Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪২

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪২

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪২
নুসাইবা আরা নুরি

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত।ইশার আজানের সময় ঘুম ছুটে যায় শ্রেয়সীর।ঘুম থেকে জাগার পরেই নাকে ভেষে আসে একটা চন্দনের ঘ্রান।শ্রেয়সীর চিনতে অসুবিধা হয়না এটা কার ব্যবহৃত পারফিউম এর ঘ্রান।শ্রেয়সী চোখ মেলে তাকায় সাথে সাথে।তবে আশ্চর্য কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।শ্রেয়সী একটু আড়ামোড়া খেয়ে বুজতে পারে সে কারোর বাহু বন্ধম্লনে আবদ্ধ।আর পুরো ঘর টা অন্ধকার।ফ্যান চলছে ঘরে সেটারই শব্দ ভেসে আসছে কানে।ঘরের ভিতরে হলুদাভাবের একটা ড্রিম লাইট জলছে।তার আলতো আভায় শ্রেয়সী মেহেরাজের বুক থেকে মাথা তুলে উপরে তাকাতেই মেয়েরাজে ছোট ছোট করে কাটা চাপদাড়ি শ্রেয়সীর মুখে ফুটে যায়।
শ্রেয়সী আউচ করে সরে আস্তে চাই।তবে পারেনা।মেহেরাজ তাকে জড়িয়ে রেখেছে বুজতে পেরে শ্রেয়সী লজ্জায় শেষ। বাইরের কেও জানলে কি হবে।তাদের বিয়ে হয়েছে কিছুদিন আগে এটা তো ফাহিম ভাই আর ইরু বাদে কেও জানেনা।তাহলে ওরা কি ভাব্বে।ছিহ।আর এই লোক এখানে এলো কিভাবে।
শ্রেয়সী মেহেরাজের হাত ছাড়ানোর জন্য ছটফট শুরু করতেই মেহেরাজ চোখ বুজেই বিরক্তিকন্ঠে বলে,

-উফফ ডিস্টার্ব করো না লিটল বার্ড।
-ছাড়ুন অশুদ্ধ লোক।আপনি এখানে কেন।ছাড়ুন।আমাকে ধরছেন কেন।
-আমি আমার বউ কে ধরছি।তুমাকে না।
মেহেরাজ ঘুম ঘুম কন্ঠে শুনে শ্রেয়সী লজ্জায় রাগে কিছু ভেবে পাচ্ছে না।শ্রেয়সী ছাড়া পাওয়ার জন্য মেহেরাজের কয়েকটা দাড়ি ধরে টান দিতেই মেহেরাজের ঘুম পুরো পুরি ভেঙে গেলো।সাথে সাথে উঠে বসে নিজের থুতনি তে হাত দিলো।তা দেখে শ্রেয়সী ঠোঁটের নিচে হাসি চেপে রাখলো।
মেহেরাজ শ্রেয়সীর দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন তারপর ফুস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-কাজটা ঠিক করলা না লিটল বার্ড।
-আপ্নি বোধহয় ঠিক করছেন।আমার ঘুমের সুজোগ নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরছেন।
কথাটা বলেই শ্রেয়সী দাত দিয়ে জিভ কাটলো।ছই সে কি বলে ফেললো।মেহেরাজ শ্রেয়সীর কথায় আরো কিছুক্ষন তার দিকে তাকিয়ে রইলো চুপচাপ।ঘুমের ঘোর পুরোপুরি কাটার পর মেহেরাজ স্থির কন্ঠে বলল,

-সরি।
মেহেরাজের হটাৎ সরি বলা আসা করেনি শ্রেয়সী। তাই ভ্রু কুচকে বলল,
-সরি কেন??
-ওশুরের মেয়েকে জড়িয়ে ধরার কারনে না বলে।আসলে ঘুমিয়ে গেছিলাম তাই বুজতে পারি নাই।বুজতে পারলে..
বাকি কথাটা আর মেহেরাজ বলল না। আড়ামোড়া খেয়ে বিছানা থেকে নেমে দাড়ালো।তা দেখে শ্রেয়সী কন্ঠে একটু রাগ এনে বলল,
-বুজতে পারলে কি বলেন অর্ধেক বলে রাখবেন না বলে দিলাম।আর আপনি আমার আব্বুকে ওশুর বলবেন না একদম।
শ্রেয়সীর কথায় মেহেরাজ ঝুকে পড়ে শ্রেয়সীর দিকে।শ্রেয়সী একটু পিছিয়ে যায়।মেহেরাজ ফু দিয়ে দিয়ে শ্রেয়সী মুখের উপর পড়া বেবি হেয়ার গুলো সরিয়ে বলে,

-বললে কি করবা।
-দে দেখুন।
শ্রেয়সী কথাটা বলতেই মেহেরাজ টুপ করে শ্রেয়সী কপালে একটা চুমু খেলো তারপর দাঁড়িয়ে বলল,
-ফ্রেশ হয়ে বাইরে এসো আমি গেলাম।
বলেই মেহেরাজ চলে যায় দরজা খুলে বাইরে।এদিকে শ্রেয়সী অবাক হয়ে বসে আছে।এই লোক কি তাকে হুট হাট চুমু খাওয়ার জন্য বিয়ে করেছে।শ্রেয়সী লজ্জা পায়।কাল রাতে সপ্ন হলেও আজ মানুষ টার বুকে মাথা দিয়ে ঘুমাতে পেরেছে ইশ কি লজ্জা।শ্রেয়সী বিছানা থেকে নেমে বিছানা গুছিয়ে এলোমেলো চুল গুলো গাডার দিয়ে বেধে ওয়াশরুম এ যেতে যেতে মেহেরাজের কথা ভেবে বিড়বিড় করে বলে,
-অশুদ্ধ পুরুষ।

সময় গড়িয়েছে কয়েকদিন।কাল বাদে পরশু মেহেরাজ আর শ্রেয়সীর বিয়ে।দুই পরিবারেই বেশ আয়োজন চলছে বিয়ের।সিয়াম সেদিন আর বাড়িতে আসেনি।কারন তার ঢাকার কাজ মেটেনি।যার ফলে আনাম মিয়া রেগে ছিলো।তবে সিয়াম সেখান থেকে কয়েকটা মেয়ে জোগাড় করে দেওয়ায় আনাম মিয়া আর কিছু বলেনি।
তবে আনাম মিয়ার চোখ সর্বস্ব শ্রেয়সীর উপর।শ্রেয়সী কে সে ধরবেই।সামনা সামনি সেদিন আলতাফ শেখ এর বাড়িতে দেখার পর পরই আনাম মিয়া অস্থির হয়ে গেছে।প্রথমে সিয়াম কে ভালো ভাবে বলবে না মানলে পরে মানিয়ে নিবে সেসব আইডিয়া আনাম মিয়ার জানা আছে।
এই কয়েকদিনের পরিবেশ বেশ ঠান্ডা।যেমন ঠান্ডা হয় বড় কোনো ঝড় আসার আগে চারিপাশের পরিবেশ।অনুভব চ্যাটার্জীর কোনো সুত্র আর খুজে পাই নি কেও।হাওয়ার বেগ এ এসে হাওয়ার বেগে হারিয়ে গেছে।তবে শামসুর মরার দুদিন বাদে তার লাশ থানার সামনে গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।তবে সিসি ক্যামেরাতেও কিছু পাওয়া যায়নি।

পুলিশ এখোনো তদন্ত করে যাচ্ছে।ইরুর সৎ মা রোকেয়া ইরুকে খূজে না মেয়ে থানায় গেলে তার কেচ ফাইল নেওয়া হয় তবে কোনো কাজ হয় না।পরে তিন দিন বাদে ফাহিম নিজেই ইরুকে নিয়ে রোকেয়ার বাড়িতে আসে।প্রথমে ইরুকে দেখে রোকেয়া রেগে মারতে গেলেও পরে ফাহিম কে দেখে আর বিয়ে হয়েছে শুনে কিছু বলেনা।কারন সে জানে তার এতো টাকা নেই যে এই উকিল এর বিরুদ্ধে কেচ করবে। কিন্তু জমিটা হাতাতেই হবে সেজন্য যতেষ্ট ভালো আচরন করেছে ওদের সাথে।
তুহিন আগের চেয়ে সুস্থ।তোহা সিয়াম যেদিন বাড়িতে ফিরেছে তার আগের দিন ফিরেছে।তবে কেও কিছু বলেনি সিয়াম কে যে তোহা এই কফিন বাড়িতে ছিলনা।কারন সিয়াম একদিন কল দেইনি।তাই আর এসব বলে কথা বাড়াতে চাচ্ছে না কেও।

বিছানার এক কোনে মন মরা হয়ে বসে তোহা।চোখের কোনে পানি স্পষ্ট। হআটু তে মুখ গুজে দূরে বারান্দার দিকে তাকিয়ে আছে চুপ করে।কিছুই ভালো লাগছে না ওর।রার নয়টা।খেয়ে আসার পর থেকেই মনটা ভীষণ খারাপ লাগছে।চোখের পানি বাধ মানতে চাইছে না তবুও তোহা নিজেকে সর্বচ্চ শক্ত করে রেখেছে।
একটু আগে সিয়ামের ফোন চেক করার সময় এমন কিছু পেয়েছে যা তোহা কখোনো আশা করি নি। কইছু ফোন কল রেকর্ডস আর সিয়ামের হোয়াইটসআ্যপে সেকেন্ড আইডির কিছু আইডির ম্যাসেজ।তোহা কখোনো সিয়ামের ফোনে হাত দিতো না।তবে সিয়াম আজ মোবাইল রেখে ওয়াশরুমে গোসল করতে যেতেই দ্রুত চেক করেছে।লক টা জানতো না কিন্তু কিছুদিন আগে জেনেছে সিয়াম কে লক খুলতে দেখে সে খেয়াল করেনি তোহা দেখেছে।

তোহা জান্তো না সিয়ামের সেকেন্ড কোনো একাউন্ট আছে তাই প্রথমে হোয়াইটসআ্যপে গিয়ে সবার ম্যাসেজ চেক করে মোবাইল এর ফাইল এ গিয়ে সব কল রেকর্ডস গুলো একাউন্টে নিয়ে নেই।তখনই হোয়াইটসআ্যপে নোটিফিকেশন আসে তোহা চাপ না দিয়ে হোয়াইটসআ্যপে প্রবেশ করে সেই ম্যাসেজ না পেয়ে বেরিয়ে আসার সময় সুইপ একাউন্ট চেক করতে গিয়ে পায় আর একটা একাউন্ট। আর তখনই চোখ পড়ে কিছু মানুষের সাথে কথোপ কথন।
তোহা কয়েকজনের সাথের কথোপকথন পড়ে যা বুজার বুজে যায়।আর নিজের ফোন দিয়ে ভিডিও করে রাখে সব গুলো তারপর যে যেভাবে ছিলো রেখে দেয়।তখন থেকেই মনের কোনো অশান্তি হচ্ছে।নইজের উপরেই নিজের ঘৃনা হচ্ছে।তবে তোহা জানে তোহাকে এখন শক্ত থাকতে হবে।আর সময় পেলে সব ম্যাসেজ গুলো পড়তে হবে।

তোহার ভআবনার মাঝে ওয়াশরুম থেকে ভেজা চুল মুছতে মুছতে বের হয় সিয়াম।পরনে একটা লুঙি আর টিশার্ট। বের হয়ে সবার প্রথমে চোখ পড়ে তোহার উপর। মন মরা হয়ে বসে আছে।সিয়ামের ভ্রু জোড়া কুচকে যায় কি হলো তার বউ এর।সিয়াম চুল মুছে তোহার পাশে গিয়ে বসে তারপর শান্ত কন্ঠে বলে,
-কি হলো জান হটাৎ মন খারাপ কেনো কি হয়েছে??
তোহা চোখ বুজে নিলো সিয়ামের স্পর্শে ঘৃনায় গা গুলিয়ে উঠছে ওর।চোখ বেয়ে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়তেই সিয়াম এবার বেশ সিরিয়াস হয়ে যায়।তারপর তোহার কাধ ধরে নিজের দিকে করে তোহার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
-কি হয়েছে তোমার কাদছো কেন এই।এই তোহা।
-কিছু না।
-বলো??

সিয়াম বেশ উত্তেজিত হলো এবার।তোহাকে খুব ভালোবাসে ও।আর তার বোকা বউ টাও তাকে ভালোবাসে এই বিশ্বাস তার মনে সমুদ্রের ন্যায়।তোহা সহজে কাদে না আবার মন খারাপ করে না তবে সিয়ামের কাছে সব খুলে বলে।সিয়াম তোহার মাথায় হাত দিয়ে নিজের কাছে টেনে নিলো।তোহার মাথা এসে ঠেকে সিয়ামের বুকে।তোহা একটা ঢোক গিলে নেই।মন চাচ্ছে সর্বশক্তি দিয়ে এই মানুষ টাকে সরিয়ে দিতে তবে তোহা পারবে না।বুক ভেঙে কান্না আসছে।হাতে নাতে প্রমান পাওয়া পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করা লাগবে।সিয়াম তোহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
-কেও কিছু বলেছে তোমাকে।
তোহা না সুচক মাথা নাড়ায় সিয়াম আবারো বলে,
-তাহলে।কি হয়েছে বলো জান।আমার অস্থির লাগছে।তোমার চোখে পানি দেখলে আমার খারাপ লাগে।
সিয়ামের কথায় তোহা মনে মনে তাচ্ছিল্য হাসে তারপর মুখে বলে,
-ননদিনী আর দুদিন বাদে চলে যাবে।বাড়িটা ফাকা হয়ে যাবে।সারাদিন সময় কাটবে কি করে ওর সাথে খুনশুটি না করে।
তোহা কথাটা মন থেকেই বলেছে।শ্রেয়সী চলে যাবে ভাবতেই চোখের কোন ভিজে উঠছে।তবে আসল কথা লুকানোর জন্য কথাটা পারফেক্ট ছিলো।তোহার কথা শুনে সিয়াম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-সবারই তো একদিন যেতে হয় জান।আর ও তো একেবারে যাচ্ছে না আসবে যাবে।আর ভিডিও কলে কথা বলবা।মন খারাপ করোনা তো এখন হাসো।তুমি তো জানো তুমি মন খারাপ করলে বনু ও মন খারাপ করবে লক্ষি।
সিয়ামের আদুরে কথায় তোহা মিথ্যা একটা হাসি হাসলো।সিয়াম তোহার মাথায় একটা চুমু দিয়ে বলল,

-মন খারাপ করো না।
-আচ্ছা।
সিয়াম তোহাকে ছেড়ে উটগে বারান্দায় চলে যায় তোয়ালে নেড়ে দিতে তখন তোহা কান্না মাখা চোখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তোলে ঠোঁটে তারপর বাম হাতের তালু দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছতে মুছতে ঘৃনা ভরা দৃষ্টিতে বারান্দায় দাঁড়ানো সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে,

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪১

-আপনি হলেন মাছের কাটার মতো সিয়াম শেখ।যা হুট করে গলায় বাধার পর আর কেও গলা থেকে না ছাড়ানো পর্যন্ত স্বস্তি পায় না।তেমনই আপনার গলায় পাপিষ্ঠ আপনি যতদিন বেধে আছেন আমিও সস্তি পাবো না।
কথাটা বিয়ারবিড় করে বলে তোহা।চোখ বেয়ে অবাধ্য এক ফোটা পানি পড়তেই বুকের ভিতর কেমন মুচড়ে উঠে।তা দেখে তোহা নিজেকে সামলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একই ভাবে ভাঙা গলায় বিড়বিড় করে বলে,
-আপনাকে মারতে আমার ভিষন কষ্ট হবে সিয়াম শেখ।রুহ অব্দি কেপে উঠবে আপনার শুট করতে।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪৩