দুইজনাতেই পর্ব ৪৬
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
“ দ্বিতী বজ্জাতটা চুপিচুপি সাক্ষ্য স্যারকে বিয়ে করে বসে আছেরে। আর আমি দ্বিতীর কাছেই হাজারবার বলেছি যে সাক্ষ্য স্যারের উপর আমি ক্রাশ খেয়ে পিছলে পড়েছি। ”
মিহুর কথা শুনেই কিয়ান চাইল। আসলেই তো! এ বজ্জাত যে সাক্ষ্য স্যারকে বিয়ে করে বসে আছে আগে জানাবে না? এই বজ্জাত নিজেও তো সমানে সাক্ষ্যর নামে বদনাম করেছে এতগুলো দিন। সাথে কিয়ানও তো কতবার তালে তাল মিলিয়েছে। অথচ ভেতরে ভেতরে কিনা এইছিল ওর মনে? এইজন্যই তো বেয়াদবটা ট্যুরে গেল না সেবার। চুপি চুপি বিয়েটা সেরে ফেলেছে! কিয়ান ফোঁসফাস শ্বাস তুলল। বলল,
“আগে জানলে আমি ব্যাটাকে আরেকটু চিন্তায় রাখতাম। ব্যাটায় আমাদের যেভাবে পড়ালেখা নিয়া প্রেশার দেয় আমিও দিতাম। ইশশ রেএএএ। মিস হয়ে গেল। ”
মিহু মুখ কালো করে চাইল। মিস হোক আর যায় হোক, ওর এখন লজ্জা হচ্ছে। আচমকাই নিজের ওপর কেমন লজ্জা জন্মাচ্ছে। অথচ এতকাল এতগুলো সিনিয়র, জুনিয়র, টিচারকে চোখ দিয়ে গিলে নিয়েও ওর একটুও লজ্জা হয়নি।
সাক্ষ্য যখন দ্বিতীর রুমে এল তখন দ্বিতী ঘুমে। একপাশটায় গুঁটিশুঁটি হয়ে চোখ বুঝে শুঁয়ে থাকতেই সাক্ষ্য চাইল। কিছুটা সময় ওভাবেই দ্বিতীর ঘুমন্ত মুখটা পরখ করতে করতে গিয়ে মুখ ঝুঁকিয়ে চাইল দ্বিতীর সামনেই। অতঃপর তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে কপালের উপর পড়া চুলগুলো কানের কাছে সরিয়ে দিতে দিতেই বলল,
“ এতোটা অভিমান মিসেস এহসান? এতোটা অভিযোগ? এতগুলো দিনে এই অভিমান, অভিযোগ গুলো ভুলে একবারও কি মনে পড়েনি আমার কথা? একবারও মনে হয়নি কোন এক প্রান্তে সাক্ষ্য নামক পুরুষটা পুড়ছে?”
দ্বিতী তখনও ঘুমে। শুনল না ওসব। অথচ সাক্ষ্যর বুকের ভেতর তখন দুঃখরা সতেজ হয়ে এসেছে। এতকাল পর নিজের আদুরে বউকে খুব কাছ থেকে দেখতে দেখতেই মনে হলো তারা দুইজনে কতদূরে! কি ভীষণ দূরত্ব দুইজনের মাঝে। দ্বিতী কতগুলো দিন হলো সাক্ষ্যর সাথে আগের মতো কথা বলেনি। কতগুলো দিন হলো চোরা চোখে বা আড়ালে আবড়ালে সাক্ষ্যর দিকে প্রেমনজরে তাকায়নি৷ কতগুলো দিন হলো দ্বিতী নিজের স্বভাবসুলভ ঝগড়াটাও করেনি সাক্ষ্যর সাথে। রাগ করেনি। মুখ ফুলায়নি। রাগে নাক মুখ লাল করে কয়েকটা কথাও শোনায়নি। সাক্ষ্য চোখ বুঝে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সর্বপ্রথম ঠোঁট ছোঁয়াল দ্বিতীে কপালে। অতঃপর দীর্ঘ এক ওষ্ঠ ছোঁয়া এঁকে বিড়বিড় করল,
“ এই যে হুটহাট এমন চিন্তায় রাখছো, হুটহাট বুকের ভেতর মোঁচড় তুলছো, নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসার মতো দুঃশ্চিন্তায় ভাসাচ্ছো? এসবের জন্য আমারও অভিযোগ আছে দ্বিতী। আমারও দুঃখ আছে। তোমাকে হারানোর ভয়ে কতোটা ছটফট করেছি জানো দ্বিতী? কতোটা অসহায় লাগে তখন জানো? কতোটা শূণ্য লাগে। মুহূর্তগুলো কি ভীষণ কঠিন লাগে। তুমি তা বুঝবে না দ্বিতী। বুঝবে না।”
সাক্ষ্য এরপরেও অনেকটা সময় দ্বিতীর মুখের দিকে চেয়ে থাকল। অতঃপর ছোটশ্বাস ফেলে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এল। শাওয়ার না নিতে পারলেও গায়ে পানির ছিটে দিল। কারণ এতোটা সময়ে গা প্রায় ঘেমে গিয়েছিল। পরনের শার্টটাও ঘামে ভেজা বলে খুলে রাখল একপাশটায়। অতঃপর ধীরে সুস্থে পা বাড়িয়ে আলো নিভিয়ে দ্বিতীর পাশটাতেও শুয়ে পড়ল। দুই হাতে আলতো করে দ্বিতীকে জড়িয়ে বিড়বিড় করে,
“ অদিতি আন্টির মেয়েটা আসলেই নিষ্ঠুর দ্বিতী। নির্দয়! জানো দ্বিতী? আমি অনেকগুলো রাত ঘুমায়নি। নিশ্চিন্তে চোখ বুঝতে পারিনি। একটা ঠিকঠাক মতো ভালো ঘুম দিতে পারিনি বহুদিন। কতগুলো নির্ঘুম রাত্রব কাটিয়েছি এই নিষ্ঠুর মেয়েটাকে ভেবেই। কতগুলো রাত ছটফট করে রাস্তার ধারে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম শুধু এই মেয়েটাকে দেখব বলে। অথচ মেয়েটা কি ভীষণ নির্দয়! দূরত্ব টানার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও আবদ্ধ করে নিল বদ্ধ ঘরে। এক পলক দেখতে অব্দি দিল না। একটু কথা বলে কন্ঠটা অব্দব শুনতে দিল না। দ্বিতী? তুমিও কি আমার মতে করে অনুভব করেছিলে প্রিয় মানুষের শূণ্যতা কেমন হয়? কতোটা পোড়ায়? ”
দ্বিতী তখনও ঘুমে। সাক্ষ্য আর শব্দ করল না। কতগুলো রাত সে ভালোভাবে ঘুমোয়নি। আজ হয়তো ঘুমটা ভালো হবে। আজ বোধহয় ছটফট করা অস্থির মনটা শান্ত হলো। তাই তো সাক্ষ্য দ্বিতীকে বুকে আগলে নিয়ে ফের ঠোঁট ছোঁয়াল মেয়েটার দুই গালে। শেষমুহূর্তে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“ সারাজীবন এমনই আমার আশপাশে থেকো দ্বিতী। আমার কাছ ঘেষে ড্যবড্যাব করে চেয়ে থেকো, বিরক্ত করবে, ভালোবাসবে, ঝগড়া করবে, জ্বালাবে। আমি কিচ্ছু মনে করব না। আমার বুকেতেই ঘুমাবে। হুহ? আর দূরে সরো না দ্বিতী। প্লিজ! আমাকে চরম শাস্তব দিয়ে হলেও আমার নাগালেই থেকো। দিনশেষে অভিযোগে, অভিমানে আমার বুকে মাথা রেখে সব উগড়ে দিও। আমি তোমার সমস্ত অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করব, সমস্ত অভিযোগ মুঁছে দিব। তবু দূরত্ব টেনো না। সহ্য হয় না আমার। ”
সাক্ষ্য বোধহয় বৃথাই অনুরোধ সঁপল। বৃথায় বকে গেল। দ্বিতী তো শুনল না। ঘুমের ঔষধ খেয়ে সে যে গভীর ঘুমে তলিয়েছে আর কোন হুশ থাকলে তো!
দ্বিতীর বাবা মা দুইজনই সারাদিন মেয়ের চিন্তায় ছিল। এখানে ওখানে কল করে, খোঁজ করে যখন মেয়েকে পাচ্ছিল না তখন পাগল পাগল লাগছিল দুইজনেরই। অদিতি আহমেদ সাদিকুর সাহেবের সামনে কেঁদেছিলেন এ। হাতজোড় করে বলেছিলেন,
“ একটাবার খুঁজে এনে দাও সাদিক। আমার মেয়েটাকে একটাবার খঁুজে এনে দাও। এরপর ও যা চাইবে আমি তাই করব। ওর কথামতো সব করব। আমার মেয়েটাকে এনে দাও না সাদিক। ”
সাদিকুর রহমান নিজেও প্রতুত্তরে দৃঢ় কোন উত্তে দিতে পারেননি। শুধু বলেছিলেন, এনে দিবেন। কারণ মেয়েটা যে তার মেয়ের মতোই আত্মসম্মানসম্পন্ন, জেদি মেয়ে। একবার যেখানে কষ্ট পায়, অপমানিত হয় সেখানে হাজার অনুভূতি থাকলেএ ফেরে না। দুইজনই বোধহয় সমান। সাদিকুর রহমান তে চেনেন দুইজনকে। অবশেষে যখন সাক্ষ্যর কাছ থেকে দ্বিতীর খবর পাওয়া গেল তখন আশ্বস্তই হলেন দুইজনে।
এখন রাত অনেক। অদিতি আহমেদ তখনও না খেয়েই বসে ছিলেন বেলকনিতে। ভাবছিলের তার সমস্ত জীবন নিয়ে। সাদিকুর রহমান অবশ্য কিছুটা সময় চেয়ারে বসে থেকে উঠে এলেন অদিতি আহমেদের কাছে। গলা ঝেড়ে বললেন,
“ খাওনি যে? খেয়ে নাও অদিতি। ”
অদিতি আহমেদ চাইলেন এক পলক। গম্ভীরমুখো এই পুরুষটির জন্য একটা সময় তিনি কি ভীষণ পাগল ছিলেন। বন্ধুমহলের এই পরিচিত মুখটা দেখার জন্যই কতশত ব্যস্ততার মধ্যেও ভার্সিটিতে গিয়ে ভীড় জমাত। কত কি গল্প জুড়ত দইজনের। তারপর? তারপর সে সমস্ত অনুভূতি হুট করেই হারিয়ে গেল। হুট করেই সব অচেনা হয়ে গেল। দ্বিতীর জন্মের পর থেকে সাদিকুর রহমান প্রায় প্রতি সপ্তাহেই চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসতেন। বাসার আলাদা অন্য রুমটায় জায়গা হতো সাদিকুর রহমানের। দুইজনের মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্ক বর্তমান রাখলেও স্বামী স্ত্রীর ন্যায় সম্পর্কটা মুঁছে নিয়েছিলেন। এরপর যখন দ্বিতীর বয়স দুই কি তিন হলো? অল্প অল্প বুঝতে শিখল সবটা। তখন সাদিকুর রহমান এ বাসায় এলে একই রুমেই ঘুমাতেন। অথচ অদিতি আহমেদের মন তখনও গলেনি। সাদিকুর রহমান অবশ্য নিজের দ্বিতীয় স্ত্রীকে তিনদিনের সময়ে তালাক দেওয়ার পর থেকে অজস্রবার চেষ্টা করেছিলেন অদিতি আহমেদকে ফিরিয়ে নিতে। একটা সুন্দর সংসার গড়ে নিতে। অদিতি আহমেদই রাজি হয়নি। যে পুরুষ রাগের মাথায় নিজের জীবনে অন্য নারীকে আনতে পারে তার উপর এইটুকু রাগ বোধহয় সব নারীরই হতো। তাও আবার যদি হয় প্রিয় শখের পুরুষ! অদিতি আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন,
“ সাদিক? সেদিন কেন ঝগড়া করেছিলাম আমরা? কেনই বা আমি চলে এসেছিলাম বলো তো? তুমিই বা কেন তোমার খালাতে বোনকে বিয়ে করেছিলে সাদিক? কি হতো বিয়েটা না করলে? কি হতো? কেন এত সহজেই সেদিন অন্য নারীকে কবুল বলার নাম করে তোমার জীবনে আমার অস্তিত্বটা মুঁছে দিয়েছিলে সাদিক? আমি যে আর তোমায় আগের মতো সে পুরুষটা ভাবতে পারি না। আগের মতে সে ভালো ব্যক্তিত্বধারী মানুষটা ভাবতে পারি না। আমার যে আর তোমার জন্য আগের মতো অনুভূতি আসে না সাদিক। কেন করেছিলে বিয়েটা? বলো? বিয়েটা না করলে তো আমি ঠিকই ফিরতাম সাদিক। ঠিকই রাগ কমলে নিজের সংসারটা আগলে নিতাম। তুমি তো আমায় ফিরিয়ে নিতেও আসোনি সেবার সাদিক। যদি একটাবার আসতে? খুব ক্ষতি হতো? খুব ক্ষতি হতো নিজের ইগোটা বাদ দিয়ে আমার রাগ ভাঙিয়ে সংসারে ফিরিয়ে নিয়ে গেলে? তা না করে তুমি ইগো বাঁচাতে বিয়ে করলে! আঘাতটা এখনো আমার বুকে গেঁথে আছে সাদিক। এখনো সেদিনের কষ্টের কথা ভাবলে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। এখনও আমার কি ভীষণ কান্না পায় তোমার দেওয়া সে কষ্টের কথা ভাবলে। যদি বিয়েটা না করতে সাদিক…যদি না করতে তবে আজ আমার সংসারটাও সুন্দর হতো। আমার সংসারটাও আর দশ পাঁচজনের মতোই হতো। কেউ আমার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলত না। কেউ আমার মেয়েকে ভাঙা সংসারের মেয়ে বলতে পারত না। পারত বলো? পারত না তো। ”
সাদিকুর সাহেব বোধহয় স্থির শুনে গেলেন কথাগুলো। উত্তরে কি বলা উচিত বা কি বলবে বুঝে উঠলেন না। শুধু টের পেলেন তার বুকটা ভার হয়ে এল। নিরব এক ব্যথা জমা হয়ে রইল বুকের ভেতরে। সাদিকুর সাহেব নিজের সে ইগোর কথা অপরাধবোধে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি তো জানতেন, তার অদিতি তার এইটুকু ভাগও অন্যের হোক এটা চাইত না। যেখানে নিজেন পুরুষের আশপাশেও অন্য নারীর উপস্থিতি সহ্য করতে পারত না সেখানে সেদিন কি করে পেরেছিলেন কাগজে কলমে অন্য এক নারীকে নিজের করে দিতে? কি করে? যদিও কয়েক মুহূর্তেই নিজের বিবেক জেগেছিল। রাগ ক্রোধ ভুলে মুহূর্তেই বুঝে উঠেছিলেন, তার দ্বারা চরম এক ভুল হয়ে গিয়েছে। যে ভুলের ক্ষমা নিজের প্রিয়তমার কাছে এখনো পায়নি সে। এখনো নিজের প্রিয়তমার হৃদয়ে আগের মতো ভালোবাসা তৈরি করতে পারেনি৷ অদিতি আহমেদ উনার দিকে একনজর চেয়ে ফের বলল,
“ জানো সাদিক? সাজিকে আমি খুব বিশ্বাস করতাম। খুবব! বিশ্বাস করতাম বলেই নিজের সমস্তটা ওর কাছে জানতাম। সমস্তটা ওকে বলতাম। তোমার থেকে পাওয়া কষ্টটাও সর্বপ্রথম আমি সাজিকেই বলেছিলাম। হৃদয়ের সব কষ্টও ওর সাথেই শেয়ার করতাম। এমনকি আমরা যে নামমাত্রই দ্বিতীকে দেখানোর জন্য সংসার করছি এটাও। কে জানত ও এটা পাঁচ কান করবে। কখনো যে কোন না কোন ভাবে দ্বিতীর কান অব্দিও পৌঁছে দিটে কে জানত? এইজন্যই কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা উচিত নয়। কাউকেই না। কেউই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারে না। না প্রিয় পুরুষ, না প্রিয় বন্ধু। কেউই প্রকৃতপক্ষে আপন হয় না। ”
সাদিকুর সাহেবের গলা ধরে এল। বোধহয় গলা দিয়ে শব্দ বের হলে না পুরুষটির। শুধু বলল,
“ অদিতি? আমায় আরেকটাবার বিশ্বাস করবে? আরেকটাবার সুযোগ দিবে জীবনের শেষ মুহূর্তে? একটাই তো জীবন অদিতি। একটাই! এই একটা জীবনও আমি অপরাধবোধ, শুণ্যতা আর তুমিহীনা কাটিয়ে দিয়েছি। তবুও জীবনের শেষপ্রান্তে এসে লোভ করছি। একবার মাফ করা যায় না অদিতি? একটাবার? প্লিজ! ”
অদিতি আহমেদ চোখ বুঝলেন। মুহূর্তেই ফুটে উঠল মেয়ের মুখটা। ফুটে উঠল সাদিকের সেই অনেকগুলো বছর আগের রূপটা। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। বললেন,
“ সাদিক? তোমায় মাফ করে দিয়েছি বহু আগে। বহু আগে। যদি মাফ না করতাম তাহলে এতগুলো বছর বন্ধু হয়ে থাকতাম না। এতগুলো বছর এই মিথ্যে অভিনয়টাও করতাম। কিন্তু দুঃখজনক হলো, আমার আর তোমার জন্য মন কাঁদে না সাদিক। একটা সময়ে কাঁদতে কাঁদতে আমি এখন তুমি ছাড়া বাঁচতে শিখে গেছি। শিখে গেছি একা বাঁচতে। এখন আর অনুভব, অনুভূতির জায়গায় ই নেই আমার হৃদয়ে। তবে আমি তোমার সাথে সংসারে ফিরতে চাই। দ্বিতীর জন্য। শুধুমাত্র দ্বিতীর জন্য। ওকে একটা পরিবার উপহার দেওয়ার জন্য। ”
সাদিকুর সাহেব বোধহয় নিরাশ হলেন। শুধুই দ্বিতীর জন্য? শুধুই? এইটুকু অনুভূতিও অবশিষ্ট নেই বুঝি তার অদিতির হৃদয়ে? দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনি চলে যেতে যেতে বললেন,
“ তা তো করে এসেছিই এতকাল অদিতি। মৃত্যুর আগ অব্দি নাহয় আরেকটু ভালো অভিনয় করব। বুঝাব আমরা সত্যিই সংসার করছি। সমস্যা নেই। বাদ দাও, আমায় মাফ করতে হবে না। খাবার আনছি, খেয়ে নিও। ”
এইটুকু বলেই পা বাড়ালেন উনি। রান্নাঘর থেকে খাবারটুকু নিয়ে এসে বললেন,
“ খেয়ে নাও।”
অদিতি আহমেদ খেতে পারলেন না। খাবারটুকু ও নিলেন না। শুধু মেয়ের কথা ভাবতে ভাবতে বললেন,
“ আমার মেয়েটা কেমন যেন হয়ে সাদিক।কথা বলে না। ঘুমায় না। গুমড়ে গুমড়ে মরছে আমার মেয়েটা। যে মেয়েটা মা ছাড়া কিছু বুঝত না সে মেয়েটাই মায়ের উপর অভিমান করে আজকাল কথা বলে না আর। আম্মু আম্মু বলে বলে পিছু পিছু ঘুরে না। আগে সপ্তাহে একশো বার তোমার কথা জিজ্ঞেস করত। আব্বু কখন ফিরবে, আব্বু কখন ফিরবে করে করে কান ঝালাপালা করে ফেলত। মন খারাপ হলেই তোমার কাছে ফোন দিত। একটু থেকে একটুতেই তোমাকে কল দিত। সে মেয়েটা আজ আব্বু আম্মু কারোর সাথেই কথা বলে না ঠিকমতো। আমার মেয়েটা খুব আঘাত পেয়েছে জানে সাদিক? খুবব! নরম মনের সহজ সরল মেয়েটা কষ্ট পেয়ে আম্মুকেই আর বিশ্বাস করে না। ”
সাদিকুর সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন,
“ আমি দায়ী! সবটুকুর জন্য আমি দায়ী অদিতি। ”
অদিতি আহমেদ কেঁদে ফেললেন। মেয়ের বোধহয় তার প্রতি এতোটাই অভিমান যে এই সারাটা দিনে একটাবারও কল তুলল না। এই যে এখনো মেয়ের একটাবার কথা শোনা্ জন্য বসে আছে, দ্বিতী কি একবারও টের পাচ্ছে মায়েরও কতোটা কষ্ট হচ্ছে?
ভোরের আলো ফুটতেই দ্বিতীর ঘুম ভাঙল। নিজেকে পরিচিত কোন সুভাসে আবদ্ধ পেয়ে সর্বপ্রথম মস্তিষ্কে প্রশ্ন জাগল । এই সুভাসটা…এই সুভাসটা তো তার চেনা। দ্বিতী ঘুমোঘুমো চোখ মেলে যেই সরতে নিবে তখনই বুঝে উঠল কেউ একজন তাকে জড়িয়ে আছে। কারোর দুই হাতের বাঁধনে সে। দ্বিতী ফ্যালফ্যাল করে মাথা ঘুরিয়ে চাইল। কয়েক সেকেন্ড কিছু বুঝে না উঠলেও পরমুহূর্তে ঠিকই বুঝতে পারল। সাক্ষ্য নামক পরিচিত পুরুষটির গায়ের সুভাস নাসারন্ধ্রে গিয়ে ভীড়তেই দ্বিতী কপাল কুঁচকাল। অতঃপর ওভাবেই দ্রুত সরে যেতেই সাক্ষ্য কপাল কুঁচকাল। চোখজোড়া কুঁচকে ঘুমঘুম স্বরে আওড়াল,
“ উফফ….ঘুম হয়নি.. ”
বাকিটুকু বলার আগেই দ্বিতী ভ্রু কুঁচকাল। সাক্ষ্যর ঘুম জড়ানো স্বর মারাত্মক নেশাময় হলেও আজ তা দ্বিতীকে এতোটাও ছুঁয়ে গেল না। এবং দ্বিতী দ্রুতই প্রশ্ন ছুড়ল,
“ এখানে কি করছেন সাক্ষ্য? আপনি এখানে কিভাবে? কে বলেছে আপনাকে? ”
সাক্ষ্য এই পর্যায়ে বহু কষ্টে ঘুমঘুম চোখ জোড়া মেলে ধরল। অতঃপর ফের আবার দ্বিতীকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে চোখ বুঝল। গলায় মুখ গুঁজে বলল,
“একটু ঘুমোতে দিন দ্বিতী। বহু তো জ্বালিয়েছেন। বহু তো পুড়ালেন। এবার একটু ঘাপটি মেরে বুকে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমোতে দিন। কথা দিচ্ছি এর বিনিময়ে আপনাকে দুটো চুমু উপহার দিব। ”
দ্বিতী আজ কথা বাড়াল না। না তো সাক্ষ্যর সাথে ঝগড়া করল। আর না তো সাক্ষ্যকে ত্যাড়া কথা শুনাল। শুধু সাক্ষ্যর হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। শান্ত গলায় বলল,
“ ছাড়ুন। ঘুম আসছে না আর। এভাবে অস্বস্তি হচ্ছে। ”
সাক্ষ্য ছাড়ল না। দ্বিতীর শান্ত আর এড়িয়ে যাওয়া স্বরটা বুঝে উঠে আহতও হলো। একটি আগের খোশমেজাজ এবার মিইয়ে এল। বলল,
“ রাতে ওভাবেই ঘুমিয়েছিলেন দ্বিতী। আগেও ওভাবেই ঘুমাতেন। অস্বস্তি হতো না তো। বরং জেগে গেলে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকতেন আমার মুখচোখে। ছুুঁয়ে দিতেন আমার ঠোঁট, নাক মুখ। এখন কি মুগ্ধতা কমে গেছে দ্বিতী? ”
শেষ প্রশ্নটা সাক্ষ্য খুব গম্ভীর গলাতেই বলল। উত্তরের অপেক্ষায় চাইতেই দ্বিতী বলল,
“ মেয়েদের অনুভূতি এতোটা নড়বড়ে হয়না ছেলেদের মতো। মেয়েরা যাদের জন্য অনুভূতি পুষে তাদের জন্য আজন্মই অনুভূতি পুষে। শুধু কখনো কখনো তা প্রকাশ পায়, কখনো বা পায় না। ”
সাক্ষ্য হাসল। উৎফুল্ল হাসি নয়। বরং মর্মাহত, ভঙ্গুর হাসি। শুধাল,
“ তাহলে ফিরছেন না কেন আমার কাছে? আর কতোটা অপেক্ষা করব দ্বিতী? ”
“ যতোটা অপেক্ষা করলে দ্বিতীর যোগ্যতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলবে না। যতোটা অপেক্ষা করলে দ্বিতী সে সংসারের পার্ফেক্ট বউ হবে ততোটাই। বলেছি না?আমি আপনার জন্য ফিরব না। ফিরব নিজের যোগ্যতাটুকু দেখাতে। দেখাতে যে দ্বিতীও সংসার করতে পারে। দ্বিতীও পার্ফেক্ট বউ হতে পারে। দ্বিতীও সব কাজকর্ম করতে পারে। ”
“ এত যোগ্যতা, পার্ফেক্ট হওয়া লাগবে না। আপনি শুধু আমার হয়েই থাকুন দ্বিতী। কথা দিচ্ছি, কেউ আপনাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না। কেউ না। ”
দ্বিতী এবারে উত্তর দিল না। শুধু সাক্ষ্যকে সরিয়ে উঠে বসতেই সাক্ষ্য হাত টেনে ধরল। বলল,
“ দ্বিতী…এতোটা অবহেলা কি আমার প্রাপ্য? আসলেই প্রাপ্য? কেন করছেন এমন আমার সাথে? আমাকে মানুষ মনে হয় না? মনে হয় না আমারও কষ্ট হয়? মনে হয় না, আমারও অনুভূতি আছে? নাকি ইচ্ছে করেই পোড়াচ্ছেন দ্বিতী? ইচ্ছে করেই বারবার আপনাকে হারিয়ে ফেলার ভয় দেখাচ্ছেন? ইচ্ছে করেই যোগাযোগ বন্ধ রেখেছেন আমার সাথে। অথচ আম্মু, আব্বু, কথা, সাম্য সবার সাথেই আপনার যোগাযোগ হয়। কথা হয়! তাহলে আমার বেলায় কেন এই অন্যায় দ্বিতী? কেন এমন করছেন? কেন এতেটা অবহেলা? ”
দ্বিতী চোখ বুঝে। সাক্ষ্য আবারও দ্বিতীকে টেনে জড়িয়ে নিল। বলল,
“ ঘুমাতে পারি না কতগুলো রাত। একটু ঘুমাতে চাওয়া কি আমার অপরাধ হয়েছে দ্বিতী? ”
দ্বিতী শুধু এইটুকু বলল,
“ ছাড়ুন সাক্ষ্য। আমায় বের হতে হবে।”
সাক্ষ্য ছাড়ল না। দ্বিতীর শরীরটা আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে চোখ বুঝল সে। অতঃপর ঘুম জড়ানো স্বরে শুধাল,
“দ্বিতী,একটু ও কি মায়া হয় না আমার প্রতি? দয়া করে হলেও এই অধমের প্রতি একটু মায়া করুন। একটু বুকের বা পাশটায় মাথা রেখে দুঃখগুলোর ভারটা কমিয়ে দিন দ্বিতী…আমার একটু শান্তি প্রয়োজন, একটু ঘুম প্রয়োজন, একটু সুখ প্রয়োজন দ্বিতী। দূরত্বটা গুঁছিয়ে দিন না দ্বিতী। বিশ্বাস করুন, কতগুলো রাত আমি ভালোভাবে ঘুমাইনি দ্বিতী। কতগুলো দিন আমি আপনাকে ছাড়া ছটফট করে কাটিয়েছি। মায়া করে হলেও এই দূরত্বের অবসান ঘটিয়ে দিন না দ্বিতী।”
দ্বিতী এবারে চুপ হয়ে গেল আচমকা। সাক্ষ্যর গা ঘেষে ওভাবেই চুপটি করে থেকে টের পেল সাক্ষ্যর বুকের ধুকপুক শব্দ। নাসারন্ধ্রে ভীড় করল খুব সুন্দর একটা সুভাস।
খেয়া, কিয়ান, সাদাত আর মিহু সবাই সারারাত জেগে সুর্যোদয় দেখার জন্য বের হওয়ার কথা ছিল৷ সাথে অবশ্য দ্বিতীকেও নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এমন একটা অবস্থায় পড়েছে দ্বিতীকে ডাকতেও পারছে না। আবার দ্বিতীকে ছাড়া যেতেও পারছে না। কিয়ান একপর্যায়ে খেয়ার দিকে চেয়ে বিরক্ত হয়েই বলল,
“ দূরর! ওরা জামাই-বউ একসাথে এখন তুই ওকে ডেকে নিয়ে সুর্যোদয় দেখাবি? মাথামোটা। চল, চারজনই যাই। ওরা একজোড়া গিয়ে পরে দেখে আসবে। আমাদের তো আর জোড়া নাই। আমরা বন্ধুরা মিলেই দেখে আসি। ”
মিহুও তাল মিলিয়ে বলল,
” হু। আমরা চারজনই তো বিজোড়। আমাদের কেউ নাই। সুর্যোদয় দেখতে গিয়ে বরং আমি আর খেয়া দুটো ছেলে খুঁজে নিব। তারপর ওখানে কাপল পিক তুলব। কেমন হবে? ”
খেয়া সামান্য কাঁশল বোধহয়। ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ সুর্যোদয়ে কাপল পিক সুন্দর হবে? ”
“ খুবব! ”
“ ইশশ! একেবারে কাপল হয়ে এলেই হতো তাহলে। একা একা আসা তো উচিত হয়নি। ”
কথাটা খেয়া মুখ ফস্কে বলে ফেললেও সাদাতের মুখটা দেখাল টানটান। টাউজারের পকেটে হাত গুঁজে সোজা উল্টোদিকে হাঁটা দিতেই খেয়া আচমকা প্রশ্ন শুধাল
“একি সাদাত! চলে যাচ্ছিস কেন? আমরা সূর্যোদয় দেখতে যাব তো। ”
সাদাত মুখ টানটান করে সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল,
“ তোমাকে আমার বিষয়ে ভাবতে বলিনি খেয়া। সবসময় আমার বিষয়ে নাক গলাও কে? লজ্জা নেই।”
খেয়া চুপ হয়ে গেল আচমকা। তাকিয়ে একটা শ্বাস ফেলে কিয়ানরা সহ পা বাড়াল বাইরের দিকেই। মিহুর তখন দুনিয়ারর আফসোস। কেন যে একা একা এল। কেন যে ওরা চারজন সিঙ্গেল হয়ে এল। অথচ ও জানেই না ওর অজান্তেও আরো দুইজন জোড় বেঁধে বসে আছে।
সাম্য তখন দাঁত ব্রাশ করছে। কাল রাতের ঝামেলার পর সে রুমে ফেরেনি। বরং ছাদেই ছিল। এই যে এখনোও কথাকে দিয়ে ব্রাশ আনিয়েছে। অতঃপে দাঁত ব্রাশ করতে করতেই পুরো ছাদটা ঘুরঘুর করল৷ কথার অনেকগুলো ফুলগাছেই বেশ সুন্দর ফুল ফুটেছে। দেখতে সুন্দর লাগছে। কিন্তু সে সুন্দরটা সে থাকতে দিলে তো। ইচ্ছে করেই কথার সাদা গোলাপ গাছটা থেকে গুণে গুণে ছয়টা গোলাপ নিল। ততক্ষনে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে পিকু। মুখ আওড়িয়ে স্বর তুলে আওয়াজ করতেই সাম্য ভ্রু কুঁচকে চাইল। বলল,
“ কিরে বেয়াদবের বাচ্চা বেয়াদব? এমন চিল্লাস কেন? ”
বিড়ালটা আবারও আওয়াজ তুলল। এই পর্যায়ে বিরক্ত হয়েই সাম্য ধমক দিল,
“ এই?গলা উঁচু করিস কার সামনে? থাপ্রে দাঁত ফেলে দিবা বেয়াদব। ”
পিকু তবুও অসন্তুষ্টি নিয়ে চেয়ে থাকল। চাহনি এমন যেন সে সাম্যকে দেখে নিবে। শুধু দেখে নিবে না, সোজা এটাক করবে। সাম্য সে নজর খেয়াল করেই বলে উঠল,
“ তোর চোখ কি বড়বড় রে! কাকে দেখাস এই চোখ তুই? আমাকে? এসব শেখায় তোর বেয়াদব আম্মায়? এসব? ছিঃ!”
পিকু যখন তবুও নজর সরাল না, একই ভাবে চেয়ে থাকল তখন সাম্য মুখের থুতু ছিটিয়ে দিল ওরই পাশে। হাঁটু ভাজ করে বসল পিকুর সামনেই। অতঃপর আঙ্গুল উঁচিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলে,
“এই বেয়াদব। খেয়ে দেয়ে তো একদম পটকা হয়েছিস। অথচ রেসপেক্ট করতে জানিস না? তোর শিক্ষার অভাব আছে। তোর আম্মাকে বলিস আমাকে দুইদিনের জন্য শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব দিতে। মেরে ধরে একদম সোজা বানিয়ে দিব। ”
তবুও যখন পিকু একই ভাবেই চাইল তখন সাম্য ধমকে উঠল। বলল,
“ ঐভাবে তাকাস কেন? তোরে ভয় পাই আমি? তোর ঐ বলদ আম্মারেই ভয় পাই না আবার পাব কিনা তোরে ভয়। সোজা ছাদ থেকে টপকে দিব বেয়াদব। বেয়দবের ঘর থেকে তো বেয়াদবই হবি। ভালো কি করে হবে? ”
কথা তখনই সাম্যে জন্য নাস্তা নিয়ে হাজির হলো। একটু পরই ছুটতে হবে তাকে। এমনিতেই গতকালের আইটেমটা তার পেন্ডিংয়ে আছে। তার উপর আজও যদি খারাপ হয় তাহলে গেছে। কথা যদিও রাত জেগে ভালোভাবে পড়েছে তবুও অযথা সময় নষ্ট করতে সে চাইছিল না৷ তবুও সাম্যকে খাবার না দিয়ে যেতেও ইচ্ছে করছিল না। এসেই সাম্যকে শাসাতে দেখে মুহূর্তেই পেছন থেকে বলল,
“ তুমি কি ওর বাবা মাকে চেনো? না জেনেশুনে ওর বাবা মাকে বেয়াদব বলছো কি করে?”
“ কেন? আমার চোখের সামনেই তো স্বয়ং উপস্থিত ওর মাথামোটা অভিভাবক। এমন অভিভাবকের কাছে ও মানুষ হবে তা ভাবাও অন্যায়। ”
” ভেবো না তাহলে। ”
“ থাপ্রে গাল লাল করে দিব কাঁথার বাচ্চা কাঁথা। তুই নিজেই বেয়াদব তো তোর বিলাই ই বা ভদ্র হবে কি করে?”
ব্যস! পিকু বোধহয় বুঝল তার মালিককে বকা হয়েছে। তখনই মুখে আওয়াজ তুলে সঙ্গে সঙ্গেই দাঁত বসাল সাম্যর ফর্সা হাতে। বেচারা সাম্য মুহূর্তেই বিস্ময় নিয়ে চাইল। পরমুহূর্তেই এক ঝাড়া মেরে পিকুকে ছাদের মেঝেতে ফেলে দিয়ে বলল,
“ তোর বেয়াদব পোলাটা দেখি কামড়াকামড়িও করেরে কাঁথা। শিক্ষা দে, শিক্ষা দে। নয়তো কিন্তু সোজা ডাস্টবিনে নিয়ে ফেলে দিয়ে আসব৷ ”
কথা এগিয়ে গেল। সাম্যর নাস্তার প্লেটটা একপাশে রেখে গিয়ে পিকুকে কোলে নিল। অতঃপর বলল,
“ বলেছি না এই উদ্ভট ছেলের আশপাশ না ঘেষতে? বুঝিস না নাকি? না আসলে তো এখন এই ব্যথাটা পেতে হতো না। কি জোরে আঁছাড় মারল! ”
সাম্য ফোড়ন কেটে বলল,
“ ওরে বাবাহ! কি এমন ব্যথা পেয়েছে ঐ বিলাই? আর আমার হাতে যে দাগ বসে তেল? তোর বিলাই এর দাঁত কি ধারালে। দাগ ফেলে দিয়েছে সঙ্গে সঙ্গে। ”
কথা সরু চাহনিতে চাইল। বলল,
“ ভালো করেছে। ছাদের গোলাপ গুলো ছিড়েছো কেন?”
“ তুই ভালোবাসিস বলেই। তোর ভালোবাসার জিনিস চোখের সামনে দেখলেই আমার এলার্জি হয়। গা চুলকায়। ”
“ আমি তো কত জিনিসই ভালোবাসি৷ সব জিনিসেই কি এলার্জি হয়? ”
“ হবে না কেন? হয়। ”
“ ভালো। নাস্তা করে নাও। যাচ্ছি। ”
এইটুকু বলেই কথা পিকুকে নিয়ে পা বাড়াল। যেতে যেতে আওড়াল,“ আমি তো তোমাকেও ভালোবাসি। কই? তোমার তো তোমার নিজেকে নিয়ে কখনো এলার্জি হয়নি। আচ্ছা, যদি কখনে জানতে পারো আমি তোমায় ভালোবাসি? তোমার প্রতিক্রিয়া কি হবে সাম্য? ”
সাক্ষ্য পুরো বেলা একটা অব্দি ঘুমাল দ্বিতীকে জড়িয়ে। ওভাবেই পুরোটা সময় দ্বিতী পড়ে ছিল । সাক্ষ্য যখন উঠল তখন দ্বিতীকে দুই হাতে আওতায় দেখে বলল,
“ অনেকদিন পর একটা ভালো ঘুম হলো। ধন্যবাদ মিসেস এহসান। ”
দ্বিতী চাইল একবার। অতঃপর সাক্ষ্য তার দিকে ঝুঁকে কপালের দিকটায় ঠোঁট ছোঁয়াতে নিতেই দ্বিতী বলল,
দুইজনাতেই পর্ব ৪৫
“ ওয়াশরুমে যাব আমি।এতোটা সময় অপেক্ষা করেছি। ”
“ ওয়াশরুমের যাওয়ার জন্য? ”
দ্বিতী উত্তর করল না। তবে এতোটা সময় জেগে থেকেও এভাবে একজনের বাহুডোরে পড়ে থেকে শরীর মেঝমেঝ করছিল। তবুও যেতে নিতেই সাক্ষ্য বলে উঠল,
“আমার সত্যিই অনেকদিন পর অনেক ভালো ঘুম হয়েছে মিসেস এহসান।আপনার কিন্তু দুটো চুমু অবশ্যই প্রাপ্য।”
