দুইজনাতেই পর্ব ৪৫
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
সাক্ষ্য যখন চিন্তায় প্রায় দিশেহারা এবং বারবার দ্বিতীর বন্ধুমহলের সবাইকে কল দিয়ে যাচ্ছিল ঠিক তখনই আচমকা কল তুলল কিয়ান।তখন প্রায় বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা। এতটুকু সময় কি ভীষণ অস্থিরতা নিয়ে কাটিয়েছে সে। কিয়ান ওপাশ থেকে আমতা আমতা করে বলল,
“ আসসালামুআলাইকুম স্যার, কল দিয়েছিলেন কয়েকবার? ”
সাক্ষ্যর বোধহয় ইচ্ছে হলো কিয়ানকে তুলে এনে জিজ্ঞেস করতে যে এতোটা সময় কি করেছে। সাথে দুই গালে দুটো থাপ্পড় লাগাতে ইচ্ছে করল। কিন্তু তা না করে সে প্রথমেই জিজ্ঞেস করল,
“কিয়ান, তোমার ফ্রেন্ড দ্বিতী কোথায়? তাকে ফোনটা দাও এক্ষুনি।”
কিয়ান বোধহয় উত্তর দিতে খানিকটা সময় নিল। তারপর বলল,
“ দ্বিতীকে কেন স্যার? ”
সাক্ষ্য দাঁতে দাঁত চেপে বলল
“ দরকার আছে। তোমাকে দিতে বললাম যেহেতু দাও তাড়াতাড়ি। ”
কিয়ান আরেকটু সময় নিল। অতঃপর একটু পর জানাল,
“ ও তো সমুদ্রের ঢেউতে নিশ্চুপ বসে আছে। একটু মেন্টালি ডিস্টার্ব আসলে ও। আমরা ভার্সিটিতে গেলে কথা বলিয়ে দিই স্যার? ”
সাক্ষ্য চাপাশ্বাস ফেলল। প্রশ্ন ছুড়ে জিজ্ঞেস করল,
“ কোথায় তোমরা? পরিবারে না বলে কোথায় গিয়েছো? মানুষদের চিন্তায় রাখতে ভালো লাগে? ”
“ আসলে বন্ধুরা মিলে একটা ছোট্ট ট্যুর স্যার। কালই আবার ফিরে যাব। পরিবার থেকে হয়তো এত দূরে আসতে দিবে না। তাই ওরা বলেনি। দ্বিতীর আম্মু কি চিন্তা করছে? ”
“ কোথায় তোমরা? ”
“ কক্সবাজার স্যার। সকাল সকাল ট্রেনে উঠে পড়েছিলাম সবাই। তারপর প্রায় আট নয় ঘন্টা জার্নি করে দুপুরে এসে পৌঁছেছি। আজকের দিনটা থেকে কাল দুপুরেই আবার ব্যাক করব। আমরা দরকার হলে আন্টিকে বলে দিব এখন। চিন্তা করার জন্য নিষেধ করে দিয়েন। ”
“ লাগবে না। শোনো, দ্বিতীর খেয়াল রাখবে। চোখে চোখে রাখবে। আর আমি যে কল করলাম বলার প্রয়োজন নেই। বাই। ওর কিছু হলে কিন্তু আমি তোমাকে প্রথমে দেখে নিব কিয়ান। ”
“ স্যার, আমি কি করলাম? ওর মাথার তো এমনিতেই ঠিক নাই। ছোটবেলা থেকেই উঠতে-বসতে উষ্ঠা খেয়ে ব্যথা পায়। এত বড় হইছে, অথচ ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারে না। ”
“ না পারলে না পারবে। তবু উষ্টা খাওয়ার আগে ওকে সেইফ করার দায়িত্ব তোমার। আগামী কয়েক ঘন্টা ওর দায়িত্ব তোমার হাতে দিলাম। বাকিটুকু ওখানে দেখা যাবে। ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্য কল রাখল। অতঃপর দ্বিতীর আম্মুকে চিন্তা করতে নিষেধ করে সবটা বলে ওভাবেই রওনা দিল কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। কিয়ানকে কল করে পাশাপাশি একটা রুমও বুক করতে বলল শীঘ্রই। কোথায় আছে তাও জানল।
বেচারা কিয়ান কিছুই বুঝল না বোধহয়। মাথায় হাজারটা প্রশ্ন নিয়ে কেবল ঘুরফির করল। কি আশ্চর্য! কিছুতেই কিছুর হিসেব মিলছে না যেন। আবার সরাসরি দ্বিতীকে প্রশ্নও করে উঠতে পারছে না। না পেরে শেষ মুহূর্তে সে বলেই ফেলল দ্বিতীকে,
“ দ্বিতী? সত্যি করে বল তো, সাক্ষ্য স্যারের সাথে তোর প্রেমট্রেম চলছে না তো? তুই কোনভাবে সাক্ষ্য স্যারের গোপন প্রেমিকা নয় তো? ছিহ ছিহ! অবশেষে কিনা পরকীয়ায় জড়াল ঐ ব্যাটা!”
দ্বিতী নিরাশ। সাক্ষ্যকে বিয়ে করেছে জানলে পঁচাবে ভেবে এদের বলা হয়নি সাক্ষ্যর কথা। আবার আনুষ্ঠানিক বিয়ের সময়টাতেও এরা সবাই ছিল ট্যুরে। এরপর ও বিভিন্ন কারণে বলা হয়নি। কারণ যে সাক্ষ্যকে দ্বিতী নিজেই এদের সাথে মিলে পঁচাত সে সাক্ষ্যকে বিয়ে করেছে বললে বন্ধুমহল তাকে উঠতে বসতে পঁচাত। অথচ এখন তো সোজা পরকীয়ার ট্যাগই লাগিয়ে দিচ্ছে এরা।
খেয়ার পরনে একটা ঢিলেঢালা টিশার্ট আর শুভ্ররঙা স্কার্ট। গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আছে মেয়েটা। সমুদ্রের নোনা পানিতে পা ভিজিয়ে এদিক সেদিক হাঁটতে গিয়েই প্রায় অর্ধেকটা স্কার্ট ভিজিয়ে নিয়েছে সে। অতঃপর ভাবল সমুদ্রের পানিতে ভেজাই যাক। ক্ষতি কি? যা ভাবা তাই হলো। মেয়েটা ভিজে চুপসে গেল। সমুদ্রের পানিতে সমুদ্র বিলাস করার পর পোশাক বদলানোর উদ্দেশ্যে রুমের দিকটায় পা বাড়াল সবাইকে বলে। অতঃপে যখন রুমের লক খুলে রুমে ডুকতে নিবে ঠিক তখনই কেউ একজন হাত টেনে ধরল মেয়েটার। আচমকায় পাশের রুমে টেনে নিয়ে চেপে ধরল দেওয়ালে। চোখে রাগের আভাস ফুটিয়ে বলে উঠল,
“ খুব বাড় বেড়েছো তাই না খেয়া? ওখানে এত মানুষের সামনে পানিতে ভিজতেই হলো? নাকি মানুষকে দেখাচ্ছো যে তোমার শরীরের কাঠামো খুব সুন্দর। ”
খেয়া বিস্ময় নিয়ে চাইল। সামনের মানুষটা সাদাব। চোখজোড়া কি সাংঘাতিক লাল দেখাচ্ছে। যেন সবটুকু রাগ গিয়ে জমেছে চোখের ঐ সাদা জমিনে। খেয়া এক পলক চেয়ে সাদাবের ভেজা শরীরের সংস্পর্শ থেকে দূরে সরতে চাইল। মুখে কোনরকমে হাসি টেনে বলল,
“ একি সাদাব। তুই নিজেও ভিজে গিয়েছিস। পোশাক পাল্টে ফেল। ”
সাদাব ছাড়ল না মেয়েটাকে। দুইহাতে ওভাবেই খেয়ার হাত দুটো চেপে ধরে বলল,
“ আমি তোমাকে কিছু বলেছি খেয়া। ভিজেছো কেন ওভাবে? ”
খেয়া এবারে শুকনো ঢোক গিলল। এই রাগটা যে তার খুব অপরিচিত এমন নয়। আবার বোধহয় খুব পরিচিতও। খেয়া শ্বাস ফেলল। খুব কাছ থেকে সাদাবের উপস্থিতি টের পেয়ে বলে উঠল,
“ ছাড় সাদাব। কেউ আসলে উল্টোপাল্টা কিছু ভেবে ফেলবে। ”
“ কি ভাববে? ”
খেয়া অসহায়ের মতো চাইল। বলল,
“ সাদাব। প্লিজ..ঘুরতে এসেছি শুধু। এতগুলো দিন তোর অবহেলা, ঘৃণা সব মেনে নিয়েছি আমি। সবব! কিছু বলিনি। কিন্তু এখন এখানে এসে এসব সিনক্রিয়েট করবি না৷ ”
“ সিনক্রিয়েট করছি? যা আমার তা আমারই খেয়া। ছাড় দিচ্ছি মানে ছেড়ে দিব এমন না। ”
খেয়া হাসল মৃদু। বলল,
” যা আমার? আমি তো কখনো তোর বন্ধুই হতে পারিনি সাদাব। শুনেছি আমায় বন্ধু হিসেবে মানিসও না তুই। তাহলে? তাছাড়া তোর গার্লফ্রেন্ড আছে না সাদাব? এসব শুনলে পরে আমাকে ভুল বুঝবে মেয়েটা৷ ”
সাদাবের রাগে বোধহয় হাত পা নিশপিশ করল। চোয়াল শক্ত করে বলল,
“ খুব বেশি মহান সাজবে না খেয়া। তুমি নিজেও জানো তুমি কি করেছো। এরপরও আমার প্রতি অভিযোগ রাখো কি করে তুমি? ”
“ কারণ তোর আঘাতগুলো একদিনের জন্য ছিল না। প্রতিটা দিন আঘাত পেতে পেতে আমি ক্লান্ত সাদাব৷ এতোটা অবহেলা তো মানুষ কাউকে করে না। যতোটা তুই করেছিস৷ আমার অন্যায়ের কাছে তোর অবহেলা, অপমানগুলো অবশ্যই অনেক অনেক বেশি! ”
“অপমান, অবহেলা মানুষ বিনা কারণে পায় না। তুমি তার যোগ্য বলেই পেয়েছো খেয়া। আর আমি বেহায়া পুরুষমানুষ নই খেয়া। যে যেখানে আমার মূল্য নেই সেখানেও আমি বোহায়া কুকুরের মতো পড়ে থাকব। ”
খেয়ার চোখ টলমল করে উঠল যেন। সাদাবের দিকে তাকাতে পারল না আর সে। কান্না পেল। খুব করে কান্না পেল। খেয়া কান্না আটকাল। খুব কষ্টেই কান্না আটকিয়ে বলল,
“ থাকতে হবে না। হাত ছাড় সাদাব। রুমে যাব আমি। ”
“ না ছাড়লে কি করবে তুমি?”
“ কিছু করব না। তোর তুলনায় আমি খুব নগন্য সাদাব। কিছু করতে পারব ও না। ”
খেয়া কথাগুলো বলল নরম গলাতেই। সাদাব চাইল। ক্লান্ত মুখশ্রী, নরম স্বর আর নিভু নিভু চোখজোড়ায় চেয়ে আচমকাই খেয়াকে ছেড়ে দিল। বলল,
“ এসো না আমার সামনে। এসো না। যে অধিকার আমার আছে তার অপব্যবহার করে ফেলব নয়তো। ”
খেয়া আর দাঁড়াল না। বোধহয় শুনলও কথাটা। হয়তো কথার অর্থটাও বুঝল। কিন্তু প্রত্যুত্তর করল না। অথচ যে পুরুষটি তাকে এতোটা দোষারোপ করে, এতোটা অবেহেলা অপমানে ডুবিয়ে রাখে খেয়া এই পুরুষকেই প্রতিনিয়ত নিজের বাড়ির লোকের কাছে ভালো সাজায়। এখনও! বুঝায়, তাদরর সম্পর্ক কতোটা স্বাভাবিক। কিন্তু..স্বাভাবিকতার মধ্যেও যে কি ভীষণ অস্বাভাবিকতা ঘেরাও করে আছে তা কি কেউ টের পেয়েছে একবারও?
সাম্য অনেকটা সময় ছাদেই বসে আছে। বাইরে থেকে আসার সময়ই একটা সিগারেট ফুঁকে এসেছে ছেলেটা। অতঃপর বাসায় ডুকার সময় সিঙ্গেম চিবুতে ভুলে বসেছিল। যার ফলস্বরূপ মুখে নিকোটিনের বিদ্ঘুটে গন্ধটা থেকে গেছিল। আর সে গন্ধের কারণেই একটু আগে সাম্য বাবার হাতে দু দুটো চড় খেয়েছে।তাও আবার যেন তেন চড় নয়। গাল লাল করে ফেলা চড়। সাম্যর মনটা এই কারণেই উদাস। পাশে বসে থাকা কথার বিড়ালটাকে ও তার অসহ্য লাগল। মুখ কুঁচকে বলল,
“ কি দেখিস ওভাবে বিলাইয়ের বাচ্চা বিলাই? কি দেখিস? আমার গালের চড় খাওয়া দাগ? ”
বিড়ালটা নড়ল চড়ল না। একইভাবেই সাম্যর দিকে চেয়ে থাকল। বলল,
“তোর আম্মার জন্য বেয়াদব। ছোটবেলা থেকে তোর আম্মা আমার আব্বুর মাথায় এমনভাবে ঝেঁকে বসেছে যে আমার আব্বু এখন আমাকে সহ্যই করতে পারে না। ভাবে আমি খারাপ। সব খারাপ আমারর।সববব!”
“ এই তোর বেঈমান মালিক তোকে পালছে, তোকে খাওয়াচ্ছে এর পেছনে কত টাকা খরচ হচ্ছে জানিস? কই তার বেলায় তো কিছু বলে না। কিন্তু আমি একটা সিগারেট ফুকতেই নাকি টাকাপয়সা সব শেষ করে ফেলছি। একটা সিগারেটের টাকা বাঁচিয়ে কি আমি দশতালা বিল্ডিংয়ের মালিক হবো হুহ? সবজায়গায় খালি একচোখামি। আমার বেলাতেই চোখে বেশি দেখে। আর তোর মালিকের বেলায় আমার বাপ চোখে বুঝে বসে থাকে। ”
বিড়ালটা এবারে নড়ল একটু। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে ছাদের কার্নিশ ঘেষে পা বাড়াতেই সাম্য খেয়াল করল কিছুটা দূরের ছাদে আরো একটা বিড়াল। এটা কথার নয়। কার কেজানে! সাম্য এই এতোটা রাতে আরেকটা বিড়াল দেখেই কথার বিড়ালের এমন পা বাড়িয়ে যাওয়া দেখে দ্রুত হুংকার ছুড়ল,
“ এই দাঁড়া। ”
বিড়ালটা শুনতে পেলে তো। সে ওভাবে পা এগোচ্ছিল। সাম্য মুহূর্তেই গিয়ে হাতে তুলল বিড়ালটাকে। অপর ছাদের বিড়ালটাকে দেখিয়ে বলল
“ কিরে? তুই দেখি ইনোসেন্ট ফেইস নিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে ভেতরে ভেতরে তুই অন্য বিলাই নিয়ে ঘুরিস। রিলেশন করিস। ছিহ! তোর মালিক শেষ পর্যন্ত তোরে এসব শেখায়? ”
সাম্য বিড়ালটাকে যেতে দিল না। বরং অপর ছাদের বিড়ালটাকে ঢিল ছুড়ে তাড়িয়ে দিয়ে বলল
“ আগুন খালি আমার বুকে জ্বলবে কেন? তোর বুকেও জ্বলুক। আমার মতো তেইশ চব্বিশ বছর বয়সী ছেলে সিঙ্গেল থাকতে পারলে তুই সামান্য বিড়াল হয়ে মিঙ্গেল হয়ে ঘুরে বেড়াবি? কখনো না। এরচেয়ে আমার চড় খেয়ে লাল হয়ে যাওয়া গাল দেখ। ভালোই জোর আছে বল আমার বাপের? নয়তো গালে এমন আঙ্গুল বসে যায়? ”
সাম্য নিজ মনেই বকবক করছিল ওর সাথে। বেচারার হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য বিড়ালটা দুই তিনবার আওয়াজ তুলে আঁছড়ও কেটেছেে।অথচ সাম্য ছাড়ল না। ওভাবেই বসে থাকল। তার একটু পরই কথা এল। হাতে খাবারের প্লেট, তার উপর পানির বোতল। অপর হাতে মোবাইলে আলো জ্বালানো। ধীর পায়ে এগিয়ে এসেই সাম্যর সামনে বসে বলল,
“ খাও নি কেন রাতে? ”
সাম্যর সহ্য হলো না। একেই এত বড় হয়েও বাবার হাতে মার খেয়েছেে।তাও কথার সামনেই খেয়েছে।মানসম্মান তো যা আছে গেছেই। তার উপর এত দরদ ভালো লাগল না। কই তখন তো দরদ দেখাল না। যেহেতু কথার সব কথা তার বাবা শুনে সেহেতু কথা তো চাইলে তার হয়ে সুপারিশ করে বলতে পারত যে সে সিগারেট টানেনি। বলেনি তো। সাম্য দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ দরদ দেখাবি না কাঁথার বাচ্চা কাঁথা।”
“ দরদ দেখাচ্ছি না। রাত হয়েছে। খেয়ে নাও এখন। খাবারের উপর তো রাগ নেই তাই না?”
“ কাটা গায়ে নুন ঢালতে এসেছিস তাই না?কি মনে হচ্ছে তোর? আমি বুঝি না? তোর এসব ঢং আমায় দেখাবি না কথা। ”
“ ঢং নয়। খেয়ে নাও৷ আর ওসব ধরোই বা কেন? ভালো ওসব? ফুসফুসের বারোটা বাজিয়ে তো লাভ নেই তাই না? শারিরীক সুস্থতা কতোটা দামী তুমি তা এখনো জানোই না। আমি জানি। রোজ রোজ কতগুলো ঔষধ খেতে হয়৷ কত যন্ত্রণায় ভুগি। ওজন কমানোর কত কি চেষ্টা করে যাই। অথচ কিছু হয় না। ”
সাম্য চাইল। ভালো করে খেয়াল করে বলল,
“ জিমে চল। ওজন কমে হাড্ডি হয়ে যাবি। কিন্তু তখন তো তোকে কষ্ট দিতে পারব না মোটা বলে। ”
“ আমার প্রতি তোমার কিসের এত ক্ষোভ? ”
“ অনেক ক্ষোভ। এই চব্বিশটা বছরে আমি তোর কারণে কতগুলো মার খেয়েছি জানিস?জানিস না। তোর কারণেই আমার লাইফটা শেষ। তোর কারণেই কথা। কি হতো তুই আমাদের বাড়িতে না আসলে? ”
সাম্য চোখ লাল হয়ে আসে। যেন জল জমেছে। কিংবা রাগ, ক্ষোভ। কথা শ্বাস ছাড়ল। বলল,
” খেয়ে নাও। পিকুকে আমায় দাও। ”
সাম্য বিড়ালটার দিকে চাইল। বলল,
“ তোর পিকু কি পোলা বিলাই? ”
“ হু। কেন? ”
” এই কারণেই তো সারাক্ষণ তোর পিছে পড়ে থাকে। তোকে পছন্দ করে। পোলারা আর পোলাগোরে ভালোবাসবে? তবে ওই তো নষ্ট হইয়া গেছের।মাইয়া বিলাই নিয়া ঘুরঘুর করে। তুই কেমন গার্জিয়ান হইলি যে শাসন টাসন করিস না?”
কথা চোখ ছোট ছোট করে চাইল। উত্তর না করে পিকুকে দুইহাতে টেনে নিল। অতঃপর ঠিক সে মুহূর্তটাতেই কথার ফোনটা বেজে উঠল। স্পষ্ট দেখা গেল স্ক্রিনে নিহালের নামটা। সাম্যর বোধহয় আবারও মেজাজ খারাপ লাগল। বিরক্ত লাগল। মেজাজ খারাপ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ তোকে না নিহালের সাথে যোগাযোগ করতে নিষেধ করেছিলাম?তাও এত কি কথা ওর সাথে?তাও এত রাতে?”
ফের পরমুহূর্তেই চেঁচিয়ে বলল,
“ ওকে এক্ষুনি ব্লক করবি কাঁথা। নয়তো তোকে ছুড়ে ফেলব ছাদ থেকে।কয়বার বলেছি মানুষ ভালোমানুষি দেখালেই ওরা ভালো হয়ে যায় না। ভালোমানুষি দেখিয়ে ও মানুষ পেটে পেটব শয়তানি রাখতে পারে। সমালোচনা করতে পারে। উপহাস করতে পারে। এরচেয়ে ঐসব লোকদের বেশি ট্রাস্ট করবি যারা সব সরাসরি বলে। আঘাত করলেও সামনামামনি করবে। কষ্ট দিলেও সরাসরিই দিবে। অপমান করলেও সরাসরিই করবে। বেশি ঢং করে ভালোমানুষ বিশ্বাস করলে পরে বাঁশটা তুই নিজেই খাবি৷ আমি না। ”
কথা শুনল। নিশ্চুপে ফোনটা কেটে ফোন বন্ধ করে রাখল। নিহাল হুট করে এত রাতে কল দিল কেন? কোন দরকার কি? নাহলে এতরাতে কল কেন করল?
সাক্ষ্য প্রায় মধ্যরাতে এসে পৌঁছেছে নির্দিষ্ট জায়গাটায়। অতঃপর কিয়ানের সাথে দেখা করে তার জন্য বুক করা রুমটার দিকে এগোতে এগোতে আচমকা বলল,
“ তোমার ফ্রেন্ড দ্বিতী কোথায়? খেয়েছে রাতে? ”
“ জ্বী স্যার। কিন্তু আপনি ওর বিষয়ে হঠাৎ এত ইন্টারেস্টেড কেন স্যার?যদি বলতেন। ’
সাক্ষ্য উত্তর দিল না। এক কাপড়েই ওভাবে অতদূর থেকে ছুটে এসেছে সে। পোশাকও আনা হয়নি। শার্টটা প্রায় ঘেমেও গেছে। সাক্ষ্য ওভাবেই রুমের দিকে পা বাড়াল। অতঃপর মাঝপথে দেখা হলো দ্বিতী ছাড়া সবার সাথেই। সবাই একটা রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে। দ্বিতীর কাছে ভালো না লাগার কারণেই অন্য রুমে ঘুমাচ্ছিল। আর ওর ঘুমে যাতে ব্যঘাত না ঘটে তাই সবাই অন্য রুমটায় আড্ডা দিচ্ছিল। সাক্ষ্য যখন জানল দ্বিতী অন্য রুমটায় ঘুমাচ্ছে ঠিক তখনই খেয়া আর মিহুর দিকে চেয়ে বলে উঠল,
“ ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, তোমরা আমার রুমটায় ঘুমাবে প্লিজ? ”
খেয়া মেকি হেসে বলল,
“ কিন্তু আপনি স্যার? ”
“ কেন? দ্বিতীর রুমে আমার জায়গা হবে না?”
প্রশ্নটা শুনে বোধহয় মিহুর চোখজোড়ায় বেশি বড়বড় হলো।বাকি সবাই ও বিস্ময় নিয়ে চাইতেই সাক্ষ্য পা বাড়াতে বাড়াতে বলল,
“ প্লিজ, স্টপ রিয়েক্টিং লাইক দ্যাট। শি ইজ মাই ওয়াইফ। ওর সাথে একই রুমে থাকার অধিকার আমার আছে। ওকে? ”
দুইজনাতেই পর্ব ৪৪
একটু আগের বিষয়টা যতোটা না বিস্মিত করল এই বিষয়টা দ্বিগুণ বিস্মিত করলো ওদের। চুপিচুপি এরা বিয়েও করে ফেলেছে? বাহ! বাহ! কিয়ান তো বিশ্বাসই করতে পারল না। মিহু আরো পারল না। না পেরেই তারা দ্বিতীর আম্মুকে কল দিল। অতঃপর উনার থেকেও পুরো বিষয়টা জেনে মিহু আফসোস করে কপালে হাত রেখে বলল,
“ দ্বিতী বজ্জাতটা চুপিচুপি সাক্ষ্য স্যারকে বিয়ে করে বসে আছেরে। আর আমি দ্বিতীর কাছেই হাজারবার বলেছি যে সাক্ষ্য স্যারের উপর আমি ক্রাশ খেয়ে পিছলে পড়েছি। ”
