অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৬
রিদিতা চৌধুরী
রাত তখন প্রায় দশটা কি সাড়ে দশটা। নিস্তব্ধ রাতের চাদরে মোড়ানো চারপাশ। দূরে জ্বলতে থাকা ল্যাম্পপোস্টটার হলদেটে আলো এসে পড়েছে ঘাসের ওপর। ঠিক তার পাশেই গোল হয়ে বসে আছে সুমি, রিদি আর সায়েম। কিছুক্ষণ আগেই তারা গোডাউনের দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে বেরিয়ে মুক্ত বাতাসে এসে বসেছে।
ইতোপূর্বে রায়ান তাদের বাড়ি পৌঁছে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু সুমি মৃদু নাক সিঁটকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে— তারা একাই বাড়ি ফিরে যেতে পারবে, কোনো সমস্যা হবে না। আসলে পুরো সময়টা ধরে রায়ানের চোখের ভাষা সুমির একটুও ভালো লাগেনি। রায়ানের সেই তীক্ষ্ণ ও আচ্ছন্ন দৃষ্টি সে নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করেছে, যা একজন নারীর সূক্ষ্ম অনুভূতিতে ধরা পড়তে এক মুহূর্তও সময় লাগে না।
রিদি একটা বেঞ্চের সাথে পিঠ এলিয়ে আনমনে তাকাল রাতের গভীর আকাশের দিকে। তার কণ্ঠে এক বুক দীর্ঘশ্বাস জমিয়ে সে বলে উঠল,
“ইশ একদম মন ভরেনি আরেকটু মারতে পারলে শান্তি লাগত ”
সুমি শুকনো একটা হাসি দিয়ে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,
“হুম… এখন তবে কী করবি? স্বীকারোক্তিটা কি ঠিকঠাক মতো নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠাবি?”
রিদি কিছু একটা নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে গেল। তারপর এক অদ্ভুত দৃঢ়তা নিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“উহু, শুধু এইটুকুতে যথেষ্ট নয়! এই প্রমাণ দিয়ে ওদের মুখোশ খোলা যাবে না, ওরা দিব্যি এটাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেবে!”
সায়েম রিদির কথার সাথে সুর মিলিয়ে সায় দিয়ে বলল,
“একেবারে ঠিক বলছিস। তবে হ্যাঁ, পরিস্থিতি অতটাও সহজ হবে না। আমার মনে হয়, এই ব্যাপারে আমরা রায়ান ভাইয়ের আর কিছুটা সাহায্য নিতে পারি।”
রিদি ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকাতেই সায়েম একটু হেসে বুঝিয়ে বলল,
“মানে, ওনি শুধু ওদের গতিবিধিগুলো একটু ট্র্যাক করবে আর আমাদের আপডেট দেবে। বাকি দায়িত্বটুকু তুই আমার ওপর ছেড়ে দে! আর সবচেয়ে বড় কথা, ভেতরের খবরগুলো জোগাড় করা তো তোর জন্য আরও বেশি সহজ হবে…”
সুমি হঠাৎ করে গম্ভীর পরিবেশটা হালকা করে দিয়ে বলে বসল,
“বাদ দে তো এসব সিরিয়াস কথাবার্তা! চল, কিছু খেয়ে নিই, দারুণ খিদে পেয়েছে।”
সায়েম একটু বিরক্ত হয়ে ভুরু কুঁচকে বলল,
“এইটুকু পেটে এত খাবার তুই কোথায় রাখিস বল তো? আসার আগেই না খেয়ে আসলি?”
রিদি সায়েমের দিকে তাকিয়ে করুণ সুরে বলল,
“কই আর খেতে পারলাম! খেতে বসেই তো হুট করে বের হয়ে আসতে হলো।”
সায়েম আর পেরে উঠল না। মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবং নিজেকে গালমন্দ করতে শেষ পর্যন্ত ওদের নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টের দিকে হাঁটা ধরল। এই মেয়েগুলোকে নিয়ে বাইরে বের হওয়া মানেই নিজের পকেটের বারোটা বাজা! সুমির কাছ থেকে তাও মাঝেমধ্যে কিছু আদায় করা যায়, কিন্তু রিদি তো এমন— খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে এমনভাবে বসে থাকে, দেখলে মনে হবে কোনো রাজপ্রাসাদের মিসকিন!
সায়েম রিদির দিকে তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে খাপছাড়াভাবে বলে বসল,
“শোন, আজ কিন্তু খাওয়ার বিল তুই দিবি!”
কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই রিদি যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো! তড়িৎ বেগে প্রতিবাদ করে সে বলে উঠল,
“চল ভাই, আমার আর ক্ষিদে-টিদে কিচ্ছু নাই! যেট—”
কথাটা শেষ করতে পারল না। সায়েম এক ধমকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল,
“আরে থাম, ওরে খাটাশের বউ, ফকিন্নি! চল, আর নাটক করতে হবে না। তোর মতো এমন কিপ্টা মহিলা আমি জীবনে একটাই দেখেছি!”
রিদি নাক-মুখ কুঁচকে মানিব্যাগ সামলানোর ভঙ্গি করে বলল,
“ইশ্, এমন করে বলিস না তো! বিশ্বাস কর, একদিন তোর সব টাকা সুদে-মূলে শোধ করে দেব।”
সায়েম বাঁকা হেসে ঠাট্টার সুরে বলল,
“হুম! কবে দিবি? আমি মরে ভূত হয়ে গেলে তখন তো?”
ওরা হালকা দুষ্টুমি আর হাসাহাসি করতে তিনজনে মিলে একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে ঢুকল। চেয়ার টেনে সবেমাত্র বসেছে, এমন সময় রিদির চোখ আটকে গেল একটু দূরের একটা টেবিলের দিকে।
তার রক্ত যেন হিম হয়ে এল! সেখানটায় বসা মানুষটা আর কেউ নয়, স্বয়ং আরহান— যাকে সে নিজের ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করে। আরহান কিছু দূরে বসা একটা মেয়ের সঙ্গে বেশ খোশগল্পে মেতে আছে, হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে মেয়েটার মুখের কোণে লেগে থাকা খাবার পরম যত্নে মুছে দিচ্ছে।
রিদির ভেতরটা গুলিয়ে উঠল। যে মানুষটা কি না সবসময় কাজের অজুহাত দেখিয়ে দিনের পর দিন রাত করে বাড়ি ফেরে, স্ত্রী-সন্তানকে একটু সময় দেওয়ার ফুরসত পায় না— সে কিনা এখানে অন্য এক নারীর সাথে এমন ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে! রিদির বুকটা আজ সাথীর জন্য হুহু করে কেঁদে উঠল। মেয়েটা দুটো অবুঝ বাচ্চা নিয়ে একা একা কত না কষ্ট করে! রোজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাত জেগে পথ চেয়ে বসে থাকে— কখন আরহান বাড়ি ফিরবে,।
রিদি তীব্র ক্ষোভে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই সায়েম ইশারায় তাকে শান্ত হতে বলল। বাধ্য হয়ে রিদি দম চেপে আবার বসে পড়ল। কিন্তু ঠিক তার পরের মুহূর্তেই যা সে দেখল, তাতে রিদির মাথার চুল থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত শিউরে উঠল— মেয়েটা অত্যন্ত অবলীলায় আরহানকে ঝুঁকে এসে চুমু খাচ্ছে!
দৃশ্যটা এক মুহূর্তও সহ্য হলো না রিদির। রাগে, ঘৃণায় তার শরীর কাঁপছে। সে আর এক সেকেন্ডও সেখানে টিকতে না পেরে সোজা রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এল। পেছনে পেছনে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এল সায়েম আর সুমিও।
রিদিদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে ঘড়ির কাঁটা প্রায় এগারোটার ঘর ছুঁইছুঁই। সায়েম ওদের নামিয়ে দিয়েই গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেছে। সুমি চলে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু রিদি তাকে কিছুতেই যেতে দিল না।
দুজনে নানা কথা বলতে বলতে এসে দাঁড়াল প্রধান দরজার সামনে। দরজায় টোকা দেওয়ারও সুযোগ হলো না, তার আগেই ভেতর থেকে সাথী নিজেই দরজা খুলে দিল।
সাথীর মুখে এক চিলতে অমায়িক হাসি। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই রিদির বুকটা হুড়মুড় করে মোচড় দিয়ে উঠল। বুকের ভেতরে কেমন যেন একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস আটকে গেল।
নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে রিদি জিজ্ঞেস করল,
“ভাবী, কীভাবে বুঝলে আমরা আসছি? নক করার আগেই দরজা খুলে দিলে!”
সাথী ঠোঁটে এক ফালি মুচকি হাসি ঝুলিয়ে বলল,
“আমি বারান্দা থেকে দেখছি। তোরা দশ মিনিটের কথা বলে এত দেরি করলি কেন? কোথায় ছিলি!”
রিদি এক পলক তাকিয়ে হালকা হেসে প্রতিউত্তর করল,
“সায়েমদের বাসায়, তোমাকে বলেই তো গেলাম!”
সাথী আর কথা বাড়াল না। আমেনা খালাকে ডেকে ওদের জন্য টেবিলে খাবার দিতে বলল। ঠিক তখনই রিদি বলে উঠল,
“আমি খাব না, শুধু সু…”
রিদির অসমাপ্ত কথা কেড়ে নিয়ে সুমিও তৎক্ষণাৎ বলে ফেলল,
“আমারও ইচ্ছে করছে না।”
সত্যি বলতে, পেটে ক্ষুধা থাকলেও আরহানের ওই বিভীষিকাময় রূপ দেখার পর থেকে মনের ভেতর যে ঝড় বইছে, তাতে ক্ষুধার লেশমাত্র আর অবশিষ্ট নেই। সব যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।
সাথী নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
“তাহলে যা, ঘুমিয়ে পড়!”
রিদি কেমন এক অদ্ভুত শূন্য দৃষ্টিতে সাথীর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“তুমিও চলো। কী করবে এখানে? বাচ্চারা একা না?”
সাথী তখনও সেই চিরচেনা আত্মত্যাগী সুর ধরে রেখে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানাল,
“তোর ভাইয়া আসবে কিছুক্ষণ পর। আমি ঘুমিয়ে গেলে আবার না খেয়ে ঘুমিয়ে যাবে। আর বাচ্চারা ঘুমাচ্ছে।”
সাথীর এই উদাসীনতা দেখে রিদির রাগে শরীর কেঁপে উঠল। সে কিছু বলতে চাইল, ঠিক তখনই সুমি তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। রিদি নিজেও ভাবল, এই মুহূর্তে এগুলো করে ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই। তার থেকে বরং সৌহার্দ্য আসলে আরহানের সাথে এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে বলবে।
রিদি আর কথা বাড়াল না। সুমিকে নিজের রুমে থাকতে দিয়ে সে তাদের রুমের দিকে পা বাড়াল।
লন্ডনের সেন্ট থমাস হসপিটালের কেবিনটা তখন স্নিগ্ধ ও শান্ত আলোয় মোড়ানো। সৌহার্দ্যের শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেকটাই স্থিতিশীল। বিছানায় হেলান দিয়ে বসে সে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছে ফোনের স্ক্রিনের দিকে— যে নতুন ফোনটা ফারিস নিজে কিনে এনে দিয়েছে, কারণ বারবার ফারিসের ফোনটাই সে কাড়াকাড়ি করছিল।
স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে ফারিসের দিকে তাকিয়ে সৌহার্দ্য কিছুটা ক্লান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে উঠল,
— “ফারিস, আমার যাওয়ার ব্যবস্থা কর। কালকের মধ্যে আমি দেশে ফিরতে চাই!”
তার এমন হঠকারী সিদ্ধান্তে শাহবীরের কপালে জমে উঠল উদ্বেগের ভাঁজ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বুঝিয়ে বলার সুরে বলল,
— “মাথা খারাপ তোর? ডাক্তার পরিষ্কার বলে দিয়েছে কমপক্ষে এক সপ্তাহ তোকে এখানে থাকতে হবে। শুধু শুধু এভাবে জেদ করিস না প্লিজ!”
শাহবীরের কথায় যেন সৌহার্দ্যের ভেতরের জেদটা আরও দানা বাঁধল। রাগী ও তেজি দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে সে প্রায় চেঁচিয়ে জবাব দিল,
— “আমি নিজেই ডাক্তার! আমাকে ডাক্তারি শেখাতে আসবি না। যেটা বলছি, চুপচাপ সেটাই কর!”
বন্ধুর এই পাগলামি দেখে সুজন ক্লান্ত মুখে বিরক্তি প্রকাশ করল। অসহায়ের মতো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বিড়বিড় করে উঠল,
— “এর চেয়ে ভালো ছিল আরও দুটো দিন এটাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা!”
কথাটা বলেই সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। হুট করে চিৎ হয়ে ফ্লোরে শুয়ে পড়ল। তারপর শূন্য দৃষ্টিতে হাসপাতালের ছাদের দিকে তাকিয়ে আপন মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল,
— “বউ নাই, প্যারা নাই… যেখানে রাত, সেখানেই কাত!”
সুজনের এই খুনসুটিতে সৌহার্দ্য যখন আরও বেশি তেড়েফুঁড়ে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন সারহান চৌধুরী। সৌহার্দ্যের চিলচিৎকার আর হইচই কানে যেতেই তার মুখটা থমথমে হয়ে গেল। রাগী ও কঠোর কণ্ঠে তিনি সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন,
— “কী চাও তুমি? এভাবে বেয়াদবের মতো চেঁচিয়ে পুরো হাসপাতাল মাথায় তুলেছ কেন?”
সৌহার্দ্য বাবার দিকে এক ফলক তাকাল, তারপর বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে নির্বাক কণ্ঠে বলে উঠল,
“বউ চাই, বউ! হয় আমার এখান থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা করো, নয়তো আমার বউকে আনার ব্যবস্থা করো! আমার বউকে ছাড়া ঘুম আসছে না!”
ছেলের এমন অপ্রত্যাশিত ও কাঁচা শোনানো আকুলতায় সারহান চৌধুরীর চোখ কপালে উঠল। তিনি যেন পলকের জন্য বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। অপ্রস্তুত হয়ে গলায় আটকে থাকা কাশি সামলে নিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলেন,
“হায় আল্লাহ্, এমন বেহায়া, বউ-পাগল কার মতো হয়েছো তুমি আমাদের বংশে…”
বাবার এই বিস্ময়ভরা কথাটুকু গলাতেই আটকে রইল, তার আগেই চোখের পলকে সমস্ত বিরক্তি জমিয়ে বাবার মুখের ওপর কড়া এক জবাব ছুড়ে দিল সৌহার্দ্য,
“তোমার মতো। নিজে তো নিজের বউকে আনতে ভোলোনি, অথচ আমার বাচ্চা বউটাকে আনতে ভুলে গেছ!”
রাগে সর্বশরীর জ্বলে উঠল সারহান চৌধুরীর। আর নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে গর্জে উঠে বললেন,
“বেয়াদব ছেলে! তোমার এই নির্লজ্জতা দেখতে দেখতে একদিন আমি হার্ট অ্যাটাক করব!”
সারহান চৌধুরীর তর্জনী তোলার সেই মুহূর্তটি মিলিয়ে যাওয়ার আগেই ফারিস অত্যন্ত সরল ও নিষ্পাপ মুখভঙ্গি করে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল সারহান চৌধুরীর পানে,
“আচ্ছা মামা, এটাকে কি খেয়ে জন্ম…?”
প্রশ্নটা অর্ধেক ছুঁড়েই সারহান চৌধুরীর বিস্ফোরিত ও রোষকষায়িত চোখের দিকে নজর পড়ল তার। ঢোক গিলে তৎক্ষণাৎ আমতা আমতা করে লাইন বদলাল সে,
“না মানে… ভবিষ্যতে সেসব খাওয়া থেকে বিরত থাকতাম আরকি! আপনার ভবিষ্যৎ নাতি-নাতনিদের কথা ভেবেই যা একটু জিজ্ঞেস করছিলাম আরকি!”
ফারিসের এই চতুর সাফাইয়ে পিত্তি জ্বলে গেল সারহান চৌধুরীর। দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,
“বেয়াদবের দল!”
এরপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঘুরিয়ে শাহবীরের দিকে তাকিয়ে কিছুটা শান্ত হওয়ার সুরে বললেন,
“একমাত্র এই ছেলেটাই ভালো।”
পরক্ষণেই শাহবীরের কাঁধে দায়িত্বশীল প্রবীণের মতো চোখ রেখে আবার বলে উঠলেন,
“আচ্ছা বলো তো, তুমি ঠিক কী দেখে এই আস্ত বেয়াদবগুলোর সাথে বন্ধুত্ব…”
সারহান চৌধুরীর বাক্যটি সমাপ্ত হওয়ার বিন্দুসুমাত্র সুযোগ দিল না শাহবীর। একদম গভীর ও চরম ভাবুক ভঙ্গিতে মাথাটা একটু এলিয়ে সে বলে বসল,
“আসলে আঙ্কেল, রহস্যটা আমার নিজেরও বড় জানতে ইচ্ছে করে! যদি একটু বলতেন?”
আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ানো সম্ভব হলো না সারহান চৌধুরীর। রাগ, বিরক্তি আর রক্তচাপ একলাফে চরমে পৌঁছে যাওয়ায় হনহন করে ঘর থেকে বের হতে বিড়বিড় করে বলে উঠলেন,
“সব কটা আস্ত বেয়াদব!”
সারহান চৌধুরী বের হয়ে যেতেই কেবিনে প্রবেশ করলেন ডাক্তার আর্থার। সৌহার্দ্যকে ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মৃদু ভর্ৎসনার সুরে বলে উঠলেন,
“সো মাচ শাউটিং উইল ক্রিয়েট প্রবলেমস, ইয়াং ম্যান! ইউ নিড টু স্টে হিয়ার ফর অ্যাটলিস্ট ওয়ান মোর উইক, প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড? হোপ ইউ উইল কিপ মাই ওয়ার্ডস?”
এই হাসপাতালে চিকিৎসক থাকার সুবাদে ডাক্তার আর্থারের সাথে সৌহার্দ্যের বেশ ভালো ও আন্তরিক একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বয়সে ও অভিজ্ঞতায় সিনিয়র হওয়ায় তাঁকে যথেষ্ট সম্মানও করত সৌহার্দ্য। তাই বাড়তি কোনো কথা না বাড়িয়ে মাথা নিচু করে সে বলে উঠল,
“ওকে, বাট প্লিজ ট্রাই টু ডিসচার্জ মি অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল!”
ডাক্তার আর্থার তাঁর কথা শুনে হালকা হেসে দিলেন। স্নেহের সুরে সৌহার্দ্যের বাহুতে আলতো একটা চাপড় দিয়ে বলে উঠলেন,
“ওকে, ইয়াং ম্যান!” — এই বলেই তিনি কেবিন ছেড়ে বাইরে চলে গেলেন।
চারপাশের প্রকৃতি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘর পেরিয়ে বহু দূরে চলে গেছে। ঘুমন্ত এই শহরের বুকে নেমে এসেছে প্রগাঢ় এক নিস্তব্ধতা— যেখানে জোছনার স্নিগ্ধ আলো আর রাস্তার টিমটিমে ল্যাম্পপোস্টের হলুদরঙা ছায়া মিলে তৈরি করেছে এক অদ্ভুত মায়াবী ও রহস্যময় পরিবেশ। সেই গভীর প্রহরে হঠাৎ করেই নিস্তব্ধতা ভেঙে মৃদু আওয়াজে বেজে উঠল রিদির ফোনটা।
অর্ধেক ঘুমে থাকা চোখে রিদি ফোনটা কানের কাছে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল সৌহার্দ্যের সেই চেনা, গম্ভীর কণ্ঠস্বর—
“ঘুমাচ্ছ?”
সৌহার্দ্যের কণ্ঠস্বর কানে যেতেই রিদির ঘুম যেন নিমেষে উবে গেল। চমকে বিছানায় সোজা হয়ে বসে পড়ল সে। একবার পাশে ফিরে দেখে নিল গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন রিভাকে। এরপর অত্যন্ত সন্তর্পণে, পা টিপে টিপে নিঃশব্দে হেঁটে চলে গেল বারান্দায়। রাতের হিমেল বাতাসে মৃদু শ্বাস নিয়ে ধীর ও ক্ষীণ কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“কেমন আছেন, ডাক্তার সাহেব?”
ওপাশে সৌহার্দ্য কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। শুধু নিস্তব্ধতার বুক চিরে এক তীব্র আকুলতা নিয়ে বলে উঠল,
“ভিডিও কলে আসো, দেখব তোমাকে!”
রিদি একটু থমকে গিয়ে নিজেকে সামলে নিল, তারপর ভিডিও কলটা অন করল। স্ক্রিনে সৌহার্দ্যের চোখের দিকে তাকাতেই পলকের জন্য রিদির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সৌহার্দ্যের চোখে-মুখে তখন এক অদ্ভুত নেশা উপচে পড়ছে। কণ্ঠস্বরে মিশে আছে চরম এক মাদকতা—
“এভাবে আমার সামনে এসেছ আমাকে পাগল করার জন্য?”
সৌহার্দ্যর এমন সরাসরি কথায় রিদি এক মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে নিজের দিকে তাকাল। বুঝতে পারল, গায়ে জড়ানো ঢিলেঢালা টি-শার্টের গলাটা একটু বেশিই নিচে নেমে গেছে। লজ্জায় আরক্ত হয়ে রিদি ঝটপট টি-শার্টটা ঠিক করে নিল, আর তারপর সৌহার্দ্যের দিকে কটমট করে তাকিয়ে রাগী গলায় বলে উঠল,
“ছিঃ! লুচ্চা ডাক্তার একটা! আপনার নজর এত বাজে কেন?”
রিদির এই মিষ্টি ধমক শুনে সৌহার্দ্যের মুখে এক চিলতে দুষ্টু হাসি খেলে গেল। সে ঠোঁট কামড়ে ধরল। তারপর রিদিকে আরও একটু রাগিয়ে দেওয়ার মজায় মেতে সে বাঁকা হেসে বলে উঠল,
“নিজে মিষ্টির ঢাকনা খোলা রাখবে, আর সেখানে মাছি বসতে চাইলে দোষটা কার?”
সৌহার্দ্যের এমন নির্লজ্জ কথায় রিদি লজ্জায় একদম টকটকে লাল হয়ে খাপ্পা সুরে বলে উঠল,
“আপনি দিন দিন একটু বেশিই বেহায়া হয়ে যাচ্ছেন, লুচ্চা ডাক্তার একটা!”
সৌহার্দ্য এবার কণ্ঠে এক তীব্র বেপরোয়া ভাব এনে আরও একটু ঝুঁকে এল ক্যামেরার দিকে, নিচু স্বরে বলল,
“কাছে থাকলে এখনই বুঝিয়ে দিতাম লুচ্চামি কাকে বলে! যত সূত্র আছে, সবকটা এপ্লাই করতাম।”
সৌহার্দ্যের কথার ধরনে রিদি একমুহূর্ত থমকে গেল, তারপর অবুঝ আর এক মায়াবী সুরে অবুঝ শিশুর মতো প্রশ্ন করে বসল,
“লুচ্চামির আবার সূত্র থাকে নাকি?” জানতাম না তো?
ঘোর লাগা কণ্ঠে সৌহার্দ্য ফিসফিস করে বলে উঠল,
“জানবে বেবি! আমাকে আসতে দাও; ফিরে আসলে একটা একটা করে হাতে-কলমে বুঝিয়ে দেবো, মাই হার্ট” কাম এখন কয়েকটা…..
কথাটার মাঝ পথে থেমে গেল সৌহার্দ্য, ঠিক তখনই দরজায় মৃদু শব্দ করে সুজন ঢুকে পড়ে বলে উঠল,
“সৌহার্দ্য, তোর ওষুধ—”
বিরক্তিতে কুঁকড়ে গিয়ে সৌহার্দ্য তীব্র এক নজরে সুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সমস্যা কী তোর? টাইমিং সেন্স এত খারাপ কেন? সব সময় অন্যের প্রাইভেসি নষ্ট করতে চলে আসিস কেন বল তো!”
সুজন একটু থমকে গিয়ে হকচকিয়ে গেল। তারপর কিছুটা অপ্রতিভ হয়ে বলল,
“এ বাবা, আমি আবার কী করলাম! তোর ওষুধের টাইম হয়ে গেছে যে!”
বলেই সে সৌহার্দ্যের দিকে ওষুধটা বাড়িয়ে দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সুজনের চোখ হঠাৎ সৌহার্দ্যের ফোনের স্ক্রিনের দিকে চলে গেল। রিদিকে ভিডিও কলে কথা বলতে দেখেই সুজন পরিস্থিতি বুঝে ফেলল। একটা দুষ্টু হাসি লুকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে সে গান ধরে বসল—
“একটা বউ নাই বলে আজ, ইনকামিং কলের ঢল,
ধরলেই কাস্টমার কেয়ার বলে— ‘স্যার, অফার লাগ…'”
পুরো লাইনটা শেষ করার সুযোগই পেল না সুজন! সৌহার্দ্যের এক ঝটকায় তেড়ে আসা রামধমক খেয়ে সে একপ্রকার দৌড়েই রুম থেকে চম্পট দিল।
সুজন চলে যাওয়ার পর সৌহার্দ্যের নজর হঠাৎ স্ক্রিনে রিদির গলার দিকে পড়ল। মুহূর্তেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। রিদির গলার দিকে তাকিয়ে সে কিছুটা কাঠখোট্টা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তোমাকে যেই পেন্ডেন্টের সাথে ওই চেইনটা দিয়েছিলাম, সেটা কোথায়? তোমাকে না বলছি, ওটা সব সময় গলায় পরে থাকতে? আমার কথা কেন একটা কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দাও তুমি?”
দুর্ঘটনাটার ঠিক কিছু দিন আগের কথা। রিদিকে রাফ ইউজ করার জন্য একটা সাধারণ চেইন উপহার দিয়েছিল সৌহার্দ্য, আর কড়া নির্দেশ দিয়ে বলেছিল সবসময় যেন সেটা তার গলাতেই থাকে। কিন্তু রিদির গলায় কোনো কিছু পরে থাকতেই ভীষণ অস্বস্তি হয়, সবসময় একধরনের বিরক্তি কাজ করে। তাই সে ওটা আলমারিতে তুলে রেখে দিয়েছিল এবং যথারীতি ভুলেও গিয়েছিল।
রিদি অপরাধীর মতো আমতা আমতা করে বলে উঠল,
“আসলে আমি…”
কিন্তু বাক্যটা শেষ করার সুযোগ দিল না সৌহার্দ্য। বিরক্ত আর ধমকের সুরে সে বলে উঠল,
“পরের বার যখন কল দেবো, চেইনটা যেন তোমার গলায় দেখি!”
রিদি আর কোনো কথা বাড়াল না, মিনমিন করে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
এরপর সৌহার্দ্য দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল দেশে রাত অনেক গভীর হয়েছে। রিদির দিকে তাকিয়ে ফোনের স্ক্রিনেই একটু ঝুঁকে একটা ভালোবাসার চুম্বন ছুড়ে দিয়ে সে নরম গলায় বলল,
“ওকে সুইটহার্ট, এখন ঘুমিয়ে পড়ো, অনেক রাত হয়েছে!”
রিদি মুখে এক ফালি মিষ্টি হাসি টেনে সৌহার্দ্যের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফোনটা কেটে দিল। তারপর বারান্দা থেকে ঘরে ফিরে আলমারিটার দরজা খুলল। সৌহার্দ্যের বকুনি খাওয়ার ভয়ে আর তার প্রতি বুকভরা ভালোবাসার টানে শেষমেশ আলমারি থেকে চেইনটা বের করে নিজের গলায় পরে নিল রিদি। এমনিতে গলায় কিছু পরার অভ্যাস তার নেই বললেই চলে, কেমন যেন লাগে; কিন্তু আজ সৌহার্দ্যের কথা রাখতে গিয়ে সেই বিরক্তিটুকু নিমেষেই কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
ক্যালেন্ডার থেকে খসে গেছে প্রায় আরও বিশ দিন। সময় গড়িয়ে চললেও সৌহার্দ্য এখনো আটকে আছে ওই ভিনদেশী শহর লন্ডনেই। সেদিন সরহান চৌধুরীর সাথে সেই তীব্র তর্ক-বিতর্কের পরেই তাকে সহ শাহেদা চৌধুরী আর ফারিসকে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে সে। বউয়ের দুশ্চিন্তায় বুক চিরে আসছিল তার, যদিও সে প্রথমে ফারিসকে পাঠাতে একদমই রাজি ছিল না। তার ইচ্ছে ছিল শাহাবীর যেন ফিরে যায়। কিন্তু শাহাবীরের নাকি লন্ডনে জরুরি কিছু কাজ বাকি, তাই সে থেকে গেছে সৌহার্দ্যের সাথেই একসাথে দেশে ফিরবে বলে।
তার মধ্যে ফারিস নিজেও তো দেশের একজন দায়িত্বশীল সংসদ সদস্য। চাইলেও তার পক্ষে এভাবে অনন্তকাল দেশের বাইরে পড়ে থাকা সম্ভব ছিল না। এদিকে ঘন ঘন রায়ানের ফোন আসছে, দেশে তার জরুরি উপস্থিতি দরকার। সবমিলিয়ে শেষ পর্যন্ত চরম অনীহা আর একরকম নিরুপায় হয়েই ফারিসকে দেশের বিমানে তুলে দিতে বাধ্য হয় সৌহার্দ্য।
বিদায়ের মুহূর্তেও দুষ্টু ফারিস খ্যাপানোর সুরে বলেছিল, “তুই দেশে ফেরা পর্যন্ত তোর বউয়ের সব দায়িত্ব আমার, একটুও টেনশন নিস না ভাই!” ব্যস, এ কথা শুনেই সৌহার্দ্যের রাগ একদম সাতমাসে চড়ে বসেছিল। রিদির থেকে দূরে থাকার সেই চরম হুমকি-ধমকি দিয়েই তবে সে ফারিসকে দেশের বিমানে উঠতে দিয়েছিল।
ওদিকে হাসপাতালের পাট চুকে গেছে কবেই। শরীর কিছুটা সামলে উঠলেও ব্যবসার এক জটিল কাজে আটকা পড়ে গেছে সে। রিভানের পক্ষে একা সবটা সামলানো সম্ভব হচ্ছিল না বলেই এই দীর্ঘপ্রবাসী বন্দিদশা। কিন্তু শরীর লন্ডনে থাকলেও, তার মনটা পড়ে আছে দেশের ওই একটুকরো ঘরে। দিনে কম করে হলেও কুড়িবার রিদির ফোনে আছড়ে পড়ে তার আকুলতা। একটাই কাতর অনুরোধ, “সৌহার্দ্যের দেশে ফেরার আগে যেন কোনোভাবেই ঘর থেকে পা না বের হয় রিদির।”
রিদির পড়াশোনায় একচুলও যেন বিঘ্ন না ঘটে, সে ব্যাপারে সে চরম সচেতন। সায়েমকে ফোন করে সাফ নির্দেশ দিয়ে দিয়েছে, সব প্রয়োজনীয় নোটস যেন ঠিকমতো রিদির হাতে পৌঁছে যায়। আর রাত নামলেই দীর্ঘ ভিডিও কলের স্ক্রিনে চোখ রেখে, পরম যত্নে সেই জটিল পড়াগুলো নিজ হাতে বুঝিয়ে দেয় সৌহার্দ্য। দূর থেকেও যেন ছায়া হয়ে আগলে রাখে তার ভালোবাসাকে।
রাত তখন প্রায় ১১টা। ডাইনিং টেবিলের সামনে পাথর হয়ে বসে আছে রিদি। সামনে সুস্বাদু খাবার সাজানো, অথচ তার সমস্ত সত্তা জুড়ে যেন এক অদ্ভুত অনীহা। গত কয়েকটা দিন ধরেই এভাবেই কাটছে তার। দুপুরের এক গ্রাস খাবারও ঠিকমতো গলা দিয়ে নামেনি। গম্ভীর মুখে রিদির সামনে বসে আছেন শাহেদা চৌধুরী। তাঁর সেই চিরচেনা চোখের দৃষ্টিতে রয়েছে একরাশ শাসন। যতক্ষণ না রিদি খাচ্ছে, টেবিল থেকে ওঠার কোনো জো নেই।
ওনার এই কঠোর দৃষ্টির কাছে হার মেনে রিদি সবেমাত্র এক লোকমা ভাত মুখে তুলেছে, অমনি তার পুরো শরীরটা বিদ্রোহ করে উঠল। তীব্র বমি ভাবটা এমন এক মুহূর্তের ঝড়ে রূপ নিল যে, আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সে দৌড়ে বেসিনের কাছে গিয়ে সব উগলে দিল। শাহেদা চৌধুরী বুকভাঙা এক গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে রইলেন রিদির দিকে। কিছুক্ষণ পর ধীর পায়ে রিদির কাছে এগিয়ে এসে নরম হাতে তার চুলগুলো সরিয়ে পিঠে আলতো বুলিয়ে দিলেন, পরম মমতায় জিজ্ঞেস করলেন, “কবে থেকে এমন হচ্ছে তোর?” রিদি লজ্জায় লাল হয়ে আমতা আমতা করে ফিসফিসাল, “এই তো আম্মু, অল্প কিছু দিন হলো।”
ঠিক তখনই চঞ্চলা হাওয়ার মতো হাজির হলো পৃথা। হাতে এক টুকরো তেঁতুল আচার বাড়িয়ে দিয়ে সে নরম গলায় বলল, “এটা মুখে দে, একটু ভালো লাগবে।” ক্লান্ত রিদি ধীর পায়ে সোফায় এসে বসল এবং আচারটা মুখে পুরল।
শাহেদা চৌধুরী তখনো নিজের মনের ভেতর জমা হওয়া হাজারো ভাবনাকে মেলাবার চেষ্টা করছেন। বুকের ভেতর কেমন যেন এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল তাঁর। ইতস্তত পায়ে এগিয়ে এসে তিনি কিছু জানতে চাইলেন, তাঁর মনে উঁকি দেওয়া সেই মধুর ভাবনাটাই সত্যি কিনা। রিদি লজ্জায় আরক্ত হয়ে মৃদু মাথা নেড়ে নীরবে সম্মতি জানাল।
কথাটা শোনার সাথে সাথেই শাহেদা চৌধুরীর কপালে চিন্তার সব মেঘ মুহূর্তের মধ্যে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। সেখানে ফুটে উঠল নিখাদ আনন্দের এক স্বর্গীয় ঝিলিক। তাঁর চোখের কোণ দুটো খুশিতে চিকচিক করে উঠল। আবেগে ভেঙে পড়ে তিনি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, “তাহলে আর দেরি করছিস কেন রে? এখনই টেস্টটা করে ফেল। আমি এখুনি একটা প্রেগনেন্সি কিট…”
শাহেদা চৌধুরীর কথা শেষ হওয়ার আগেই পৃথা খুশিতে চকিত হয়ে বলে উঠল, “মামুনি, তোমায় দৌড়াতে হবে না, আমার কাছে এক্সট্রা কিট আছে, আমি দিচ্ছি।” বলেই সে ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরল রিদির হাত, টেনে নিয়ে গেল নিজের ঘরে। পৃথা পরম যত্নে ইউরিন প্রেগনেন্সি টেস্ট কিটটা রিদির কাঁপা কাঁপা হাতের মুঠোয় গুঁজে দিল, আর বুঝিয়ে দিল ব্যবহারের ছোট্ট নিয়মগুলো। রিদির বুক তখন ঢাকের মতো ধুক ধুক করছে। একদিকে অজানা ভয়, অন্যদিকে এক অসীম প্রাপ্তির শিহরণ। কাঁপা পায়ে সে কিটটা হাতে নিয়ে ঢুকে পড়ল বাথরুমে।
ঠিক দশটি মিনিট কেটে গেল যেন অনন্তকালের মতো। রিদি যখন বাথরুমের দরজা খুলে বাইরে এল, পৃথা তখন অধীর আগ্রহে বুক চেপে জিজ্ঞেস করল, “কী রে? কী রিপোর্ট এল?”
রিদি আর কথা বলতে পারল না, শুধু লাজুক মুখে চোখ নিচু করে মৃদু মাথা নাড়ল। রেজাল্ট পজিটিভ।
এই পরম কাঙ্ক্ষিত সুখবরটা কান পর্যন্ত পৌঁছানোর সাথে সাথেই পৃথা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক লাফে এগিয়ে এসে সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল রিদিকে। গলার স্বরটা কেঁপে উঠল আবেগে, চোখে জল এসে গেল খুশিতে, “উফ! কী যে আনন্দ! আজ বুকটা জুড়িয়ে গেল। আমরা দুইজন একসাথে মা হবো।”
রিদির সারা শরীর যেন এক অদ্ভুত, অবর্ণনীয় ভালো লাগায় থরথর করে কেঁপে উঠল। তার মনে তখন দোলা দিচ্ছে হাজারটা প্রজাপতি। সে মনে ভাবছে, সৌহার্দ্যকে কীভাবে সে জানাবে তাদের অস্তিত্বের আগমন। এ কথা ভাবতেই মেয়েটার কোমল দুটি গাল লজ্জার রক্তিম আভায় লাল হয়ে উঠল।
রিদি তখন পৃথার রুম থেকে বের হয়ে শাহেদা চৌধুরীকে খুশির খবরটা দিতেই আনন্দের জোয়ারে তাঁর চোখ দুটো ছলছল করে উঠল, তিনি প্রায় কেঁদে ফেললেন। পরম মমতায় রিদিকে সাবধানে থাকার তাগিদ দিয়ে চটজলদি নিজের রুমে পাঠিয়ে দিলেন। এই মুহূর্তে শরীর ও মনের শান্তির জন্য পর্যাপ্ত ঘুম ভীষণ জরুরি।
রিদি রুমে ফিরে আলগোছে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। নিজের উদরের ওপর পরম যত্নে হাত রেখে ফিসফিস করে বলে উঠল, “আমার ছোট্ট সোনা… তোমার বাবা যখন জানতে পারবে তুমি আসছো, তখন তার অনুভূতি কেমন হবে বল তো? সেটা দেখার জন্য আমার বুকটা কেমন যেন ছটফট করছে।”
কথাটা শেষ করেই পাশ থেকে হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিল সে। সৌহার্দ্যের নাম্বারে ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে রিসিভ হলো না ঠিকই, তবে ঠিক এক সেকেন্ডের মাথায় স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার মেসেজ, “পাঁচ মিনিট ওয়েট করো জান, একটু বিজি আছি।”
মেসেজটা দেখে রিদির ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে লাজুক হাসি। তারপর প্রতিদিনের মতো সৌহার্দ্যের ছবিটা বুকে জড়িয়ে পরম শান্তিতে বিছানায় শুয়ে পড়ল সে।
রাত তখন প্রায় দুটো। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, নিঝুম চারপাশ। কেবল দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছে। ফারিস বিছানায় হেলান দিয়ে বসে গভীর মনোযোগে ল্যাপটপে কাজ করছিল। তার পরনে একটা ঢিলেঢালা টি-শার্ট। তার পাশে রিভা, এক অদ্ভুত আদুরে ভঙ্গিতে ফারিসের বুকের মধ্য ঘাপটি মেরে বসে আছে। সে যেন ফারিসের অস্তিত্বের সাথে মিশে যেতে চাইছে। ল্যাপটপের নীলচে আলোয় রিভার নিষ্পাপ মুখখানা আরও বেশি স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে, সে আধো ঘুমে আচ্ছন্ন।
কাজ করতে করতে ফারিস অনুভব করল রিভা ঘুমের ঘোরেও তার টি-শার্টটা আরও শক্ত করে খামচে ধরেছে। সে ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে রিভার দিকে তাকাল। ভালোবাসায় মনটা ভরে উঠল। পরম মমতায় সে রিভার কপালে একটু চুমু দিয়ে বলল, “শশুরের বেয়াদব মেয়ে ঘুমাবিনা?”
ফারিসের আদুরে কণ্ঠস্বর শুনে রিভা চোখ না খুলেই ফারিসের বুকে নাক ঘসতে ঘসতে বলল, “আপনি ঘুমাবে না ফারিস ভাই?”
ফারিসের এতক্ষণের কোমলতা মুহূর্তেই উধাও। ‘ভাই’ ডাকটা শুনলেই যেন তার সমস্ত শরীরে আগুন জ্বলে ওঠে। সে তেতে উঠে বলল, “পকেট সাইজের ঝড়, তুই আমাকে ভাই ভাই বলে আমার গেদা গুলোর মুখে আমাকে মামা ডাক শোনাতে চাস?”
রিভা এবার বিরক্তির ভান করে নাক মুখ কুচকে ফেলল। ঘুমের আবেশে তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত শিশুসুলভ জেদ চলে এল। সে বিরক্ত হয়ে বলল, “ফুফাতো বোন বিয়ে করছেন কেন? আমি তো বাচ্চাদের শিখাবে আপনাকে যেন মামা ডাকে হুম!
ফারিস এবার সত্যি সত্যি বিরক্ত হলো। গম্ভীর গলায় বলল, “তোর ভাই ও তো খালাতো বোন বিয়ে করেছে, তো রিদি কি তাকে ভাই ডাকে?”
রিভা তার চিরচেনা নেকা কণ্ঠে বলল, “ভাবী তো আর ছোট বেলা থেকে ভাইয়ার সাথে ওভাবে কথা ও হয়নি, তাই তার অভ্যাস ও হয়নি, আমি তো আপনাকে ছোট থেকে ভা…”
রিভার কথা শেষ হলো না। ফারিস আর সহ্য করতে পারল না। সে রিভার ঠোঁটের মধ্য জোড়াল একটা কামড় বসিয়ে দিয়ে বলল, “আর একবার ভাই বলল, খবর আছে তোর, পোঁকলা দাঁত!”
বলেই পাশে ল্যাপটপটা রেখে রিভাকে বুকের মাঝেই জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল!
ভোর প্রায় চারটা। ঠিক যখন রাত আর সকালের সীমানাটা মিলেমিশে একাকার, তখনই কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল ফোনের মৃদু রিংটনে। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করতে থাকা ‘সৌহার্দ্য’ নামটা দেখেই রিদির ঘুমজড়িত ঠোঁটে এক পলকে ফুটে উঠল মিষ্টি হাসি।
ফোনটা কানে ঠেকাতেই চঞ্চল কণ্ঠে এক চিলতে অভিমান ঝরে পড়ল তার গলায়, “ডাক্তার সাহেব! পাঁচ মিনিট বলে পুরো একটা রাত কাটিয়ে দিলেন?”
ওপাশ থেকে বউয়ের এই অভিমানী সুর শুনে সৌহার্দ্যের ঠোঁটের কোণটাও মৃদু হাসিতে মুচড়ে উঠল। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে সে শান্ত অথচ ক্লান্ত গলায় বলল, “বিজি ছিলাম জান। এখন এয়ারপোর্টে আছি, আর ঘণ্টা খানেক পরে ফ্লাইট।”
কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই রিদির চোখ-মুখ যেন খুশিতে ঝলমল করে উঠল। সে তো প্রায় বলেই ফেলতে চেয়েছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর খবরটা, কিন্তু পরক্ষণেই থেমে গেল। ভাবল, আর তো মাত্র কয়েক ঘণ্টা। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে নিজের মুখে এই খুশির খবরটা দেওয়ার যে কী আনন্দ, সেটা ভেবেই সে নিজেকে সামলে নিল এবং চুপ করে রইল।
ওদিকে রিদির এই অস্বাভাবিক নীরবতা টের পেয়ে সৌহার্দ্য একটু কৌতূহলী হলো। গমগমে গম্ভীর স্বরে সে বলল, “কী ব্যাপার ম্যাডাম, লজ্জা পাচ্ছেন নাকি?”
লজ্জায় রাঙা হয়ে রিদি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে সৌহার্দ্য আদুরে অথচ পুরুষালি কণ্ঠে নির্দেশ দিল, “এখন ঘুমান। আর মাত্র কয়েকটা ঘণ্টার অপেক্ষা। আমি দেশে পৌঁছানোর পর আপনার আর ঘুমানোর কোনো সুযোগই থাকবে না, ম্যাডাম। এতদিনের দূরত্বের প্রতিটা মুহূর্তের সুদে-আসলে হিসাব বুঝে নেব।”
কথাটা শেষ করেই লাইনটা কেটে দিল সৌহার্দ্য। রিদি অপলক তাকিয়ে রইল নিভে যাওয়া মোবাইল স্ক্রিনের দিকে। বুকটা তখন অচেনা এক উত্তেজনায় কাঁপছে। সৌহার্দ্য যখন জানবে তাদের অস্তিত্বের আগমন তখন তার অনুভূতি কেমন হবে।
কলেজ শেষ করে ক্যাম্পাসের খোলা প্রাঙ্গণের একপাশে বসে আছে রিদি, সুমি, সায়েম আর পৃথা। আজ রিদির কলেজে আসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু সায়েম সকাল সকাল ফোন করে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, আজ একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে, তাই আসতেই হবে। শাহেদা চৌধুরীও রিদিকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, “জরুরি ক্লাস হলে আর শরীর মোটামুটি ভালো থাকলে কলেজ কামাই করার দরকার নেই, কিছুদিন পরেই তো পরীক্ষা শুরু।” ওনার কথাতেই শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছিল সে।
তবুও সকাল থেকে রিদির মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে আছে। বুকের ভেতর অকারণ এক চাপা অস্বস্তি বারবার দোলা দিয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে, আজ যেন কিছু একটা ঠিক নেই। চারপাশের সবকিছুই আজ তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। ইচ্ছে করছে সব ফেলে এখনই বাড়ি ফিরে যেতে। কেন এমন অনুভূতি হচ্ছে, তার কোনো উত্তর সে নিজেও খুঁজে পাচ্ছে না।
একবার নয়, কয়েকবার অস্থির দৃষ্টিতে পুরো ক্যাম্পাসে চোখ বুলিয়ে নিল সে। কেন যেন মনে হলো, কেউ একজন দূর থেকে নিবিড়ভাবে তাকে লক্ষ্য করছে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই অনুভূতিটা আবার মিলিয়ে গেল। নিজের মনকেই অকারণে দোষ দিয়ে জোর করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রিদি। হয়তো শরীরটা ভালো নেই বলেই এমন অদ্ভুত লাগছে।
তার এমন অন্যমনস্ক ভাবটা সুমির চোখ এড়াল না। কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, “কী রে? তোকে আজ কেমন যেন লাগছে। শরীর বেশি খারাপ করছে নাকি?”
রিদি মৃদু হেসে বিষয়টা হালকা করার চেষ্টা করল। তারপর নিচু স্বরে বলল, “জানি না… কেন যেন বুকের ভেতরটা কেমন ধড়ফড় করছে। একদম ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে, এখনই বাড়ি চলে যাই।”
সুমি আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে রিদির হাতটা আলতো করে চেপে ধরে বলল, “এত ভাবিস না। হয়তো শরীরটা দুর্বল বলেই এমন লাগছে। আর একটু বস, তারপর একসাথেই বের হব।”
রিদি আর কিছু বলল না। শুধু নিজের অকারণ অস্থিরতাটাকে জোর করে চাপা দিয়ে বন্ধুদের কথায় মন দেওয়ার চেষ্টা করল।
চারজনের টুকটাক হাসিমুখের আড্ডার মাঝেই হঠাৎ ডিপার্টমেন্টের পরিচিত এক ব্যাচমেট এসে রিদির সামনে দাঁড়াল। ছেলেটা একটু ইতস্তত করে বলল, “রিদি… অ্যানাটমির ডক্টর জামিল স্যার তোকে গেটের বাইরে ডাকছেন। সৌহার্দ্য স্যার নাকি তোকে কিছু নোট দিতে বলছে।”
ছেলেটার কথা শুনে সায়েম ভুরু কুঁচকে সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তাকাল। “জামিল স্যার আবার হুট করে গেটের বাইরে ডাকবেন কেন? ডিপার্টমেন্টে বা ক্লাসেই তো দিতে পারতেন!” তারপর রিদির দিকে তাকিয়ে বলল, “চল, তোর সাথে আমিও যাই।”
রিদি হালকা হেসে মাথা নাড়ল। “না রে, দরকার নেই। স্যার যখন ডেকেছেন, আমি গিয়ে দেখেই আসছি কী ব্যাপার।”
কথাটা বললেও বুকের ভেতরের অজানা অস্বস্তিটা যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য পা দুটোও যেন এগোতে চাইছিল না। তবুও নিজেকে সামলে ধীর পায়ে ক্যাম্পাসের মূল গেটের দিকে এগিয়ে গেল সে।
গেটের বাইরে এসে চারপাশে ভালো করে চোখ বুলিয়েও ডক্টর জামিলকে তো দূরের কথা, পরিচিত কাউকেই দেখতে পেল না রিদি। বিস্মিত হয়ে আরও কয়েক পা এগিয়ে চারপাশে তাকাল। কোথাও কেউ নেই।
সন্দেহ আর অস্বস্তি একসাথে চেপে বসল তার মনে। ধীরে ধীরে ঘুরে ক্যাম্পাসের ভেতরে ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই ঠিক সেই মুহূর্তে ওত পেতে থাকা অদৃশ্য এক বিপদ বজ্রপাতের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর।
কিছু বুঝে ওঠার বা সাহায্যের জন্য চিৎকার করারও সুযোগ পেল না সে। মুহূর্তের মধ্যে শক্ত এক হাত তার মুখ শক্ত করে চেপে ধরল, যাতে গলা দিয়ে কোনো শব্দই বের হতে না পারে।
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৫
আরেকজন তার শরীরটাকে জোর করে টেনে নিয়ে গেল রাস্তার পাশে আগে থেকেই স্টার্ট করে রাখা কালো রঙের একটি গাড়ির দিকে।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে, আশপাশের কেউ কিছু বুঝে ওঠারও সুযোগ পেল না। পলকের মধ্যেই রিদিকে গাড়ির ভেতরে ঠেলে ঢুকিয়ে দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দেওয়া হলো। পরের মুহূর্তেই গাড়িটা বিকট শব্দ তুলে ঝড়ের গতিতে ছুটে গেল, মুহূর্তের মধ্যে কলেজ এলাকা পেরিয়ে লোকালয়ের ভিড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
