শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৮
সুমাইয়া ইসলাম নূর
দুপুরের রোদ তখন চৌধুরী ভিলার বিস্তীর্ণ উঠোনজুড়ে সোনালি আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। সকালের ব্যস্ততা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। সকাল হতেই বাড়ির পুরুষ সদস্যরা নিজ নিজ কাজে বেরিয়ে গেছেন। আজ ইউভি আর রেদোয়ানের লন্ডনের একজন খ্যাতনামা ব্যবসায়ীর সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মিটিং রয়েছে। তাই সকাল সকালই তারা অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।
বাড়িটা এখন তুলনামূলক শান্ত। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে দুপুরের খাবারের সুগন্ধ। দূরে বাগানের গাছে বসে পাখিরা আপনমনে ডাকছে।
এদিকে আয়াত আর আতিকা স্কুল থেকে অনেক আগেই ফিরে এসেছে। ফ্রেশ হয়ে তারা সবাই মিলে রিমঝিমের রুমে আড্ডা দিচ্ছে। হাসি-ঠাট্টায় সরগরম হয়ে আছে পুরো ঘর।রেশমা চৌধুরী, সাবিহা চৌধুরী, নুসরাত চৌধুরী—তিনজনও সেখানে বসে গল্প করছেন। তাদের সঙ্গেই রয়েছে পিয়াসা।
কিন্তু আজ পিয়াসার মনটা কোথাও স্থির হচ্ছে না।
বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছে সিঁড়ির দিকে।
মনে মনে শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে—
বেবিটাকে এখনো বলাই হলো না… ভাইয়া ওকে জাগাতে মানা করে দিয়েছে । কিন্তু আর অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছে না পিয়াসা শেষ পর্যন্ত আর নিজেকে সামলাতে পারল না সে।চুপিচুপি সবাইকে ফাঁকি দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল।ধীরে ধীরে ইউভির রুমের দরজাটা সামান্য ফাঁকা করে ভেতরে উঁকি দিতেই দেখল, ইনায়া এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে এপাশ-ওপাশ করছে।
পিয়াসার ঠোঁটে মায়াভরা হাসি ফুটে উঠল।
সে নিঃশব্দে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসে আলতো করে ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
মৃদু স্বরে ডাকল,বেবি… উঠ না। দেখ, দুপুর একটা বাজতে চলল। ইনায়া চোখ না খুলেই বিড়বিড় করে বলল,হুম…পিয়াসা ঠোঁট বাঁকিয়ে রাগ দেখিয়ে বলল এই বাল তোকে কে ড্রিংকস করতে।বলেছিল বল তো? পুরো পার্টিটাই ঠিকমতো এনজয় করতে পারলি না। সবাই কত চিন্তা করেছে। এবার উঠ, অলস কোথাকার!”
ঘুমের মধ্যেই ইনায়া হাত বাড়িয়ে পিয়াসার হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।শিশুসুলভ কণ্ঠে বলল,
বেবি… তুইও ঘুমা। আমার পাশে এসে শুয়ে পড়।”
কথাটা শুনে পিয়াসা হেসে ফেলল।সে একটু ঝুঁকে ইনায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,বেবি… আমি প্রেগন্যান্ট। তুই মিমি হতে চলেছিস। আমার ছোট্ট বাবুটাকে আদর করবি না? কথাটা শেষ হতেই যেন জাদুর মতো কাজ হলো এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে ধড়ফড় করে উঠে বসে পড়ল ইনায়া।
ঘুমের সমস্ত ঘোর মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল যেন
বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,কি… কী বললি? পিয়াসার চোখ দুটো আনন্দের অশ্রুতে চিকচিক করে উঠল।মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।হ্যাঁ, বেবি… আমি মা হতে চলেছি। তুই মিমি হবি। এই খবরটা সবার আগে তোকে বলব ভেবেছিলাম। কিন্তু গতরাতে সবাই জেনে গেল… শুধু তুই ঘুমিয়ে ছিলি। ইনায়া যেন এখনো বিশ্বাসই করতে পারছে না।সে নিজের গালে আলতো করে চিমটি কেটে বিড়বিড় করে বলল,
— “না… আমি স্বপ্ন দেখছি না তো?পরের মুহূর্তেই আনন্দে চিৎকার করে উঠে পিয়াসাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।বেবি! তুই মা হবি! মানে… আমি মিমি হব! ইসস… আমি সত্যিই মিমি হব! আনন্দে তার চোখও ভিজে উঠল।এই কুত্তি! আগে বলিসনি কেন? তোকে আর বেবি বলা যাবে না তুই এখন বড় হয়ে গেছিস। পিহু রে আমি মিমি হব মিমি
তারপর ইনায়া ধীরে ধীরে নিচু হয়ে অত্যন্ত যত্ন করে পিয়াসার পেটের কাছে কান রাখল মুখে দুষ্টু হাসি এনে বলল।হেই, লিটল প্রিন্স কিংবা লিটল প্রিন্সেস… আমি তোমার মিমি বলছি। তাড়াতাড়ি বড় হয়ে এসো, ঠিক আছে? তোমাকে নিয়ে আমি অনেক খেলব, অনেক গল্প করব। তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসবো পাখি। কথাগুলো বলেই সে আলতো করে পিয়াসার পেটের ওপর স্নেহভরা একটি চুমু এঁকে দিল।আবার পিয়াসাকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,দাঁড়া! আমি এখনই তোর ভাইয়াকে ফোন করে বলি!”
পিয়াসা সঙ্গে সঙ্গে হেসে তার হাতটা ধরে ফেলল।
আরে পাগলি! ভাইয়া অনেক আগেই জানে। শুধু ভাইয়াই নয়, বাড়ির সবাই জেনে গেছে… শুধু তুই বাদে। কথাটা শুনে ইনায়া কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে রইল।তারপর আবারও পিয়াসাকে বুকে টেনে নিয়ে গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরল।চোখ ভিজে এল তার।খুব আস্তে বলল,
— “আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া… আমার বেবিটা মা হতে চলেছে। নিজের একদম খেয়াল রাখবি। সময়মতো খাওয়া, বিশ্রাম, ওষুধ—একটাও যেন বাদ না যায়। এখন থেকে তুই একা না, তোর ভেতরে আমাদের সবার সবচেয়ে আদরের ছোট্ট অতিথিটাও আছে। পিয়াসা মুচকি হেসে ইনায়ার কাঁধে মাথা রাখল।জানি, বেবি। তোরা সবাই পাশে আছিস বলেই তো এত সাহস পাচ্ছি।
ইনায়ার চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি বিরাজ করল নিজের বুকের ভেতরের সমস্ত কষ্ট যেন কিছুক্ষণের জন্য হলেও মিলিয়ে গেছে।আজ সে শুধু একটাই পরিচয়ে ভীষণ আনন্দিত সে খুব শিগগিরই মিমি হতে চলেছে।ইনায়া আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। তড়িঘড়ি করে ফোনটা হাতে নিয়ে তুবার নম্বরে কল দিল।কল রিসিভ হতেই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল,ওরে বেবি! কোথায় তুই?”
ওপাশ থেকে তুবার হাসিমাখা কণ্ঠ ভেসে এলো,
শপিংয়ে আছি, বেবি। কেন? কী হয়েছে? ইনায়া আর নিজের উত্তেজনা ধরে রাখতে পারল না।
আমি মিমি হব, জানিস? পিহু প্রেগন্যান্ট! আমার ভাতিজা… না হলে ভাতিজি আসছে! কাল ম্যাডাম বমি করল না এই জন্যই সয়তান আমাদের কিছু বলেই নি। কথাটা শুনেই তুবা আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠল,
— “রিয়েলি!”
পাশ থেকে পিয়াসাও হেসে ফেলল।তুবা উত্তেজিত কণ্ঠে বলতে লাগল,আমি এখন কী করব রে! দাঁড়া, আমি এখনই আসছি। তোরা আমার জন্য অপেক্ষা কর। আলহামদুলিল্লাহ আমি অনেক খুশি খুব খুশি
অন্যদিকে…
চৌধুরী গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে নিজের কেবিনে বসে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দেখছিল ইউভি। সামনে বসে আছেন লিখন চৌধুরী ও রেদোয়ান।কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর লিখন চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
তুমি কি ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্তটা নিচ্ছ, ইউভি? পুরো পাঁচ বছরের জন্য? ইউভি শান্ত গলায় উত্তর দিল,
কেন, বাবা? দশটা বছর তো তোমাদের ছাড়া দূরে ছিলাম। তাহলে পাঁচটা বছর কেন পারব না? আর এটা আমার ক্যারিয়ারের বিষয়। এখানে আমি কোনো কম্প্রোমাইজ করব না। লিখন চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,তখন তুমি একা ছিলে। এখন তো নূরকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইছ। নূরকে রেখে আমরা কীভাবে থাকব?”
ইউভি হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
— “বাহ, বাবা!,স্বার্থপর এর মতো কথা বললে কেমন করে ? আদরকে ছাড়া ও তোমাদের রেদোয়ান আছে, পিয়াসা আছে, আয়াত, আতিকা, রিদসহ বাড়ির প্রতিটা সদস্য আছে। কিন্তু আমি? আমি ওই লন্ডনে একা একা কীভাবে থাকব, একবারও ভেবেছ? একটু থেমে আবার বলল,
আমার আদরকে ছাড়া আমি একটা দিনও কল্পনা করতে পারি না। আর অ্যাটাচ একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট লাগলে রেদোয়ানকে তো পাঠাতে পারবেন না। এই মুহূর্তে আমি ওকে বনুর থেকে দূরে নিয়ে যেতে চাই না।”
— “আর একটা কথা… আদরকে আমি শুধু আমার স্ত্রী হিসেবে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি না, বাবা। আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি ওকে ভালো রাখার জন্য। ওর হাসিটা ফিরিয়ে আনার জন্য। তোমাদের তো ওর অসুস্থতা বিষয়ে সব বলেছি ডাক্তার বলেছেন, ওকে সবসময় মানসিকভাবে ভালো রাখতে হবে। তাই আমি চাই, ও আমার চোখের সামনেই থাকুক। ওকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ছেড়ে দেওয়ার সাহস আমার নেই।”
কথাগুলো শোনার পর পুরো কেবিনে সবার মাঝে নীরবতা নেমে এলো।ইউভির দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারিত কথাগুলোর পর আর কেউ কোনো আপত্তি করল না।কথাগুলো বলেই ইউভি টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলো গুছিয়ে নিল। তারপর রেদোয়ানের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
ব্রো চল। কাল সকালেই ফ্লাইট। আজকের মধ্যে বাকি সব কাজ শেষ করে ফেলতে হবে। রেদোয়ান মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।দু’জন পাশাপাশি কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে হাঁটতে লাগল।কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর রেদোয়ান মৃদু হেসে বলল রাজ্যর বিয়ের সেলিব্রেশনটায় অ্যাটেন্ড করতে পারলে না, ভাইয়া।
একটু থেমে আবার বলল,
— “যাই হোক… আজকের এই দিনটার জন্য তোমাকে অনেক অনেক অভিনন্দন। আমি নিজের চোখে দেখেছি, এই জায়গায় পৌঁছানোর জন্য তুমি কতটা স্ট্রাগল করেছ, কতটা পরিশ্রম করেছ। সত্যি বলতে, আজকের এই সাফল্যটা তোমার প্রাপ্য।”
রেদোয়ানের কথায় ইউভির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।সে ছোট ভাইয়ের কাঁধে আলতো করে হাত রেখে বলল,থ্যাংক ইউ, ব্রো। তবে তুই না থাকলে আমি একা কখনোই এতদূর আসতে পারতাম না। আমার প্রতিটা কঠিন সময়ে তুই ছায়ার মতো পাশে ছিলি।”কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ইউভির কণ্ঠটা গম্ভীর হয়ে উঠল।
—তোকে অনেক বড় দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি। বিশেষ করে পরিবার… আর আমার বনুর। এই সময়টায় ওর পাশে থাকতে পারলাম না বলে খারাপ লাগছে। তুই খেয়াল রাখিস, ব্রো। বনুর কোনো কমতি যেন না থাকে। রেদোয়ান দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— “তুমি একদম চিন্তা কোরো না, ভাইয়া। তুমি যেভাবে এতদিন আমাদের আগলে রেখেছ, তোমার অনুপস্থিতিতে আমিও ঠিক সেভাবেই সবাইকে আগলে রাখব। বিশেষ করে তোমার বনুকে। ওর আর আমাদের ছোট্ট অতিথির কোনো কিছুরই অভাব হতে দেব না। ইউভি আশ্বস্ত হয়ে মুচকি হাসল।দু’জনে ধীরে ধীরে পার্কিং এরিয়ার দিকে এগিয়ে গেল।গাড়িতে উঠে বসার পর ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিতেই সেটি ধীরে ধীরে অফিস প্রাঙ্গণ ছেড়ে বেরিয়ে এলো।পথে যেতে যেতে দুই ভাই লন্ডন এর নতুন প্রজেক্ট, আগামী দিনের পরিকল্পনা এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে নিল।
রাত ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়েছে।
চৌধুরী ভিলার বিশাল ডাইনিং হলের ঝাড়বাতির সোনালি আলোয় পুরো পরিবেশটা যেন আরও অভিজাত হয়ে উঠেছে। লম্বা ডাইনিং টেবিলজুড়ে সাজানো রয়েছে নানা রকম সুস্বাদু খাবার। গরম ধোঁয়া ওঠা পোলাও, রোস্ট, কাবাব, বিভিন্ন সবজি, সালাদ আর ডেজার্টে ভরে আছে পুরো টেবিল।এক এক করে পরিবারের সবাই এসে নিজেদের নির্দিষ্ট আসনে বসেছেন। দিনের শেষে সবাই একসঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার এই মুহূর্তটা চৌধুরী পরিবারের সবাই বেস এনজয় করে কিন্তু এদিকে পিয়াসার খাওয়ার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই।
রেশমা চৌধুরী বারবার নিজের হাতে ওর প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন, অথচ দু-এক লোকমার বেশি খেতেই পারছে না সে।সেটা দেখে নুসরাত চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন,এখন এমনটাই হবে। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে। রেদোয়ান অত্যন্ত যত্ন করে এক গ্লাস জুস এগিয়ে দিয়ে বলল,পিহু, যতটুকু পারো খাও। এখন শুধু নিজের জন্য না, আমাদের ছোট্ট অতিথির জন্যও খেতে হবে।।পিয়াসা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।ঠিক তখনই ইউভি টেবিলের চারপাশে একবার সবার দিকে তাকাল।তারপর শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,তোমাদের সবাইকে একটা কথা জানাতে চাই।”
মুহূর্তের মধ্যেই সবার মাঝো নেমে এলো নীরবতা।
সবাই প্রশ্নভরা দৃষ্টিতে ইউভির দিকে তাকিয়ে রইল।
ইউভি ধীরে ধীরে বলল,
— “আমি আগামী পাঁচ বছরের জন্য লন্ডন এ সেটেল হচ্ছি। নতুন বিজনেস প্রজেক্টের দায়িত্ব নিয়ে আমাকে সেখানে থাকতে হবে। কথাটা শেষ হতেই যেন সময় থমকে গেল।ইনায়ার হাতের চামচটা থেমে গেল মাঝপথেই।সে অবিশ্বাসে ইউভির দিকে তাকিয়ে রইল।কাঁপা কণ্ঠে শুধু একটাই শব্দ বেরিয়ে এলো—
— “পাঁচ… বছর?”
ইউভি ধীরে মাথা নাড়ল।হ্যাঁ, আদর।”
এর বেশি আর একটি কথাও শুনল না ইনায়া।
তার হাত থেকে চামচটা আস্তে করে প্লেটের ওপর পড়ে গেল।মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখের সমস্ত রং উধাও হয়ে গেল।চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।
সে আর এক মুহূর্তও সেখানে বসে থাকতে পারল না।চেয়ারটা আস্তে সরিয়ে উঠে দাঁড়াল।কেউ কিছু বোঝার আগেই দ্রুত পায়ে ডাইনিং হল ছেড়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।পরের মুহূর্তেই তাকে দেখা গেল প্রায় দৌড়ে ওপরে উঠে যেতে।কারও সঙ্গে একটি কথাও বলল না।শুধু বুকের ভেতর জমে ওঠা কান্নাটা আর আটকে রাখতে পারল না
ইনায়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে যেতেই ডাইনিং টেবিলে সবার মাঝে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা নেমে এলো।রেদোয়ান মুচকি হেসে মাথা নেড়ে বলল,
ভাইয়া, বনু তো পুরো কথাটাই না শুনে চলে গেল।”
রেশমা চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন,আরও কিছু বলার বাকি আছে নাকি, ?”রেদোয়ান নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে খাবার খেতে খেতেই উত্তর দিল,
আছে তো। সাহেব তার গিন্নিকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে।”
কথাটা শুনে নুসরাত চৌধুরী বিস্মিত হয়ে বললেন,
নূরকেও নিয়ে যাবি, বাবা?লিখন চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন,ওকে রেখে যা।
ইউভি নির্বিকার ভঙ্গিতে খাওয়া চালিয়ে যেতে যেতে বলল,কেন, বাবা? তোমার বুঝি দাদু ডাক শোনার ইচ্ছে নেই ইউভি ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে আবার বলল,দু’জন যদি দুই মেরুতে থাকি, তাহলে তুমি দাদু ডাক শুনতে পারবে কী করে?”
কথাটা শেষ করেই সে আবার খাওয়ায় মন দিল।
এরপর হালকা তাচ্ছিল্যের সুরে বললো সবচেয়ে বড় কথা, আমার বউকে ছাড়া আমি এক মুহূর্তও থাকতে পারব না। বিশেষ করে রাতে তো নয়ই।”
ইউভির মুখে কথাটা শেষ হতেই রাতিব চৌধুরী হঠাৎ কাশতে কাশতে বিষম খেয়ে ফেললেন।
রেদোয়ান দ্রুত সামনে রাখা পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল,আস্তে, বাবা ! এই নাও পানি খাও।”
ডাইনিং টেবিলে সবার মুখে চাপা হাসির রোল পড়ে গেল।
লিখন চৌধুরী মুচকি হেসে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,বউ কি শুধু তোমার একার আছে নাকি? এত ঢং করো কেন? ইউভিও এক মুহূর্ত দেরি না করে পাল্টা উত্তর দিল,তুমি-ই বা কম ঢং করো না কী ? জীবনে কোনোদিন দেখলাম না, মাকে এক রাতের জন্যও নানুবাড়িতে থাকতে দিয়েছ!”
কথাটা শুনে মুহূর্তের মধ্যেই লিখন চৌধুরীর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।তিনি আমতা আমতা করে বললেন,দিইনি… কারণ ইউভি ভ্রু কুচকে বলল,
— “হুম… কী কারণ? শুনি। লিখন চৌধুরী গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,দিইনি কারণ তোমার নানুবাড়ি তো একেবারে কাছেই। ছাদে দাঁড়ালেই বাড়িটা দেখা যায়। এখানে থাকা আর ওখানে থাকা একই কথা।”
ইউভি হাসতে হাসতে উত্তর দিল দেখলে তো! শেষ পর্যন্ত প্রমাণ হয়ে গেল, এই বউপাগলামিটা বংশগত। আমি শুধু আমার বাবা চাচ্চু দের ফলো করছি।
রেসমা চৌধুরী কথা অন্য প্রসঙ্গে নিয়ে বললেন ঠিক আছে। তোরা দু’জন একসঙ্গেই থাক। আল্লাহ তোদের দু’জনকে সবসময় ভালো রাখুন।”রেশমা চৌধুরীর কথা শুনে ইউভির মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। টেবিলের অন্যরাও মৃদু হেসে সম্মতি জানালেন। ঠিক আছে নিয়ে যাও তোমার আদর কে।
ইউভি আর রেদোয়ান রাতের খাবার শেষ করেই সোজা অফিস রুমে চলে গেল। দু’ভাই মিলে আরও কিছুক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র আর জরুরি কাজ গুছিয়ে নিল।রাত ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে এলো।ল্যাপটপ বন্ধ করতে করতেই রেদোয়ান মৃদু হেসে বলল,চলো, ভাইয়া। বাকি কাজ আমি সামলে নেব। তোমার তো কাল সকালেই ফ্লাইট। এখন গিয়ে একটু বিশ্রাম নাও। ইউভি মাথা নেড়ে হালকা হেসে বলল,নো, ব্রো। চার ঘণ্টা পেছিয়েছে, তবুও এখনই যেতে হবে। অনেক কিছু প্যাকিং এখনো বাকি। নিজের লাগেজ গুছাতে হবে। আর তোর ঘাড়-তেড়া, বেয়াদব বোনটার লাগেজও তো আমাকে গুছিয়ে দিতে হবে।”
একটু থেমে ঠোঁটের কোণে মায়াভরা হাসি ফুটিয়ে আবার বলল,দেখে এলাম… কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। রেদোয়ানও মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।তোমার আদরকে তো তুমি ছাড়া আর কেউ এভাবে সামলাতে পারবে না, ভাইয়া। দু’ভাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল। তারপর যে যার রুমের দিকে চলে গেল।
নিজের রুমে ঢুকেই ইউভি প্রথমে ওজু করে নিল।
প্রতিদিনের মতো গভীর একাগ্রতায় তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করল। দীর্ঘ সময় ধরে নিজের রবের কাছে দোয়া করল নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, আর সবচেয়ে বেশি দোয়া করল নিজের আদরের জন্য।নামাজ শেষে ধীর পায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে এলো।ইনায়া তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
কান্নার ক্লান্তি যেন তাকে শিশুর মতো নিশ্চিন্ত ঘুম উপহার দিয়েছে।ইউভি আলতো করে নিচু হয়ে তার কপালে গভীর ভালোবাসার একটি চুমু এঁকে দিল।
তারপর ধীরে ধীরে আলমারি খুলে ইনায়ার প্রয়োজনীয় সব কাপড়, ওষুধ, প্রসাধনী, দরকারি জিনিসপত্র একে একে অত্যন্ত যত্ন করে লাগেজে গুছিয়ে রাখতে লাগল।সঙ্গে আইভিএ গ্রুপের প্রয়োজনীয় সব গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও কাগজপত্রও আলাদা করে ব্যাগে রেখে দিল।সবশেষে নিজের জিনিসপত্রও গুছিয়ে নিতে শুরু করল।কখন যে রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে, সে খেয়ালই করেনি।ঠিক তখনই চারদিকে ভেসে এলো ফজরের আজান।ইউভি আবার ওজু করে ফজরের নামাজ আদায় করল।
নামাজ শেষে রান্নাঘরে গিয়ে নিজের জন্য এক মগ গরম ব্ল্যাক কফি বানিয়ে নিয়ে রুমে ফিরে এলো।কফিতে ধীরে ধীরে চুমুক দিতে দিতে আবারও একবার সব লাগেজ খুলে দেখে নিল।কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস বাদ পড়েছে কি না, সবকিছু আরেকবার নিশ্চিত হয়ে গুছিয়ে রাখল।
ভোরের কোমল আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়তেই ইনায়ার ঘুম ভাঙল।
ঘুমজড়ানো চোখে পাশে হাত বাড়াতেই থমকে গেল সে।বিছানার পাশটা খালি।আধোঘুমের মধ্যেই উঠে বসে মনে মনে ভাবল,আমার শেহজাদা তাহলে কি চলে গেছে? কথাটা ভাবতেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন শূন্য হয়ে গেল।ঠিক সেই মুহূর্তেই—
তার ভাবনার উপর ঝপাৎ করে এক বালতি পানি ঢেলে দিল ইউভি ইনায়া চমকে উঠে চোখ বড় বড় করে সামনে তাকাতেই দেখল সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইউভি।তার মুখে সেই চেনা দুষ্টু হাসি।ইনায়ার বিস্মিত মুখ দেখে ইউভি ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
— “গুড মর্নিং, মিসেস চৌধুরী।”
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে রাগ আর অভিমানের মাঝামাঝি এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।ইউভি হেসে বলল,কী হলো? এত দিনের জন্য যাচ্ছি… আমার সবকিছু গুছিয়ে দেবে কে , একটু কেয়ারিং হও তো বউ এর থেকে কি এই আশাটুকুও কি করা যাবে না? ইনায়া বুঝতেই পারছিল না, রাগ করবে, নাকি আবার কেঁদে ফেলবে।
ইউভি আবার বলল,
— “দেখেছ? কাঁদলে ঘুমটা কত ভালো হয়! সারা রাত একবারও ওঠোনি। শুধু ঘুমের মধ্যে খাটের চারপাশে গোল গোল ঘুরে বেড়িয়েছ। একটু থেমে মজা করে বললো আজ তো আমি ঘুমাইনি। তাই কেউ বারবার তোমাকে বুকে টেনে নেয়নি। সবসময় তো পায়ের কাছে চলে যাও। সেই আমাকেই আবার বুকে টেনে নিয়ে আসতে হয়।
ইনায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,আপনি ঘুমাননি? মানে… সারারাত কী করেছেন? ইউভি কোনো উত্তর না দিয়ে পাশের দুটি বড় লাগেজের দিকে আঙুল দেখাল।প্যাকিং করেছি।”
ইনায়ার দৃষ্টি ধীরে ধীরে লাগেজ দুটির দিকে গিয়ে থামল…ইউভি আবারও একবার লাগেজ দুটো খুলে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সবকিছু মিলিয়ে দেখতে লাগল। কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস বাদ পড়েছে কি না, সেটাই নিশ্চিত করছিল।সবকিছু দেখে নিয়ে হঠাৎই মুচকি হেসে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
সবকিছু ঠিক আছে তো, আদর দেখে নাও তো ? আর কিছু নিতে হবে নাকি? ইনায়া কাঁদো কাঁদো মুখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর খুব আস্তে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
হুম… আছে তো।”
ইউভি ভ্রু তুলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা? কী নিতে ভুলে গেছি বলো তো?”পরের মুহূর্তেই ইনায়া শিশুর মতো দু’হাত উঁচু করে ইউভির দিকে বাড়িয়ে দিল।চোখ দুটো আবারও টলমল করে উঠেছে।কাঁপা কণ্ঠে বলল,
— “আমাকে… আমাকে নিয়ে যাও তোমার সঙ্গে। আমি তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারব না, বর। প্লিজ… আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাও। কথাগুলো বলেই সে স্থির দৃষ্টিতে ইউভির দিকে তাকিয়ে রইল।
ইউভি কিন্তু কোনো উত্তর দিল না।শুধু ঠোঁটের কোণে মৃদু একটুকরো হাসি ফুটিয়ে আবারও লাগেজ গোছানোর কাজে মন দিল।ইনায়া অভিমানী মুখে আবার ডাকল,
— “বর…”
ইউভি কাজ থামিয়ে ধীরে ধীরে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল।মায়াভরা চোখে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
— “হুম… বলো বউ।”
ইনায়া আবারও দু’হাত উঁচু করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।একদম ছোট্ট বাচ্চাদের মতো গলায় বলল,
— “নিয়ে যাও না… নিয়ে যাও, আমাকে ওই বর।”
ইউভি আর নিজেকে সামলাতে পারল না।মুচকি হেসে একপাশে রাখা বড় লাগেজটার দিকে ইশারা করল।ওদিকে একবার তাকাও তো, মিসেস চৌধুরী। ইনায়া অবাক হয়ে লাগেজটার দিকে তাকাল এই টা তো তার পিংক কালারের লাগেজ টা
ইউভি দুষ্টু হেসে বলল,আগে তোমার সবকিছু গুছিয়েছি, তারপর নিজেরটা। তোমার কাপড়, ওষুধ, দরকারি সব জিনিস—একটাও বাদ দিইনি।”
কথাটা শুনে ইনায়া বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।ইউভি আলতো করে এগিয়ে এসে তার নাকে আদুরে করে একটা টোকা দিয়ে মৃদু হেসে বলল,
পাঁচটা বছর আমি তোমাকে ছাড়া কীভাবে থাকব বলো তো? তাই তো তোমাকে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছি সঙ্গে ।”
একটু থেমে আরও নিচু স্বরে বলল,. আমি শুধু বিজনেসের জন্য লন্ডন যাচ্ছি না, আদর। আমার আরও একটা বিশেষ কারণ আছে।”
ইনায়া মিটিমিটি হেসে বলল,
শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৭
— “এত ভালোবাসো?”
ইউভি তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,”ভালোবাসি বললে কম বলা হবে। তুমি আমার অভ্যাস। মানুষ অভ্যাস ছাড়া থাকতে পারে না। তুমি না থাকলে কাজে মন বসবে না, ঘুম আসবে না,ঠিকমতো খেতে পারব না । তাই যেখানে ইউভি যাবে, তার আদরও সেখানেই যাবে। এটাই শেষ কথা।তুৃমি থাকলে বিদেশও আপন লাগে আদর, আর তুমি না থাকলে নিজের বাড়িটাও ফাঁকা লাগে।
ইনায়া ইউভির বুকে মুখ গুজে বলে উঠলো কিন্তু বর তুবার বিয়ে?
