শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৭
সুমাইয়া ইসলাম নূর
নগরজুড়ে তখন নেমে এসেছে এক শান্ত, স্নিগ্ধ নীরবতা। দিনের কোলাহল অনেক আগেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। দূরে কোথাও দু-একটি গাড়ির ক্ষীণ শব্দ ছাড়া চারপাশ যেন নিস্তব্ধতার চাদরে মোড়ানো।
আকাশের বুকে অর্ধচন্দ্র মৃদু আলো ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অসংখ্য তারা সেই আলোকে সঙ্গ দিয়ে যেন রাতের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে। হালকা শীতল বাতাসে দুলে উঠছে গাছের ডালপালা, পাতার মৃদু মর্মর ধ্বনি যেন প্রকৃতির নিজস্ব এক নীরব সুর।
এদিকে….
ইউভি অত্যন্ত যত্ন করে টলমল পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়াকে গাড়ির ভেতরে বসিয়ে দিল। কিন্তু বসার পরও ইনায়ার শরীরটা বারবার হেলে পড়ছিল। হালকা নেশায় চোখ দুটো আধবোজা, হয়ে যাচ্ছে বারবার মুখটা লালচে হয়ে উঠেছে।
ইউভি নিঃশ্বাস ফেলে আলতো করে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। তারপর কোনো দ্বিধা না করে ইনায়াকে নিজের কোলে বসিয়ে এক হাত দিয়ে কোমর, আরেক হাত দিয়ে মাথাটা বুকে আগলে রাখল।
গাড়ির ভেতরে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা।
হঠাৎই ইউভির বুকের সঙ্গে মুখ গুঁজে থাকা ইনায়া জড়ানো কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,এত ভালোবাসো না আমাকে, বর ইউভি ভ্রু কুঁচকে নিচের দিকে তাকিয়ে বললো কেন, আদর?”
ইনায়া ধীরে ধীরে মাথা তুলে তার চোখের দিকে তাকাল। নেশায় ঝাপসা হয়ে থাকা চোখদুটো অশ্রুতে আরও চিকচিক করছে।পরে যখন অবহেলা করবে আমি যে সহ্য করতে পারব না…”
কথাটা শুনেই ইউভির বুকটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল।সে দু’হাতে ইনায়ার মুখটা আলতো করে তুলে ধরে কপালের এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিল।
অত্যন্ত কোমল কণ্ঠে বলল,
— “আমি কেন তোকে অবহেলা করব, আদর? এমন কথা তোর মনে এলো কীভাবে?”
ইনায়া যেন তার কথাই ঠিকমতো শুনছে না।
নেশার ঘোরে শিশুর মতো বিড়বিড় করে বলল,
— “আমি তো… তোমার ইচ্ছে কে এনে দিতে পারব না। তখন তুমিও আমাকে আর আগের মতো ভালোবাসবে না।কথাগুলো শেষ হতেই গাড়ির ভেতরটা যেন আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।ইউভি ধীরে ধীরে চোখ দুটো বন্ধ করল।গভীর একটা শ্বাস নিল।
নিজের বুকের ভেতরে জমে থাকা কষ্টটাকে কোনো রকমে সামলে আবার চোখ খুলল।তারপর ইনায়ার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে খুব শান্ত স্বরে বলল,
— “কখনো না, আদর। কোনোদিনও না। আমি আমার আদরকে কোনোদিন অবহেলা করব না।”
একটু থেমে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আরও নিচু স্বরে বলল,ডা. রাজিয়া সুলতানা আমাকে সবকিছু বলেছেন। কথাটা শুনে ইনায়ার শরীরটা কেঁপে উঠল।ইউভি তার কাঁধে আশ্বাসের হাত রেখে বলল,
— “তুই এখন নিজের মধ্যে নেই। আগে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যা। তারপর আমরা দু’জনে বসে সব কথা বলব।
কিন্তু ইনায়া যেন হঠাৎই শিশুর মতো জেদ ধরে বসল।পরের মুহূর্তেই ঝুঁকে এসে ইউভির ঠোঁট দুটো নিজের অধরে বন্দি করে ফেলল।
বারবার একইভাবে ভালোবাসার স্পর্শ এঁকে দিয়ে একটু সরে এসে মিষ্টি হেসে বলল,”এই যে… আমি একদম স্বাভাবিক আছি। ইউভি তার দিকে তাকিয়ে অজান্তেই হেসে ফেলল।আলতো করে ইনায়ার নাকটা ছুঁয়ে দিয়ে বলল,তুমি যে স্বাভাবিক নেই… এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?”
ইনায়া কোনো উত্তর দিল না।শুধু আবারও মুখ লুকিয়ে দিল ইউভির প্রশস্ত বুকে।কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর খুব আস্তে বলল,
— “বর…”
ইউভি তার চুলে হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— “হুম বলো, বউ।
ইনায়ার কণ্ঠটা কেঁপে উঠল।জানো আজ আমি খুব কেঁদেছি ইউভি চোখ বন্ধ করেই বলল,জানি, আদর… সব জানি।”ইনায়া আবার বলল,আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল… খুব কথাগুলো বলতে বলতেই তার চোখ বেয়ে আবার অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।আমার খুব ইচ্ছে ছিল… তোমার জন্মদিনের আগেই তোমাকে একটা বড় সারপ্রাইজ দেব। তোমার সবচেয়ে বড় ইচ্ছেটা পূরণ করব। কিন্তু তার গলা ধরে এলো। কাপা কাপা কন্ঠে বললো হলো না…”
ইউভি কিছু বলল না।শুধু আরও শক্ত করে তাকে বুকে জড়িয়ে নিল।ইনায়া কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
— “এই জন্যই আজ এত কেঁদেছি। শুধু একটা কথাই বারবার মনে হয়েছেআমি যদি কোনোদিন… তোমাকে বাবা হওয়ার সুখটাই দিতে না পারি?”
কথাটা বলেই সে ভেঙে পড়ল ইউভির বুকে।
হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল, যেন বুকের ভেতরে এতখন ধরে জমে থাকা সমস্ত ভয় একসঙ্গে বেরিয়ে আসছে।
আমার নিজের উপরি বিরক্ত লাগছে বর।
ইউভি ইনায়ার মাথাই হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো সাধে কি আর বলি বুদ্ধি হাটুতে। এই সামন্য বিষয়ে কেও নিজেকে দোষ দেয়।
—আজকের পর আর একবারও নিজেকে দোষ দিবে না। কারণ আমি আমার স্ত্রীকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছি, মাথা নিচু করে কাঁদতে নয়। তুমি আমার ইনায়া। আমার আদর। আল্লাহর সবচেয়ে সুন্দর উপহার। এই উপহারের সঙ্গে আমি পৃথিবীর কোনো কিছুর তুলনা করি না।”
সন্তান আমাদের ভালোবাসার একটা উপহার হতে পারে, কিন্তু তুমি আমার ভালোবাসার কারণ। উপহার না পেলেও মানুষ বাঁচতে পারে, কিন্তু কারণ হারিয়ে ফেললে বাঁচা যায় না। তাই তুমি কখনো নিজেকে আমার কাছে অসম্পূর্ণ ভেব না। আমার কাছে তুমি ই আমার সম্পূর্ণ পৃথিবী।
রাত তখন আরও গভীর হয়েছে। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এসেছে। রাস্তাজুড়ে সোডিয়াম লাইটের হলুদ আভা ছড়িয়ে পড়েছে। গাড়ির ভেতরে নেমে এসেছে এক অপার্থিব নীরবতা।ইনায়া এখনও ইউভির বুকের সঙ্গে মুখ লুকিয়ে আছে। কথা বলতে বলতে কখন যে তার চোখদুটো ভারী হয়ে এসেছে, সে নিজেও টের পায়নি।খুব আস্তে আস্তে বিড়বিড় করে বলল,
— “বর… আমাকে ছেড়ে যেও না…”
ইউভি তার মাথায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে মৃদু স্বরে উত্তর দিল,কখনো না, আদর।”
কথাটা শুনেই যেন নিশ্চিন্ত হয়ে গেল ইনায়া।
ধীরে ধীরে তার নিশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এলো। মুহূর্তের মধ্যেই সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল, মাথাটা ইউভির বুকেই নিশ্চিন্তে এলিয়ে রইল।
ইউভি কিছুক্ষণ নীরবে তার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকল। চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর দাগগুলো বুকের ভেতরটাকে আবারও মোচড় দিয়ে উঠতে বাধ্য করল।সে আর কিছু বলল না।শুধু আরও শক্ত করে নিজের বুকের সঙ্গে।
কিছুক্ষণ পর গাড়িটি এসে থামল চৌধুরী ভিলার সামনে।এক হাতে ইনায়াকে শক্ত করে আগলে রেখে অন্য পা দিয়ে গাড়ির দরজাটা আলতো করে ঠেলে বন্ধ করে দিল।স্বয়ংক্রিয় লক হওয়ার ক্ষীণ শব্দ রাতের নীরবতায় মিলিয়ে গেল।তারপর দুই বাহুতে নিজের ঘুমন্ত স্ত্রীকে আগলে নিয়ে ধীর পায়ে ভিলার ভেতরে প্রবেশ করল।রাত অনেক হয়ে যাওয়ায় পুরো ভিলা তখন প্রায় নিস্তব্ধ গেছে সবাই ঘুমিয়ে পরেছে। করিডোরজুড়ে শুধু নরম নাইটল্যাম্পের আলো জলছে।ইউভির পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত সতর্ক।যেন সামান্য ঝাঁকুনিতেও তার আদরের ঘুম ভেঙে না যায়।
রুমে পৌঁছে অত্যন্ত যত্ন করে ইনায়াকে বিছানায় শুইয়ে দিল।কিছুক্ষণ তার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর আলতো করে গাউন আর অলংকারগুলো খুলে দিল। খুব সাবধানে পার্টির পোশাক বদলে নিজের একটি সাদা কটন টি-শার্ট আর নরম জিন্স পরিয়ে দিল তাকে।ঢিলে টি-শার্টটা ইনায়ার শরীরে এসে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে।
ঘুমন্ত অবস্থাতেই সে শিশুর মতো কুঁকড়ে শুয়ে রইল।ইউভি আলতো করে চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিয়ে কপালে দীর্ঘ একটি চুমু এঁকে ফিসফিস করে বলল,
— “ঘুমাও… আমার আদর।”
এরপর ধীরে ধীরে উঠে বাথরুমের দিকে চলে গেল
শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়েও আছে ইউভি
বরফশীতল পানির ধারা একের পর এক গড়িয়ে পড়ছে তার মাথা, কাঁধ আর বুক বেয়ে।
ইউভি চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর নিজের মনেই খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,বিশ্বাস কর, আদর… যখন ডা. রাজিয়া সুলতানা আমাকে সব বললেন, তখন একবারের জন্যও আমাদের সন্তানের কথা আমার মাথায় আসেনি।আমি শুধু তোর কথাই ভেবেছি। না জানি কতটা ভেঙে পড়েছিস তুই একা একা কষ্ট পেয়েছিস অনেক আমি তো সবসময় ভাবতাম, পৃথিবীর সব কষ্ট থেকে তোকে আড়াল করে রাখব। অথচ দেখ… এত কিছু করেও তোর চোখের জল থামাতে পারলাম না। সে দু’হাত দেয়ালে রেখে মাথাটা নিচু করল।উফ… কী ভীষণ অসহায় লাগছে নিজেকে। এই অনুভূতিটা সত্যিই খুব বাজে, বউ… খুব বাজে।
অনেকক্ষণ পর শাওয়ার বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এলো ইউভি।তার পরনে এখন সাদা রঙের একটি সাধারণ টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার।
ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতেই তার চোখ গিয়ে পড়ল টেবিলের ওপর রাখা একটি ফাইলের দিকে।ডা. রাজিয়া সুলতানার কাছ থেকে সংগ্রহ করা ইনায়ার সব মেডিকেল রিপোর্ট।ধীরে ধীরে ফাইলটা হাতে তুলে নিয়ে সোফায় বসে পড়ল সে।
একটার পর একটা রিপোর্ট অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগল প্রতিটি শব্দ প্রতিটি মেডিকেল টার্ম…
প্রতিটি পর্যবেক্ষণ সে গভীর মনোযোগে পড়ল।
সবশেষ পাতাটা বন্ধ করে অনেকক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল।তারপর দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে খুব আস্তে নিজের মনেই বলল ডাক্তার ওষুধ দেবেন, চিকিৎসা করবেন কিন্তু তোর সবচেয়ে বড় ওষুধটা আমি হব, আদর। আজ থেকে তোকে ভালো রাখার দায়িত্বটা আমি আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলাম। তোর হাসি ফিরিয়ে আনা এখন শুধু আমার ইচ্ছে নয়—আমার প্রতিজ্ঞা। যতদিন আমি বেঁচে আছি, ততদিন তোকে কোনো কষ্ট একা বহন করতে দেব না। একদিন, ইনশাআল্লাহ… এই রিপোর্টের পাতাগুলো আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতির সামনে একেবারেই তুচ্ছ হয়ে যাবে।
কথাগুলো বলেই ইউভি একবার বিছানার দিকে তাকাল।গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ইনায়া তখনও তার টি-শার্ট জড়িয়ে শিশুর মতো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।ইউভির ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটুকরো মায়াভরা হাসি ফুটে উঠল।
খুব আস্তে বলল তুই শুধু আমার স্ত্রী না, আদর… তুই আমার দোয়া। আর নিজের দোয়াকে আগলে রাখতে মানুষ কখনো ক্লান্ত হয় না।”
ইউভি শেষবারের মতো রিপোর্টের ফাইলটা বন্ধ করতেই নিচতলা থেকে হঠাৎ ভেসে এলো এক আতঙ্কিত চিৎকার পিহু! কী হলো তোর? পিহু…!”
রেদোয়ানের কণ্ঠে এমন আতঙ্ক আগে কখনো শোনা যায়নি।মুহূর্তের মধ্যেই ইউভি চমকে উঠে দরজা খুলে প্রায় দৌড়ে নিচে নেমে এল।তার সঙ্গে সঙ্গে লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রবিউল চৌধুরী, রেশমা চৌধুরী, নুসরাত চৌধুরী, সাবিহা চৌধুরী—এক এক করে সবাই ড্রইংরুমে এসে জড়ো হলেন।
সামনের দৃশ্যটা দেখেই সবার বুক কেঁপে উঠল।
রেদোয়ানের কোলের ওপর অচেতন হয়ে পড়ে আছে পিয়াসা।রেদোয়ানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। দু’হাতে শক্ত করে আগলে রেখেছে নিজের স্ত্রীকে। পিহু… চোখ খোলো। প্লিজ…”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠছে।সাবিহা চৌধুরী দ্রুত রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস পানি এনে পিয়াসার মুখে ছিটিয়ে দিলেন।
কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল পিয়াসা।সবাই একসঙ্গে যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।রেদোয়ান দু’হাতে তার মুখটা ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,আজ না… বেশ কয়েকদিন ধরেই দেখছি তুই ঠিকমতো খাচ্ছিস না, বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছিস। কী হয়েছে, পিহু? ডাক্তার দেখিয়েছিলি? আমাকে কিছু বলার প্রয়োজন মনে করিস না পাশ থেকে রেশমা চৌধুরীও উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,আমিও অনেকদিন ধরেই খেয়াল করছি। মাছ, মাংস—কিছুই ঠিকমতো খাচ্ছিস না। মুখটাও কেমন শুকিয়ে গেছে। কী হয়েছে, মা?
ইউভি ধীরে ধীরে বোনের সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।অত্যন্ত স্নেহভরা কণ্ঠে বলল,বনু… সবকিছু নিজের ভেতরে লুকিয়ে রাখিস না। তোদের জন্য আমরা কতটা চিন্তা করি, সেটা তো জানিস। বল না পাখি কী হয়েছে? পিয়াসা নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।তার চোখ ভরে উঠেছে অশ্রুতে।
খুব আস্তে বলল,আমি জানি আমার কী হয়েছে…”
ইউভি সঙ্গে সঙ্গে বলল,ডাক্তার দেখিয়েছিস? কী বলেছে? কোনো উত্তর না পেয়ে আবারও বলল,
তুইও কি ওই বেয়াদবটার মতো হয়ে যাচ্ছিস? সবকিছু নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখছিস?”
রেশমা চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন,
— “কার কথা বলছিস?”
ইউভি হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
কে আবার তোমাদের নূর। কথাটা শুনেই নুসরাত চৌধুরী চমকে উঠলেন।নূরের কী হয়েছে?”
ইউভি সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিল।ও কিছু না। আগে বনুর দিকে মন দাও। নুসরাত চৌধুরী আবার পিয়াসার হাত ধরে বললেন,বল না মা… কী হয়েছে?”রেদোয়ান আর অপেক্ষা করতে পারল না।
উচ্চস্বরে বলে উঠল,কেউ আমাদের ফ্যামিলি ডাক্তারকে ফোন দাও। এখনই! পিয়াসা হঠাৎ কেঁদে ফেলল।তারপর কাঁপা কণ্ঠে বলল,ডাক্তার লাগবে না সবাই তার দিকে তাকিয়ে রইল।পিয়াসা চোখের পানি মুছে খুব আস্তে বলল,আমি প্রেগন্যান্ট।”
পুরো বাড়িটা উপস্থিত সবাই যেন হঠাৎ থমকে গেল।কারও মুখে কোনো শব্দ নেই।সবাই যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।হঠাৎ রেদোয়ান দু’হাতে পিয়াসার মুখটা ধরে প্রায় চিৎকার করে উঠল,
— “সত্যি, পিহু? সত্যি? পিয়াসা কান্নার মাঝেই লাজুক হেসে মাথা নাড়ল।হ্যাঁ…পরের মুহূর্তেই রেশমা চৌধুরী ছুটে এসে পিয়াসাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন।চোখ ভিজে উঠেছে আনন্দে।
এই পাগলি মেয়ে! এত বড় সুখবর লুকিয়ে রেখে কাঁদছিলি কেন? পিয়াসা মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে বলল,আজ সকালেই জেনেছি, মা কথাটা শেষ হতেই চারদিক থেকে একসঙ্গে ভেসে এলো—
“আলহামদুলিল্লাহ! পুরো চৌধুরী ভিলা যেন আনন্দে মুখর হয়ে উঠল।
রাতিব চৌধুরী আবেগে দু’হাত আকাশের দিকে তুলে বললেন,আলহামদুলিল্লাহ… আমি দাদু হতে যাচ্ছি!”
লিখন চৌধুরী হেসে বললেন,আর আমি নানুভাই!”
রবিউল চৌধুরী হেসে উঠলেন। আরে মিষ্টি কই
নুসরাত চৌধুরী বললেন,কেউ দাঁড়িয়ে আছো কেন? তাড়াতাড়ি মিষ্টি নিয়ে আসো! চারদিকে আনন্দ, হাসি আর আলহামদুলিল্লাহ ধ্বনিতে ভরে উঠল পুরো বাড়ি।
কিন্তু…
এই আনন্দের মাঝেও ইউভি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল।
তার চোখ ভরে উঠেছে অদ্ভুত এক ভালোবাসায়।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নিজের ছোট বোনের সামনে দাঁড়াল।পিয়াসা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।খুব আস্তে বলল,”ভাইয়া…”ইউভির ঠোঁট কেঁপে উঠল।সে দু’হাতে পিয়াসার মুখটা তুলে কপালে দীর্ঘ একটা চুমু এঁকে দিল।তারপর ভেজা চোখে মৃদু হেসে বলল,আমার ছোট্ট বনু… নিজেই মা হতে চলেছে!”কথাটা বলেই সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।পিয়াসাকে শক্ত করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল।তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।
— “আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া। আজ তুই আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর খবরটা দিলি। জানিস, তোকে প্রথম যখব কোলে নিয়েছিলাম যেদিন… মনে হয়েছিল আমার একটা ছোট্ট পুতুল এসেছে । আর আজ সেই পুতুলটাই আরেকটা ছোট্ট প্রাণের মা হতে চলেছে। আল্লাহ তোদের দু’জনকে সুস্থ রাখবে ইনশাআল্লাহ।”
কথাগুলো শুনে উপস্থিত সবার চোখই আনন্দে ভিজে উঠল।
— “আজ থেকেই তোরা নিচতলার রুমে শিফট করবি। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা যতটা সম্ভব কম করতে হবে। আর রেদোয়ান সে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো অফিস তোকে আপাতত যেতেই হবে। কিন্তু যত ব্যস্ততাই থাকুক না কেন বনুর খেয়াল রাখবি। সময়মতো খাওয়া, ওষুধ, বিশ্রাম—একটাও যেন বাদ না যায়। রেদোয়ান মাথা নত করে মৃদু হেসে বলল,জি, ভাইয়া। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এখন ও আর আমাদের ছোট্ট অতিথি।
ইউভি এবার আবার পিয়াসার দিকে তাকিয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে বলল,আর শুন, বনু… তোর গিফটটা কাল দেব। আজ আর কিছু নয়। আজ থেকে রাত জাগা একদম বন্ধ। নিজের যত্ন নে। তারপর একে একে পরিবারের সবাই এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।কেউ কপালে চুমু খেলেন, কেউ মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন।চারদিকে শুধু শুভেচ্ছা, দোয়া আর আনন্দের আবহ তৈরি হলো
হঠাৎ রেদোয়ান গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
— “প্লিজ… এখন যদি সবাই আমাকে একটু সময় দেন? সবাই মুচকি হেসে সরে দাঁড়াতেই সে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে পিয়াসাকে দুই বাহুতে তুলে নিল।
পিয়াসা লজ্জায় ফিসফিস করে বলল,নামাও… সবাই দেখছে।”রেদোয়ান একগাল হেসে উত্তর দিল,
এক পা-ও হাঁটতে হবে না। এখন থেকে খুব সাবধানে থাকতে হবে।কথাটা শুনে সবাই আবারও হেসে উঠল।পিয়াসা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলল রেদোয়ানের বুকে।রেদোয়ান অত্যন্ত যত্ন করে তাকে কোলে নিয়েই ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল।ওদের চলে যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে রইল ইউভি।
ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক প্রশান্তির হাসি।
মনে হচ্ছিল, নিজের সুখের থেকেও আজ বোনের সুখে তার হৃদয় অনেক বেশি পরিপূর্ণ।
কিছুক্ষণ পর সে রেশমা চৌধুরী আর নুসরাত চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল,
মা মেজো মা কাল একটা লিস্ট করে দিও। বনুর এখন কী কী দরকার হবে, সবকিছু। একটাও যেন বাদ না যায়।”সাবিহা চৌধুরী হেসে বললেন,
এই নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, ইউভি। আমরা সবাই আছি। সবকিছু আমরা দেখে নেব।”
ইউভি মাথা নেড়ে বলল,তোমরা বুঝতে পারছ না। ও শুধু আমার বোন না… আমার কলিজার টুকরো। ওর কোনো কিছুর যেন অভাব না হয়। রেশমা চৌধুরী স্নেহভরা হাসি দিয়ে বললেন,হ্যাঁ রে, আমরা বুঝি। এখন যা আগে নূরকে খবরটা দে। পাগল মেয়েটা শুনলে কত খুশি হবে!
ইউভির চোখের হাসিটা মুহূর্তেই একটু মলিন হয়ে এল।সে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,হুম… বলছি।”
কিছুক্ষণ পর ইউভি নিজের রুমের দরজা আস্তে করে খুলল।ঘরের নরম আলোয় ইনায়া তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মুখভরা প্রশান্তি, অথচ চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর ক্ষীণ দাগ এখনো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ইউভি ধীরে ধীরে তার পাশে গিয়ে বসল।অনেকবার ইচ্ছে হলো তাকে জাগিয়ে বলবে আদর… শুন, আমাদের বনু মা হতে চলেছে।”
কিন্তু পরক্ষণেই থেমে গেল।
আজ সারাদিনে মেয়েটা যতটা মানসিক ধকল গেছে, তার পর এই শান্ত ঘুমটুকু ভাঙার অধিকার যেন তারও নেই।মৃদু হেসে খুব আস্তে ইনায়ার কপালে চুমু খেল।তারপর আলতো করে তাকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিল।ঘুমের মধ্যেই ইনায়া অভ্যাসবশত আরও একটু সরে এসে ইউভির বুকের সঙ্গে মুখ লুকিয়ে নিল।ইউভির বুকটা হালকা কেঁপে উঠল।সে ইনায়ার এলোমেলো চুলে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,আজ আমাদের বাড়িতে একটা নতুন সুখবর এসেছে, আদর। সবাই খুব খুশি… কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা এখনো তোকে নিয়ে তুই। তোর হাসিটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় উৎসব।একটু থেমে সে ইনায়ার কপাল নিজের ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিল।
রুমের দরজাটা আলতো করে বন্ধ করতেই চারপাশে নেমে এলো এক গভীর নীরবতা। দূরে জানালার বাইরে রাতের মৃদু বাতাসে পর্দা দুলছে। কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেও রেদোয়ানের বুকের ভেতরটা যেন তীব্র আবেগে কাঁপছে।
দরজা থেকে এক পা… দুই পা… ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সে পিয়াসার সামনে দাঁড়াল।কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়েই রইল।যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না—এই ছোট্ট মানুষটার ভেতরেই তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর উপহার বেড়ে উঠছে।
পরের মুহূর্তেই আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
এক ঝটকায় পিয়াসাকে নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে নিল।মাথার চুলে, কপালে, চোখের পাতায়, গালে একের পর এক স্নেহভরা চুমু এঁকে দিতে লাগল। তারপর কাঁপা হাতে তার মুখটা দু’হাতের মাঝে তুলে নিয়ে খুব ধীরে, গভীর ভালোবাসায় তার ঠোঁটে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
সেই স্পর্শে ছিল না কোনো উন্মাদনা—ছিল শুধু সীমাহীন ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা আর অগাধ মুগ্ধতা।
কিছুক্ষণ পর কপাল কপালে ঠেকিয়ে ভেজা গলায় ফিসফিস করে বলল,রিয়েলি, পিহু…? আমি… আমি বাবা হব? মানে… সত্যিই আমি বাবা হব?”
রেদোয়ানের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।চোখের কোণে চিকচিক করছে আনন্দের জল।পিয়াসাও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তেই মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ… আর আমি… আমি মা হব।
কথাটা শেষ হতেই রেদোয়ান আবারও তাকে বুকে জড়িয়ে নিল।মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সমস্ত সুখ যেন তার দুই বাহুর ভেতর বন্দী।সে আলতো করে নিচু হয়ে পিয়াসার পেটের ওপর নিজের কপাল ঠেকাল।দুই হাত দিয়ে অত্যন্ত যত্নে আগলে রেখে আবেগভরা কণ্ঠে বলল,
— “আল্লাহ… তোমাকে হাজার হাজার শুকরিয়া। এত বড় নিয়ামত আমার মতো মানুষকেও দিলে!”
একটু থেমে মৃদু হেসে আবার বলল,শোনো ছোট্ট পাখি আমি তোমার বাবা। তুমি এখনো পৃথিবীর আলো দেখনি, কিন্তু জেনে রাখো তোমার জন্য একজন পাগল বাবা প্রতিদিন অপেক্ষা করবে। তুমি আসার আগেই তোমাকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি।”পিয়াসার বুকটা হুহু করে উঠল।
সে নিচু হয়ে রেদোয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
রেদোয়ান আবার উঠে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
পিহু… আজ মনে হচ্ছে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ। আমার কাছে টাকা, ব্যবসা, সফলতা—কিছুই আর বড় মনে হচ্ছে না। কারণ আজ আল্লাহ আমাকে এমন একটা সুখ দিয়েছেন, যার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো কিছুর তুলনা হয় না।”
পিয়াসা মৃদু হেসে চোখ মুছে বলল,
তুমি খুশি তো? রেদোয়ান অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।তারপর হেসে ফেলল।খুশি? এই অনুভূতির নাম যদি খুশি হয়, তাহলে এর চেয়ে বড় খুশি পৃথিবীতে আর নেই। মনে হচ্ছে এখনই সবাইকে জড়িয়ে ধরে বলি—আমি বাবা হতে যাচ্ছি!”
ইনায়া তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘুমের মধ্যেই হালকা করে নড়ে উঠল সে। কপালটা অস্বস্তিতে সামান্য কুঁচকে গেল, যেন কোনো অজানা দুঃস্বপ্ন তাকে ছুঁয়ে গেছে।ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘুমন্ত ইউভির বাহুর বাঁধন আরও শক্ত হয়ে এলো।
শেহেজাদার আদর পর্ব ৭৬
সম্পূর্ণ অবচেতন অবস্থাতেই সে ইনায়াকে নিজের বুকের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে নিল। যেন ঘুমের মাঝেও তার অবচেতন মন শুধু একটাই কাজ জানে নিজের আদরকে আগলে রাখা।
ইনায়ার মাথাটা আরও গভীরভাবে আশ্রয় নিল ইউভির বুকের কাছে। পরিচিত সেই উষ্ণতা আর নিরাপদ স্পর্শ পেতেই তার কুঁচকে থাকা ভ্রু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল।
