শেহেজাদার আদর পর্ব ৮১
সুমাইয়া ইসলাম নূর
মাঝখানে কেটে গেছে আরও পাঁচটি মাস। দেখতে দেখতে ইনায়ার গর্ভাবস্থারও পাঁচ মাস পূর্ণ হয়ে গেছে। এই পাঁচ মাসে তার শরীরে বেশ কিছু পরিবর্তনও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগের তুলনায় তার চেহারায় এসেছে কোমলতা, গাল দুটোও যেন একটু গোলগাল হয়ে উঠেছে। প্রেগনেন্সি -এর স্বাভাবিক পরিবর্তনে আগের সেই ছিপছিপে অবয়বটায় এখন হালকা গোলুমোলু ভাব ফুটে উঠেছে। মুখের মায়াবী কোমলতা যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে,
ফজরের নামাজ শেষ করে ইউভি নিজের অফিসের কাজ নিয়ে বসে পড়েছে। একদিকে ASU গ্রুপের যাবতীয় দায়িত্ব, অন্যদিকে IVA গ্রুপের সম্পূর্ণ দেখভাল—দুটো প্রতিষ্ঠানের কাজই এখন সমান গুরুত্ব দিয়ে সামলাতে হচ্ছে তাকে। সামনে ল্যাপটপ খোলা, পাশে একের পর এক ফাইল আর গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথি ইউভি গভীর মনোযোগে কাজ করছিল। তার চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও কাজের প্রতি মনোযোগে তার কোনো কমতি নেই।ইনায়া নামাজ শেষ করে ধীরে ধীরে ইউভির কাছে এগিয়ে এল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে স্বামীর ব্যস্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল সে। ইউভি এতটাই কাজে ডুবে ছিল যে ইনায়া পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, সেটাও খেয়াল করেনি। অবশেষে ইনায়া যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, ঠিক তখনই পেছন থেকে ইউভির কোমল কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “আদর…আমার আদর পরিচিত সেই ডাক শুনে ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল। ইউভিও চেয়ার ছেড়ে উঠে তার দিকে এগিয়ে এলো। কাছে এসেই কোনো কথা না বলে আলতো করে ইনায়াকে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল। তারপর তার কপালে খুব ছোট্ট একটি ভালোবাসার পরশ এঁকে দিয়ে মমতাভরা চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল পা-ব্যথাটা কমেছে?
ইনায়া মৃদু হেসে মাথা নাড়িয়ে বললো হ্যাঁ, বর। তুমি সারারাত আমার পা মালিশ করে দিয়েছ তাই না ।
ইউভি ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। কণ্ঠে এবারও সেই একই উদ্বেগ আগে বলো এখন কেমন আছো?
ইনায়া মুচকি হেসে বললো আলহামদুলিল্লাহ ভালো রাতেই কেন পা ব্যথা করে, বুঝি না।ইউভি গম্ভীর কণ্ঠে বললো কোন সমস্য হলে তুমি আমাকে সঙ্গে সঙ্গে বলবে, আদর। একা একা কষ্ট সহ্য করার কোনো দরকার নেই। তোমার সামান্য অস্বস্তিও আমার জানা উচিত। কথাটা বলতে বলতে ইউভি ইনায়াকে খুব যত্ন করে নিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। তারপর তাকে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে দুহাত দিয়ে আলতো করে আগলে রাখল। ইনায়াও স্বাভাবিকভাবেই তার বুকে হেলান দিয়ে ইউভির এলোমেলো চুলে আঙুল চালাতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর মৃদু অভিমান মেশানো কণ্ঠে বললনভালো লাগে না, বর। সারাক্ষণ শুধু খিদে পায়। কিছুক্ষণ পরপরই কিছু খেতে ইচ্ছে করে। দেখো না, কেমন মোটু হয়ে যাচ্ছি! তবুও খিদেটা যেন কমতেই চায় না। ইউভির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে ইনায়ার গালটা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বলল আবার ঠিক হয়ে যাবে, আদর। এখন এসব নিয়ে একদম চিন্তা করবে না। তোমার শরীরে যে পরিবর্তনগুলো হচ্ছে, সেগুলো স্বাভাবিক। তুমি নিজের শরীরটাকে নিয়ে এত ভাববে না। তোমার আর আমাদের ছোট্ট অতিথির ভালো থাকাটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটু থেমে তার কপালে হাত রেখে আরও নরম স্বরে বলল আর কোনো কষ্ট হলে, যত ছোটই হোক, আমাকে বলবে। তোমার একটু ব্যথা হলে আমার ভালো লাগে না। তুমি কষ্ট পেলে আমি পাশে বসে শুধু তাকিয়ে থাকব—এমন মানুষ আমি নই। যতটুকু পারি, তোমার কষ্টটা নিজের করে নিতে চাই। বুঝেছ?
ইনায়া মুগ্ধ চোখে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মৃদু হেসে আবারও তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।ইউভি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল এখন তুমি একটু রেস্ট নাও। আমি আরেকটু কাজ করি। আজ অফিসে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং আছে। ASU আর IVA—দুটোরই কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে। কাজটা শেষ করেই তোমার কাছে আসব।”
ইনায়া ধীরে ধীরে ইউভির কোল থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর তার মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলল—
— “ঠিক আছে, বর। তুমি কাজ করো। আমি বড় মায়ের রুমে যাচ্ছি। ভীষণ খিদে পেয়েছে। মনে হচ্ছে এখনই কিছু না খেল পাগল হয়ে যাব কথাটা বলেই ইনায়া মুচকি হাসল। বেরিয়ে যাওয়ার আগে একটু ঝুঁকে ইউভির কপালে ছোট্ট একটি চুমু এঁকে দিল।
ইনায়া ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ইউভি তার চলে যাওয়ার পথের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে আবার ল্যাপটপের সামনে বসল। কাজের ব্যস্ততার মাঝেও তার মুখে রয়ে গেল এক টুকরো শান্ত হাসি
ইনায়া ধীরে ধীরে রেশমা চৌধুরীর ঘরের দিকে গেল। কিন্তু ঘরে ঢুকে দেখল, রেশমা চৌধুরী সেখানে নেই। তাই নিচে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই পাশের রেদোয়ানের ঘর থেকে ভেসে এলো ছোট্ট প্রণয়ের খিলখিল হাসির শব্দ। পরিচিত সেই মিষ্টি হাসি শুনে ইনায়ার পা থেমে গেল। ঠোঁটের কোণে আপনাতেই হাসি ফুটে উঠল। সে দরজার কাছে গিয়ে আলতো করে নক করে বলল, — “আসবো, ভাইয়া?” ভেতর থেকে রেদোয়ানের হাসিমাখা কণ্ঠ ভেসে এলো, আমার ঘরে আসতে আবার পারমিশন লাগে নাকি, বোনু? আয়, আয়। অনুমতি পেয়ে ইনায়া ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। রেদোয়ানও সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে মমতাভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, শরীর ঠিক আছে? ইনায়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। জি, আলহামদুলিল্লাহ, ঠিক আছি। তবে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। মাঝে মাঝে পা-ব্যথা করে, তাই ঘুমটা ভেঙে যায়।”কথাটা শুনে পাশে থাকা পিয়াসা মুচকি হেসে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে, বেবি। এখন তো তোর শরীরে অনেক পরিবর্তন হচ্ছে। একটু কষ্ট তো হবেই। তবে বেশি অসুবিধা হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বলবি ঠিক আছে?” ইনায়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। প্রণয় তখনও নিজের মতো করে খেলতে খেলতে খিলখিল করে হাসছিল। তার সেই নিষ্পাপ হাসিতে ঘরটার পরিবেশটাও যেন আরও মায়াময় হয়ে উঠল।
রেদোয়ানের ফোনে হঠাৎ একটি মেসেজ আসতেই সে দ্রুত ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। পরমুহূর্তেই পিয়াসার দিকে ফিরে বলল, পিহু, আজ একটু দ্রুত বের হতে হবে। তুমি তো আজ অফিসে যাবে না, তাই তো? পিয়াসা তখন রেদোয়ানের পোশাক গুছিয়ে দিচ্ছিল। মৃদু হেসে বলল না। আজ তো শুক্রবার, সেটা ভুলে গেছ? আর তোমরাও তো আজ দুপুরেই চলে আসবে। রেদোয়ান মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, ঠিক আছে। কথাটা বলেই সে দ্রুত তৈরি হতে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর পোশাক পরিবর্তন করে রেদোয়ান যখন বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে গেল, ঠিক তখনই হঠাৎ পেছন ফিরে তাকাল। ছোট্ট প্রণয় তখন ঘরের ভেতরেই খেলছিল। রেদোয়ান সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে গিয়ে আদর করে ছোট্ট কপালে একটি চুমু এঁকে মায়াভরা কণ্ঠে বলল ভালো ছেলে হয়ে থাকবে, আমার গুড বয়।” প্রণয়ের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে এবার পিয়াসার কাছে এগিয়ে গেল। পিয়াসার কপালে ভালোবাসার ছোট্ট একটি চুমু এঁকে বলল, ওকে, দুপুরে দেখা হবে।” পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়া পুরো দৃশ্যটা দেখে মুচকি মুচকি হাসছিল।
রেদোয়ানের চোখ এবার তার দিকে পড়তেই সে ইনায়ার কাছেও এগিয়ে এলো। স্নেহভরা ভঙ্গিতে তার কপালে আলতো করে একটি চুমু দিয়ে জিজ্ঞেস করল কিছু খেতে ইচ্ছে করছে, বোনু? ইনায়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। এখন করছে না, ভাইয়া। পরে ইচ্ছে করলে বলব। তুমি সাবধানে যেও। রেদোয়ান মুচকি হেসে মাথা নাড়ল। ঠিক তখনই ইউভির ফোনকল এসে পড়ল। হ্যালো, ভাইয়া?” ওপাশ থেকে ইউভি কিছু জিজ্ঞেস করতেই রেদোয়ান দ্রুত বলল আসছি, ভাইয়া।” কথাটা বলে সে আর দেরি না করে বেরিয়ে গেল।ইউভি একবার নুসরাত চৌধুরীর ঘরের দরজায় উঁকি দিয়ে দেখল, কিন্তু সেখানে ইনায়াকে দেখতে পেল না। হাতে সময়ও বেশি নেই আজ অফিসে গুরুত্বপূর্ণ একটি মিটিং রয়েছে। তাই আর দেরি না করে দ্রুত নিচে নেমে এল সে। যাওয়ার পথে একবার কিচেনেও উঁকি দিয়ে দেখল, কিন্তু সেখানেও ইনায়ার কোনো দেখা নেই। অবশেষে রেশমা চৌধুরীর কাছে গিয়ে বলল, মা, নূর তো তোমার রুমে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওকে কোথাও দেখছি না। ওকে বলে দিও, আমি অফিসে চলে গেছি। আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে।
আমি আর রেদোয়ান বাইরে ব্রেকফাস্ট করে নেব।” দূর থেকে রেশমা চৌধুরী স্নেহভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন সাবধানে যাস, তোরা দুজনেই। এদিকে ইনায়া ততক্ষণে দ্রুত পায়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটে এসেছে। ইউভি অফিসে যাওয়ার আগে এই সামান্য সময়টুকু সে তার প্রিয় মানুষটার কাছ থেকে একটু আদর আর ভালোবাসা পাওয়ার আশায় খুঁজছিল। কিন্তু ঘরে এসে দেখল, ইউভি তার আগেই অফিসের উদ্দেশে বেরিয়ে গেছে। মুহূর্তেই তার মুখটা মলিন হয়ে গেল। বিছানার ওপর ধপাস করে বসে পড়ল সে। আজ পর্যন্ত এমন কখনো হয়নি। ইউভি প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার আগে তাকে শক্ত করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে, কপালে ছোট্ট একটা চুমু এঁকে তবেই বের হয়। অথচ আজ এত ব্যস্ততার মধ্যে সেই ছোট্ট আদরটুকুও দিতে ভুলে গেছে!
অভিমানে ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা হাতে তুলে নিল। কয়েক মুহূর্ত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে দ্রুত টাইপ করতে শুরু করল—
“বাহ, মিস্টার চৌধুরী! আমাকে তো আজ একেবারেই ভুলে গেলেন। নতুন কাউকে পেয়ে গেছেন নাকি? ঠিক আছে, তাকে নিয়েই থাকেন। তাকে জড়িয়ে ধরেন, তাকে চুমু দেন। তারপর আবার এসে বলবেন ‘বড্ড ক্লান্ত লাগছে, বউ বুকে আসো।’ আজ থেকে এসব আর আমাকে বলতে আসবেন না। আপনাকে আর কিছু বলব না। ভালো থাকবেন। বাই। গুডবাই!”
মেসেজটা পাঠিয়েই ইনায়া ফোনটা পাশে রেখে আবার ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ল। ঠোঁট ফুলিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করল, যেন ইউভি সামনে বসেই সব শুনছে কিছুক্ষণ পর ক্ষুধার কথা মনে পড়তেই অভিমান ভুলে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে গেল ইনায়া। নুসরাত চৌধুরীর কাছে গিয়ে বলল, মা, কিছু খেতে দাও।।নুসরাত চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন বস মা, দিচ্ছি। ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে একটু জোর দিয়েই বলল অনেক খাবার দেবে কিন্তু! ভীষণ খিদে পেয়েছে। কথাটা শুনে নুসরাত চৌধুরী আর সাবিহা চৌধুরী দুজনেই হেসে উঠলেন। ইনায়ার এই খিদে পাওয়ার কথাটা এখন যেন বাড়ির সবার কাছেই বেশ পরিচিত হয়ে গেছে।
ইনায়া খেতে বসতেই একে একে লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী আর রোবিউল চৌধুরীও সেখানে এসে বসলেন। সকালের খাবার খেতে খেতে লিখন চৌধুরী রাতিব চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন, আজ কিন্তু একটু দ্রুত ফিরিস। দুপুরের আগেই বাড়িতে থাকিস।
ইনায়া চুপচাপ খাবার খেতে খেতে কথাগুলো শুনছিল। আজ শুক্রবার জুমার নামাজ শেষ করে দুপুরে পুরো পরিবার একসঙ্গে খাবার খাবে। হঠাৎ তার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। মুখের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল মিষ্টি হাসি।
মনে মনে বলল, আজ তো শুক্রবার। জুমার নামাজ শেষ করে সবাই একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাবে। আর আমার বরও আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরবে। সকালে আমাকে আদর না করে অফিসে চলে যাওয়ার শাস্তি—আজ না হয় সেটাই দেওয়া যাবে
ভাবনাটা মনে আসতেই ইনায়ার চোখেমুখে দুষ্টুমির ঝিলিক ফুটে উঠল। সে মনে মনে ঠিক করেই ফেলল—মিস্টার চৌধুরীকে আজ তার ভুলের মাশুল একটু আদর-অভিমানের মধ্য দিয়েই দিতে হবে।সকাল গড়িয়ে ধীরে ধীরে দুপুর হয়ে এলো। চৌধুরী বাড়ির বহু বছরের একটি নিজস্ব নিয়ম রয়েছে দুপুর বারোটার মধ্যেই বাড়ির সবাই গোসল সেরে, পরিপাটি হয়ে নতুন পোশাক পরে নিচে এসে বাড়ির কর্তাদের জন্য অপেক্ষা করে কারণ শুক্রবারের দুপুরটা চৌধুরী পরিবারের কাছে অন্যসব দিনের চেয়ে একটু আলাদা। এই দিনটিতে বাড়ির সবাই একসঙ্গে বসে দুপুরের খাবার খায়। ব্যস্ততা, কাজ কিংবা নানা কারণে সারাদিন একসঙ্গে থাকা সম্ভব না হলেও শুক্রবারের এই দুপুরের আয়োজনটা যেন পরিবারের ভালোবাসার বন্ধনটাকে আরও শক্ত করে রাখে।
এই সুন্দর নিয়মটি বাড়ির প্রবীণ কর্তা আতীক চৌধুরী বেঁচে থাকতেই ঠিক করে দিয়েছিলেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল, পরিবারের সদস্যরা যত দূরেই থাকুক না কেন, অন্তত সপ্তাহের একটি দিন যেন সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়ার সুযোগ পায়। তাঁর সেই নিয়ম আজও একইভাবে মেনে চলে চৌধুরী পরিবার।এমনকি ইউভি দীর্ঘ দশ বছর বাড়ির বাইরে থাকলেও শুক্রবারের এই নিয়ম থেকে কখনো নিজেকে দূরে রাখেনি। যত ব্যস্ততাই থাকুক, যত দূরেই থাকুক, প্রতি শুক্রবার দুপুরে বাড়িতে ফিরে আসার চেষ্টা করত সে। কারণ এই একটি দুপুর শুধু খাবার খাওয়ার সময় ছিল নাএটা ছিল পুরো পরিবারের একসঙ্গে বসে গল্প করা, হাসি-ঠাট্টা আর ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার সময়।
আজও সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। বরং আজকের দুপুরটা যেন আরও বিশেষ। কারণ আজ চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে দুপুরের খাবারে যোগ দেবে রিমঝিম মির্জা ও রাশেদ মির্জাও। তাদের জন্যও বাড়িতে আয়োজন চলছে বেশ জমজমাটভাবে। সকাল থেকেই রান্নাঘরে ব্যস্ততা, বাড়ির সদস্য ও হেলপিলহ্যান্ড দের মধ্যে ছোটাছুটি চলছে সব মিলিয়ে চৌধুরী বাড়িটা যেন শুক্রবারের পারিবারিক আনন্দে ধীরে ধীরে আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে।
জুমার নামাজ শেষ করে একে একে বাড়ির কর্তারা চৌধুরী বাড়িতে ফিরতে শুরু করলেন। দুপুরের আগেই বাড়িটা আবার পরিবারের সদস্যদের কোলাহল আর হাসি-আনন্দে মুখর হয়ে উঠল। ইউভি আর রেদোয়ান পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করছিল। ঠিক তখনই সিঁড়ির ওপর থেকে ধীরে ধীরে নিচে নামতে দেখা গেল ইনায়া আর পিয়াসাকে। ইনায়ার সাজের দিকে চোখ পড়তেই ইউভির পা যেন আচমকাই থেমে গেল। গাঢ় লাল খয়েরী পোশাকে আজ তাকে যেন অন্যরকম লাগছে। লম্বা, হালকা লাল চুলগুলো সুন্দর করে চুলের ভাঁজে ছোট ছোট ফুলের অলংকার, দিয়েছে কানে ঝুলছে মাচিং দুল হাতে মেহেদি দিয়েছে চোখে কাজল দিয়েছে হাতে ইউভির দেওয়া লাল কাশ্মীরু চুরি ও পায়ে পায়েল সব মিলিয়ে ইনায়াকে দেখে ইউভির চোখে মুহূর্তেই মুগ্ধতা নেমে এলো।
এক হাতে ফোন ধরে স্ক্রল করতে করতে নিজের অজান্তেই মুচকি মুচকি হাসছিল ইনায়া, আর সেই দৃশ্যেই ইউভি যেন আটকে গেল। পাশে থাকা রেদোয়ানকে উদ্দেশ্য করে সে বিস্মিত কণ্ঠে বলল, ব্রো, আজ কোনো বিশেষ দিন আছে নাকি? রেদোয়ান কিছুক্ষণ মাথা চুলকে ভাবার ভান করে বলল, — “নো ব্রো! যতদূর মনে পড়ছে, আজ শুধু শুক্রবার।” ইউভি সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে ফোন বের করে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে নিজেই নিশ্চিত হয়ে নিল। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল না, আজ কোনো বিশেষ দিনও নয়। তাহলে আমার বউটা আজ হুরপরি সেজেছে কেন? ইশ্! তোর বোনটা যা দেখতে!” রেদোয়ান ইউভির মুখের দিকে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল ব্রো, বাস্তবে ফিরে আসো।” কথাটা শুনে ইউভি যেন হঠাৎ নিজের ঘোর থেকে বেরিয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটিয়ে নিজের পোশাকটা একবার ঠিক করে নিল।
তারপর যথাসম্ভব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে রেদোয়ানের সঙ্গে ভেতরে এগিয়ে গেল, যদিও তার চোখের দৃষ্টি বারবার অজান্তেই সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকা তার আদরের দিকেই ফিরে যাচ্ছিল।এদিকে রিমঝিম ও রাশেদ মির্জাও এসে পৌঁছালেন চৌধুরী ভিলায়। রৌদিক দৌড়ে গিয়ে প্রণয়ের কাছে পৌঁছাতেই দুজন একে অপরের হাত ধরে আনন্দে দৌড়াতে লাগল। রিমঝিম ইনায়ার জন্য সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন অনেকগুলো ফ্লেভারের আচার। আচারগুলো দেখতেই ইনায়ার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে রিমঝিমকে জড়িয়ে ধরে খুশি কণ্ঠে বলল— “থ্যাংক ইউ, ফুপি মনি!” কিছুক্ষণ পর সবাই যার যার জায়গায় বসে দুপুরের খাবার খেতে শুরু করল। ইউভি বরাবরের মতো রেদোয়ান ও পিয়াসার পাশে একটি চেয়ার ফাঁকা রেখেই বসেছিল, কারণ সেই চেয়ারটায় সবসময় ইনায়াই বসে। কিন্তু আজ ইনায়া যেন ইচ্ছে করেই ইউভিকে অবাক করে দিয়ে লিখন চৌধুরী ও রাতিব চৌধুরীর মাঝখানে গিয়ে বসল
একেবারে ইউভির সামনাসামনি। ইউভি একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। বিষয়টা খেয়াল করে রেশমা চৌধুরী ইউভিকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বললেন এই ইউভি, বল না আর দেব? ইউভি সঙ্গে সঙ্গে প্লেটের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল না মা, লাগবে না।” কিন্তু পরক্ষণেই আবার তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল ইনায়ার ওপর। অথচ ইনায়া একবারের জন্যও ইউভির দিকে তাকাল না। সে বেশ স্বাভাবিকভাবেই নিজের মতো করে খেতে ব্যস্ত। ইউভি চিংড়ি মাছের একটি টুকরো নিয়ে বলল মা, এটা আদরকে দাও। ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে শান্ত গলায় বলে উঠল না, বড় মা, চিংড়ি মাছ খাব না। নুসরাত চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন তোর তো প্রিয়! কী হয়েছে নূর? খাবি না কেন? ঠিক।আছিস তো ইনায়া এবার খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল— “ঠিক আছি মা। আমি চিংড়ি মাছ খেতাম, কিন্তু এখন ইচ্ছে করছে না।” ইনায়ার কথায় ইউভি যেন আরও বেশি অবাক হলো।
হাসি-আনন্দ আর পরিবারের খুনসুটির মধ্য দিয়ে একসময় সবার খাওয়া শেষ হলো। ইউভি উঠে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল আদর, রুমে এসো। কথাটা বলেই সে আর এক মুহূর্ত না থেমে ওপরে চলে গেল। কিন্তু ইনায়া নিজের জায়গা থেকে এক পাও নড়ল না। বিষয়টা দেখে রেশমা চৌধুরী বললেন এই নূর, ইউভি ডাকছে। যা ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে মিথ্যে অসহায় মুখ করে বলল একটু পরে যাব, বড় মা। ভালো লাগছে না।” রেশমা চৌধুরী আর কথা বাড়ালেন না। এদিকে নিজের ঘরে গিয়ে ইউভি অপেক্ষা করতে করতে প্রায় দুই ঘণ্টা পার করে ফেলল। কিন্তু ইনায়ার কোনো দেখা নেই। শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে ফোন হাতে নিয়ে সময় দেখার সময় হঠাৎ একটি নোটিফিকেশন চোখে পড়তেই ফিসফিস করে বলে উঠল— “Like seriously! Oh my God, আদর!”
আর এক মুহূর্তও দেরি করল না সে। দ্রুত নিচে নেমে এসে দেখল, ইনায়া সোফায় রিমঝিমের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে আর তার দুটো পা পিয়াসার কোলে রাখা। পিয়াসা আলতো হাতে তার পায়ে মালিশ করে দিচ্ছে। দুজন মিলে গল্পে মেতে আছে, আর রিমঝিমের বলা নতুন কোনো মজার ঘটনা নিয়ে তিনজনের হাসি-ঠাট্টাও চলছে। ইউভি নিচে এসে সোজা ইনায়ার দিকে তাকাতেই হঠাৎ দুজনের চোখে চোখ পড়ে গেল। মুহূর্তেই ইনায়া মাথা নিচু করে ফেলল। যেন চোখে চোখ পড়াটাও আজ তার জন্য নিষিদ্ধ! রাশেদ মির্জা রিমঝিমকে উদ্দেশ্য করে বললেন চলো, অনেক দেরি হয়ে গেছে।” এরপর রিমঝিম ও রাশেদ মির্জা বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর রেদোয়ান ও রোবিউল চৌধুরীও কাজের জন্য বাইরে বেরিয়ে গেলেন। ইউভি আবারও ইনায়ার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল আদর, রুমে এসো।” ইনায়া যেন কিছুই শোনেনি—এমন ভান করে নুসরাত চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বলল বড় মা, কিছু খেতে দাও না।” ঠিক তখনই লিখন চৌধুরী ও রাতিব চৌধুরী সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে জিজ্ঞেস করলেন কী খাবি, নূর?
ইনায়া এবার মিষ্টি গলায় বলল ফল খেতে ইচ্ছে করছে।” কথাটা শেষ হতে না হতেই নুসরাত চৌধুরী ও রেশমা চৌধুরী দ্রুত নানা রকম ফল নিয়ে হাজির হলেন। দুজন সোফায় বসে ফল কাটতে শুরু করলেন। লিখন চৌধুরী রেশমা চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে বললেন এই আমাকে দাও, তোমরা গল্প করো। এত সময় লাগে ফল কাটতে? রেশমা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে ছুরিটা লিখন চৌধুরীর হাতে দিয়ে বললেন এই নাও কাটো মুখেই যাও ফটরফটর! লিখন চৌধুরী মুচকি হেসে ফল কাটায় মন দিলেন। রাতিব চৌধুরীও পাশে বসে মনোযোগ দিয়ে ইনায়ার জন্য ফল কাটতে লাগলেন। দৃশ্যটা কিছুক্ষণ লক্ষ্য করার পর ইউভি আর চুপ থাকতে পারল না। সে গিয়ে রেশমা চৌধুরী ও সাবিহা চৌধুরীর মাঝখানে বসে অভিমানী ভঙ্গিতে বলল শুধু কি তোমাদের নূরই মা হচ্ছে? আমি কি বাবা হচ্ছি না? যত্ন শুধু ও পাবে, আমি পাব না?
তার পর গম্ভীর কণ্ঠে বললো মেজো মা, তোমার মেয়ে আমাকে ইগনোর করছে কেন বলো তো? ইউভির এমন কথায় নুসরাত চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন নূর তোকে ইগনোর করছে? কারণটা কী বল তো? ইউভি ফিসফিস করে বলল সেটাই তো বুঝতে পারছি না। রেশমা চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন কী করেছিস? সত্যি কথা বল।। ইউভি লিখন চৌধুরীর কাছ থেকে এক টুকরো ফল নিয়ে খেতে খেতে বলল সকালে আদর তোমার রুমে ছিল, আমি ওকে কিছু না বলে অফিসে চলে গেছি। জানোই তো, কতটা গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন ছিল আজ লিখন চৌধুরী ইউভির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আজ তুই শেষ রে, ইউভি! আমিও আজ থেকে আটাশ বছর আগে একজনকে না বলে অফিসে চলে গিয়েছিলাম। ভুলবশত সেদিন তাকে বুকে টেনে কপালে চুমু দিয়ে যেতে পারিনি। এই অপরাধে আমাকে এক সপ্তাহ লবণ ছাড়া তরকারি রান্না করে খাইয়েছিল। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত সেই ভুল আমি দ্বিতীয়বার করিনি। লিখন চৌধুরীর কথা শুনে ইউভি মুচকি হেসে বলল, — “বাবা, তোমার মতো এত ধৈর্য আমার নেই।
, আমি তোমার মতো এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে পারব না। সকালে যতটুকু ভালোবাসা তার প্রাপ্য ছিল।তার দশগুণ ফিরিয়ে দেব। বউটা যে আমার বড্ড শখের বউ! ওভাবে মুখ ফুলিয়ে অভিমান করে থাকলে কি আর ভালো লাগে বলো?”ইউভি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। ইনায়ার কাছে গিয়ে এক ঝটকায় তকোলে তুলে নিল। হঠাৎ এমন কাণ্ডে প্রণয় অবাক হয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল বাবাই, তুনি মিমিতে কোলে নিলে! মিমি তো বল।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে রাগী চোখে ইউভির দিকে তাকিয়ে বলল কী করছেন আপনি? সবাই আছে! আপনার লজ্জা না থাকতে পারে, মিস্টার চৌধুরী, আমার কিন্তু আছে। আর আমি এখন অনেক ভারী হয়ে গেছি, আপনার কষ্ট হবে। ইউভি কোনো উত্তর দিল না। শুধু ইনায়াকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সঙ্গে আগলে নিল। তারপর শান্ত ভঙ্গিতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলো ফিসফিস করে বললো
শেহেজাদার আদর পর্ব ৮০ (২)
“সকালে তোমাকে আদর না করে বেরিয়ে যাওয়াটা সত্যিই আমার ভুল হয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস করো, ইচ্ছে করে তোমাকে ভুলিনি। কাজের তাড়ায় মাথা ঠিকমতো কাজ করছিল না। এখন বলো, কীভাবে এই অপরাধের শাস্তি পেলে আমার শখের বউয়ের অভিমানটা ভাঙবে?
