Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৯

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৯

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৯
রিদিতা চৌধুরী

ভোরের নরম আলো তখন পূর্ব আকাশে সোনাঝরা রোদের ছোঁয়া বুলিয়ে ধীরে ধীরে জাগিয়ে তুলছিল চারপাশ। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো মুক্তার মতো চকচক করছিল, আর সেই স্নিগ্ধ ভোরে কলেজ মাঠের সবুজ ঘাসগুলো যেন অনেক বছরের জমানো দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবশেষে একটু হালকা নিঃশ্বাস ফেলছিল।
অতীতের কথামালাগুলো একে একে নিংড়ে বের করে দেওয়ার পর, আকাশের বুকজুড়ে চেপে থাকা পাথরটার ভার যেন খানিকটা কমল। কিন্তু অনুশোচনার তীব্র দহন তাকে তখনও ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। কাঁপা কাঁপা গলায় সে তাকাল সৌহার্দ্যের দিকে, যে এতক্ষণ নির্বাক মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে সব শুনে গেছে।
সব শোনার পরও সৌহার্দ্যের চোখে-মুখে কোনো পরিবর্তনের ছোঁয়া নেই। সে আগের মতোই পাথরের মতো অচঞ্চল, নির্বাক। সৌহার্দ্য যখন চারপাশটায় একবার চোখ বুলিয়ে গম্ভীর পায়ে হেঁটে চলে যেতে উদ্যত হলো, আকাশ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক ছুটে গিয়ে সে জড়িয়ে ধরল সৌহার্দ্যকে, আর কণ্ঠে উপচে পড়া আকুতি নিয়ে ভেঙে পড়ে বলল,

“মাফ করে দে ভাই, এই অকৃতজ্ঞ বিশ্বাসঘাতক বন্ধুকে, প্লিজ?”
সৌহার্দ্য বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ওকে ধমক দিয়ে সরিয়ে দিয়ে কঠোর গলায় বলল,
“মহিলার মতো ঘেঁষাঘেঁষি করবি না, ছাড়!”
কিন্তু আকাশ ছাড়ল না। ছোট্ট শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় আকুল হয়ে সে বলে উঠল,
“আগে বল, মাফ করছিস কি না?”
সৌহার্দ্যের বরফশীতল কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল নিরাসক্ত এক উচ্চারণ,
“উহু।”
একটু থেমে সে আরও যোগ করল,
“দুনিয়াতে দুজন মানুষকে সৌহার্দ্য চৌধুরী কখনো মাফ করে না। এক, আমার কলিজায় হাত দিতে চাওয়া। দুই, বেইমান!”
বলা শেষ করেই সে এক মুহূর্তও আর অপেক্ষা করল না। আকাশকে জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে গটগট পায়ে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল, পেছনে ফেলে গেল অনুশোচনায় দগ্ধ এক বন্ধুকে।
চোখে ভরা জল নিয়ে আকাশ ছলছল চোখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্যের চলে যাওয়ার পথের দিকে। ঠিক তখনই শাহবীর এগিয়ে এসে ওর কাঁধে সান্ত্বনার হাত রেখে নরম গলায় বলল,

“এখনো রাগটা মাথায় চড়ে আছে, রাগ কমলে ঠিকই কথা বলবে!”
ফারিস মুখভঙ্গি বিকৃত করে বিরক্তির সুরে বলে উঠল,
“একটা পিস জন্ম দিয়েছে সারহান চৌধুরী, মাইরি!”
সুজন একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে বলল,
“আমি তো এখন থেকেই টেনশনে আছি, এটার যেটা বের হবে সেটা কেমন টাইপের হবে! আমার ছেলে হলে বাবা, আমি এই দেশেই থাকব না। নাহলে এমন বন্ধু জুটিয়ে বাপের মতো জীবনটাই বরবাদ হবে!”
সুজনের কথা শুনে ফারিস তাকে এক ধমক দিয়ে বলল,
“কেমন আর হবে! বাপ হচ্ছে ভেজাল প্রোডাক্ট, ছেলে হবে মহা ভেজাল প্রোডাক্ট!”
আবার একটু আফসোসের সুর মিশিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“ওদিকে আবার আমার তারছেঁড়া বউটা নাকি ওই না-আসা মহা ভেজালটার সাথে আমার কিউট মেয়েটার বিয়ে ঠিক করে বসে আছে!”

ভাগিনার কথা উঠতেই শাহবীর বিরক্ত হয়ে কড়া গলায় বলে উঠল,
“একদম আমার ভাগিনাকে নিয়ে কোনো বাজে কথা বলবি না! ও আমার মতোই হবে, ভাগিনারা সবসময় মামার মতোই হয়!”
কথাটা বলতেই শাহবীরের ঠোঁটের কোণে অজান্তে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। তা দেখে ফারিস বাঁকা হাসি হেসে ঠোঁট উল্টে বলল,
“তাহলে তো অবস্থা আরও বেশি খারাপ হবে!”
শাহবীর আর কথা বাড়িয়ে পরিস্থিতি জটিল করল না। বিরক্ত হয়ে সোজা নিজের গাড়ির দিকে পা বাড়াল। আর তার দেখাদেখি ফারিস, সুজন ও আকাশও নিঃশব্দে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

সৌহার্দ্য সবেমাত্র রিদিকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে এসেছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল প্রায় এগারোটা।
রিদি চুপচাপ বিছানায় বসে আছে। তার ক্লান্ত অথচ স্নিগ্ধ দৃষ্টি আটকে আছে সৌহার্দ্যের ওপর। সোফায় বসে ল্যাপটপে ব্যস্ত সৌহার্দ্য যেন সম্পূর্ণ নির্বাক। সকালেও রিদিকে হাসপাতাল থেকে আনতে গিয়ে একটা কথাও সে বলেনি। বাড়িতে ফেরার পরও এই নীরবতার বরফ একটুও গলেনি। বুকের ভেতর জমে থাকা আনন্দের খবর সৌহার্দ্যকে শোনানোর জন্য রিদির মনটা ছটফট করছিল, কিন্তু সৌহার্দ্যের এই পাথরকঠিন ও নির্বাক রূপ দেখে সে কিছুতেই সাহস পাচ্ছিল না। সে কি এখনো রাগ করে আছে? নাকি অন্য কিছু? কিছুই বুঝতে পারছে না রিদি।
দ্বিধায় বুক কাঁপলেও ধীরে সুস্থে বিছানা থেকে নেমে এল রিদি। সৌহার্দ্যের শরীর ঘেঁষে সোফায় বসল সে। তারপর আমতা আমতা করে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী করছেন?”
সৌহার্দ্য নির্বাক, মুখে কোনো শব্দ নেই। রিদি তখন দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে আরেকটু কাছে এগিয়ে গেল। আলতো করে জড়িয়ে ধরল সৌহার্দ্যকে, গুঁজে দিল নিজের মুখটা তার প্রশস্ত বুকে। তারপর লাজুক অথচ মিষ্টি এক কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,

“আপনাকে একটা কথা বলার আছে!”
এবার সৌহার্দ্য ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে রাখল। ভ্রু কুঁচকে তাকাল রিদির দিকে। রিদি তখন লজ্জায় লাল হয়ে মিনমিন করে বলে উঠল,
“আপনি বাবা হবেন, ডাক্তার সাহেব! আমাদের আপনার মত একটা কিউট ছেলে আস…”
কিন্তু বাক্যটি সম্পূর্ণ শেষ করতে দিল না সৌহার্দ্য। কথা কেড়ে নিয়ে সে রিদিকে নিজের কাছ থেকে আলতো করে সরিয়ে দিল, তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর ও শীতল গলায় বলল,
“আই নো!”
বলেই এক মুহূর্ত দেরি না করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সে।
রিদি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্যের চলে যাওয়ার পথের দিকে। বুকভরা আশা নিয়ে সে ভেবেছিল, এই সুসংবাদটা শোনার পর সৌহার্দ্যের সব রাগ নিমেষেই মিলিয়ে যাবে, সে খুশিতে জড়িয়ে ধরবে তাকে। অথচ সৌহার্দ্যের এমন বরফশীতল আচরণ রিদির সমস্ত প্রত্যাশাকে গুঁড়িয়ে দিল। নিমেষেই যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল তার বুকটা। রিদির মন এক গভীর অভিমানে কেঁদে উঠল। তবে কি সৌহার্দ্য তাদের এই নতুন অতিথির আগমনটাকে মনেপ্রাণে মেনে নেয়নি? সে কি একটুও খুশি হয়নি বাবা হতে পেরে? ভাবতে বুকটা হাহাকার করে উঠল মেয়েটার।

ড্রয়িং রুমে থমথমে মুখে বসে আছেন সারহান চৌধুরী। গতকালকের সেই আকস্মিক ঘটনার পর থেকে পুরো বাড়ির বাতাসে যেন বিষাদের ভারী চাদর ঝুলে আছে। সকাল থেকে রুম থেকে বের হয়নি সাথী। বাচ্চা দুটোকে নিয়ে নিজেকে একরকম ঘরবন্দী করে রেখেছে সে। পৃথা গিয়ে একবার জোর করে হলেও খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু লাভ হয়নি। মুখে এক গ্রাসও তুলছে না সাথী, কারও সঙ্গে একটা কথাও না। উপায় না পেয়ে পৃথা কেবল বাচ্চা দুটোকে খাইয়ে সাথীর খাবারটা পাশেই রেখে চলে এসেছে। সাথী কোনো দিন বিশ্বাসই করতে পারেনি, আরহান এমন কোনো জঘন্য কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে! এই চরম সত্যটা তার পুরো পৃথিবীটা এক নিমিষে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। রিমা চৌধুরীর অবস্থাও তথৈবচ। তিনিও নিজেকে আটকে রেখেছেন নিজের রুমে। পুরো বাড়িটা যেন এক জীবন্ত মরা বাড়িতে পরিণত হয়েছে।
এমনই দমবন্ধ করা পরিবেশে বাবার দিকে এক পলক তাকিয়ে সামনের সোফায় এসে বসল সৌহার্দ্য। ছেলের দিকে তাকাতেই আকুতি ঝরে পড়ল সারহান চৌধুরীর কণ্ঠে,
“তোমার চাচ্চু তো পালিয়ে গেছে, আরহানকে কি কোনো রকম ছাড়ানোর ব্যবস্থা করা যায় না?”
সৌহার্দ্য এক অদ্ভুত গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল,

“সে নিজেই ধরা দিয়েছে, এখন আর কিছু করার নেই!”
ছেলের এই নির্বিকার অথচ কঠোর জবাবে একটা দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল সারহান চৌধুরীর বুক চিরে। অসহায় গলায় তিনি বলে উঠলেন,
“একবার ভালো করে দেখো না, কোনোভাবে কিছু করা যায় নাকি! অবুঝ বাচ্চা দুটোর ভবিষ্যৎ কী হবে বল তো? সমাজে লোকে ওদের দিকে আঙুল তুলবে!”
বাবার এমন কথায় কিছুটা বিরক্ত হলো সৌহার্দ্য। ভ্রু কুঁচকে, গমগমে অথচ শক্ত কণ্ঠে সে বলে উঠল,
“তুমি এসব নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করে নিজের হার্টের সমস্যা বাড়িও না। আমি দেখছি কী করা যায়!”
কথাটা শেষ করেই এক মুহূর্ত দেরি না করে সোফা ছেড়ে উঠে পড়ল সৌহার্দ্য, তারপর দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।

মির্জা বাড়ির ড্রয়িং রুমে থমথমে ও গম্ভীর এক পরিবেশে বসে আছে সৌহার্দ্য, শাহবীর আর ফারিস। তাদের ঠিক সামনেই সোফায় বসে আছেন সাফিন মির্জা। মূলত শাহবীরের সঙ্গেই সুমির বিয়ের পাকা কথা বলতে বা প্রস্তাব নিয়ে তারা আজ এখানে হাজির হয়েছেন।
ঘরের দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে সাফিন মির্জা সরাসরি সৌহার্দ্যের দিকে চোখ রাখলেন। সৌজন্যমূলক গলায় জানতে চাইলেন,
“আমাদের বউমা কেমন আছে?”
সৌহার্দ্য নিজের স্বভাবসুলভ গম্ভীর ভাব বজায় রেখে শীতল কণ্ঠে উত্তর দিল,
“জি, ভালো আছে। আপনার সাথে একটা ব্যাপার নিয়ে কথা ছিল, সেজন্যই আসা।”
ঠিক তখনই তাদের কথার মাঝখানে ড্রয়িং রুমে এসে ঢুকলেন সুমির মা। হাতে নাস্তার ট্রে। সবার সামনে ট্রেটা রাখতে রাখতে তিনি স্নেহের সুরে বলে উঠলেন,

“আরে কথা তো পরে হবে, আগে একটু নাস্তা খেয়ে নাও বাবা! আমার মেয়েটাকে একবার আনতে পারলে না? এখন তো মেয়েটা আসেই না বললেই চলে! রিদিকে সুমির মা নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসে!”
সৌহার্দ্য কফির কাপটা হাতে তুলে নিয়ে সামান্য চুমুক দিল। তারপর শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বলল,
“ও একটু অসুস্থ আছে আন্টি, ও সুস্থ হলে নিয়ে আসব।”
কথা শেষ করেই সে আবার দৃষ্টি ফেরাল সাফিন মির্জার দিকে। গম্ভীর কণ্ঠে বলতে শুরু করল,
“আঙ্কেল, আমার বন্ধু বীরকে তো আপনি চেনই, আলাদা করে ওর পরিচয় দেওয়ার কিছু নেই। ও খান বাড়িরই ছেলে…”
কিন্তু সৌহার্দ্যের কথা শেষ হলো না। তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সাফিন মির্জা একটু বাঁকা ও ব্যঙ্গাত্মক হাসিতে মুখটা কুঁচকে বলে উঠলেন,
“তার তো আবার দুটো পরিচয়! একাধারে সিকদার বাড়ির ছেলে, আবার অন্যদিকে খান বাড়িরও!”

সাফিন মির্জার এমন খোঁচা মারা কথায় মুহূর্তের জন্য ড্রয়িং রুমের বাতাসটা আরও ভারী হয়ে উঠল। শাহাবীর ততক্ষণে শান্ত অথচ তীব্র দৃষ্টিতে চোখ তুলল সুমির বাবার দিকে। তার চোখেমুখে কোনো রাগ বা অস্বস্তি নেই, রয়েছে এক পাথুরে আত্মবিশ্বাস। গম্ভীর ও ভারী কণ্ঠে সে সোজা সাফিন মির্জার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল—
— “আমার নিজের পরিচয়টাই এনাফ। খান বা শিকদার, কারও পরিচয়ের কোনো প্রয়োজন পড়ে না আমার!”
শাহাবীরের এমন কড়া ও আত্মবিশ্বাসী জবাবে সাফিন মির্জা কিছুটা হকচকিয়ে গেলেন। তিনি আর শাহাবীরের সঙ্গে তর্কে না গিয়ে সরাসরি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন সৌহার্দ্যের দিকে। তাচ্ছিল্যের সুর এড়িয়ে জানতে চাইলেন—
— “কী যেন বলতে চেয়েছিলে, বলো?”
সৌহার্দ্য বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারল, এই লোক এত সহজে নরম হওয়ার পাত্র নয়। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলার সময় তার নেই, আর সেটা সৌহার্দ্যের ধাতে ও নেই। তাই সে কোনো রাখঢাক না রেখে একেবারে সোজাসুজি নিজের বক্তব্যটা পেড়ে ফেলল—
— “আপনার মেয়ে, কী যেন নাম, ওটাকে বীর ভালোবাসে এবং বিয়ে করতে চায়! তাই কোনো রকম ঝামেলা না বাড়িয়ে আপনি সরাসরি রাজি হয়ে যান!”
সৌহার্দ্যের এই হুকুমের সুরে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার ভঙ্গি দেখে ফারিস পাশে বসে মনে নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল। সে মনে বিড়বিড় করে ভাবল, “এভাবে কেউ বিয়ের প্রস্তাব দেয়! এভাবে প্রস্তাব দিলে তো মেয়ের বাপ মেয়ে তো দূরের কথা, উল্টো জুতোপেটা করে বাড়ি থেকে বের করে দেবে!”
সাফিন মির্জা এমনিতেই সৌহার্দ্যকে চোখে দেখতে পারেন না; একই এলাকার হওয়ায় সৌহার্দ্যর চরিত্র ও স্বভাব সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ও নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। তাই বিরক্তিটা চেপে রেখে তিনি বেশ ঠান্ডা ও স্থির কণ্ঠে বললেন, “তোমার প্রস্তাবটা রাখতে পারলাম না, আমার মেয়ের বিয়ে ঠিক করা আছে, আমার বন্ধুর ছেলের সা……”

​ওনার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ফারিস শান্ত অথচ পাথরকঠিন গলায় বলল, “ভেঙে দিন, আর আপনার লজ্জা লাগলে আমাকে বলুন আমি গিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে আসব!”
সাফিন মির্জা আর কোনো কথা বললেন না। কেবল চোখের পলকে সামনে বসা এই ত্রিমূর্তিকে মনে ভালোমতোই চিনেন। ওনার চোখে এরা কেউ-ই ভালো নয়। মুরব্বি তো দূরের কথা, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মানটুকু দেওয়ার ভদ্রতাও এদের নেই। একেবারে আস্ত বেয়াদব! বিশেষ করে ফারিসকে তিনি সৌহার্দ্যের থেকেও অনেক বেশি অপছন্দ করেন। এর কারণও আছে। সংসদে বা জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় ফারিস যেভাবে খোঁচা মেরে কথা বলে, তাতে মনে হয় সে ভাষণ দিচ্ছে কম, বরং অন্য এমপি-মন্ত্রীদের তুলোধোনা ও টিটকারি করছে বেশি! আর শাহাবীরের ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে খুব বেশি কিছু না জানলেও, তার জটিল পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডের কথা মাথায় রেখে সাফিন মির্জা তাকেও মনে সম্পূর্ণ অপছন্দ করেন।
আর কোনো রাখঢাক বা ভনিতা না করে সাফিন মির্জা এবার একেবারে সরাসরি বিষ ঢেলে দিলেন—

— “আমি কোনো জারজ সন্তানের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দেব না। তোমরা এখন আসতে পারো!”
এই চরম অপমানজনক ও কুরুচিপূর্ণ কথাটা শোনার মাত্রই সৌহার্দ্যের ভেতরে থাকা রাগটা আগ্নেয়গিরির লাভা হয়ে ফেটে পড়ল। সে ধড়ফড় করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে গর্জে উঠল—
— “মুরব্বি বলে সম্মান দিচ্ছি, তাই বলে যা খুশি তাই বল…”
কিন্তু পুরো কথাটা শেষ করতে পারল না সৌহার্দ্য। তার ঠিক পাশেই বসে থাকা শাহাবীর শক্ত হাতে সৌহার্দ্যের হাতটা খপ করে চেপে ধরল, আর চোখের ইশারাতেই তাকে শান্ত হতে বলল।
সব রাগ, উত্তেজনা আর থমথমে পরিবেশটাকে এক নিমেষে স্তব্ধ করে দিয়ে শাহাবীর খুব শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল সাফিন মির্জার দিকে। তার কণ্ঠে ছিল এক পাথরের মতো অনমনীয় দৃঢ়তা—
— “আপনার মেয়েকে ডাকুন। সে যদি সামনাসামনি বলে যে সে আমাকে চায় না, তবে কথা দিচ্ছি, এই মুহূর্তেই আপনার বাড়ি থেকে চিরতরে চলে যাব। আর ও যদি বলে যে সে আমাকেই চায়, তবে কারও বাপের ক্ষমতা নেই আমাকে আটকানোর!”
শাহাবীরের এমন চ্যালেঞ্জে ভরা কথায় সাফিন মির্জা এক পলক তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এরপর আর কথা না বাড়িয়ে গলা উঁচিয়ে ডাকলেন—

— “সুমি! এদিকে আয়!”
বাবার ডাকে ড্রয়িং রুমে এসে হাজির হলো সুমি। তার বুক তখন কাঁপছে, দুই হাত মোচড়ানো। শাহাবীর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে সরাসরি গিয়ে দাঁড়াল সুমির ঠিক সামনে। সুমির চোখের গভীরের দিকে তাকিয়ে কঠিন অথচ কাঁপা কাঁপা গলায় সে শুধাল—
— “তোমার বাবা তোমাকে আমার কাছে দিতে রাজি নন। বলো, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো? আমার হাত ধরে আমার সাথে যাবে?”
শাহাবীরের এই সরাসরি প্রশ্নে সুমি একবার ত্রাসভয়ে চোখ তুলে তাকাল তার বাবার রাগী মুখের দিকে। তারপর দ্রুত দৃষ্টি নামিয়ে নিল মেঝেতে। গলা কাঁপিয়ে, অত্যন্ত ক্ষীণ ও ছোট একটা শব্দ তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল—
— “না… আপনি চলে যান।”
এই একটা ছোট্ট শব্দ যেন পুরো ঘরটাকে স্তব্ধ করে দিল। শাহাবীর যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না! সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সুমির দিকে। বুক চিরে বেরিয়ে আসা সুমির ওই ছোট্ট “না” শব্দটা যেন খঞ্জরের মতো এসে বিঁধল তার হৃদপিণ্ডে। এক নিমেষে ছিঁড়েখুঁড়ে দিল তার সমস্ত অহংকার ও ভালোবাসা।
ভাঙা বুক আর পাথর হয়ে যাওয়া নিঃশ্বাসটাকে কোনোমতে আটকে শাহাবীর সুমির ওপর থেকে চোখ সরিয়ে নিল। সে আর একটাও কথা বলল না। পেছন ফিরে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে ম্লান অথচ শক্ত গলায় কেবল বলল—
— “চল, এবার আমাদের যাওয়া উচিত।”
সবাই যখন নীরব, তখন ফারিস একটু সামনে ঝুঁকে নরম গলায় সাফিন মির্জাকে বোঝানোর সুরে বলে উঠল—
— “আঙ্কেল, একটু বোঝার চেষ্টা করুন—”
কিন্তু ফারিসকে বাক্য শেষ করার সুযোগ দিল না সাফিন মির্জা। গমগমে ও কঠোর স্বরে তিনি হাত নেড়ে ধমকে উঠলেন—
— “আমার বাড়ি থেকে যেতে পারো তোমরা!”
সাফিন মির্জার এমন অভদ্র ও অপমানজনক আচরণে ফারিসের মাথার ভেতরের সমস্ত রাগ মুহূর্তের মধ্যে মাথায় চড়ে বসল। সে আর নিজেকে একটুও ধরে রাখতে পারল না। তেতে উঠে তেড়ে গিয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল—
— “বা*ল ভেবেছিলাম একটু ভদ্রভাবে কথা বলব, কিন্তু আজকাল তো দেখি ভদ্রতার কানাকড়িও দাম নেই! চলেই যাচ্ছি আমরা! আমার বন্ধু যদি আপনার মেয়েকে ভালো না বাসতো, তবে আপনার বাড়িতে মুততেও আসতাম না!”
কথাটা বলেই সে হুড়মুড় করে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু পরমুহূর্তেই দরজার সামনে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল সে। টেবিলে রাখা সাথে আনা মিষ্টি আর ফলমূলের প্যাকেটগুলো সজোরে তুলে নিল হাতে। তারপর বাঁকা হাসিতে সাফিন মির্জার দিকে তাকিয়ে বিষাক্ত গলায় বলে উঠল—

— “যেহেতু মেয়ে দিচ্ছেনই না, তাই এগুলো খেয়ে ডায়াবেটিস বাড়িয়ে আর লাভ নেই! এগুলো নিয়ে গেলাম!”
বলেই এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে, রাগে গমগম করতে করতে ফারিস নিজে হাত বাড়িয়ে শাহাবীরের হাতটা শক্ত করে খপ করে ধরে ফেলল এবং টেনে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গেল তাকে।
ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পুরো ড্রয়িং রুমে একটা থমথমে নীরবতা নেমে এল। সৌহার্দ্য তখন সুমির দিকে একটা সেকেন্ডের জন্যও তাকাল না। চোখ নিচু রেখেই খুব শান্ত ও গম্ভীর গলায় সে ডেকে উঠল—
— “কী যেন নাম তোমার? একটু কথা বলা যাবে, এক মিনিট?”
সৌহার্দ্যের এমন গম্ভীর ব্যক্তিত্ব দেখে সুমি কিছুটা ইতস্তত বোধ করল। ভয়ে ভয়ে ঢোক গিলে সে ফিসফিস করে বলল—

— “জ্বি… স্যার, বলুন।”
সৌহার্দ্য আগের মতোই চোখের দৃষ্টি মাটিতে ফেলে রেখে বলল—
— “পার্সোনালি আমি আমার বউ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো মেয়ের সাথে কখনো কথা বলি না। আজ তোমার সাথে কথা বলার একমাত্র কারণ আমার বন্ধু। তাই যা জিজ্ঞেস করব, একদম সোজাসুজি উত্তর দেবে। কোনো ভনিতা বা প্যাঁচালো কথা না, ওকে?”
সৌহার্দ্যের এই স্পষ্ট কথায় সুমি কেবল ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়াল। তখন নির্বাক ও পাথরকঠিন কণ্ঠে সৌহার্দ্য সরাসরি প্রশ্ন করল—
— “ভালোবাসো ওকে?”
প্রশ্নটা শুনে সুমি এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। বুক চিরে দীর্ঘ একটা সময় নিয়ে সে অনুচ্চ কণ্ঠে শুধু বলল—

— “হ্যাঁ!”
সৌহার্দ্য একটুও সময় নষ্ট না করে সরাসরি কাজের কথায় এল—
— “তোমার বাবা যদি রাজি হন, তুমি কি রাজি?”
সুমি এবার আর দেরি করল না। চটজলদি ওপর-নিচ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
সৌহার্দ্য আর সেখানে এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। পিঠ ফিরিয়ে হাঁটতে শুরু করতে সে শুধু বলে গেল—
— “ওকে। তোমার বাবা নিজেই তোমাকে বীরের হাতে তুলে দেবেন।”
সৌহার্দ্য রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সুমির ভেতর আটকে থাকা সমস্ত কান্না বাঁধ ভেঙে উপচে পড়ল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। আসলে, এর আগের রাতেই সুমি তার বাবাকে শাহাবীরের ব্যাপারে সব খুলে বলেছিল। বাবা যখন বারবার জোর করে সুজনের সাথে তার বিয়ে ঠিক করার চেষ্টা করছিলেন, তখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় সুমি সাফ জানিয়ে দিয়েছিল যে সে কেবল শাহাবীরকেই ভালোবাসে। শাহাবীরদের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড ও প্রভাব সম্পর্কে সাফিন মির্জা আগে থেকেই ভালোমতো জানতেন, কারণ ব্যবসায়িক সূত্রে শিকদার পরিবারের সাথে তাদের বেশ ভালো পরিচয় ছিল। কিন্তু ওই নামের ওজন বা আভিজাত্য সাফিন মির্জার কাছে কোনো মূল্যই পায়নি। তিনি মেয়েকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই বিয়ে তিনি জীবনের তরেও মানবেন না! যদি সুমি আসলেই শাহাবীরকে চায়, তবে তাকে আজীবনের মতো বাবা-মাকে ত্যাগ করতে হবে! একমাত্র সন্তান হওয়ায় বাবা-মায়ের কাছ থেকে আজীবন অন্ধ স্নেহ ও ভালোবাসা পেয়ে বড় হওয়া সুমির পক্ষে কি কখনো সম্ভব ছিল নিজের মা-বাবার বুকে এভাবে পাথর চাপা দিতে? মা-বাবার মনে এত বড় কষ্ট দেওয়ার কথা ভাবতেই সুমির বুক কেঁপে উঠেছিল, যা তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না!

রাস্তার পাশের অমসৃণ নিস্তব্ধতাটুকু যেন ভারী হয়ে নেমে এসেছে তিন যুবকের ওপর। রাস্তার মৃদু হলুদ বাতির আলোয় শাহাবীরের মুখের থমথমে ভাবটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সুমির কথাটা যেন এখনও তার কানের ভেতর একটানা বেজে চলেছে, কানের পর্দা ফাটিয়ে দিচ্ছে।
শাহাবীর কখনো ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি সুমি এভাবে তার চোখের ওপর চোখ রেখে তাকে সরাসরি অস্বীকার করবে! সে তো মনে ভেবেছিল, অন্তত বাবার সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে না পারুক, অন্তত এইটুকু তো বলবে যে সে শাহাবীরকে ভালোবাসে। কিন্তু সব হিসেব যেন মুহূর্তেই এলোমেলো হয়ে গেল।
শাহাবীরের এই পাথরের মতো কঠিন ও বিষণ্ণ মুখানা দেখে আর থাকতে পারল না ফারিস। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাগের সুরে বিড়বিড় করে উঠল, “বালের শ্বশুরগুলো যে এমন কেন হয়!” একটু থেমে নিজের মনেই আবার যোগ করল, “এদিক থেকে সৌহার্দ্যের কপাল ভালো, শ্বশুর নামের এই আপদটা ওর নেই!”
ফারিসের এই অতিরিক্ত এবং অপ্রাসঙ্গিক কথায় মুহূর্তেই বিরক্তিতে কুঁকড়ে গেল সৌহার্দ্যের মুখ। কড়া গলায় সে ধমক দিয়ে বলে উঠল, “তোর ওই স্টুপিড মুখটা একটু বন্ধ করবি, ইডিয়ট?”

এরপর আর রাগ ধরে রাখতে না পেরে পরম যত্নে শাহাবীরের কাঁধে হাত রাখল সৌহার্দ্য। গলার স্বরটা একদম নরম করে সান্ত্বনার সুরে বলল, “টেনশন নিস না। কী যেন নাম ওটার… ওর সাথে কথা বলছি। বাবার ভয়ে হয়তো একটু ভয় পেয়ে গেছে, কিন্তু তোকেই ও ভালোবাসে!”
একটু থেমে, অভিজ্ঞতার একটা সত্যি দিক তুলে ধরে সৌহার্দ্য আবার যোগ করল, “আর সত্যি কথা বলতে কী, একটা মেয়ে তো তার বাবার রাজকন্যা! দুই দিনের ভালোবাসার টানে বাবা-মাকে ছেড়ে হুট করে সব ছেড়ে আসা উচিত—এটা আমিও মনে করি না।”
কথাগুলো শেষ করে সৌহার্দ্য আবার শাহাবীরের মলিন মুখের দিকে তাকাল। চোখে আশ্বাসের আলো জ্বেলে বলল, “ওই মেয়ে তোরই হবে, কথা দিচ্ছি। আর কোন… ওই কোন বালটার সাথেই বিয়ে দিতে চাচ্ছে ওটাকে…”

সৌহার্দ্যের কথা শেষ হওয়ার আগেই শাহাবীর মরা গলায় ফুঁপিয়ে উঠল, “সুজনের সাথে!”
নামটা উচ্চারিত হতেই এক মুহূর্তে থমকে গেল চারপাশ। সৌহার্দ্য আর ফারিস দুজনেই চমকে তাকাল শাহাবীরের দিকে। ফারিস কিছু একটা বলতে মুখ খুলতেই শাহাবীর হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল, “ওর কোনো দোষ নেই… ও নিজে এই বিয়েটা করতে চায় না।”
শাহাবীরের এই কথাটাতেই ফারিসের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। হঠাৎ যেন মাথার ভেতর এক অদ্ভুত ফন্দি খেলে গেল তার। উৎসাহে ফেটে পড়ে সে বলে উঠল, “এক কাজ কর! সুজনকে বলব বিয়েতে রাজি হতে, তারপর বিয়ের দিন ওর জায়গায় ঘোমটার আড়ালে তুই…”
ফারিসের কথা শেষ হতে দিল না সৌহার্দ্য। একটা তীব্র ধমক দিয়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে কড়া গলায় বলল, “ইডিয়ট! তোর মাথাটায় কি গোবর ছাড়া আর কোনো ভালো বুদ্ধি আসে না?”
বলেই আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না সৌহার্দ্য। রাগ আর বিরক্তিতে পা চালিয়ে গিয়ে সরাসরি গাড়িতে উঠে বসল। তারপর জানালার কাঁচ নামিয়ে গলা উঁচু করে বাকি দুজনকে ডেকে বলল, ” উঠে আস তোরা জলদি! বাড়ি যেতে হবে আমাকে… অনেকক্ষণ বউটাকে দেখি না, বুকের ভেতর জ্বালা হচ্ছে! এক্ষুনি দেখতে হবে ওই স্টুপিডটাকে!”
দূরে দাঁড়িয়ে ফারিস বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে ফেলে বিড়বিড় করে উঠল, “আস্ত একটা বউপাগল!”

বিকালে প্রায় চারটার দিকে সবেমাত্র বাড়ি ফিরল সৌহার্দ্য। রুমে পা রেখেই তার চোখে পড়ল, রিদি মলিন মুখে হাত দিয়ে চুপচাপ বসে আছে। সৌহার্দ্য একবার সেদিকে তাকিয়ে নির্বিকারভাবে আলমারি থেকে একটা টাওয়েল তুলে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল।
রিদি মনে মনে ভেবেছিল, এভাবে কষ্ট নিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে দেখলে অন্তত একবার হলেও সৌহার্দ্য এগিয়ে এসে জানতে চাইবে, কী হয়েছে, কেন সে এমন করে বসে আছে? কিন্তু তার সেই আশায় পুরোপুরি ছাই ঢেলে দিয়ে সৌহার্দ্য কোনো কথা না বলেই নিজের মতো বাথরুমে ঢুকে গেল। রিদির রাগে তখন পুরো শরীর জ্বলে যাচ্ছে! এই মানুষটার মধ্যে একটুও মায়া-দয়া নেই, সব সময় শুধু তেজ আর অহংকার! রাগে-অভিমানে রিদি আর সহ্য করতে না পেরে সজোরে টেনে তার কাপড়-চোপড়ের ব্যাগটা বের করে ফেলল। আলমারি থেকে কিছু কাপড় খামচে টেনে বের করার পর বাথরুমের বন্ধ দরজার দিকে একবার রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুখটা মুচড়ে একটা ভেংচি দিল সে।
ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খোলার আওয়াজ কানে এল। শব্দ পেতেই রিদি দ্রুত হাতে নিজের ব্যাগটা গোছাতে শুরু করল এবং মনে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বিড়বিড় করে বলে উঠল—

— “আস্ত একটা গণ্ডার! পারে শুধু নিজের তেজ দেখাতে!”
তক্ষণে সৌহার্দ্য বেরিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েছে। গায়ে পারফিউম স্প্রে করে হাতের ঘড়িটা কবজিতে পরতে পরতে সে রিদির কাণ্ডকারখানা দেখল। তারপর ভ্রু কুঁচকে, ঠান্ডা গলায় রিদির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল—
— “ব্যাগ গোছাচ্ছ কেন, স্টুপিড?”
রিদি মুখটা আরও বাঁকিয়ে, জেদি গলায় তেড়ে উঠে বলল—
— “চলে যাব বাবার বাড়িতে! মানুষের এত ইগো আর অহংকার, সে থাকুক!”
সৌহার্দ্যের কপালটা বিরক্তিতে কুঁকড়ে গেল। ঠান্ডা অথচ বিরক্তিকর এক কণ্ঠে সে জবাব দিল—
— “যেখানে খুশি যাও, আমার বাচ্চা রেখে যাও!”
রিদি হতবাক হয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্যের দিকে। বিশ্বাসই করতে পারছে না মানুষটা কী বলছে! সে কিছুটা অবাক ও ক্ষিপ্ত সুরে বলে উঠল—

— “কিন্তু ও তো এখনও দুনিয়াতেই আসেনি! রেখে যাব কীভাবে?”
বলেই উত্তরের অপেক্ষায় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্যের মুখের দিকে। সৌহার্দ্য আগের মতোই চরম উদাসীন ও বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে উঠল—
— “সেটা আমি কীভাবে বলব? আমার বাচ্চা রেখে তুমি যে জাহান্নামে খুশি যাও, আই ডোন্ট কেয়ার!”
কথাটা শেষ করেই ক্লোজেট থেকে একটা কালো শার্ট টেনে বের করে গায়ে গলিয়ে নিল সে। রিদি অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল। রাগে তার বুক ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। ব্যাগ গোছানো শেষ করে এই মুহূর্তে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যই সে সবেমাত্র উঠতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘটে গেল অপ্রত্যাশিত এক কাণ্ড।
সৌহার্দ্য হঠাৎ লম্বা পায়ে এগিয়ে এসে রিদির হাত থেকে গোছানো ব্যাগটা হেঁচকা টানে কেড়ে নিয়ে একপাশে ছুড়ে ফেলল। তারপর রিদিকে প্রায় জোর করেই বিছানায় বসিয়ে দিয়ে তার পেটের ওপর থেকে জামাটা আলতো করে সরিয়ে দিল। সে যখন রিদির উন্মুক্ত পেটে মুখ গুঁজে চুমু খেতে গেল, রিদি তৎক্ষণাৎ রাগে ফেটে পড়ে দুই হাত দিয়ে সৌহার্দ্যের মাথাটা ঠেলে সরাতে গেল—

— “একদম আমাকে চুমু খাবেন না! আমার সাথে একটা কথাও বলছেন না, আবার এসে চুমু খাচ্ছেন কেন?”
কিন্তু রিদির সেই ধাক্কা বা প্রতিবাদে একটুও কান দিল না সৌহার্দ্য। সে রিদির হাত দুটো একহাতে সরিয়ে দিয়ে নিজের মুখটা আবার রিদির উষ্ণ পেটে গুঁজে দিল। চুমুতে চুমুতে পেটটা ভরিয়ে দিতে দিতে সে ব্যঙ্গমিশ্রিত আদুরে গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল—
— “তোমাকে কে চুমু খাচ্ছে, স্টুপিড মহিলা? আমি আমার প্রিন্সেসকে চুমু খাচ্ছি! একদম আমার আর মেয়ের মাঝখানে এসে বাধা দেবে না!”
বলেই সে পেটের ওপর পরপর কয়েকটা গভীর চুমু বসিয়ে দিল। এরপর রিদির পেটের সাথে নিজের মুখটা একেবারে লাগিয়ে রেখে এক অদ্ভুত মায়াবী ও আকুল কণ্ঠে ফিসফিস করে বলতে লাগল—

— “বাবার কলিজাটা, কখন আসবে তুমি তোমার বাবার কাছে? তোকে বুকে জড়িয়ে ধরার জন্য বাবার মনটা যে ভীষণ ব্যাকুল হয়ে আছে! আমার জান বাচ্চাটা, তাড়াতাড়ি চলে এসো বাইরে…”
সৌহার্দ্যের এমন পাগলামি আর অব্যক্ত ভালোবাসার প্রকাশ দেখে রিদির চোখের কোণ ভিজিয়ে এক ফালি স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। সে ভালোবেসে আলতো হাতে সৌহার্দ্যের চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে দিল, তারপর নরম ও আদুরে কণ্ঠে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল—
— “আপনি খুশি হয়েছেন তো, ডাক্তার সাহেব?”
সৌহার্দ্য তখনও রিদির পেটের মাঝে নিজের নাক ঘষে চলেছে। মৃদু অথচ গভীর তৃপ্তির সুরে সে বলে উঠল—
— “ভীষণ খুশি হয়েছি, মাই হার্ট! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এই উপহারটা আমাকে দেওয়ার জন্য বলো, কী চাও তুমি আমার কাছে?”

সৌহার্দ্যকে তখন পরনে শুধু একটা টাওয়েল জড়ানো অবস্থায় দেখে রিদির মনে হঠাৎ করেই এক চিলতে দুষ্টুমি খেলে গেল। সকাল থেকে কথা না বলে তাকে যে কষ্টটা সে দিয়েছে, তার একটা ছোট্ট শোধ তোলার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেল সে! দুষ্টুমিভরা হাসিতে চোখ দুটো চকচক করে ওঠায় রিদি বলে উঠল—
— “সত্যি বলছেন? আমি যা চাইব, তাই করবেন?”
সৌহার্দ্য এক মুহূর্ত দেরি না করে মাথা তুলে একটু ঝুঁকে এল, তারপর রিদির কপালে একটা গভীর চুমু দিয়ে প্রশান্ত গলায় বলল—
— “হুম।”
রিদি তখন চোখ টিপে দুষ্টুমি ভরা কণ্ঠে খিলখিল করে বলে উঠল—
— “তাহলে আমি চাই, আপনি একটা লুঙ্গি পরে আমাকে একটা ‘লুঙ্গি ডান্স’ দিয়ে দেখান! আমার দেখতে চাই আপ—”

কিন্তু পুরো বাক্যটা শেষ করার সুযোগ পেল না রিদি! “লুঙ্গি ডান্স” কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সৌহার্দ্যের চোখ কপালে উঠল। চরম বিরক্তি আর অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সে এক ঝটকায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সমস্ত বিরক্তি এক লহমায় ঝেড়ে ফেলে সে বিরক্তিকর গলায় বলে উঠল—
— “তুমি যেমন স্টুপিড, তোমার চাওয়াও তেমন স্টুপিড, বেয়াদব মহিলা!”
বলেই সে আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। আলমারি থেকে একটা ট্রাউজার্স টেনে দ্রুত পায়ে গায়ে গলিয়ে নিতে নিতে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কড়া গলায় বলে গেল—
— “চুপচাপ বিছানায় বসে থাকো, আমি খাবার নিয়ে আসছি!”
রিদি বিছানায় বসে একটু আড়মোড়া ভেঙে ফিক করে হেসে দিল, তারপর পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলল—
— “আরে শুনুন, আমি তো খেয়েছি!”
কিন্তু রিদির সেই কথায় একটুও পাত্তা দিল না সৌহার্দ্য। দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে সে গম্ভীর ও ধমকের সুরে বলে উঠল—
— “তোমার ওইটুকু পাখির খাবারে আমার প্রিন্সেসের পেট ভরবে না! বেশি কথা না বাড়িয়ে একদম লক্ষ্মী মেয়ের মতো চুপচাপ বসে থাকো।”
কথাটা শেষ করেই সে আর দাঁড়াল না। ঝড়ের বেগে রুম থেকে বেরিয়ে গেল খাবার আনতে।

রাত তখন প্রায় এগারোটার কাছাকাছি। চারপাশের চরাচর থমথমে, গা ছমছমে নিস্তব্ধতা ভেদ করে দূরে কোথাও একটানা বেজে চলেছে ঝিঁঝি পোকার ডাক। বেলকনির ঠান্ডা লোহার রেলিংটা শক্ত করে ধরে শূন্য দৃষ্টিতে সামনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে আরবান। তার চোখ দুটো কেমন যেন অনুভূতিহীন, পাথর হয়ে গেছে যেন! বাবা আর ভাইয়ের এমন জঘন্য ও কলঙ্কজনক কুকীর্তির কথা জানার পর থেকেই সে যেন নিজের ছায়াটাকেও ভয় পাচ্ছে। সৌহার্দ্য কিংবা রিদির সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর ন্যূনতম সাহসটুকুও সে হারিয়ে ফেলেছে। নিজের অস্তিত্বটাই তার কাছে এক বিরাট অপরাধের মতো ভারী হয়ে চেপে বসেছে।
আরবানের এমন শূন্য ভাবনার মাঝেই নিঃশব্দে এসে তার পাশে দাঁড়াল পৃথা। আলতো করে আরবানের পিঠে হাত রেখে নরম গলায় সে বলে উঠল—

— “এমন করে একা একা দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আপনাকে এই অবস্থায় দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়, একদম ভালো লাগছে না!”
পৃথার কথায় আরবান যখন মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল, তখন অন্ধকারেও পৃথা শিউরে উঠল। আরবানের চোখ-মুখগুলো অতিরিক্ত কান্নায় ফুলে লাল হয়ে আছে। দেখলেই বোঝা যায় সে কিছুক্ষণ আগেও নীরবে কতটা কেঁদেছে।
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠায় পৃথা আরবানের মুখের ওপর নিজের হাতটা রাখল, তারপর কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—

— “আপনি কি কেঁদেছেন?”
আরবান নিজের ভাঙা গলাটাকে কোনোমতে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। মুখে একটা কৃত্রিম হাসির আভা টেনে ম্লান সুরে বলল—
— “না তো! তুমি ঘুমাও গিয়ে। তোমার শরীর খারাপ হবে। এই সময়ে এভাবে রাত জেগে থাকা তোমার জন্য একদম ঠিক না।”
কিন্তু পৃথার মন কি আর এসব সান্ত্বনায় মানে? সে কথা না বাড়িয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল, তারপর নিজের মাথাটা আলতো করে গুঁজে দিল আরবানের প্রশস্ত বুকে। আকুল হয়ে ফিসফিস করে বলল—
— “বুকের ভেতরে জমে থাকা এই কষ্টের কথাগুলো কি আমাকে একটুও বলা যায় না?”
পৃথার এমন নিঃস্বার্থ মায়া আর ভালোবাসার ছোঁয়া পেয়ে আরবানের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা উষ্ণ জল গড়িয়ে পড়ল। সে নিজের থুতনিটা আলতো করে রাখল পৃথার মাথার ওপর। ভারী ও রুদ্ধশ্বাসে সে ফিসফিস করে বলে উঠল—

— “কেন বাবা আর ভাইয়া এমন করতে গেল, পৃথা? আমাদের কিসের কোনো কমতি ছিল বলো তো? বিশ্বাস করো, আমার ছোট ভাইয়া আর রিদির চোখের দিকে তাকাতেও এখন আমার ভীষণ লজ্জা করছে। নিজেকে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধী!”
পৃথা তখন নিজের হাত দিয়ে আরবানের পিঠ জড়িয়ে ধরে তাকে সান্ত্বনার সুরে বলল—
— “এমন কথা আর কখনো মুখেও আনবেন না! ওরা তো খুব ভালো করেই জানে, এই অপরাধের সাথে আপনার দূর-দূরান্তেও কোনো সম্পর্ক নেই। আপনি তো কোনো অন্যায় করেননি!”
পৃথার সেই সান্ত্বনার কোনো উত্তর দিল না আরবান। সে কেবল চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলল, আর আগের মতোই পৃথার মাথার ওপর থুতনি ঠেকিয়ে গভীর হতাশায় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল রাতের ওই স্তব্ধতার মাঝে।

চারপাশে গুমোট অন্ধকার আর ভ্যাপসা একটা গন্ধ। ঘরের এক কোণায় একটা কাঠের চেয়ারে হাত-পা শক্ত করে দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছেন সারবান চৌধুরী। বয়সের ভারে আর মানসিক ধকলে ওনার মুখটা কেমন যেন অতিরিক্ত ক্লান্ত ও ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তখন খোঁজাখুঁজির পরও যখন তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না বলছিল, তখন আসলে সেখান থেকে আগেই সৌহার্দ্যের ইশারায় লোক লাগিয়ে শাহাবীর নিজেই তাকে ধরে এনে এই গোপন জায়গায় আটকে রেখেছে।
হঠাৎ করেই বাইরে থেকে জুতো পায়ে হেঁটে আসার শব্দ শোনা গেল। খটখট শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে আসছে। শব্দের উৎস লক্ষ্য করে চোখ তুলে তাকালেন সারবান চৌধুরী। ঝাপসা আলোয় দেখতে পেলেন, সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সৌহার্দ্য। তার পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে শাহাবীর, ফারিস আর সুজন।
সৌহার্দ্য কোনো কথা না বাড়িয়ে একদম ওনার সামনে একটা লোহার চেয়ার টেনে এনে বসে পড়ল। তারপর মুখে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটিয়ে বেশ আদব-কায়দা করে সালাম জানিয়ে বলল—

— “আসসালামু আলাইকুম চাচ্চু! কেমন ফিল করছ এখন?”
নিজের এই অসহায় অবস্থার ওপর এমন উপহাস সহ্য হলো না সারবান চৌধুরীর। তিনি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে গর্জে উঠলেন—
— “আমার সাথে এই ধরনের বেয়াদবি করছ কেন? কেন আমাকে তুলে এনে এখানে বন্দি করে রেখেছ?”
সৌহার্দ্য তাতে বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হয়ে মৃদু হাসল। সরাসরি ওনার চোখের দিকে গভীর দৃষ্টি ফেলে শান্ত গলায় বলল—
— “তোমার ভাতিজা তো আর জন্ম থেকেই বেয়াদব, চাচ্চু! এটা তো তোমার ভালো করেই জানার কথা। তবুও কেন বারবার নিজে মুখে বলে আমাকে লজ্জায় ফেলছ বলো তো?”
সৌহার্দ্যের এই রসাত্মক অথচ বিষাক্ত কথায় পেছন থেকে ফারিস আর সুজন মিটিমিটি হাসতে লাগল। তবে শাহাবীরের মুখের ভাব বরাবরের মতোই কঠিন। সে গম্ভীর চোখে শুধু পুরো দৃশ্যটা পর্যবেক্ষণ করছে।
সারবান চৌধুরী চোখেমুখে চরম বিরক্তি আর ঘৃণা ফুটিয়ে তুলে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন—
— “কী চাও তুমি আমার কাছে, আস্ত বেয়াদব ছেলে?”
সৌহার্দ্যের মুখের হাসিটা এক মুহূর্তে মিলিয়ে গিয়ে পুরোপুরি বরফশীতল হয়ে গেল। নির্বাক ও ভারী কণ্ঠে সে সোজা উত্তর দিল—

— “বেশি কিছু না, চাচ্চু! তোমার এই অকাজের হার্টটা আমার চাই। তুমি তো এমনিতেও একদিন মরবেই, তাই মরার আগে তোমার এই অকেজো হার্টটা অন্য কারও শরীরে লাগিয়ে ভালো একটা কাজ করতে চাইছি!”
সৌহার্দ্যের মুখ থেকে এমন ভয়ানক ও নিষ্ঠুর একটা কথা বেরোতেই শিউরে উঠলেন সারবান চৌধুরী। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ঢোক গিলে ভয়ার্ত ও কাঁপা কাঁপা গলায় তিনি কোনোমতে বলে উঠলেন—
— “আমি তোর চাচা হই! ছোটবেলায় কত আদর করে তোমাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি আমি! আজ নিজের চাচার সাথে তুমি এই পৈশাচিক কাজ করতে পারবে?”
সৌহার্দ্য এক ফালি বাঁকা হাসি দিল। মুখে কৃত্রিম আফসোসের সুর ফুটিয়ে সে বলল—
— “সত্যি বলছি, আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে! ছোটবেলায় এত আদর করে মানুষ করে, এখন বারবার আমাকে এভাবে মেরে ফেলার চেষ্টা কেন করেছিলে বলো তো? সেই ছোটবেলায় আমাকে মেরে ফেলতে? বিশ্বাস করো চাচ্চু, আমার নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করলে আমি কিছুই করতাম না। তোমার ওপর আমার বিন্দুমাত্র কোনো অভিযোগ থাকতো না। কিন্তু আমার হার্ট—যাকে আমি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি—তার গায়ে কেউ যদি আঁচড় কাটে, তাকে আমি কখনো ক্ষমা করি না!”
বলেই সে হাত বাড়িয়ে সুজনের কাছে সার্জারির যন্ত্রপাতিগুলো একে একে এগিয়ে দিতে বলল।
সৌহার্দ্যের এই প্রস্তুতি দেখে শাহাবীর ভেতর থেকে কেঁপে উঠল। সে এতক্ষণ ভেবেছিল সৌহার্দ্য হয়তো কেবল ভয় দেখাচ্ছে, কিন্তু এখন বুঝতে পারছে ব্যাপারটি পুরোপুরি বাস্তব! আতঙ্কে চমকে উঠে শাহাবীর হাত বাড়িয়ে সৌহার্দ্যকে বাধা দিয়ে বলে উঠল—

— “প্লিজ, সৌহার্দ্য! তুই এটা করতে পারিস না! তুই পাগল হয়েছিস? এর পরিণতি কী হবে ভেবেছিস? আমাকে এই বেআইনি কাজের জন্য আইনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে!”
সৌহার্দ্য একটানা নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে একেবারে ঠান্ডা মাথায় জবাব দিল—
— “কোন বালের জবাবদিহি? পালিয়ে যাওয়া লোকটাকে খুঁজে পাচ্ছিস না—ব্যাস, এই কথা বলে দিবি! জবাবদিহি চাইলে বলবি হাজার খুঁজেও তাকে পাওয়া যায়নি, কেস ক্লোজ! ঝামেলা শেষ!”
কথাটা শেষ করেই সে সারবান চৌধুরীকে আর একটাও কথা বলার ন্যূনতম সুযোগ দিল না। কোনো রকম অ্যানাস্থেসিয়া বা চেতনানাশক ওষুধ ছাড়াই সে জীবন্ত অবস্থায় অত্যন্ত দক্ষ হাতে তার হৃদপিণ্ডটা শরীর থেকে বের করে নিল! এত বড় একটা পৈশাচিক কাজ করছে সে, অথচ সৌহার্দ্যের হাতের একটা আঙুলও একটুর জন্য কাঁপল না।
ফারিস আর সুজন এই দৃশ্য দেখে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকায় খুব একটা অবাক হলো না, কিন্তু শাহাবীর একদম পাথর হয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্যের হাতে থাকা তখনো চটপট করতে থাকা রক্তাক্ত হৃদপিণ্ডটার দিকে।
সৌহার্দ্য সামান্য ভ্রুক্ষেপ না করে সেটা সুজনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে নির্দেশ দিল—

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৮

— “এটা খুব সাবধানে প্রিজার্ভ করে ঠিকঠাক রাখ। ঠিক যে লোকটার জন্য এই হার্টটা প্রয়োজন, তার শরীরেই এটা ট্রান্সপ্লান্ট করতে হবে!”
এরপর সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রায়ানের দিকে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে হুকুম দিল—
— “বাকি বডিটা পিস পিস করে কেটে গভীর জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আসবি! এক ফোঁটাও যেন প্রমাণ না থাকে!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬০