অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬০
রিদিতা চৌধুরী
রাত তখন গভীর। চারপাশের সমস্ত কোলাহল থামিয়ে দিয়ে প্রকৃতি যেন তলিয়ে গেছে গভীর ঘুমে। ঘরের নরম বিছানায় রিদি তখন আচ্ছন্ন গভীর ঘুমে; তার মুখের ওপর এসে পড়েছে স্নিগ্ধ জোছনার আলো, আর ঠোঁটের কোণে লেগে আছে এক ফালি মিষ্টি হাসির রেখা।
দরজাটা আলতো করে খুলে ঘরে পা রাখল সৌহার্দ্য। সারাদিনের ধকলের ছাপ স্পষ্ট তার ক্লান্ত চোখে। ঘরে ঢুকেই একবার থমকে দাঁড়িয়ে চোখ বুলিয়ে নিল বিছানার দিকে—যেখানে রিদি তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে সেদিকে তাকিয়ে আলমারি থেকে একটা ট্রাউজার আর তোয়ালে টেনে নিল, তারপর নিঃশব্দ পায়ে চলে গেল ওয়াশরুমের দিকে।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর শাওয়ার নিয়ে যখন সে বের হলো, দেখল রিদি খাটের কোণে পা ঝুলিয়ে বসে অপলক তাকিয়ে আছে তারই দিকে।
ভ্রু কুঁচকে সৌহার্দ্য নরম সুরে বলে উঠল, “হোয়াট হ্যাপেন্ড, জান? ঘুমাওনি এখনো?”
রিদি বিছানা ছেড়ে এগিয়ে এসে সৌহার্দ্যের কাঁধ থেকে তোয়ালেটা নিজের হাতে তুলে নিল। এরপর ইশারায় তাকে একটু ঝুঁকে দাঁড়াতে বলল। সৌহার্দ্য রিদির ঘাড় জড়িয়ে নিচের দিকে ঝুঁকতেই, রিদি তার নরম হাত বুলিয়ে সৌহার্দ্যের ভেজা চুলগুলো মুছে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল, “এত দেরি করলেন যে?”
সৌহার্দ্য রিদির তুলতুলে গালে গভীর একটা চুমু এঁকে ক্লান্ত হেসে বলল, “একটা জরুরি অপারেশন ছিল।”
রিদি নরম কণ্ঠে আবার জিজ্ঞেস করল, “খেয়েছেন?”
সৌহার্দ্য শুধু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝাল। এরপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে রিদিকে পাঁজা কোলে তুলে নিল সে। বিছানার কাছে নিয়ে আলতো করে শুইয়ে দিয়ে নেশাভরা চোখে তার পানে তাকিয়ে বলল, “জান, মনটা ভীষণ অশান্ত লাগছে… একটু শান্ত করে দেবে?”
সৌহার্দ্যের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে রিদি একটু আড়ষ্ট হলো। সৌহার্দ্যের গলা জড়িয়ে আমতা আমতা করে বলল, “বেবির… কোনো সমস্যা হবে না তো?”
রিদির কথায় ঠোঁট কামড়ে কিছু ভাবল সৌহার্দ্য তারপর গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ওকে… ঘুমিয়ে পড়ো।”
সৌহার্দ্যের গলার স্বর আজ কেমন যেন একটু অন্যরকম, অদ্ভুত এক মোহে ভরা। রিদি আলতো হাতে সৌহার্দ্যের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করে উঠল, “আপনাকে আজ কেমন যেন লাগছে, ডাক্তার সাহেব?”
সৌহার্দ্য রিদির গলার ভাঁজে আলতো একটা কামড় দিয়ে ক্লান্ত স্বরে বলল, “ক্লান্ত লাগছে খুব… ঘুমাতে দাও।”
রিদি আর কথা বাড়াল না, শুধু চোখ বুজে এল তার। আর সেই সুযোগেই সৌহার্দ্য রিদির গলা থেকে মুখ সরিয়ে তার স্নিগ্ধ পেটের কাছে মুখ নিয়ে একটা আলতো চুমু আঁকল। এরপর রিদিকে নিজের দুই বাহুর মাঝে জড়িয়ে, বুকের খুব কাছে টেনে নিয়ে চোখ বুজে তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে।
রাত জাগা নীরবতায় ব্যালকনির রেলিংয়ে ভর দিয়ে একা বসে আছে শাহবীর, আর তার আঙুলের ফাঁকে টিমটিম করে জ্বলছে একটা সিগারেট। ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়িয়ে তার দৃষ্টি আটকে আছে আকাশের দূর সীমানায়। একটা দীর্ঘ টান দিয়ে সে হাত বাড়িয়ে তুলে নিল মোবাইলটা। কল লিস্ট থেকে সুমির নাম্বারটা স্ক্রিনেই ভেসে উঠল; আঙুলটা একবার কলের বাটনে গিয়েও থেমে গেল। তবু ওই অবাধ্য মনটাকে যেন কিছুতেই মানানো যাচ্ছে না। বারবার চোখ চলে যাচ্ছে ওই নামটার ওপর—শুধু একবার মেয়েটার কণ্ঠস্বর শোনার তীব্র এক সুপ্ত জেদ চেপে বসেছে মনে।
শেষ পর্যন্ত মনের জেদের কাছে হেরে গিয়ে নিজের অন্য একটা সিম কার্ড থেকে ডায়াল করল সুমির নাম্বারে।
এপাশ থেকে বেশ কয়েকটা রিং বাজার পর ওপাশ থেকে রিসিভ হলো—ঘুম জড়ানো, বিরক্ত এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “হ্যালো, কে?”
শাহবীর একদম চুপ করে রইল, মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। ওপাশ থেকে সুমি পরপর কয়েকবার “হ্যালো, হ্যালো” বলে কোনো সাড়া না পেয়ে ফোনের সংযোগ কেটে দিল। কিন্তু এত সহজে কি আর মন মানে? শাহবীরের তৃপ্তি হলো কই! সে আবার ডায়াল করল। সুমির সেই চেনা কণ্ঠস্বর কানে আসতেই সে আগের মতোই চুপ করে নিঝুম হয়ে বসে রইল।
এভাবে ওপাশ থেকে যখন আবার লাইন কেটে গেল, শাহবীর নাছোড়বান্দার মতো আবার কল দিল। আর যায় কোথায়! এবার কল রিসিভ হতেই ভেসে এল সুমির সেই বজ্রকঠিন, রাগে ফুঁসে ওঠা কণ্ঠ—
“কোন বান্দির পোলারে তুই এত রাতে চোর-পুলিশ খেলতেছিস আমার সাথে? আর একবার ফোন দিলে পঁচা ডোবায় চুবিয়ে মারব!”
বলেই ঝাস করে লাইনটা কেটে দিল সুমি।
এদিকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে থম মেরে বসে রইল শাহবীর—একদম তব্দা খাওয়া অবস্থা! ফোন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে সে বলে উঠল, “এটা তো কোনো সাধারণ মেয়ে না, আস্ত একটা আগুনের গোলা!”
বলেই রুমে ফিরে বিছানায় ফোনটা একপাশে সশব্দে ছুঁড়ে ফেলে শুয়ে পড়ল। সুমির ওই চাবুকের মতো তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরটা কান থেকে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই যেন তার ছটফট করা অশান্ত মনটা একটুখানি শান্ত হয়ে এল।
এর মাঝেই কেটে গেছে তিনটে মাস।
আইনি লড়াইয়ের সেই অধ্যায় পেরিয়ে আকিব শিকদার ও আসিফ শিকদারের ভাগ্যে জুটেছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আরহানের ভাগ্যে জুটল পাঁচ বছরের কারাদণ্ড; কারণ সারবান চৌধুরীকে সাহায্য করা ছাড়া তার বিরুদ্ধে সরাসরি অপরাধের বড় কোনো প্রমাণ মেলেনি। উপরন্তু, নিজের উদ্যোগে পুরো গ্যাংটাকে ধরিয়ে দিতে সে পুলিশকে সাহায্য করায় সরকার তার শাস্তি অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
এদিকে সুমি আর শাহবীরের বিয়ের দিনক্ষণ পাকাপাকি। মজার ব্যাপার হলো, তাদের এই সম্পর্ক মেনে নিয়েছেন স্বয়ং সাফিন মির্জা! সৌহার্দ্য ঠিক কী এমন জাদুকরি কথা বলেছিল সুমির বাবাকে, তা আজ পর্যন্ত কারও জানা নেই। তবে সুমির বাবা নিজেই সেদিন শাহবীরকে ফোন করে বিয়ের দিন ঠিক করতে বলেন। এরপর শাহবীর তার মা আরিফা খানকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে বিয়ের সব চূড়ান্ত করে এসেছে। ব্যস, আর মাত্র তিন দিন বাদেই তাদের বহুল প্রতীক্ষিত সেই শুভলগ্ন!
ওদিকে সৌহার্দ্য আর রিদির ভুবনেও এসেছে অনেক পালাবদল। রিদি আর আগের মতো সেই শান্ত স্বভাবের নেই—এখন একটুতেই তার মেজাজ চড়ে যায়। সৌহার্দ্য একটা কথা বললে সেটার জবাবে দশটা কথা শুনিয়ে দেয়। আর সৌহার্দ্য একটু কড়া সুরে ধমক দিতেই হলো কথা শেষ, অমনি পেটের বাচ্চার দোহাই দিয়ে হুড়মুড় করে কান্নায় ভেঙে পড়ে! আর তাতেই কুপোকাত তার ডাক্তার সাহেব—একদম কাবু!
মাতৃত্বকালীন শারীরিক পরিবর্তনের কারণে রিদি এখন আর নিয়মিত কলেজ করতে পারে না। পড়াশোনার প্রতি আগের থেকে মনোযোগী হওয়া সত্ত্বেও, ক্লাসে অনিয়মিত হয়ে পড়ার কারণে সে পড়াশোনায় অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। তবে সৌহার্দ্য এ নিয়ে এখন তাকে কোনো বাড়তি চাপ দেয় না। হাসপাতালের কাজ শেষ করে সে এখন বেশিরভাগ সময় বাড়িতে কাটায়, শত ব্যস্ততার মাঝেও সারাদিন রিদির পেছনে সে ছায়ার মতো লেগেই থাকে। বাইরে থাকলে মিনিটে মিনিটে ফোনে খবর নেওয়া চাই-ই চাই। আর বাড়িতে থাকলে তো কথাই নেই—মেয়েটা যেন শান্তিমতো বাথরুমেও যাওয়ার জো পায় না! একটু দেরি হলেই বাথরুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে চঞ্চল গলায় চেঁচাতে শুরু করে, “সুইটহার্ট, এতক্ষণ লাগছে কেন? বের হচ্ছ না কেন? ভেতরে কোনো সমস্যা হচ্ছে নাকি?”
এমনকি রুম থেকে একা একা একটু বের হলেও সৌহার্দ্য চেঁচিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে রাখে। ছেলের এমন পাগলামি দেখে সারহান চৌধুরী ভীষণ বিরক্ত হন! রিদি নিজেও মাঝে মাঝে চরম বিরক্ত হয়, মাঝে মাঝে রাগ করে সৌহার্দ্যের সাথে কথা বলে না। কিন্তু সৌহার্দ্য তাতে দুই পয়সার পাত্তাও দেয় না! বাড়ির বাকিরা অবশ্য এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। পৃথা তো এসব দেখে আরও দারুণ মজা পায়। আরবানও তার মনের মতো করে খুব যত্ন নেয় পৃথার, তবে সৌহার্দ্যের মতো এমন পাগল করা মাত্রাতিরিক্ত দেখভাল সে করে না।
বর্তমানে পৃথার প্রায় চার মাস শেষের পথে, আর তার স্নিগ্ধ পেটটা এখন সামান্য বোঝা যায়। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত ও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো—রিদির পেটটার আকৃতিও যেন পৃথার প্রায় সমান! বাইরে থেকে দেখে ঘুণাক্ষরেও বোঝার উপায় নেই যে সবেমাত্র তিন মাস পার হয়েছে!
দুপুর গড়িয়ে প্রায় দুটো বাজে। রিভা এক অদ্ভুত অভিমান নিয়ে মুখ ফুলিয়ে গুম হয়ে বসে আছে। ফারিস সেই কখন থেকে এই অকারণ নীরবতার কারণ জানতে চাইছে, অথচ এই পাগল মেয়েটার মুখ থেকে কোনো শব্দই বের হচ্ছে না!
ফারিস এবার চরম বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল, “পকেট সাইজের ঝড়, কী হয়েছে তোর? এভাবে উগান্ডার পেত্নীর মতো মুখ বানিয়ে আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছিস কেন?”
রিভা রাগে ফুঁসে উঠে তেড়েমেড়ে বলে উঠল, “আপনার সমস্যা আছে, ফারিস ভাই! ডাক্তার দেখাচ্ছেন না কেন?”
ফারিস তো একদম আকাশ থেকে পড়ল! তার আবার কী সমস্যা হবে? তার জানা মতে সে তো সম্পূর্ণ সুস্থ। তাহলে সে কেন ডাক্তার দেখাতে যাবে? হতভম্ব হয়ে সে বলে উঠল, “শ্বশুরের বেয়াদব মেয়ে, আমি কেন ডাক্তার দেখাতে যাব? আমার আবার কী সমস্যা থাকতে পারে?”
রিভা নাক-মুখ কুঁচকে অভিমানী কণ্ঠে বলল, “সমস্যা না থাকলে সবার বাচ্চা হচ্ছে, আমাদের হচ্ছে না কেন?”
এতক্ষণে ফারিস বুঝতে পারল তার বউয়ের এমন গাল ফুলানোর আসল রহস্য। কথা ঘোরানোর চেষ্টা করে সে মুচকি হেসে বলল, “তুই নিজেই তো একটা আস্ত বাচ্চা, আবার বাচ্চা চাস কীভাবে?”
রিভা নাক ফুলিয়ে তেজি গলায় জবাব দিল, “আমি মোটেও বাচ্চা না! আমি ভাবির থেকে মাত্র দেড় বছরের ছোট, তাহলে আমি বাচ্চা হই কীভাবে?”
ফারিস বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “ওই দেড় বছর বয়স পর্যন্ত আগে বড় হয়ে ওঠ, তারপর বাচ্চার চিন্তা করিস!”
রিভা তাতে একচুলও কমল না; উল্টো আরও তেড়ে এসে বায়না ধরল, “আমার বাচ্চা চাই, এক্ষুনি দিতে হবে!”
ফারিস নাক-মুখ কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলে উঠল, “বাচ্চা কি তোর ঢাকলা বাপের কেনা সম্পত্তি যে বললেই এনে দেব?”
আর অমনি রিভার চোখের কোণ গলে গড়িয়ে পড়ল জল। সে কেঁদে ফেলে ফারিসের শরীরের সাথে একেবারে ঘেঁষে বসে পড়ল, গলায় আকুতি মিশিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এমন করছেন কেন, ফারিস ভাই?”
রিভার ভেজা চোখ আর কান্নার সুর দেখে ফারিসের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে বুঝল, মেয়েটা এই ব্যাপারে মারাত্মক সিরিয়াস। কিন্তু ফারিস এখনই এত দ্রুত বাবা হতে প্রস্তুত নয়; রিভা নিজেই তো এখনও ছোট্ট একটা মেয়ে, আরেকটু পরিপক্ব হোক, তারপর না হয় ভাবা যাবে। ফারিস এবার একটু নরম সুরে, ভালোবাসার মোড়কে তাকে বোঝাতে শুরু করল, “পকেট সাইজের ঝড়, তুই না সেদিন বলছিলি তোর ভাইয়ের ওই মহা ঝামেলা ছেলের সাথে আমাদের মিষ্টি মেয়েটার বিয়ে দিবি?”
রিভা তখনো চোখের জল মুছতে মুছতে মাথা নাড়ল—হ্যাঁ, সে তো সেটাই চায়!
ফারিস তখন এক দারুণ সুযোগ পেয়ে মোক্ষম চালটা চালল, “তাহলে ভাব তো, এখন যদি আমরাও একটা বাচ্চা নিয়ে নিই, তবে ওরা তো একদম সমবয়সী হয়ে যাবে! তখন কি তোর ভাইয়ের ওই ঝামেলা মার্কা পোলাটা আমাদের মেয়েকে আর নিজের বউ বানাতে চাইবে, সোনা?”
রিভা না বুঝে নিষ্পাপ চোখে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু কেন?”
ফারিস এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর গলায় বলল, “তোর ভাইয়ের প্রোডাক্ট তো আর ভালো কিছু হবে না, একদম ওরকমই একটা প্যাঁচাল মার্কা হবে! তোর ভাই নিজে একটা দামড়া হয়ে একটা বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করতে পারলে, ওর প্রোডাক্ট তো বড় হয়ে তেমনই কোনো বাচ্চা মেয়েকেই খুঁজবে, সোনা! তাই তোর ওই ভাইয়ের প্রোডাক্ট আগে দুনিয়ায় আসুক, তারপর না হয় আমরা আমাদেরটা ‘ডাউনলোড’ করব… কেমন?”
মনটা শতভাগ সায় না দিলেও ফারিসের এই অদ্ভুত যুক্তির সামনে শেষ পর্যন্ত হার মানল রিভা।
ফারিস অবশেষে তাকে বাগে আনতে পেরে বুকের ভেতর থেকে এক দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর রিভাকে টেনে নিজের শক্ত বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে মনে মনে মুচকি হেসে বিড়বিড় করে উঠল, “শালা! জীবনেও ওই মহা ভেজালের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিচ্ছি না!” দরকার পড়লে এই দেশ ছেড়েই চলে যাব!
ডাইনিং টেবিলের এক কোণে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন সারহান চৌধুরী। চায়ে চুমুক দেওয়ার কথা থাকলেও তাঁর চোখ আটকে আছে সামনের দৃশ্যটায়। কাপে চুমুক দেওয়ার চেয়ে ছেলের কাণ্ডকারখানা দেখতেই যেন তাঁর আগ্রহ বেশি।
সৌহার্দ্য জেদ ধরে বসে আছে—রিদির মুখে একটার পর একটা ফল গুঁজে দিচ্ছে, আর বেচারি রিদি লজ্জায় লাল হয়ে হাঁসফাঁস করছে। টেবিলে থরে থরে সাজানো ফলের প্লেটটা দেখে মনে হচ্ছে আজ সব কটাই রিদির পেটে চালান করে ছাড়বে সে। রিদি আড়চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, বারবার মিনমিন করে বলছে, “আমি নিজের হাতে খাচ্ছি…” কিন্তু সৌহার্দ্য যেন কারো কথাই শোনার পাত্র নয়।
ছেলের এই প্রকাশ্য প্রেমময় কাণ্ড আর রিদির আড়ষ্ট লজ্জা দেখতে দেখতে আর স্থির থাকতে পারলেন না সারহান চৌধুরী। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাচ্ছিল্যের সুরে বলেই ফেললেন,
“বেঁচে থেকে মানুষের নির্লজ্জতা দেখতে দেখতে মরে যেতে হবে!”
বাবার এই তির্যক খোঁচা গায়ে মাখিয়েই সৌহার্দ্য গম্ভীর মুখে পাল্টা জবাব দিল,
“তো তোমাকে দেখতে বলছে কে?”
ছেলের এমন বেপরোয়া জবাবে ভ্রু কুঁচকে ব্যঙ্গের সুরে সারহান চৌধুরী বললেন,
“একটুও কি লজ্জা নাই তোমার?”
সৌহার্দ্য তাতেও বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে রিদির মুখে আরও এক টুকরো ফল জোর করে গুঁজে দিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলে উঠল,
“দেখতেই তো পাচ্ছ নেই, তাহলে প্রশ্ন করছো কেন আজব?”
রিদির অবস্থা দেখে এবার আর রাগ চেপে রাখতে পারলেন না সারহান চৌধুরী। নাক-মুখ কুঁচকে ধমকের সুরে বলে উঠলেন,
“নির্লজ্জ ছেলে! এমন বেহায়ার মতো করছ কেন? মেয়েটা খেতে পারছে না তবুও জোর করছ কেন? বাপ মনে হয় তুমি একাই হচ্ছ, আমরা কেউ হইনি?”
বাবার এমন খোঁচায় সৌহার্দ্যের বিরক্তি এবার চরমে পৌঁছাল। বাবাকে ছেড়ে কথা না বলে সে এক হাত নেড়ে উল্টো খোঁচা দিয়ে বলে উঠল,
“তোমার হিংসে হচ্ছে নাকি? আশ্চর্য! এই বয়সে এসে ছেলের সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে চাচ্ছ? তাহলে শুনে রাখো আব্বু, এখন আমার বাচ্চা পালার বয়স— ভাই-বোন পালতে পারব না! যদি কিছুদিন আগে…”
ছেলের মুখে এমন বেপরোয়া কথা শুনে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন সারহান চৌধুরী। ধমকে উঠে বললেন,
“চুপ করো তুমি! তোমার মতো নির্লজ্জ বেয়াদব আমি জীবনে দুটো দেখিনি!”
সৌহার্দ্য একরাশ বিরক্তি গলায় মেখে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে জবাব দিল,
“এখন তো দেখছো, ভালো করে দেখে নাও। খাওয়া শেষ হলে যেতে পারো, আমার বউ তোমার জন্য লজ্জা পাচ্ছে!”
ছেলের সাথে এই বাকযুদ্ধে আর এক মুহূর্তও টিকলেন না সারহান চৌধুরী। বুঝতে পারলেন, এই বেয়াদব ছেলের সাথে কথা বাড়াতে গেলে নিজের সম্মানটুকুও ধুলোয় মিশে যাবে। তাই আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ টেবিল ছেড়ে উঠতে গেলেন তিনি। রাগে গজগজ করতে করতে বিড়বিড় করে বলে উঠলেন,
“এমন বউ-পাগলও আমি জীবনে দেখিনি!”
সারহান চৌধুরীর কথাটা রিদির কানে যাওয়ামাত্র সে লজ্জায় যেন মাটির সাথে মিশে যাওয়ার উপক্রম হলো। কান দুটো দপদপ করছে, ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে মাটি ফুঁড়ে কোথাও লুকিয়ে যেতে! একটা মানুষ কীভাবে এত নির্লজ্জ হতে পারে, তা রিদির ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের ধারণাতীত। কোনোমতে ঢোক গিলে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে সে বলে উঠল,
“আমার বমি পাচ্ছে… আর খেতে পারব না!”
রিদির অস্বস্তি বুঝতে পেরে সৌহার্দ্য এদিক-ওদিক একবার চোখ বুলিয়ে আলতো করে রিদির গালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“ওকে, রুমে যাও। আমি একটু বের হব, জান!”
রিদি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, মাথা নেড়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। সৌহার্দ্য চিন্তিত চোখে তাকিয়ে থেকে স্নেহের সাথে সতর্ক করল,
“আস্তে হাঁটো, জান! পড়ে যেও না যেন!”
সিঁড়ির মাঝপথে একবার রিদি পেছন ফিরে সৌহার্দ্যের দিকে তাকাল, চোখের ভাষায় বুঝিয়ে দিল সে ঠিক আছে। রিদি আড়ালে চলে যাওয়ার পরই সৌহার্দ্যও আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাত তখন প্রায় বারোটা। কিছুক্ষণ আগেই বাড়ি ফিরেছে সৌহার্দ্য। কিন্তু তার পিছন পিছন ছায়ার মতো ঘুরে চলেছে রিদি—তার একটানা অনুরোধ, যে করেই হোক তাকে একবার খান বাড়িতে যেতেই হবে। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে যে বাড়িটা সে আর কোনোদিন মাড়ায়নি।
এখন খান বাড়িতে থাকে শাহবীর, আর সেটা শুধু রিদির কথা রাখতে গিয়েই! রিদির নামের, খান পরিবারের সমস্ত সম্পত্তি রিদি শাহবীরের নামে করে দিয়েছে। যদিও এই পুরো ব্যাপারটা সম্পূর্ণ সৌহার্দ্য নিজের হাতে সব ঠিকঠাক করেছে। আইনি কাগজপত্রে সব গোছানোর পর সৌহার্দ্য যখন রিদিকে সবটা বুঝিয়ে বলে, তখন রিদি কোনো প্রতিউত্তর করেনি—একবিন্দু দ্বিধা না করে, নির্দ্বিধায় সেগুলোতে সিগনেচার করে দিয়েছে। উল্টে শাহবীরকে সে অনুরোধ করেছে, সে যেন খান বাড়িতেই থাকে। শাহবীর প্রথমে রাজি না হলেও, বোনের কথা শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছে।
বর্তমানে শাহবীরের সাথে খান বাড়িতে থাকে আরিফা খান। আকিব শিকদারের অপকর্মের কথা শোনার পর থেকে তিনি আর ওই বাড়িতে থাকেননি। অন্যদিকে, সাহানকে শাহবীর অনেক আগেই আমেরিকায় পাঠিয়ে দিয়েছে, তার সেখানকার বিজনেস দেখাশোনার জন্য।
নিজের পিছন পিছন রিদির এই নাছোড়বান্দা ঘোরাঘুরি আর মিনতি দেখতে দেখতে অবশেষে ধৈর্য হারিয়ে ফেলল সৌহার্দ্য। চোখে-মুখে বিরক্তির গাঢ় মেঘ টেনে, কঠিন গলায় সে বলে উঠল—
“বিড়ালের মতো চুকচুক করছ কেন? এক জায়গায় বসতে পারছ না, স্টুপিড?”
রিদি সৌহার্দ্যের কথায় কান না দিয়ে আনমনেই বলে উঠল, “ভাইয়ার বিয়ের আর তিনদিন মাত্র?”
সৌহার্দ্য রিদির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল, “তো?”
রিদির চোখে তখন আকুতির জোয়ার। হাত দুটি এক করে সে মিনতির সুরে বলে উঠল, “আমি কাল যেতে চাই প্লিজ? না করবেন না!”
সৌহার্দ্য একঝলক মেয়ের দিকে তাকিয়ে নির্বিকারভাবে নিজের ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখেই সাফ জানিয়ে দিল, “নো; বিয়ের আগের দিন যাব আমরা!”
সৌহার্দ্যের এই কঠোর সিদ্ধান্তে রিদি বুঝল, সহজে কাজ হবে না। উপায় না পেয়ে সে তার পুরোনো অস্ত্র—ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলের আশ্রয় নিল। মায়াবী কান্নাকাটার সুর ধরে সে বলে বসল, “আমি যেতে চাচ্ছি না! আপনার বাবু যেতে চাচ্ছে, ও কষ্ট পাচ্ছে ওর নানাবাড়ি যাওয়ার জন্য!”
নিজের দুনিয়াতে না আসা বাচ্চাকে এই নাটকে জড়াতে দেখে সৌহার্দ্য একমুহূর্তে বিরক্তিতে জ্বলে উঠল। ফোন থেকে চোখ সরিয়ে কড়া গলায় ধমকে উঠল, “স্টুপিড! তুমি সবসময় আমার প্রিন্সেসের ওপর দোষ চাপাবে না! আমার মেয়ে তোমার মতো বেয়াদব হবে না, ওর বাবার মতো ভদ্র হবে!”
সৌহার্দ্যের মুখে নিজের এমন অপমান শুনে রিদি অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বলে ফেলল, “আপনি ভদ্র?”
রিদির কণ্ঠে অবিশ্বাস আর বাঁকা হাসি দেখে সৌহার্দ্যের চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল। রাগি দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে সে রূঢ় স্বরে জানতে চাইল, “কী বলতে চাচ্ছ তুমি, আমি ভদ্র না?”
সৌহার্দ্যের ওই প্রলয়ঙ্করী দৃষ্টি দেখেই রিদির বুক কেঁপে উঠল। ভয়ে ঢোক গিলে সে তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে তোতলামির সুরে বলে উঠল, “ভদ্র… ভদ্র খুব! পৃথিবীতে…”
কিন্তু তার সেই কথা শেষ করতে দিল না সৌহার্দ্য। এক ঝটকায় রিদির আরও কাছে এগিয়ে এসে তার সরু কোমরটা নিজের শক্ত বাহুডোরে জড়িয়ে ধরল সে। রিদির মুখের ওপর ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “ভদ্র-অভদ্র যাই হই, আমার সাথে থাকতেই হবে তোমাকে আজন্ম!”
কথাটা শেষ করেই নিজের উষ্ণ ও দৃঢ় ওষ্ঠ মিলিয়ে দিল রিদির নরম অধরের ভাঁজে। মুহূর্তের এক পরম আবেশ তৈরি হওয়ার আগেই, রিদির শরীরের ভেতরের হঠাৎ চলা ঝড় সব ওলটপালট করে দিল। চুম্বনের ঘোর কাটতে না কাটতেই রিদি আর নিজেকে সামলাতে পারল না—গলগল করে বমি করে ভাসিয়ে দিল সৌহার্দ্যের সমস্ত শরীর!
নিজের গায়ে কী হচ্ছে সেদিকে সৌহার্দ্যের কোনো ভ্রক্ষেপই নেই। তার সমস্ত মনোযোগ তখন কেবল রিদির কষ্টটার ওপর। ব্যাকুল হয়ে সে রিদির ফ্যাকাশে মুখটা নিজের হাতের জাদুকরী ওমে আগলে ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠল, “জান, বেশি খারাপ…”
বাকি কথাটা তার গলাতেই আটকে গেল। রিদি আবার বমি করে সৌহার্দ্যের হাত ভরিয়ে দিল। বমির বেগে শরীর যখন আর চলছে না, তখন মুখ চেপে কোনোমতে বাথরুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল রিদি। কিন্তু সৌহার্দ্য চিন্তিত মুখে তার পথ আগলে ধরে পরম মায়ায় বলল, “এখানেই করো, আমি পরিষ্কার করে দেব!”
তীব্র ক্লান্তিতে রিদি আর নিজের মাথা সোজা রাখতে পারল না, অবশ হয়ে সে মাথা এলিয়ে দিল সৌহার্দ্যের প্রশস্ত কাঁধে। ফিসফিস করে ভাঙা গলায় বলল, “আর করব না…”
সৌহার্দ্য এক সেকেন্ডও দেরি করল না। নিজের ময়লা শার্টটা একপাশে ছুড়ে ফেলে রিদিকে শক্ত বাহুতে পাঁজা কোলে তুলে সোজা বাথরুমে নিয়ে গেল। নিজ হাতে তাকে পরিষ্কার করিয়ে, জামা পাল্টে পরম যত্নে বিছানায় এনে শুইয়ে দিল। এরপর নিজ হাতে ঘরটার পরিষ্কার করে, দ্রুত একটা শাওয়ার নিয়ে যখন রুমে ফিরে এল, তখন দেখল রিদি অপরাধীর মতো বিছানায় চুপচাপ গুটিসুটি মেরে বসে আছে।
সৌহার্দ্য আলতো পায়ে হেঁটে গিয়ে রিদির পাশে বসল। রিদি অপরাধী কন্ঠে মিনমিন করে বলল, “আমি আসলে…”
রিদির কথা শেষ হতে দিল না সৌহার্দ্য। তাকে টেনে নিলো নিজের শক্ত বুকের মাঝে। রিদির চুলে বিলি কেটে, কপালে একটা দীর্ঘ উষ্ণ চুমু এঁকে ফিসফিস করে বলে উঠল, “ইটস ওকে, আমি বুঝতে পেরেছি… বাট জান, বমিটা আর একটু পরে করতে পারতে, চুমুটা শেষ হলে!”
রিদি আলতো করে সৌহার্দ্যের প্রশস্ত বুকে নাক ঘষতে ঘষতে খানিকটা অভিমানী সুরে ফিসফিস করে বলে উঠল, “আপনার মুখে সিগারেটের গন্ধ ছিল, সিগারেট কেন খেয়েছেন?”
সৌহার্দ্য রিদিকে নিজের দুই বাহুর আষ্টেপৃষ্টে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বুকফাটা এক তীব্র আফসোসের সুরে সে গলার স্বর নামিয়ে বলল, “আমার ফেবারিট ডিশ খেতে পারছি না, তাই ক্রেভিং কমাতে সিগারেট খেয়েছিলাম জান, আর খাবো না প্রমিজ!”
রিদি আর কোনো প্রতিউত্তর করল না। সে ভালো করেই জানে, সৌহার্দ্য যখন একবার কথা দিয়েছে যে সে আর সিগারেট ছুঁয়েও দেখবে না, তখন সে নিজের কথা ঠিক রাখবে।
সৌহার্দ্য আস্তে করে রিদিকে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর ঝুঁকে রিদির পেটের কাছে মুখ নিয়ে অত্যন্ত নরম কণ্ঠে ফিসফিস করে বলতে শুরু করল, “আমার কলিজার আম্মা আপনি একটু তাড়াতাড়ি চলে আসেন? আপনার মাম্মামকে কাছে পাওয়ার জন্য পাপার অবাধ্য মনটা চটপট করছে, একটা চুমু খেতে গেলে ও আপনি ডিস্টার্ব করেন ইটস নট ফেয়ার বাবার জান বাচ্চা!”
সৌহার্দ্যের এমন আদুরে কথায় রিদি নিজের হাসি আর আটকে রাখতে পারল না, খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর ভালোবাসায় হাত বাড়িয়ে সৌহার্দ্যের অগোছালো চুলে আঙুল বুলিয়ে কৌতূহলী সুরে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা আপনি প্রিন্সেস প্রিন্সেস করেন কেন যদি আমাদের প্রিন্স আসে?”
সৌহার্দ্য রিদির পেট থেকে মাথা তুলে রিদির কাছে ঝুঁকে এল। একদৃষ্টিতে রিদির চোখের দিকে তাকিয়ে গভীর মুগ্ধতায় বলল, “উহু আমি জানি আমার একটা প্রিন্সেস আসবে ঠিক তোমার মতো একটা কিউট ডল।”
সৌহার্দ্যের সেই ঘোর লাগা চোখের দিকে তাকিয়ে রিদি একটু হেসে দুষ্টুমি করে বলে উঠল, “আপনি কিভাবে জানেন? ছেলে ও…”
সৌহার্দ্য একটু বিরক্তি প্রকাশ করে বলে উঠল, “স্টুপিড আমি… আমি ডিএনএ দিছি আমি জানব না, কি…”
সৌহার্দ্যের কথা শেষ হতে দিল না রিদি, তার আগেই রিদি এক ঝটকায় নিজের হাত বাড়িয়ে সৌহার্দ্যের মুখটা চেপে ধরে ফিসফিস করে বলে উঠল, “মুখটা বন্ধ করেন, আমি আর শুনতে চাই না মুখ না যেন ফারাক্কার বাঁধ ছুটলে সর্বনাশ!”
রিদির এই ছোট্ট বকাঝকায় সৌহার্দ্য ভালোবাসায় গলে গেল। তার কপালে একটা গভীর চুমু এঁকে আলতো হাতে রিদির ঢোলাঢালা টি-শার্টটা একটু ওপরে তুলে নিজের মুখটা গুঁজে দিল রিদির উন্মুক্ত বুকের মাঝে।
একদম ধীর ও মায়াবী কণ্ঠে ফিসফিস করে সে বলল, “ঘুমাও আমার জান!”
বলেই নিজে চোখ বুজে তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে।
সকালের মিষ্টি রোদ জানলার পর্দা ভেদ করে আলতো পায়ে ঘরে এসে কড়া নাড়ল। সেই সোনালী রোদের ঝিলিক এসে পড়ল সৌহার্দ্যের মুখে। চোখ মেলে তাকাতেই তার দৃষ্টি আটকে গেল রিদির স্নিগ্ধ ঘুমন্ত মুখটার ওপর। অপলক চোখে কিছুক্ষণ সেই মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে, যেন বাইরের দুনিয়ার সব কোলাহল এই ছোট্ট ঘরে এসে থমকে গেছে। এরপর বিছানার পাশ থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে টাইম দেখতেই সে চমকে উঠল—ঘড়ির কাঁটা নয়টা পার হয়ে গেছে!
এক মুহূর্তও দেরি না করে সৌহার্দ্য দ্রুত বিছানায় সোজা হয়ে বসে পড়ল। একটু ঝুঁকে রিদির কপালে আলতো ছোঁয়া দিয়ে নরম গলায় ডেকে উঠল, “সুইটহার্ট, ওঠো! হাসপাতালে যেতে হবে, আজ তোমার চেকআপ আছে।”
রিদি চোখ পিটপিট করে ঘুমের ঘোর কাটানোর চেষ্টা করল। তারপর টেনেটুনে উঠে বসে সোজা সৌহার্দ্যের প্রশস্ত বুকে মুখ গুঁজে আদুরে গলায় বলে উঠল, “আমাকে একটু ফ্রেশ করিয়ে দিন না… আমার একদম হাঁটতে ইচ্ছে করছে না।”
রিদির এই মিষ্টি আবদারে সৌহার্দ্য মৃদু হাসল। কোনো কথা না বাড়িয়ে ঝটপট রিদিকে নিজের শক্ত বাহুতে পাঁজা কোলে তুলে নিল। ওয়াশরুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তিরস্কারের সুরে বলল, “দিন দিন আপনি বেশি অলস হয়ে যাচ্ছেন ম্যাডাম!”
সৌহার্দ্যের বুকে মুখ গুঁজে থাকা অবস্থাতেই রিদি তার চওড়া বুকের ঠিক মাঝখানে একটা মিষ্টি চুমু এঁকে খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল, “এটার জন্য একমাত্র আপনিই দায়ী, ডাক্তার সাহেব!”
রিদির সেই অকাট্য যুক্তিতে সৌহার্দ্য আর কথা বাড়াল না, কেবল চোখে মুখে একরাশ ভালোলাগা মেখে তাকে নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করল। নিজ হাতে রিদিকে ফ্রেশ করিয়ে, নিজেও দ্রুত তৈরি হয়ে নিল। এরপর হালকা কিছু খেয়ে রিদিকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
ডাক্তার শাহানা জাহানের চেম্বারে নিস্তব্ধ একটা সময় পার করছে রিদি ও সৌহার্দ্য। ডাক্তার দেখানোর পর্ব ঘন্টাখানেক আগেই শেষ। একটি আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানোর প্রেসক্রিপশন দিয়েছিলেন ডা. শাহানা জাহান। সৌহার্দ্য নিজেই আলট্রাসনোগ্রাফিটা করতে চেয়েছিল, কিন্তু মাঝপথে তার একটি জরুরি ইমার্জেন্সি আসায় সে রিদিকে তার পরিচিত এক নারী চিকিৎসকের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে নিজের জরুরি রোগী দেখতে চলে যায়।
আল্ট্রাসনোগ্রাফি শেষ করে রিদি কিছুক্ষণ আগেই এসে ডা. শাহানা জাহানের চেম্বারে বসেছে। তার আসার কিছুক্ষণ পরেই এসেছে সৌহার্দ্য! ডাক্তার তখন অন্য একটি কাজে বাইরে গেছেন বলেই দুইজন অপেক্ষা করছে। সৌহার্দ্য ঘড়ির দিকে একনজর তাকিয়ে কিছুটা কৌতূহলী কণ্ঠে বলে উঠল—
“রিপোর্ট দেয় নাই?”
রিদি আনমনে মাথা নেড়ে ফিসফিস করে বলল—
“আমি জানি না;”
সৌহার্দ্য আর কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে চেম্বারের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন ডা. শাহানা জাহান। তার মুখে এক স্নিগ্ধ হাসি। সৌহার্দ্য তক্ষুণি উৎকণ্ঠিত গলায় প্রশ্ন করল—
“ম্যাম সব ঠিক আছে?”
ডা. শাহানা জাহান মিষ্টি হেসে প্রতিউত্তর করলেন—
“সব ঠিক, তার সাথে তোমাকে আমাদের ডাবল মিষ্টি খাওয়াতে হবে!”
ডাক্তারের এমন আকস্মিক কথায় সৌহার্দ্যের কপালে ভাঁজ পড়ল; সে ঠিক বুঝতে পারল না কথার অর্থ কী। তার ভ্রু কুঁচকে যাওয়া দেখে ডাক্তার মৃদু হেসে বলে উঠলেন—
“তুমি টুইনস বেবির বাবা হচ্ছ!”
কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল পুরো ঘর। সৌহার্দ্য অবাক চোখে তাকিয়ে রইল ডাক্তারের দিকে। তারপর কিছুটা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল—
“ম্যাম রিপোর্টটা একটু দিবেন?”
ডা. শাহানা হাসিমুখে আল্ট্রার রিপোর্টটা সৌহার্দ্যের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। সৌহার্দ্য থরথরে কাঁপা হাতে রিপোর্টটি লুফে নিল। তারপর এক পলক তাকাল রিদির দিকে—মেয়েটি তখন কেমন যেন হতভম্ব হয়ে ছলছল চোখে নিজের পেটের দিকে তাকিয়ে আছে।
রিদির দিক থেকে চোখ সরিয়ে সৌহার্দ্য দ্রুত রিপোর্টের পাতায় চোখ বোলাল। ঝাপসা কালো-সাদা কাগজের পর্দায় স্পষ্ট ফুটে আছে পাশাপাশি দুটি ক্ষুদ্র অস্তিত্ব! এক অদৃশ্য আনন্দের জোয়ারে সৌহার্দ্যের বুকটা ভরে উঠল। এই অদ্ভুত শিহরণ জাগানো অনুভূতি কোনো শব্দে প্রকাশ করার মতো নয়। চোখ ভিজে আসার উপক্রম হলো তার; বিড়বিড় করে সে বলে উঠল—
“আমার জান বাচ্চাগুলো! পাপার এবার তোমাদের কাছে পাওয়ার আগ্রহ আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।”
বলেই সে আবারও মুগ্ধ চোখে তাকাল রিদির পেটের দিকে। পরক্ষণেই আবার মনের কোণে উঁকি দিল—টুইন বেবির জটিলতা বা ঝুঁকির কথা ভেবে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সব মিশ্র আবেগ সামলে আফসোসের সুরে মৃদু হাসিতে সে ফুসফুস করে বলে উঠল—
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৫৯
“মাত্র দুইবার বাসর করলাম, তাতেই দুইজন! আর কয়েকবার বাসর করলে তো আমার বউয়ের ছোট্ট পেটটাকে এরা একেবারে ফুটবলের মাঠ বানিয়ে ফেলতো দলবেঁধে এসে…”
কথাটি শেষ করেই সে আবারও পরম যত্নে রিপোর্টের কাগজে হাত বুলিয়ে ধীর ও মায়াবী কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠল—””আমার জানবাচ্চারা!”
