Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৮

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৮

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৮
রিদিতা চৌধুরী

টঙ্গীর সেই ঘন মেহগনি বাগান আর বুনো জঙ্গলঘেরা পরিত্যক্ত এলাকাটি তখন এক থমথমে রণক্ষেত্র। মাথার ওপর পূর্ণিমার ফ্যাকাশে আলো রাতের গাঢ় চাদর ভেদ করে ঝোপঝাড়ের পাতার ওপর ফেলেছিল অদ্ভুত, ভুতুড়ে সব ছায়া। ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা শোরগোল আর ভ্যাপসা গরম বাতাসকে চিরে হঠাৎই গর্জে উঠল পুলিশের সাইরেন, আর তার ঠিক পরপরই মুহুর্মুহু গুলির শব্দ।
শাহাবীর আর আকাশের নেতৃত্বে সিআইডি ও পুলিশের বিশেষ টিম বিদ্যুৎগতিতে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল পুরো জঙ্গল। পালানোর কোনো পথই খোলা রাখা হয়নি। প্রায় ঘন্টাখানেক টানা তুমুল গোলাগুলির পর অবশেষে সারবন চৌধুরীর লোকেরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। কিন্তু পুরো গোডাউন চিরুনি তল্লাশি করেও নাগাল পাওয়া গেল না খোদ সারবান চৌধুরীর।

তবে ধরা পড়ে গেছে আকিব শিকদার, আসিফ শিকদার আর আরহান।
ঘটনার একটা অন্য দিকও ছিল। সৌহার্দ্য আগেই ফারিসকে বলে রেখেছিল, সুযোগ বুঝে যেন আরহানকে নিরাপদে সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। সেই সুযোগও এসেছিল। কিন্তু আরহান সে পথ মাড়ায়নি। নিজের ইচ্ছাতেই সে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
সৌহার্দ্য যখন রিদির লোকেশন ট্রেস করে টঙ্গীর পথে গাড়ি ছুটিয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ফারিসের ফোনে এসে পৌঁছাল আরহানের পাঠানো লোকেশন। আরহান ইচ্ছে করেই লোকেশনটি পাঠিয়েছিল—যাতে রিদিকে উদ্ধার করার পাশাপাশি পুরো চক্রটাকেও একসঙ্গে ধরার সুযোগ পায় তারা।
সবকিছু নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী সাজিয়ে নিয়েছিল আরহান। রিদিকে যখন অপহরণ করা হয়, আসিফ শিকদার সেই খবরটা অত্যন্ত সুকৌশলে তাজওয়ানের কাছ থেকে সম্পূর্ণ গোপন রেখেছিলেন। তাজওয়ান ঘুণাক্ষরেও কিছু টের পায়নি।

কিন্তু আরহান জানত, সৌহার্দ্য যেহেতু তখনও দেশে এসে পোঁছাইনি, এই বিপদ থেকে রিদিকে একমাত্র তাজওয়ানই দ্রুত উদ্ধার করতে পারবে। তাই সে নিজেই উদ্যোগ নিয়ে গোপনে তাজওয়ানকে সবকিছু জানিয়ে দেয়। তার উদ্দেশ্য ছিল একটাই—তাজওয়ান যেন যেকোনো মূল্যে রিদিকে উদ্ধার করার ব্যবস্থা করে।
আরহান জানত, তাজওয়ানের কাছে রিদি কোন সাধারণ মেয়ে না; তার দুর্বলতম জায়গা। রিদি বিপদে আছে জানতে পারলে তাজওয়ান যে কোন মূল্যেই উদ্ধার করবে।
আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছিল আরহান।

রাত তখন প্রায় দুটোর কাঁটায় ছুঁই ছুঁই। হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডোরে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে সৌহার্দ্য আর সুজন। বাতাসে যেন পিনপতন নীরবতা, আর সেই নীরবতা ভেদ করে ভেসে আসছে মাথার ভেতর ঘুরপাক খাওয়া হাজারো দুশ্চিন্তা।
রিদির পাশে কাউকে তো থাকতেই হবে—এই ভেবেই আরবানকে বাড়ি পাঠানো হয়েছে শাহেদা চৌধুরীকে নিয়ে আসার জন্য। এক দিকে রিদির জন্য বুকভাঙা উৎকণ্ঠা, আর অন্য দিকে বন্ধুদের বর্তমান অবস্থা কী—সেই কথা ভেবে সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠছে।
কেবিনের ভেতরে রিদিকে দেখছেন গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. শাহানা জাহান। দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, অথচ ভেতর থেকে কোনো খবর আসছে না। একটা দীর্ঘশ্বাসও যেন আটকে আছে গলার কাছে। সৌহার্দ্য প্রথমে চেয়েছিল রিদির পাশেই থাকতে, কিন্তু ডা. শাহানা জাহান তাকে শক্ত হাতে বাইরে বের করে দিয়েছেন। তিনি হাসপাতালের একজন অত্যন্ত সিনিয়র ও সম্মানিত চিকিৎসক, সে কথা মাথায় রেখেই সৌহার্দ্য আর কথা বাড়ায়নি; কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে প্রতিটা মুহূর্ত তার কাছে যেন একেকটা শতাব্দীর সমান দীর্ঘ মনে হচ্ছে।

উদ্বেগে করিডোরে তখন চঞ্চল পায়ে এদিক-ওদিক পায়চারি করে চলেছে সৌহার্দ্য। বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। তার এই অসহ্য ছটফটানি দেখে সুজন সান্ত্বনার সুরে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই কেবিনের ভারী দরজা ঠেলে ক্লান্ত মুখে বেরিয়ে এলেন ডা. শাহানা জাহান।
আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত পায়ে ডাক্তারের দিকে এগিয়ে গেল সৌহার্দ্য। তার চোখের আকুতি বুঝে ডাক্তার মৃদু হেসে আশ্বাসের সুরে বললেন,
“টেনশনের কিছু নেই বাবা, তোমার ওয়াইফ আর বেবি দুজনেই এখন সম্পূর্ণ ভালো আছে! তবে ওকে…”
ডাক্তারের মুখের কথাটুকু মাঝপথেই আটকে গেল। কপালে গভীর ভাঁজ ফেলে, হতবাক কণ্ঠে সৌহার্দ্য শুধু উচ্চারণ করল,

“বেবি?”
সৌহার্দ্যের মুখের ওই চরম বিস্ময় আর শূন্যদৃষ্টি দেখে বুঝতে বাকি রইল না যে, এই খুশির খবরটা সে বিন্দুমাত্র কল্পনাও করেনি। স্নেহের এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে ডা. শাহানা জাহান বললেন,
“ইয়েস মাই বয়, তোমার ওয়াইফ পাঁচ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট! বাবা হতে চলেছ তুমি!”
খবরটা যেন সৌহার্দ্যের মস্তিষ্কে আঘাত হানল, কিন্তু তার মন যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, কোনো রকমে গলা খাঁকারি দিয়ে সে অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠল,
“না মানে ম্যাম… আপনি ঠিক…”
সৌহার্দ্যের ব্যাকুল মন আর ঘোর লাগা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝতে পেরে ডাক্তার এবার তাকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত, আশ্বস্ত করা গলায় বললেন,
“আমি একদম সিউর। আমার একটু সন্দেহ হওয়াতে দ্রুত ব্লাড টেস্ট করিয়ে নিয়েছিলাম, সেটার রিপোর্ট হাতে পেয়েই নিশ্চিত হয়ে তোমাকে জানাচ্ছি।”

খবরটা শোনার পর থেকেই সৌহার্দ্য যেন পৃথিবীর সব যোগাযোগ হারিয়ে ফেলল। পাথরের মূর্তির মতো নির্বাক, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার বুকের ভেতরে যে কী এক প্রচণ্ড প্লাবন বয়ে যাচ্ছে, তার বাহ্যিক প্রকাশ দেখে বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় নেই।
বন্ধুর এই অদ্ভুত স্থবিরতা দেখে সুজন আর চুপ থাকতে পারল না। দ্রুত এগিয়ে এসে সৌহার্দ্যের নাড়ি চেক করার একটা ভুয়া ভঙ্গি করে দুষ্টুমিমাখা গলায় সে বলে উঠল,
“ভাই, ফিট খেয়ে গেলি নাকি রে? তুই তো দুনিয়ার সবাইকে ফিট খাওয়াস, উল্টো মানুষকে ঘায়েল করিস! অথচ নিজের বউয়ের কথা আসলে যে কেন তুই প্রতিবার এভাবে ফিট খেয়ে যাস, আমি তা বুঝি না! এটা কেম…”

সুজনের বাকি কথাটা শেষ করার সুযোগটুকুও দিল না সৌহার্দ্য। তার পাশ কাটিয়ে এক ঝটকায় ঝড়ের গতিতে সে ঢুকে পড়ল রিদির কেবিনে। ভেতরে তখন কেবল জ্ঞানহীন রিদির পোশাক বদলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন দুই নার্স। হঠাৎ সৌহার্দ্যকে এভাবে হুড়মুড় করে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখে তারা থমকে গেল, তারপর আমতা আমতা করে বলতে গেল,
“স্যার, ম্যামের ড্রেস…”
তাদের কথা শেষ হলো না। সৌহার্দ্য কেবল হাতের একটা দৃঢ় ইশারায় তাদের দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার আদেশ দিল। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে নার্স দুজন তক্ষুনি রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল এবং বাইরে থেকে দরজাটা আলতো করে টেনে বন্ধ করে দিল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটুকু পেতেই সৌহার্দ্য আর নিজের বুকভাঙা আবেগ চেপে রাখতে পারল না। দ্রুত পায়ে বিছানার পাশে গিয়ে বসে পড়ল সে। রিদির অচেতন, ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টিতে—মনে হলো এই বুঝি চোখের পলক ফেললেই সব হারিয়ে যাবে।
ধীরে ধীরে নিজের থরথর করে কাঁপা হাতটা সে রাখল রিদির উদরের উপর। ঠিক সেই জায়গাটায়, যার ভেতরে নিঃশব্দে বেড়ে উঠছে তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে বড় উপহার, একটা ছোট্ট প্রাণ। মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের কোণ গলে এক ফোঁটা উষ্ণ জল গড়িয়ে পড়ল রিদির ওপরে। তার হাতটা তখনো কাঁপছে; তার মনে হচ্ছিল, এই ভারী হাতটা রাখলে বুঝি তার বাচ্চাটার সামান্যতম কষ্ট হবে! এই ভয়েই সে মুহূর্তের মধ্যে হাতটা তুলে নিল।

এরপর গভীর এক আকুলতা ও ভালোবাসায় রিদির পেটের কাছের জামাটা একটু ওপরে তুলে উন্মুক্ত পেটের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল সে। খুব সাবধানে, পরম মায়ায় সেখানে পরপর কয়েকটা আলতো চুমু খেল সৌহার্দ্য। তারপর একদম পেটের কাছাকাছি মুখটা নামিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল—
“বাবার কলিজা, এভাবে চুপি চুপি এসে বাবাকে সারপ্রাইজ দিলে? এই জন্যই তো এই স্টুপিড মহিলা তোমাকে এত কষ্ট দিয়েছে! কোনো ব্যাপার না, বাবার প্রিন্সেস। তুমি শুধু তাড়াতাড়ি বাবার কোলে চলে এসো। তারপর তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য এই স্টুপিড মহিলাকে বাবা থাপ্পড় মেরে সবকটা দাঁত ফেলে দেবে! আমার রাজকুমারীকে কষ্ট দেওয়ার সাহস কী করে হলো, স্টুপিড মহিলার? আই লাভ ইউ সো মাচ, বাবার কলিজা!”
তারপর আবার মুখ তুলে রিদির ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকাল সৌহার্দ্য। বুকের ভেতর জমে থাকা সব আকুলতা ঢেলে দিয়ে রিদির মুখের খুব কাছে ঝুঁকে পড়ল সে। তার কপালে আর ঠোঁটের কোণে একে একে এঁকে দিল ব্যথাতুর, আলতো অথচ তীব্র ভালোবাসার কিছু চুমু। এরপর রিদির কানের ঠিক কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল—

“স্টুপিড দেড় ব্যাটারি, অশেষ ধন্যবাদ তোমাকে… আমার জীবনটাকে এভাবে পরিপূর্ণ একটা উপহার দিয়ে ধন্য করার জন্য! তবে আমার প্রিন্সেসকে এত কষ্ট দেওয়ার শাস্তি তোমাকে পেতে হবে জান!”
কথাটা শেষ করেই সে অতি যত্নে রিদিকে একটু আলতো করে তুলে তার গায়ের জামাটা বদলে হাসপাতালের পরিষ্কার পোশাকটা পরিয়ে দিল। এরপর রিদির হাতে চলতে থাকা স্যালাইনের নলটা ঠিকঠাক আছে কি না দেখে, পরম মমতায় তা ঠিক করে দিল।
ছোট্ট হাসপাতালের বেডটার একপাশে রিদির সাথে গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ল সৌহার্দ্য। নিজের মাথাটা ধীরে ধীরে এলিয়ে দিল রিদির বুকের ঠিক মাঝখানে। বুকের ভেতরটা তখন কাঁপছে—একদিকে হারানোর ভয়, আর অন্যদিকে এক আকাশ না বলা ভালোলাগার অদ্ভুত এক শিহরণ।
পরমুহূর্তেই সৌহার্দ্য মাথাটা একটু ওপরে তুলে আবার রিদির ঠোঁটের খুব কাছে নিজের ঠোঁট নিয়ে এল। আলতো চুমুতে ভরিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলে উঠল—

“আই লাভ ইউ মোর দ্যান এনিথিং এলস ইন দিস ওয়ার্ল্ড, মাই বেবিজ মম।”
“তুমি সৌহার্দ্য চৌধুরীর আটকে থাকা শেষ নিঃশ্বাস, আমার জান। তুমি নেই মানে শুধু আমার পৃথিবীটাই শূন্য নয়—তুমি না থাকলে এই সৌহার্দ্য চৌধুরীও নেই।”
বলেই রিদির ঠোঁটের ভাঁজে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিল, যখন এক গভীর, সর্বগ্রাসী ভালোবাসার পরশ দিতে যাবে সৌহার্দ্য—ঠিক তখনই পৃথিবীর সব মোহময় আবেশকে খানখান করে দিয়ে খটখট শব্দে কেবিনের বন্ধ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ বেজে উঠল।
সৌহার্দ্য রিদির পাশ থেকে কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের এলোমেলো শার্টটা ঠিক করে নিল। তারপর এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে কেবিনের দরজাটা খুলতেই হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল পৃথা, শাহেদা চৌধুরী, সায়েম আর সুমি। পৃথার মুখে রিদির পাওয়ার খবরটা শোনা মাত্রই ওরা আর এক মুহূর্তও নষ্ট করেনি; ছুটে চলে এসেছে রিদিকে নিজের চোখে এক পলক দেখতে।

কান্নায় সবার মুখগুলো ফুলে লাল হয়ে আছে। বিশেষ করে সায়েমের অবস্থা সবচেয়ে করুণ; অপরাধীর মতো সৌহার্দ্যের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে অনুতপ্ত স্বরে সে বলে উঠল,
“সরি স্যার… আপনাকে দেওয়া আমার কথাটা আমি রাখতে পারিনি, আ…”
সায়েমের মুখের কথা পুরোপুরি শেষ হতে দিল না সৌহার্দ্য। তার কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে সৌহার্দ্য তার পিঠে একটা হালকা চাপড় দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত হাসপাতালে থেকো।”
বলেই আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না সে। সুজনকে সাথে নিয়ে দ্রুত পায়ে করিডোর পার হয়ে হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে গেল সৌহার্দ্য!

রাত তখন ফুরিয়ে আসার পথে। আকাশের ফিকে অন্ধকারের বুক চিরে ভোরের প্রথম আলো উঁকি দিচ্ছে। কলেজ ক্যাম্পাসের পরিচিত সেই সবুজ মাঠ—যেখানে একসময় তাদের তারুণ্যের অন্তহীন রাত কেটেছিল—আজ দীর্ঘ এতগুলো বছর পর আবার যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সময় বদলেছে, জীবন তাদের অনেক দূরে টেনে নিয়ে গেছে, কিন্তু আজকের এই ভোরে তারা আবার সেই একই জায়গায় পাঁচজন একসঙ্গে।
মাঠের নরম ঘাসের ওপর চিত হয়ে শুয়ে আছে সৌহার্দ্য। তার ঠিক পাশেই মাথা লাগিয়ে শুয়ে আছে শাহবীর, ঠিক যেমনটা তারা আগে থাকত। একটু দূরেই ঘাসের ওপর বসে নিঃশব্দে চারপাশের পুরোনো স্মৃতিগুলো গায়ে মাখছিল ফারিস, আকাশ আর সুজন।
বহু দিন পরের সেই চেনা ছন্দে হঠাৎই একটা পুরোনো দুষ্টুমি ভর করল ফারিসের মনে। নাক-মুখ কুঁচকে সে বলে উঠল,

—”দেখলে মনে হচ্ছে বউয়ের ভাই না বউয়ের সাথে লেপ্টে আছে! শুরু হয়ে গেছে আবার মহিলা মানুষের মতো নেকামি!”
শাহবীর এক চিলতে বিরক্তি মিশিয়ে জবাব দিল,
—”তোর সমস্যা কী বল তো? ওর সাথে আমাকে দেখলে তোর এত জ্বলে কেন?”
ফারিস মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—”আমি তো বুঝি না তোদের সমস্যা কী! এমন জড়াজড়ি করিস কেন? দুইটা একসাথে হলে আমার তো তোদের চরি…..”
ফারিসের কথা শেষ পর্যন্ত আর টিকল না। তার অসমাপ্ত কথার মাঝেই একটা তীব্র ধমকে বাতাস কাঁপিয়ে উঠল সৌহার্দ্য—
—”চুপ করবি তুই, ইডিয়ট?” ছুড়ে ফেলবো এখান থেকে একটা বাজে শব্দ বের করলে!
ফারিস আরও কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই সুজন কৌতূহলী চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল,

—”তোর খবর বল, প্রেম-ট্রেম করছিস নাকি আমার মতো সিঙ্গেল?”
আকাশ মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তার আগেই শাহবীর মাঝপথে খপ করে বাগড়া দিয়ে বসল,
—”ও বিয়ে করে অলরেডি দুই বাচ্চার বাপ! একটা ডাউনলোড হয়ে গেছে, আরেকটা হওয়ার পথে!”
শাহবীরের কথা শেষ হওয়ামাত্রই ফারিস আর সুজন চমকে একেবারে আড়ষ্ট হয়ে গেল। পরমুহূর্তেই ফারিস আকাশকে জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠল,
—”বাহ্! কংগ্রাচুলেশনস দোস্ত! এত বছর আমাদের বাঁশ দিয়ে টেনশনে রেখে বাচ্চা পয়দা করে ফেলছিস, তাও একটা না দুইটা!”
সুজন তখনও ঘোর লাগা চোখে থম মেরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এই অপ্রত্যাশিত ধাক্কাটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে রাগে ও দুঃখে নিজের কপাল চাপড়ে সে আর্তনাদ করে উঠল,
— প্লিজ”তোরা কেউ বিষ খা, আমি মরে যাই! এই দুঃখ আর সহ্য হচ্ছে না! আমি কি সিঙ্গেল….”
সুজনের কথা শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য একরাশ বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে কড়া গলায় বলে উঠল,

—”যখন-তখন অন্যের প্রাইভেসি নষ্ট করলে এমনই হবে, ইডিয়ট!”
সুজন আর কাউকে একটি কথাও বলল না। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে চুপচাপ ঘাসের ওপর চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর শূন্যে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
—”সব মিঙ্গেলের ভিড়ে আমিই একমাত্র অভাগা সিঙ্গেল!” হে আল্লাহ্ তোমার কি এই হতভাগা কে নজরে পড়েনা?
এদিকে আকাশ তখন থেকেই থম মেরে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে আছে। এখানে আসার পর থেকে সৌহার্দ্য তার দিকে একবার ফিরেও তাকায়নি, একটা কথাও বলেনি। অতীত নিয়ে কোনো কৌতূহল তো দূরঅস্ত, উল্টো একরকম নিখুঁত অবহেলায় সে যেন আকাশকে এড়িয়ে চলেছে।
এই শীতল দূরত্ব আকাশের বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে তুলছে। তার ভেতরের অভিমানী মনটা আকুল হয়ে চাইছে—সৌহার্দ্য অন্তত একবার তাকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করুক, একটুখানি তো মুখ খুলুক! কিন্তু আকাশ তো ভালো করেই জানে সৌহার্দ্যের জেদ। সে একরোখা, বড্ড ঘাড়ত্যাড়া স্বভাবের; যতক্ষণ না আকাশ নিজে থেকে সবটা উজাড় করে বলবে, সৌহার্দ্য পাথরের মতো মুখ বন্ধ করে বসে থাকবে।
সৌহার্দ্যের এই নীরবতা আর সহ্য করতে না পেরে আকাশ আর থাকতে পারল না। গলাটা কাঁপিয়ে অস্থির হয়ে বলে উঠল,

—”তোর কিচ্ছু জানার নেই, সৌহার্দ্য?”
সৌহার্দ্য নির্বিকার। ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’—কোনো শব্দ দিয়েই ভাঙল না তার এই পাথুরে নীরবতা।
তার এমন উদাসীন ভাব দেখে ফারিস এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। একরাশ চাপা বিরক্তি ঝেড়ে কটমট করে তাকাল,
—”আরে এই ঘাড়ত্যাড়া বেজাল প্রোডাক্টকে তুই চিনিস না? ও কি তোকে নিজে থেকে জিজ্ঞেস করবে? ফালতু আশা করিস না! বরং তুই নিজেই বল, এত বছর ধরে তোর মুখ থেকে শোনার জন্য আমরা মরে গিয়েও জিন্দা হয়ে আছি!”

ফ্ল্যাশ ব্যাক
সৌহার্দ্য আর রিদির বিয়ের ঠিক সাত দিন পরের এক গুমোট সন্ধ্যা।
আকাশ তখন তার এক ফুফুর বাসা থেকে রওনা হয়েছে সুজনের বাসার দিকে। সৌহার্দ্য সুজনের বাসায় ওঠার পর থেকেই তাদের এই বিকেলগুলো বড্ড চেনা—প্রতিদিন সন্ধ্যায় জমে ওঠা আড্ডা, ফারিসের সেই স্বভাবসুলভ খোঁচাখুঁচি, আর সৌহার্দ্যকে নিয়ে সবার দুষ্টুমি। সেই আনন্দময় আড্ডার টানেই সিএনজির পেছনের সিটে বসে আনমনে মোবাইল টিপছিল আকাশ।
ঠিক তখনই ফাঁকা রাস্তা থেকে হঠাৎ এক অচেনা লোক এসে হুড়মুড় করে তার পাশে বসে পড়ল। আকাশ সামান্য বিরক্ত হয়ে একটু সরে বসল বটে, কিন্তু লোকটার দিকে আর মনোযোগ দিল না; নিজের কাজেই মগ্ন রইল। সে তখনো ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে, এই অচেনা মানুষটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সর্বনাশ ডেকে আনছে।

হঠাৎ করেই কানের কাছে ব্রেক কষার তীব্র শব্দ! মাঝরাস্তায় পুলিশের একটা গাড়ি এসে গতিরোধ করল তাদের সিএনজির। মুহূর্তের মধ্যে বুকটা কেঁপে উঠল। পুলিশ সদস্যরা এসেই রাগী দৃষ্টিতে তল্লাশি শুরু করল। একে একে ড্রাইভার আর আকাশের পাশে বসা সেই লোকটার পকেট চেক করা হলো।
আকাশ তখন একপাশে একদম শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার বুক তো কাঁপেনি, কারণ সে জানে, সে একদম নির্দোষ—কোনো অপরাধ সে করেনি। সে মনে মনে ভেবেছিল, হয়তো পুলিশের সাধারণ কোনো তল্লাশি চলছে, এখনই ছেড়ে দেবে।
কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সেই ভাবনা দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। ড্রাইভার আর লোকটার কাছে কিছুই না পেয়ে পুলিশ সদস্যরা এবার এগিয়ে এল আকাশের দিকে। এক পুলিশ সদস্য আকাশের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিতেই ভেতর থেকে টেনে বের করল ছোট্ট একটা পলিথিনের প্যাকেট।
প্যাকেটটার দিকে তাকাতেই আকাশের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! ছোট্ট প্যাকেটটার ভেতর একসঙ্গে রাখা বেশ কয়েকটি ইয়াবার প্যাকেট!

মুহূর্তের জন্য সব শব্দ হারিয়ে গেল। বুক চিরে একটা আর্তনাদ গলার কাছে এসে আটকে গেল আকাশের। সে নির্দোষ, অথচ মুহূর্তের ব্যবধানে সে হয়ে গেল অপরাধী! এক অদ্ভুত গভীর ষড়যন্ত্রের জালে আকাশ তখন পুরোপুরি বাকরুদ্ধ, অনুভূতিশূন্য।
পকেট থেকে ইয়াবার প্যাকেটটা ছিটকে বের হওয়ার পর আকাশ যেন একেবারে পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো। নিজের চোখের ওপর নিজেরই আর কোনো বিশ্বাস হচ্ছিল না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সে বারবার পুলিশ সদস্যদের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় আকুতি করতে লাগল,
—”বিশ্বাস করুন, এগুলো আমার না! আমি কিচ্ছু জানি না! এগুলো এখানে কীভাবে এল, আমি নিজেই জানি না!”

কিন্তু কঠিন মুখের পুলিশ সদস্যরা তার একটা কথাও কানে তুলল না। উল্টো একজন কড়া গলায় ধমক দিয়ে হ্যান্ডকাফ পরানোর জন্য এগিয়ে এল।
ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ করেই ভিড় ঠেলে সেখানে উপস্থিত হলো এমন একজন মানুষ, যাকে আকাশ চিনতে এক মুহূর্তও ভুল করল না।
শাহাবীরের সঙ্গে তোলা তাজওয়ানের ছবি এর আগে বহুবার দেখেছে আকাশ। তাই পলক ফেলতেই চিনে ফেলল তাকে। তাজওয়ানের দিকে তাকাতেই পুলিশের একজন সদস্যের মুখের কঠোরতা মুহূর্তে বদলে গেল। তাজওয়ান শুধু হাত তুলে ইশারা করতেই তারা কিছুটা সরে দাঁড়াল।
তাজওয়ান আকাশের কাঁধে হাত রেখে খুব শান্ত গলায় বলল,
—”আমিও বিশ্বাস করি, তুমি এসব করতে পারো না!”
আকাশ জন্ম থেকেই অত্যন্ত প্রখর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। তাজওয়ানের ইশারায় পুলিশদের এভাবে সরে যাওয়া দেখে সে এক পলকেই বুঝে গেল—এই গোটা ঘটনাটা একটা সাজানো নাটক, এর পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র আছে।
নিজেকে কোনোমতে সংযত করে সে ঠান্ডা অথচ তীব্র কণ্ঠে প্রশ্ন করল,

—”কী বলতে চাও, ক্লিয়ার করে বল? তুমি না দেশের বাইরে থাকো? এখানে কোথা থেকে এলে?”
তাজওয়ান রহস্যময় এক কুটিল হাসি হেসে জবাব দিল,
—”সেগুলো শোনা তোমার জন্য জরুরি না। আমার কিছু কথা শুনলে তোমাকে এই সমস্যা থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারি আমি! আর না হলে এখুনি ওরা তোমাকে নিয়ে যাবে। তোমার না পুলিশ অফিসার হওয়ার স্বপ্ন? পরীক্ষা দিচ্ছ সাব-ইন্সপেক্টর পদের জন্য? এই কেসে ফেঁসে গেলে কিন্তু তোমার স্বপ্ন কখনো পূরণ হবে না!”
তাজওয়ানের মুখে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের কথা শুনে আকাশের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। চরম বিরক্তি আর ক্ষোভে ফেটে পড়ে সে বলে উঠল,

—”নাটক বাদ দিয়ে কী বলতে চাও বল!”
তাজওয়ান মাথা নেড়ে বলল,
—”চল আমার সাথে!”
বলেই পুলিশের দিকে ইশারায় কিছু বুঝিয়ে সে আকাশকে নিয়ে রাস্তার পাশের একটা নিরিবিলি রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসল। আকাশ বুঝতে পারছিল, তাজওয়ান ওপর ভরসা করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু এই মুহূর্তে পুলিশের হাতে আটক হওয়ার চেয়ে তার সঙ্গে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথও খোলা নেই।
টেবিলে বসেই নিজের মোবাইলটা আকাশের দিকে এগিয়ে দিল তাজওয়ান। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই আকাশের পিনিক ধরে গেল—ঠিক যে মুহূর্তে পুলিশ তাকে মাদকসহ আটক করেছিল, সেই মুহূর্তেরই একটা নিখুঁত ছবি ভেসে উঠেছে সেখানে।
তাজওয়ান নির্বিকার চিত্তে ছবিটা দেখিয়ে বলল,

—”শুধু এটা না, এটার সাথে মানবপাচার থেকে শুরু করে আরও অনেকগুলো মামলা হয়ে যাবে তোমার নামে!”
আকাশের চোখ দুটো তখন রাগে লাল হয়ে আসছে। রক্তিম দৃষ্টিতে তাজওয়ানের দিকে তাকিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করল,
—”কী চাইছো আমার কাছে?”
তাজওয়ান ঠোঁটে বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে খুব হালকা চালে বলল,
—”বেশি কিছু না, ছোট্ট একটা সাহায্য। আর সেটা হলো—তোমার প্রাণের বন্ধু সৌহার্দ্য চৌধুরীর সাথে ছোট্ট একটা বিশ্বাসঘাতকতা করতে হবে! আমি বলে দেবো কী করতে হবে।”
তাজওয়ানের মুখ থেকে সৌহার্দ্যের নামটা বের হওয়ার সাথে সাথেই যেন মাথার ভেতর আগুন জ্বলে উঠল আকাশের। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সে ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তাজওয়ানের চোখের ওপর চোখ রেখে ঘৃণায় ফেটে পড়ে সে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করল—
—”অসম্ভব! নিজে আজীবন জেলে পচে মরব, তারপরও আমার বন্ধুর সাথে কোনো রকম বিশ্বাসঘাতকতা করব না!”
তাজওয়ান একটু হাসল। তারপর আগের চেয়েও শীতল আর আত্মবিশ্বাসী সুরে বলল,
—”আমি জানতাম তুমি এমনটাই বলবে! ওকে, ফাইন… তুমি তো সোজা জেলে যাবেই। সাথে তোমার বাবা-মা—তাদের লাশটাও কেউ খুঁজে পাবে না! আমাদের ক্ষমতা সম্পর্কে আশা করি তোমার ভালো ধারণা আছে? আর তুমি এমনভাবে ফাঁসবে যে, তোমার বন্ধুদের আব্বাও যদি আসেন, তিনিও তোমাকে বাঁচাতে পারবেন না!”
একটু থেমে বিষাক্ত হাসিতে সে যোগ করল,

—”না, কষ্ট করে মারতে হবে না… তোমার বাবা তো এমনিতেই একজন অসুস্থ মানুষ। ছেলের এত বড় অপকর্মের কথা শুনলে এমনিতেই হার্ট অ্যাটাক করে মারা যাবেন! আর হ্যাঁ… তোমার না একটা প্রেমিকা আছে গ্রামে? ওই যে তোমার খালাতো বোন, তন্বী? সে স্কুলে যাওয়ার পথে যদি হঠাৎ ধর্ষিতা হয়ে যায়, কিংবা তার কোনো বড় ক্ষতি হয়, তবে ব্যাপারটা কেমন হবে বল তো?”
তাজওয়ানের মুখে এই কথাগুলো শোনার সাথে সাথেই আকাশের বুকটা ধক করে উঠল। রক্ত হিম হয়ে এল তার। একদিকে তার অসুস্থ বাবা-মা আর জীবনের চেয়েও প্রিয় সেই মানুষটা, অন্যদিকে তার প্রাণের বন্ধু সৌহার্দ্য!
তার মতো সাধারণ গরিব ঘরের একটা ছেলের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয় তাজওয়ানদের মতো পাহাড়সমান ক্ষমতাবান কুচক্রী মানুষের সাথে পেরে ওঠা। মুহূর্তের মধ্যে আকাশের সব সাহস ভেঙে চুরমার হয়ে গেল; সে যেন ভয়ে নিজের বোধ-বুদ্ধিই হারিয়ে বসল।
থরথর কাঁপতে কাঁপতে আমতা আমতা করে সে বলে ফেলল,
—”বব… বল, কী করতে হবে?”
আকাশের এই অসহায় আত্মসমর্পণ খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করল তাজওয়ান। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে কুটিল হেসে সে বলল,

—”আমি ভালো করেই জানি, তোরা সব ক’টা ধুরন্ধর চালু মাল! তবে মনে রাখিস, বিন্দুমাত্র চালাকি করার চেষ্টা করলেই তার খেসারত দিতে হবে তোর পুরো পরিবারকে। তোর প্রাণের প্রিয়তমার বাড়ির সামনে অলরেডি আমার লোকেরা ওত পেতে আছে। একটু এদিক-সেদিক হলেই বুঝতেই তো পারছিস কী হতে পারে?”
আকাশ পাথরের মূর্তির মতো কেবল নিচু হয়ে মাথা নাড়ল। সে বুঝিয়ে দিল, তাজওয়ানের সাথে কোনো রকম চালাকি করার সাহস তার আর নেই।
তাজওয়ানের উদ্দেশ্য ছিল ; আকাশ কে ব্যবহার করেই সৌহার্দ্যকে ফাঁসানোর,। এরপর তাজওয়ান কফিতে চুমুক দিয়ে নিখুঁত পরিকল্পনাটা বুঝিয়ে দিল—কীভাবে, ঠিক কোন ছকে তাকে ফাঁসাতে হবে সৌহার্দ্যকে।
সেদিন পরিস্থিতির কাছে হেরে গিয়ে বাধ্য হয়েই তাজওয়ানের কথা মেনে নিয়েছিল আকাশ। কিন্তু বিবেকের তাড়নায় সে তাজওয়ানের পুরো পরিকল্পনাটা আর শুনতে পারেনি। তাজওয়ান বলেছিল—যেভাবেই হোক সৌহার্দ্যকে ফাঁসাতে হবে, যাতে পুরো গ্রাম এক হয়ে ওই মেয়েটির সঙ্গেই তার জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়।
কিন্তু মনের ভেতর চলতে থাকা এই অন্যায়ের সঙ্গে যুদ্ধের কাছে শেষ পর্যন্ত হেরে যায় আকাশ। সে নিজের বিবেককে জলাঞ্জলি দিতে পারেনি। তাই তো সেদিন ফারিস আর সুজনের সাহায্যে সৌহার্দ্যকে সেই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে নিরাপদে বের করে দেয় সে।

এরপর ভিডিওটা চেক করে আকাশ। ভালোভাবে দেখে বুঝতে পারে, ভিডিওটিতে শুধু মেয়েটির কিছুটা অগোছালো পোশাক আর সৌহার্দ্যের গায়ে কিছু লিপস্টিকের দাগ ছাড়া আর কিছুই নেই! আকাশ বুঝল, এটুকু দিয়ে চাইলেও সৌহার্দ্যকে বড় কোনো অপরাধে ফাঁসানো অসম্ভব, আর সৌহার্দ্যর বাবার যা ক্ষমতা তার কাছে এটা সমাধান করা তেমন কোন বড় ব্যাপার হবেনা!
বাবা-মা আর তন্বীর নিরাপত্তার কথা মনে করে আকাশ শেষমেশ সেই ভিডিওটিই তাজওয়ানের কাছে পাঠিয়ে দেয় এবং জানায় যে, গ্রামবাসী এক হওয়ার আগেই তারা পালিয়ে গেছে।
কিন্তু আকাশ কি আর জানে, তাজওয়ানকে বোকা বানানো অত সহজ নয়!
সে আকাশের এই মিথ্যে অজুহাত এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস করল না। তাজওয়ান খুব ভালোভাবেই বুঝে গেল যে, আকাশ নিজেই সৌহার্দ্যকে পালাতে সাহায্য করেছে। আর ঠিক তখনই প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে তাজওয়ানের চোখে।
সে আকাশকে ড্রাগের ভুয়া ছবি দিয়ে চিরতরে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি তাকে মেরে ফেলারও হুমকি দেয়।

চারপাশ যখন ধীরে ধীরে বিপদের ঘেরাটোপে আটকে আসছিল, তখন নিরুপায় হয়ে মোবাইল থেকে সিমটা খুলে ছুড়ে ফেলে দেয় আকাশ। সে রাতেই তন্বী—তার খালাতো বোন, যাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসত—তাকে সঙ্গে নিয়ে অনেক কাঠ খট পুড়িয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়।
আকাশ ভেবেছিল, তাজওয়ান যখন তাকে খোঁজাখুঁজি বন্ধ করে দেবে, তখন সুযোগ বুঝে সৌহার্দ্যের সঙ্গে দেখা করে সব সত্যিটা খুলে বলবে।
কিন্তু তাজওয়ানের হিংস্র লোকগুলো যেন পাগলা কুকুরের মতো তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এক পাও নড়ার উপায় ছিল না। হাতে একটা টাকাও নেই, পকেটে সম্বল বলতে শুধু বুকভাঙা ভয় আর দিশেহারা এক বুক নিঃসঙ্গতা। কোনো রকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে একটা ছোট বাসা ভাড়া নেয় সে। তাও বাসা থেকে বের হওয়ার কোন সুযোগ নেই, এক প্রকার বন্দি!

ঘটনার তখন প্রায় দশ-বারো দিন পার হয়ে গেছে। এদিকে সৌহার্দ্যের সাথে শাহাবীরের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে; মানসিকভাবে দূরত্ব তৈরি হয়ে দুজনের মধ্যকার সমস্ত হৃদ্যতা তখন ভেঙে চুরমার। ঠিক এমন এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে বাসার মালিকের ফোন থেকে কোনোমতে শাহাবীরকে কল করে আকাশ।
ফোন ধরেই সে শাহাবীরকে গত কদিনের সমস্ত ঘটনা—তাজওয়ানের হুমকি, তার নিজের পালিয়ে বেড়ানো আর তন্বীকে নিয়ে লুকিয়ে থাকার অসহায়ত্বের কথা আদ্যোপান্ত খুলে বলে।
আকাশের মুখে সব শুনে শাহাবীর প্রথমে স্তব্ধ হয়ে যায়। এরপর মুহূর্তের জন্যও দেরি না করে সে তৎক্ষণাৎ আকাশের নিরাপত্তার সমস্ত ব্যবস্থা পাকা করে দেয়।

আকাশ তখন সৌহার্দ্যের সাথে দেখা করার কথা বললে শাহাবীর তাকে কঠোরভাবে নিষেধ করে। সে সাফ জানিয়ে দেয়, এই মুহূর্তে ভুলেও যেন সৌহার্দ্যের সাথে কোনো যোগাযোগ করা না হয়।
কারণ, ঠিক কেন তাজওয়ান এমন মরিয়া হয়ে সৌহার্দ্যকে ধ্বংস বা ফাঁসাতে চাইছে, সেই গভীর ষড়যন্ত্রের আসল রহস্য তখনো শাহাবীরের কাছে সম্পূর্ণ অন্ধকার ছিল। সে কিছুতেই মেলাতে পারছিল না—তাজওয়ান কেন এত বড় শত্রুতা করছে সৌহার্দ্যের সাথে!

শাহাবীরের তখনো জানা ছিল না যে, এই সবকিছুর নেপথ্যে রয়েছে রিদির প্রতি তাজওয়ানের একতরফা অন্ধ ভালোবাসা। তার ওপর এই অল্প কদিনেই ঘটে গেছে অনেকগুলো নাটকীয় ঘটনা—হঠাৎ আকরাম খানের মৃত্যু, সৌহার্দ্যের সঙ্গে রিদির বিয়ে! তার মধ্যে প্রতিনিয়ত সারহান চৌধুরীর সম্পর্কে তাকে ভুল বুঝানোর চেষ্টা করছে আকিব শিকদার! তার একটাই কথা সৌহার্দ্যর সাথে রিদিকে বিয়ে দেওয়ার মুল কারণ রিদির সম্পত্তি!
চারপাশের সবকিছুই শাহাবীরের কাছে কেমন যেন এক রহস্যময় গোলমেলে ঠেকছিল। তার তীব্র অনুভূতি হচ্ছিল—এই আপাতবিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর সুতোয় গাঁথা রয়েছে কোনো গভীর ও বড় সত্য।
শাহাবীরের মনে তখন জোরালো ধারণা জন্মেছিল যে, আকরাম খানের মৃত্যুটি মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। বিশেষ করে, যখন স্বয়ং এসপি হারুনুর রশীদ এই রহস্যজনক কেসটি তদন্ত করার দায়িত্ব তার কাঁধেই সঁপে দিয়েছিলেন, তখন তার সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

আকরাম খানের মৃত্যুর ঠিক বছরখানেক আগে সিআইডিতে যোগ দিয়েছিল শাহাবীর। এই পেশায় আসাটা তার কোনো পেশাদার ক্যারিয়ার গড়ার তাগিদে ছিল না, বরং ছিল একান্তই ভালোলাগা ও শখের জায়গা থেকে। ছোটবেলা থেকেই যখন তার বোধশক্তি তৈরি হয়েছিল, বুকজুড়ে একটাই স্বপ্ন লালন করত—দেশের জন্য সে কিছু একটা করবে। পড়াশোনা শেষ করে নিজের দেশে ফিরে সিআইডিতে যোগ দেওয়াটাই ছিল তার জীবনের ব্রত।
কিন্তু জীবন সবসময় সোজা পথে চলে না। ঠিক দেশমুখী হওয়ার প্রাক্কালে যখন সে তার আসল পিতৃপরিচয়ের নির্মম সত্যটি জানতে পারল, তখন তার চেনা পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। সেই আকস্মিক ধাক্কায় তার দেশ ফেরার সিদ্ধান্ত এক পলকে বদলে গিয়েছিল বটে, কিন্তু নিজের শৈশবের সেই সুপ্ত স্বপ্নের সাথে সে বিন্দুমাত্র আপস করতে পারেনি।

তাই তো, গোপনীয়তার চাদরে মুড়ে, কারো না জানার আড়ালেই বিভিন্ন গোপন কেসের সূত্র ধরে সে বারবার ছুটে আসত নিজের সেই চিরচেনা অথচ অচেনা মাতৃভূমিতে!
সিআইডিতে যোগ দেওয়ার পরেই শাহাবীর শিকদার পরিবারের অন্ধকার জগতের সমস্ত অবৈধ কর্মকাণ্ডের খবর জানতে পারে। আর সেই মুহূর্ত থেকেই সে এক অভিনব পরিকল্পনা আঁটে—নিজের পরিচয় গোপন রেখে সে সুকৌশলে আকিব শিকদারের বিশ্বাস অর্জন করে এবং তাকে সাহায্য করার ভান করে তাদের অপকর্মের সমস্ত অকাট্য প্রমাণ জোগাড় করতে মাঠে নামে।
ভেতরে ভেতরে এগোতে গিয়েই তার চোখ কপালে ওঠে; সে বুঝতে পারে, শিকদার পরিবার এই অপরাধের সাগরে কেবল চুনোপুঁটি মাত্র! তাদের এই বিশাল সাম্রাজ্যের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে এমন কেউ, যে সমস্ত ঘটনার মূল চালিকাশক্তি।

আকিব শিকদার শাহাবীরকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করলেও, আসিফ শিকদারের চোখে শুরু থেকেই সে ছিল সন্দেহের পাত্র। আসিফ তাকে একটুও বিশ্বাস করতে পারত না বলেই তাদের অপরাধজগতের ভেতরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা গোপন কাজে শাহাবীরকে কখনোই জড়াত না।
এদিকে সৌহার্দ্যের ঘটনাটি মোড় নেয় ভিন্ন দিকে। যখন শাহাবীর দেখল যে, সৌহার্দ্য নিজেই নিজের নির্দোষিতার সমস্ত প্রমাণ জোগাড় করে ফেলেছে, তখন সে এই নির্দিষ্ট বিষয়টি নিয়ে আর সামনে এগোয়নি। শাহাবীরের বিচক্ষণ মন চেয়েছিল অযথা জল ঘোলা না করে একসঙ্গে সব কটি জট বা রহস্যের জাল খুলে দিতে।

সেই হিসেব-নিকেশ মাথায় রেখেই শাহাবীর যখন নিজের মতো করে সৌহার্দ্যের কেসটি নিয়ে গভীর তদন্ত চালাতে শুরু করে, তখনই বেরিয়ে আসে এক চমকপ্রদ ও চাঞ্চল্যকর সত্য।
সে জানতে পারে, তাজওয়ান সৌহার্দ্যকে নির্মমভাবে ফাঁসানোর একমাত্র কারণ—তার বোন! রিদি, যাকে তাজওয়ান পাগলের মতো ভালোবাসে আর যার অন্ধ মোহই তাকে এই অপরাধের পথে টেনে নিয়েছিল! আর সাথে আসিফ শিকদার আকিব শিকদার রিদির সম্পত্তির জন্য “তাজওয়ানের পাগলামিতে সায় দিয়ে আরও উসকে দিয়েছিল!
তবে তাজওয়ানের এই নোংরা কাজের কথা আসিফ শিকদার, আদিব শিকদার কিংবা সারবান চৌধুরী—তাদের কেউই বিন্দুবিসর্গ জানত না।
কিন্তু যখন এই চাঞ্চল্যকর খবরটি সারবান চৌধুরীর কানে পৌঁছাল, তখন মুহূর্তের মধ্যে তার রক্ত গরম হয়ে উঠল। রাগে ফেটে পড়ে তিনি আসিফ শিকদারকে কঠোর ভাষায় হুমকি দিয়ে সাফ জানিয়ে দিলেন—ওই মেয়েকে নিয়ে তারা কী করবে বা না করবে, তাতে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। তবে সৌহার্দ্যের যেন বিন্দুমাত্র ক্ষতি না হয়, তাদের পারিবারিক মানসম্মান নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন না ওঠে, সেই আপত্তিকর ভিডিওটি যেন অবিলম্বে চিরতরে ডিলিট করা হয় এবং যত দ্রুত সম্ভব পুরো ঘটনাটি যেন ধামাচাপা দেওয়া হয়! অন্যথায়, তিনি কাউকেই এক বিন্দু ছাড় দেবেন না।
সারবান চৌধুরী যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা আসিফ শিকদার জানত। তাই তার এই ভয়াল রূপ দেখে আসিফ ভয়ের চোটে দিশেহারা হয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সে ঠান্ডা মাথায় এক নৃশংস পথ বেছে নেয়—সবকিছুর মূল উৎপাটন করতে মেয়েটিকেই সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং পুরো ঘটনাটিকে এমন নিখুঁতভাবে সাজায়, যেন মনে হয় কিছুই ঘটেনি। কারণ তারা জানত, ওই মেয়ে বেঁচে থাকলে সৌহার্দ্যে ব্যাপারটা আবার জল ঘোলা করবে; আর সৌহার্দ্য যে এত সহজে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়, তা তাদের অজানা ছিল না।
একই সঙ্গে আকাশকে চিরতরে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে সে পাগল হয়ে ওঠে। কারণ, আকাশ তাজওয়ানের এই নোংরা অপরাধের সমস্ত সত্য জানত। সৌহার্দ্যের কাছে আকাশ মুখ খোলার আগেই তাকে পৃথিবী থেকে মুছে দিতে আসিফ মরিয়া হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু এই খেলায় শাহাবীর ছিল এক ধাপ এগিয়ে। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার সাথে সে আকাশকে নিখুঁত সুরক্ষায় নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখে।

শুধু তাই নয়, নিজের দায়িত্ব ও প্রভাবের সীমার মধ্যে থেকে শাহাবীর আকাশকে নিরাপদ সরকারি কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে। আকাশ যেহেতু নিজের যোগ্যতায় সাব-ইন্সপেক্টর পদের নিয়োগ পরীক্ষার সব ধাপ আগেই সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে রেখেছিল, তাই তার নিয়োগের পথটাও আর খুব একটা কঠিন ছিল না।
তাজওয়ান তো তাজওয়ান! বাপ-চাচারা কিছু জানার আগেই, ভিডিওটা হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে সেটা শাহাবীরকে পাঠিয়ে দিল—উদ্দেশ্য একটাই, রিদিকে সৌহার্দ্যের থেকে আলাদা করা।
তাজওয়ান ভালো করেই জানত, নিজের বাবার অতীতের কারণে শাহাবীর চরিত্রহীন মানুষদের ঘৃণা করে। এই ভিডিও দেখলে শাহাবীরের চোখের সামনে তার বাবার সেই ঘৃণ্য মুখটা ভেসে উঠবে। বোনের প্রতি তার অন্ধ ভালোবাসা তো আছেই; এই দৃশ্য দেখার পর সৌহার্দ্যের কাছে নিজের বোনকে রাখার প্রশ্নই ওঠে না!
তাই আকাশ যখন তাকে ভিডিওটা দিল, সে ছদ্মবেশে অন্য একটা নম্বর থেকে সেটা সাথে সাথে শাহাবীরের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৭

পরবর্তীতে আসিফ শিকদারের প্রচণ্ড চাপে পড়েও সে ভিডিওটা ডিলিট করার নাটক করে, কিন্তু আসলে ডিলিট করে না। বরং সৌহার্দ্যকে রিদির জীবন থেকে সরাতে না পেরে, সৌহার্দ্য দেশে ফেরার পর সেই একই ভিডিও তার নম্বরে পাঠিয়ে হুমকি দেয়—রিদির থেকে দূরে না থাকলে ভিডিওটি পাবলিক করে দেওয়া হবে!
কিন্তু সৌহার্দ্যও কম যায় না। সে তাজওয়ানের এই ফালতু হুমকির বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না।
শেষ পর্যন্ত নিজের পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে তাজওয়ান সেই ভিডিও সরাসরি রিদির ফোনেই পাঠিয়ে দেয়!

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৯