Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৮২

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮২

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮২
সুমাইয়া ইসলাম নূর

ভোরের নরম আলো ধীরে ধীরে চৌধুরী ভিলার চারপাশের অন্ধকারকে সরিয়ে দিচ্ছে। পূর্ব আকাশে ফিকে আলো ফুটে উঠেছে। রাতের নিস্তব্ধতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি, তবে পাখিদের মৃদু ডাক আর দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা ফজরের আজানের শেষ সুর মিলিয়ে চারপাশে এক শান্ত, পবিত্র আবহ তৈরি হয়েছে। বিশাল চৌধুরী ভিলার জানালাগুলোতেও ভোরের সেই কোমল আলো এসে পড়েছে।ঘরের ভেতরটাও বেশ নীরব। ইউভি চোখ বন্ধ করে খাটের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে। তার বুকের মাঝখানে গুটিসুটি মেরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে ইনায়া।
দেখতে দেখতে তার গর্ভাবস্থার আট মাস পূর্ণ হয়েছে এই দীর্ঘ সময়টাতে রাতগুলো যেন ইনায়ার জন্য আগের মতো সহজ নেই। পায়ের ব্যথা, কোমরের যন্ত্রণা আর শরীরের নানা অস্বস্তির কারণে বেশিরভাগ রাতেই ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না সে।এদিকে ইনায়ার প্রতিটি কষ্ট যেন ইউভির নিজের কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাতভর যতটুকু সম্ভব তার ব্যথা কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে সে। সবসময় বুকের মাঝে টেনে নিয়ে অত্যন্ত যত্নে আগলে রাখে, যেন তার সামান্য অস্বস্তিটুকুও ইউভির চোখ এড়িয়ে না যায়।

এই মুহূর্তেও ঘুমন্ত ইনায়ার দিকে গভীর চিন্তায় তাকিয়ে আছে ইউভি। তার চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ। অসহায়ভাবে নিজের বুকের সঙ্গে লেপ্টে থাকা প্রিয় মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।গর্ভাবস্থার পাঁচ মাসের শেষদিকে তুবা তাকে ইনায়ার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা জানিয়েছিল। ইনায়ার এই গর্ভাবস্থা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তাকে খুব সাবধানে রাখতে হবে, নিয়মিত চেকআপের মধ্যে রাখতে হবে এবং সামান্য কোনো সমস্যা দেখা দিলেও অবহেলা করা যাবে না।
সেই কথাগুলো মনে পড়তেই ইউভির গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো। ঘুমন্ত ইনায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল। এতদিন ধরে সে প্রতিটি মুহূর্তে চেষ্টা করেছে ইনায়ার কষ্টটা যতটা সম্ভব নিজের হাতে কমিয়ে দিতে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, শুধু পাশে থাকা আর যত্ন নেওয়াই যথেষ্ট নয়।
ইউভি ধীরে ধীরে ঝুঁকে ইনায়ার কপালে খুব ছোট্ট একটি চুমু এঁকে দিল। তারপর অত্যন্ত নরম স্বরে ফিসফিস করে বলল আমার আদর… আমি তোমাকে আর কষ্ট পেতে দেব না। আমি আছি তো। তোমার কিছু হতে দেব না, ইনশাআল্লাহ।

কথাগুলো বলার পরও কিছুক্ষণ সে চুপচাপ ইনায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সাবধানে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল, যাতে ঘুমটা না ভাঙে। বালিশটা ঠিক করে দিয়ে আরও একবার তার দিকে তাকাল ইউভি। এরপর ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।নিচে এসে প্রথমেই তুবাকে ফোন করল সে। কয়েক মুহূর্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার পর ফোনটা রেখে ইউভি সরাসরি রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে রেশমা চৌধুরীকে দেখতে পেয়ে কিছুক্ষণ নীরব দাঁড়িয়ে থেকে বলল
— “মা… মেজো মা… আমি নূরকে আজ চেকআপে নিয়ে যাচ্ছি। ডাক্তার যদি আজই অপারেশন করতে বলে, তাহলে আমি আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করব না।

কথাটা বলতে গিয়ে ইউভির গলায় জমে থাকা কষ্ট স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে কিছুক্ষণ থেমে আবার ভারী কণ্ঠে বলল গত মাসেই ডাক্তার অপারেশনের কথা বলেছিল। কিন্তু আমি তখন বাচ্চার কথা ভেবেছি আমার আদরের কথা, ওর কষ্টের কথা না ভেবে… স্বার্থপরের মতো বাচ্চাটার ওজন আরেকটু বাড়ার অপেক্ষা করেছি। ভেবেছিলাম আর একটু সময় গেলে হয়তো ওর জন্য ভালো হবে। কিন্তু এখন
কথাটা শেষ করতে পারল না ইউভি। চোখ নামিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে বলল আমি আর ওর কষ্ট সহ্য করতে পারছি না, মা। প্রতিটা রাতে ওকে ব্যথায় কষ্ট পেতে দেখি অথচ আমি কিছুই করতে পারি না।
এবার ডাক্তার যা বলবে, সেটাই করব। নূরের কষ্টের বিনিময়ে আর কোনো অপেক্ষা নয়। রেশমা চৌধুরী ছেলের কষ্টভরা মুখের দিকে তাকিয়ে মমতাভরা কণ্ঠে বললেন তুই নিজেকে দোষ দিস না, ইউভি। তুই তো রাজি হোসনি। আমরাই তোকে জোর করেছিলাম। তখন সবাই ভেবেছিলাম আর কিছুদিন অপেক্ষা করলে হয়তো বাচ্চাটার জন্য ভালো হবে। তুই একা এই সিদ্ধান্তের ভার নিজের ওপর নিস না বাবা। রেশমা চৌধুরীর কথায় ইউভি কিছু বলল না। শুধু গভীরভাবে চোখ বন্ধ করে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

ঠিক তখনই পিয়াসা রেদোয়ান আর ছোট্ট প্রণয় নিচে নেমে এলো। ইউভি পিয়াসার দিকে তাকিয়ে বলল বোনু, রেডি হতে হবে। আদরকে নিয়ে আজ চেকআপ এ যেতে হবে। পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল “হ্যাঁ, ভাইয়া, যাব। তুবার সঙ্গে মাএ কথা বলেছি। ইউভি কিছুক্ষণ নীরব থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল ভালো লাগছে না, বোনু। সবকিছু কেমন এলোমেলো লাগছে। পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে ইউভির পাশে এসে দাঁড়াল। ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মমতাভরা কণ্ঠে বলল ভাইয়া, তুমি তো ক্যাপ্টেন। তুমি যদি এভাবে ভেঙে পড়ো, তাহলে কী হবে বলো? শোনো, আমরা সবাই মিলে ওকে হাসিখুশি রাখব। ও যেন কিছুই বুঝতে না পারে। ওকেবুঝতেই দিব না ওর সাথে কি হচ্ছে ইউভি মৃদু হেসে বল হুম।
ঠিক তখনই প্রণয় ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলে উঠল—
তই দাবে, মা?ইউভি সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট প্রণয়কে কোলে তুলে নিল। তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে মৃদু হেসে বলল তোমার উত্তেকে আনতে।”
প্রণয় খিলখিল করে হেসে উঠল। আমাল উত্তে আদবে, বাবাই!ইউভি মুচকি হেসে প্রণয়ের নাকে আলতো করে ছোট্ট একটা টোকা দিয়ে বলল।হ্যাঁ।”
পিয়াসা দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল বিষয়টা কী বলো তো? ইচ্ছে কবে থেকে ওর হলো?

প্রণয় আবার নিজের মতো করে বলল উত্তে তো আমাল খেলনা বাাবাই বলেতে।
ছোট্ট প্রণয়ের সরল কথায় মুহূর্তের জন্য চারপাশের ভারী পরিবেশটাও যেন একটু হালকা হয়ে গেল। উপস্থিত সবাই হেসে উঠল। ইউভির মুখেও ফুটে উঠল মৃদু হাসি।ঠিক তখনই নুসরাত চৌধুরী এগিয়ে এসে ইউভির পাশে দাঁড়ালেন। ছেলের মুখের দিকে স্নেহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন।ইউভি বাবা, তুই নিজেকে শক্ত রাখিস। এভাবে ভেঙে পড়িস না। আজ নূরকে কিছুই বুঝতে দেওয়া যাবে না। ওর অপারেশন করাতে হলে করাতে হবে, কিন্তু তার আগে ওকে কোনোভাবেই দুশ্চিন্তায় ফেলা যাবে না। মায়ের কথাগুলো নীরবে শুনল ইউভি। তারপর ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বলল ঠিক আছে। আমরা কিছু সময় পরই বের হচ্ছি।”

গাড়ির ভেতরটা তখন বেশ শান্ত। ইউভি গভীর মনোযোগে গাড়ি চালাচ্ছে আর পাশে বসে ইনায়া মনের আনন্দে তাদের অনাগত সন্তানকে নিয়ে নানা কথা বলে চলছে মাঝে মাঝেই নিজের পেটের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। হঠাৎ পেটের ভেতর থেকে জোরালো একটা নড়াচড়া অনুভব করতেই ইনায়া একটু বিরক্ত হয়ে বলল এই! তোমার ইচ্ছেটাকে বলো তো আমাকে একটু কম লাথি দিতে! মনে হচ্ছে পেটের ভেতর বসে গেম খেলছে!”
ইনায়ার কথা শুনে ইউভি মুচকি হাসল। পরক্ষণেই গাড়ির গতি কমিয়ে নিরাপদে পাশে থামিয়ে দিল। তারপর এক হাত বাড়িয়ে ইনায়ার পেটের ওপর আলতো করে হাত রাখতেই ভেতর থেকে যেন আবারও ছোট্ট একটা নড়াচড়া অনুভূত হলো। ইউভির মুখে সঙ্গে সঙ্গে আনন্দের হাসি ফুটে উঠল।
একদম মায়ের মতোই হবে। চঞ্চল আর দুষ্টু!

কথাটা শুনে মুহূর্তেই ইনায়ার কণ্ঠের সমস্ত বিরক্তি যেন কোথায় মিলিয়ে গেল। গলা নরম হয়ে এলো তার । সে মৃদু হেসে বলল বর…ইউভি তার পেটের ওপর হাত রেখেই মায়াভরা কণ্ঠে বলল বলো, বউ। তুমি রাতে জেগে জেগে ইচ্ছের সঙ্গে গল্প করো, তাই না?
ইনায়া কিছু বলার আগেই ইউভি মুচকি হেসে আবার গাড়ি চালু করল। কিছুটা পথ এগিয়ে যেতে যেতে বলল হুম। আমরা দুজন কিন্তু অনেক কিছুই প্ল্যান করে ফেলেছি। এখন শুধু আমাদের সেই পরিকল্পনাগুলো একে একে পূরণ করার অপেক্ষা।”

ইনায়ার ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।তারপর খানিকটা অভিমান মিশিয়ে বলল যেদিন থেকে জেনেছ তোমার মেয়ে হবে, সেদিন থেকেই তো আকাশে উড়ছ। বুঝতে আর বাকি নেই, মেয়ে আসার পর আমাকে আর পাত্তাই দেবে না।ইউভি ইনায়ার এমোন কথাই হেসে ফেলল। ইনায়া আবার বললো বর আমার না ইউভি কিছু বলার আগেই ইনায়া দ্রুত ফোনটা হাতে তুলে নিল। তারপর পিয়াসার নম্বরে কল করে বলল বেবি, মন্টু চাচার দোকানে চলে আয়। আমরা ওখানেই যাচ্ছি।”
কথা শেষ করে তুবাকেও ফোন করে একইভাবে ডেকে নিল সে।ইউভি অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো আদর, আমরা কিন্তু হসপিটাল এ যাচ্ছি।
ইনায়া একেবারে নির্দ্বিধায় মুচকি হেসে বলল ইচ্ছের অনেক আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে। মন্টু দাদুর দোকানের আইসক্রিম! ইউভি নিজের মনেই বললো বেয়াদব! কী আর সাধে বলি?
কিছুক্ষণ পর একে একে তিনটি গাড়ি এসে থামল মন্টু চাচার দোকানের সামনে। ইনায়াদের গাড়ি থামতেই দোকানের ভেতর থেকে মন্টু চাচা তাড়াহুড়ো করে বাইরে বেরিয়ে এলেন। বহুদিন পর প্রিয় মানুষগুলোকে একসঙ্গে সামনে দেখে আনন্দে তাঁর চোখের কোণে পানি চিকচিক করে উঠল। মুখে অভিমানের ছাপ থাকলেও চোখের সেই পানি যেন তাঁর মনের সমস্ত ভালোবাসার কথাই বলে দিচ্ছিল।

পিয়াসা ছোট্ট প্রণয়কে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তুবা তার ছেলে তুর্যকে নিয়ে ইনায়ার পাশে এসে দাঁড়াল। আর ইনায়া একটু আড়াল করে ইউভির পাশে দাঁড়িয়ে মন্টু চাচার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।
মন্টু চাচা অভিমান করে বললেন এখন আর আইসক্রিম আর চা বিক্রি করি না। আপনারা বোধহয় ভুল জায়গায় চলে এসেছেন। কথাটা এমনভাবে বলা হলো যে তাঁর অভিমানটা বুঝতে কারও আর বাকি রইল না।পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট প্রণয়কে কানে কানে কিছু একটা শিখিয়ে দিল। প্রণয়ও এক মুহূর্ত দেরি না করে মিষ্টি গলায় বলল—
দাদুভাই, একতা তকলেত নিয়ে আতো মন্টু চাচা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। সঙ্গে সঙ্গে পেছন ফিরে চোখ মুছতে মুছতে বললেন অসভ্যর দল! তোমরা খুব ভালো করেই জানো, আমার দুর্বলতা কোথায়! কথাটা বললেও তাঁর গলায় লুকিয়ে থাকা হাসিটা স্পষ্ট বোঝা গেল।এরপর তিনি ছোট্ট প্রণয় আর তুর্যকে দুহাতে কোলে তুলে নিয়ে আদরে ভরিয়ে দিতে লাগলেন। তাঁর মুখের অভিমান মুহূর্তেই গলে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল নিখাদ স্নেহ।

পেছন থেকে ইনায়া হেসে চিৎকার করে বলল এই যে, মন্টু চা! তিনটা চা আর আইসক্রিম নিয়ে আসো। অনেক ফাঁকি দিয়েছ!এবার ইউভিও নীরবতা ভেঙে মুচকি হেসে বলল যান চাচা, আগে ওকে আইসক্রিম আর চা এনে দিন। না হলে পাগল হয়ে যাবে। মন্টু চাচা যেতে যেতে বললেন তোমাদের জন্য কী আনব বলো? রেদোয়ান মুচকি হেসে বললআমরা কিছু খাব না, চাচা। মূলত বোনুর আবদার পূরণ করার জন্যই আমরা এখানে এসেছি। আজ যে বোনুর অপারেশন, বোনুর জন্য একটু দোয়া করবেন, চাচা। কথাটা শুনে মন্টু চাচা থেমে গেলেন। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়ার দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখ দুটো আবারও স্নেহে ভিজে উঠল। ধীর কণ্ঠে বললেন ওরা তিনজন যে আমার কতটা আপন, তোমাদের আমি কী করে বোঝাব? ক্লাস নাইন থেকে ওরা আমাকে জ্বালিয়ে আসছে। ওদের জ্বালাতন ছাড়া যে আমি এখন একটুও ভালো নেই। ইনায়া মা দেশে ছিল না বলে তুবা আর পিয়াসাও আসত না । আর যখনই ইনায়া দেশে আসত, তখনই ওদেরও দেখা পেতাম।
একটু থেমে তিনি মমতাভরা চোখে তিনজনের দিকে তাকালেন।ওদের গুরুত্ব আমার জীবনে অনেক বেশি। তোমাদের সাহায্যেই তো কাঠের ছোট্ট দোকান থেকে আজ এত সুন্দর একটা বিদেশি ধাঁচের দোকান দিতে পেরেছি। একটু জমি রেখেছি, বাড়ি করেছি। বউ আর পোলাডার নিয়ে ভালো আছি। পোলাডা হাফেজি পড়ছে, ইনশাআল্লাহ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। জীবনে যা পেয়েছি, তার পেছনে তোমাদের অবদানও কম না। ইনায়ার আবারও অধৈর্য হয়ে বলে উঠল মন্টু চাচা, আইসক্রিম কই? আনো! ইউভি মুচকি হেসে মন্টু চাচার দিকে তাকিয়ে বলল চাচা, আগে যান।

ইনায়া, তুবা আর পিয়াসা তিনজন মনের সুখে আইসক্রিম আর চা খাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে তারা এতটাই মেতে উঠেছে যে সময়ের কথা যেন কারও মনেই নেই । তুবা হঠাৎ পেছনে ফিরে গাড়ির দিকে তাকাতেই রাজ্জো হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দিল, অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে, এবার আসতে হবে।তুবা পড়ল মহা বিপদে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে দেখলো সে মনের সুখে খাচ্ছে আবারও গাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, ইউভি, রেদোয়ান, রাজ্জো আর মন্টু চাচা দাঁড়িয়ে আছেন। তুবা এবার অসহায় চোখে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল বেবি…
ইনায়া তখনও আপনমনে আইসক্রিম খাচ্ছে তুবা মুচকি হেসে বললো এই কুত্তি বলছি যে, তোর হয়েছে।ইনায়া খেতে খেতেই উত্তর দিল না হলে তো দেখতেই পেতি, কান্না করত!তুবা এবার হাসবে, নাকি কাঁদবে সেটাই বুঝতে পারল না কি প্রশ্ন করল আর কি উত্তর দিল । বিরক্ত হয়ে বলল শয়তান চেমড়ি! আমি খাওয়ার কথা বলছি । তোর খাওয়া হয়েছে, সেটা বলছি। পিয়াসার ও ধর্যের বাধ ভেঙে বললো বেবি ইচ্ছে কে , তো বাইরে বের করতে হবে, নাকি? চল।

ইনায়া যেন তুবা আর পিয়াসার কোনো কথাই শুনল না। বরং কিছুক্ষণ পর তার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল কেন? তুই আর খাবি না? তুবা সঙ্গে সঙ্গে বলল না। ইনায়া বিন্দুমাত্র দেরি না করে বললতাহলে দে, তোর আইসক্রিমটাও আমি খাচ্ছি। পিয়াসা এবার ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু বিরক্তির সঙ্গে বলল প্লিজ, থাম। তোর বাচ্চাটার ঠান্ডা লেগে যাবে। পিয়াসার কথা শুনে ইনায়া খাওয়া থামিয়ে তার দিকে তাকাল। তারপর অভিমান মেশানো কণ্ঠে বলল গাছের চিন্তা নেই তোদের ফল নিয়ে টানাটানি করছিস! বাহ বুঝে গেছি, আপন মানুষগুলো যে এমন শত্রুতে পরিণত হবে, সেটা বুঝতেই পারিনি। বুঝে গেছি আমার বরের মতো তোরা ও ইচ্ছেকে পেয়ে আমাকে ভুলে যাবি!”কথাটা শেষ করেই ইনায়া আবার আইসক্রিম খেতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর পিয়াসার দিকে তাকিয়ে বলল কীরে, তুই ও খাবি না কী? পিয়াসা না বলতেই ইনায়া আবার বলল না খেলে তোরটাও দে।

দূর থেকে ইনায়ার এই কাণ্ড দেখছিল ইউভি। এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। দ্রুত পায়ে ইনায়ার কাছে এসে নরম কণ্ঠে ডাকল আদর…”
তারপর মমতাভরা অথচ খানিকটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল ওঠো। অনেক খেয়েছ। বুঝতে পারছ না কেন? সকাল দশটার আগেই তোমার একটা চেকআপ করতে হবে, আর সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
ইউভির কথা শুনে ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে কাঁদো কাঁদো মুখ করে ফেলল। ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানী কণ্ঠে বলল ধুর! কেউ ভালোবাসো না আমাকে। থাকো তোমরা। আর ভালো লাগে না।কথাটা বলেই ইনায়া আর কারও দিকে না তাকিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।

সকাল গড়িয়ে ধীরে ধীরে দুপুর হয়ে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর অবশেষে ইনায়ার সব রিপোর্ট তুবার হাতে এসে পৌঁছাল। রিপোর্টগুলো হাতে পাওয়ার পর থেকেই তুবার মুখের হাসিটা যেন কোথায় মিলিয়ে গেল। একের পর এক রিপোর্ট খুব মনোযোগ দিয়ে দেখেও যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে। শেষ পর্যন্ত আর দেরি না করে ইউভিকে নিজের চেম্বারে ডেকে পাঠাল।ইউভি চেম্বারে ঢুকতেই তুবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। সে ধীর পায়ে এসে তুবার সামনে বসতেই তুবা কিছুক্ষণ নীরব থেকে রিপোর্টগুলো তার দিকে এগিয়ে দিল। তারপর মমতাভরা কণ্ঠে বলল
জিজু, আমি রিপোর্টগুলো খুব ভালোভাবে দেখেছি। কিছু বিষয় আমাদের একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। ইনায়ার প্রেগন্যান্সিটা শুরু থেকেই একটু ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, আর এখন রিপোর্ট অনুযায়ী ওর অবস্থা এমন একটা পর্যায়ে এসেছে যেখানে আর বেশি অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। একদিন ও ব না।ইউভির বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল। সে উৎকণ্ঠিত চোখে তুবার দিকে তাকিয়ে রইল।
তুবা ধীরে ধীরে বলল ইনায়ার বাচ্চার ওজন প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা কম আছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা যেন আর কোনো ঝুঁকি না নিই। বাচ্চাটা এখনও প্রিম্যাচিউর হওয়ার মতো ছোট, তাই আমাদের খুব সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু ইনায়ার বর্তমান অবস্থাটা বিবেচনা করে আমি মনে করছি, আজই ওর অপারেশন করানো সবচেয়ে নিরাপদ হবে।

কথাগুলো শুনে ইউভি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। তার মুখের সমস্ত চিন্তা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।তুবা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল।তুমি এত চিন্তা করো না, জিজু। আমি আছি। আমি নিজেই ওর অপারেশন করব এবং চেষ্টা করব সবকিছু যতটা সম্ভব নিরাপদভাবে করতে। তুমি আর আমি যতক্ষণ আছি, ওর মুখের হাসিটুকু এক মুহূর্তের জন্যও মুছে যেতে দেব না।ইউভি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ নামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর নিজেকে শক্ত করে ধীরে ধীরে বলল ঠিক আছে, তুবা। তুমি সব রেডি করো। তুবা মাথা নেড়ে বলল সন্ধ্যায় অপারেশন করতে হবে। তার আগে ইনায়াকে কিছু খেতে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিতে হবে। আর আন্টিদেরও আসতে বলো, যাতে সবাই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে পারে।
ইউভি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল সে। একবার পেছন ফিরে তুবার দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতাভরা কণ্ঠে বলল থ্যাঙ্ক ইউ, তুবা। তুবা মৃদু হেসে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল

সন্ধ্যা নেমে এসেছে । দিনের শেষ আলোটুকু ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে চারপাশে জ্বলে উঠেছে নরম হলুদ আলো। অপারেশন থিয়েটারের সামনে একে একে চৌধুরী পরিবারের সবাই এসে জড়ো হয়েছে। লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রোবিউল চৌধুরী, রেদোয়ান, রেশমা চৌধুরী, নুসরাত চৌধুরী, সাবিহা চৌধুরী, আয়াত, আতিকা, রিদা, পিয়াসা সবাই নীরব হয়ে অপেক্ষা করছে রিমঝিমও অফিসের কাজ শেষ করেই আসবে বলে জানিয়েছে।
এই গভীর দুশ্চিন্তার মাঝেও ছোট্ট প্রণয় যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। পিয়াসার হাত ধরে খেলছে, কখনো আয়াত-আতিকাদের সঙ্গে ছোটাছুটি করছে, আবার মেঝেতে বসে নিজের খেলনা নিয়ে মনের আনন্দে খেলছে। তার নিষ্পাপ খিলখিল হাসি মাঝে মাঝে করিডোরের ভারী নীরবতা ভেঙে দিচ্ছে। পরিবারের বড়রা সেই হাসির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসার চেষ্টা করলেও, সবার চোখের গভীরে একই উৎকণ্ঠাইনায়া আর তার অনাগত সন্তান কে নিয়ে।
অন্যদিকে ইউভি যেন এক মুহূর্তের জন্যও স্থির থাকতে পারছে না। অপারেশন থিয়েটারের দরজার সামনে থেকে করিডোরের এক প্রান্তে যায়, আবার ফিরে আসে। দুহাত কখনো জোড় করে রাখছে, কখনো চুলের মধ্যে আঙুল চালিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে যাচ্ছে। তার চোখ বারবার গিয়ে থেমে যাচ্ছে অপারেশন থিয়েটারের বন্ধ দরজায়।

ছেলের এমন অস্থিরতা কিছুক্ষণ নীরবে লক্ষ্য করলেন লিখন চৌধুরী। অবশেষে ধীরে ধীরে উঠে ইউভির পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাবার উপস্থিতি টের পেয়ে ইউভি ঘুরে তাকাল। লিখন চৌধুরীকে দেখেই যেন মুহূর্তের জন্য নিজের অস্থিরতাটা সামলে নিল সে।এদিকে লিখন চৌধুরীও ছেলেকে কাছে ডেকে এক পাশে রাখা চেয়ারে বসালেন। তারপর স্নেহভরে ইউভির কাঁধে হাত রেখে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন চিন্তা হচ্ছে, বাবা? ইউভি মাথা নিচু করে মৃদু স্বরে বলল হুম…লিখন চৌধুরী ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন আজ নূর তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা দিতে যাচ্ছে, ইউভি। একজন নারী যখন মা হতে যায়, তখন সে শুধু একটা সন্তানকে পৃথিবীতে আনার জন্য কষ্ট সহ্য করে না নিজের সমস্ত শক্তি, সাহস আর ভালোবাসা দিয়ে একটা নতুন জীবনকে পৃথিবীর আলো দেখানোর চেষ্টা করে। আজ তোর আদর ঠিক সেটাই করছে। এতটা কষ্ট সহ্য করে সে তোকে একটা সন্তান উপহার দিতে যাচ্ছে। একটু পর হয়তো তুই প্রথমবারের মতো নিজের সন্তানকে কোলে নেবি,।

আর সেই ছোট্ট মুখটা তোকে ‘একসময় বাবা’ বলে ডাকবে। বিশ্বাস কর, এই একটা ডাকের মূল্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। ইউভি নিঃশব্দে বাবার কথা শুনছিল। লিখন চৌধুরী এবার ছেলের কাঁধে হাত রেখে আরও নরম স্বরে বললেন তুই এতদিন নূরকে শুধু তোর প্রিয় মানুষ হিসেবে আগলে রেখেছিস। কিন্তু আজ থেকে তোদের জীবনটা আরও বড় হয়ে যাবে। নূর শুধু তোর বউ নয়, সে তোদের সন্তানের মা। আর একটা সন্তান পৃথিবীতে আসার পর একজন স্বামীর দায়িত্বও বদলে যায়। তখন শুধু স্ত্রীকে ভালোবাসলেই হয় না, স্ত্রী আর সন্তান দুজনকেই সমান মমতা, যত্ন আর নিরাপত্তায় আগলে রাখতে হয়। একটু থেমে তিনি ইউভির চোখের দিকে তাকিয়ে বললো মনে রাখিস, সন্তান আসার পর নূরের প্রতি তোর ভালোবাসা যেন একটুও কমে না যায়। বরং তখন তাকে আরও বেশি করে বুঝতে হবে।

কারণ যে নারীটা তোকে বাবা হওয়ার আনন্দ দেবে, সেই নারীটার নিজেরও তখন তোকে আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে। রাত জাগা, ক্লান্তি, কষ্ট সবকিছুর মাঝেও ওকে মনে করিয়ে দিবি, ও একা নয়। তুই আছিস।আর তুই পারবি, ইউভি। আমি বিশ্বাস করি, তুই পারবি। তোকে ছোটবেলা থেকে দেখেছি। তুই নূর কে কতোটা যত্নে রাখিস কখনো অযত্নে রাখিসনি। এবার তোর সামনে তোর জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্বটা আসছে। তুই শুধু একজন বাবা হবি না, একই সঙ্গে তোর সন্তানের মায়ের সবচেয়ে বড় ভরসাও হবি। এই দুটো দায়িত্বই তুই ভালোবাসা দিয়ে পালন করবি আমি জানি।
কথাগুলো শুনে ইউভি ধীরে ধীরে বাবার দিকে তাকাল। তার বাবার কথাগুলো যেন তার ভেতরে কোথাও একটু শক্তি জাগিয়ে তুলেছে। সে ধীরে মাথা নাড়িয়ে বললো ঠিক আছে বাবা মনে থাকবে।
অপারেশন থিয়েটারের সামনে সবাই অধীর আগ্রহে বসে আছে। দুশ্চিন্তায় যেন সবার গলা শুকিয়ে আসছে। কারও মুখে কোনো কথা নেই, সবার চোখ স্থির হয়ে আছে অপারেশন থিয়েটারের দরজার দিকে। এখনো অপারেশন শুরু হয় নি সব কিছু রেডি করে তুবা ইউভি ডেকে নিবে।

এরই মাঝে প্রণয় ধীরে ধীরে ইউভির পাশে গিয়ে বসে কাতর কণ্ঠে বলল,বাবাই, আমাল উত্তে কোথায়?”ইউভি সঙ্গে সঙ্গে প্রণয়কে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে নরম গলায় বলল,আর একটু অপেক্ষা করো, বাবাই। এক্ষুনি চলে আসবে।।পিয়াসা দ্রুত এগিয়ে এসে ইউভির কাছ থেকে প্রণয়কে নিয়ে নিল। তারপর ভাইয়ের পাশে বসে তার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল,ভাইয়া, সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি এভাবে ভেঙে পড়ো না।
ভাইয়ের চোখের পানি মুছে দিয়ে প্রণয়কে কোলে নিয়ে একটু দূরে সরে গেল পিয়াসা।প্রণয় আবার পিয়াসার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,মা, উত্তে তখন আতবে?পিয়াসা শান্ত করার চেষ্টা করে বলল,আর একটু পরে, বাবা।কিছুক্ষণ পর আবার ছোট্ট প্রণয় ছুটে এসে পিয়াসার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,ও মা, উত্তে তোই? পিয়াসা হাতের ইশারায় অপারেশন থিয়েটারের দরজাটা দেখিয়ে বলল,
ওই রুমে আছে। প্রণয় সঙ্গে সঙ্গে অপারেশন থিয়েটারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত দরজার দিকে তাকিয়ে আবার দৌড়ে পিয়াসার কাছে ফিরে এসে বলল,উত্তে ওখানে আতে তেন, মা? উত্তে কে এনে দাও।

পিয়াসা এবার প্রণয়কে বুকে জড়িয়ে ধরে মৃদু হেসে বলল বিরক্ত করো না, বাবা। তোমার মিমির অনেক কষ্ট হবে। কিন্তু ছোট্ট প্রণয় যেন কিছুতেই বুঝতে নারাজ। কিছুক্ষণ পর আবার পিয়াসার কাছে এসে অস্থির কণ্ঠে বলে উঠল মা, উত্তে এখনো আসে না কেন? চিন্তায় ভারী হয়ে থাকা পরিবেশের মাঝেও ছোট্ট প্রণয়ের এই পাগলামি দেখে চৌধুরী বাড়ির সদস্যদের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। এত দুশ্চিন্তার মাঝেও শিশুটার সরলতা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য সবার মনটা হালকা করে দিল।
হঠাৎই অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে তুবা বাইরে বেরিয়ে এলো।বাইরে অপেক্ষা করতে থাকা ইউভিকে দেখেই সে বলল জিজু, তুমি আসো। সব রেডি। কথাটা বলেই তুবা দ্রুত ইনায়ার কাছে এগিয়ে গেল। ইনায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদু স্বরে ফিসফিস করে বলল।আজ আমার ডাক্তার হওয়া টা সার্থক হলো।ইনায়া মুচকি হেসে ভ্রু কুঁচকে বলল কেন রে, কুত্তি? তুবা ভেংচি কেটে হেসে বলল মনে আছে, যখন বলতাম আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব, তখন তোরা দুজন বলতিস হ্যাঁ, ডাক্তার হোস। তোর হাতেই আমরা আমাদের ডেলিভারি করাব।’ আজ সেই দিন এসে গেছে রে জানে মান ইনায়াও হেসে মাথা নেড়ে বলল তুই ডেলিভারি করছিস বুঝি কোই আমি তো দেখছি না তুবা এবার একটু সাবধানী গলায় বলল আজ তোর সব দেখব। তুই পারলে আমাকে আটকাস। ইনায়া দ্রুত বলল একটু অসুস্থ আছি বলে যা বলার বলে নে জানে মান সুস্থ হলে তোর বারো টা আনি বাজিয়ে ছাড়বো।

কথার মাঝেই তুবা আবার নিজের পেশাগত গাম্ভীর্যে ফিরে এলো। ইনায়ার অপারেশনের প্রস্তুতি নিতে নিতে হেসে বলল বেবি। কষ্ট পাস না বলেই ইনায়ার পেছনের দিকে অ্যানেস্থেশিয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলো। অপারেশনের আগে তাকে স্পাইনাল অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া হলো, যাতে কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যায় এবং সে ব্যথা অনুভব না করে। তুবা বারবার তাকে আশ্বস্ত করছিল, যেন কোনোভাবেই ইনায়ার মনে ভয় না ঢোকে।
ঠিক তখনই ইউভি অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে প্রবেশ করল।তুবা তাকে ইনায়ার পাশের একটি চেয়ারে বসিয়ে দিল। ইউভি এমনভাবে বসল, যাতে পুরো সময় ইনায়ার মুখটা তার চোখের সামনে থাকে। তার আদরের অস্ত্রোপচার কীভাবে হচ্ছে, সেটা দেখার মতো মানসিক শক্তি তার নেই। সে শুধু ইনায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে চায়, তার সঙ্গে কথা বলতে চায়, তার ভয়টা নিজের কথায় একটু হলেও কমিয়ে দিতে চায়।ইউভি পাশে বসতেই ইনায়া মুচকি হেসে বলল আমি ভয় পাচ্ছি না, বর। এই দেখো, আমি হাসছি। একটুও ভয় করছে না।”

কথাটা শুনে ইউভির বুকটা আরও ভারী হয়ে উঠল। যে মানুষটাকে এই মুহূর্তে সে সাহস দেবে, সেই মানুষটাই উল্টো তাকে সাহস দিচ্ছে!ইউভি নিজেকে শক্ত করে ইনায়ার কপালে আলতো করে চুমু দিল। তারপর তার গালে, কপালে হাত বুলিয়ে দিয়ে শক্ত করে তার হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে ধরে রাখল।
কাঁপা কণ্ঠটাকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল—
আদর, ভাবতে পারছ? আর একটু পরেই তোমার ইচ্ছে তোমার বুকে থাকবে।ইনায়ার ঠোঁটে আবারও মায়াবী হাসি ফুটে উঠল ফিসফিস করে বললো না, বর… তোমার ইচ্ছে।ইউভি কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে নিজের কপালটা ইনায়ার কপালের সঙ্গে ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল আমাদের ইচ্ছে।কথাটা শুনে ইনায়ার চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল অশ্রু।

এদিকে তুবা ও বাকি চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। ইনায়ার শরীরের অপারেশনের অংশটি জীবাণুমুক্ত করে স্টেরাইল ড্রেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো। মনিটরের নিয়মিত শব্দের মাঝে তুবা বারবার ইনায়ার সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছে বেবি, জিজুর দিকে তাকিয়ে থাক কোনো চিন্তা করবি না সব ঠিকঠাক চলছে। ইনায়া ইউভির হাত শক্ত করে ধরে রইল।বর… তুমি আছ তো?”
আমি আছি, আদর। তোমার হাতটা যতক্ষণ আমার হাতে আছে, ততক্ষণ তোমার কিছু নিয়ে ভাবতে হবে না।
অপারেশন শুরু হওয়ার মুহূর্তে তুবা নিজের সব আবেগ একপাশে সরিয়ে কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ঠিক তখনই তার হাত সামান্য কেঁপে উঠল।এমন তো আগে কখনো হয়নি!
কতবার সে অপারেশন করেছে, কত কঠিন পরিস্থিতি সামলেছে কখনো হাত কাঁপেনি। কিন্তু আজ সে পারছে না কেন তুবার চোখের কোণে পানি চিকচিক করে উঠল। একবার সে ইনায়ার মুখের দিকে তাকাল। ইনায়া তখনও ইউভির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে কথা বলছে তুবা আবার নিজেকে সামলে কাজে মন দিল। কিন্তু হাত যেন কথা শুনছে না।
পাশে থাকা আরেকজন চিকিৎসক তুবার অবস্থাটা বুঝতে পেরে শান্ত গলায় বললেন আমাকে দাও। আমি বুঝতে পেরেছি।

তুবা এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ধীরে ধীরে ইনায়ার মাথার কাছে চলে গেল। ইউইউভি তুবা কে দেখে বললো তুবা তুমি।তুবা নিচু হয়ে ইউভির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো সব ঠিকঠাক চলছে।ইনায়া তুবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল কী রে? কী হয়েছে?
তুবা নিজের চোখের পানি সামলে হেসে বলল—
কিছু হয়নি, বেবি। কিছুই হয়নি। হলে কান্না করবে ।”
বলে ইনায়ার মাথাই হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো
ইনায়া চোখ বন্ধ করে শান্ত থাকার চেষ্টা করছিল। ইউভি বারবার তার কপালে আলতো করে চুমু দিচ্ছে আর ফিসফিস করে বলছে আমি আছি, আদর। আর একটু… শুধু আর একটু।
ঠিক সেই মুহূর্তেই অপারেশন থিয়েটারের নীরবতা ভেঙে ভেসে এলো এক নতুন, ক্ষীণ অথচ তীক্ষ্ণ কান্নার শব্দ।এক মুহূর্তের জন্য যেন সবাই থমকে গেল।তারপর সেই কান্না আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
পৃথিবীতে নতুন একজনের আগমনের প্রথম ঘোষণা।ইউভির চোখ মুহূর্তেই অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। সে ইনায়ার হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বলল
আদর আমাদের ইচ্ছে এসেছে।

তুবা ধীরে ধীরে ছোট্ট শিশুটিকে কোলে তুলে নিল। এতক্ষণ যে ছোট্ট প্রাণটি পৃথিবীতে আসার ঘোষণা দিয়ে কেঁদে উঠেছিল, এখন সে শান্ত। তুলোর মতো নরম শরীর, ক্ষুদ্র দুটি হাত পা মায়াভরা দৃষ্টিতে শিশুটিকে কিছুক্ষণ দেখল। তারপর অত্যন্ত সাবধানে তাকে ইনায়ার কাছে এনে দিল।
মায়ের বুকে ছোট্ট ইচ্ছেটাকে ছুঁইয়ে দিতেই যেন মুহূর্তটা থমকে গেল। ইনায়া কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের সন্তানকে আগলে নিল। মা ও নবজাতকের মুখ একে অপরের কাছে আসতেই ছোট্ট ইচ্ছের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে মায়াবী হাসি। সেই হাসি যেন ইনায়ার সমস্ত কষ্ট, ভয় আর ক্লান্তিকে এক মুহূর্তে অর্থপূর্ণ করে দিল। ইনায়ার চোখ বেয়ে নেমে এলো উষ্ণ অশ্রু। সে কিছু বলতে পারল না শুধু নিজের সন্তানকে বুকের আরও কাছে টেনে নিল। ইউভিসে নীরবে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছে
যে মানুষটা এতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, সেই মানুষটির চোখেও এখনঅশ্রুর ঢেউ। তার দৃষ্টি আটকে আছে সেই ছোট্ট মুখটার ওপর। এটাই তার ইচ্ছা। তার আর ইনায়ার ভালোবাসার প্রথম পূর্ণতা। এত ছোট্ট একটা মানুষ, অথচ মুহূর্তের মধ্যেই যেন ইউভির পুরো পৃথিবী হয়ে গেছে।তুবা এবার শিশুটিকে ইউভির কোলে দেওয়ার জন্য এগিয়ে এলো। কিন্তু ইউভি অজান্তেই এক পা পিছিয়ে গেল। তার চোখ শিশুটির ওপর স্থির, অথচ দুটো হাত যেন নিজের অজান্তেই কাঁপছে।

তুবা অবাক হয়ে তাকিয়ে বললো জিজু তোমার ইচ্ছে কে নাও ইউভি ধীরে ধীরে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
আমার হাত কাঁপছে, তুবা আমি পারব না। তুমি। তুমি ওকে আমার মায়ের কাছে দিয়ে আসো।
কথাটা বলতে গিয়েই তার গলা ভারী হয়ে এলো। চোখের সামনে নিজের সন্তান, অথচ তাকে কোলে নেওয়ার সাহসটুকুও যেন এই মুহূর্তে তার হচ্ছে না। এতদিন যে মানুষটি শত বিপদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে, আজ একটি ছোট্ট শিশুর নরম অস্তিত্বই তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।
ইনায়া ইউভির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

না, বর তুমি নাও। ইউভি কাঁপা চোখে তার দিকে তাকাল।ইনায়া ধীরে ধীরে বলল,তোমার ইচ্ছা, বর। দেখো… আমি পেরেছি। তোমার ইচ্ছেটাকে আমি তোমার কাছে এনে দিয়েছি।
কথাগুলো বলতে বলতে ইনায়ার চোখ আবারও পানিতে ভিজে উঠল। সে শিশুটির ছোট্ট মুখের দিকে তাকিয়ে মায়াভরা কণ্ঠে বলল আমার আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করেছেন, বর। আমাদের এতদিনের অপেক্ষা আমাদের ইচ্ছে আজ আমাদের মাঝে এসেছে। ইউভি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। সে ধীরে ধীরে ইনায়ার পাশে এগিয়ে এসে শিশুটির দিকে তাকাল।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮১

কাঁপতে থাকা হাত দুটো বাড়িয়ে দিল।সেই হাত, যে হাত এতদিন শক্ত করে ইনায়াকে আগলে রেখেছে, আজ প্রথমবার নিজের সন্তানের জন্য কাঁপছে।ইউভি খুব সাবধানে ছোট্ট ইচ্ছেটাকে নিজের কোলে তুলে নিল।এক মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতরটা যেন থেমে গেল।এত ছোট্ট! এত কোমল!তার বুকের ওপর মাথা রেখে ছোট্ট ইচ্ছেটা শান্ত হয়ে রইল। ইউভি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে নিজের সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁট কাঁপছে তার শিশুটির কপালে অত্যন্ত আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
আমার ইচ্ছে.. আমাদের ইচ্ছে।”

শেহেজাদার আদর পর্ব ৮৩