Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৮৩

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮৩

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮৩
সুমাইয়া ইসলাম নূর

বেশ কিছুক্ষণ পর অবশেষে অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে গেল। ইউভি ছোট্ট ইচ্ছেকে কোলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। এতক্ষণ ধরে উৎকণ্ঠা আর অধীর অপেক্ষায় থাকা পুরো চৌধুরী পরিবার যেন এক মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পেল। ইউভির কোলে ছোট্ট পুতুলটাকে দেখামাত্রই সবাই একসঙ্গে তার দিকে এগিয়ে গেল। প্রত্যেকের মুখেই একই আবদার—আগে আমার কাছে দাও, একটু আমাকে কোলে নিতে দাও! সবার চোখে বিস্ময়, । এতদিন ধরে যার অপেক্ষায় ছিল সবাই, সেই ছোট্ট ইচ্ছেকে প্রথমবার চোখের সামনে দেখে যেন সবার বুক ভরে গেল এক অদ্ভুত ভালোবাসায়।

ইউভি প্রথমে ছোট্ট ইচ্ছেকে নিয়ে তার ডান কানে আজান দিল। পবিত্র সেই আজানের ধ্বনি শেষ করে ছোট্ট ইচ্ছেকে রেশমা চৌধুরীর কোলে তুলে দিল। এরপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে আবার ইনায়ার কাছে ফিরে যেতে গিয়ে থেমে গেল। লিখন চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল বাবা, আমার মেয়ে।লিখন চৌধুরী ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন হুম
কী বোঝাতে চাচ্ছিস তুই? ইউভি ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বলল না, কিছু না।লিখন চৌধুরী এবার ছেলের সেই মুচকি হাসির অর্থ বুঝতে পেরে রাতিব চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন সে জিতে গেছে, আর তার বাবা হেরে গেছে। এটাই বোঝাতে চাইছে।

কথাটা শুনে রাতিব চৌধুরীর মুখেও আবেগমাখা হাসি ফুটে উঠল। তিনি আর এক মুহূর্ত দেরি না করে রেশমা চৌধুরীর কাছে এগিয়ে গেলেন। মমতাভরা কণ্ঠে বললেন ভাবি, দাও তো একটু আমাকে দাও।
রেশমা চৌধুরী ছোট্ট ইচ্ছেকে তার কোলে তুলে দিলেন। রাতিব চৌধুরী ইচ্ছে কে নিজের বুকের কাছে টেনে নিতেই তার চোখের কোণে পানি চিকচিক করে উঠল। আবেগে কাঁপা কণ্ঠে তিনি বললেন এই তো সেদিনের কথা ভাবি মনে আছে তোমাদের ঠিক এভাবেই আমার ছোট্ট নূরকে কোলে নিয়েছিলাম। আর আজ আমার সেই নূরও মা হয়ে গেল! কথাটা শেষ করার আগেই আবেগে তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে রাতিব চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে বলল চাচ্চু… দেখোতো, পুতুলটা কীভাবে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে! পিয়াসার কথায় রাতিব চৌধুরী চোখের পানি মুছে ছোট্ট ইচ্ছের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। পিয়াসাও শিশুটির গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল

মাশাআল্লাহ! আমাদের পুতুল! দূর থেকে এতক্ষণ পুরো দৃশ্যটা দেখছিল ছোট্ট প্রণয়। তার কৌতূহলী চোখ বারবার সবার কোলে থাকা শিশুটার দিকে চলে যাচ্ছিল। অবশেষে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে সে পিয়াসাকে উদ্দেশ্য করে বলল তোমাল তোলে কে, পিউ ? পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু গেড়ে প্রণয়ের সমান হয়ে বসে মুচকি হেসে বলল তোমার উত্তে।কথাটা শুনেই প্রণয় আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠল আমাল উত্তে তলে আইতে পিউ! দেকাও, দেকাও! পিয়াসা ইচ্ছেকে কোলে নিয়ে প্রণয়ের সামনে ধরল। শিশুটার দিকে তাকিয়ে প্রণয় বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে বলল এ মা! এ তো পুতুল না, মানুত তাকাই আতে! তুল ততগুলো! হাত কত ছোত পা-ও কত ছোত!
প্রণয়ের নিষ্পাপ কথাগুলো শুনে সবাই হেসে উঠল। এতক্ষণকার দুশ্চিন্তা আর উৎকণ্ঠায় ভারী হয়ে থাকা পরিবেশটা মুহূর্তেই ছোট্ট শিশুটির আগমনের আনন্দ আর প্রণয়ের সরল কথায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।এরপর রেদোয়ান এগিয়ে এসে পিয়াসার কাছ থেকে ছোট্ট ইচ্ছেকে কোলে নিয়ে মুগ্ধ চোখে তার মুখের দিকে তাকাল। শিশুটির ছোট্ট আঙুলগুলো নিজের আঙুলের মধ্যে নিয়ে আদর করে বলল আমি মামা হয়ে গেছি! আমাকে মামা বলে ডাকবে তো, ইচ্ছে? যেন তার কথার উত্তর দেওয়ার মতোই ছোট্ট ইচ্ছে হঠাৎ মুখ বাঁকিয়ে কেঁদে উঠল। রেদোয়ান সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলল এই তো! এখন থেকেই মামাকে উত্তর দেওয়া শুরু করে দিয়েছে!

সবাই আবারও হেসে উঠল। একে একে সবাই ছোট্ট ইচ্ছেকে ঘিরে আনন্দ করতে লাগল। এতদিনের অপেক্ষার পর চৌধুরী পরিবারের ঘরে যেন নতুন এক আনন্দের সূচনা হয়েছে।কিছুক্ষণ পর রেদোয়ান একজন নার্সকে কাছে জিজ্ঞেস করল আমার বোনের অবস্থা কেমন? ওকে কেবিনে কখন শিফট করবেন? নার্সটি শান্তভাবে উত্তর দিলেন আর মাত্র দশ মিনিটের মতো সময় লাগবে। তবে বেবিটাকে আপাতত পর্যবেক্ষণে রাখাতে হবে।”
রেদোয়ান একটু চিন্তিত হয়ে আবার জিজ্ঞেস করল বেবির কোনো সমস্যা হয়েছে? নার্সটি মৃদু হেসে বললেন
ভয়ের কিছু নেই। বেবিটা একটু কম ওজন নিয়ে জন্মেছে এবং সময়ের দিক থেকেও প্রিম্যাচিউর হওয়ায় আমরা একটু বেশি সতর্ক থাকছি। এমন বেবিদের জন্মের পর শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখা, শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্তে শর্করার মাত্রা এবং খাওয়ানোর সক্ষমতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রয়োজনে কিছু সময় নবজাতক পর্যবেক্ষণ ইউনিটে রেখে চিকিৎসকরা নজরে রাখেন। এখন পর্যন্ত বেবির অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা ধরা পড়েনি। আলহামদুলিল্লাহ, সে স্থিতিশীল আছে।”
নার্সের কথা শুনে রেদোয়ানের মুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারের সদস্যরাও যেন একটু নিশ্চিন্ত হলেন।

বেশ কিছুক্ষণ পর রিমঝিম মির্জা এসে পৌঁছালেন। সঙ্গে এসেছেন নাতাশা এহসান ও তুর্য। তুবা আর রাজ্জো হাসপাতালে থাকলে বেশিরভাগ সময়ই তুর্য নাতাশা এহসানের কাছেই থাকে। হাসপাতালে পৌঁছে রিমঝিম ও নাতাশা প্রথমেই ইনায়ার কাছে গেলেন। দুজনেই দেখে শুভেচ্ছা জানাল রিমঝিম ইনায়ার মাথাই হাত বুলিয়ে বললো কেমন ফিলিংস ইনায়া মুচকি হেসে বললো ব্যথা দায়ক ফুপিমনি। সবাই ইনায়ার কথাই হেসে উঠলো। ইউভি কিছু সময়ের জন্য হাসপাতালের বাইরে গেছে।রাত যত গভীর হতে লাগল, চৌধুরী পরিবারের একে একে অনেকেই বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলেন। ইনায়ার পাশে থেকে গেল রেদোয়ান, পিয়াসা, তুবা ও রাজ্জো। ইউভি তখনো হাসপাতালের বাইরে; যাওয়ার আগে ইনায়ার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রেদোয়ানের ওপর দিয়ে গেছে। লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী ও রোবিউল চৌধুরীও বাড়িতে ফিরে গেছেন। তবে তারা জানিয়ে গেছেন, কিছুক্ষণ পর আবার আসবেন।
কিছুক্ষণ পর তুবা ছোট্ট ইচ্ছেকে কোলে নিয়ে ইনায়ার পাশে এসে দাঁড়াল। শিশুটির ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে তুবার চোখে-মুখে ফুটে উঠল স্বস্তির হাসি। সে ধীরে ধীরে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের ইচ্ছের কোনো সমস্যা নেই। ও একদম সুস্থ আছে।” কথাটা শুনেই যেন ঘরের পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। এতক্ষণ যে মুখগুলো দুশ্চিন্তায় ভারী হয়ে ছিল, সবার মুখেই এবার স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। ইনায়ার চোখেও চিকচিক করে উঠল আনন্দাশ্রু। মা হওয়ার পর প্রথমবার নিজের ছোট্ট সন্তানকে নিরাপদে দেখার আনন্দটা যেন তার বুকের ভেতর ঢেউ তুলছিল।ঠিক তখনই সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইউভি ধীরে ধীরে কেবিনের ঠিক প্রবেশ করল ।

তার পেছন পেছনই এগিয়ে এলেন মন্টু চাচা। দরজার কাছে এসে তিনি কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন, যেন এত মানুষের ভিড়ে হঠাৎ করে সামনে আসতেও কোথাও একটা সংকোচ কাজ করছে। পিয়াসার চোখে পড়তেই সে বিস্মিত হয়ে বলে উঠল চাচা! আসো তুমি! সত্যি তুমি এসেছ? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না! ইনায়াও মৃদু হাসি দিয়ে হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকল। এদিকে আসো মন্টু চা।মন্টু চাচা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। ইনায়ার দিকে কিছুক্ষণ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে আবেগভরা কণ্ঠে বললেন তুমি মা হয়ে গেলে, মা! কবে যে এত বড় হয়ে গেলে তোমরা, বুঝতেই পারলাম না। তুবার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। সে মজা করে বলল হ্যাঁ চাচা, দিন শেষে আপনিও বুড়ো হয়ে গেলেন, আর আমরাও বড় হয়ে গেলাম।

মন্টু চাচা হেসে ফেললেন। কিন্তু পরক্ষণেই তুবার মুখে অভিমানের ছাপ ফুটে উঠল। সে বলল কিন্তু চাচা, আমার আর পিয়াসার সময় তো আপনি আমাদের দেখতে আসেননি। আজ এত রাতে এলেন যে? প্রশ্নটা শুনে মন্টু চাচার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। তিনি মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ভারী কণ্ঠে বললেন, “মা, তোমরা তো অনেক বড়লোক মানুষ। সত্যি কথা বলতে কী, এত বড় বড় মানুষের ভিড়ে আসতে আমার কেমন যেন সংকোচ হতো। মনে হতো, তোমাদের সামনে আমি হয়তো মানাব না। তাই চাইলেও আসতে পারিনি। কিন্তু আজ কেন জানি আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলাম না।তাই চলে এলাম।

মন্টু চাচার কথায় পিয়াসার চোখ দুটো পানিতে ভিজে উঠল। সে এগিয়ে এসে তার দিকে তাকিয়ে অভিমানী কণ্ঠে বলল চাচা, তুমি এই কথাটা কীভাবে বলতে পারলে? বড়লোক আর গরিব।এসবের চোখ দিয়ে আমরা কি কোনোদিন তোমাকে দেখেছি? তুমি আমাদের তিনজনের জীবনে ঠিক কী, সেটা হয়তো তুমি নিজেই জানো না চাচা। আমাদের কাছে তুমি কখনো শুধু চা বিক্রি করা একজন মানুষ ছিলে না। তুমি আমাদের শৈশবের একটা বড় অংশ, আমাদের হাসির একটা কারণ, আমাদের অনেক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একজন আপন মানুষ তুমি চাচা, তোমাকে একটা ঘটনা বলি। মনে আছে আমরা যখন জিএসসি পরীক্ষা শেষ করে ক্লাস নাইনে উঠলাম? স্কুলে প্রথম দিন ছিল সেদিন। তাই না ইনায়া? ইনায়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। হ্যাঁ, প্রথম দিনই তো।

পিয়াসা আবার মন্টু চাচার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল সেদিনই আমরা প্রথম তোমাকে ওই অবস্থায় দেখেছিলাম। তুমি অসহায় একটা মুখ করে তোমার ছোট্ট দোকানটায় বসে চা বিক্রি করছিলে। দোকানে তেমন কিছুই ছিল না।শুধু একটা কেকের প্যাকেট ঝুলছিল, আর চা ছাড়া বিক্রি করার মতো তেমন কিছুই ছিল না। তোমাকে ওইভাবে দেখে আমাদের খুব কষ্ট হয়েছিল। মনে হয়েছিল, মানুষটা সারাদিন এখানে বসে থাকে, অথচ দোকানে এমন কিছুই নেই যেটা বিক্রি করে ভালোভাবে চলতে পারে। তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, প্রতিদিন তোমার দোকান থেকেই চা খাব। অন্য কোথাও নয় এতে যদি তোমার একটু উপকার হয় বিশ্বাস করো চাচা এর আগে আমরা তিনটাই কোন দিন চা খাইনি তোমার দোকান থেকেই প্রথম চা খাওয়া শুরু করলাম।

চায়ের বিনিময়ে একটু বেশি টাকা দিতে গেলে তুমি নিতে চাইতে না তাই আমরা তোমাকে মিথ্যা কথা বলতাম যে চা ঠান্ডা হয়ে গেছে চাচা আর এক কাপ চা নিয়ে আসো তুমি আমাদের উপর প্রচুর বিরক্ত হতে কিন্তু ইনায়া তোমার সাথে ঝগরা করে বলতো এতো চেত কেন সবগুলোকাপ এর টাকা দিয়ে দিব হিসাব করে রাখো ।
আবার যদি টাকা বেশি দিতে চাইতাম তুমি কিছুতেই টাকা নিতে চাইতে না। কতবার বলেছ তোমরা আমাকে এত টাকা দিও না।’ শেষ পর্যন্ত আমরা জোর করে তোমার হাতে টাকা দিতাম। সেই টাকা জমিয়ে তুমি একটা ছোট্ট ফ্রিজ কিনলে। তারপর সেই ফ্রিজে আইসক্রিম রাখতে শুরু করলে। আর আমরা প্রতিদিন তোমার দোকানে চা আর আইসক্রিম খেতে যেতাম। তুবা ও মৃদু হেসে বললো বিশ্বাস করো চাচা, আমরা চাইলে শহরের যেকোনো নামী রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে চা খেতে পারতাম। কিন্তু সেখানে গেলে তোমার ওই হাসিটা দেখতে পেতাম না। তোমার দোকানে গেলে চা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমার সঙ্গে গল্প করা যেত, তোমাকে জ্বালানো যেত, আর তোমার মুখে সেই বিরক্ত অথচ মায়াভরা হাসিটাও দেখা যেত।”

পিয়াসা বলল, আমরা প্রতিদিন তোমাকে কিছু টাকা করে দিতাম। অথচ তুমি সেটাও নিতে চাইতে না। বলতে তোমরা আমাকে বেশি টাকা দাও।’ আর আমরা তখনও জোর করে তোমার হাতে টাকা গুঁজে দিতাম। কারণ আমাদের কাছে সেটা কোনো দান ছিল না, চাচা। আমরা শুধু চেয়েছিলাম, তুমি একটু ভালো থাকো। তোমার দোকানটা একটু বড় হোক, তোমার জীবনে একটু স্বস্তি আসুক।
মন্টু চাচা নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়া পিয়াসা তুবার দিকে তাকিয়ে যেন তিনি বহু বছর আগের সেই ছোট্ট তিনটি কিশোরীকে দেখতে পেলেন যারা প্রতিদিন তার ছোট্ট দোকানে এসে চা খেত, আইসক্রিম খেত, তাকে জ্বালাত, আবার নিজেদের মতো করে তার জীবনে একটু একটু করে আলোও জ্বেলে দিয়েছিল।

ইউভি পরিস্থিতিটা একটু স্বাভাবিক করার জন্য সে ইচ্ছে করেই প্রসঙ্গ বদলে তুবার দিকে তাকিয়ে বলল তুবা, ইচ্ছের সব চেকআপ হয়ে গেছে? তুবা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।জি, জিজু। তোমার মেয়ে আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে। প্রিম্যাচিউর হওয়ায় আপাতত একটু বেশি পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে, তবে এখন পর্যন্ত চিন্তার মতো কিছু নেই। তুবার কথা শুনে ইউভির মুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে তুবার কাছ থেকে ছোট্ট ইচ্ছেকে কোলে তুলে নিল। কয়েক মুহূর্ত নিজের বুকের কাছে আগলে রেখে ইচ্ছের ছোট্ট মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মৃদু হেসে ইচ্ছেকে মন্টু চাচার দিকে বাড়িয়ে দিল।চাচা, নাও। কোলে নাও।
মন্টু চাচা যেন মুহূর্তের জন্য কথাই হারিয়ে ফেললেন। কাঁপা হাতে ছোট্ট ইচ্ছেকে কোলে তুলে নিয়ে পরম মমতায় তার মুখের দিকে তাকালেন। তারপর ছোট্ট গালে আঙুল ছুঁইয়ে বললেন,
মাশাআল্লাহ! কী সুন্দর পুতুল! দাদুভাই, তুমি তো একেবারে আমার ছোট্ট পরি গো। ইচ্ছের মুখের দিকে তাকিয়ে তার চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল।

বেশ কিছুক্ষণ পর ইউভি রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল।ব্রো, চাচাকে নামিয়ে দিয়ে আয়।”
রেদোয়ান মাথা নেড়ে মন্টু চাচার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দুজন ধীরে ধীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই ইউভিও তাদের পেছন পেছন বাইরে চলে গেল। ইনায়া চুপচাপ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটা পৃথিবীতে আসতে না আসতেই তার বাবা এত ব্যস্ত হয়ে গেল! একবারও যেন তার আদর এর কথা মনে পড়ছে না। অভিমানে ইনায়ার ঠোঁট দুইটা কাপতে লাগলো।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে ইউভি আবার ভেতরে ঢুকল।তার দুই হাতে কিছু একটা দেখে ইনায়ার অভিমানী চোখ দুটো কৌতূহলে ভরে উঠল। ইউভির এক হাতে ছিল সুন্দর করে সাজানো একগুচ্ছ লাল গোলাপ ফুল, আর অন্য হাতে ছোট্ট একটি উপহারের বাক্স।
বিষয়টা রাজ্জোর চোখ এড়াল না। সে সঙ্গে সঙ্গে তুবা ও পিয়াসার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় কিছু একটা বোঝাল। তুবা কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই রাজ্জো এক ঝটকায় তাকে কোলে তুলে নিয়ে বললো চলো, পিচ্চি। কোনো কথা নয়।”

তুবা অবাক হয়ে বলল,আরে! কোথায় নিয়ে যাচ্ছো বলতে তো দাও রাজ্জো হেসে বলল,যেখানে নিয়ে যাচ্ছি, সেখানেই চলো। এখানে থাকলে তোমার কৌতূহল কমবে না পিচ্চি।
অন্যদিকে পিয়াসাও মুচকি হেসে ছোট্ট ইচ্ছেকে কোলে তুলে নিল। ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
ইচ্ছেকে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আসি, ভাইয়া। তোমরা একটু কথা বলো। ইউভি এবার বুঝে গেল, সবাই ইচ্ছে করেই তাকে আর ইনায়াকে একা করে দিচ্ছে। সে মুচকি হেসে পিয়াসার দিকে তাকিয়ে বলল একটু বেশি বুঝিস তোরা! যেহেতু বুঝেই গেছিস, এখন যা, বনু। পিয়াসা হেসে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যেতেই ঘরের ভেতর নেমে এলো একান্ত নীরবতা।

ইউভি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ইনায়ার পাশে বসল। তার চোখে তখন অন্যরকম এক মায়া। কিছুক্ষণ কোনো কথা না বলে সে শুধু ইনায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ইনায়ার ক্লান্ত মুখ, চোখের নিচের হালকা কালচে ছাপ ফুটে উঠেছে তবু ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা সেই পরিচিত মায়াবী হাসি সবকিছু যেন নতুন করে আবিষ্কার করছিল সে।
ইউভি ধীরে ধীরে ফুলের তোড়াটা ইনায়ার সামনে এগিয়ে দিল।তোমার জন্য।ইনায়া অবাক হয়ে ফুলগুলোর দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে ইউভির দিকে চোখ তুলে বলল আমার জন্য?”

ইউভি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।হ্যাঁ, আমার বিয়াদোব বউয়ের জন্য। শুধু ফুল নয়, এর সঙ্গে একটা ধন্যবাদও আছে।ন্যবাদ কেন? ইউভি ফুলগুলো তার হাতে তুলে দিয়ে বলল আমার পৃথিবীটাকে আরেকটু বড় করে দেওয়ার জন্য। আর আজ এতটা কষ্ট সহ্য করে আমাদের ইচ্ছেকে পৃথিবীতে নিয়ে আসার জন্য।”কথাগুলো শুনে ইনায়ার চোখের কোণে পানি জমে উঠল। ইউভি সঙ্গে সঙ্গে তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল।
ইউভি এবার ছোট্ট বাক্সটা তার হাতে তুলে দিয়ে মুচকি হেসে বলল আর এটা তোমার জন্য। মা হওয়ার প্রথম উপহার।ইউভি ধীরে ধীরে ছোট্ট বাক্সটির ঢাকনা খুলতেই ইনায়ার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। মখমলের ওপর রাখা ছিল অপূর্ব নকশার একটি হীরের আংটি। আংটির মাঝখানে বসানো বিরল হীরেটি আলো পড়তেই ঝিকমিক করে উঠল। তার সৌন্দর্য আর দীপ্তিতে ইনায়া কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন কথাই হারিয়ে ফেলল।ইউভি খুব যত্ন করে আংটিটি তুলে নিয়ে ইনায়ার অনামিকা আঙুলে পরিয়ে দিল। তারপর তার হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে কিছুক্ষণ গভীর মমতায় তাকিয়ে রইল। ইনায়া বিস্মিত চোখে আংটির দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বলল,

— “বর… এটা তো অসম্ভব সুন্দর! এত মূল্যবান হীরা এই হীরা তো বাংলাদেশে একটাও নেই বলে আমি জানতাম ইউভির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে ইনায়ার আরও কাছে এগিয়ে এসে তার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। দুজনের চোখে চোখ আটকে রইল কিছুক্ষণতারপর ইউভি খুব নরম স্বরে বলল,ভুল বললে, আদর। আছে তো এক পিস আছে। ইনায়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।ইউভি মৃদু হেসে ইনায়ার আঙুলে পরানো আংটির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,সেই এক পিস হীরেটাই এখন আমার আদর এর কাছে।
কথাটা বলেই সে আলতো করে ইনায়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।ইউভির ঠোঁট আলতো করে ইনায়ার ঠোঁট ছুঁয়ে দিতেই ইনায়া ধীরে ধীরে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। মুহূর্তটায় তার ভেতরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। সদ্য মাতৃত্বের ক্লান্তি, শরীরের সমস্ত ব্যথা আর দীর্ঘ সময়ের উৎকণ্ঠা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল। ইউভির ভালোবাসার স্পর্শে তার বুকের ভেতরটা নরম এক আবেগে ভরে উঠল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মৃদু এক হাসি। ইউভি ধীরে সরে এসে তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে থাকতেই ইনায়া নিঃশব্দে তার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল।

মুহূর্তটুকু যেন হঠাৎ করেই থমকে গেল।
ইউভি তার কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল,
মা হওয়ার জন্য এই সামান্য উপহারটুকু তো প্রাপ্য তোমার। তুমি আজ আমাকে শুধু একটা সন্তান দাওনি, আদর তুমি আমার জীবনে নতুন একটা পরিচয় এনে দিয়েছ। ইনায়ার চোখের কোণে পানি চিকচিক করে উঠল। ইউভি তার গাল ছুঁয়ে সেই পানিটুকু মুছে দিয়ে মৃদু হেসে বলল,আমার মেয়ের মা তুমি তোমাকে তো একটু বিশেষভাবেই সাজাতে হবে, মিসেস চৌধুরী।

তিনটি দিন যেন চোখের পলকেই কেটে গেল। অবশেষে আজ ইনায়া ও ছোট্ট ইচ্ছেকে চৌধুরী ভিলায় নিয়ে আসা হয়েছে। ইনায়াদের তার সুস্থতার কথা মাথায় রেখে নিচতলাই একটি নিরিবিলি ঘরে রাখা হয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত এই ঘরেই থাকবে তারা মা-মেয়েকে সবসময় পরিবারের সবার চোখের সামনেই রাখার জন্যই ইউ ভি এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছে। ইউভি তাদের দুজনকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে অফিসের জরুরি কাজের কারণে আবার বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে চৌধুরী ভিলার পরিবেশটাও বদলে গেল। দিনের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে কমে এসে চারপাশে নেমে এলো এক শান্ত মায়াময় আবহ। ভিলার বাগানের ছোট ছোট আলোগুলো জ্বলে উঠেছে, জানালার কাঁচে প্রতিফলিত হচ্ছে নরম হলুদ আলো। হলরুমজুড়ে পরিবারের সদস্যদের হাসি আড্ডায় মেতে আছে বাড়িটা যেন আবার তার চিরচেনা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। দিনের সমস্ত ব্যস্ততার পর বাড়ির কর্তাব্যক্তিরাও একে একে বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন।

ঠিক এমন সময় ভিলার প্রধান দরজা দিয়ে পাশাপাশি গল্প করতে করতে প্রবেশ করল ইউভি ও রেদোয়ান। সারাদিনের ব্যস্ততার পর দুজনের মুখেই ক্লান্তির ছাপ থাকলেও আপনজনদের মাঝে ফিরতেই তাদের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল স্বস্তির মৃদু হাসি। হলরুমে থাকা পরিবারের প্রতিটি সদস্যের দিকে তাকিয়ে দুজনেই মৃদু হেসে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করল। এদিকে রেদোয়ানকে দেখামাত্রই ছোট্ট প্রণয় যেন আর এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারল না। বাবাকে দেখেই সে ছুটে এলো। ছোট্ট পায়ে দৌড়ে এসে এক ঝটকায় রেদোয়ানের পা জড়িয়ে ধরে খুশিতে বলে উঠল,বাবা! তুমি এত দেলি কলে এলে তেনো। রেদোয়ানও সঙ্গে সঙ্গে ছেলেকে কোলে তুলে নিল। পরম আদরে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেতে লাগল। প্রণয়ও বাবার গলা জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হাসতে লাগল।
দৃশ্যটা কয়েক পা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইউভি নীরবে দেখছিল।দৃশ্যটা তার চোখের সামনে নতুন কিছু ছিল না। প্রতিদিনই তো এমন হয়। ইউভি আর রেদোয়ান একসঙ্গে বাড়িতে ফিরলেই প্রণয় ছুটে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। অথচ একসময় এই দৃশ্যটাই ইউভির বুকের ভেতর নিঃশব্দ এক শূন্যতা তৈরি করত। অন্য কারও প্রতি হিংসা ছিল না, কারও সুখ দেখে কষ্ট পাওয়ার মতো সংকীর্ণতাও ছিল না তার শুধু নিজের জীবনে এমন একজন ছোট্ট মানুষ না থাকার অভাবটা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেত।রেদোয়ানের কোলে প্রণয়কে দেখে কতবার যে ইউভি মনে মনে ভেবেছে ইশশ আমারও যদি এমন কেউ থাকত! আমি বাড়ি ফিরলে যে ছোট্ট দুটো হাত ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরত… যে আমাকে দেখেই বাবাই বলে ডাকবে।

সেই অপূর্ণ ইচ্ছেটা বুকের এক কোণে লুকিয়েই রেখেছিল সে। কাউকে কখনো বলেনি। শুধু নীরবে অন্যের বাবা হওয়ার আনন্দ দেখেছে আর নিজের ভাগ্যের দিকে তাকিয়ে থেকেছে।কিন্তু আজ পরিস্থিতিটা অন্যরকম।আজ তার নিজেরও তো একটি সন্তান এসেছে।ভাবনাটা মনে আসতেই ইউভির বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। এতদিনের সেই নিঃশব্দ অভাব, অপেক্ষা আর আকাঙ্ক্ষা যেন এক মুহূর্তে অন্য এক অনুভূতিতে বদলে গেল। তার মেয়েটাও একদিন তাকে দেখলে এভাবেই ছুটে আসবে তার ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরবে, মায়ামাখা কণ্ঠে ডাকবে, “বাবা! চোখের সামনে যেন ভবিষ্যতের সেই দৃশ্যটা ভেসে উঠল।ইউভির বুকটা অদ্ভুত এক আবেগে ভরে গেল। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটলেও চোখের গভীরে জমে রইল অপ্রকাশিত অনুভূতির ছায়া।
আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সে। মনের সমস্ত আবেগ নিয়ে দ্রুত পা বাড়াল নুসরাত চৌধুরীর কাঁধে মাথা রেখে ইনায়া শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। আশপাশে পরিবারের সবাই বসে গল্প করছে। ইউভিকে দেখেই ইনায়া মায়াময় চোখে তার দিকে তাকাল।ইউভি দ্রুত তার পাশে গিয়ে বসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,কী হয়েছে, আদর? শরীর ঠিক আছে তো? খারাপ লাগছে? কোথাও ব্যথা করছে?”

ইনায়া মৃদু হেসে ইউভির দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,শান্ত হও। আমি ঠিক আছি। তুমি অযথা এত চিন্তা করো না। ইনায়ার কথা শুনেও ইউভির উদ্বেগ পুরোপুরি কাটল না। সে আলতো করে তার কপালে একটি চুমু এঁকে কিছুক্ষণ মমতাভরা চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। রেশমা চৌধুরী বললো নে আমার মেয়েকে ছেরে তোর মেয়ের কাছে যা।
হঠাৎ তার দৃষ্টি চলে গেল ঘরের একপাশে রাখা ছোট্ট ইচ্ছের দিকে। ইনায়া মৃদু স্বরে বলল।ইচ্ছেটা মাত্রই ঘুমিয়েছে। ওই যে দেখো, আমি ওর দিকেই তাকিয়ে আছি এখান থেকে দেখা যাচ্ছেইউভির চোখ সঙ্গে সঙ্গে কোমল হয়ে গেল। নিজের মেয়েকে একবার দেখেই তার বুকের ভেতরটা ভালোবাসায় ভরে উঠল।সে রেসমা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল,মা, আমি ইচ্ছের কাছে যাচ্ছি। তোমরা এখানে গল্প করো। কথাটা বলে ইউভি আর দেরি করল না। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসে অত্যন্ত সাবধানে ছোট্ট ইচ্ছেকে কোলে তুলে নিল।
মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই ইউভির মুখে ফুটে উঠল এক প্রশান্ত হাসি। ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে সে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।যে মানুষটা এতদিন অন্যের সন্তানের বাবাকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য দেখে নিজের বুকের ভেতর নিঃশব্দ শূন্যতা অনুভব করত, আজ সেই মানুষটার বুকেই নিজের সন্তান ঘুমিয়ে আছে।ইউভি খুব আস্তে করে ছোট্ট ইচ্ছের কপালে চুমু দিল।
তার চোখের কোণে তখন একফোঁটা আনন্দের আভা।হয়তো এতদিনের অপেক্ষার পর অবশেষে তার সেই অপূর্ণ ডাকটাও পূর্ণ হতে শুরু করেছে।

ইউভি ইচ্ছের দিকে তাকিয়ে থেকেই বিছানায় বসে পরলো কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো
আল্লাহ…! সত্যিই কি আমি বাবা হয়েছি? এতদিন পর এতগুলো বছর অপেক্ষা করার পর আজ কি সত্যিই আমার নিজের একটা সন্তান এসেছে? কত রাত আমি নিঃশব্দে কেঁদেছি, কতবার অন্যের সন্তানকে কোলে নিয়ে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠেছে, কতবার মনে হয়েছে।আমার জীবনে কি কোনোদিন এই ডাকটা আসবে? ‘বাবা’ একটা ছোট্ট মুখ কি কোনোদিন আমাকে বাবা বলে ডাকবে? আজ সেই অপেক্ষার শেষ হলো! আল্লাহ, তুমি আমার বুকের এত বছরের শূন্যতা সত্যিই পূর্ণ করে দিলে! আমি জানি না এই আনন্দ কীভাবে প্রকাশ করব আমি কাঁদছি কেন জানি না, হাসতেও ইচ্ছে করছে, আবার চিৎকার করে সবাইকে বলতে ইচ্ছে করছে আমি বাবা হয়েছি! আমি বাবা হয়েছি! আমারও একটা সন্তান হয়েছে! এতদিন যে দুটো হাত খালি ছিল, আজ সেই হাতেই আমি আমার সন্তানকে তুলে নিয়েছি এতদিন যে বুকটা একটা ছোট্ট অস্তিত্বের জন্য হাহাকার করেছে, আজ সেই বুকেই আমার সন্তান মাথা রেখেছে আল্লাহ, আমি আর কিছু চাই না… জীবনে আর কিছু পাওয়ার নেই আমার। শুধু আমার এই ছোট্ট সন্তানটাকে আমার কাছে রেখো। আর তার মাকে ও যে মানুষটা আমাকে এই সুখটা এনে দিল, তাকেও ভালো রেখো।

ইউভি কিছুক্ষণ পর ছোট্ট ইচ্ছেকে কোলে নিয়েই বাইরে বেরিয়ে এলো। ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল আদর, রুমে এসো। বড্ড ক্লান্ত লাগছে।”
রেশমা চৌধুরী ছেলের কথা শুনে মুচকি হেসে বললেন.তোর যা লাগবে নিয়ে যা না ইউভি । মেশেরা আমাদের সঙ্গে গল্প করছে। একটু পরে খাবার খেয়ে একবারে রুমে যাস।পিয়াসাও দুষ্টু হেসে বলল,বউকে জড়িয়ে ধরবে, যানি তো।আসো! লজ্জা পাচ্ছ কেন? এমন তো নয় যে আমাদের সামনে বউকে জড়িয়ে ধরো না। ইউভি মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,খাবার পরে খাব, মা। সবে তো সন্ধ্যা হয়েছে। আদরকে রুমে দিয়ে যাও। ভালো লাগছে না। নুসরাত চৌধুরীও ইশারায় বললেন,

যেতে দাও। ছেলেটা সারাদিন পরিশ্রম করেছে।”
অবশেষে পিয়াসার সাহায্যে ইনায়া ধীরে ধীরে রুমের দিকে চলে গেল।
ইনায়া রুমে ঢুকতেই ইউভি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। ছোট্ট ইচ্ছেকে সাবধানে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সে ইনায়াকে নিজের কাছে টেনে নিল। তারপর গভীর মমতায় তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল।দীর্ঘ তিন দিন পর প্রিয় মানুষটাকে এভাবে কাছে পেয়ে ইউভির মুখে যেন স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। ইনায়াও তার বুকে মুখ রেখে চোখ বন্ধ করে বলল,কী শান্তি লাগছে! ইউভি মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল,হুম তিনটা দিন, বউ। পুরো তিনটা দিন তোমাকে ঠিকমতো জড়িয়ে ধরতে পারিনি। আর ইনায়া পালটা প্রশ্ন করলো আর কি বর?আর আমি আট মাস ধরে রোজা আছি অথচ এখনো ইফতার করতে পারলাম না বউ ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে তার বাহুতে আলতো করে চিমটি কেটে বলল,একদম চুপ! তোমার ইফতার করতে এখনো অনেক দেরি আছে। এখনো তো তিন মাস বাকি!।ইনায়ার কথা শুনে ইউভির ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। সে আরও একটু কাছে ঝুঁকে মৃদু স্বরে বলল তুমি তো তাহলে অনেক খুশি তাই না ইনায়া পালটা উত্তর দিলো হুম অনেক না মানে একটু। ইউভি আবারো বললো খুব উঠছো তাই না যত খুশি উড়ে নাও, বউ। যেদিন রোজা ভাঙবো সেদিন তোমার ওই পাখনা দুটো ও ভেঙ্গে দিব।

ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে ইউভির বুকে আলতো করে কিল মেরে বলল অসভ্য লোক একটা! ইউভি হেসে আবারও তাকে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ পর মায়াভরা কণ্ঠে বলল দুইটা ঘণ্টা তোমার বুকে মাথা রেখে একটু ঘুমাতে দেবে? সঙ্গে সঙ্গে ইনায়া কে থামিয়ে দিয়ে বলল না, না। তুমি তো এখনো পুরোপুরি সুস্থ নও। তার চেয়ে আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাও। ইউভির কথা শুনে ইনায়ার চোখেমুখে মায়া ছড়িয়ে পড়ল। সে আর কোনো কথা বলল না। বরং ইনায়াকে নিজের বুকে আগলে নিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।ফিসফিস করে বলল,একটুও নড়বে না, আদর।
ঠিক তখনই ছোট্ট ইচ্ছে হালকা করে কেঁদে উঠল।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮২

ইউভি সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল আমি দেখছি। তারপর খুব সাবধানে ছোট্ট ইচ্ছেকে কোলে তুলে নিজের বুকের অন্য পাশে নিয়ে নিল। এক পাশে ইনায়া, অন্য পাশে ছোট্ট ইচ্ছে দুজনকেই নিজের বুকের মধ্যে আগলে নিয়ে ধীরে ধীরে মেয়েটাকে ঘুম পাড়াতে লাগল।ঠিক তখনই ইউভির ফোনটা বেজে উঠল। রেদোয়ানের কল।ইউভি একটু নড়ে উঠে ফোনটা হাতে নিতেই ওপাশ থেকে রেদোয়ানের কণ্ঠ ভেসে এলো ছোটো চাচ্চু, এসেছে ইউভি গভীর কণ্ঠে বলল অপেক্ষা করতে বল।৷ ব্রো আগামী দুই ঘণ্টার মধ্যে একটা পোকাও যেন আমার রুমে না আসে। মনে থাকে যেন কথাটা।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮৪