দুইজনাতেই পর্ব ৪৪
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
সাক্ষ্যর মা স্থির, শান্ত চোখে কেবল ছেলের দুঃখটুকুই দেখলেন। দেখলেন মুখের চাহনি, মলিন মুখশ্রী এবং চোখজোড়ায় ভেসে উঠা আফসোস টা। বুকটা হুহু করে উঠল কেমন যেন। তার ছেলেটা..তার ছেলেটার এমন পরিণতি সে কি ভেবেছিল? ভাবে নি তো। সাক্ষ্য ফের মায়ের দিকে চাইল। কিছুটা সময়ে চেয়ে থেকেই মাকে জড়িয়ে ধরল। অসহায়ের মতো করে বলল,
“ আম্মু…ওকে এনে দিবে আম্মু? একবার ফিরিয়ে নিয়ে আসবে আম্মু? বিশ্বাস করো আম্মু, আমি এই ছন্নছাড়া সম্পর্কটা চাইনি। এই দূরত্বটাও চাইনি৷ আকদেন পর নিজেই ইচ্ছে করে গাছাড়া ভাব দেখালেও এখন আমার সম্পর্কের ছন্নছাড়া পরিণতি সহ্য হচ্ছে না। কষ্ট হচ্ছে। অদ্ভুত এক দুঃখে রোজ হাঁসফাস করছি, ব্যথা বয়ে নিয়ে সব করছি। কিন্তু আমার ওকে চাই আম্মু। সত্যিই চাই। আমি তাকে যতোটা অবহেলা দিয়েছি সবটুকু মুঁছে দিয়ে ততটুকুই ভালোবেসে আগলে নিতে চাই। আমাকে আরেকটা সুযোগ দিতে বলো না আম্মু। একটা…”
সাক্ষ্যর মায়ের বোধহয় কান্না পেল ছেলের অসহায়তা দেখে। পুরোটা শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। উত্তাপ বুঝে বুঝলেন ছেলেটা হয়তো জ্বরের কারণেই মাকে এভাবে নিজের দুঃখগুলো উগড়ে দিতে পারছে। নয়তো ছেলে তো তার বরাবরই গম্ভীর। সাজিয়া আফরোজ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সাক্ষ্য ফের আবার ও বলল,
“ আমি শিওর..দেখো আম্মু। সে আর ফিরবে না আমার কাছে। একটুও ফিরবে না। দিবে না আরেকটা সুযোগ। জেদি তো। দিবে না… অপরাধ তো আমার। আমিই কেন আগে বললাম না আম্মু? কেন আগে বুঝালাম না আমি তাকে ভালোবাসি…”
সাক্ষ্যর মা কেঁদে ফেলল এবারে। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে ওভাবেই কেঁদে ফেলে বলল,
” ফিরবে আব্বু। ফিরবে। দ্বিতী তো তোমায় ভালোবাসে। ফিরবে আব্বু…আম্মু ঠিক ফিরিয়ে আনবে…”
“ এখন আর বাসে না আম্মু। বাসলে আমায় এতবার ফিরিয়ে দিত না সে..সামান্যটুকু হলেও যোগাযোগ করত। বুঝত তার সাথে যোগাযোগহীনতায়, তার শূণ্যতায় আমি কতোটা পুড়ছি। ”
“ আম্মু রাজি করাব আব্বু। ঠিক রাজি করাব। আম্মুর কারণেই তো এসব। বিশ্বাস করো, আম্মু গিয়েছিলাম। কয়েকবার গিয়েছিলাম। কিন্তু ওর সাথে কথা বলতে পারিনি। বুঝাতে পারিনি। কিন্তু আম্মুও হাল ছাড়ব না দেখবে। ঠিক রাজি করাব। ঠিক ফিরিয়ে আনব। ”
এইটুকু বলেই সাক্ষ্যর মাথায় হাত বুলালেন। কোনরকমে ছেলের জ্বরশরীরে খাওয়াতে চেষ্টা করলেন৷ অথচ সাক্ষ্য খেল না। শরীরের প্রচন্ড উত্তাপ নিয়েই একটা সময় পর ঘুমিয়ে গেল। অথচ ঘুমানোর আগ অব্দিও সে ঐ মানুষ টার শূণ্যতাতেই পুড়ছিল। সাজিয়া আফরোজ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলেন। ছেলেটা সে যে প্রথমদিন ঠান্ডা মাথায় মা আর নানীকে কথা শোনাল, শীতল স্বরে ঝামেলা করেই ঘরে দরজা লাগাল এরপর থেকে এতগুলো দিন মায়ের সাথে খুব একটা কথা হয়নি।সাক্ষ্য ফিরেও না তেমন। না তো বাসায় খাওয়া দাওয়া করে। যেন কথা না বলেই, এমন ছন্নাছাড়া ভাব দিয়েই মাকে শাস্তি দিচ্ছিল। আর সে সাক্ষ্যই আজ বাচ্চাদের মতো অসহায় স্বরে এতগুলো কথা বলল। মা তো! বুকটা হু হু করে তার। কেন সেদিন ওভাবে বলেছিল দ্বিতীকে? কেন? কেন ওভাবে মেয়েটার মনে আঘাত দিল?
সাজিয়া আফরোজ আজও এলেন। দ্বিতীর সাথে একটাবার কথা বলার জন্য অদিতি আহমেদকে বহু অনুরোধ করেই বসে থাকলেন সোফার কোণে। মৃদুস্বরে বললেন,
“অদি,আমার ছেলেটা ভালো নেই রে। বিশ্বাস কর, এতগুলো দিন ও সম্মুখে ভালোবাসা না দেখালেও আমি এখন স্পষ্ট বুঝি যে আমার ছেলেটা তোর মেয়েটাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। প্লিজ, আমার ভুলের শাস্তি আমার ছেলেকে দিস না আর। প্লিজ। ভুল তো আমি করেছি বল? ভুল আমার আম্মা করেছে। ভুল হয়তো কণাও করেছে।”
অদিতি আহমেদ শেষের বাক্যটা শুনে হাসলেন। বললেন,
“ হয়তো কণাও করেছে? রিয়েলি সাজি? কণার দোষটা তোর চোখে এখনো পড়েনি? একটা বিবাহিত ছেলের পিছনে ঘুরঘুর করছিল। সংসার ভাঙতে চাইছিল। এটা দোষ নয়? ”
সাজিয়া আফরোজ দীর্ঘশ্বাম ফেললেন। হু। ভুলই তো। কিন্তু অতিরিক্ত স্নেহ করেন বলেন বোধহয় মেয়েটাকে লোকসম্মুখে দোষী বলতে ইচ্ছে হলো না তার। বলল,
“ কিছুটা দোষ তো আমারও বল। প্রথমেই যদি ওদের বিয়ের কথাটা না ভাবতাম তাহলে তো মেয়েটাও এতদূর ভাবতে পারত না। তাই..ওরও দোষ আছে। আমি..আমি ওকে বলেছিলাম দ্বিতীর সাথে কথা বলতে। সাক্ষ্যও চেয়েছিল কণা সবটা ক্লিয়ার করে ক্ষমা চাক। এই নিয়ে বেশ ঝামেলা, রাগারাগি ও হয়েছে। আম্মাও চলে গিয়েছেন। যায় হোক, আমি..আমি আরেকটাবার তোর মেয়েটাকে ভিক্ষা চাইছি অদি। আমায় আরেকটাবার ওকে দে। কথা দিচ্ছি, এবার আর অযত্ন হবে না ওর।”
অদিতি আহমেদ হাসলেন মৃদু। কথা কাটাতেই বললেন,
“ আমি যে কেবল নিজের মেয়ের জন্য তোকে ভরসা করতে পারছি না এমন নয় সাজি। বন্ধু হিসেবেও আমার আস্থার জায়গাটা তুই ভেঙে ফেলেছিস। আমার আর সাদিকের বিষয়ে কথাগুলো তো না বললেও পারতি। পারতি না?মেয়েটা আমার সাথে ঠিক মতো কথা বলে না। ওর বাবার সাথে ঠিক মতো কথা বলে না। আমাদের সাথে আগের মতো মিশেই না আর। রাত ধরে জেগে থাকে।
দিন হলে ঘুমের মেডিসিন নিয়ে ঘুমায়। নাওয়া খাওয়া কোনকিছুরই ঠিক নেই। আমার মেয়েটাও যে কেমন হয়ে গেল তার বেলায়? ”
সাজিয়া আফরোজ উত্তরে কি বলবেন বোধহয় খুঁজে পেলেন না। অপরাধবোধে ভুগলেন ভীষণ। মৃদু গলায় বলল,
“ আম্মা বলেছেরে অদি। আমি কখনো তোকে বা ওর পরিবার নিয়ে বলিনি। বিশ্বাস কর..”
“ যেই বলুক। তুই তো কোন প্রতিবাদ করিসনি সাজি। দিনের পর দিন খালাম্মা আমার মেয়েকে কত কথা শুনাল। কই, তুই তো আমার মেয়ের হয়ে একটা কথা বলিসনি। ”
“ ভুল হয়েছে। ভুল হয়েছে অদি। তুই জানিস তো আম্মা কেমন প্যাঁচালো স্বভাবের মানুষ। কথা উঠলে তা নিয়ে বলেই যায়। যদি কখনো কথায় কথায় প্রতিবাদ করতে গিয়ে এটা বলে দেয় যে তুই আর সাদিকুর ভাই একসাথে সংসার করিস না এই ভয়েই কোনদিন দ্বিতীর সামনে আম্মাকে কিছু বলিনি। ঝামেলা বাড়াতে চাইনি বলে। অথচ দেখ, এখন আরো বড় ঝামেলা হলো। আম্মা সবটা বলেই দিল। আমার সংসারটাও কেমন ছন্রছাড়া হয়ে গেল।”
“ কার জন্য? ”
“ আমার জন্যই। আমার নিজের দোষেই তো। ”
অদিতি আহমেদ মৃদু হাসলেন কেবল। আর কিছুই বললেন না। অপরদিকে সাজিয়া আফরোজ ওভাবেই বসে থাকলেন।
দ্বিতীর ঘুম ভাঙল প্রায় দুপুর তিনটায়। অগোছালো বিছানা ছেড়ে উঠে বসতেই টের পেল তার মাথাটা ঘুরছে। চোখ জ্বলছে। এমনকি মাথাটাও ব্যথা করছে। শরীরটা উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বুঝল যে জ্বর নেমেছে। অস্বাভাবিক দুর্বলতায় শরীরটাও মৃদু কাঁপছে যেন। দ্বিতী উঠেই চুলগুলো খোঁপা করল হাতে। অতঃপর পা বাড়িয়ে মুখচোখ ধুঁয়ে যখন বের হলো তখন সর্বপ্রথম চোখে পড়ল সাক্ষ্যর বাবা সাদাদ এহসানকে। দ্বিতীকে ঘুমোঘুমো চোখে আসতে দেখেই উনি একটক হাসি দিলেন। মৃদু হেসে বললেন,
“ আম্মু, ভুলে গেছিস আমাদের? ”
দ্বিতী চাইল। কিছুটা বোধহয় অপ্রস্তুত বোধ করল। সাক্ষ্যর বাবা এই নিয়ে চারদিন এসেছে। প্রতিবারই সরাসরি না বললেও কোন না কোনভাবে বাসায় ফিরে যাওয়ার কথা বলেছেন মিষ্টি স্বরে। আজও হয়তো বলবে। দ্বিতী ছোটশ্বাস ফেলে জানাল,
“ একদম না আব্বু। কেমন আছো? ”
“ কি করে ভালো থাকি? যদি ছেলে মেয়ে দুটো ভালো না থাকে। আব্বু একটা কথা বলি? বাসায় চলো আম্মু। তারপর নাহয় ওদের মা-ছেলেকে ইচ্ছেমতো ইগ্নোর করবে। হুহ? কিন্তু আমি তো কিছু করিনি। কথা তো কিছু করেনি। আমরা কেন শাস্তি পাব?”
দ্বিতী চাইল। কি উত্তর দিবে বোধহয় বুঝল না। বলল,
“ বসো আব্বু। আমি হালকা নাস্তা নিয়ে আসছি। ”
সাদাদ সাহেব আবারও বললেন,
“ এখন খাব না। বাসায় ফিরলে তারপর খাব। নয়তো অনশন করব। তোমার সাজি আম্মুও এসেছে দ্বিতী। ”
দ্বিতী এই পর্যায়ে অপ্রস্তুত হলো আরেকটু। সাজি আম্মুর সাথে তার সেদিনের পর আর কথা হয়নি। দেখাও হয়নি। বলা চলে, সাজি আম্মুকে সে সত্যিই নিজের মায়ের মতো ভালোবেসেছিল ছোটবেলা থেকে। কিন্তু সে সাজি আম্মুর ভালোবাসাটা যখন একমুহূর্তে বদলে যেতে দেখল তখন থেকেই দ্বিতী আন্দাজ করল যে পৃথিবীতে সব মানুষ বদলায়। সব বদলায়। এমনকি এমনও হতে পারে, ভালোবাসার ধরণটা হয়তো সবসময়ই এমনই ছিল। শুধু লোক দেখানো ভালোবাসায় ভুলে বসেছিল দ্বিতী। দ্বিতী হাসল। সাদাদ সাহেবের পেছনে দাঁড়ানো মানুষটিকে দেখে হাসিমুখে বলল,
“ কেমন আছো সাজি আম্মু? ”
সাজিয়া আফরোজ মুহূর্তেই চোখ তুলল। মেয়েটা হেসেই বলল। অথচ উনি হেসে উত্তর দিতে পারছেন না৷ সংকোচ, অস্বস্তি আর অপরাধবোধে চোখ টলমলে করে উঠেে।একমুহূর্তেই সামনে এসে দ্বিতীর হাতটা জড়িয়ে ধরল। টলমল চোখে শুধাল,
“ দ্বিতী, আম্মুকে কি ক্ষমা করা যায় না? মানছি ভুল করেছি সাজি আম্মু। সেদিন ওভাবে কথাগুলো বলা উচিত হয়নি। মাথাতেই ছিল না কিছু। কি থেকে কি বলেছি বোধহয় আকস্মিক বুঝেই উঠিনি। পরে যখন বুঝলাম তখন বাসায় এসেই তোকে খুঁজতে থাকলাম ক্ষমা চাইব বলে। শুধু একটাবার ক্ষমা চাইব বলে। আমার উপর নিশ্চয় খুব রাগ করে আছিস তাই না দ্বিতী? খুব কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তাই না?”
দ্বিতী হাসল। হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ দূর। তুমি আমার আম্মুর মতোই সাজি আম্মু। এটা ঠিক যে, আম্মুর মতো করে ভালোবাসতে কেউ পারে না। তবে তুমি তো একটু হলেও বেসেছিলে তাই না?আমিও তাই তোমায় আম্মুর মতো করেই ভালোবাসি। ছোট থেকেই। আর আম্মুরা তো কতকিছুই বলে। কতই বকাঝকা করে। তাই বলে ক্ষমা চাইবে কেন? আমাকে তোমার বান্ধবী বকা দিলেও আমি একটু পর গিয়ে আবার ঠিক আম্মু আম্মু করি। ”
সাজিয়া আফরোজ দ্বিতীর দিকে চাইতেই এবার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল দু ফোঁটা পানি। বললেন,
“ দ্বিতী…আর একটাবার তোর আম্মু হওয়ার সুযোগ দিবি আম্মু? বাসায় ফিরে চল। অনেকগুলো দিন তো..
এইটুকু বলেই থামলেন উনি। ফের আবারও বললেন,
“ জোর করছি না আমি দ্বিতী। তবে নিজের ভুলগুলো শুধরানোর জন্য হলেও তো তোকে আরেকটাবার আমার সংসারে চাইছি দ্বিতী। আরেকটাবার। বিশ্বাস কর…কণাকে পুত্রবধ্য হিসেবে চাইলেও আমিই পরবর্তীতে তোর আম্মুকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম তোকে পুত্রবধূ হিসেবে চেয়ে। বিশ্বাস কর আম্মু। কণাকে ভালোবাসি ঠিক, কিন্তু তোকে ও আমি…”
বাকিটুকু বোধহয় বলতে পারলেন না আর। কোনমুখেই বা বলবেন যে ভালোবাসেন? ফের বললেন,
“ শোন দ্বিতী, কণার সাথে সাক্ষ্যর বিয়েটা আমরা তখন ভেবেছিলাম যখন আমার ভাবী মারা যায়। মা ছাড়া মেয়েটা কিভাবে বড় হবে ভেবেই ভেবেছিলাম ওকে মেয়ে বানাব। ছেলের বউ করব। কণা যখন মাধ্যমিক দিল তখনই প্রথম কথা হয়েছিল ওদের বিয়ের বিষয়ে। ওদের পরিবার, আমরা সবাই রাজি ছিলাম মোটামুটি। সাক্ষ্যকে তখনও বিষয়টা জানানো হয়নি। ভেবেছিলাম যে, কণার বয়স আরেকটু হলেই বলব। বাকি সবাই রাজি দেখে ওদের বিয়ের কথা ঠিক করেই কণাকে রিং পরিয়েছিলাম সেদিন। কণা যে রিংটা দেখাল না? ওটা আমি পরিয়েছিলাম দ্বিতী। আমি।সাক্ষ্য নয়।তারপর ঐদিনের প্রায় পনেরো দিন পর সাক্ষ্য যখন জানল বিষয়টা তখন অনেক রাগারাগি হলো। ঝামেলা হলো। কণাকে ছোটবোনের নজরে দেখে এসেছে এবং কণা বয়সে অনেক ছোট বলে বিয়ে সম্ভব না এটা এক কথাতেই জানিয়েছিল এবাড়িতে এবং ওবাড়িতে। তুই বোধহয় খেয়াল করেছিস, তোদের বিয়েতে আমার বড়ভাইয়া আসেনি দ্বিতী। কারণ ঐ একটাই! তার মেয়েকে সাক্ষ্য রিজেক্ট করেছে ।এই নিয়েই উনারা কিছুটা রেগে আছেন। আমার আম্মাও। আর সে রাগটাই বোধহয় তোর উপর কথা দিয়ে ফলাত আম্মা। বোধহয় নাতিনর বদলে তোকে মানতে পারছিল না। বিশ্বাস কর, আম্মার মুখের উপর চাইলে হাজারটা প্রতিবাদ করতে পারতাম। কিন্তু আম্মাও থেমে থাকতেন না। ঝামেলা হতো, ঝগড়া হতো, পুরোনো কাহিনী গুলো তোর সামনেই তুলে ধরত। এই ভেবেই প্রতিবার চুপ করে গেছি। ভাবছি যে আম্মা তো কিছু মাস থেকেই নিজের বাড়িতে চলে যাবে। এই ভেবেই…”
দ্বিতী শুনল। সবটাই শুনল। অতঃপর বলল,
“ তুমি এভাবে কৈফিয়ত দিচ্ছো কেন সাজি আম্মু? আমি তো জিজ্ঞেস করিনি। তোমার ব্যখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং তোমার যদি মনে হয়ে থাকে যে , আমি তোমার ছেলের জন্য পার্ফেক্ট নই সেটা বললেও আমি কিছু মনে করব না। তোমার অধিকার আছে বলার। হ্যাঁ, প্রথমদিন হয়তো কষ্ট পেয়ে রিয়েক্ট করেছিলাম, কান্না করেছিলাম। কিন্তু এখন নিজেকে বুঝিয়েছি যে, এসব স্বাভাবিক। মানুষের নিজস্ব ভালো লাগা, নিজস্ব চয়েস তো থাকবেই। সবজায়গায় আমি তো সবার উপরে থাকব না।সবার প্রথম চয়েসও আমি হবো কথা নেই। তুমি চাইলে এখন ও কণাকে পুত্রবধূ বানাতে পারো। আমি কিছু মনে করব না। ”
দ্বিতী কি সুন্দর করে হেসে হেসে মৃদু স্বরে কথাগুলো বলল। যেন সত্যিই সে কিছু মনে করবে না। সাজিয়া আফরোজ এই মুখের হাসিটা দেখেই বলে উঠলেন,
“ দ্বিতী..প্লিজ আমাকে আর ছোট করিস না দ্বিতী। আমাকে কি তোর এতোটাই নিচু মনে হয়? একটা মেয়েকে নিজেই চেয়ে পুত্রবধূ করে এনে এখন অন্য কাউকে পুত্রবধূ হিসেবে চাইব? ওকে ভালোবাসি ঠিক। কিন্তু তোকে কষ্ট দেওয়াটাও আমার উদ্দেশ্য ছিল না দ্বিতী। সত্যি বলি? আমার ছেলেটা তোকে অনেক ভালোবাসে দ্বিতী। অনেকটা। যখন দেখলাম সাক্ষ্য একদিন তোর হাত থেকে বেখেয়ালে পড়ে যাওয়া চুড়িটক হাতে নিয়ে হাসছিল আর যত্ন করেই তা ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখছিল সেদিনই বুঝলাম আমার ছেলেটা উপরে উপরে তোকে ভালোবাসা না দেখালেও ভালোবাসে। সে হিসেবেই তোর আম্মুকে প্রস্তাব রেখেছিলাম। সাক্ষ্য প্রথমে রাজি না হওয়ার ভান করলেও আমি ঠিকই বুঝেছিলাম ও রাজি। ওকে তো জানিস। একটু ভাব দেখানো। আমার দুটো ছেলেই এমন। ভেতরে যা তা বাইরে প্রকাশ করে না। আবার বাইরে যা তা ভেতরের সবই না৷ কিন্তু তার মানে এই না আমার ছেলে তোকে ভালোবাসে না দ্বিতী। এই কয়টা দিনে আমি স্পষ্ট দেখেছি দ্বিতী। স্পষ্ট দেখেছি আমার ছেলেটা কি ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিল। গুমরে মরছিল। আমার ছেলেটা তোর জন্য কেঁদেছে ও দ্বিতী। প্লিজ আমার ছেলেটাকে কষ্ট দিস না দ্বিতী। প্লিজ। ”
দ্বিতী শুনল। অবশেষে হেসে বলল,
“ বাদ দাও ওসব। সেদিনের ঐটুকু ঘটনা আমি মনে রাখিনি আর। বসো বরং। আমি কিছু করে আনি।”
দ্বিতী ঐটুকু বলেই পা বাড়াতে নিল। সাক্ষ্যর মা আবারও দ্বিতীর হাতটা চেপে ধরলেন। বললেন,
“ ফিরবি না দ্বিতী? আমার বাসায় আর ফিরবি না আম্মু? ”
দ্বিতী চোখ বুঝে। এইযে একটু আগে বলল সেদিনের ঘটনাটা সে মনে রাখেনি এটা ভুল। মনে আছে! সবটাই মনে আছে। এখনো দমবন্ধ লাগে ওর। এখনও কান্না পায়। বলল,
“ ফিরব না তো বলিনি সাজি আম্মু। না ফিরলে তো মানুষ আমার আম্মুর দিকে যেভাবে আঙ্গুল তুলে ব্যর্থতা দেখায় ঠিক সেভাবেই আমাকেও বলবে, আমি সংসার করতে পারিনি। বলবে না? সে অনুযায়ী আমি তো ব্যর্থ হতে পারি না। ”
“ দ্বিতী.. আম্মার হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি তো। প্লিজ ফিরে চল আম্মু। আরেকটাবার…”
দ্বিতী হাত ছাড়িয়ে নিল। একটু হেসে বলল,
“ আমি পার্ফেক্ট হয়ে ফিরব সাজি আম্মু। দক্ষ সংসারী হয়ে ফিরব। যাতে কেউ আমার দিকে আঙ্গুল তুলতে না পারে। যাতে কেউ আমায় ব্যর্থ বলতে না পারে। আমার সময় চাই সাজি আম্মু। ততদিন অব্দি আর ফেরার অনুরোধ করো না। সময় হলে ঠিকই ফিরব।”
এইটুকু বলেই দ্বিতী ফের আবারও পা বাড়াল রান্না ঘরের দিকে। কিছু তৈরি করে উনাদের দিবে এই ইচ্ছে নিয়ে রান্নাঘরে গেলেও নিজের শরীরে, জ্বর দুর্বলতা ইত্যাদির জন্যই শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারল না মেয়েটা। নিভুনিভু চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে উঠতেই রান্নাঘরের মসৃণ ফ্লোরটায় আঁছড়ে পড়ল শরীরটা। শরীরের নিয়ন্ত্রন হারিয়ে জ্ঞান হারানো শেষ মুহূর্তটুকুতে সে চোখ বুঝল। একটা বিধ্বস্ত এক দেহ যেন লুটিয়ে পড়ে আছে।
বাইরের ঘর থেকে দপ করে কিছ পড়ে যাওয়ার আওয়াহ শুনেই ছুটে এলেন সাজিয়া আফরোজ, সাদাদ এহসান ও অদিতি আহমেদ। মেয়েকে ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখে অদিতি আহমেদই ছুটে গেলেন সর্বপ্রথম। মেয়ের শরীর ছুঁয়ে ডাকতে নিতেই বুঝে উঠলেন উত্তাপময় শরীরটা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। কি ভীষণ জ্বর। অথচ মেয়েটা এই অবস্থায় এসেছে রান্নাঘরে। সাদাদ এহসান একবার দ্বিতীর কপাল ছুঁয়েই জ্বর বুঝে চিন্তিত হলেন। দ্বিতীকে কোলে তুলে বিছানায় নিয়ে বললেন,
“ মেয়েটারও দেখছি জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। সাজি, সবটা তোমার জন্যই। সেদিন এমনটা না করলে তো ছেলেমেয়ে দুটোর আজ এই অবস্থা হতো না। ”
সাজিয়া আফরোজ উত্তর করতে পারলেন না। সাদাদ এহসান ততক্ষনে পরিচিত এক ডক্টরকে কল করে বললেন আসতে। পুণরায় কল দিলেন সাক্ষ্যকে। দৃঢ় স্বরে বলল,
“ কোথায় তুমি? এমন ছন্নছাড়া স্বামী হলে বিয়েই বা করেছো কেন? বউ আগলে রাখতে জানো না আবার বউয়ের অভাবে জ্বর নিয়ে ঘুরো? ”
সাক্ষ্য কিছুটা সময় চুপ থেকে বাবাকে বলল,
“ কি হয়েছে? ”
“ তুমি কোথায়? ”
“ ভার্সিটিতে। কেন আব্বু? দ্বিতী ঠিক আছে? ”
“ বউয়ের অসুস্থতা সম্পর্কে খবর রাখো না, রাগ ভাঙাতে পারো না, দুঃখ মুঁছতে পারো না। কেমন স্বামী হয়েছো? এতগুলো দিন কেবল দেখছিলাম তোমার দৌড় কতদূর। তারপর দেখলাম দৌড়াবে কি, তুমি কি হাঁটতেই পারো না ঠিকঠাক। দ্বিতীদের বাসায় এসো। মেয়েটা অসুস্থতায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। ”
সাক্ষ্য বোধহয় এবারে চিন্তায় অস্থির হলো। দ্রুত বলল,
“ কি হয়েছে ওর? ঠিক আছে আব্বু? মেডিসিস নিয়েছে? আব্বুউ..”
“ থাপ্রে দাঁত ফেলে দিব বেয়াদব। বউ কার? খেয়াল রাখা উচিত ছিল কার? বউয়ের রাগ ভাঙানোর উচিত ছিল কার? তা না করে নিজেও গাছাড়া ভাব নিয়ে পড়ে ছিলে। নিজেকে দেবদাসের মতো করে রেখে দূরে দূরে থাকলেই তোমার বউয়ের রাগ ভাঙবে না সাক্ষ্য। তোমার তো উচিত ওর সাথে সাথে থাকা। এতোটা কষ্ট পেয়ে মেয়েটা কি না কি করে বসে। তোমার তো উচিত ছিল এই বাসাতেই থাকা। মিনিটে মিনিটে সরি বলে রাগ ভাঙানো। সরি না বলেও কাজ না হলে ভালোবাসি বলতে। অথচ তুমি নিজের ভাব দেখাতে দেখাতে মেয়েটা এখন ধরেই নিয়েছে তুমি তাকে কখনোই ভালোবাসোনি। ”
“ ভালোবাসি বললে ও এখন আর বিশ্বাস করে না। ভাবে হয়তো সিচ্যুয়েশনে পড়ে বলছি। আর ওর সাথে থাকা? আব্বু.. দ্বিতী সেদিন রাতে সুইসাইডও করতে গিয়েছিল। আমার সেদিন কি অবস্থা হয়েছিল জানো? আরেকটু হলেই বোধহয় আমার দমবন্ধ হয়ে আসত। সেদিন..সেদিন সে বলেছে ও নিজের মতো বাঁচতে চায়। আমি সামনে এলে নাকি ওর সবটা আরো মনে পড়বে৷ আমি শুধু ওকে হারাতে চাইনি আব্বু। এই কারণেই ওর সামনে যাওয়ার সাহস করিনি।”
“ গুড। এখন কি তোমায় এর জন্য মাথায় নিয়ে নাচব? তুমি আর তোমার আম্মু দুইজনেরই কোন বোধবুদ্ধি নেই সাক্ষ্য। কথা না বাড়িয়ে এখন এসো একটু তাড়াতাড়ি। ”
সাদাদ এহসান কলটা রাখলেন তখনই। বাবা হয়ে নিশ্চয় এর বেশি বলবেন না আর?আর কতটুকু বললেই বা বুঝবে? মাথামোটা! মনে মনে এসব বলতে বলতেই কল রেখে দ্বিতীকে দেখলেন। ততক্ষনে চোখে পানি দিয়ে মেয়েটার জ্ঞান ফিরেছে। একটু পরই ডক্টর এল। ঔষধ দিলেন। তার খানিকটা সময় পরই সাক্ষ্য এল।শরীর প্রায় ভেজা। বাইরে তীব্র বর্ষনের দরুণই গা ভিজে গিয়েছে। মাথার চুলগুলো থেকেও পড়ছে টপাটপ পানি। সাক্ষ্য দ্বিতীদের বাসায় পা ফেলতেই সর্বপ্রথম অদিতি আহমেদকে দেখে ছোটশ্বাস ফেলল। ফের নিজের আব্বুর দিকে চাইতেই সাদাদ এহসান বলে উঠলেন,
“ অদিতি? ওরা দুইজন একটু কথা বলুক? তোমার নিষেধ আছে কি? ”
অদিতি আহমেদ আজ আর কিছু বললেন না। চুপ করে মত দিতেই সাক্ষ্যর নিজের ব্যাকুল হৃদয়টা নিয়ে দাঁড়াল দ্বিতীর রুমের সামনে। বুকের ভেতর প্রথম প্রেমের পড়ার মতোই উত্তেজনাময় একটা অনুভূতি হলো যেন। যেন বহুকাল পর দ্বিতীকে সামনে থেকে দেখার আনন্দে হৃদয়টা কিঞ্চিৎ শিহরিত হলো। সাক্ষ্য যখন পা বাড়িয়ে রুমে এল দ্বিতী তখন জানালার দ্বারে দাঁড়ানো। দৃষ্টি জানালার দিকেই নিবদ্ধ। সাক্ষ্য চাইল। মেয়েটাে মুখটা শুঁকিয়েছে আগে থেকে। চোখের নিচে কালিটা চোখে পড়ছে। এমনকি এলোমেলো চুলগুলোও। কেমন যেন বিধ্বস্ত রূপ। সাক্ষ্যর হাঁসফাঁস লাগে। অসহায় স্বরে বলল,
“ নিজের এহেন দশা করেছেন কেন মিসেস এহসান? ঠিকই তো বলেছিলেন নিজের যত্ন নিবেন, নিজেকে ভালোবাসবেন। তাহলে? ”
দ্বিতী চাইল এবারে পরিচিত স্বর শুনে।সাক্ষ্যর নিজেরও হাল বুঝি খুব সুন্দর দেখাচ্ছের?চুল দাঁড়ি তুলনামূলক বড়ই ঠেকছে। চাহনিতে ক্লান্তি। চেহারাটাও বিধ্বস্ত। ভেজা চুলগুলো থেকে পানি পড়ছে টপাটপ। অতঃপর চাহনি সরিয়েই সাক্ষ্যকে এড়িয়ে চলে যেতে নিয়ে বলল,
“ আপনি? কেন এসেছেন সাক্ষ্য? ”
দ্বিতী যখন তাকে এড়িয়ে পা বাড়াতে নিল তখনই সাক্ষ্য চাইল কেমন অভিযোগ নিয়ে। দ্বিতীর কি এতগুলো দিনে সাক্ষ্যর প্রতি একটুও মায়া হলো না? একটুও কষ্ট হলো না? অতঃপর আচমকাই দ্বিতীর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল সাক্ষ্য। প্রিয় নারীর চোখে এতোটা অবহেলা, অবজ্ঞা মানতে না পেরেই নিজের দিকে টেনে এনে আচমকা জড়িয়ে ধরল সাক্ষ্য। বিড়বিড় করে বলল,
“ অনেক এড়িয়ে চলেছেন দ্বিতী। অনেক দূরত্ব বজায় রেখেছেন। প্লিজ.. আর দূরত্ব টানবেন না দ্বিতী। আমার কষ্ট হয়। যন্ত্রণা হয়। আপনার থেকে অবহেলা নিতে পারি না আমি। আমার দমবন্ধ লাগে। ছটফট লাগে। অস্থির হয়ে আপনার অপেক্ষায় থাকি আমি। অথচ আপনার কি আমার প্রতি একটুও মায়া হয় না দ্বিতী? একটুও না? আমার দোষটা কি বলুন? কি দোষ? কণাকে আমি সত্যিই বিয়ে করতে চাইনি কখনো। কখনো না। বিশ্বাস করুন দ্বিতী। বিশ্বাস করুন, আম্মু বা নানু যা বলেছে তা ধরে নিয়ে আমায় এতোটা শাস্তি দিবেন না। আমি আর নিতে পারছি না। আপনার শূণ্যতায় কি ভীষণ যন্ত্রণা তা আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন না দ্বিতী। পারবেন না বুঝতে..”
দ্বিতী কেমন জড় পদার্থের ন্যায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সাক্ষ্যর আঁকড়ে ধরা হাতে নিজের সমস্ত শরীর লেপ্টে থাকা সত্ত্বেও কেমন নিস্পৃহ, নিষ্প্রাণ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল যেন সে। অথচ সাক্ষ্যর ভেজা শার্টের দরুন ভিজে উঠল দ্বিতীর জামাটাও। শরীরটা পানিতে জুবুথুবু হলেও ওভাবেই থাকল সে। সাক্ষ্য ফের বলল,
“ দ্বিতী প্লিজ..প্লিজ ফিরে চলুন না আমার কাছে আরেকটাবার। আরেকটাবার দ্বিতী..আমায় আরেকটা সুযোগ দিন দ্বিতী। দ্বিতী? আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারছি না। আপনাকে না দেখে থাকতে পারছি না। আড়ালে আবড়ালে আপনাকে সূক্ষ্ম নজরে পরখ করতে না পেরে হাঁসফাঁস করি এখন। আপনাকে জ্বালাতে না পেরেও আমার দিনগুলো খারাপ লাগায় ঢেকে যায়। আমি কতগুলো রাত ঘুমাইনি দ্বিতী। আমি কতগুলো দিন নিজের হৃদয়ে শান্তি অনুভব করিনি দ্বিতী। কতগুলো দিকে আপনাকে চোখ ভরে দেখেনি। একটাবার জড়িয়ে ধরিনি। দ্বিতী? চলুন না আমার কাছে ফিরে। দ্বিতী? এই দ্বিতী? কথা বলবেন না আমার সাথে?”
দ্বিতী এই পর্যায়ে চোখ বুঝল। সাক্ষ্য ফের অসহায়ের মতো করে বলল,
“ কি করলে ক্ষমা করবেন দ্বিতী? কি করলে ফিরবেন? কি করলে আম্মুর আর নানুর কথাগুলো ভুলে যাবেন দ্বিতী? কি করলে আমায় আবার ভালোবাসবেন? কি করলে আরেকটাবার আমার বউ হয়ে আমার বাহুডোরে জড়িয়ে নিবেন? বলুন না দ্বিতী? ”
দ্বিতী ছোটশ্বাস ফেলল এবারে। জ্বরে উত্তপ্ত শরীরটা সাক্ষ্যর ভেজা শরীরের সান্নিধ্যে এসে যখন ভিজে বসল তখন দ্বিতীর শীত করল। শিরশিরে শীতশীত অনুভূতি নিয়েই সে সাক্ষ্যকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিল আচমকা। কেমন নির্জীব বস্তুর মতো নিজেকে সরিয়ে নিয়ে দু পা পিছাতেই সাক্ষ্য বোধহয় অবচেতন মনেই দ্বিতীর উত্তরটা না ধরে নিল। বুঝে নিল, দ্বিতী ফিরবে না। ফিরবে না তার কাছে। সাক্ষ্য লাল টকটকে চোখজোড়া এবার কেমন যেন হয়ে এল। অতঃপর আরো একবার দ্বিতীকে জড়িয়ে ধরে চাইল সে। পরমুহূর্তেই পরাজিত সৈনিকের মতোই দ্বিতীর কাঁধে মাথা ঠেকাল। চোখের উষ্ণ পানির উপস্থিতি জানান দিয়ে আওড়াল,
“ দ্বিতী? দ্বিতী? ফিরবেন না আমার কাছে? এতোটা নিষ্ঠুর কি করে হতে পারেন দ্বিতী? এই জেদটা কি আসলেই আমার উপর ফলানো উচিত দ্বিতী? বলুন না..উচিত? আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারব না দ্বিতী। পারব না। আমার ছটফট লাগে অস্থির লাগে। আমার আপনাকে ছাড়া চলবে না দ্বিতী। আপনার সাথে কথা না বলে আমি থাকতে পারব না। আপনার মুখ না দেখলে দমবন্ধ লাগে। আপনার উপস্থিতি না পেলে অস্থির লাগে। তবুও ফিরবেন না? ভালোবাসবেন না? ”
দ্বিতী হাসল কিঞ্চিৎ। সাক্ষ্যর চোখের উষ্ণ পানিটা বুঝতে বাকি নেই তার। তবুও ভাঙা স্বরে বলল,
“ সাক্ষ্য? শেষ একটা প্রশ্ন করছি। আপনি কি আসলেই আকদটা মন থেকে খুশি হয়ে করেছিলেন? আমায় মন থেকে চেয়েছিলেন সাক্ষ্য? নাকি কণাকে? হতেই পারে এখন আপনি বা আপনার পরিবার আমায় মনভোলানো বাক্য বলে ভুলাতে চাইছেন। হতেই পারে। ”
“মন ভুলানো বাক্য? আপনার বিশ্বাস হয়না আমি যে আপনাকে ভালোবাসি?”
“ উত্তর দিন। মন থেকে করেছিলেন বিয়েটা? তাহলে রাগ দেখিয়েছিলেন কেন? আর আপনার নানু কেন বলল আমার আম্মু অনুরোধ করেছিল বলেই বিয়েটা করেছেন? কেন? ”
সাক্ষ্য আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মেয়েটাকে। অতঃপর ঘাড়ে ওভাবেই মুখ গুঁজে বলল,
“ ভালোবাসি, ভালোবাসতাম, ভালোবাসব দ্বিতী। আমি ছোট বাচ্চা নই নিশ্চয়? তাহলে? আম্মু আব্বু বললেই আপনাকে বিয়ে করে নিব আমি? বুঝতেন না আমার আচরণে? ভালো না বাসলে আপনার কাছ ঘেষাঘেষি করতাম না। ভালো না বাসলে আপনাকে নজরে নজরে রাখতাম না। ভালো না বাসলে আপনাকে বিয়েও করতাম না। ভালোবেসেছি বলেই করেছি। রাগ দেখানোটা তো আমার আজন্মের ভুল হয়ে থাকবে। সেদিন উপরে উপরে নিজের দাম রাখতে গিয়ে আজ নিজের ভালোবাসাটাই বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আর অনুরোধ? সেদিন আকদের আগে আম্মু আমায় ডেকেছিল। বলেছিল উনাদের সেপারেশনের বিষয়টা। যাতে আমার সমস্যা না হয়। আর সে ডেকে নেওয়াটাকেই হয়তো নানু ভেবে নিয়েছিল যে অনুরোধ করেছিল। নয়তো আড়ালে আর কিই বলবে এমনটাই হয়তো ভেবে নিয়েছিল। ”
ফের বলল,
“ নানুর কথা মতো আমার ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহ করবেন না দ্বিতী। নানু কেন, যে কেউ বললেই তা বিশ্বাস করে নিবেন না। জানবেন না, আপনার হাজব্যান্ড আপনাকে ভালোবাসে। খুব ভালোবাসে। প্রকাশ না করে তার বুকে আপনার এক সমুদ্র গুপ্ত অনুভূতি আছে। আপনার জায়গাটা তার কাছে অনেক উপরে…”
দ্বিতী হাসল মদু এবারে। অতঃপর বলল,
“ আপনার স্ত্রীকে আপনার বাড়ির মানুষজন, আত্মীয় স্বজন কিভাবে সম্মান দিবে জানেন সাক্ষ্য? কিভাবে আপনি তাকে ট্রিট করছেন তার উপর ভিত্তি করে। কিভাবে আপনি তাকে গুরুত্ব তার উপর নির্ভর করে। সেখানে আপনি তো কোনদিন পরিবারের সামনে এটাই স্বীকার করেননি যে আপনি বিয়েটায় রাজি ছিলেন। কখনোই কাউকে বুঝাননি যে আপনি আপনার বউকে ভালোবাসেন। সেখানে ওদের দোষই বা কোথায়? আমার জায়গাটা অতি ঠুনকো ভাবা তাদের অন্যায় নয় সাক্ষ্য, আপনার অন্যায় ছিল। ”
“ ছিল তো। এবারের মতো ক্ষমা করে দিন দ্বিতী। আর কখনো..”
বলতে বলতেই সাক্ষ্য মাথা তুলে চাইল। দ্বিতী ও তাকাল স্পষ্ট নজরে।সাক্ষ্যর লাল টকটকে চোখজোড়ায় চেয়ে মৃদু শ্বাস ফেলে বলল,
“ বাসায় ফিরে যান। আব্বু আর সাজি আম্মুর খুব আফসোস তাদের ছেলে ভালো নেই। সো, ভালো থাকুন, ভালো রাখুন নিজেকে। যত্ন নিবেন নিজের।”
সাক্ষ্য বোধহয় আশাহত হলো। বলল,
“ আপনি? যাবেন না? ”
“ আমার সময় লাগবে সাক্ষ্য। আমি নিজেকে আরো পরিপক্ব ঘরোনী করে গড়ে তুলেই সংসারে পা রাখব। পার্ফেক্ট হতে হবে। একদম পার্ফেক্ট। যাতে কেউ আমার দিকে আঙ্গুল তুলতে না পারে, কেউ আমার আম্মুর দিকে আঙ্গুল তুলতে না পারে। ”
“ লাগবে না পার্ফেক্ট হওয়া। আমার এই ইমপার্ফেক্ট দ্বিতীকা তাসনিমকেই চাই।”
“আপনার চাওয়ার গুরুত্ব দিয়ে আমি সংসারে চলে যেতে পারব না সাক্ষ্য। যদি কখনো সংসারে নাও ফিরি তাহলে আপনি হয়তো নতুন কাউকে জীবন গুঁছাবেন৷ জীবন কারোর জন্য কখনো থেমে থাকে না সাক্ষ্য। আপনিও ঠিক জীবনে কাউকে না কাউকে পেয়ে যাবেন। কিন্তু এই আপনারাই একটা সময় পর বলবেন যে আমি সংসার করতে পারিনি৷ আমি ব্যর্থ হয়েছি সংসারে। আমি ব্যর্থ! আমি তো এই তকমা গায়ে নিব না সাক্ষ্য। আমি যে আপনাকে ভালোবেসেই সংসারে ফিরব এমন নয় সাক্ষ্য। আমার জেদের কারণেই কারণে ফিরব। দেখাতে হবে না ভাঙা সংসারের মেয়েরাও সংসার করতে পারে? তাই ফিরব৷ আর যদি পার্ফেক্ট হয়ে না ফিরি তাহলে আজ নাহয় কাল যেকেউ আঙ্গুল তোলার সাহস করতে পারবে। হয়তো কোনদিন আপনিও করবেন। আজকে আপনি এমন আছেন মনেই যে চিরকালই এমন থাকবেন তার নিশ্চয়তা নেই। সুতারাং প্রত্যেকটা মেয়েকেই আগে নিজেকেই মজবুত করে গড়ে নিতে হবে। যাতে কেউ কষ্ট দেওয়ার সুযোগই না পায়।”
সাক্ষ্যর বোধহয় নিজেকে এই পর্যায়ে অসহায় বোধ হলো। এই যে দ্বিতী ফিরবে বলল এতে আনন্দ হওয়ার বদলে তার নিজের প্রতি জম্মাল বিতৃষ্ণা। সে বোধহয় দ্বিতীকে এতোটাই কষ্ট দিল যে, দ্বিতী এখন তাকে আর ভালোবাসার নজরে দেখে না। এই যে কথাগুলো বলছে, দ্বিতী একটাবারও আগের মতো করে চঞ্চলতা নিয়ে বা হেসে বলেনি। একটাবারও বলে সাক্ষ্যকে ভালোবেসে সাক্ষ্যর কাছে ফিরে আসবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। বলল,
“আপনি বদলে গিয়েছেন দ্বিতী। জানি, এই বদলটার জন্য আমিই দায়ী। আমার নিজের প্রতি আসলেই ক্ষোভ জন্মায় দ্বিতী। কেন প্রথম থেকেই আমি পার্ফেক্ট হতে পারলাম না? ”
“ কারণ, আমিই আপনাকে ভালোবেসেছিলাম প্রথমে। আপনার মনে হয়েছিল, যে মেয়েটা আমার জন্য পাগল তাকে আবার ভালোবাসা দেখাব কিসের জন্য? তাও আবার জনসম্মুখে? ছিহ ছিহ।দাম কমে যাবে না? আপনার মতো সুন্দর একটা ছেলে, যার জন্য মেয়েরা পাগল সে কেন অযথা একটা মেয়ের জন্য ভালোবাসা দেখাবে?”,
সাক্ষ্য চোখ বুঝে। না। এমনটা নয়। সাক্ষ্য তো শুধু দ্বিতীকে জ্বালিয়ে মজা নিত। দ্বিতীকে রাগাতে ভালো লাগত, লজ্জায় ফেলতে ভালো লাগত। তখন কি জানত এই সামান্য ভাব দেখানো টুকুই এতদূর পৌঁছাবে?
সাক্ষ্যরা সেদিন সত্যিই ফিরে গেল। বিনিময়ে নিয়ে গেল অপেক্ষা। দ্বিতী এখনো যোগাযোগের কোন পথ খুলেনি।তবে সাক্ষ্যর আব্বু আম্মু, কথা এবং সাম্যর সাথেও মেয়েটা রোজই যোগাযোগ করে। শুধু সাক্ষ্যর সাথেই যোগাযোগ করে না। যাদের জন্য এতকিছু হলো তাদের সাথে দ্বিতীর এতদিনে খুব ভাব জমে গেলেও সাক্ষ্যর সাথেই তার আর কথা হলো না, দেখা হলো না। কিছুই হলো না। সাক্ষ্যর মাঝেমাঝে অসহায় লাগে খুব করে। দ্বিতী ভার্সিটিতেও যায় না যে একপলক দেখতে পাবে। সাক্ষ্য যখন দ্বিতী নামক মেয়েটার জন্য ছটফট করছিল ঠিক তখনই দ্বিতীর মা কল করল। বলল,
“ সাক্ষ্য? দ্বিতী কি তোমাদের বাসায় গিয়েছে? সকালে বন্ধুে সাথে ঘুরতে বলে যে বের হলো আর ফোনেই পাচ্ছি না মেয়েটাকে। খেয়াকেও ফোনে পাচ্ছি না। কোথায় গেল জানো কিছু? ”
সাক্ষ্য তখন ভার্সিটিতেই ছিল। প্রায় দুই সপ্তাহ সে দ্বিতীকে দেখেনি। কথা বলেনি।আর এতগুলো দিন পর দ্বিতীকে ফোনে পাচ্ছে না বলে চিন্তায় অস্থির লাগলেও শান্ত স্বরে বলল,
“ তা তো জানি না। আমি দেখছি আম্মু। ”
দুইজনাতেই পর্ব ৪৩
এখন দুপুর। ভার্সিটিতে আজ দ্বিতীর কোন বন্ধুকেই দেখা গেল না।আসেনি একটাও। সাক্ষ্য না পেরে কিয়ানের ফোনেই কল দিল। কিন্তু কিয়ানকেও যখন পাওয়া গেল না তখন কল দিল সাদাবকে। অথচ ওর ফোনেও কল গেল ঠিক। রিং ও হলো কিন্তু কেউ ফোন তুলল না। সাক্ষ্যর এবারে চিন্তায় দমবন্ধ লাগে। চার পাঁছজনের বন্ধুমহলে একজনও কল না তোলার মানে কি? কোথায় গিয়েছে ওরা? নাকি কিছু হলো? সাক্ষ্য চোখ বুঝে। আর ভাবতে পারল না। মাথা ঝিমঝিম করছে কেমন। লাগাতার কিয়ান আর সাদাবকে কল দিতে দিতেই সে পা বাড়াল দ্বিতীদের ক্লাসরুমটার দিকেই। যদি কেউ জানে ওরা কোথায় গিয়েছে।
