Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৩

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৩

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৩
নুসাইবা আরা নুরি

আজ বাদে কাল বিয়ে।আজ গায়ে হলুদ শ্রেয়সী আর মেহেরাজের।দুজনের গায়ে হলুদ দুই বাড়িতে হবে।সকালে শ্রেয়সীদের বাড়িতে আর সন্ধাই মেহেরাজ দের বাড়িতে।বিশাল আয়োজন করা হয়েছে দুই বাড়িতেই।মির্জা বাড়ির বাগানে প্যান্ডেল করা হয়েছে গায়ে হলুদের।সেখানে সাউন্ড বক্সে গান চালাচ্ছে বাচ্চারা।ইতিমধ্যে আত্মীয়রা সকলে আসতে শুরু করে দিয়েছে।

সকাল সাড়ে দশটার দিকে বর পক্ষ রওনা হয় সাতটা গাড়ি নিয়ে শ্রেয়সীদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।মেহেরাজের পরনে গায়ে হলুদের পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা।হাতে মেহেদি দেওয়া।যদিও মেহেরাজ এসব পছন্দ করে না।তবে মিলি রা আর শোনেনি।এক প্রকার বাধ্য হয়েই মেহেরাজ মেহেদি দিয়েছে।মেহেরাজের গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে আছে ফাহিম আর পিছনে মিলি আর ইভান।নিশাদ আসতে পারি নি কাল আসবে।ইভান আর ফাহিমের গায়ে হলুদ পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা।মেহেরাজের বিয়ের জন্য সবাই এক সাথে অর্ডার দিয়ে বানানো বন্ধুদের গুলো। তোহার টা তুহিন নিয়ে গেছে। তোহার মিলির আর ইরুর একই রকমের শাড়ি।
তুহিন ইরু তোহা এরা হলো মেয়ে পক্ষ তাই ওরা মেয়েদের ওখানেই।মেহেরাজ দের গাড়ি সবার আগে তার পিছনে বাকি গাড়ি গুলো সবার হাতে গায়ে হলুদের তত্ত্ব।বেলা এগারোটায় মেহেরাজ দের গাড়ি গিয়ে পৌছায় শ্রেয়সীর বাড়ির সামনে।শ্রেয়সীর বাড়ির সামনে বিশাল বিয়ের গেট।সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে আলতাফ শেখ সিয়াম আরো অনেকজন।

সিয়াম গিয়ে মেহেরাজকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনে।সহুরু হয়ে যায় হৈ হুল্লোড়। শ্রেয়সী দের বাড়ির সাদে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান করা হয়েছে।সেখানেই সোফায় বসে আছে শ্রেয়সী।মুখে মিষ্টি একটা হাসি লেগে আছে।ক্যামেরা ম্যান রা ফটোশুট করছে সবার।মেহেরাজ রা আসার পর মেহেরাজ কে শ্রেয়সীর পাশে বসানো হয়।সেদিনের পর আজ আবার সামনা সামনি দেখলো মেহেরাজকে।
বিয়ের শপিং এও মেহেরাজ ছিলনা।যদিও এতে শ্রেয়সীর মন খারাপ হয়নি কারন মেহেরাজ আগেই বলে রেখেছিলো তার কিছু কাজ আছে।অফিস থেকে ফোন দিয়েছে।তাই সময় অডিও কলে সময় দিয়েছে।শপিং এ গিয়েও শ্রেয়সী কে নিজের পছন্দের অনেক কিছু নিতে বলছে।শ্রেয়সীর যা পছন্দ হয়েছে ছবি দিয়েছে মেহেরাজ সিলেক্ট করে দিয়েছে।
মেহেরাজ রা আসার পর পরই হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়।সবাই এক করে এসে দলবেধে হলুদ মাখিয়ে যায় আর সালামি দিয়ে যায়।কেও কেও কেক আর পায়েশ ও খাইয়ে দেয় মুরব্বিরা।এভাবেই হলুদ দেওয়া শেষ হলে সবাই এবার গানের তালে নাচ শুরু করে। প্রথমে শ্রেয়সী এক কাজিন।তারপর আরো অনেক দূর সম্পর্কের আত্মীয়রা।তারপর ছেলেরাও ডান্স করে।

অনুষ্ঠান শেষ করে সবাই কে দুপুরের খাবার দেওয়া হয়।খাওয়া শেষ সবাই ফিরে আসে মির্জা বাড়িতে।মেহেরাজ যে হলুদ পাঞ্জাবি পরে গিয়েছিলো শ্রেয়সী দের বাড়িতে সেটা বাড়িতে এসে খুলে ফেলে নতুন তা পরে।মেহেরাজের যেখানে চাকরি করে সেখান কার অনেক কলিগ রাও এসেছে।
সন্ধ্যা সাতটাই শ্রেয়সীর বাড়ি থেকে মানুষ জন আসে।আরেক দফা হলুদ মাখা মাখি নাচ গান চলে তারপর সবাইকে রাতে খাইয়ে বিদায় দেওয়া হয় মির্জা বাড়ি থেকে।
ইরু আজ শ্রেয়সীর কাছেই থাকবে তাই ফাহিম আর কিছু বলেনি।এখন তার ইরুকে ছাড়া থাকতেও ভাল্লাগে না।কেমন যেনো লাগে।বিয়ের আগের অনুভূতি আর এখন কার অনুভুতি আকাশ পাতাল তফাৎ।
মেহেরাজ আর রাত জাগে না সকাল সকাল ঘুমিয়ে যায় গোসল করে এসে।আজ বেশ খাটুনি গেছে বসে থাকতেও যে কষ্ট সেটা যে বিয়ে করতে যায় সে বোঝে।মেহেরাজের রুমে মেহেরাজ একা আর ইভানের রুমে ফাহিম ইভান।আর অন্য দের সাথে মাহি মিলি সুয়েছে।পুরো বাড়ি ফেইরি লাইট দ্বারা সুন্দর করে সাজানো হয়েছে।সেই আলো চক চক করছে পুরো মির্জা বাড়ি।

রাত এগারোটা বেজে বিশ।শ্রেয়সীর সাথে আজ তোহা আর ইরু ঘুমাবে।ইরু ঘুমিয়ে পড়েছে।সিয়ামের ঘরে সবাইকে ডেকেছে আলতাফ শেখ।আলতাফ শেখ এর চোখ মুখ অন্ধকার। সিয়ামের ও একই।খাদিজা খাতুন ও চুপ।তোহা আর শ্রেয়সী বুজলো না কি হয়েছে।শ্রেয়সী একবার বাবার মুখের দিকে আর একবার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
-কি হয়েছে আব্বু। কি বলবা।
শ্রেয়সীর কথায় আলতাফ শেখ সিয়ামের দিকে তাকালেন।সাথে সাথে সিয়াম একটা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
-এই বিয়ে হবে না।
সিয়ামের মুখ থেকে কথাটা বের হতেই চমকে গেলো সকলে।তবে খাদিজা খাতুন বা আলতাফ শেখ এর মুখ সাবলিল তারা হয়তো আগে থেকেই অবগত।শ্রেয়সী অবাক হয়ে বলে,
-মানে এত রাতে মজা করার জন্য ডেকেছো ভাইয়া??
শ্রেয়সীর কথায় সিয়াম কিছু বলতে যাবে তার আগে খাদিজা খাতুন বলে,

-কোনো মজা না।এটা সত্যি।
-মানে।কি আজে বাজে বলছো।
শ্রেয়সীর কথায় সিয়াম এবার কিছুটা রেগে গিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলে,
-একবার বললাম না বিয়ে হবে না।মানে হবে না।মেহেরাজের সাথে তোর ওই বাড়িতে যাওয়া হবে না।
সিয়ামের রাগী কন্ঠে তোহা একটু পিছিয়ে যায়।সে নিজেও অবাক হয়েছে।তবে এখন তা বেশি প্রকাশ বা সাহস করে কিছু বললে সন্দেহ করবে।যে বউমা আবার কবে থেকে প্রশ্ন করা শুরু করলো।তোহা একটু নিজেকে গুটিয়ে নিলো।সিয়ামের রাগান্বিত কন্ঠে শ্রেয়সী ও কিছুটা রেগে গিয়ে বলে,
-কাল বিয়ে আর আজকে আমার সাথে মজা করছো তোমরা আর এটা কোন ধরনের মজা।
-বল্লাম না মজা না।কাল বিয়ে হবে না।এটাই শেষ কথা।
সিয়ামের কথায় এবার সত্যি সত্যি রেগে যায় শ্রেয়সী।রাগী কন্ঠে বলে,

-আমার জীবন টা তোমরা খেলনা পেয়েছ ভাইয়া।যখন মন চাইবে জোর করে বিয়ে দিবে আবার ডিভোর্স ও করাবে।আবার বিয়েতে রাজি করাবে আবার বিয়ে হবেনা।কি নাটক শুরু করেছো তোমরা।
শ্রেয়সী আর কিছু বলার আগেই খাদিজা খাতুন পর পর ঠাশ ঠাশ করে দুটো চড় মারলেন শ্রেয়সীর গালে।তারপর চড়া গলায় বললেন,
-দিন দিন তোর সাহস বেড়ে যাচ্ছে।ভাইয়ের মুখে মুখে তর্ক করছিস অমানুষ। তোরে এই শিক্ষা দিয়েছি আমি।
মায়ের হাতে চড় খেয়ে শ্রেয়সী পড়ে যেতে নিলে তোহা ধরে ফেলে।চোখ বুজে সহ্য করে নেয়।সে নিজেও কল্পনা করতে পারছে না এ কি হচ্ছে তার সামনে এখন।শ্রেয়সী মায়ের দিকে তাকিয়ে আবারো একই গলায় বলে,

-ভালো কাজ করেছি। তোমরা বার বার কেন এক নাটক করবা আমার জীবনের সাথে।আমার মন বলতে কিছু নেই নাকি।যখন রাজি ছিলাম না তখন রাজি করালে আবার এখন বিয়ে হবে না।
কথা গুলো বেশ জোরেই বলে শ্রেয়সী সাথে সাথে আবারো দুটো চড় আচড়ে পড়ে ওর গালে।শ্রেয়সী এবার কেদে ফেলে।খাদিজা খাতুন রাগী কন্ঠে বলে,
-তুই কি অন্ধ দেখিস নি তোর বাপ ভাই কে সেদিন কতটা অপমানিত হতে হয়েছিলো সবার সামনে।তোকে কত কিছু বলেছিলো ওরা।সেটা মনে নেই।সব প্রতিশোধ তুলবো ওই মির্জা বাড়ির উপর থেকে।যা যা বলে অপমান করেছিলো সব।ওই জন্য তো তোকে বিয়েতে রাজি করিয়েছিলাম।
ঘটনা ঘুরে যাচ্ছে আর শ্রেয়সী রাজি হচ্ছেনা দেখে আলতাফ শেখ হটাৎ বুকে হাত চেপে বিছানায় সুয়ে পড়ে।সবাই প্রথমে কিছু না বুজলেও হটাৎ আলতাফ শেখ এর ব্যাথাতুর চিৎকার শুনে সেদিকে তাকাতেই সকলে ভয় পেয়ে যায়।শ্রেয়সীও ভয় পেয়ে যায় সাথে সাথে।সিয়াম ডাক্তারের কাছে ফোন লাগায়।তোহা ও বুজতে পারে না কি হয়েছে।তোহা পানি এনে কিছুটা পানি ছিটিয়ে দেয় আলতাফ শেখ এর মাথায়।শ্রেয়সী বাবার কাছে কি আলতাফ শেখ এর হাত টা হাতের মুঠোয় নিয়ে কেদে দিয়ে বলে,
-কি হচ্ছে তোমার আব্বু।হটাৎ কি হলো।আব্বু।
শ্রেয়সীর কান্না মাখা কন্ঠ শুনে সিয়াম রেগে বলে,

-এক মাত্র তোর জন্য আব্বু এখন অসুস্থ। আব্বুর কিছু হলে তোকে মাফ করবো না।বলে দিচ্ছি।অমা*নুষ।
সিয়ামের কন্ঠে শ্রেয়সী আরো কেদে ফেলে।খাদিজা খাতুন ও দোষ দিতে থাকেন শ্রেয়সীকে।আলতাফ শেখ বেশ কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে চুপ থেকে শ্রেয়সীর হাত টা নিজের মাথায় নিয়ে করুন কন্ঠে বলে,
-ছোট থেকে তোর সকল আবদার রেখেছি আমি।আজ আমার এই ছোট আবদার টা রাখ মা।আমি মরে গিয়েও শান্তি পাবো না এই অপমানের বদলা না নিতে পারলে।মেয়ে হয়ে বাপের এই আবদার টা রাখ।
বলে আলতাফ শেখ জোরে একটা শ্বাস ছেড়ে আবার চোখ বুজে নেয়।শ্রেয়সী কেদে ফেলে বাবাকে জড়িয়ে।আলতাফ শেখ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় আলতো করে।জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বলে,
-বল রাখবি আমার আবদার টা।না হলে আমার মরা মুখ দেখবি।আর কোনো আবদার করবে না তোর আব্বু তোর কাছে।
শ্রেয়সী আতকে উঠে।বুকের ভিতর দুপড়ে মুচড়ে যায় ওর।মেহেরাজ কে সে ভালোবেসে ফেলছে গভীর ভাবে।আজ বুজতে পারছে মেহেরাজ কেন সেদিন বলেছিলো তোমার বাবা ভাই মনে হয় চাইনা এই বিয়ে হোক।তাই আমরা আগে বিয়ে করে রাখি।শ্রেয়সী কে চুপ থাকতে দেখে আলতাফ শেখ আবার বলে,

-বল রাখবি আমার আবদার টা।যা বলবো শুনবি।
শ্রেয়সীর চোখ ভিজে উঠে।বুকের উপর মনে হচ্ছে কয়েক টন ওজনের একটা পাথর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।।শ্রেয়সী তোহার দিকে তাকায় একবার তোহার মাথা নিচু শ্রেয়সী জানে তোহা বাড়িতে সবার কাছে যেমন নরম সভাব বাইরে ততটা চটপটে তাই এখন কিছু বলতেও পারছে না সবার সাথে।তার ভাবি নিশ্চয় মেহেরাজ কে সব বলে দিবে।
শ্রেয়সী কে চুপ থাকতে দেখে সিয়াম ধমক দিয়ে বলে,

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪২

-কি হলো বল।যা বলবো শুনবি।নয়তো আব্বুর কিছু হয়ে গেলে সমস্ত দোষ তোর হবে।
সিয়ামের ধমকে শ্রেয়সী চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়লো কয়েকফোটা।কোনো মেয়ে কি পারে বাবার মৃত্যুর কারন হতে।শ্রেয়সী ও পারবে না নিজেকে ক্ষমা করতে।শ্রেয়সী কাপা কাপা গলায় বলল,
-আমার হৃদয়টাকে কুরবানি দিয়ে যদি তোমরা সুখ পাও।তাহলে আমি তোমাদের সব আবদার মানতে রাজি।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৪