লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫২
নুসাইবা আরা নুরি
খোলা বারান্দায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে তুহিন আর মিলি।দুজনের চোখ ই পুর্নিমার ঝলমলে চাদের দিকে।তোহা ঘরে ঘুমাচ্ছে।মেহেরাজের নেওয়া এই ফ্লাটে তিনটা বেড রুম একটা কিচেন আর আর একটা বিশাল ডাইনিং আর ছোট একটা লাইব্রেরি আছে।তোহা আর মিলি একটা ঘরে ঘুমিয়েছে।মেহেরাজ আর শ্রেয়সী এক ঘরে আর তুহিন আর ইভান এক ঘরে।
তবে তুহিনের আজ ঘুম আসছিলো না তাই মিলিকে নক দিয়েছিলো।যেহেতু মিলি রা যে ঘরে আছে সে ঘরের সাথে এটাস্ট বারান্দা আছে তাই মিলি তুহিন কে ওখানেই ডেকেছে।তুহিম ও আর অপেক্ষা করেনি সাথে সাথে চলে এসেছিলো বারান্দায়।
দুজনের মাঝে তেমন দুরত্ব নেই হাতের উপর হাত রাখা।মিলি আকাশের দিকে তাকিয়ে বেশ জোরে হতাশাভরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
-দুনিয়াটা কত আজব তাই না তুহিন??
মিলির কথায় তুহিন অবাক হয়।আজ কেমন যেনো শোনালো মিলির কন্ঠস্বর।তুহিন মিলির দিকে তাকিয়ে বলে,
-কি হয়েছে তোর??
-উহু কিছু না।
-মন খারাপ লাগছে??
তুহিনের কথায় মিলি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে।তারপর তুহিনের দিকে না তাকিয়েই বলে,
-যার কাছে তোদের মতো একটা বন্ধুর মতো পরিবার আছে তার কি মন খারাপ হতে পারে।আমার তো ভাগ্য খারাপ।
বলতে বলতেই মিলির চোখ বেয়ে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে।চাদের উজ্জল আলোয় তা চোখ এড়ায় না তুহিনের।তুহিন মিলির হাত ছেড়ে দুই বাহুতে হাত রেখে বলে,
-এই কাদছিস কেন তুই।কি হয়েছে বল আমাকে।কিসের ভাগ্য খারাপ??
-ভালো লাগছে না কিছু।সব কিছুই কেমন যেনো লাগছে।মনের মাঝে কোথাও শান্তি পাচ্ছি না।অবাধ্য মন নিজের আয়ত্তে থাকতে চাইছে না আর।
-পরিবারের কথা মনে পড়ছে??
-যে মেয়েটার বেড়ে উঠা অনাথ আশ্রমে তার কিভাবে পরিবারের কথা মনে পড়তে পারে।তোরাই তো আমার সব।আমার পরিবার আমার ভালো থাকা।
-তাহলে কাদছিস যে।
তুহিনের কথায় মিলি চুপ করে গেলো।বুকের বা পাশ টা চিনচিনে ব্যাথা করছে।মেয়েরা বরাবর কথা চেপে রাখার এক অশেষ গুন নিয়ে জন্মায়।তবে মিলি আর পারছে না।দোম বন্ধ হয়ে আসছে ওর।মিলিকে চুপ থাকতে দেখে তুহিন মিলিকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরএ।পরক্ষনেই মিলি ভেউভেউ করে কেদে ফেলে। তুহিন চমকে গিয়ে মিলিকে ছাড়াতে চাইলো তবে পারলো না।বুজতে চাইলো কি হয়েছে মিলির।
বেশ কিছুক্ষন কাদার পর মিলি শান্ত হওয়ার পর তুহিন মিলির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
-কি হয়েছে তোর বল আমাকে।তুই জানিস তুই কাদলে আমার কেমন লাগে।প্লিজ কাদিস না এবার অন্তত বল কি হয়েছে???
-কিছুই হয়নি।তবে হবে।
-কি হবে??
মিলি একটা তাচ্ছিল্য হাসি দিয়ে তুহিনকে ছেড়ে দেয়।তারপর কিছুটা দূরে সরে গিয়ে আকাশের চাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
-ছোট থেকে হতভাগা আমি ভাগ্য টা এতোটা খারাপ যে।জ্ঞান বুদ্ধি হবার পর বাবা মা নামক মানুষ টাকে দেখেনি।বেড়ে উঠেছি অনাথ আশ্রমে।নিজের ইচ্ছা গুলো কখোনো পুরন করতে পারিনি।তবে আল্লাহ তোদের পাইয়ে দেই আমার জীবনে এক সময়।তারপর মেহেরাজের কারনে এই জব টা পেয়েছিলাম।আমার ছোট্ট স্বপ্ন পুরন করে দিলো ও।আসলেই নিলয় আঙ্কেল খুব ভালো তার জন্য আমি আজ এখানে।ধীরে বন্ধুত্ত্বের আড়ালে তোর প্রতি দুর্বল হয়ে গেলাম।তবে নিজের অনুভুতি প্রকাশ করার আগেই তুই আমাকে প্রপোজ করলি।বন্ধুর আড়ালে ভালোবাসা হয়ে গেলো।তারপর তোর সাথে বিয়েটাও হলো।তবে দেখ আমার ভাগ্য টা কত খারাপ আর তিন দিন পর দুই বছর হবে।আমাদের বিয়ের অথচ আজ অব্দি মেহেরাজ ব্যাতীত কেও জানলো না।তোর বৈধ বউ হয়েও কারোর সামনে তোর হাতটাও ধরতে পারি না।আমার অনেক সংসার করার সখ তুহিন।তোর হাত ধরে সারাজীবন বাচার সখ আমার।তবে হয়তো সেই সপ্ন পুরন এর আগেই আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে ফেলবো।
-মিলিইই।
তুহিন এতক্ষন সব শুনলেও শেষ কথায় রেগে ধমক দেয় মিলিকে।তারপর মিলির হাত ধরে নিজের সামনে টেনে এনে দাড় করিয়ে রাগী কন্ঠে বলে,
-আর একবার এসব কথা বললে আমি নিজেই তোকে মেরে ফেলবো।তুই জানিস না।কেন আমাদের এতো দুরুত্ব??
তুহিনের কন্ঠে মিলি কেদে দেয় এবার।মাটিতে বসে পড়ে নিঃশব্দে ফুফিয়ে উঠে তারপর চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলে,
-আমার মন আর মানতে চাই না সত্যিই। বিয়ে না হলেও এই দুরুত্ব মানতে পারতাম তবে এখন আর পারি না।দোম আটকে আসে আমার।হুটহাট মন খারাপ হলে তোর বুকে মুখ গুজে থাকতে ইচ্ছা করে।তবে পারি না আমি।কেন।আমাদের এতো দুরুত্ব কেন।
তুহিন হাটু গেড়ে মিলির সামনে বসে।তারপর হাত দিয়ে মিলির চোখ মুছিয়ে দিয়ে শান্ত অথচ অপরাধী কন্ঠে বলে,
– সত্যি পাখি তুই জানিস না আমাদের এতো দুরুত্ব কিসের।আমি তো কথা দিয়েছি তোকে।আমার জন্য আমার আদরের বোনটা নিজের ভালোবাসার মানুষকে বিষর্জন দিয়ে বিয়ে করলো সিয়াম কে।শুধুমাত্র বাবা মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ এর জন্য।তার পর এই মিশন। মিশন টা শেষ হলে আমার বোনটাকে হাতে না ধরে পায়ে ধরে হলেও ইভানের হাতে ওর ভালোবাসার মানুষের হাতে তুলে দিবো।তারপর তোকে নিজের ঘরে তুলবো।আমি আমার বোনটাকে আগে সুখে দেখতে চাই।নিজের সুখ চিন্তা করি না।আমার কষ্ট হয় না।মেহেরাজ যখন আমার নাম নিয়ে তোরে ডাকে কেও না বুজলেও আমি বুঝি মেহেরাজের কথা।বিয়ে করার পরেও তোকে ছেড়ে এই ২ বছর কিভাবে রয়েছি আমি। সেটা শুধু আমি জানি অন্য কারোর বোঝার ক্ষমতা নেই।তুই তো পাগলী তুই তো আরো বুজিস না আমার ব্যাথা।
শ্রেয়সী বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায় মোবাইলের বক্স টা নিয়ে।তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে যায় কাবার্ডের দিকে।তারপর কাবার্ড এর একটা ড্রয়ার খুলে একটা প্লাজু আর টপ্স বের করে নেয় পরার জন্য।মেহেরাজ শাড়ি চেঞ্জ করে ঘুমাতে বলেছে ওকে।
শ্রেয়সী মোবাইল এর বক্স টা কাবার্ডের উপরে রেখে জামা কাপড় গুলো নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়।তারপর ওয়াশরুমে কাপড় গুলো রেখে আবার বাইরে বেরিয়ে আসে।শাড়িতে লাগানো পিন গুলো খুলতে পারছে না ও।ঘরে এসে বিছানার কাছে গিয়ে চকলেট এর বাক্সটা বেড সাইট টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিলো।তারপর ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাড়ালো শ্রেয়সী।পুর্নিমার চাঁদের আলো আর ঘরের ভিতর জ্বলতে থাকা নীলাভো বাতিতে স্পষ্ট নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পারছে শ্রেয়সী।
আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই লজ্জা পেলো শ্রেয়সী।আড়চোখে আয়নার ভিতর দিয়েই তাকালো বিছানায় বসে থাকা মেহেরাজের দিকে ।মেহেরাজ তার দিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই কখন থেকে।পর্যবেক্ষন করছে তার কার্যকলাপ।শ্রেয়সী বেশ লজ্জা পেয়ে সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিলো।
শাড়িতে লাগানো পিন গুলো খোলার চেষ্টা করলো।পিঠেএ ব্লাউজের সাথে শাড়িতে এমন ভাবে পিন মারা যে শ্রেয়সী কোনো মতেই খুলতে পারছে। অনেক চেষ্টা করার পর ব্যার্থ হয়ে মাথা নিচু করে তাকালো মেহেরাজের দিকে।মেহেরাজ ভ্রু উচিয়ে কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করতেই শ্রেয়সী মাথা নিচু করে বলে,
-আসলে পিন খুলতে পারছি না।কোনো মতেই খুলছে না।একটু কগুলে দিবেন।
শ্রেয়সীর কথায় মেহেরাজ নিজের হাতে থাকা মোবাইলের স্ক্রীনের দিকে একবার তাকালো।সাথে সাথে ঠোঁটে ফুটে উঠলো এক রহস্যময় হাসি।মিলিয়ে গেলো নিমিষেই।মেহেরাজ ফোন টা বেড সাইট টেবিলের উপর রাখতেই চোখ গেলো দুধের গ্লাসের উপর।সাথে সাথে ভ্রু কুচকে বলল,
-দুধ কে দিয়েছে??
-মিলি আপু।বলেছে অর্ধেক আপনাকে দিতে আর অর্ধেক আমাকে খেতে।খেলে নাকি..
-খেলে কি??
শ্রেয়সী লজ্জায় পড়ে যায়।তারপর শান্ত গলায় বলে,
-মহব্বত বাড়ে।
শ্রেয়সীর কথায় আসে মেহেরাজ।তারপর মনে বিড়বিড় করে বলে,
-লিলিপুটের বাচ্চা যা করেছিলো তাতে মহব্বত না ঘুম বেড়ে যেতো।আমারে বলদ পেয়েছে।ফাহিমের মতো নিজের বাসর নষ্ট করবো নাকি।এতো সহজ।
মেহেরাজের ভাবনার মাঝেই শ্রেয়সী আবারো মৃদু কন্ঠে ডেকে উঠলো,
-কি হলো একটু খুলে দিন পিনটা।
মেহেরাজের ধ্যান ভেঙে গেলো।ঠোঁট কামড়ে এগিয়ে এলো শ্রেয়সীর পিছনে।আয়নায় শ্রেয়সী দেখতে পেলো মেহেরাজ তার পুরোপুরি পিছনে।শ্রেয়সী শুকনো একটা ঢোক গিললো।মেহেরাজ ঠোঁট কামড়ে ধরে পিন টা খুলে দিয়ে হটাত নিজের বাম হাত শ্রেয়সীর পেটে চেপে ধরলো।কেপে উঠলো শ্রেয়সী।চোখ বুজে নিলো সাথে সাথে।
মেহেরাজ পিনটা ড্রেসিং টেবিলের উপর চেলে দিয়ে শ্রেয়সী পেট ধরে নিজের আরো কাছে টেনে নিলো।শ্রেয়সীর পিঠ এসে ঠেকেছে মেহেরাজের বুকে।শ্রেয়সী চোখ বুজে ভয়ে লজ্জায় কাপছে।মেহেরাজ আয়নায় শ্রেয়সীর মুখটা একবার দেখে নিয়ে মাথা নিচু করে শ্রেয়সী কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে নেশালো কন্ঠে ফিশফিশ করে বলল,
-অলরেডি টুয়েন্টি টু মিনিট পার হয়ে গেছে সুইটহার্ট। আমি টাইম দিয়েছিলাম টেন মিনিট। এর ভিতরে ড্রেস চেঞ্জ করে আসলে তুমি যা বলবা তাই হবে।বাট না পারলে…
মেহেরাজ নিঃশব্দে হেসে উঠলো।শ্রেয়সীর গা কাটা দিয়ে উঠলো।এক অজানা অনুভুতিতে।গায়ের পশম গুলো দাঁড়িয়ে গেলো।মেহেরাজ শ্রেয়সীর খোপা করা চুল গুলো ছেড়ে দিলো সাথে সাথে কোমর ছাড়িয়ে গেলো চুল গুলো।মেহেরাজ শ্রেয়সী ঘাড় থেকে চুল গুলো সরিয়ে সেখানে নির্লিপ্ত ভাবে চুমু খেলো।আবারো কেপে উঠলো শ্রেয়সী।
মেহেরাজ চোখ বুজে একটা শ্বাস নিলো।হৃদস্পন্দন গতি বাড়তে শুরু করছে ধীরে।মেহেরাজ শ্রেয়সীর গলায় আস্তে করে একটা কামড় বসালো।শ্রেয়সী ব্যাথায় চোখ মুখ কুচকে নিলো তবে বাধা নিলো না।তা দেখে মেহেরাজ আরো পেয়ে বসলো।উন্মাদ হতে শুরু করলো। মেহেরাজ শ্রেয়সীর কানের কাছে নেশাক্ত গলায় ফিশফিশ করে বলে উঠলো,
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৫১
-আজ বড্ড অসভ্য হতে চাই বউ।যতটা অসভ্য হলে আমাদের মাঝে একটা সুতা প্রবেশ এর যায়গা থাকবে না।যতটা অসভ্য হলে তোমার শরীরে আমার দেওয়া ভালোবাসার ক্ষত থাকবে।খুব খুব কাছে পেতে চায় তোমাকে আজ খুব।
মেহেরাজের কথায় শ্রেয়সী কেপে উঠে।পিটপিট করে চোখ খুলে আয়নায় তাকায় মেহেরাজের নেশালো কাতর চোখের দিকে।শ্রেয়সী সেখানের নিজের স্পষ্ট সর্বনাশ দেখতে পাচ্ছে।মেহেরাজ ঠোঁট কামড়ে আয়নার ভিতরে চোখ টিপ দিতেই শ্রেয়সী লজ্জায় চোখ বুজে নিলো।মেহেরাজ যা বুজার বুজে গেলো এতেই।আর এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে কোলে তুলে নিলো শ্রেয়সীকে।
শ্রেয়সী ভয় পেয়ে গেলো।চোখ মুখ খিচে এক হাত দিয়ে মেহেরাজের বুকের কাছের টিশার্ট খামচে ধরলো সজোরে।আর অন্য হাত দিয়ে মেহেরাজের বাহু চেপে ধরতেই নখ ডেবে গেলো মুহুর্তেই।তবে হুসে নেই মেহেরাজ।
