লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪১
নুসাইবা আরা নুরি
সকাল থেকে সকল প্রকার নিউজ চ্যানেল এ এক্টাই ভিডিও নিয়ে তোলপাড়।সাথে কাল রাতের সেই ছয় জনের মরদেহ।ফেসবুক,, ইন্সটাগ্রাম সব কিছুতেই সেই বিদ্ধংস খু*নের ভিডিও।গা ছিম ছিম করে উঠছে মানুষের।ইতিমধ্যে পুলিশ আর আর্মির একটা টিম খবর নেওয়া শুরু করে দিয়েছে।সব থেকে বড় সুত্র গত বারো বছর ধরে বন্ধ থাকা নিউজ চ্যানেল ওয়ানে এই ভিডিও সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে।
এই নিয়ে চ্যানেল ওয়ান এর মালিক কে জিজ্ঞাসাবাদ এমন কি সব কিছু খুটিয়ে দেখা হচ্ছে।এমন সময় সবাই আরো অবাক হলো তখন যখন দেখলো এখান থেকে তিন বছর আগের কেচ ফাইল এ একজন সিরিয়াল কিলার ঠিক একই পদ্ধতি তে খুন করতো মানুষদের।সেও পাপিদের বেছে বেছে মারতো।তারপর হটাৎ উধাও।এখন আবার সত্যিই তার আগমন হয়নি তো।এমন কি তার নাম টাও ছিলো “Tsk”
তবে পুলিশ রেকর্ডে তার একটা ছায়ার ছবি বাদে আর কিছুই কখোনো ধরা পড়েনি।তবে তার হাত থেকে কোনো অপরাধী কখোনো বেচে ফিরতে পারেনি।সবাইকেই নিকৃষ্ট ভাবে মারতো সে।আবারো সেই একই কাজ পুনরায় শুরু হয়ে গেছে।
আনাম মিয়া সোফায় বসে চা খাচ্ছিলেন।হটাৎ সময় টিভির সংবাদে তার গুপ্তচর শামসুর মৃত্যুর ভিডিও আর আদ্রিজের মরদেহের ছবি দেখে চমকে যায় আনাম মিয়া।ক্ষনিকের জন্য নিজের পাপি মন ভয়ে কেপে উঠে।তবে এটা কিভাবে সম্ভব।তার পেশাদার ধুর্ত লোক গুলোকে মারলো কিভাবে।আর জানলোই বা কিভাবে।
এক সময় অনুভব চ্যাটার্জীকে অনেক দলই মেতে ফেলতে চেয়েছিলো তবে এতোটাই ধুর্ত ছিলো যে হটাৎ একদিন গায়েব হয়ে যায় তারপর আর তার কোনো খোজ পাওয়া যায়নি।তবে আজ আবার কেন আসলো।আর সবার প্রথমে তার দলের লোককে তার্গেট। এর মানে কি?? কথাটা মাথা চাড়া দিতেই ভয়ে রাগে হাতে থাকা চায়ের কাপ্টা দূরে ছুড়ে মারে আনাম মিয়া। মাটিতে পড়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।নিশ্চয় শামসুকে যারা গুপ্তচর ভেবে নিয়েছিলো তারা ওদের খবর পেয়ে গেছে।
এখন কি হবে।এই অনুভব যদি তার সাম্রাজ্যেকে নষ্ট করে দেয়।কথাটা ভাবতেই রিমোট ছুড়ে মারে টিভিতে আনাম মিয়া।বাড়ির চাকর গুলো বুজলো না আনাম মিয়ার রাগের কারন।আনাম মিয়ার মাথায় কাজ করছে না।দলের এতো গুলো কাজের মানুষ হারিয়েছে এখন তার ব্যবসা।হাতে মাত্র দুদিন।মেয়ে জোগাড় করবে কোথায় নয়তো তার কোটি টাকার লোকশান।
আনাম মিয়া পকেট থেকে ফোন বের করে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো তারপর আলতাফ শেখ এর নাম্বারে কল দেয়।তবে ফোন বন্ধ।আনাম মিয়া আরো রেগে গিয়ে সিয়াম কে কল দেয়।দু বার কল হওয়ার পর সিয়াম রিসিভ করতেই আনাম মিয়া বলে,
-কোথায় তুমি। এক্ষুনি আমার বাড়িতে আসো।
-আমিতো ঢাকাতে চাচাজান।কেনো কোনো দরকার??
-দরকার না মানে।আমার দলের সাত জন। স্পাই সব মার্ডার হয়েছে।রফিক ভাই মার্ডার হয়েছে। তুমি মোবাইল চালাও না। দেখো না।
-আসলে।
-কিছু শুনতে চাচ্ছি না।রাতের ভিতরে চট্রগ্রাম ফিরে এসো।আলতাফ ভাইয়ের ফোন অফ।যদি পুলিশ এর টিম আমাদের কথা যেনে যায় কত বড় বিপদ হবে বুজতে পারছো??
-জি চাচাজান আমি ফিরছি।
-আমি অপেক্ষা করছি।
আনাম মিয়া কল কেটে দিলো।সাথে সাথে ভ্রু জোড়া কুচকে গেলো তার।সিয়াম কে এতো শান্ত দেখালো কেন আজ।এতো শান্ত ভাবে কথা বলতে পারে কেও এমন বিপদের সময়।নাকি দাবার চাল উলটে আমাকেই পিছন দিয়ে ছুরি মারার প্লান।আনাম মিয়া নিজের কথায় নিজেই হাসে।কি আবোল তাবোল ভাবছে।তেমন যদি কিছু হয় তাহলে সিয়ামের কপাল পুড়বে।সাথে ওর পুরো পরিবার এর।কারন সিয়াম আর ওর বাবা পুরোপুরি জড়িত এর সাথে।তখনই আনাম মিয়ার মনে পড়ে সিয়ামের বোনের কথা যার কদিন পর বিয়ে দেখতে শুনতে হুরপরীর মতো।কোনো ভাবে যদি মেয়েটাকে তুলে আনা যায়।তাহলেই তার ব্যবসা টা বাসবে।লোকশান থেকে বাচবে।আপন মানুষদের কেও সন্দেহ করেনা।আনাম মিয়া ভয় ভুলে নিজের বুদ্ধিতে নিজেই হেসে উঠলো।সিয়াম কি তার বুকে ছুরি মারবে সে নিজেই সিয়ামের বুকে তীর মারবে এবার।যদি সত্যি হয় হলো না হলে অর্ধেক টাকার ভাগ দিয়ে দিবো।বাচলে এক সাথে মরলে শুধু ও একা মরবে।আবারো হেসে উঠে আনাম মিয়া।
সকাল সকাল ইভানের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী মেহেরাজ হসপিটালে গিয়েছিলো।সবাই মোটামুটি ভালো আছে শুধু তুহিনকএ বেড রেস্ট দিছে।মাথায় অনেক চাপ এর জন্য। মেহেরাজ সবাইকে নিয়ে যখন বাড়িতে ফিরেছে তখন কেও ওঠেনি।তাই বুদ্ধি করে একটা ঘটনা সাজিয়েছে মেহেরাজ।তুহিন পা পিচলে পড়ে গেছিলো বেল্কোনিতে।তা দেখে তোহা তুলতে গিয়ে তুহিনের নখের আচড় লাগছে তার মুখে।আর ফিরে আসার সময় আবার পড়ায় মিলি স্লিপ খেয়ে দরজার কোনায় ঠোঁট লেগে কেটে গেছে।
সবাই ঘুম থেকে ওঠার পর সব বিশ্বাস করেও ফেললো।ফাহিম সবার উপর রেগে ছিলো তবে সবার এই ঘটনা দেখে আর রেগে থাকতে পারেনি।মন গলে গিয়েছে।যদিও সকাল থেকে ইরু ফাহিমের দিকে তাকাতে পারি নি লজ্জায় মাথা নুইয়ে রেখেছে নতুন বউ এর মতো।
মেহেরাজ সবার জন্য বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করেছিলো সেটাই সবাই খেয়েছে।।ইতিমধ্যে সবাই নিউজ চ্যানেলে আজকের সংবাদ দেখে অবাক।মেহেরাজ অনেক আগেই দেখেছে।সে নিজেই অবাক একটা মানুষ এতো টা ভয়ংকর হতে পারে।সকালে খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই একটু আড্ডা দেই।শ্রেয়সী তোহার অবস্থা দেখে বাড়িতে খাদিজা খাতুনকে ফোন দিয়ে বলেছে আজ যাবে না আর একদিন থেকে তাই বাড়িতে ফিরবে।খাদিজা খাতুন ও আর কিছু বলেনি।রাজি হয়ে গেছেন।
যদিও মেহেরাজ আর তোহা অনেকবার বুজিয়েছিলো শ্রেয়সীকে বাড়িতে যেতে তবে শ্রেয়সী যায়নি।তার এক কথা ভাবি অসুস্থ তাকে রেখে যাবোনা কাল যাবো।মেহেরাজ ও আর জোর করেনি।
দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ এ নিশাদ বাড়িতে চলে গেছে ওর ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়েছে হটাৎ তাই জিজ্ঞাসা করেছে কি করবে মেহেরাজ আর তোহা জোর করেই পাঠিয়েছে নিশাদ কে।নিশাদ যাওয়ার পর শাহিদা খাতুন,মাহি,,ইরু আর ফাহিম ও বাড়িতে চলে যায়।যাওয়ার সময় ইরুর ভিষন মন খারাপ তোহা,, মিলি,, শ্রেয়সী অনেক বুজিয়ে শুনিয়ে মাথাও হাত বুলিয়ে পাঠালো ওদের এক দিনেই কেমন আপন হয়ে গেছে সবাই।ফাহিম ওদের রেখে আসতে চেয়েছিলো তবে সবাই নিষেধ করেছে আজকে পুরো সময় টা ইরুকে দিতে বলেছে।
বিকেল সাড়ে পাচঁটা।তোহাদের বাড়ির সাদের রেলিং গেসে দাঁড়িয়ে আছে মেহেরাজ।পাশেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে তোহা।মেহেরাজের চোখ মুখ গম্ভীর।তোহা মাথা নিচু করেই বলে,
-দোস্ত বোজার চেষ্টা কর।আসলেই হুট করে প্লানিং করেছিলাম।আমরা কি জানতাম যে শামসু এমন একটা কাজ করবে।
মেহেরাজ কোনো উত্তর দেই না।চোখ মুখ শক্ত।তোহা আবার বলে,
-সরি দোস্ত মাফ করে দে।লাস্ট বার মাফ করে দে।তুই কথা না বললে ভালো লাগে বল।
-আজ যদি তোদের কিছু হয়ে যেতো।সব তো শুনলাম এর পর ও কি তোদের মাফ করা উচিত।আমাকে কি একটা বার জানাতে পারতিস না।বাড়িতে এসে ইভানকে নিয়ে গেলি আমাকে জানালি না।আজ ওই অনুভব চ্যাটার্জী সময় মতো না এলে তোদের কি হতো বুজতে পারছিস??
মেহেরাজের গম্ভীর কন্ঠ শুনে তোহা মাথা নিচু করে নিয়ে বলে,
-মাফ করে দে না দোস্ত।এবার সব তোকে বলবো। এখন খুজতে হবে এই অনুভব চ্যাটার্জীকে।কে এই লোক।আমাদের বাচালো কেন।তার কি কোনো স্বার্থ আছে।
-আর্মি আর পুলিশ রা তো কিছুই পাইনি।শুধু ৩ বছর আগে বন্ধ হওয়া ফাইল বের করে জনগনের মনে ভয় ঢুকাচ্ছে।এটা পাবলিক না করে আগে প্রাইভেট ভাবে খোজা উচিত ছিলো।
মেহেরাজের কথায় তোহা শান্ত কন্ঠে বলে,
-চল নিচে চল।শ্রেয়সী যেনো কিছু বুজতে না পারে।তোদের বিয়েটা হয়ে গেলে বাচি।তোর বউ তোর কাছে থাকবে।
-তো আমার বউ কি তোর মাথায় চেপে আছে??
মেহেরাজের টেরা কন্ঠে তোহা একটু হাসে তারপর সিরিয়াস কন্ঠে বলে,
-এই অনুভব চ্যাটার্জী আমাদের সাহায্য করতে চাইছে কি বিপদে ফেলতে চাইছে বুজতে পারছি না।যদি সাহায্য করতে চাইতো তাহলে শামসু কে ধরে নিয়ে গেলো কেন ওর থেকে আমরা আসল মাস্টার মাইন্ড রে ধরতে পারতাম।কিন্তু এখন সব কাজ আরো বেড়ে গেলো।
-আমিও সেটাই ভাবছি।তবে এর উত্তর পাই না।
তোহা আর কিছু বলে না মেহেরাজ কে নিয়ে নিচে নেমে আসে।মেহেরাজ সব শোনার পর থেকেই তাদের উপর রেগে আছে।তাই তুহিন মেহেরাজ কে বোজাতে বলেছিলো সব টা।নিচে শ্রেয়সী আছে বলে তোহা একটু আগে মেহেরাজ কে নিয়ে উপরে এসেছিলো।তারপর সব মেহেরাজ কে পুনরায় বিশ্লেষণ ক্ক্রে বুজিয়েছে।
মেহেরাজ নিচে এসে দেখে শ্রেয়সী ঘুমিয়ে আছে।মিলি রান্না ঘরে সবার জন্য চা বানাচ্ছে।তুহিন আর ইভান মুভি দেখছে টিভিতে।মেহেরাজের ও ভিষন ঘুম পাচ্ছে।তোহা তা খেয়াল করে বলল,
-তোর মনে হয় ঘুম লাগছে।
-নাহ।
-চোখ বলে দিচ্ছে।
-আসলে ইভান সেই রাতে ফোন দিছিলো তো তখন আর ঘুম আসেনি।পরে মাথা যন্ত্রনা করেছে তাই এখন বোধহয় এমন হচ্ছে।চা খেলে ঠিক হয়ে যাবে।সমস্যা নেই।
মেহেরাজের কথায় তোহা হাত দিয়ে একটা ঘরের দিকে ইশারা করে বলল,
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ৪০
-চা খেতে হবে না।ওই ঘরে গিয়ে ঘুমা যা দেখ শ্রেয়সী ও আছে।
-উহু না।
-যেতে বলছি কথা শোন।
-আমি অন্য রুমে যাচ্ছি।ওই রুমে যাওয়া খারাপ দেখাই।
-ও তোর বিয়ে করা বউ।নাটক করিস না।গিয়ে ঘুমা।সন্ধাই ডেকে দিবোনি।
বেগত্যা মেহেরাজ আর কিছু না বলে চলে যায় ঘরে।মাথা ধরেছে আবারো একটা ঘুম দরকার।মেহেরাজ ঘরে ঢুকে ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে এগিয়ে যায় বিছানার দিকে।
