Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ৫৫

দুইজনাতেই পর্ব ৫৫

দুইজনাতেই পর্ব ৫৫
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

দ্বিতী খুব সূক্ষ্মভাবেই পুরো একটা দিন সাক্ষ্যর থমথমে মুখ দেখে গেল। গমগমে স্বর শুনে গেল। সাথে যত্ন, ভালোবাসাটাও অনুভব করল৷ দ্বিতী ভাবে। পুরুষ মানুষের রাগটাও সুন্দর। ভালো লাগে। এই যেমন দ্বিতীর লাগছে। দ্বিতী ভেবে হাসতে হাসতেই একটু পরই সাক্ষ্য হাজির হলো। মিটিমিটি হাসতে দেখে গম্ভীর গলায় বলল,
“এক বড়ভাই তার ওয়াইফ দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার কারণে দ্বিতীয় বিবাহ সেরেছেন। বউ অবশ্যই সুন্দরী। যায় হোক, সমাজের বাস্তবতা বলে কথা! ”
দ্বিতী ভ্রু বাঁকিয়ে চাইল। মুহূর্তেই প্রশ্ন ছুড়ল,
“ হু, তো? ”
দ্বিতী প্রশ্নটা সুন্দর ভাবেই করল। মিহি স্বরে। অথচ তার বিনিময়ে সাক্ষ্য হাসল। জবাব দিল,
“ কিছু না, বাস্তবতা। পুরুষ মানুষতো কেবল দুই বিয়েই নয়। চার বিয়েও করতে পারে। ”
“ হু পারে তো। ”
সাক্ষ্য চাপা হাসে। ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করে,

“ হিসেব অনুযায়ী আমি আরো কয়টা বিয়ে করতে পারব মিসেস এহসান? ”
“ তিনটে। কিন্তু কেন?”
প্রশ্নটা করেই পরমুহূর্তেই দ্বিতী চাইল কেমন করে। আবারও বলল,
“তিনটে কম হয়ে যাবে। আপনি চাইলে আরো কয়েকটা এক্সট্রা করতে পারেন। আই হ্যাভ নো প্রবলেম। ”
সাক্ষ্য দ্বিতীর টানটান মুখশ্রীটা আর কটমটে চাহনীটা লক্ষ্য করেই হেসে ফেলে মাথা নামিয়ে। ফের বলে,
“শিওর? ”
“হ্যাঁ। পাত্রী দেখতে সাহায্য করব?”
সাক্ষ্য যেন মজা পেল। দ্বিতী যে রাগছে তা বুঝে উঠেই বলল,
“ নো। পাত্রী আমার মনের মতো হবে। আপনার মতো বেশি বুঝা মেয়ে হবে না। ”
“ তো, কেমন পাত্রী আপনার মনের মতো? ”
“যে নিজেকে নিয়ে ইনসিকিউরড ফিল করবে না। যে আমাকে ভালোবাসবে। যে আমাকে কষ্ট দিবে না। যে আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও কষ্ট দিবে না। ”
দ্বিতী সরু চাহনিতে চেয়ে এবার চোখ বুঝল। তার শরীর মেঝমেঝ করছে। অশান্তি লাগছে। এর মধ্যে সাক্ষ্য যে ফাও বকছে তা বুঝে উঠেই চোখ বুঝে থেকে বলল,
“ হসপিটাল থেকে কবে ছাড়া পাব সাক্ষ্য? ”
“কেন?”
দ্বিতী চাইল মন খারাপ নিয়ে। বলল,

“ কার ভালো লাগে এমন জীবন কাটাতে? আমার ভালো লাগছে না। বাসায় ফিরতে চাই। ”
সাক্ষ্যর যেন হুট করেই রাগটা পড়ে গেল। অমন গোলগাল মুখটায় মন খারাপি কথা শুনে বোধহয় কেউই রাগ ধরে রাখতে পারবে না। সাক্ষ্য ও পারল না। দ্বিতীর মুখটক দুই হাতের আঁজলায় নিয়ে ঝুঁকল কিছুটা। অতঃপর কপালে চুমু এঁকে বলল,
“ আর দুটোদিন পর আমি দ্বিতীয় বিয়ে করলে তোমাকে সহ নিয়ে যাব কেমন? মন খারাপ করে না ছোট্ট বাচ্চা। ”
দ্বিতী ভ্রু কুঁচকে চাইল। প্রশ্ন ছুড়ল,
“আমাকে নিয়ে গিয়ে কি হবে? আমি কি আপনাদের বাসরে বসে থাকব?”
“ না, বিয়ের দাওয়াত খাবেন।আমার বিয়েতে ভালোই রান্না হবে। ”
“ গুড। তো কি কি রান্না হচ্ছে? খুব ভালো ভালো পদ হতে হবে। ”
সাক্ষ্য ফের বাইরের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতেই বলে গেল একেকটা পদের নাম। যেন সব মুখস্থ করে রেখেছে সে৷ দ্বিতী অবশ্য শুধু শুনলই। বলল না কিছু৷

ঠিক তার আরো কিছুটা সময় পর সাক্ষ্য আবারও এল। অতঃপর সাথে নিয়ে এল একটা হুইল চেয়ার। দ্বিতীর সামনে তা হাজির করেই মাথা সোজা করে বলে উঠল,
“নিন, হাজির। আপনাকে ঘুরিয়ে আনি এবার। ”
দ্বিতী শুধু দেখল। দুয়েক পলক তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“বাইরে? ”
“ হু। ”
“ আসলেই বাইরে যাব? ”
“ কেন? সমস্যা আছে? ”
দ্বিতী ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। সাক্ষ্য সামনে এসেই দ্বিতীর মুখে অল্প জমা ঘাম মুঁছে দিয়ে বলল ফের,
“ কোলে উঠবেন? ”
দ্বিতী উত্তর করল না এবারে৷ সাক্ষ্য এবারে আবারও জিজ্ঞেস করল,
“ উঠবেন না?”
“ কোলে নেওয়ার ইচ্ছে হলে এতবার জিজ্ঞেস করতে হবে কেন?”
সাক্ষ্য চাপা হাসে। তার বউটা আচমকাই ভালো হয়ে গেছে। ত্যাড়ামো ছেড়ে একদম মিষ্টি বাচ্চা হয়ে গেছে যেন৷ সাক্ষ্য ওভাবেই কোলে তুলল। হুইল চেয়ারে বসিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ ফেরার পর হাত পা মুঁছিয়ে দিব। আজ ভ্যাপসা গরম পড়ছে যেন।”
দ্বিতী বিনিময়ে জানতে চাইল,

“ কোথায় যাব এখন? মানে কোথাও ঘুরতে যাব কি? ”
সাক্ষ্য হুইলচেয়ারটা ধরে নিতে নিতেই উত্তর করতে নিল,
“ এই তো আমার বাকি তিনটে শ্বশুড়বাড়ি, তাদের আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি সাথে তাদের পাড়া-প্রতিবেশীদের বাড়িও। মন্দ হবে না রাইট? ”
দ্বিতী ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায়। উত্তর করে,
“শুধু আত্মীয় স্বজন আর পাড়াপ্রতিবেশী? আমি তো চৌদ্দগোষ্ঠীর সবার বাড়িতেই ঘুরতে চাই। আর যায় হোক সাক্ষ্য এহসানের শ্বশুরবাড়ি তো। ”
“ সাক্ষ্য এহসানের বউ যখন বলেছে তখন না হয় চৌদ্দগোষ্ঠীর বাড়িও ঘুরানো হবে। নো প্রবলেম। ”
অতঃপর যখনই নিজের বউকে নিয়ে বের হতে নিবে ঠিক তখনই দেখা গেল ওখানে কিয়ান, মিহু আর সাদাত হাজির। দ্বিতী আর সাক্ষ্যর দিকেই তাদের নজরটা। কিয়ান আর মিহু ভার্সিটি থেকে এলেও সাদাত এসেছে বাসা থেকে। আর খেয়ে বাড়িতে কাজ আছে বলেই দ্রুত কেটে পড়েছে। অতঃপর এই তিনজন এখানে এসেই সর্বপ্রথম দেখল তাদের সাক্ষ্য স্যার তার বউকে কোলে করে হুইলচেয়ারে বসাচ্ছে। এর পরের কথোপকোথন গুলোও শুনে মিটিমিটি হাসছিল তারা। কিয়ান এবারে হেসেই বলল,
” স্যার, দ্বিতীকে দেখতে এসেছি আমরা। আন্টি বলল দুয়েকদিনের মধ্যে নাকি বাড়ি নিয়ে যাবে তাই দেখতে এলাম। পুরোপুরি বেঁচে গিয়েছে না এই হারামি? ”
দ্বিতী কেমন করে চেয়ে বলল,
” না, অর্ধেক ম’রেছি। অর্ধেক বেঁচেছি।”
” অর্ধেক? আমি তো দেখছি তুই পুরোপুরি বেঁচে আছিস।”
“ তাহলে জিজ্ঞেস করছিস কেন? ”
কিয়ান কপালে ভাজ ফেলের।ভেতরে এসে বিড়বিড় করে বলে,
“ আল্লাহ জানে, এই মহিলার সাথে সাক্ষ্য স্যারের মতো ভদ্র ভালো মানুষ সংসার করে কি করে।”
দ্বিতভ গলা ঝেড়েই বলল,
“ জোরে বল যা বলার। বিড়বিড় করছিস কেন মাছির মতো? ”
“ চুপ। মাছি কে? ”
“ অবশ্যই তুই। ”
কিয়ান কিছু বলতে নিতেই সাক্ষ্য গলা ঝাড়ল। বলল,
“ একটু বাইরে যেতে হচ্ছে আমাদের। তোমরা বরং বসো। আমরা ফিরে আসছি। ”
সাদাত মাথা নাড়িয়ে বলল,

“ ইটস ওকে স্যার। আপনারা ঘুরে আসুন৷ আমরা আছি। ”
অতঃপর সাক্ষ্য দ্বিতী বেরিয়ে গেল।কিয়ান তখন মুখ ভেঙ্গিয়ে বলল,
” একটু বাইরে যেতে হচ্ছে।ঢং! আমরা মনে ল্যাদা বাচ্চা যে জানব না ওরা ঘুরতে বের হচ্ছে। ”
সাদাত হাসে। বলে,
“ ভাগ্যিস তুই এখনো বিয়ে করিসনি৷ নয়তো আরো অনেক কিছু জেনে বসে থাকতি। ”
“ এমন ভাবে বলছিস যেন তুই বিয়ে করেছিস? ”
“ করব না কেন? দুইদিন পরই বউ নিয়ে নিয়ে ঘুরঘুরর করব তোদের চোখের সামনে দিয়ে। তখন জ্বলবি। ”
“ ঢং! বউ দিচ্ছে কে তোকে এখন? ”
“ যদি দেয়? ”
“ দিবে না। ”
“ ওকে, আজ বিকালে আমার সাথে বের হোস। তখন দেখবি দেয় নাকি না দেয়৷ ”
কিয়ান বিশ্বাসই করল না। গুরুত্বও দিল না। বরং মুখ ভেঙ্গিয়েই বেডে বসে থাকল। অতঃপর তিনজনে ঝগড়া খুনসুটি করে আধঘন্টা কাটিয়ে দেওয়ার পরও যখন সাক্ষ্য আর দ্বিতী হাজির হলো না তখনই আবার ও কিয়ান খ্যাচ খ্যাচ করে বরে উঠল,
“ কি দিনকাল আসল! হসপিটালে রোগী দেখতে এলে রোগীরা হানিমুনের উদ্দেশ্যে চারদিনের ট্রিপ দিয়ে দেয় আর আমরা রোগী হয়ে বেডেই শুয়ে আছি। ছিঃ! কি দিনকাল আসল। ছিঃ!”

খেয়া ভার্সিটিতেই গিয়েছিল। ফিরল একটু আগে। অতঃপর ভার্সিটি থেকে সোজা ফিরল বাড়িতে। কারণ দুইদিন যাবৎই বাড়িতে বারবার একই বিষয় নিয়েই ঝামেলা হচ্ছে। বারবার একটা বিষয় নিয়েই প্যাঁচানো হচ্ছে। অথচ ঘটনাটা স্বাভাবিক। খুবই স্বাভাবিক। পারিবারিক দিক দিয়ে এর কোন ভেজাল নেই। কিন্তু সমস্যাটা খেয়ার। সমস্যাটা বোধহয় সাদাতের ও। খেয়া আজ দুটোদিন সমানভাবেই সাদাতের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে। পারে নি। সাদাত কল তোলেনি। খেয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল শুধু। বাড়ি ফেরার পর সর্বপ্রথম মায়ের সাথে দেখা হওয়ার পরই তার মা রাগ দেখালেন। গত দুইদিনের মতো আজও গলা উঁচিয়ে বলে উঠলেন,
“ সারাজীবন বাবার বাড়িতে পড়ে থাকবে খেয়া?শ্বশুড়বাড়ি যাবে না? যাবেই না যখন তখন ধ্যাই ধ্যাই পরিবারকে না জানিয়ে বিয়েটা করেছিলে কেন? আমরা বলেছিলাম?”
খেয়া নির্বাক হয়েই তাকাল৷ নির্বাক হয়েই চেয়ে থাকল৷ কারণ তার বলার মতো কিছু নেই। জীবনে একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত সে নিয়েছে, একের পর এক ভুল সে করেই গিয়েছে৷ সেসব ভুলের ভারেই হয়তো মুখ দিয়ে আওয়াজ বের হলো না৷ তার মা আবারও বলল,

“ কি হলো? কথা শোনো না? তোমার শ্বশুড় শ্বাশুড়ি যখন বসতে চাইছেনই তখন তোমার এত না কিসের? বলো না কেন? নাকি তোমরা ইতোমধ্যেই আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছো? কই তোমাদের মধ্যে তো কোন যোগাযোগের রেশ দেখি না আমি। কোনদিনই তো দেখলাম না। এমনকি ছেলেটা কোনদিন আমাদের আব্বু আম্মু বলে একটু সম্মানও দেখাল না৷ কোনদিন আমাদের সাথে ভালোভাবে ভাবও করল না। ছেলেটা এমন করন? আদৌ তোমায় সুখে রাখবে সে?”
খেয়া এবারেও চুপ। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলর জানতে চাইল,
“ ওর বাবা মায়ের সাথে তো তোমাদের সম্পর্ক ভালো আছে তাই না? ”
“ তো? সংসারটা কি তুমি ওর বাবা মায়ের সাথে করবে? নাকি ওর সাথে করবে? কেমন বিয়ে করেছে যে বিয়ের এতগুলো দিনেও তোমায় কল দিয়ে খোঁজ নিতে দেখলাম না। ”
“ ওসব বাদ দাও। ওর বাবা মা হঠাৎ এত তাড়া দিচ্ছেন কেন? কোন কারণ? ”
” তা আমি কি করে জানব? উনারাই জানবেন নিশ্চয়ই তাই না? তাছাড়া বিয়েটা যখন হয়েছেই সংসার করতে অসুবিধা কি? কি বলো? খুলে বলতে হবে তো। আমি তো তোমার মা তাই না? ”
খেয়া চুপই থাকল। এবার বোধহয় সন্দেহ আর চেপে রাখতে পারলেন না উনি। মেয়ের দুই কাধে হাত রেখে নিজের দিকে ফিরিয়েই ভ্রু কুঁচকে বললেন,

“ আসলেই তোমাদের প্রেমের বিয়ে? নাকি সেবার দাদুর দেখা ছেলের সাথে বিয়ে ভাঙ্গতেই জোর করে বিয়েটা করেছিলে খেয়া? কিন্তু কাবিননামায় তারও দুই মাস আগের ডেইট ছিল। তার মানে তোমরা বিয়েটা আগেই করেছিলে রাইট? তাহলে সমস্যা কি তোমাদের? তোমাদের কি কোন কারণে দুইজনের বনিবনা হয়নি? তোমরা কি সংসারের কথা ভাবো না? দেখো.. আমি, তোমার বাবা, তোমার দাদু সবাই মেনে নিয়েছি তোমাদের না বলে বিয়ে করাটা। তবু তোমার মনে হয় না তোমাদের বিয়েটা স্বাভাবিক হয়নি এখনো?”
খেয়া মায়ের দিকে হতাশ হয়েই চাইল। হতাশ হয়েই চেয়ে থাকে। অতঃপর একটা সময় পর চোখ টলমল করে। কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। সে কি করে বুঝাবে? কি করে বুঝাবে যাকে একটা সময় সবাইকে না বলেই বিয়ে করেছিল সে পুরুষটির সাথে এখন তার ভালো সম্পর্ক নেই। প্রেমের সম্পর্ক তো দূর, বন্ধুত্বের সম্পর্কটা অব্দি নেই৷ কি করে বুঝাবে? খেয়া কেঁদেই ফেলল। কাঁদতে নিতেই তার মা আবারও প্রশ্ন ছুড়ল,
“ সত্যি করে বলো খেয়া, ছেলেটা তোমায় ভালোবাসে? সত্যিই ভালোবাসে তো এখনো ? নাকি কোন কারণে তোমাদের ছাড়াছাড়ি হয়েছে বলো? কিন্তু সেদিন এত রাগ, এত জেদ সব দেখে তো মনে হলো না সে তোমায় ছাড়বে। একটুও তো মনে হলো না। তাহলে? ”
উনি আবারও মেয়ের কান্না দেখে বিচলিত হয়ে বলল,

“ এই এই..তোমরা কি সংসার না করার কথা ভাবছো? বোকামো করো না খেয়া। বিয়ে করেছো। সংসার না করার আগেই সম্পর্কটা ছাড়তে পারো না তোমরা। তুমি জানো এর ফলটা কেমন হবে? ডিভোর্সী তকমা লাগার পর একটা মেয়ের জীবন অতোটাও স্মুথ হয় না। প্রেমিক ছিল তোমার। ভালোবেসে বিয়ে করেছো। ওভাবে বেখেয়ালিভাবে চললে কিভাবে হবে বলো? স্বামীকে হাতে আনতে শিখো।স্বামীকে ভালোবাসতে শিখো। স্বামীর মনে শুধু তোমার অস্তিত্ব বজায় রাখতে শিখো। বুঝেছো? বুঝেছো কি বলছি?”
খেয়া শুধু মাথাই দোলাল। আর কিচ্ছু বলল না। কিছু না। শুধু শুনল, আর উপলব্ধি করল এসবের কিচ্ছু তাকে করতে হবে না। কিছু না। শুধু যেটা করতে হবে, তা হলো স্বামীর সাথে ভুল বুঝাবুঝিটা মেটাতে হবে৷ এরপরই তো একটা সুষ্ঠু সংসার সম্ভব। নয়তো তার স্বামী যদি তাকে নাই চায় তাহলে সে শুধু শুধু কেন গিয়ে উঠবে তার স্বামীর কাঁধে?

সাম্য বাবার থেকে খুব কঠিন ধমক খেয়েছে কথার সাথে এমন করেছে বলে। সাথে গাল লাল করা একটা চড় উপহার পেয়েছে। এই সামান্য টুকুতে রাগে হম্বিতম্বি দেখিয়ে রুমে ফিরতে নিয়েই কাঁচের টুকরোতে পা কেটেছে ছেলেটা। বেশ গভীর। রক্তপাতও হয়েছে ভীষণ। অথচ সাম্য কাঁচটা ফেলেই বসে আছে। ব্যান্ডেজ করেনি। কিচ্ছু করেনি। এমনকি দুপুরে খায়ও নি ছেলেটা। এখন বিকেল। না খাওয়ার কারণে খিদেতে পেট ছোঁ ছোঁ করছে। অন্যদিন হলে কথা আসে ঠিকই খাবার নিয়ে। বাবা মায়ের সাথে শত রাগ, জেদ ঝগড়া হওয়ার পরও যখন না খেয়ে থাকে তখন ঠিকই কথা আসে৷ খাবার নিয়ে হাজির হয়। এই সেই বলেই ঠিকই খাবার খেতে বাধ্য করে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় আজ কথা এল না। খাবার নিয়ে আসা তো দূর। সাম্য ঐ ব্যথা পা নিয়েই খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে রইল। ব্যথা হচ্ছে। চিনচিন এক ব্যথায় যন্ত্রণা হচ্ছে।তবুও দাঁতে দাঁত চেপেই বসে আছে। সাথে অবশ্য বেঁধে রেখেছে কথার বিড়ালটাকেও। নিজের খাটের উপর বেঁধে রেখে একের পর এক রাগ উড়াচ্ছে ঐ বেচারার উপরেই৷ সাম্য এবারেও রাগ নিয়ে বলে উঠল,
“ তোর মালিক কি বেয়াদব দেখেছিস? দেখেছিস? এখনো আসেনি। তোকে নিতেও আসেনি পিকুর বাচ্চা পিকু। তোর মালিক তো জানে না ওর শখের জিনিস আসলে তুই ভেঙেছিস, আমি না। জানলে তোকে ডাস্টবিনে নিয়ে ফেলে আসবে বেয়াদব। ”
বিড়ালটা অবশ্য বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাল না। অনেকক্ষন ছোটার চেষ্টা করে এখটা লেপ্টে পড়ে আছে বিছানায়। যেন সাম্যকে সে গুরুত্বই দিচ্ছে না। সাম্য নিজে এত গুলো কথা বলার পরও নিজের দিকে এ বাড়িলকে ফিরতে না দেখে ডানহাতে মুখ চেপে ধরল। বলল,

” ভেঙ্গেছিস কেন? ভেঙ্গেছিস কেন বল? মাঝখানে দোষ পড়ল আমার। কথা শুনলাম আমি। দোষী হলাম আমি। আব্বুর চড়ও খেলাম আমি। তুই তো শালা কিছুই ভুগলি না। জা’নোয়ার! ”
এইটুকু বলেই বিড়ালটাকে একদিকে ছুড়ে রাখল। বিড়ালটা বোধহয় অতি রাগেই এবার নিজের দুই পা দিয়ে সাম্যর হাতে আঁছড় বসাল। জোরেসোরে আঁছড় বসিয়েই চোখ বড়বড় করে রাগ দেখাল। সাথে চিৎকার জুড়ে নিজের আওয়াজের জানান দিতেও ভুলল না৷ সাম্য এসবে রাগলই। আঙ্গুল উঁচিয়ে ধমকে বলল,
“ এই গলা নিচে বেয়াদব। সাউন্ড কমা। আর চোখ রাঙাস কাকে তুই? চোখ নামা, নামা এক্ষুণি। চোরের মায়ের বড় গলা। জিনিস ভেঙ্গে আবার মিও মিও ও করে গলা উঁচিয়ে। ”

বিড়ালটা বোধহয় পারলে আরো দুটো আঁছড় টানত। সাথে বলত, “ তোর কি? তোর কি? তুই কে? ”কিন্তু বেচারা কথা বলতে পারে না বলে বলতে পারল না। সাম্য অবশ্য পিকুকে নতুন করে শাস্তি দিতে দড়ি ধরে টেনে টেনে ছাদে নিয়ে গেল। অতঃপর টুল টেনে বসেই পিকুর সাথে বাঁধা দড়িটা রাখল নিজের হাতের বাঁধনে। অতঃপর বিকালের ফুরফুরে বাতাসটা গায়ে লাগতেই কিছুটা সময় পর দেখা মিলল পিকুর সে মেয়ে বান্ধবীর। বিড়ালটা ধবধবে ফরসা। দেখতে নাদুসনুদুস। বলা চলে পিকুর পছন্দ হওয়ার কারণ আছে। সাম্য ঐ বিড়ালটাকে দেখেই ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। তাকাল পিকুর দিকে। পিকু যখন মেয়ে বিড়ালটিকে দেখতে পেল তখন পা বাড়াল। যেন দ্রুতই যেতে হবে। সাক্ষ্যাৎ করতে হবে। বোধহয় মানুষদের প্রেমেও এত টান থাকে না। পিকু সত্যিই পা বাড়িয়ে প্রায় রেলিংয়েই পৌঁছে গেল। অতঃপর যে মাত্র মেয়ে বিড়ালটির সাথে আলাপ করবো ঠিক তখনই সাম্য নিজের হাতের দড়িটায় টান দিল। বেচারা পিকু প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেছনের দিকে হেঁচকা টানের সাথে টান খেয়ে এল। সাম্য যেন মজাই পেল। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ কি? প্রেমে খুব শান্তি তাই না ছোটভাই? তোর শান্তি অশান্তিতে পরিণক করার জন্য আমি আছি। ডোন্ট ওরি। ”
পিকু বোধহয় আওয়াজ তুলল। হাউকাউ আওয়াজ ফের আবারও যখন মেয়ে বিড়ালটির দিকে গেল ঠিক তখনও আবারও একই কান্ডই ঘটল। আবারও সাম্য টেনে আনল তাকে। অতঃপর হাতের দড়ির বাঁধন ঢিলে করল। এভাবে তিনবার টেনে আনার পর মেয়ে বিড়ালটাই যখন এ ছাদে এসে পড়ল তখন সাম্য দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
” কিরে! তোর প্রেমিকা দেখি খুব ভালো। সোজা চলে এসেছে তোর জন্য৷ কিন্তু আমি কি এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোদের প্রেম করতে দিব? কক্ষনো না।”

সাম্য পরমুহূর্তেই মাথা ঝুঁকিয়ে মেয়ে বিড়ালটির দিকে তাকায়। হাত নাড়িয়ে বলে,
” হাই। তুমি দেখতে নেহাৎ ই সুন্দরী আছো মেয়ে। কিন্তু এই জা’নোয়ারের সঙ্গে কেন তোমায় প্রেম করতে হবে? প্রেম করলে ভালো বিড়ালদের সাথে করবে। এসব বেয়াদবের সাথে না। বুঝেছো? ”
অবুঝ প্রাণী কিছুই বুঝল৷ তবু সাম্য বলল,
“ সবচেয়ে বড় কথা এই বাড়ির ছোট ছেলের এখনো লাইফে একটা প্রেম হয়নি। এখনো সে বিয়ে করেনি। আর তার আগে এই বেয়াদব এই বাড়িতে থেকেই এসব করে যাবে? আমি মানব? কক্ষনো না। তারচেয়ে তুমি বরং আর এ বাড়ি এসো না সুন্দরী। আজ থেকে তোমাদের ব্রেকাপ। মনে থাকবে? ”
এইটুকু বলেই সাম্য ফের পা বাড়াল। দড়ি টেনে পিকুকে নিয়ে যেতে যেতেই ছাদের দরজাটা বন্ধ করে দিল। অতঃপর সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতেই বলল,
“ কিরে? কেমন লাগছে ব্রো? দুই সেকেন্ডের দেখা কেবল, অথচ তোর প্রেমিকাকে ছুঁতে পারলি না, আলাপ করতে পারলি না, কাছে যেতে পারলিনা। দুঃখটা সেই না বল? ”

সাম্য বোধহয় আনন্দই পাচ্ছিল। পেটে খিদে, পায়ে ব্যথা এসবের মধ্যেও আনন্দ হচ্ছিল। অতঃপর সে আনন্দ নিয়েই ফের পিকুকে নিয়ে নিজের রুমে এল। খাটের উপর বেঁধে রেখে বলল,
“ আমি না খেয়েই আছি। তুইও না খেয়ে থাক। কারণ দোষ তো তোর। খালি আমি মিথ্যে মিথ্যে দোষী হয়ে বসে রইলাম তোর জন্য। আমার অবস্থা হয়েছে ঐ গরু চরানো রাখালের মতো। প্রতিদিন বাঘ আসে বাঘ চিৎকার করর অথচ যেদিন বাঘ এল সেদিন কেউই বাঁচাতে এল না। ”
এইটুকু বলেই বিছানায় চিৎ হয়ে শুল সে। সিলিং এর দিকে চেয়ে বলল,
” আজীবন ঐ বেয়াদবের এত শখের জিনিস নষ্ট করেছি, এত কষ্ট দিয়েছি তবু এমন বেঁকে বসেনি৷ আমায় ঘৃণা করেনি। অথচ আজ? যেটা আমি করিইনি ওটার জন্যই নাকি ও আমাকে ঘৃণা করছে। করলে কি? আমার কি? মানতে কেন পারছি না আমি হুহ? তারচেয়ে বড় কথা ওর জন্য আনা জিনিসটা ও ভেঙ্গে দিল? ওভাবে ভেঙ্গে দিল আমার সামনে? কোনদিন কিছু আনিনি। প্রথম আনলাম। এত কষ্ট করে, এত খঁুজে আনলাম। আর ও? নিলই না। বরং আঁছড়ে ভেঙ্গে ফেলল। সবকটা বেয়াদব! ”

এসব বিড়বিড় করতে করতেই সাম্য ঘুমিয়ে গেল এক পর্যায়ে। চোখ লেগে গেল বলা যায়। অথচ পিকু তখনও ওভাবেই বিছানায় আটকে ছিল। কারণ তাকে ওখানেই বেঁধে রাখা ছিল। বোচারা পিকু নিজের প্রাকৃতিক ক্রিয়া সারার জন্য বেশ অনেকটা সময়ই কাঁচুমাঁচু করেছে। ছোটার চেষ্টা করেছে। অথচ সাম্য তো তখন ঘুমে। অতঃপর না পেরে বেচারা ছোট থেকে শিখে আসা প্রতিদিনের নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়েই সাম্যর বিছানাতেই নিজের প্রাকৃতিক ক্রিয়া সেরে ফেলল। বেচারা সাম্য তা টের পেল আরেকটু সময় পর। যখন নাকে বিধল বিচ্ছিরি এক গন্ধ! সাথে আড়মোড়া দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠতে নিয়েই যখন টের পেল তার হাতে কিছু লেগে গিয়েছে যেন। চোখ মেলে চাইতেই সাম্যর চক্ষু চড়কগাছ হলো। বিদ্ঘুটে গন্ধটা নাকে বিধতেই আর হাতের ময়লা মতো বস্তুটা দৃশ্যমান হতেই ও চেঁচিয়ে উঠল। বড্ড ক্ষভ নিয়ে ও চিৎকার করে বলে উঠল,

” এই কাঁথার বাচ্চা কাঁথা, তোর বিড়াল আমার বিছানায় খিঁচুড়ি পরিবেশন করে দিয়েছে রে! এই কাঁথা…”
চিৎকারটা একটু জোরে দিয়েই ও আবার হাতে চাইল। না ঠিক কালার ঠিক খিঁচুড়ির মতো নয় তবে কি নাম দেওয়া যায় তাও মাথায় এল না। শেষে বিড়ালটাকেই বলল দাঁতে দাঁত চেপে,
“ এই জানোয়ার, তোর প্রেমিকার সাথে টাইম স্পেন্ড করতে দিই নি বলে তুই এভাবে তোর এই গন্ধওয়ালা বিষ্ঠা আমার বিছানায় ঢালবি? ছিঃ! ছিঃ! কি দুর্গন্ধ!”
কথা প্রায় সে চিৎকারেই একটু পর এল। একদম শান্তশিষ্ট একটা ভাবে সাম্যর রুমে এসেই বিষয়টার সারমর্ম বুঝে উঠে বিছানার কাছ থেকে বেঁধে রাখা দড়িটা খুলে বিড়ালটাকে ছেড়ে দিল সে। সাম্য তখনই বলল,
“ ছাড়লি কেন? ছাড়লি কেন? দেখেছিস তোর বিড়াল কি করেছে আমার? ”
কথা একটাও উত্তর দিল না। শুধু বিছানার কোন অংশটা ময়লা করেছে তা দেখল৷ সাম্য গুরুত্ব না পেয়ে আবারও বলল,

“ কি হলো শুনতে পাচ্ছিস না? নাকে কানেরতুলা গুঁজেছিস?কি করেছে দেখেছিস?”
কথা এবারেও উত্তর দিল না৷ বরয় চুপচাপ সাম্যর বিছানাটা পরিষ্কার করার জন্য বিছানা ছাদর উঠিয়ে নিল৷ সাম্য তখনও তিক্তবিরক্ত হয়ে বলল,
“ ঢং দেখাচ্ছিস তুই? ইগ্নোর করছিস আমায়? তোর বিড়াল দোষ করেছে অথচ তোর মধ্যে একটুও অপরাধবোধ নেই। আশ্চর্য! চোরের মায়ের বড় গলা। ”

দুইজনাতেই পর্ব ৫৪

কথা নতুন বিছানা ছাদল বিছিয়ে দিল না। শুধু ময়লা হওয়া ঐ বিছানা ছাদরটা নিয়ে যেতে যেতেই বলল,
“ আর দুয়েকটাদিন! এর পর আর করবে না। তখন শান্তিতে থাকতে পারবেন। ”
সাম্য তাকাল কেমন করে। শান্তিতে থাকবে? খোঁচা দিয়ে বলল এটা? দুয়েকটা দিন বলতে কি বুঝাল?

দুইজনাতেই পর্ব ৫৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here