট! আমি ওখানে একবার পৌঁছাই, তারপর তোকে হাসপাতাল থেকে ছুড়ে ফেলে দেব…”
পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই সুজন মুচকি হেসে দরজাটা আটকে দিয়ে সরে গেল।
সুজন চলে যেতেই সৌহার্দ্য গভীর মায়ায় আবার মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকাল। রিদির সেই আদুরে মুখটা দেখতে দেখতে তার কণ্ঠস্বর নরম হয়ে এল, পরম স্নেহে ডেকে উঠল, “জান?”
ওপাশ থেকে একরাশ আবেগমথিত কণ্ঠে রিদি ফিসফিস করে জবাব দিল, “হুম!”
সৌহার্দ্যের বুক তখন ভালোবাসায় উথালপাথাল করছে। সে স্ক্রিনের দিকে একটু ঝুঁকে রিদির উদ্দেশ্যে কয়েকটি চুম্বন ছুড়ে দিয়ে দুষ্টু মিষ্টি হাসিতে বলল, “আমার ভীষণ ব্যাড ফিল হচ্ছে জান… সামথিং সামথিং, করতেই ইচ্ছে হচ্ছে!”
সৌহার্দ্যের এমন চঞ্চল আবদার শুনে অবুঝ গলায় রিদি কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল, “সেটা আবার কী?”
সৌহার্দ্য তখন বাঁকা হেসে নিজের চোখের ইশারায় মনের গোপন আকুলতাটুকু বুঝিয়ে দিল। আর তা বুঝা মাত্রই রিদি লজ্জায় একদম টকটকে লাল হয়ে গেল! দুহাতে মুখ ঢেকে অভিমানে সে বলে উঠল, “ছিঃ! অসুস্থ হয়েও আপনার এই বেহায়াপনা একটুও কমল না, তাই না?”
বউয়ের ওই লাজুক, রক্তিম মুখের পানে তাকিয়ে সৌহার্দ্যের বুকজুড়ে শান্তি নামল। চোখের কোণে দুষ্টুমি ফুটিয়ে সে ভালোবাসার সুরে বলল, “অসুস্থ বলেই তো এখন সবচেয়ে বেশি এনার্জি দরকার! সেই এনার্জি শুধু…”

কথাটা শেষ হতে না হতেই লজ্জা আর উত্তেজনায় রিদি দুই কানে হাত চাপা দিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, “থামুন, একদম চুপ করুন তো বেহায়া লোক! আমাকে এভাবে লজ্জার সাগরে না ডোবালে কি আপনার একটুও শান্তি হয় না?”
সৌহার্দ্য আরও কিছু মিষ্টি কথা শুনিয়ে রিদিকে ঘায়েল করতে চেয়েছিল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আবার দরজাটা হালকা ফাঁক করে উঁকি দিল সুজন! মুখে চওড়া হাসি ঝুলিয়ে সে বলে উঠল, “এই যে গম্ভীর রোমিও! আর একটু পরে বাকি প্রেম করিস, এখন ডাক্তার ভিজিট করতে আসছে!”
বন্ধুর এমন সময়ে বেহিসেবি এন্ট্রি দেখে সৌহার্দ্য এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর রিদির দিকে তাকিয়ে নিজের কণ্ঠে কিছুটা গাম্ভীর্য আর অগাধ ভালোবাসা মিশিয়ে নরম সুরে বলল, “ওকে হার্ট, এখন রাখছি। সাবধানে থেকো। আমি না ফেরা পর্যন্ত বাড়ি থেকে বের হওয়ার দরকার নেই, ওকে। তাড়াতাড়ি তোমার কাছে আসছি, আমার জান!”

বলেই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, বুকভরা একরাশ ব্যাকুলতা নিয়ে কলটা কেটে দিল সৌহার্দ্য।
রোদের তেজ তখন অনেকটাই নরম হয়ে এসেছে। বিকেল প্রায় চারটে—ছাদের মৃদু বাতাসে বসে আছে রিদি, সুমি, সায়েম, পৃথা আর রিভা। সুমি আর সায়েম একটু আগেই এসেছে। রিদির মুখে আজ এক চিলতে অমায়িক হাসি, যে হাসি যেন বহু দিন পর দেখা গেল। আর তা দেখেই সুমি আর পৃথা শুরু করে দিয়েছে চিরচেনা খুনসুটি, খোঁচাখুঁচি করে দুষ্টুমি।
চারপাশের হাসি খুশির রেশ কাটতে না কাটতেই—হঠাৎ করেই কিছু একটা মনে পড়তে থমকে গেল রিদির গলা।
চিন্তার এক গভীর মেঘ জমে উঠল তার চোখে-মুখে। ভারী ও রুদ্ধশ্বাসে সে ফিসফিস করে বলে উঠল, “আমার মনে হচ্ছে… এই এক্সিডেন্টটা নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়। কেউ জেনেশুনে ওনার ক্ষতি করতে চাইছে!”
সায়েম চমকে উঠল। রিদির চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে প্রায় অবিশ্বাস্য কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“তুই শিওর, রিদি?”
কোনো দ্বিধা নেই, কোনো সংশয় নেই। রিদির বুক চিরে বেরিয়ে এল এক পাথুরে আত্মবিশ্বাস। চোখের চাউনিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে সে শক্ত গলায় বলে উঠল, “আমি ওয়ান হান্ড্রেড পারসেন্ট শিওর! আমাদের যে করেই হোক… ওই গাড়ির ড্রাইভারকে খুঁজে বের করতেই হবে, জানতে হবে এই এক্সিডেন্টটা কে করিয়েছে!”
সায়েম কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে কিছুটা সময় নিয়ে বলে উঠল, “কিন্তু ব্যাপারটা তত সহজ হবে না। কিভাবে আমাদের পক্ষে সম্ভব? তুই জানিস গাড়িটা কোথায় এক্সিডেন্ট করেছিল?”
রিদি নিঃশব্দে মাথা নেড়ে ‘না’ বুঝাল।
উদ্বেগ কাটিয়ে সুমি চটজলদি বলে উঠল, “আমরা একটা কাজ করতে পারি, থানা থেকে….”
বাকি কথা শেষ করার আগেই সায়েম সতর্ক করে দিয়ে বলে উঠল, “উহু, এইটা যদি করানো হয়ে থাকে, তবে এর পিছনে বড় কোনো কারো হাত আছে। থানা থেকে আমাদের হেল্প করবে না!”
রিদি নিজের জেদি ভাবটা বজায় রেখে ভাবনাহীন গলায় বলে উঠল, “ওসব আমার…”
কিন্তু বাক্য শেষ হওয়ার আগেই রিভা এক লাফে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে উঠল, “এত ঝামেলা না করে আমরা একজন থেকে সাহায্য নিতে পারি?”

রিদি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই রিভা একটু আশার আলো দেখিয়ে বলল, “রায়ান ভাই, ফারিস ভাইয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট। আমার মনে হয় ওনার কাছে সব খবর পাওয়া যাবে! উনি আমাদের সাহায্য করতে পারে।”
রিদি গভীর কিছু একটা ভেবে নেওয়া দৃষ্টি নিয়ে বলল, “কিন্তু উনার নাম্বার তো আমার কাছে নাই!”
রিভা একচিলতে মিষ্টি হাসি হেসে নিজের ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “আমার কাছে আছে, এটা দিয়ে কল কর ভাবি!”

রিদি তখন রিভার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ডায়াল করল রায়ানের নাম্বারে। ফোনের ওপাশ থেকে রিং হওয়ার শব্দ ভেসে আসতেই রিদির বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। ফোনটা রিসিভ হতেই একটু আড়ষ্ট হয়ে, ইতস্তত স্বরে সে বলে উঠল, “হ্যালো ভাইয়া… আমি রিদি বলছি, সৌ…”
বাকি কথাটুকু শেষ করতে না দিয়েই ওপাশ থেকে রায়ানের চেনা, বিনয়ী কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “আরে ভাবি, আমি চিনতে পেরেছি! বলুন, আপনাদের কি কোনো সমস্যা হয়েছে?”
রিদি এবার কিছুটা গলা নরম করে, একটু মায়াবী আর আকুল সুরে বলল, “ভাইয়া, ছোট বোন মনে করে আমাকে একটা সাহায্য করবেন প্লিজ?”
রায়ানের হাসিমুখের মিষ্টি আওয়াজটা এপাশে স্পষ্ট শোনা গেল, “এভাবে বলতে হবে কেন, ভাবী! ফারিস ভাই তো আগেই বলে গেছেন, আপনাদের কোনো রকম সমস্যা হলে যেন আমি সবটা দেখি।”
রায়ানের এই কথা শুনে রিদির বুক থেকে যেন একটা বড় পাথর নেমে গেল। কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে সে রায়ানের কাছে পুরো ঘটনাটা খুলে বলল।

সব শুনে রায়ানের কণ্ঠস্বর কিছুটা গম্ভীর হয়ে এল। সে একটু দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলল, “কিন্তু ভাবী… সৌহার্দ্য ভাই যদি কোনোভাবে জানতে পারেন, তাহলে তো উনি প্রচণ্ড রেগে যাবেন…”
রিদি আর একটুও দেরি না করে দৃঢ় গলায় রায়ানের সেই শঙ্কা উড়িয়ে দিল, “আপনাকে ওসব নিয়ে একদম ভাবতে হবে না ভাইয়া, কেউ কিচ্ছু জানতে পারবে না, বিশ্বাস রাখুন!”
রায়ানের ভেতরকার সব দ্বিধা কেটে গেল। সে তখন আর দ্বিরুক্তি না করে সায় দিয়ে বলে উঠল, “ঠিক আছে, ভাবি!”

রাত তখন প্রায় নয়টা। একটা পরিত্যক্ত নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর সামনে চেয়ারে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা রক্তাক্ত অবস্থায় বসে আছে দুটো লোক—সৌহার্দ্যের গাড়িকে ধাক্কা দেওয়া সেই ঘাতক ট্রাক ড্রাইভার আর তার সঙ্গী।
তাদের ঠিক সামনেই একটা চেয়ারে পায়ে পা তুলে বসে আছে রিদি। তার মুখের শীতল কাঠিন্য আর চোখের হিংস্র আগুন ঘরটার বাতাস ভারী করে রেখেছে। রিদির ঠিক একপাশে ছায়াসঙ্গীর মতো দাঁড়িয়ে আছে সায়েম আর সুমি, অন্য পাশে রায়ান। ফারিসের সুনির্দিষ্ট হুকুম পেয়ে রায়ান আগেই ওদের হদিশ বের করেছিল। আর আজ ভাগ্যক্রমে নাগাল পাওয়ার সাথে সাথেই রিদিকে খবরটা দেয় সে। খবর পাওয়ামাত্রই রিদি, সায়েম আর সুমি সেখানে ছুটে এসে দুই অপরাধীকে বেধড়ক পেটায়। দীর্ঘ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাদের ওপর চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, উদ্দেশ্য একটাই—সৌহার্দ্যের এই দুর্ঘটনা কার ইশারায় ও কার পরিকল্পনায় ঘটানো হয়েছে, তা তাদের মুখ থেকে টেনে বের করা।

কিন্তু কী আশ্চর্য জেদ লোকগুলোর! এত মারধর সহ্য করার পরও একটা টু শব্দও করছে না তারা।
বিরক্তিতে রিদির পুরো মুখ থমথমে হয়ে উঠল। ধৈর্য হারিয়ে সে হঠাৎ রায়ানের দিকে ফিরে তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল, “ভাইয়া, আপনার বন্দুকটা তো একটু দিন তো!”

রিদির মুখে বন্দুকের কথা শুনে রায়ান তো রীতিমতো হকচকিয়ে গেল। রিদি যে এতটা ডেঞ্জারাস রূপ নিয়ে এদের খোঁজ করতে এসেছে, তা সে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। রায়ান ভেবেছিল হয়তো মেয়েরা সামান্য রাগ করে দু-চারটা চড়-থাপ্পর মারবে, কিন্তু এরা তো মারতে মারতে লোকগুলোকে প্রায় আধমরা বানিয়ে ফেলেছে!
রায়ান থমকে গিয়ে আমতা আমতা করে বলে উঠল, “ভাবী… এটা তো কোনো খেলনা বন্দুক না, আপ…”
কিন্তু রায়ানের কথা শেষ হওয়ার সুযোগও দিল না রিদি। নাক-মুখ কুঁচকে, বিন্দুমাত্র ভয়ের লেশমাত্র না রেখে সে ঠান্ডা মাথায় বলে উঠল, “আরে সত্যি গুলি ভরা জেনেই তো মারার জন্য নিচ্ছি! দিন না, দিচ্ছি ওটাকে টপকে!”

রায়ান দিতে না চাইলেও রিদির সেই অদম্য, পাগলাটে জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতেই হলো তাকে। ইতস্তত করে সে বন্দুকটা রিদির হাতে দিল।
বন্দুক হাতে পেয়েই রিদি মুহূর্তের মধ্যে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ট্রিগারে আঙুল রেখে সে সরাসরি ট্রাক ড্রাইভারটার কপালে বন্দুকের নলটা ঠেকিয়ে দিল। বরফের মতো ঠান্ডা গলায় সে হুমকি দিয়ে বলে উঠল, “স্বীকার যখন করবি না, তখন তোদের বাঁচিয়ে রেখে আর কোনো লাভ নেই, বল? রায়ান ভাই, এদের সোজা আরব সাগরে নিয়ে গিয়ে বালিচাপা দিয়ে দিন তো!”
সায়েম রিদির দিকে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে কটমট করে বলে উঠল, “খাটাশের বউ গাঁদাফুল! সাগরে পানি থাকে, বালি না!”

কিন্তু সায়েমের কথায় বিন্দুমাত্র কান দিল না রিদি। আগের সেই তেজ ও অনমনীয় ভাব বজায় রেখে সে রায়ানের দিকে তাকিয়ে আদেশ দেওয়ার সুরে বলল, “সেই যাই হোক, যেখানেই হোক, বালিচাপা দিন; যেন একটা হাড়ও খুঁজে পাওয়া না যায়!”
রিদির এই পাগলাটে ও উগ্র রূপ দেখে রায়ান তখন পড়ে গেল মহা ফ্যাসাদে। বিপদের চোরাবালিতে আটকে যাওয়ার মতো অবস্থা তার। রিদির কথার বিপরীতে ভয়ে মাথা নেড়ে সায় দিতে বাধ্য হলেও সে মনে মনে শিউরে উঠতে লাগল। ভয়ে গলার ভেতর বিড়বিড় করে সে মনে মনে বলে উঠল, “জামাই তো যেমন-তেমন, বউ তো আস্ত একটা মাফিয়া! হে আল্লাহ, আমি কেন জেনেশুনে এমন একটা পাগলের খপ্পরে পড়লাম? এই খবর যদি ফারিস ভাই কোনোমতে জানতে পারেন, তবে তো আমাকেই জীবিত বালিচাপা দিয়ে দেবে!”
রায়ানের কথা শেষ হওয়ার আগেই তার চোখ হঠাৎ আটকে গেল রিদির হাতের আঙুলের দিকে। বন্দুকের ট্রিগারের ওপর রিদির আঙুল এমনভাবে চেপে বসে আছে যে একটু এদিক-সেদিক হলেই বুলেট বেরিয়ে যেতে বাধ্য। বুক কেঁপে ওঠে রায়ানের। আতঙ্কে চিৎকার করে সে সবেমাত্র বলতে গেল, “ভা…”
তার সেই অসমাপ্ত আর্তনাদ গিলে খেয়ে মুহূর্তের মধ্যে গোটা ঘরটা কেঁপে উঠল একটা বিকট, কর্কশ শব্দে! কান ফাটানো শব্দে বুলেট ছুটে বেরিয়ে গেছে। আচমকা এই কাণ্ডে সায়েম আর সুমি ভয়ে “ইন্নালিল্লাহ” বলে একলাফে বহু দূরে সরে গেল। এমনকী খোদ রিদি নিজেও বুক কেঁপে থমকে গেল ভয়ে। গুলিটা যে এভাবে হুট করে বেরিয়ে যাবে, সে নিজেও কল্পনা করতে পারেনি। তবে পরম ভাগ্যবশত বুলেটটা কারও গায়ে না লেগে পাশের ফাঁকা দেওয়ালে গিয়ে আঘাত হেনেছে।

কিন্তু কাজের কাজ হয়ে গেছে। গুলির শব্দের তীব্রতা আর মৃত্যুর ভয়ে ড্রাইভারটা তখন থরথর করে কাঁপছে। ভয়ে কাঠ হয়ে সে আর্তনাদ করে উঠল, “বলছি! সব সত্যি বলছি! মারবেন না প্লিজ!”
রিদি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল, ভুল করে হলেও মোক্ষম কাজটা হয়ে গেছে। নিজের ভয়ের ভাবটা লুকিয়ে সে মুখের ওপর একটা ঠান্ডা, শক্ত ভাব ফুটিয়ে তুলল। একটু ভাব নিয়ে সে হুমকি দিয়ে বলল, “এইটা তো কেবল ট্রেইলার দেখালাম! এরপরও যদি ঠিকঠাক সত্যিটা না বলিস, তোর ওই ষাঁড়ের মতো ভুঁড়িটা একদম ঝাঁজরা করে দেব!”

বলেই সে দেরি না করে নিজের মোবাইল ফোনটা বের করে ভিডিও অন করে দিল। চোখের পলকে তার দৃষ্টি হয়ে উঠল এক্কেবারে ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো। সেই ভয়ানক চাহনি দেখে ড্রাইভারটা আর এক মুহূর্তও টিকতে পারল না, ভয়ে গড়গড় করে সব সত্যি উগলে দিল।
সব স্বীকারোক্তি মোবাইলে রেকর্ড করার পর রিদি শান্ত অথচ শীতল গলায় রায়ানের দিকে ফিরে বলল, “এই জলহস্তী দুটোকে এমন সেফ জায়গায় আটকে রাখবেন, যাতে কোনোভাবেই পালিয়ে যেতে না পারে!”
রায়ান তখন সামলে নিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিল। তবে মনে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে উঠল, “এ যে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত মাফিয়াদেরও হার মানিয়ে দিচ্ছে রে বাবা!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৪

তিনজন একসঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে সুমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এগিয়ে গিয়ে লোকটার গায়ে আরও দুটো সজোরে লাথি বসিয়ে দিয়ে ঝংকার দিয়ে উঠল, “খাওয়া-দাওয়া করে আস্ত একটা জলহস্তী হয়েছিস, অথচ ভেতরে এক ফোঁটা বুদ্ধি-শুদ্ধি নেই! বেঁচে থাকলে এখন থেকে রোজ বেশি বেশি করে হরলিক্স খাস!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৬