দুইজনাতেই পর্ব ৫২
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
সরু কাঁচের ধারালো ছোঁয়ায় মেয়েটার পায়ে গড়াল লালাভ ধারা। ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে এল। যন্ত্রণায় আরেক দফায় পা ফেলতে না পেরে কথা ঝুঁকে বসল। পায়ে বিধে যাওয়া কাঁচের টুকরোটা খেয়াল করে হাত দিয়ে টুকরোটা তুলে ফেলতেই অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ করল সে। চোখ খিঁচে ওভাবেই পা চিৎ করে বসে পড়তেই দেখা গেল সাম্যর ছায়া। সাম্য কথার পিছু পিছুই আসছিল কৌতুহল বশত। যে রুমে এসেই ক্রিস্টার শোপিসটা না দেখে কথা কি করবে তা দেখার জন্য। কিন্তু এসেই কথার অস্ফুট আর্তনাদ শুনে আর ওভাবে বসে থাকতে দেখে ভ্রু বাঁকা সে। কপালে ভাজ ফেলে বড্ড বিরক্তি নিয়ে বলল
“ কি আশ্চর্য!কাঁথার বাচ্চা, ওভাবে লেপ্টে বসে পড়েছিস কেন ফ্লোরে? ”
কথা কেমন নিবু নিবু চাহনিতে চাইল। যন্ত্রণা হচ্ছে ভীষণ তবু সহ্য করে নিচ্ছে সে। আর এদিকে সাম্য এমন একটা ভাব করছে যেন ও এমনিই বসে গেছে। কথার বিড়ালটা ততক্ষনে মালিকের পাশ ঘেষে দাঁড়াল। বোধহয় কথার দুঃক বুঝেই গা ঘেষে হামাগুড়ির মতো দিতে চাইল। সঙ্গ দিতে চাইল। সাম্যর তখনো চোখে পড়েনি কথার পা টা। পরক্ষণে যখন চোখে পড়ল রক্তাকাত পা টা তখনই কপালে দ্বিগুণ ভাজ ফেলে বলে উঠল,
“ আশ্চর্য! পা কাটলি কিভাবে? এখন আব্বু আম্মু আসলে তো ঠিকই আমার দোষ দিবে। ঠিকই ভাববে আমি তোর পা কেটে দিয়েছি। এদিকে তাদের মেয়েকে বসিয়ে বসিয়ে খাইয়ে যে সাবধানে হাঁটাচলাটাও শিখাতে ব্যর্থ তা বুঝতে পারবে না। মেয়েকে দিনরাতে আদরে রাখার বদলে যে তারই ক্ষতি করছে তা কেউ বুঝে না।শুধু সাম্য বললেই দোষ। যত দোষ নন্দ ঘোষ!”
কথার বিরক্ত লাগল বোধহয়। বলল,
“ পা আমার কেটেছে। আমি কি সাহায্য চেয়েছি তোর কাছে? চেয়েছি সাম্য? ”
“ এইই! তুই করে কাকে বলিস তুই? বেয়াদব! নূন্যতম শিক্ষাদীক্ষাও নেই তোর। বড়দের কিভাবে রেসপেক্ট করতে হয় তাও জানিস না। আব্বু আম্মু যদি তোকে শাসন করত তাহলে আজ এমন হতো না। আব্বু আম্মু যদি তোকে চলতে ফিরতে শিখাত তাহলে এমন উঠতে বসতে ব্যথা পেতি না, হাত পা কাটতি না। আব্বু আম্মু যদি তোকে কম খেয়ে এক্সারসাইজ করতে বলত তাহলে এত রোগও হতো না। পিসিওস, থাইরয়েড, রক্তশূণ্যতা আরোও কত কি প্রবলেম! অথচ উনি ডক্টর হবেন। সারাদিন বসে বসে পড়ালেখা করে করে ডক্টর হবেন। না আছে ব্যয়াম, না আছে হাঁটা চলা, না আছে খাওয়া কমানো। খালি বসে বসে খেতেই পারে আর ওষুধ গিলে গিলে আমার বাপের টাকা ধ্বংস করতে পারে। শরীরে এত রোগ যে তোর শুধু ওষুধ গিললেই কি হবে ছাগল? সরি, ছাগল না। ছোটোমোটো হাতি। ”
কথা এবারে একটাও কথা বলল না। ওর ভালো লাগে না ওর ওজন নিয়ে খোটা দিলে। ভালো লাগে না ওকে হাতি বললে। মন খারাপ হয়। কষ্ট হয়। হৃদয় ঝাঁঝড়া হয়ে যায়। হ্যাঁ, এটা ঠিক। কথা হাঁটাচলা খুব কম করে। ব্যায়াম করে না। সাম্য তো ওকে কতবার ওর সাথে টেনে ধরে জিমে নিতে চেয়েছিল। কথা যায়নি। ওখানে কত ছেলেপেলে থাকবে বলেই যায়নি। আবার এইসেই বাঁকা কথা শুনিয়ে কষ্ট দিয়ে মর্নিং ওয়াকের জন্যও খুব চাপ দিয়েছিল বারকয়েক। কথা তাতেও সাঁই দেয়নি। রাত জেগে পড়ে সকালে উঠে এক্সারসাইজ করার বা হাঁটতে যাওয়ার সময় কোথায় ওর? আছে সময়? সকালে উঠেই দৌড়াতে হয়। আবার ফিরে বই নিয়ে বসতে হয়৷ কখনো ছাদে দোলনায় পড়ে কখনো রুমে। এর বাইরে হাঁটাচলার সময় কোথায় মেয়েটার? মেয়েটা তো শুধু পড়েই আর সাম্যর দেওয়া কষ্টগুলো হজম করে। কথা চোখ বুঝে। কোন রকমে উঠে দাঁড়িয়ে পা বাড়াতে নিতেই সাম্য ধমকে উঠল,
“ তুই আমাকে ইগ্নোর নামক ঢং দেখালে কি আমি তোকে মাথায় তুলে রাখব? আর কখনো কথা শুনাব না?হাজারবার শুনাব। ”
“ ইগ্নোর করছি না। ”
“ তো উত্তর না দিয়ে এই কাটা পায়ে হাঁটতে যাচ্ছিস কেন?”
কথা এবারেও উত্তর দিল না। শুধু থমথমে মুখে তাকিয়ে থাকল। অথচ একবারও ওর মাথায় প্রশ্ন এল না যে এই কাঁচটা কোথায় থেকে এল? কোথায় থেকে?
সাম্য ততক্ষণে এগিয়ে ড্রয়ার থেকে সব নিয়ে এসে কথার সামনে ঝুঁকে বসল। কথার পাটা জোর পূর্বক টেনে নিয়ে নিজের পায়ের উপর রেখে রক্তটা পরিষ্কার করতে করতে বলল,
“ রক্তশূণ্যতায় ভুগে। আমার বাপের টাকা খরচ করে রক্ত দিতে হয়। অথচ কাঁচ দিয়ে পা কেটে রক্ত ফেলতে কত মজা লাগে তার। জা’নোয়ার। ”
কথা থমথমে মুখেই বলল,
“ মানুষ একটা কুকুর পাললেও এতবার খোঁটা দেয় না সাম্য। যতোটা তুই দিস। ”
সাম্য পায়ে ব্যান্ডেজ করে দিতে দিতেই চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ আবার তুই? তোর থেকে বড় আমি কাঁথা। মাইন্ড ইট! বড়! ”
“ হু বড়। অথচ আচরণ বড়দের মতো করো না। কই..কখনো তো আমায় ছোট হিসেবে স্নেহের সাথে মাথায় হাত বুলিয়ে দাও নি সাম্য। আমার মন খারাপ হলে কখনো পাশে থাকো নি। বড়দের মতো কি করেছো? উল্টে আমি সবসময় তোমার পাশে থেকেছো। অপমান,অবহেলা পেয়ে। ”
” তো, তোকে কি আমি থাকতে বলেছি? বলেছিলাম? আর তোর পাশে আমি থাকিনি কেন? থাকব না! তুই আমার সমস্ত জীবন নষ্ট করে দিয়েছিস। ছোটকাল থেকে আমার বাবা মায়ের আদর সব তুই নিয়ে নিয়েছিস। এখনো! এখনো আমার আব্বু আম্মু কেউ আমায় ভালোবাসে না, তোকে যতোটা বাসে। কেন বাসে না?তোর জন্য। তোর যেখানে এতজন আছে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য সেখানে আমি না থাকা না থাকা ম্যাটার করে না। আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয় আমি এই পরিবারের সন্তানই না।”
কথা কিছুই বলে না। সাম্য পা টা ব্যান্ডেজ করে দিয়ে আচমকা উঠে দাঁড়াল। তারপর চলে যেতে লাগল। চলে যেতে যেতে আরো একবার তাকাল টেবিলের ঐ জায়গাটায় যেখানে কথার ঐ ক্রিস্টাল শোপিস টা ছিল। কথার নিশ্চয় চোখে পড়বে এক্ষুনি? এক্ষুণি নিশ্চয় খোঁজ করবে?তখন?কি বলবে সাম্য? যদি ওকে জিজ্ঞেস করে?
দ্বিতীর চোখ বুঝে রাখা। তখন প্রায় রাক দুটো কি তিনটে। এত রাত অব্দি সাক্ষ্য জেগে আছে। একপাশটায় বসে দ্বিতীর ঘুমন্ত মুখটার দিকে চেয়ে আছে। সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে। অতঃপর ঝুঁকে দুইবার চুমু খেল দ্বিতীর কপালে। শেষে নাকে চুমু খেল। হেসে বলল,
“তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যান ম্যাম। আমার আপনার সাথে এখোন অনেক হিসেবে মিটানো বাকি বুঝলেন? অনেক..!”
মেয়েটা তখনো ঘুমে। নির্ঘুম রাত্রি কাটানোর দরুণ আর জ্বরের কারণে সাক্ষ্যর চোখজোড়া কিছুটা লালচে হয়ে আছে। দুয়েকবার পায়চারি করল সে। অতঃপর কিছুটা সময় পর একজন নার্স এলেন। দ্বিতীর একটা মেডিসিন ইঞ্জেক্ট করবে বলেই আসা। অতঃপর দ্বিতীকে ঘুমাতে দেখে তৈরি হয়ে নিতেই সাক্ষ্য বলে উঠল,
“ দুয়েকঘন্টা হলো চোখ বুঝেছে। এখনই কি ওষুধটার টাইম? ”
“ জ্বী।”
সাক্ষ্য কপালে ভাজ ফেলে তাকায়। এখন নিশ্চয় জেগে যাবে? সাক্ষ্য বউয়ের অসুস্থতার পর বউ ঘুমালে পা টাও ফেলে পিঁপড়ার মতো। যাতে আওয়াজ নাহয়। ঘুম না ভাঙ্গে। অথচ সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস ফেলতেই নার্সের এর সাথে কথা বলার সময়ই দ্বিতী মিনমিনে চোখে চাইল। দুইজনকে দেখে ঠোঁট টেনে বলল,
“কিছু হয়েছে? ”
দুইজনই উত্তর দিল, না। কিছু হয়নি। অতঃপর নার্স কাজ সেরে চলে যেতেই দ্বিতী প্রশ্ন ছুড়ল,
“ সাক্ষ্য, এভাবে না ঘুমিয়ে আমার কাছে পড়ে থাকার মানে বলুন? কি দরকার এসবের? ঘুমে চোখ লাল হয়ে আছে আপনার। এখানে থাকার দরুন ভালোভাবে গোসলও করেন না। জ্বর নিয়েও পড়ে আছেণ। কি কারণ? আমি কি চলে যাচ্ছি? আম্মু আছে না এখানে? আব্বু আছে। সাজি আম্মুও থাকে। তাহলে আপনি বাসায় গিয়ে ঘুমালে কি মহাভারত অশুদ্ধ হবে?”
সাক্ষ্য শীতল চোখে তাকায়। বলে,
“ বউটা কি আমার শ্বাশুড়িআম্মুর? নাকি শ্বশুড় আব্বুর? নাকি আমার আম্মুর? বউটা তো আমার তাই না? আমি থাকব না তো কে থাকবে? ”
“ থাকুন। নিষেধ করেছি? কিন্তু পালাক্রমে থাকুন। একটা মানুষ দিনরাত কন্টিনিয়াসলি এফোর্ট দিতে থাকলে তো সে নিজেই অসুস্থ হয়ে যাবে। ”
“ তো? আপনার কি সমস্যা? ”
“লোকজন খারাপ বলবে। বলবে বউয়ের সেবা করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে গেছেন। ”
“ তো? আমি কি আপনার মতো? যে লোকজনের কথা শুনব? লোকজনের কথাকে গুরুত্ব দিব? ”
দ্বিতী এবারে আর কথায় পেরে উঠল না বোধহয়৷ তবু ধীরস্বরে জানাল,
“ নিজের চেহারাটা দেখিন। দাঁড়ি দেখুন। এমন চেহারা দেখলে তো মানুষজন আর আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে না। মুগ্ধ হবে না। প্রেমে পড়বে না। ”
“ সো হোয়াট? আপনি তাকালেই চলবে। এই যে তাকিয়ে এতকিছু খেয়াল করেছেন এভাবে তাকিয়ে খেয়াল করলেই হবে। ”
দ্বিতী চাইল। নিবু নিবু চোখে চেয়ে আচমকা ঐ ছোটখাটো সরু বেডটায় পাশের জায়গাটুকু দেখিয়ে বলল,
“ জেগে না থেকে এই জায়গাটুকুতে চুপচাপ ঘুমান। এর বাইরে বেশ জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়।”
সাক্ষ্য ঐটুকু জায়গার দিকে চেয়ে কপালে ভাজ ফেলে বলল
“ ঐটুকু জায়গাতে আমার হাত পা কিছুই আঁটবে না। আপনি ঘুমান। আমি আছি। ”
“ আঁটবে।”
“ নিজে তো অসুস্থ। এখন আমাকেও কি ফেলে টেলে অসুস্থ করার চিন্তা করছের ম্যাডাম? পড়ে গেলে তখন আপনি ধরবেন? ”
“ পড়বেন না। ”
এইটুকু মৃদু স্বরে ভেসে আসতেই সাক্ষ্য হাসে। বলে,
” শিওর? পড়ব না? ”
“ শিওর। ”
“ ওকে। আই উইল ট্রাই ইট। ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য দরজাটা লাগিয়ে এসে ঐ জায়গাটুকুতে নিজের লম্বা চওড়া শরীরটার অবস্থান ঠিক করে দ্বিতীর দিকে চেয়ে চোখে হাসল। একদম দুইজনের শরীর লেগে আছে। অবশিষ্ট জায়গা নেই। সাক্ষ্য চোখে হেসে বলল,
“ ডিয়ার ভেল্যুএবেল পিস,
ইফ ইউ গিভ মি পরামিশন, আমি কি আপনাকে জড়িয়ে ঘুমাতে পারি ম্যাডাম?”
আগের দ্বিতী হলে হয়তো মুহূর্তেই না করত। তড়াক করে রাগ দেখাত। মুখচোখ ফুলিয়ে সাক্ষ্যকে সরাতে উদ্যত হতো। অথচ এখনকার শান্ত দ্বিতী সাক্ষ্যকে সরাল না৷ সাক্ষ্যকে রাগ দেখাল না। বরং চোখের দিকেই চেয়ে থাকল। অতঃপর মৃদু স্বরে বলল,
“ এজ ইউর উইশ মিস্টার সাক্ষ্য এহসান। ”
সাক্ষ্য হাসে। বউকে আলতো হাতে জড়িয়ে ধরেই বউয়ের ডানগালে নরম চুমু বসাল৷ ফিসফিস স্বরে বলে উঠল,
“ মিসেস সাক্ষ্য এহসান এত ভালো হয়ে গেল কবে থেকে? ”
“ মিসেস সাক্ষ্য এহসান সবসময়ই ভালো ছিল মিস্টার। শুধু মিস্টার সাক্ষ্য এহসান ভাব দেখাত বলেই সেও ত্যাড়ামো দেখাত। ”
“ এখন থেকে আর দেখাবে না বলছেন? ”
দ্বিতী উত্তর করতে নিচ্ছিল তার আগেই অনুভব হলো সাক্ষ্যর শরীরের উষ্ণতা। জ্বরে গা এতোটাই উত্তপ্ত যে দ্বিতীকে জড়ানোর দরুন তার বুঝতে অসুবিধা হলো না। বলল,
“ জ্বরের মেডিসিনটা নিতে ভুলে যায় কি করে? নাকি ওষুধ খেলেও বউ ফুরুৎ হয়ে যাবে বলেছ?”
“ উহু। খেয়েছিলাম। এখন আবার জ্বর এলে ওটা জ্বরের দোষ। ”
দ্বিতী মিনমিনে চোখে চেয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“ যান। মেডিসিন নিয়ে আসুন। ”
সাক্ষ্য তাকিয়ে বলল,
“ পরে নিয়ে নিব। আপনি ঘুমান।”
“ না, ওষুধ খেয়ে এসে ঘুম দেন।”
“ আমি এমনিতেও ঘুমাব না দ্বিতী। আপনি চোখ বুঝুন। ”
“ কেন ঘুমাবেন না?”
দুইজনাতেই পর্ব ৫১
“এইটুকু জায়গায় ঘুমাতে গিয়ে আমার ওয়াইফ পড়ে গেলে পরে আমারই ক্ষতি হবে। আপনার নয়। সো সতর্ক তো আমাকেই থাকতে হবে তাই না? ”
দ্বিতী অসন্তুষ্ট স্বরে বলল,
“ তো তাহলে এখানে উঠলেন কেন? নেমে যান তাহলে। ”
সাক্ষ্য হাসল ঠোঁট বাঁকিয়ে। মনে মনে আওড়াল,“আপনাকে জড়িয়ে ধরার ধান্ধা ম্যাডাম।এইটুকুও বুঝে উঠলেন না?”
