Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৯

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৯

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৯
সুমাইয়া ইসলাম নূর

সকাল ঠিক দশটা বাজে
জানালার কাঁচ ভেদ করে কোমল সোনালি রোদ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো চৌধুরী ভিলাজুড়ে। আকাশজুড়ে তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। বাগানের নানা রঙের ফুলে জমে থাকা শিশিরবিন্দু সূর্যের আলোয় চিকচিক করে উঠছে। চারপাশে ভেসে আসছে পাখিদের কলকাকলি। বিশাল চৌধুরী ভিলার প্রতিটি কোণে আজ এক অদ্ভুত আবেগময় পরিবেশ বিরাজ করছে বিদায়ের মুহূর্ত যত ঘনিয়ে আসছে, সবার মন ততই ভারী হয়ে উঠছে।
সব প্রস্তুতি শেষ করে ইউভি আর ইনায়া প্রথমেই রিমঝিম চৌধুরীর রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
রুমে ঢুকতেই দেখা গেল, রিমঝিম কোলে করে ছোট্ট রাজপুত্রকে নিয়ে বসে আছে। গোলগাল মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে ছোট্ট বাবুটি নিজের মতো হাত-পা নাড়ছে।ইনায়ার মুখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে আলতো করে ছোট্ট বাবুটাকে কোলে তুলে নিল।মায়াভরা কণ্ঠে বলল,

— “আমার ছোট্ট ভাই বোনু অনেকগুলো দিন তোমাকে দেখতে পারবে না ভালো ছেলে হয়ে থাকবে, ঠিক আছে? কথা বলতেই ছোট্ট বাবুটি খিলখিল করে হেসে উঠল।ইউভিও এগিয়ে এসে শিশুটার নরম গালে আলতো করে চুমু খেল। তারপর নিজের আঙুলটা বাড়িয়ে দিতেই ছোট্ট হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে ফেলল।দৃশ্যটা দেখে রিমঝিম মৃদু হেসে বলল,দেখেছিস চিনে ফেলেছে ওর ইউভি ভাইয়া কে।। কিছুক্ষণ ছোট্ট বাবুটার সঙ্গে সময় কাটিয়ে ইনায়া ধীরে ধীরে তাকে আবার রিমঝিমের কোলে ফিরিয়ে দিল।রিমঝিম উঠে এসে দু’জনকে একসঙ্গে জড়িয়ে ধরল।
মুখে হাসি থাকলেও চোখ দুটো ভিজে উঠেছে।
ভালো থাকিস তোরা। আর নিজেরা নিজেদের খুব ভালো করে আগলে রাখিস। ইউভি মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।”ইনশাআল্লাহ, পি। রিমঝিমও হাসিমুখেই দু’জনকে বিদায় জানিয়ে দিল।এরপর ইউভি আর ইনায়া একে একে বাড়ির প্রতিটি সদস্যের কাছ থেকে বিদায় নিতে লাগল।ড্রইংরুমে তখন পরিবারের সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
ঠিক তখনই লিখন চৌধুরী মুচকি হেসে বললেন,
ইউভি, আমাদেরও কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
ইউভি ভ্রু তুলে মৃদু হেসে বলল,বলো বাবা।”

আমাদদের যত গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক অনুষ্ঠান আছে আর দুই ঈদ—এসব সময় কিন্তু তোরা দু’জন আমাদের সঙ্গেই থাকবি কথা দে দুজনে ইউভি এক মুহূর্ত দেরি না করেই মাথা নাড়ল ঠিক আছে বাবা কথা দিলাম। যত ব্যস্ততাই থাকুক, পরিবারের বিশেষ দিনগুলো কখনো মিস করব না।”কথাটা শুনে সবার মুখেই তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।ঠিক তখনই পিয়াসা এগিয়ে এসে ইউভিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
ভাইয়া… আমি চাই, আমার ডেলিভারির আগে তুমি আমার পাশে থাকো। ইউভি নিজের ছোট বোনের কপালে স্নেহভরা একটি চুমু এঁকে দিয়ে নরম গলায় বলল,কথা দিলাম, বনু। তোর সব প্রয়জনের সময় আমি অবশ্যই তোর পাশে থাকব। এরপর সে আয়াত, আতিকা আর রিদের মাথায় একে একে হাত বুলিয়ে আদর করে বলল,আমার ছোট্ট টিম… একদম দুষ্টুমি করবে না। প্রতিদিন ভিডিও কলে কথা হবে। আর আমি তোদের জন্য অনেক অনেক খেলনা আর মেকআপ নিয়ে আসব। তিনজনই আনন্দে হেসে ইউভিকে জড়িয়ে ধরল।
এরপর ইনায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল নুসরাত চৌধুরীর কাছে।মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবেগভরা কণ্ঠে বলল,মা… তুমি একদম চিন্তা কোরো না। আমি প্রতি মাসেই অন্তত একবার করে চলে আসব। নুসরাত চৌধুরী নিজের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে মৃদু হেসে বললেন,তোকে নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই, মা। আমি খুব ভালো করেই জানি, ইউভি তোকে আমাদের থেকেও বেশি ভালো রাখবে। একটু থেমে ইউভির দিকে তাকিয়ে আবার বললেন,চিন্তা হচ্ছে ওকে নিয়ে। বাইরে রান্না তো একদমই খেতে পারে না। অফিস, বিজনেস—সব সামলে আবার রান্না করবে কখন? আর তুই তো রান্নাবান্নাও তেমন পারিস না, নূর। ইনায়া মিষ্টি হেসে বলল,তুমি একদম চিন্তা কোরো না, মা। সব সামলে নেব।”

এরপর সে রেশমা চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি পাশে রাখা ছোট্ট একটি ব্যাগ ইনায়ার হাতে তুলে দিলেন।মায়াভরা কণ্ঠে বললেন,নূর, এখানে একটা শাড়ি আর কিছু গয়না আছে। অনেক আগেই তোকে দেওয়ার জন্য কিনে রেখেছিলাম, কিন্তু দেওয়া হয়ে ওঠেনি। সঙ্গে করে নিয়ে যা।”
— “আর শোন, ইউভির জন্মদিনে এই শাড়িটাই পরবি। আর ওর খুব প্রিয় খাবার পায়েস। আমি ভিডিও কলে তোকে সব শিখিয়ে দেব। সেদিন নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াবি, কেমন?”
ইনায়া আবেগে রেশমা চৌধুরীর বুকে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল,দেব, বড় মা। তুমি শুধু আমাকে সাহায্য করবে।”
রেশমা চৌধুরী স্নেহভরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। সে ও ফিসফিস করে বললো দিব।
এরপর ইউভি আর ইনায়া একে একে লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, সাবিহা চৌধুরীসহ পরিবারের প্রত্যেক বড়দের সালাম করে দোয়া নিল।
সবশেষে বিদায়ের মুহূর্ত সত্যিই এসে গেল।

ইনায়া হেঁটে হেঁটে রেদোয়ানের কোমর জড়িয়ে বাড়ির মূল ফটকের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
রেদোয়ান হেসে বলল,বনু, ভাইয়াকে কিন্তু একটু কম বিরক্ত করিস।ইনায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,তোমার ভাইয়াকে আমি বিরক্ত করি? সেই তো সারাক্ষণ আমাকে বিরক্ত করে।”
পাশ থেকে ইউভি হেসে বলল,ভাইয়ের কাছে অভিযোগ একটু কম কোরো, মিসেস চৌধুরী।”
রেদোয়ান আবার মুচকি হেসে বলল,আচ্ছা বনু, সত্যি করে বল তো… আমাদের ছেড়ে যেতে একটুও খারাপ লাগছে না?
ইনায়া দুষ্টু হেসে উত্তর দিল একদম না। যেদিন সত্যি সত্যি তোদের ছেড়ে যাব, সেদিন খুব কষ্ট লাগবে।
হঠাৎ কী মনে হতেই সে থেমে গেল।পরক্ষণেই দ্রুত পেছন ফিরে দৌড়ে আবার পিয়াসার কাছে চলে এল।শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,একদম মন খারাপ করবি না, বেবি। পিয়াসা ভেজা চোখে বলল,
তুই তুবার বিয়েতেও থাকতে পারলি না। ও খুব কষ্ট পাবে। ইনায়া রহস্যময় হাসি হেসে উত্তর দিল,একটুও না। দেখিস, সেদিন ওর থেকে বেশি খুশি আর কেউ হবে না। আর সেই খুশির কারণ হব আমি।
কথাটা বলে আর কিছু না বুঝিয়েই পিয়াসার কপালে আলতো করে চুমু এঁকে দিল।তারপর শেষবারের মতো সবার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে হাত নাড়ল।হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই সবার উদ্দেশে বাতাসে একটি ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিল।ইনায়ার সেই শিশুসুলভ কাণ্ড দেখে ভারী হয়ে থাকা পরিবেশেও সবাই হেসে ফেলল।আর সেই হাসির মাঝেই ইউভি ও ইনায়া নতুন এক যাত্রার উদ্দেশ্যে ধীরে ধীরে চৌধুরী ভিলার ফটক পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।

বেশ কিছুক্ষণ পথ পাড়ি দেওয়ার পর ইউভির গাড়িটি এসে থামল একটি দৃষ্টিনন্দন ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে।গাড়ি থেকে নামতেই ইনায়া বিস্ময়ে চারপাশে তাকিয়ে রইল।বাড়িটা যেন শহরের কোলাহল থেকে অনেকটা দূরে, এক শান্ত-নিরিবিলি পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশজুড়ে সারি সারি সবুজ গাছ, নানা রঙের ফুলে সাজানো সুবিশাল বাগান। গোলাপ, রজনীগন্ধা, জুঁই, বেলি আর বিদেশি অর্কিডের মিষ্টি সুবাসে পুরো পরিবেশটা যেন স্বর্গের এক টুকরো হয়ে উঠেছে। বাগানের মাঝখান দিয়ে পাথরের ছোট্ট পথ সোজা গিয়ে মিলেছে বাড়ির প্রধান প্রবেশদ্বারে। বাড়ির একপাশে ছোট্ট একটি ঝরনা, যেখানে টুপটাপ পানির শব্দ চারপাশের নীরবতাকে আরও মোহনীয় করে তুলেছে। আধুনিক স্থাপত্যে নির্মিত সাদা-ধূসর রঙের ডুপ্লেক্স বাড়িটি প্রথম দেখাতেই যে কারও মন কেড়ে নেবে।এই বাড়িটির কথা আজ পর্যন্ত কেউ জানে না। এমনকি ইনায়াও নয়। শুধু রেদোয়ান আর রিটা ছাড়া এই গোপন ঠিকানার কথা আর কারও জানা নেই।
ইনায়া বিস্মিত চোখে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,বর… এটা কার বাড়ি?ইউভি শুধু মুচকি হেসে তার দিকে তাকাল।সময় হলে সব বলব। আপাতত এটাকে শুধু তোমার আর আমার বাড়ি ভাবো। কথাটা বলেই ইউভি আলতো করে ইনায়ার হাত ধরে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।

বাড়ির ভেতরেও যেন আভিজাত্য আর সৌন্দর্যের নিখুঁত মেলবন্ধন। চারপাশে আধুনিক সাজসজ্জা, বিশাল কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরের সবুজ প্রকৃতি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।ইনায়া ধীরে ধীরে হেঁটে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দূরে ফুলে ভরা বাগানের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।ঠিক তখনই ইউভির ফোন বেজে উঠল।স্ক্রিনে ভেসে উঠল— Mr. Malhotra।
ইউভি কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মিটিংয়ের ব্যাপারে কথা শুরু হলো।শান্ত কণ্ঠে ইউভি বলল,
—মিস্টার মালহোত্রা, আমি তিন দিন পর মিটিংয়ে অ্যাটেন্ড করব। তখন আমরা পুরো প্রজেক্ট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ফোনে কথা বলার মাঝেই জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা ইনায়া মৃদু স্বরে বলল,

— “বর…ইউভি চোখের ইশারায় জানাল, সে শুনছে।
ইনায়া শিশুসুলভ আবদারের সুরে বলল,
আমি লন্ডনে যাওয়ার আগে একবার এহসান মঞ্জিলটা ঘুরে দেখতে চাই। নিয়ে যাবে?ইউভি সঙ্গে সঙ্গে ফোনের কথোপকথন শেষ করে কল কেটে দিল।তারপর মুচকি হেসে ইনায়ার সামনে এসে দাঁড়াল।আমার আদরের কোনো আবদার কি কোনোদিন অপূর্ণ থেকেছে?
কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
সঙ্গে সঙ্গেই রিটাকে কল দিল।কল রিসিভ হতেই দৃঢ় কণ্ঠে বলল,রিটা, ঠিক দশ মিনিটের মধ্যে এহসান মঞ্জিলের সারাদিনের সব টিকিট আমার নামে বুকিং করে ফেলো। ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো,ওকে, স্যার।
কল কেটে ইউভি আবার ইনায়ার দিকে তাকাল।
ইনায়ার চোখে তখন আনন্দের ঝিলিক ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে তৃপ্তির এক মিষ্টি হাসি। তার সেই হাসিটুকু দেখেই ইউভির মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাফল্য বুঝি এই একটি হাসিই

।গোধূলির শেষ আলো তখন ধীরে ধীরে আকাশ ছেড়ে বিদায় নিচ্ছে। পশ্চিম আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে আছে কমলা, গোলাপি আর বেগুনি রঙের মায়াবী আভা। ঠিক সেই সময় কালো রঙের মার্সিডিজ গাড়িটি এসে থামল পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিলের সামনে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত নবাবদের এই রাজকীয় প্রাসাদটি গোলাপি রঙের অপরূপ স্থাপত্যে আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল গম্বুজ, সুদৃশ্য খিলান, দীর্ঘ সিঁড়ি আর নিখুঁত নকশায় সাজানো প্রতিটি দেয়াল যেন অতীতের গৌরবময় দিনের গল্প শোনায়। সন্ধ্যা নামতেই একে একে জ্বলে উঠল পুরো প্রাসাদের আলোকসজ্জা। অসংখ্য সোনালি আলোর ঝলকানিতে গোলাপি প্রাসাদটি যেন মুহূর্তেই রূপ নিল রূপকথার এক রাজমহলে।
গাড়ির দরজা খুলতেই এক ঝলক শীতল বাতাস এসে ছুঁয়ে গেল ইনায়ার মুখ। আজ তার পরনে ছিল হালকা ক্রিম রঙ ও সবুজ রঙের ফুলের লং গাউন। হাঁটুর নিচ থেকে ঢেউ খেলানো ঘের বাতাসে দুলে উঠছে। কোমর ছাপিয়ে নেমে আসা খোলা হালকা লাল চুলগুলো বাতাসে উড়ছে আপন খেয়ালে। গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে দু’হাতে গাউনের দুই পাশ আলতো তুলে ধরে সে দৌড়ে এগিয়ে গেল আহসান মঞ্জিলের দিকে। তার খিলখিল হাসির শব্দে যেন চারপাশের নীরবতাও প্রাণ ফিরে পেল।
আর ঠিক তার কয়েক কদম পেছনে ধীরস্থির ভঙ্গিতে হেঁটে আসছে ইউভি। ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা সুঠাম দেহে দুধসাদা পাঞ্জাবি-পায়জামাই তাকে আরও সুর্দশন করে তুলেছে। এক হাত অনায়াসে পকেটে দিয়ে ঠোঁটের কোণে মুগ্ধ একটুকরো হাসি নিয়ে হাঁটছিল। ইনায়ার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে উঠল,ধীরে… সাবধানে, মিসেস চৌধুরী।

কিন্তু ইনায়া কি আর শোনার মানুষ! সে শুধু হাসতে হাসতে আরও একটু সামনে এগিয়ে গেল। গোধূলির আলো, আলোকসজ্জায় ঝলমলে আহসান মঞ্জিল আর তাদের দু’জনের মুহূর্ত—সব মিলিয়ে দৃশ্যটা যেন কোনো রূপকথার জীবন্ত অধ্যায় হয়ে উঠল।
ইনায়া মুগ্ধ চোখে চারপাশে তাকিয়ে একের পর এক সবকিছু দেখছিল। বিশাল সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে, কখনো দীর্ঘ বারান্দা ধরে হেঁটে যাচ্ছে, আবার প্রাসাদের প্রতিটি দেয়ালের কারুকাজ হাত বুলিয়ে দেখছে। ইতিহাসের প্রতিটি ছোঁয়া যেন তাকে আরও বেশি মুগ্ধ করে তুলছিল।প্রতিটি নতুন জায়গায় গিয়েই সে কৌতূহলী শিশুর মতো ইউভিকে প্রশ্ন করতে লাগল।
এই প্রাসাদটা কে বানিয়েছিলেন?”
ইউভি মুচকি হেসে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,

— “এই প্রাসাদটি উনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত। পরে ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য নবাব আবদুল গনির মালিকানায় আসে। তিনিই তাঁর ছেলে নবাব খাজা আহসানউল্লাহর নামানুসারে এর নাম রাখেন ‘আহসান মঞ্জিল’। সেই থেকেই এটি ‘আহসান মঞ্জিল’ নামে পরিচিত।”ইনায়া বিস্ময়ে চারপাশে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,এত সুন্দর গোলাপি রঙ কেন? ইউভি হেসে উত্তর দিল,এই গোলাপি রঙই আহসান মঞ্জিলের সবচেয়ে বড় পরিচয়। সময়ের সঙ্গে সংস্কার করা হলেও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এই রঙটিই সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাই দূর থেকেই সবাই একে চিনতে পারে।
হাঁটতে হাঁটতে তারা বিশাল গম্বুজের দিকে এগিয়ে গেল।ইনায়া মাথা উঁচু করে তাকিয়ে বলল,
এই গম্বুজটা কত সুন্দর! পুরো বাড়িটা যেন রাজপ্রাসাদ। ইউভি মাথা নেড়ে বলল,একসময় এটি নবাব পরিবারের বাসভবন ছিল। এখানেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভা, অতিথি আপ্যায়ন ও সামাজিক অনুষ্ঠান হতো। সেই সময় ঢাকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও এই প্রাসাদকে ঘিরেই নেওয়া হতো।”
প্রাসাদের ভেতরের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখতে দেখতে ইনায়া আবার প্রশ্ন করল,এখন কি এখানে কেউ থাকে?।ইউভি শান্ত গলায় বলল,না। এখন এটি একটি জাদুঘর। এখানে নবাব পরিবারের ব্যবহৃত অনেক আসবাবপত্র, ছবি, নথি ও ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, যাতে মানুষ আমাদের ইতিহাসকে কাছ থেকে জানতে পারে।”
ইনায়া গভীর মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনছিল।
একটু পর বারান্দায় এসে বুড়িগঙ্গা নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,বর… জায়গাটা সত্যিই অনেক সুন্দর। মনে হচ্ছে ইতিহাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। ইউভি আলতো করে তার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে মৃদু হেসে বলল,

— “সুন্দর জায়গা তখনই আরও সুন্দর হয়ে ওঠে, যখন প্রিয় মানুষটা পাশে থাকে। আর আমার কাছে আহসান মঞ্জিলের চেয়েও সুন্দর তুমি, মিসেস চৌধুরী। কথাটা শুনে ইনায়ার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক টুকরো লাজুক হাসি।
ইনায়ার মাথাভর্তি দীর্ঘ, ঢেউ খেলানো কেশরাশি আজ খোলা। কোমর ছাপিয়ে আরও নিচে নেমে আসা সেই রেশমি চুলের মাঝে খুব যত্ন করে গুঁজে দেওয়া হয়েছে ছোট ছোট সাদা আর হালকা গোলাপি রঙের বুনো ফুলের একটি কোমল ফুলের মুকুট। সন্ধ্যার মৃদু বাতাসে ফুলগুলো আলতো দুলে উঠছে, আর তাদের মিষ্টি সুবাস চারপাশের পরিবেশকে আরও মোহময় করে তুলছে। গোলাপি আভামাখা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইনায়াকে যেন রূপকথার রাজকন্যার চেয়েও বেশি অপার্থিব লাগছে।
ইউভি কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়েই রইল।
তার গভীর দৃষ্টিতে ছিল নিখাদ মুগ্ধতা, ছিল ভালোবাসার অগণিত অনুচ্চারিত ভাষা।
খুব আস্তে ডাকল,মিসেস চৌধুরী…ইনায়া ঘুরে তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে উত্তর দিল “জি?”
ইউভি চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে হালকা হাসল।এই যে এত বড় পুরো প্রাসাদটা… খেয়াল করেছ? এখন এখানে শুধু তুমি আর আমি।”
ইনায়াও চারদিকে তাকিয়ে মৃদু বিস্ময়ে বলল,

— “হুমবএখন তো সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তাই মনে হয় সবাই চলে গেছে। ইউভি ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে মাথা নাড়ল।নো, মিসেস চৌধুরী। আমি আজকের শেষ সময়ের সব টিকিটই বুক করে নিয়েছি। যাতে এই পুরো আহসান মঞ্জিলে আজ শুধু তুমি আর আমি থাকতে পারি।
একটু থেমে দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে আবার বলল,
— “ভাবো তো এত বড় ঐতিহাসিক প্রাসাদে, চারপাশে কি সুন্দর নীরবতা, গোধূলির আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে আর মনে হচ্ছে এই বুঝি বৃষ্টি নামবে । ব্যাপারটা ভীষণ রোমান্টিক না? ইউভির কথা টা শোনা মাএই ইনায়া হেসে ফেলল।
সে ধীরে ধীরে বারান্দার রেলিংয়ের কাছে গিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল।
— “কই? কোথায় মেঘ? আমি তো কিছুই দেখছি না ঠিক তখনই পেছন থেকে ইউভি নিঃশব্দে এগিয়ে এসে আলতো করে ইনায়ার কোমর জড়িয়ে ধরল।
— “সাবধানে, মিসেস চৌধুরী…

এক টানে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল সে।
ইনায়ার পিঠ গিয়ে ঠেকল ইউভির প্রশস্ত, সুঠাম বুকে।কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না।
শুধু দু’জনের নিঃশ্বাসের শব্দ আর দূরের পাখিদের শেষ বিকেলের ডাক মিলেমিশে এক অদ্ভুত শান্তির আবহ তৈরি করল।ইউভি ধীরে ধীরে ইনায়ার কাঁধের ওপর ছড়িয়ে থাকা রেশমি চুলগুলো এক পাশে সরিয়ে দিল।তারপর ইনায়ার মাথায় গুঁজে রাখা ছোট্ট সাদা-গোলাপি ফুলগুলোর খুব কাছে মুখ নিয়ে গভীর করে সুবাস নিল।চোখ দুটো ধীরে বন্ধ হয়ে এলো তার।পরের মুহূর্তেই সে নিজের মুখটা ইনায়ার ঘাড়ের কাছে আলতো করে গুঁজে দিয়ে খুব নিচু, ভারী কণ্ঠে বলল,জানো, আদর… এই ফুলগুলোর সুবাসও তোমার শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণের কাছে একেবারে ফিকে মনে হচ্ছে।
আরও একটু গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ফিসফিস করে বলল,এই ঘ্রাণটাই আমাকে পাগল করে দেয়। ভীষণ নেশা হয়ে যায় এমন এক নেশা, যেটা থেকে আমি কোনোদিন মুক্তি চাই না। পৃথিবীর সব সুগন্ধ যেন তোমার মাঝেই লুকিয়ে আছে আদর ।”

কথাগুলো বলেই ইউভি খুব যত্ন করে ইনায়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল।দু’জনের মাঝে তখন মাত্র এক নিঃশ্বাসের দূরত্ব।ইউভি নিজের কপালটা আলতো করে ইনায়ার কপালে ঠেকিয়ে চোখে চোখ রেখে মৃদু হেসে বলল,এই নেশাটা নিয়েই তোমার সঙ্গে পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে চাই, আদর। মানুষ নাকি নেশা থেকে দূরে থাকতে চাই . অথচ আমি প্রতিদিন ইচ্ছে করেই তোমার নেশায় আরও ডুবে যেতে চাই।”
ইনায়া মৃদু কেঁপে উঠল। ইউভির কণ্ঠের ভারী সুর, চোখের গভীর দৃষ্টি সবকিছুই আজ কেমন যেন অন্যরকম লাগছে।সে মিনমিন করে বলল,আপনাকে স্বাভাবিক লাগছে না, মিস্টার চৌধুরী। আপনার চোখের ভাষা আমি পড়তে পারি… চোখ দুটো অন্য কিছু বলছে দেখুন কেমন লাল হয়ে গেছে। গায়েও মনে হচ্ছে অনেক জ্বর। এমনটা কখন হয়, আমি খুব ভালো করেই জানি। মিস্টার দূরে সরে দাঁড়ান, প্লিজ। না হলে আপনি নিজেই বিপদে পড়বেন।
ইউভি ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটিয়ে বলল,নো, মিসেস চৌধুরী। যদি বিপদে পড়ি… তাহলে দু’জন একসঙ্গেই পড়ব।কথাটা বলেই সে আরও এক কদম এগিয়ে এল।দু’জনের মাঝের সামান্য দূরত্বটুকুও মিলিয়ে গেল।চোখে চোখ রেখে খুব নিচু, কর্কশ কণ্ঠে বলল মাত্র এক মিনিট… শুধু এক মিনিট লাগবে তোমাকে বিপদে ফেলতে তোমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি, আদর।”কথা বলতে বলতেই ইউভি ধীরে ধীরে ইনায়ার এলোমেলো হয়ে থাকা চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিল।

তার আঙুলের উষ্ণ স্পর্শে ইনায়ার সমগ্র শরীর শিহরণে কেঁপে উঠল।সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও চোখ বন্ধ করে ফেলল।বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।আর ইউভি… সেই মুগ্ধ দৃষ্টিতেই একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল তার আদরের দিকে।ইনায়া চোখ বন্ধ করেই কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে কিছু বলতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ইউভি ধীরে আলতো করে তার ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটের আবরণে আটকে নিল।কয়েক মুহূর্তের নীরবতায় যেন চারপাশের সমস্ত শব্দ মিলিয়ে গেল। ধীরে ধীরে যুবকের চুম্বনের গভীরতা বাড়তে লাগল। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল তাদের দু’জনকে ঘিরে।
একসময় ইউভি আস্তে করে নিজেকে সরিয়ে নিল। কপালটা ইনায়ার কপালের সঙ্গে ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ তার চোখের দিকেই তাকিয়ে রইল। তারপর গভীর, কর্কশ অথচ ভালোবাসায় ভরা কণ্ঠে বলল,
— “আদর… তোর এত জ্বালাতন আমি সত্যিই সহ্য করতে পারি না। ভীষণ জ্বালাস তুই। কথাটা বলেই সে হালকা একটা ধাক্কা দিয়ে ইনায়াকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিল। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি লুকিয়ে গম্ভীর মুখ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল,

— “যা… দূরে যা। ওইদিকে গিয়ে দাঁড়া। বলতে বলতেই হাত তুলে ঘরের এক কোণের দিকে ইশারা করল।ইনায়া বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানী গলায় বলল,
আমি আবার কী করলাম? যা করার, সব তো তুমি করলে ।ইউভি একবার চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। যেন নিজের সংযমটাকেই সামলানোর চেষ্টা করছে। তারপর কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
যেতে বলছি, আদর। চুপচাপ যা। আর বেশি বেয়াদবি করিস না… নইলে তোর এই ত্যারামির হিসাব আমি এখনই মিটিয়ে দেব।”
ইনায়া তার মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। পরের মুহূর্তেই হেসে ফেলল। কারণ সে খুব ভালো করেই বুঝে গেছে—ইউভির এই রাগের আড়ালেও লুকিয়ে আছে সীমাহীন ভালোবাসা

কিছু সময় পর দু’জন ধীর পায়ে আহসান মঞ্জিলের বিশাল বাগানজুড়ে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
ইনায়া চারপাশটা গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। মাঝে মাঝেই থেমে ফুলের গন্ধ নিচ্ছে, কখনো দূরের আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। হঠাৎই দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইউভির দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,জানো, বর… এই পাঁচটা বছর আমি আমাদের দেশের মাটিটাকে খুব মিস করব। এই বাতাস, এই গন্ধ, এই মানুষগুলো… সবকিছুই খুব মনে পড়বে।”
ইউভি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করেই গম্ভীর মুখে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
আচ্ছা… কার যেন আজ শপিংয়ে যাওয়ার কথা ছিল? একটু থেমে দুষ্টু হেসে আবার বলল,মনে হয় কেউ একজন ভুলেই গেছে, কাল তার বেস্ট ফ্রেন্ডের মেহেদির অনুষ্ঠান।”
কথাটা শুনতেই ইনায়ার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
— “আরে! সত্যিই তো! বলেই সে প্রায় দৌড়ে এসে ইউভির একেবারে সামনে দাঁড়াল। উত্তেজনায় তার চোখ দুটো চিকচিক করছে।
ইনায়া একগাল হাসি নিয়ে ইউভির হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। তারপর দু’জনে পাশাপাশি হেঁটে বাগান পেরিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

সন্ধ্যার রাঙা আভা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে চারপাশে নেমে এসেছে এক মায়াবী আবেশ। পুরো এহসান বাড়িটা আজ যেন আলো আর রঙের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। বাড়ির প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত সাদা, হলুদ আর সোনালি ফেয়ারি লাইটে ঝলমল করছে চারদিক। গাঁদা, রজনীগন্ধা, গোলাপ আর বাহারি ফুলে সাজানো হয়েছে প্রবেশপথ। ছাদের চারপাশে রঙিন কাপড়ের ড্রেপিং, ঝুলন্ত ফুলের মালা আর ঝাড়বাতির নরম আলো পুরো পরিবেশকে রাজকীয় সৌন্দর্যে ভরিয়ে তুলেছে।
নাতাশা আহসান তাঁদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে কোনো কিছুরই কমতি রাখেননি। অতিথিদের আপ্যায়ন থেকে শুরু করে সাজসজ্জা—সবকিছুতেই ছিল আভিজাত্যের নিখুঁত ছোঁয়া। বাড়ির প্রতিটি কোণ আনন্দ আর উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে উঠেছে।

কিছুক্ষণ পর একে একে চৌধুরী পরিবারের সদস্যরাও এসে পৌঁছালেন। নিজেদের গাড়িতে করে এসেছেন রেশমা চৌধুরী, সাবিহা চৌধুরী, নুসরাত চৌধুরী, লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রবিউল চৌধুরী, রিমঝিম চৌধুরী, রেদোয়ান, পিয়াসা, আয়াত, আতিকা, রিদসহ পরিবারের সবাই। আজ তাঁরা কনের পক্ষের আমন্ত্রণে এসেছেন। বিয়ের দিন আবার সবাই একসঙ্গে বরযাত্রী হয়ে ছেলের সঙ্গে আসবেন।
নাতাশা এহসান হাসিমুখে সবাইকে আন্তরিকভাবে বরণ করে নিলেন।আসসালামু আলাইকুম। আপনারা এসেছেন, আমাদের অনুষ্ঠানটা যেন আরও পূর্ণতা পেল। চলুন, সবাই ছাদে চলুন।”
সবাই হাসিমুখে তাঁর সঙ্গে ছাদের দিকে এগিয়ে গেলেন।ছাদে উঠতেই চোখ আটকে গেল মাঝখানে সাজানো মেহেদির স্টেজে।
আজ তুবাকে যেন সত্যিই রাজকন্যার মতো লাগছে। গাঢ় সবুজ আর সোনালি কারুকাজ করা লেহেঙ্গায় অপূর্ব লাগছে তাকে। হাতভর্তি গাঢ় মেহেদি, মাথায় তাজা ফুলের টিয়ারা, কানে ভারী ঝুমকা, গলায় মানানসই গয়না আর মুখজুড়ে হালকা সাজ—সব মিলিয়ে যেন স্বপ্ন থেকে উঠে আসা কোনো পরী। চারপাশের সবাই একনজর তাকিয়ে থেকেই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
তুবা কে দেখে মনে হচ্ছে তার মুখের হাসির আড়ালেও কোথাও যেন এক চিলতে শূন্যতা লুকিয়ে আছে।ঠিক তখনই দূর থেকে পিয়াসার কণ্ঠ ভেসে এলো—

— “বেবি…!”
শব্দটা কানে যেতেই তুবা মাথা তুলে তাকাল। পরমুহূর্তেই মুখজুড়ে ফুটে উঠল বহু প্রতীক্ষিত হাসি।
পিয়াসা এগিয়ে এসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।কী রে? শরীর ঠিক আছে তো?”
পিয়াসা মাথা নেড়ে মুচকি হাসল। “হ্যাঁ, বেবি।”
পিয়াসা দু’হাত দিয়ে তুবার মুখটা ধরে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল,মাশাআল্লাহ! তোকে আজ কী যে সুন্দর লাগছে! কিন্তু কথাটা শেষ হতেই তুবার চোখ ভিজে উঠল। পরের মুহূর্তেই সে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল।কাঁপা গলায় বলল,ইনায়া আসল না… একবার ফোনও করল না। পিয়াসা আলতো করে তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,আমাকেও তো কল দেয়নি। হয়তো নতুন জায়গায় গিয়ে অনেক ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।তুবা মাথা নাড়ল।তবুও… ও কি আর দুটো দিন পরে যেতে পারত না? ওই বেয়াদবটা কি একবারও ভাবল না, ওকে ছাড়া আমার কতটা কষ্ট হবে?”
এবার রেশমা চৌধুরী এগিয়ে এসে তুবাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলেন মায়াভরা কণ্ঠে বললেন,
“মা, আজ আর কান্না নয়। আজ তোমার হাসির দিন। আল্লাহ চাইলে খুব শিগগিরই আবার সবাই একসঙ্গে হবে। সাবিহা চৌধুরী, রিমঝিম, আয়াত, আতিকা, রেদোয়ান—এক এক করে সবাই তুবার পাশে এসে দাঁড়াল।আজ কোনো কান্না নয় তুবা শুধু হাসি, আড্ডা হবে। সবাই তুবাকে হাসানোর জন্য নানা দুষ্টুমি করছে। ধীরে ধীরে তুবার মনও অনেকটা হালকা হয়ে এলো।
ছাদের একপাশে সারি সারি ফুড স্টল বসানো হয়েছে। ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, বারবিকিউ, আইসক্রিম, কফি—কী নেই সেখানে!
হঠাৎই পিয়াসা তুবার হাত ধরে টান দিল।

— “চল, বেবি! ফুচকা খাই আমার কুট্টুস কুট কুট করে বলছে মাম্মি ফুচকা খাও তুবা হেসে মাথা নাড়ল। তোর কুট্টুস এর জন্য তো কাওয়াতেই হবে
দু’জনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ফুচকা খেতে খেতে পুরোনো দিনের কত স্মৃতিই না মনে করতে লাগল। কখনো স্কুল জীবনের দুষ্টুমি, কখনো কলেজের আড্ডা—একেকটা কথা মনে পড়তেই দু’জনেই হেসে উঠছিল।ঠিক তখনই হঠাৎ পেছন থেকে কেউ এসে দু’জনের কাঁধে আলতো করে হাত রাখল।
পরিচিত সেই কণ্ঠ ভেসে এলো—

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৮

— “এই যে! এত কিছুর আয়োজন করেছিস, কিন্তু মন্টু চার চায়ের ব্যবস্থা করিসনি কেন, কুত্তি? কত দিন হয়ে গেল একসঙ্গে আইসক্রিম আর চা খাই না!”
কথাটা শুনেই তুবা আর পিয়াসা দু’জনেই বিস্ময়ে একসঙ্গে পেছন ফিরে তাকাল।

শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৯ (২)