অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৭
রিদিতা চৌধুরী
মধ্য দুপুরের চড়া রোদে ক্যাম্পাসের খোলা প্রাঙ্গণটি যেন এক টুকরো উত্তপ্ত ক্যানভাস। মাথার ওপর নীল আকাশ থেকে সূর্য যেন সোনা নয়, সরাসরি আগুন ঢেলে দিচ্ছে। পিচঢালা পথ থেকে শুরু করে চারপাশের সবকিছু তীব্র আলোয় ঝিকমিক করছে। রোদের এই অসহ্য আঁচ এড়াতে ক্যাম্পাসের কুকুরগুলোও ছায়া খুঁজে বেড়াচ্ছে, আর গাছের পাতাগুলো গরমে নেতিয়ে পড়ে একদম স্থির হয়ে আছে।
প্রাঙ্গণের একপাশে ঘাসের ওপর স্নিগ্ধ ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল একটা রেইনট্রি গাছের নিচে এখনো বসে আছে সুমি, সায়েম আর পৃথা। কিন্তু সায়েমের অস্থির মন যেন সেখানে টিকছে না। সে বারবার বিরক্তিতে কুঁচকে যাওয়া চোখে হাতের ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। রিদির আসার কোনো নামগন্ধ নেই দেখে গলায় বিরক্তির চরম মাত্রা ফুটিয়ে সে বলে উঠল,
— “এতক্ষণ কী করছে গাঁদা ফুলটা?”
সায়েমের এমন কথায় সুমি একটু নাক কুঁচকে, ভ্রুযুগল কুঁচকে উদাসীন ভঙ্গিতে জবাব দিল,
— “স্যার কী এমন নোট পাঠিয়েছে বুঝলাম না। তুই তো ওকে সব নোটাস কালেক্ট করে দিস?”
সুমির এই কথাটি কানে যাওয়া মাত্রই সায়েমের বুকের ভেতর কেমন যেন একটা সন্দেহের চাবুক মেরে গেল। তার চেহার অভিব্যক্তি মুহূর্তে বদলে গেল। কপালে জমে উঠল চিন্তার ভাঁজ। আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে সে ঝট করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে গেটের দিকে এগোতে গেল। সায়েমের এহেন আচরণের পেছনে অজানা আশঙ্কায় ভুগে সুমি আর পৃথাও তক্ষুনি উঠে দাঁড়াল এবং তার পিছু পিছু দ্রুত পায়ে গেটের কাছে এগিয়ে গেল।
গেটের কাছাকাছি আসতেই সায়েমের বুকটা ধড়ফড় করে কেঁপে উঠল। তার গলার কাছে যেন কার অদৃশ্য আঙুল চেপে বসল। গেটের আশপাশে রিদির ছায়ার লেশমাত্রও নেই! চারপাশের এই শূন্যতা দেখে সুমি আর পৃথার মুখও ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তাদের চোখে-মুখে এখন স্পষ্ট আতঙ্ক। কাঁপা হাতে কোনোরকমে মোবাইলটা বের করে সুমি রিদির নাম্বারে কল দিল। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পর ওদিক থেকে ভেসে এল সেই নিঝুম, নিস্পৃহ নারী কণ্ঠ — “আপনার কাঙ্ক্ষিত নাম্বারটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে!”
ফোন নামিয়ে আতঙ্কে নীল হয়ে যাওয়া দৃষ্টিতে সুমি সায়েমের দিকে তাকাল। আর ঠিক তখনই পৃথার বুক চিরে সব বাঁধ ভেঙে গেল। ভয়ে থরথর করে কেঁপে সে একপ্রকার কেঁদেই দিল! তাকে শাহেদা চৌধুরী বারবার বলে দিয়েছেন, “দুইজন যেন আলাদা না হয়, একজন যেন অন্যজনকে দেখে রাখে!”
সায়েমের মাথার ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে আসছে। উত্তেজনায় আর চরম আশঙ্কায় তার হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। চোখের সামনে শুধু অন্ধকার দেখছে সে। কোনো সময় নষ্ট না করে সে দিশেহারা হয়ে চারপাশের কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীকে প্রায় আকুলভাবে জিজ্ঞেস করল, “রিদিকে… রিদিকে কি তোমরা কেউ দেখেছো?”
সবার কাছ থেকে ভয়ে ভয়ে আসা “না” সূচক উত্তরগুলো যেন তার বুকের ওপর ভারী পাথরের মতো এসে পড়ল।
আর এক মুহূর্তও দেরি করল না সায়েম। কাঁপা হাতে দ্রুত ফোনটা বের করে ডায়াল করল রায়ানের নাম্বারে। ওপাশ থেকে রিং হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রিসিভ হলো ফোনটা। গলা কাঁপছে, আতঙ্কে রুদ্ধ হয়ে আসছে কণ্ঠ। কোনোমতে দম নিয়ে সায়েম আর্তনাদ করে উঠল,
“রায়ান ভাই! রিদিকে… রিদিকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না! আপনি একটু… আপনি একটু ফারিস ভাইকে জানান প্লিজ!”
সায়েমের এই আতঙ্কিত কথাটা কানের পর্দায় আছড়ে পড়তেই রায়ানের বুকের ভেতরটা চমকে উঠল। রক্ত যেন এক মুহূর্তে হিম হয়ে গেল। সে ভালো করেই জানে, এই খবরটা ফারিসের কানে পৌঁছানো মানে জলজ্যান্ত এক ঝড়ের মুখোমুখি হওয়া। ফারিস কথাটা শুনলে আস্ত রাখবে না কাউকেই! কারণ, সৌহার্দ্য বারবার কড়া নির্দেশ দিয়েছিল — কলেজ থেকে শুরু করে তাদের বাড়ির মূল গেট পর্যন্ত সবসময় যেন ছদ্মবেশে বিশ্বস্ত লোক মোতায়েন থাকে।
সৌহার্দ্য তো ভালো করেই জানত, সে রিদিকে যতই কড়াভাবে মানা করুক না কেন বাড়ি থেকে বের না হতে, তার এই জেদি বউটি ঠিকই কথা অমান্য করবে। তাই তো সে নিজের লোকদের পাশাপাশি ফারিসকে ফোন করে রায়ানকে এই সুরক্ষার দায়িত্বটা বিশেষভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিল।
রায়ান কাগজে-কলমে ফারিসের সেক্রেটারি হতে পারে, কিন্তু সৌহার্দ্যের কাছে সে একজন বিশ্বস্ত অনুচরের চেয়েও অনেক বেশি। নিজের ছোট ভাইয়ের স্নেহের চোখে সৌহার্দ্য তাকে দেখে, আর তাই নিজের হাতে বেছে রায়ানকে সে ফারিসের ছায়াসঙ্গী ও ভরসার জায়গা হিসেবে ঠিক করে দিয়েছিল। আর আজ সেই দায়িত্বের মাঝেই এত বড় একটা ফাঁকফোকর তৈরি হয়ে গেল!
রায়ান সায়েমের ফোনটা কেটে দিয়েই মুহূর্তের মধ্যে ডায়াল করল নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সেই ছেলেগুলোর নাম্বারে। ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হতেই রায়ানের গলা চিরে বেরিয়ে এল এক পৈশাচিক গর্জন —
“তোদের ঠিক কী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রে হারামিগুলো? ভাবীকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না কেন?!”
ওপাশ থেকে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ছেলেটি তোতলিয়ে বলে উঠল, “আ… আসলে ভাই, ভাবী তো সাধারণত বাড়ি থেকে বের হন না, তাই আমরা ভেবেছিলাম…”
পুরো বাক্যটা শেষও করতে পারল না সে। তার আগেই গালাগালির এক দীর্ঘ ঝড় তুলে ফোনটা কেটে দিল রায়ান। ভয়ে তার বুক তখন কাঁপছে। কোনোমতে পায়ে পায়ে গিয়ে সে হাজির হলো ফারিসের সামনে। কিন্তু গলার কাছে এসে সব কথা যেন আটকে গেছে। ভয়ে মুখ দিয়ে রা বের হচ্ছে না।
ফারিস বিরক্ত চোখে তাকাল রায়ানের দিকে। এরপর ভ্রু কুঁচকে, কটমট করে তেড়ে বলে উঠল,
“এভাবে পায়খানা কষা মানুষের মতো মুখ বানিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা বলার জলদি বল!”
ভয়সন্ত্রস্ত রায়ান আমতা আমতা করে কোনোমতে ফিসফিস করে বলল, “ভাই… ভাবীকে… ভাবীকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না!”
বিরক্তিতে মুখটা কুঁচকে ফারিস বলতে গেল, “এইমাত্র তো আমি আমার বউ…”
হঠাৎ কী যেন একটা মনে পড়তে তার মুখের কথা মুখেই আটকে গেল। পরমুহূর্তেই রাগে সর্বশরীর কেঁপে উঠল ফারিসের। চোখ দুটো লাল করে সে চিৎকার করে উঠল, “পাওয়া যাচ্ছে না মানে কী?! রিদি বাড়ি থেকে বের হয়েছে নাকি?!”
রায়ান ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে শুধু ওপর-নিচ মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বোঝাল। এরপর সায়েমের সাথে তার যা যা কথা হয়েছে, পুরো ঘটনাটা এক নিঃশ্বাসে খুলে বলল।
পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে ফারিস এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। ঠান্ডা মাথায় সে ফোন লাগাল শাহেদা চৌধুরীর কাছে। ফুফুকে আতঙ্কে না ফেলে অত্যন্ত কৌশলে, ইনিয়ে-বিনিয়ে সে জানতে চাইল রিদি বাড়ি ফিরেছে কি না। ওপাশ থেকে শাহেদা চৌধুরী যখন বললেন রিদি ফেরেনি, তখন ফারিসের বুকের ভেতরটা আঁতকে উঠে ধক করে উঠল! সৌহার্দ্যকে এখন সে কী জবাব দেবে? যে মানুষটা দিনে অন্তত দশবার ফোন করে রিদির সেফটির খোঁজ নেয়!
মনে মনে রিদিকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করতে ফারিস আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে যত ওপরমহলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারী পরিচিত ছিল, সবাইকে একে একে কল করতে শুরু করে দিল সে।
এদিকে সৌহার্দ্যের প্লেন ল্যান্ড করার সময়ও প্রায় হয়ে এসেছে। উপায় না দেখে ফারিস আর দেরি করল না। ঝড়ের বেগে নিজের গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে!
বিকেল তখন প্রায় চারটা। কাঁপা কাঁপা পায়ে ত্রস্ত পদক্ষেপে বাড়ির চৌকাঠে এসে পা রাখল পৃথা। লিভিং রুমের সোফায় আগে থেকেই অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করছিলেন শাহেদা চৌধুরী। কলেজে মেয়েটাকে পাঠিয়ে তিনি প্রথম থেকেই চরম একটা অস্বস্তি আর টেনশনের মধ্যে ছিলেন। বারবার দরজার দিকে তাকিয়ে পথ চেয়ে বসেছিলেন কখন রিদি ফিরে আসবে।
কিন্তু যখন তিনি দেখলেন — রিদির জায়গায় পৃথা একাই ফিরেছে, আর কান্নায় তার পুরো চোখ-মুখ ফুলে লাল হয়ে আছে — তখন আতঙ্কে শাহেদা চৌধুরীর বুকটা ধক করে কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তও দেরি না করে তিনি দ্রুত এগিয়ে গেলেন পৃথার দিকে। উদ্বিগ্ন, থরথর কাঁপাকাঁপা গলায় তিনি জিজ্ঞেস করে উঠলেন,
“আমার রিদি কই? তোমার এমন অবস্থা কেন? আমার মেয়েটা কোথায়?”
নিজেকে আর একটুও সামলে রাখতে পারল না পৃথা। শাহেদা চৌধুরীর মুখের ওপর হুমড়ি খেয়ে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল এবং ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে রিদিকে না পাওয়ার সমস্ত ঘটনা খুলে বলল।
পৃথার মুখে সেই দুঃসংবাদটা শোনামাত্রই শাহেদা চৌধুরীর বুকফাটা আর্তনাদে কেঁপে উঠল পুরো বাড়িটা। সেই চিৎকার শুনে ওপরের তলা থেকে দৌড়ে নিচে নেমে এলেন সারহান চৌধুরী আর রিমা চৌধুরী। কান্নার তোড়ে শাহেদা চৌধুরীর গলা দিয়ে আর কোনো শব্দই বের হচ্ছিল না। তিনি শুধু ডুকরে কেঁদে উঠলেন। এরপর সারহান চৌধুরী নিজেই দিশেহারা হয়ে পৃথার কাছ থেকে সমস্ত ঘটনাটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মুহূর্তের জন্য তার নিজেরও পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। তিনি টাল সামলাতে না পেরে পাশের সোফায় এলিয়ে পড়লেন।
তিনি মর্মে মর্মে জানেন, এই ছোট্ট মেয়েটা তার ছেলের প্রাণ। রিদির গায়ে সামান্য একটা আঁচড় লাগলেও তার সেই উন্মাদ ছেলেকে বাঁচানো দুনিয়ার কারোর পক্ষেই সম্ভব হবে না। তা ছাড়া, সৌহার্দ্য প্রতিদিন অন্তত কয়েকবার ফোন করে একটাই কড়া নির্দেশ দেয় — রিদিকে যেন সে আসা পর্যন্ত চোখের আড়াল না করা হয়। আজ সৌহার্দ্যের কাছে তিনি কী জবাব দেবেন? তার ওপর তার প্রয়াত বন্ধুর শেষ আমানত!
নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে তিনি দ্রুত ফারিসের নাম্বারে ফোন করলেন। ওপাশ থেকে ফারিস তাঁকে শক্ত থাকার সান্ত্বনা দিল এবং বিন্দুমাত্র চিন্তা করতে বারণ করে সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিল। তবে সারহান চৌধুরীও হাত গুটিয়ে বসে রইলেন না। নিজের পরিচিত পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে উচ্চমহলের সমস্ত প্রভাবশালী মহলে তিনি খবর পাঠিয়ে দিলেন। তার একটাই পণ — যেভাবেই হোক, সুস্থ ও অক্ষত অবস্থায় তার পুত্রবধূকে তার ঘরে ফিরিয়ে আনতেই হবে!
সন্ধ্যা পেরিয়ে প্রকৃতি তখন গাঢ় অন্ধকারের চাদরে মুড়ে গেছে। কোনো এক নির্জন, পোড়ো গোডাউনের মতো স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ঘর। একটা কাঠের চেয়ারের সাথে শক্ত করে বাঁধা রিদির দুই হাত। জ্ঞান না থাকায় নিথর দেহটা একপাশে মাথা এলিয়ে ঝুলে আছে। যে লোকগুলো তাকে অজ্ঞান করেছিল, তাদের করা সেই আচ্ছন্নতা এখনো কাটেনি।
ঘরের ঠিক মাঝখানে অন্য একটা চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে এক মধ্যবয়সী লোক। তীক্ষ্ণ আর ক্রুর দৃষ্টিতে সে অপলক পর্যবেক্ষণ করছে রিদিকে।
লোকটা এক ইশারা করতেই গার্ড এগিয়ে এসে রিদির হাতের বাঁধনগুলো চটজলদি খুলে দিল এবং মুখে একচিলতে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দিল। পানির স্পর্শ পেতেই রিদির চোখ দুটো ধীরে ধীরে পিটপিট করে কেঁপে উঠল। কষ্টে কোনোমতে সে চোখের পাতা মেলে তাকাল সামনের মানুষটার দিকে।
সামনের লোকটার বাঁকা হাসল। সেই তির্যক হাসি হেসে লোকটা ব্যঙ্গ করে বলে উঠল,
“কী মামুনি, আমাকে দেখে একদম শকর্ড নাকি?”
রিদি তাতে ঘাবড়াল না বিন্দুমাত্র। বরং মৃদু এক পলক হেসে, দারুণ অবজ্ঞায় ঠোঁটটা বাঁকিয়ে সে স্পষ্ট গলায় বলে উঠল,
“উহু… আপনার ওই ভালোমানুষের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আস্ত শয়তানটাকে আমি অনেক আগেই চিনে ফেলেছিলাম!”
রিদির এই নির্ভীক কথা শুনে গোডাউন কাঁপিয়ে হো হো করে হেসে উঠল সারবান চৌধুরী। তারপর এক পা এগিয়ে এসে রিদির মুখের ঠিক সামনে ঝুঁকে ফিসফিস করে হিসহিসিয়ে উঠল,
“ভাই-বোন দুটো একদম ওই পালক বাপটার মতো হয়েছিস! তোর ওই বাপটাও আমার পেছনে লাগতে এসেছিল, শেষমেশ কী হলো? অকালেই তো দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হলো তাকে! সেদিন তোমাকেও ওই একই কায়দায় শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ওই তাজওয়ান শুয়োরের বাচ্চাটা…”
কথাটা মাঝপথেই থেমে গেল। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আসিফ শিকদারের দিকে হঠাৎ চোখ পড়তেই গলা থেকে কথা যেন আটকে গেল সারবান চৌধুরীর!
সারবান চৌধুরী তার শীতল দৃষ্টি আবার ফিরিয়ে আনল রিদির দিকে। ক্রুর হাসিতে মুখটা বিকৃত করে সে বলে উঠল,
“এখন মামুনি বাঁচতে চাইলে চটপট বলে দাও তো আমার বিরুদ্ধে জোগাড় করা প্রমাণগুলো কই?” বের করো!
রিদি এই হুমকিতে একটুও দমে গেল না। বরং চরম বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে অবজ্ঞার সুরে সে জবাব দিল,
“আপনার কী মনে হয়, আমি ওই প্রমাণগুলো হাডুডু খেলার জন্য জোগাড় করেছি? যে ওগুলো সাথে নিয়ে মাঠে-ঘাটে দৌড়াবো? সেটা…”
রিদির কথা পুরো শেষ হওয়ার আগেই পাশ থেকে মুখ বাঁকিয়ে বিদ্রূপের সুরে আকিব শিকদার বলে উঠল,
“একদম বাপের মতো ইলবিশ হয়েছে ভাই-বোন দুটোই। একটা তো আমার খেয়ে, আমার পরে কী সুন্দর আমাকেই গোল দিয়ে গেল!”
সারবান চৌধুরী কারো কোনো কথায় কান দিল না। সে সরাসরি রিদির দিকে তাকিয়ে একটা ভয়ঙ্কর গর্জন দিয়ে বলে উঠল,
“এখনো সময় আছে, ভালোয় ভালোয় বলো — পেনড্রাইভ আর ভিডিওগুলো কী করছো? ওগুলো দিয়ে দিলে তোমার কোনো ক্ষতি করব না।”
এরপর সে আসিফ শিকদারের হাত থেকে আইনি কোর্টের একটা পেপার টেনে নিয়ে রিদির সামনে বাড়িয়ে দিয়ে কড়া গলায় বলল,
“এটাতে সিগনেচার করে দাও!”
কাগজটার দিকে তাকিয়ে রিদি নিজের ভ্রু কুঁচকে ফেলল। তার সন্দেহজনক দৃষ্টি দেখে সারবান চৌধুরী খলখলিয়ে হেসে বুঝিয়ে দিল,
“এখানে লেখা আছে — তুমি খান বংশের কোম্পানির সমস্ত শেয়ার আমার কাছে স্বেচ্ছায় বিক্রি করে দিচ্ছ।”
এই কথা শোনার পর রিদি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। রাগে তার শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। ফুঁসে উঠে সে ঘৃণাভরে বলে উঠল,
“কোন দুঃখে আমি আমার শেয়ার বিক্রি করতে যাব? আমার স্বামীর কি টাকার অভাব পড়ছে নাকি, যে আমাকে বাপের বাড়ির সম্পত্তি বিক্রি করে খেতে হবে?”
রিদির মুখে মুখে এমন কড়া জবাব শুনে সারবান চৌধুরী আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারল না। রাগে তার চোখ দুটো লাল হয়ে গেল, আর পরমুহূর্তেই সে রিদির কোমল গালের ওপর সজোরে ঠাস ঠাস করে দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দিল। আঘাতেই রিদির ঠোঁট ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ল।
এত বড় একটা শারীরিক আঘাত পাওয়ার পরও রিদির মুখের জেদ বা দৃঢ়তা একচুলও কমল না। সে একটুও পিছপা হলো না। বরং কোনো কথা না বলে ঠিক একটা ক্ষিপ্ত সাপের মতো ফুঁসে ভীতিহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সরাসরি সারবান চৌধুরীর চোখের দিকে।
রিদির এমন তেজ দেখে সারবান চৌধুরী আরও ক্ষেপে গিয়ে আবার তার গায়ে হাত তুলতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই তেড়ে এসে সামনে এসে দাঁড়াল আরহান। সে হাত বাড়িয়ে সারবান চৌধুরীকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি দেখছি, আর মারতে হবে না ওকে!”
এরপর সে রিদির ঠিক পাশে নরমভাবে বসল। গলার স্বর কিছুটা নামিয়ে মোলায়েম সুরে সে অনুরোধের সুরে বলল,
“প্লিজ বনু, বলে দে না পেনড্রাইভটা কোথ…”
বাকি কথাটা তার গলাতেই আটকে গেল। কারণ তার দিক থেকে কথাটা শেষ হওয়ার আগেই রিদি আগের চেয়েও বেশি ফুঁসে উঠে ঘৃণাভরে বলে উঠল,
“ওই পাপী মুখে আমাকে বোন ডাকবেন না! আর আমি জীবনেও কিচ্ছু বলব না!”
রিদির এমন পাথরের মতো শক্ত জবাব শুনে আরহানের মুখটা অভিমানে ও লজ্জায় একদম মলিন হয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। চুপচাপ মাথা নিচু করে সামনে থেকে সরে গেল।
এদিকে সারবান চৌধুরী রাগের বদলে এবার মুখে এক অদ্ভুত কুৎসিত হাসি টেনে আনল। ঠান্ডা আর ভয়ঙ্কর গলায় সে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“ঠিক আছে, মুখ দিয়ে তোকে কিচ্ছু বলতে হবে না! এখন পেটে যে সন্তানটাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস, তাকে নিয়েই এই দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় হয়ে যা!”
কথাটা কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রিদির বুকটা ধক করে কেঁপে উঠল। ভয়ে আর আতঙ্কে নিজের অজান্তে তার হাতটা চলে গেল পেটের ওপর। কাঁপাকাঁপা গলায় একরাশ আকুতি নিয়ে সে বলে উঠল,
“ছোট আব্বু, আপনি এত নিষ্ঠুর কীভাবে হতে পারছেন? আপনি না আমাকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতেন? কীভাবে পারবেন আপনার নিজের ভাইয়ের ছেলের রক্তকে… এভাবে শেষ করে দিতে?”
সারবান চৌধুরী কিছু একটা বলতে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তেই একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরহান একটা চরম ব্যথাতুর ও বিদ্রূপের হাসি হেসে বলে উঠল,
“যে মানুষটার কাছে নিজের জন্ম দেওয়া সন্তানেরই কোনো মূল্য নেই, তার কাছে আবার ভাইয়ের ছেলের অনাগত সন্তানের মূল্য!”
আরহানের মুখে এমন কথা শুনে সারবান চৌধুরী আগুনরঙা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। এরপর দৃষ্টি ফিরিয়ে সরাসরি রিদির দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
“আমি তোকে ঠিক এক ঘণ্টা সময় দিচ্ছি! এর মধ্যে মুখ খুলে বলবি পেনড্রাইভ আর ভিডিওগুলো কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস। নতুবা তোকে যদি এই গোডাউনে তিলে তিলে মেরে ফেলি, তবে ওই প্রমাণগুলোর হদিস দুনিয়ার কেউ পাবে না! মনে রাখিস, এই একটা মাত্র পেনড্রাইভের জন্যই তোর ওই বাপকেও অকালে মরতে হয়েছিল!”
কথাটা শেষ করেই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল। তার পেছন পেছন একে একে বেরিয়ে গেল আকিব শিকদার আর আসিফ শিকদারও।
ঘরের সবাই একে একে চলে যাওয়ার পর আরহান আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে দ্রুত এগিয়ে এসে রিদির ঠিক সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। অপরাধী গলায় মিনতি করে সে বলে উঠল,
“ভাইয়াকে একটু ক্ষমা…”
কথাটা তার মুখ থেকে পুরোপুরি বের হওয়ার আগেই রিদি চরম অবজ্ঞায় চোখ দুটো ফিরিয়ে নিল অন্য দিকে। নিজের মুখটা পুরোপুরি অন্যদিকে সরিয়ে নিতেই আরহানের বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মলিন মুখে, অসহায়ের মতো সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকল না। ঝাপসা চোখে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
ফ্ল্যাশব্যাকে ভেসে ওঠে সেদিনটার কথা।
সেদিন সৌহার্দ্যকে যে ড্রাইভারটা অ্যাক্সিডেন্ট করিয়েছিল, তার কাছ থেকে যখন তারা পাকড়াও করে জবানবন্দি আদায় করেছিল, তখন সেই ড্রাইভার সোজা মুখে উচ্চারণ করেছিল সারবান চৌধুরী আর আসিফ শিকদারের নাম। তবে ওই নামগুলো শোনার পর রিদির ভেতর কোনো আতঙ্কের বা চমকে ওঠার রেশ ছিল না। কারণ এর অনেক আগেই শাহাবীর আর এসপি হারুনুর রশীদ তাকে সুনির্দিষ্টভাবে চৌধুরী বাড়ির বিরুদ্ধে ইনফরমেশন জোগাড় করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। নারী পাচার, অর্গান ট্রেডিং, স্মাগলিংয়ের মতো জঘন্য সব অপরাধের জাল বুনছিল চৌধুরী বাড়ির কেউ একজন, যে প্রতিবার অপরাধ করে আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যেত।
সেদিন রিদি, সায়েম আর সুমি মিলে রায়ানের সাহায্য নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু প্রমাণপত্র জোগাড় করতে পেরেছিল। যদিও সেই প্রমাণগুলো একনজরে খুব বেশি শক্তিশালী মনে হতো না, তবুও তা দিয়ে চৌধুরী বাড়ির কালো সাম্রাজ্যের একটা অংশ হলে ফাঁস করা সম্ভব ছিল।
আর যখন সেই প্রমাণগুলো রিদি এসপি হারুনুর রশীদের হাতে তুলে দিয়েছিল, তখন তিনি রিদিকে মারাত্মকভাবে সাবধানে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কথায় কথায় তিনি টেনে এনেছিলেন রিদির প্রয়াত বাবা আকরাম খানের কথা, যিনি ছিলেন হারুনুর রশীদের খুব ভালো বন্ধু। সেদিন এসপি হারুনুর রশীদ রিদিকে এমন একটা সত্যি জানিয়েছিলেন, যা শোনার পর রিদির পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছিল — তার বাবার সেই মৃত্যুটা আদতে কোনো সাধারণ অ্যাক্সিডেন্ট ছিল না! শিকদার পরিবার এবং এই অপরাধজগতের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে এমন মারাত্মক কিছু প্রমাণ আকরাম খানের হাতে চলে এসেছিল, যার জন্যই তাকে ঠান্ডা মাথায় পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর সেই আসল রহস্য, সেই সমস্ত কুকীর্তির নিখুঁত প্রমাণ লুকিয়ে ছিল গোডাউনে বারবার যেটার কথা বলা হচ্ছে — সেই একটা মাত্র ছোট্ট পেনড্রাইভটা!
হারুনুর রশীদের মুখে বাবার মৃত্যুর আসল সত্যটা শোনার পর রিদির স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সারা শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এসেছিল। এতদিন রিদি অন্ধের মতো বিশ্বাস করে আসছিল যে, ওই ঘটনাটা কেবলই একটা সাধারণ আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর নিজের জীবন বাঁচানোর তাগিদে ও নানা প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করতে করতে এত গভীরে গিয়ে কিছু ভাবার মতো মানসিক স্থৈর্য বা বয়স তখন ওই ছোট্ট মেয়েটার ছিল না।
এসপি হারুনুর রশীদের সাথে রিদির প্রথম দেখা হয়েছিল মাত্র কয়েক মাস আগে, তাও আবার শাহাবীরের হাত ধরে। শাহাবীরের যখন সুনির্দিষ্ট সন্দেহ হলো যে এই সমস্ত অপরাধের শেকড় লুকিয়ে আছে ওই চৌধুরী বাড়িতে, তখন সে নিজের আসল পরিচয় রিদির সামনে প্রকাশ করে, যে সে একজন স্পেশাল আন্ডারকভার অফিসার, “সিআইডি টিম”। চৌধুরী বাড়ির ভেতরকার খবর জোগাড় করার জন্য সে রিদির সাহায্য চায় এবং একপর্যায়ে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় এসপি হারুনুর রশীদের সাথে। যদিও ছোটবেলায় হারুনুর রশীদকে রিদি দেখলেও এত বছর পর তার মুখটা তার মনে ছিল না, তবে হারুনুর রশীদ ঠিকই একনজরে চিনে ফেলেছিলেন তাঁর বন্ধু আকরাম খানের মেয়েকে।
সেদিন, হারুনুর রশীদের মুখ থেকে ওই রহস্যময় পেনড্রাইভের কথা কানে আসতেই রিদির মাথার ভেতর ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল বহু পুরনো একটা স্মৃতি। তার বাবার মৃত্যুর ঠিক কিছুদিন আগের একটা বিকেল চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। আকরাম খান সেদিন পরম যত্নে একটা ছোট পেনড্রাইভ মেয়ের হাতে গুঁজে দিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলেছিলেন,
“আম্মু, এটা খুব সাবধানে এমন কোনো জায়গায় লুকিয়ে রাখবে, যেখানে মানুষের কল্পনাতেও আসবে না যে এখানে কিছু থাকতে পারে। তুমি ছোট মানুষ, তাই তোমার কাছেই জিনিসটা সবচেয়ে নিরাপদ। ঠিক সময়মতো আমি তোমার কাছ থেকে এটা আবার চেয়ে নেব।”
বাবা পুলিশ অফিসার হওয়ায় ছোট্ট রিদি সেদিনই আন্দাজ করতে পেরেছিল, এর পেছনে নিশ্চিতভাবেই কোনো ভয়ঙ্কর অপরাধীর নাম ও কুকীর্তির প্রমাণ লুকিয়ে আছে। তাই সে একটুও দেরি না করে নিজের বিছানার ম্যাট্রেসের ভেতর সেটা ঢুকিয়ে অতি নিখুঁত হাতে সুতো দিয়ে সেলাই করে দিয়েছিল। আকরাম খানের মৃত্যুর পর আকিব শিকদার পুরো খান বাড়ি তন্ন তন্ন করে তেরোটা বাজিয়ে ফেললেও সেই পেনড্রাইভের নাগাল পায়নি! কারণ রিদির সেলাইয়ের কাজটা এতটাই নিখুঁত ছিল যে বাইরে থেকে বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় ছিল না। আর সবচেয়ে বড় কথা — একটা ছোট মেয়ের বেডরুমের ম্যাট্রেসের ভেতরে যে এত বড় একটা চাঞ্চল্যকর গোপন তথ্য লুকিয়ে থাকতে পারে, তা ওই শয়তানগুলোর মাথাতেও আসেনি।
এসপি হারুনুর রশীদের কাছ থেকে পুরো বিষয়টি শোনার পর রিদি আর কালক্ষেপণ করেনি। বাড়ি ফিরে সে দ্রুত শাহাবীরকে ফোন করে সেই পেনড্রাইভের কথা জানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কপাল খারাপ! বাতাসে ভেসে বেড়ানো সেই খবর ঠিকই কোনো না কোনোভাবে শুনে নিয়েছিল সারবান চৌধুরী। আর তখনই সে এক মুহূর্তের জন্যও ভুল করেনি — সে নিখুঁতভাবে বুঝে গিয়েছিল যে, তাদের কালঘাম ছুটিয়ে দেওয়া সেই মূল্যবান পেনড্রাইভটা আর কোথাও নয়, সরাসরি ওই রিদির কাছেই লুকিয়ে আছে!
রাত প্রায় দশটা। ঢাকার হযরত শাহজাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গেট দিয়ে একে একে বেরিয়ে এল সৌহার্দ্য, সুজন, শাহাবীর আর আরহান।
আবহাওয়া খারাপ থাকার কারণে তাদের ফ্লাইটটি মাঝপথে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কিছুক্ষণের জন্য আটকে রাখা হয়েছিল। যে কারণে অনেক আগেই ঢাকায় ল্যান্ড করার কথা থাকলেও ফ্লাইটটি বেশ দেরিতে ঢাকায় পৌঁছায়। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনায় সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেছে।
বিমানবন্দরের ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েই সৌহার্দ্য অস্থির হয়ে একাধিকবার চেষ্টা করেছিল রিদির সাথে যোগাযোগ করার। কিন্তু প্রতিবারই ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এসেছে সেই পরিচিত নিঝুম নৈঃশব্দ্য — রিদির ফোনটা বন্ধ। শাহেদা চৌধুরীর সাথে কথা বলেও কোনো লাভ হয়নি। উনি কেমন যেন এড়িয়ে গেছেন, অদ্ভুত সব কথা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। মায়ের এই গোলমেলে আচরণে সৌহার্দ্যের বুকটা তখনই কেমন যেন কেঁপে উঠেছিল।
গেট পেরিয়ে বাইরে আসতেই চোখে পড়ল ফারিস দাঁড়িয়ে আছে। থমথমে, বিবর্ণ তার মুখ।
সৌহার্দ্য এগিয়ে গিয়ে ফারিসের মুখোমুখি হলো। ফারিসের এই অদ্ভুত নিথর চেহারা দেখে তার বাঁ চোখের পাতাটা কেঁপে উঠল। ভ্রু কুঁচকে সে তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করল, “কী ব্যাপার, ফারিস? হোয়াটস দ্য প্রবলেম? সব ঠিক আছে তো?”
ফারিস কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শাহাবীরের চোখের ইশারাটা তার চোখ এড়ালো না। কিন্তু সৌহার্দ্যের সেই শিকারী পাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে কি সত্যি লুকিয়ে রাখা যায় কিছু?
এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না সৌহার্দ্য। বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে গিয়ে সে খপ করে ফারিসের শার্টের কলার চেপে ধরল। ফুঁসে উঠল উন্মত্ত এক গর্জন, “কী হয়েছে বল! আমার বউ কোথায়? তোকে না দায়িত্ব দিয়ে ছিলাম ওর খেয়াল রাখতে? মাত্র বিশটা দিন… একটা মেয়ের সুরক্ষা তুই দিতে পারলি না? কিসের এমপি তুই?!”
ফারিস মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। অপরাধবোধ তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই শাহাবীর দ্রুত এগিয়ে এসে সৌহার্দ্যকে ফারিসের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিল। শক্ত গলায় বলল, “এখন এসব নিয়ে মাথা গরম করার সময় নয়, সৌহার্দ্য। ওকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। আর এই কাজের পেছনে অন্য কেউ নয় — তোর নিজের রক্ত, তোর আপনজনই জড়িত!”
শাহাবীরের কথা শুনে সৌহার্দ্য যেন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে গেল। এক সেকেন্ডের জন্য তার চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই তার পুরো অবয়বটা অদ্ভুত এক বরফশীতল শান্ত রূপ ধারণ করল। সে একটুও চমকাল না। বরং শাহাবীরের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত, অথচ হাড় হিম করা গলায় বলল, “বাচ্চা মেয়েটাকে এসবে না জড়ালে তোর হচ্ছিল না? আমার রিদির গায়ে যদি একটা ফুলের টোকাও লাগে, তবে ওদের সাথে তোকেও…” কথা শেষ করল না সৌহার্দ্য। শুধু তার চোয়ালের শক্ত পেশিগুলো কেঁপে উঠল।
ভেতরটা থরথর করে কাঁপছে তার। বুক চিরে বেরিয়ে আসতে চাওয়া আর্তনাদটাকে জোর করে গিলে ফেলল সে। এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে ফারিসের দিকে সরাসরি নির্দেশ দিল, “তোর ফোনের জিপিএস ট্র্যাকিং অ্যাপটা ওপেন কর! রিদির পেন্ডেন্টে ট্র্যাকার বসানো আছে! পেন্ডেন্টের লোকেশন ট্রেস কর, দ্রুত!”
নির্দেশ পাওয়া মাত্রই ফারিস তার পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে আঙুল চালাল। পরমুহূর্তেই সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল, “পেয়েছি! লোকেশন সিগন্যাল দিচ্ছে… টঙ্গীর ওদিকের ওই ঘন জঙ্গল ঘেরা পরিত্যক্ত মেহগনি বাগান বা নদীর ধারের নির্জন এলাকা থেকে!”
আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না সৌহার্দ্য। ঝড়ের বেগে পার্কিংয়ের দিকে ছুটে গেল সে। ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে হুড়মুড় করে ভেতরে গিয়ে বসল। ঠিক তার পেছনেই দম ফেলতে ফেলতে এসে বসল শাহাবীর আর ফারিস, সুজন, আরবান। গাড়ির ইঞ্জিন গর্জে উঠল। তারপর রাতের ঢাকার পিচঢালা পথ পেরিয়ে বুলেটগতির চেয়েও দ্রুতবেগে টঙ্গীর সেই অন্ধকার, কুয়াশাচ্ছন্ন বুনো জঙ্গলের পথের দিকে ছুটে চলল।
নিস্তব্ধ রাতের কালো চাদরে ঢাকা জঙ্গলটা যেন আরও বেশি ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। চারপাশের অশুভ সব শব্দ ফায়ার ফিসফিস করে কিছু বলছে, আর ঠিক তার মাঝেই একটা পুরোনো, ভাঙা দেয়ালের আড়ালে শরীর গুটিয়ে বসে আছে রিদি। তার ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ রাতের নিঃশব্দতাকে যেন আরও ভারী করে তুলেছে। এতক্ষণ বুক ভরা সাহস নিয়ে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করলেও, এখন আর শরীর কিংবা মন — কোনোটার সাথেই পেরে উঠছে না সে। ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে তার সমস্ত শক্তি।
এরই মধ্যে তার তলপেটে শুরু হলো এক চিনচিনে ব্যথা, যা মুহূর্তের মধ্যে অসহ্য হয়ে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। শরীরের ক্লান্তি, এই অব্যক্ত যন্ত্রণা, আর তার ওপর দুপুর থেকে এক ফোঁটা পানিও পেটে না পড়ার ধকল — সব মিলিয়ে রিদি যেন তিল তিল করে শেষ হয়ে যাচ্ছে। পেটে হাত চেপে ধরে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
পেটে পরম যত্নে হাত বুলিয়ে সে ফিসফিস করে বলে উঠল, “ডাক্তার সাহেব… কোথায় আপনি? আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, আমি আর পারছি না এই যন্ত্রণা সহ্য করতে! আমাদের অনাগত বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে নিন না প্লিজ!”
কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় পেটে আবার হাত বুলিয়ে থেমে থেমে সে ফিসফিসাল, “ডাক্তার সাহেব, আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় খুশির খবরটা বোধহয় আর আপনাকে জানানো হবে না। মনে হচ্ছে, আমাদের আর কখনো দেখা হবে না…”
বলেই বুকফাটা কান্নায় শব্দ করে ভেঙে পড়ল রিদি।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ঝোপঝাড় আর অন্ধকারের বুক চিরে সামনে একটা অবয়ব — একটি ছায়ার উপস্থিতি টের পেয়ে সে চমকে উঠে চোখ তুলল। আর চোখের সামনে তাজওয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই রিদির গলার কান্না গলায় আটকে গেল। ভয়ে সে যেন আরও কুঁকড়ে গেল। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে চরম আতঙ্ক নিয়ে সে ফিসফিস করে বলে উঠল, “দূরে থাকুন! ছুঁবেন না আমাকে!”
রিদির ভয়কাতুরে ও কুঁকড়ে যাওয়া রূপটা দেখে তাজওয়ান এক পা পিছিয়ে গেল। এরপর শান্ত অথচ আকুতির সুরে নরম গলায় সে বলে উঠল, “প্লিজ বার্ড, ভয় পেয়ো না। আমি তোমার এতটুকু ক্ষতি করব না, প্লিজ একটু বিশ্বাস করো আমায়?”
কিন্তু রিদির মনে জমা থাকা ঘৃণা ও আতঙ্কের পাহাড় কি এত সহজে গলে? এই মানুষটিই তো বারবার সৌহার্দ্যের জীবনটা নরক বানিয়ে তুলতে চেয়েছিল। এমনকি রেপের মতো জঘন্য অপরাধে সৌহার্দ্যকে ফাঁসানোর চেষ্টা থেকে শুরু করে তাকে পৃথিবী থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার কত শত ফন্দিই না সে এঁটেছে! শাহাবীরকে সাহায্য করতে গিয়ে গোপন সব তথ্য হাতানোর সময় তাজওয়ানের এই অন্ধকার রূপটা রিদির কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। শুধু ওই শেষ অ্যাক্সিডেন্টটুকু বাদে, যেখানে হয়তো তাজওয়ানের হাত ছিল না, বাকি সৌহার্দ্যর সাথে সব অপরাধের মূল হোতা তো এ-ই!
রিদি ভয়ে আরও এক পা পিছিয়ে গেল। তার চোখেমুখে অনাস্থা আর তীব্র ঘৃণা দেখে তাজওয়ান আর আত্মসংবরণ করতে পারল না। সে ধুলোমাখা মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। রিদির সাথে একটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে নিজের দুই হাত জোড় করে মিনতিভরা কণ্ঠে বলে উঠল, “আমার ভালোবাসার কসম খেয়ে বলছি, আমি তোমার চুল পরিমাণ ক্ষতি করব না। প্লিজ, আমার সাথে চলো! না হলে ওরা তোমাকে জ্যান্ত রাখবে না। নিজের কথা না হোক, ওই ছোট্ট প্রাণটার কথা ভেবে হলেও আমাকে একটা সুযোগ দাও, প্লিজ! তুমি কি চাও না তোমার সন্তানকে দুনিয়ার আলো দেখাতে?”
রিদির সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। চমকে সে তাজওয়ানের দিকে তাকাল — তাদের অনাগত সন্তানের কথা তাজওয়ান জানল কী করে? তার মাথার ভেতরটা কেমন যেন গোলমেলে হয়ে গেল। শত চেষ্টা করেও মনটা কিছুতেই এই মানুষটাকে বিশ্বাস করতে সায় দিচ্ছিল না।
রিদির চোখের সেই দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস আর অসহায়ত্ব নিখুঁতভাবে পড়ে ফেলল তাজওয়ান। মুখে এক চিলতে ব্যথাতুর, মলিন হাসি ফুটিয়ে সে পকেট থেকে একটা ধারালো ছুরি বের করে রিদির দিকে বাড়িয়ে ধরল। গম্ভীর অথচ স্থির গলায় বলল, “এটা তোমার কাছেই রাখো। একটুও যদি মনে হয় আমি তোমার সাথে প্রতারণা করছি, নির্দ্বিধায় এই ছুরিটা আমার বুকে বসিয়ে দিও! এক ফোঁটা আফসোস বা অভিযোগ করব না আমি।”
রিদি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে নিজের দীর্ঘশ্বাসের সাথে হাত বাড়িয়ে ছুরিটা মুঠোয় তুলে নিল। এই নিঃসঙ্গ নরকে তাজওয়ানকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করা ছাড়া তার সামনে আজ আর কোনো খোলা দরজা নেই। আর তাজওয়ানের চোখের গভীরে তাকিয়ে তার মনে হলো — এই মানুষটার চোখের ভাষা আজ প্রতারণা করছে না!
রিদির ভেতরের দ্বন্দ্ব বুঝতে পেরে তাজওয়ান একটু তাড়া দেওয়ার ভঙ্গিতে মৃদু হেসে তার দিকে এক বোতল পানি বাড়িয়ে দিল। দ্রুতস্বরে ফিসফিস করে বলল, “আমার এখুনি এখান থেকে বের হতে হবে, হামিং বার্ড। বাইরে যারা পাহারা দিচ্ছিল, তাদের কোনোমতে অল্প সময়ের জন্য কাবু করে রেখেছি। প্লিজ, এক মুহূর্তও দেরি করো না!”
পিপাসায় বুক ফেটে যাওয়া রিদি বোতলটা টেনে নিয়ে তৃষ্ণার্তের মতো কিছুটা পানি গলায় ঢালল। এরপর শরীরের অবশিষ্ট সব শক্তি কুঁড়ে কুঁড়ে এনে ধীর পায়ে তাজওয়ানের পিছু নিল সে। গোডাউনের ভারী দরজার কপাট পেরিয়ে সবেমাত্র বাইরে পা রেখেছে তারা, ঠিক তখনই পাহারায় থাকা লোকগুলোর একজন তাদের পথ আগলে সামনে এসে দাঁড়াল! কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাজওয়ান ঝড়ের গতিতে লোকটির ঘাড়ের কাছে ইনজেকশন জাতীয় কিছু একটা ফুঁস করে দিল। সুঁচের খোঁচা খেতেই লোকটা টলতে টলতে চোখের পলকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
তাজওয়ান এক পলক চারপাশের জমাট অন্ধকারের দিকে চোখ বুলিয়ে নিল, তারপর পা বাড়াল অন্ধকার জঙ্গলের দিকে!
গোডাউন থেকে কিছুটা দূরে আসতেই পেটের অসহ্য যন্ত্রণায় রিদি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ব্যথায় ককিয়ে উঠে সে মাটিতে বসে পড়ল। মনে হলো, আর একটা পা ফেলারও শক্তি তার শরীরে অবশিষ্ট নেই।
রিদিকে এমন অবস্থায় বসে পড়তে দেখে তাজওয়ান ব্যাকুল কণ্ঠে এগিয়ে এসে বলল, “কী হয়েছে, বার্ড? খুব কষ্ট হচ্ছে? আমার হাত ধরো!”
বলে সে রিদির দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। কিন্তু রিদি তৎক্ষণাৎ নিজের হাত পেছনে সরিয়ে নিয়ে ঘৃণা ও তীব্র ক্ষোভে ফিসফিস করে বলে উঠল, “প্লিজ না! আমি মরে গেলেও চাই না সৌহার্দ্য চৌধুরী ছাড়া কোনো পুরুষের নখের স্পর্শও আমার গায়ে লাগুক!”
রিদির এই চরম ঘৃণাপূর্ণ কথাটি শোনার পর তাজওয়ানের মুখে এক পশলা মলিন ও বিমর্ষ হাসি ফুটে উঠল। এই মেয়েটাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে এসেছে। দূরে থেকেও তাকে সবসময় আগলে রেখেছে, যেন কেউ তার গায়ে ফুলের টোকাও দিতে না পারে। রিদিকে পাওয়ার জন্যই সে বারবার নিজের বাবার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। বাবার হাজার কোটি টাকার কালো পাহাড় থাকা সত্ত্বেও সে নিজের সততার জোরে উপার্জন করেছে, যাতে রিদি কখনো আঙুল তুলে বলতে না পারে যে সে অসৎ উপার্জনের কোনো পুরুষের সাথে রয়েছে। এমনকি বাবার সমস্ত অসৎ কাজের আড়ালে সে কেবল একটা উদ্দেশ্য নিয়েই সাহায্য করে গেছে — তা হলো যেকোনো মূল্যে রিদিকে নিজের করে পাওয়া এবং সৌহার্দ্যকে চিরতরে এই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া!
আর আজ… ঠিক সেই মেয়েটিই মরতে রাজি আছে, তবুও তার হাতের সামান্য একটি স্পর্শও নিজের গায়ে লাগাতে চাইছে না!
তাজওয়ান একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নিজের পকেট থেকে একটা ওষুধ বের করে রিদির দিকে বাড়িয়ে দিল। নরম গলায় বলল, “এটা খাও, ব্যথা কমে যাবে। আমার ওপর ভরসা না থাকলে চেক করে খেয়ে নাও — একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট হয়ে এইটুকু তো নিশ্চয়ই তুমি বোঝো!”
রিদি কোনো প্রতিউত্তর করল না। শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাজওয়ানের হাত থেকে ওষুধটা নিয়ে নিঃশব্দে খেয়ে নিল।
ওষুধ খাওয়ার পর তাজওয়ান চারপাশের জমাট অন্ধকারে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে বলল, “একটু বসো, ব্যথাটা একটু কমলে আমরা জঙ্গল থেকে বের হব।”
বলেই সে রিদির থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং তীক্ষ্ণ চোখে চারপাশে পাহারা দিতে শুরু করল। অন্ধকারের এই গহীনে মশা আর বুনো পোকামাকড়ের উপদ্রব বাড়তেই, সে বারবার নিজের হাত দিয়ে বাতাস করে রিদির আশপাশ থেকে পোকামাকড়গুলো তাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল — যাতে ক্লান্ত মেয়েটি সামান্য হলেও স্বস্তি পায়।
গোডাউনের মূল ফটকের ঠিক সামনে এসে পৌঁছাল সারবান চৌধুরী, আসিফ শিকদার, আকিব শিকদার এবং আরহান। কিন্তু ভেতরে পা রাখার আগেই পাহারায় রেখে যাওয়া ছেলেগুলোর মধ্যে একজন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল, “বস্… মেয়েটা পালিয়ে গেছে!”
কথাটা শোনা মাত্রই সারবান চৌধুরীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখের পলকে তার গলা চিরে বেরিয়ে এল এক পৈশাচিক গর্জন, “কুত্তার বাচ্চারা, কোথায় ছিলি তোরা?!”
ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া ছেলেগুলোর মধ্যে একজন তোতলাতে তোতলাতে আমতা আমতা করে বলল, “তাজওয়ান ভাই… তাজওয়ান ভাই আমাদের পাশের রুমে থাকতে বলেছিলেন। উনি নাকি মেয়েটার সাথে একটু… মানে…”
বাকি কথা শেষ করার সুযোগ দিল না। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সারবান চৌধুরী হিসহিসিয়ে বলে উঠলেন, “ওই শূয়োরের বাচ্চা তোদের বোকা বানিয়ে মেয়েটাকে নিয়ে গেছে! এক মুহূর্ত নষ্ট না করে এক্ষুনি যা বলছি — মেয়েটা যেন কোনোভাবেই জ্যান্ত এই জঙ্গল থেকে বের হতে না পারে! সামনে যে আসবে, কাউকেও ছাড়বি না, শেষ করে দিবি সবাইকে!”
সারবান চৌধুরীর কথা কানে যেতেই আসিফ শিকদারের বুকটা কেঁপে উঠল। রাগে ও আতঙ্কে তার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল, “আমার ছেলের যদি কোনো ক্ষতি হয়, তবে আমি আপ—”
তার কথা শেষ হতে দিল না সারবান চৌধুরী। বাঘের মতো গর্জে উঠে তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন, “গলা নামিয়ে কথা বল, আসিফ! নইলে তোর এই গলাটা কাটতে এক মিনিটও সময় নেব না আমি!”
এরপর এক পলক শীতল দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে দেখলেন আরহানকে। ব্যঙ্গাত্মক সুরে বললেন, “আমার নিজের ছেলে হলেও আজ এই কথাই বলতাম!”
আসিফ শিকদার তখনো কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আকিব শিকদার দ্রুত হাত বাড়িয়ে তাকে থামিয়ে দিল।
সব শুনে আরহান এক কোণায় দাঁড়িয়ে শুধু বাঁকা একটা হাসি হাসল। মনে মনে সে ভাবল, যে মানুষটা নিজের ছেলেকে তার বউ-বাচ্চাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে দিনের পর দিন নিজের স্বার্থে আর অসৎ কাজে ব্যবহার করতে পারে, তার কাছে এর চেয়ে ভালো আর কী বা আশা করা যায়?
রিদি চোখ বন্ধ করে একটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে ক্লান্ত হয়ে বসে আছে। আর তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাজওয়ান। তবে তার সেই চোখের চাহনিতে বিন্দুমাত্র কোনো অপবিত্রতা বা লোভ নেই, আছে কেবল একরাশ মুগ্ধতা আর গভীর ভালোবাসা।
তাজওয়ান আনমনে ফিসফিস করে বলে উঠল, “তোমাকে না পাওয়ার দহন আমাকে প্রতিটি মুহূর্তে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। জানি না, সেই অসহনীয় যন্ত্রণা বুকে নিয়ে আমি আদৌ বেঁচে থাকতে পারব কি না। তবু তোমাকে একটা কথা দিচ্ছি আজ — তোমার সুখের পথে কোনো দিন আমি কাঁটা হয়ে দাঁড়াব না। দূর থেকেই তোমার হাসি, তোমার ভালো থাকা দেখে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করব। কারণ, আমার ভালোবাসা তোমাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য নয়; তোমাকে ভালো রাখার জন্য। ভালো থেকো… খুব ভালো থেকো। আমার না হওয়া জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মানুষ হয়ে।”
হঠাৎ করেই জঙ্গলের শুকনো পাতা মাড়িয়ে আসার মরমর শব্দ তাজওয়ানের কানে এসে পৌঁছাল। মুহূর্তে তার সমস্ত স্নায়ু টান টান হয়ে গেল। সতর্ক চোখে চারপাশে একবার নজর বুলিয়ে সে রিদির দিকে তাকিয়ে তাড়া দিয়ে বলল, “ওঠো, মিষ্টি! আমাদের এক্ষুনি এখান থেকে যেতে হবে, মনে হচ্ছে কেউ এদিকেই আসছে!”
কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই রিদি চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাজওয়ান তাকে ইশারায় সামনে এগোতে বলল। রিদি তার সাথে পা মিলিয়ে সবেমাত্র দুই কদম সামনে বাড়িয়েছে, ঠিক তখনই অন্ধকার চিরে তীব্র বেগে ছুটে এল একটা বুলেট — সরাসরি এসে বিঁধল তাজওয়ানের হাতের বাহু বরাবর! গুলির আঘাতে তাজওয়ান একপাশে একটু হেলে গেল। চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে এক দীর্ঘ আর্তনাদ চেপে গেল সে।
ভয়ে শিউরে উঠে রিদি ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। আতঙ্কে বলে উঠল, “আপনার…!”
রিদিকে কথা শেষ করতে দিল না তাজওয়ান। ব্যথায় চোখ-মুখ খিঁচে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে সেই যন্ত্রণা সহ্য করে সে হাসার চেষ্টা করল। বাহুতে হাত দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “এটা তেমন কিছু না, বার্ড! এর চেয়ে অনেক বড় বুলেট আমার এখানে আগে থেকেই বিঁধে আছে…”
নিজের বুকের বাঁ পাশটায় এক আঙুল দিয়ে সে ইশারা করে বুঝিয়ে দিল। এরপর মৃত্যুর শীতলতা নেমে আসার আগেই রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত বিজয়ের হাসি দিয়ে সে ফিসফিসাল, “তোমার ভালোবাসা আমি পেলাম না — তাতে আমার আর কোনো আফসোস নেই। কারণ, মৃত্যুর আগে তোমার চোখের কোণে আমার জন্য এক ফোঁটা পানি আমি দেখেছি… এই একটুকুই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি! আমার শেষ নিঃশ্বাসেও শুধু তুমি ছিলে, বার্ড…”
বলেই সে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল, অন্ধকার চিরে দূর থেকে একটা বন্দুকের নল সোজা রিদির বুক বরাবর তাক করা! সময় নষ্ট করার বিন্দুমাত্র সুযোগ ছিল না। তাজওয়ান ঝড়ের বেগে ছুটে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে রিদির ঠিক পেছনে নিজের বুকটা ঢাল বানিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আর ঠিক তখনই পরপর দুই-তিনটি গর্জে ওঠা বুলেট এসে সরাসরি ভেদ করে গেল তাজওয়ানের পিঠ ও বুক!
গুলির তীব্র ধাক্কায় তাজওয়ান রিদিকে সামনে জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। আচমকা ধাক্কায় রিদি যখন ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই একটা পরিচিত বলিষ্ঠ হাত তাকে শক্ত করে আগলে ধরল। রিদি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সামনে থাকা মানুষটার শার্টের কলার খামচে ধরে কোনোমতে চোখ মেলে তাকাল। আর সামনে সৌহার্দ্যকে দেখতেই তার সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল — সৌহার্দ্যের বুক জড়িয়ে ধরে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে ফুঁপিয়ে বলে উঠল, “আপনি এসেছেন, ডাক্তার সাহেব?”
বলেই যন্ত্রণায় ও ক্লান্তিতে নিস্তেজ হয়ে রিদি সৌহার্দ্যের প্রশস্ত বুকের মাঝে নিজের শরীরটা এলিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
তাজওয়ানের নিবু নিবু চোখ দুটো তখন সৌহার্দ্যের বুকে পরম নিশ্চিন্তে চোখ বুজে থাকা রিদির ওপর স্থির। তার শুকনো ঠোঁটের কোণে খেলে গেল এক ফ্যাকাশে, নিষ্প্রাণ হাসি। ঝাপসা হয়ে আসা কণ্ঠে সে বিড়বিড় করে বলে উঠল, “ভালোবাসি, আমার মিষ্টি…”
আর তখনই চিরতরে বুজে এল তার ক্লান্ত দুই চোখ।
সৌহার্দ্য দুই হাত দিয়ে রিদিকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখের কোণ বেয়ে তখন যেন নদী নামছে, মুখটা ফুলে লাল হয়ে গেছে। উন্মাদ ও দিশেহারা এক মানুষের মতো সে রিদির কপালে, গালের প্রতিটা কোণায় চুমু খেয়ে আর্তনাদ করে উঠল, ” আমার জান, প্লিজ ওপেন ইয়োর আইজ! তুমি ঠিক আছ ? প্লিজ, হার্ট, ডোন্ট স্কেয়ার মি লাইক দিস! আমার বুক এখনো কাঁপছে, কলিজা আমার, চোখ খোলো! আই অ্যাম নট এ গুড হাজবেন্ড! তোমাকে এভাবে অন্যের ভরসায় রেখে যাওয়া আমার ঠিক হয়নি! আর কখনো এমন হবে না, প্লিজ ফরগিভ মি!”
বলেই সে জ্ঞানহীন রিদিকে এক নিমিষে পাঁজা কোলে তুলে নিল।
পরিস্থিতি বুঝে শাহাবীর দ্রুত এগিয়ে এসে সৌহার্দ্যের কাঁধে হাত রেখে বলল, “তুই আর এক মুহূর্তও দেরি করিস না, দ্রুত ওকে নিয়ে হাসপাতালে যা! আমি ওই শুয়োর বাচ্চাগুলোকে দেখছি!
শাহাবীর ওয়াকিটকি হাতে চারপাশের পুলিশ ও সিআইডি সদস্যদের দ্রুত পজিশন নেওয়ার নির্দেশ দিল। আকাশ নিজের রিভলভারের সেফটি ক্যাচ খুলতে খুলতে ফারিসের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিল, “তোরা সৌহার্দ্যের সাথে যা!”
সৌহার্দ্য রিদিকে কোলে নিয়ে সামনে এগোতেই হঠাৎ তাজওয়ানের নিথর দেহের সামনে এসে তার পদক্ষেপ থেমে গেল। মাটিতে লুটিয়ে থাকা তাজওয়ানের রক্তাক্ত শরীরের দিকে এক পলক তাকিয়ে সৌহার্দ্য নিজের চোখ দুটো নামিয়ে নিল। ভারী ও কৃতজ্ঞতায় ভেজা গলায় সে বলে উঠল, “তাজওয়ান, তোর কাছে আমি আজ চিরকৃতজ্ঞ হয়ে থাকলাম… আমার জীবনের এই নিঃশ্বাসটাকে বাঁচিয়ে দিয়ে তুই যা করলি…” তোর এই ঋণ কখনো শোধ হবে না!”
কথাটা শেষ করেই সে পেছনের দিকে তাকিয়ে সুজনকে তাড়া দিয়ে বলে উঠল, “সুজন, দ্রুত ওর পাল্স চেক কর! হারি আপ!”
সুজন যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না নিজের কানকে! যে সৌহার্দ্য চৌধুরী জীবনে কোনো দিন নিজের অহংকার বা আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কারও কাছে মাথা নোয়ায়নি, সেই মানুষটা আজ নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রুর — যে কিনা তাকে বহুবার পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছে — তার সামনে দাঁড়িয়ে পরম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে!
সুজনকে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সৌহার্দ্য ধমকে উঠে চেঁচিয়ে বলল, “আমার দেখতে বলছি তোকে ইডিয়ট? ওকে চেক কর দ্রুত!”
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৬
সৌহার্দ্যের ঝাড়ি খেয়ে সুজনের ঘোর কেটে গেল। সে দ্রুত হাঁটু গেড়ে বসে তাজওয়ানের কব্জিতে আঙুল রাখল, পাল্স চেক করে অত্যন্ত ভারী মনে দুই পাশে মাথা নেড়ে দিল। অর্থাৎ, সব শেষ!
সৌহার্দ্য বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে রিদিকে কোলে নিয়ে দ্রুত গাড়ির দিকে পা বাড়াল। সুজন আরবান সৌহার্দ্যের সাথে গাড়িতে উঠল। কিন্তু ফারিস গেল না, কারণ শাহাবীর আর আকাশকে বিপদের মুখে একা ফেলে চলে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব ছিল!
